যুদ্ধ লব্ধ বন্টনের পর হাওয়াযিন গোত্রের এক প্রতিনিধিদল ইসলাম গ্রহণান্তে আগমন করলেন। এ দলের সদস্য সংখ্যা ছিল চৌদ্দ জন। এ দলের নেতা ছিলেন যুহাইর বিন সুরাদ। নাবী কারীম (ﷺ)-এর দুধ চাচা আবূ বারকানও ছিলেন এ দলে। প্রতিনিধিদল আরয করলেন, ‘আপনি দয়া করে আটককৃতদের এবং তাদের অর্থ সম্পদাদি ফেরত দিয়ে দিন।’ তাঁদের কথাবার্তায় এমন ভাব প্রকাশ পেল যেন অন্তর গলে যাবে।[1]
কবিতার ভাষায় তা ছিল নিম্নরূপ:
فامنن علينا رسول اللهِ في كـرم ** فإنـك المرء نرجـوه وننتظر
امنن عَلٰى نسوة قد كنت ترضعها ** إذ فوك تملؤه من محضها الدرر
নাবী (ﷺ) বললেন,
(إِنَّ مَعِيْ مَنْ تَرَوْنَ، وَإِنَّ أَحَبُّ الْحَدِيْثِ إِلَىَّ أَصْدِقُهُ، فَأَبْنَاؤُكُمْ وَنِسَاؤُكُمْ أَحَبُّ إِلَيْكُمْ أَمْ أَمْوَالُكُمْ؟)
‘আমার সঙ্গে যে সকল লোকজন আছে তোমরা তো তাদের দেখতেই পাচ্ছ এবং আমি সত্য কথা অধিক ভালবাসি।’ সুতরাং তোমরা বল তোমাদের নিকট খুব প্রিয় বস্তু কোনটি? সন্তান সন্ততি না ধন-সম্পত্তি?’
তারা বলল যে, ‘আমাদের নিকট খানাদানী মর্যাদার তুল্য আর কোন কিছুই নেই।’
নাবী কারীম (ﷺ) বললেন,
(إِذَا صَلَّيْتُ الْغَدَاةَ ـ أَيْ صَلَاةَ الظُّهْرِ ـ فَقُوْمُوْا فَقُوْلُوْا: إِنَّا نَسْتَشْفِعُ بِرَسُوْلِ اللهِ صلى الله عليه وسلم إِلَى الْمُؤْمِنِيْنَ، وَنَسْتَشْفِعُ بِالْمُؤْمِنِيْنَ إِلٰى رَسُوْلِ اللهِ صلى الله عليه وسلم أَنْ يَّرُدَّ إِلْيِنَا سَبْيَنَا)
‘আচ্ছা আমি যখন যুহর সালাত শেষ করব তখন তোমরা উঠে দাঁড়িয়ে বলবে যে, ‘আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে মু’মিনদের জন্য এবং মু’মিনদেরকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জন্য সুপারিশকারী বানাচ্ছি। অতএব, আমাদের আটককৃতদের ফিরিয়ে দিন।’
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন সালাত সমাপ্ত করলেন তখন তারা তাই বলল, উত্তরে নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, ‘এ অংশের সম্পর্কে যা আমার জন্য এবং বনু আব্দুল মুত্তালিবের জন্য আছে আমি যে সবই তোমাদের জন্য দিয়ে দিলাম এবং এখন আমি লোকজনদের নিকট তা জেনে নিচ্ছি। এর প্রেক্ষিতে আনসার ও মুহাজিরগণ দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমাদের নিকট যা আছে তার সব রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জন্য দিয়ে দিলাম। এরপর আকরা’ বিন হারিস বললেন, ‘কিন্তু ‘আমর ও বনু তামীম গোত্রের যা আছে তা আপনাকে দিলাম না।’ অতঃপর উয়ায়না বিন হিসন বললেন, ‘আমার এবং বনু ফাজারাদের নিকট যা রয়েছে তা আপনার জন্য নয়।’ আব্বাস বিন মেরদাস বললেন, ‘আমার এবং বনু সুলাইমদের যা কিছু আছে সে আপনার জন্য নয়। এর প্রেক্ষিতে বনু সুলাইম বললেন, ‘জী না, আমাদের সঙ্গে যা কিছু আছে তার সবই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জন্য। সেহেতু আব্বাস বিন মিরদাস বললেন, ‘তোমরা আমাকে বেইজ্জত করে দিলে।’
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন,
(إِنَّ هٰؤُلَاءِ الْقَوْمَ قَدْ جَاءُوْا مُسْلِمِيْنَ، وَقَدْ كُنْتُ اِسْتَأْنَيْتُ سَبْيَهُمْ، وَقَدْ خَيَّرُتُهْم فَلَمْ يَعْدِلُوْا بِالْأَبْنَاءِ وَالنِّسَاءِ شَيْئاً، فَمَنْ كَانَ عِنْدَهُ مِنْهُنَّ شَيْءٌ فَطَابَتْ نَفْسُهُ بِأَنْ يَّرُدَّهُ فَسَبْيِلُ ذٰلِكَ، وَمَنْ أَحَبَّ أَنْ يَسْتَمْسَكَ بِحَقِّهِ فَلْيُرَدُّ عَلَيْهِمْ، وَلَهُ بِكُلِّ فَرِيْضَةٍ سِتُّ فَرَائِضَ مِنْ أَوَّلِ مَا يَفِيءُ اللهُ عَلَيْنَا)،
‘দেখ, এ সকল লোক ইসলাম গ্রহণের পর এসেছে এবং (এ উদ্দেশ্যেই) আমি তাদের আটককৃতদের বন্টনে বিলম্ব করেছিলাম। এখন আমি তাদেরকে অধিকার প্রদান করলাম। তবে তারা অন্য কিছুকে সন্তানাদির সমতুল্য মনে করে নি। অতএব, যার নিকট আটককৃত কোন কিছু রয়েছে এবং সন্তুষ্ট চিত্তে যদি সে তা ফেরত দেয় তাহলে সেটাই হবে সব চাইতে ভাল ব্যবস্থা। আর কেউ যদি নিজ অধিকার আটকিয়ে রাখতে চায় তবুও তা হবে তাদের আটককৃত। অতএব, তাদেরকে সে সব ফিরিয়ে দেবে। আগামীতে সর্বাগ্রে যে সরকারী সম্পদ অর্জিত হবে ওর মধ্য থেকে ফেরতদানকারীকে ইনশাআল্লাহ্ অবশ্যই একটির পরিবর্তে ছয়টি দেয়া হবে।’
লোকজনেরা বললেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জন্য আমরা সব কিছুই সন্তুষ্ট চিত্তে ফিরিয়ে দিতে প্রস্তুত আছি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘আমরা ঠিক বুঝতে পারছি না যে, তোমাদের মধ্যে কে রাজী আছে এবং কে নেই, অতএব, তোমরা ফিরে যাও। তোমাদের প্রধানগণ তোমাদের ব্যাপারে আমাদের সামনে উপস্থাপন করবেন। এরপর লোকজনেরা তাদের সন্তানাদি ফিরিয়ে দিলেন। শুধু উওয়ায়না বিন হিসন অবশিষ্ট রইলেন। তাঁর অংশে ছিল এক বৃদ্ধা মহিলা। তিনি প্রথমে তাঁকে ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করলেও পরে ফিরিয়ে দিলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) প্রত্যেক বন্দীকে মুক্তিদানের সময় এক খানা করে কিবতী চাদর প্রদান করলেন।
গণীমত বিতরণের পর জি’রানা হতেই উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইহরাম বাঁধলেন এবং ওমরাহ্ পালন করলেন। অতঃপর আত্তাব বিন আসীদকে মক্কার অভিভাবক নিযুক্ত করে মদীনার দিকে রওয়ানা হলেন। ৮ম হিজরী ২৪শে যুল ক্বা’দাহ তারিখে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মদীনায় ফিরে আসেন।
ইতোপূর্বে উল্লেখিত হয়েছে যে, মক্কা বিজয়ের পর ৮ম হিজরীর শেষ ভাগে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মদীনা ফিরে আসেন। অতঃপর ৯ম হিজরীর মুহাররমের চাঁদ উদিত হওয়ার পর পরই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিভিন্ন গোত্রের মুসলিমগণের নিকট থেকে সদকা ও যাকাত আদায়ের উদ্দেশ্যে কর্মচারী প্রেরণ করেন। যে কর্মচারী যে গোত্রে প্রেরিত হয়েছিল তার তালিকা হচ্ছে যথাক্রমে নিম্নরূপ :
|
কর্মচারীগণের নাম |
যে গোত্র থেকে সদকা এবং যাকাত আদায় করা হয়েছিল |
|
১. উয়ায়না বিন হিসন |
বনু তামীম |
|
২. ইয়াযীদ বিন হুসাইন |
আসলাম এবং গেফার গোত্র |
|
৩. আব্বাদ বিন বাশির আশহালী |
সুলাইম এবং মুযাইনা গোত্র |
|
৪. রাফি’ বিন মাকীস |
জুহাইনা গোত্র |
|
৫. ‘আমর বিন আস |
বনু ফাযারা |
|
৬. যাহহাক বিন সুফইয়ান |
বুন কিলাব |
|
৭. বাশীর বিন সুফইয়ান |
বনু কা‘ব |
|
৮. ইবনুল লুতবিয়্যাহ আযদী |
বনু যুবয়ান |
|
৯. মুহাজির বিন আঈ উমাইয়াহ |
সানয়া শহরে (তাঁদের উপস্থিতিতে তাঁদের বিরুদ্ধে আসওয়াদ আনসী সানয়ায় নাবী দাবী করেছিল)। |
|
১০. যিয়াদ বিন লাবীদ |
হাযরামাওত অঞ্চল |
|
১১. আদী বিন হাতিম |
ত্ বাই এবং বনু আসাদ গোত্র |
|
১২. মালিক বিন নুওয়াইরাহ |
বনু হানযালাহ গোত্র |
|
১৩. যিবরিক্বান বিন বদর |
বনু সা‘দ (এর একটি শাখা) |
|
১৪. ক্বায়স বিন ‘আসিম |
বনু সা‘দ (এর অন্য একটি শাখা) |
|
১৫. আলা- বিন হাযরামী |
বাহরাইন অঞ্চল |
|
১৬. আলী ইবনু আবূ ত্বালিব |
নাজরান অঞ্চল (যাকাত এবং কর আদায় করার জন্য) |
প্রকাশ থাকে যে, ৯ম হিজরীর মুহাররম মাসেই এ সকল কর্মচারীর সকলেই প্রেরণ করা হয় নি। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে বেশ কিছুটা বিলম্ব হয়েছিল সংশ্লিষ্ট গোত্রগুলোর বিলম্বে ইসলাম গ্রহণের কারণে। তবে এ পরিচালনা বন্দোবস্তের সঙ্গে উল্লেখিত কর্মচারীবৃন্দের প্রেরণের কাজ শুরু হয়েছিল ৯ম হিজরীর মুহাররম মাসে এবং এর মাধ্যমেই হুদায়বিয়াহর সন্ধির পর ইসলামী দাওয়াতের কৃতকার্যতার প্রশস্ততা অনুমান করা যেতে পারে। অবশিষ্ট থাকে মক্কা বিজয়ের পরবর্তী যুগের আলোচনা। অবশ্য ঐ সময়ে লোকেরা আল্লাহর দ্বীনে দলে দলে প্রবেশ করতে শুরু করে।
বিভিন্ন গোত্রের নিকট থেকে যাকাত আদায়ের জন্য যেমন কর্মচারী প্রেরণ করা হয় তেমনিভাবে আরব উপদ্বীপের সাধারণ অঞ্চলসমূহের মধ্যে নিরাপত্তা ও শান্তির পরিবেশ বজায় রাখার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন স্থানে সৈনিক মহোদ্যমও গ্রহণ করা হয়। এ সকল অভিযানের বিবরণ হচ্ছে যথাক্রমে নিম্নরূপ :
‘উয়ায়না বিন হিসন ফাযারীর অভিযান (سَرِيَّةُ عُيِيْنَةَ بْنِ حِصْنِ الْفَزَارِيْ) (৯ম হিজরী, মুহাররম) : ‘উয়ায়নার নেতৃত্বে ৫০ জন ঘোড়সওয়ারের সমন্বয়ে গঠিত এক বাহিনী বনু তামীম গোত্রের নিকট প্রেরণ করা হয়। অন্যান্য গোত্রগুলোকে উত্তেজিত করে বনু তামীম গোত্র কর প্রদানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার কারণেই এ অভিযান প্রেরিত হয়েছিল। এ অভিযানে কোন মুহাজির কিংবা আনসার ছিলেন না।
‘উয়ায়না বিন হিসন রাত্রিবেলা পথ চলতেন এবং দিবাভাগে অত্যন্ত সঙ্গোপনে অগ্রসর হতেন। এভাবে মরুভুমিতে বনু তামীম গোত্রের উপর আক্রমণ চালানো হয়। আকস্মিক আক্রমণে ভীত সন্ত্রস্ত্র হয়ে বনু তামীম গোত্র পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে পলায়ন করে এবং তাদের ১১জন পুরুষ ২১জন নারী ও ২৩জন শিশু মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হয়। তাদের মদীনায় আনয়ন করে রামলা বিনতে হারেসের বাড়িতে রাখা হয়।
অতঃপর বনু তামীমের দশ জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি বন্দীদের ব্যাপারে মদীনায় আগমন করল এবং নাবী কারীম (ﷺ)-এর দরজায় গিয়ে এভাবে বলল, ‘হে মুহাম্মাদ (ﷺ) আমাদের নিকট এসো।’ তাদের আহবানে নাবী কারীম (ﷺ) যখন বাইরে আগমন করলেন তখন তারা তাঁকে জড়িয়ে ধরে আলোচনা চালাতে থাকল। অতঃপর নাবী কারীম (ﷺ) তাদের সঙ্গে অবস্থান করতে থাকলেন এবং এ অবস্থার মধ্য দিয়ে যুহর সালাতের সময় হলে তিনি যুহর সালাত আদায় করলেন। সালাতের পর মসজিদে নাবাবীর বারান্দায় গিয়ে বসে পড়লেন। তারা ওতারেদ বিন হাজেরকে দলের মুখপাত্র হিসেবে এগিয়ে দিয়ে অহমিকা ও আত্মগর্বের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক কথাবার্তা বলতে থাকল। এদিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইসলামের বক্তা হিসেবে তাদের কথাবার্তার উপযুক্ত জবাব দানের জন্য সাবেত বিন ক্বায়স বিন শাম্মাসকে নিযুক্ত করলেন। তিনি তাদের আলোচনার আলোকে যথোপযুক্ত বক্তব্য পেশ করলেন। এরপর তারা তাদের কবি যারকান বিন বদরকে অগ্রভাগে রাখলে সে তাদের গৌরবসূচক কিছু কবিতা আবৃত্তি করল। মুসলিম কবি হাস্সান বিন সাবেত (রাঃ) তাদের জবাবে বক্তব্য পেশ করলেন।
যখন উভয় দলের বক্তা এবং কবিগণ উপস্থাপনা শেষ করলেন তখন আকরা বিন হাবেস বলল, ‘তাদের বক্তা আমাদের চাইতে অধিক শক্তিশালী এবং তাদের কবি আমাদের কবির তুলনায় অধিক শক্তিশালী বক্তব্য পেশ করেছেন। তাদের কথাবার্তা আমাদের কথাবার্তার তুলনায় অধিক জোরালো এবং তাদের আলোচনা আমাদের আলোচনার তুলনায় অধিক উন্নত মানের। এবং তারা ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদেরকে উত্তম উপঢৌকন প্রদান করে সম্মান প্রদর্শন করলেন এবং তাদের আটককৃত শিশু ও মহিলাদেরকে ফিরিয়ে দিলেন।[1]
কুতবাহ বিন আমিরের অভিযান (سَرِيَّةُ قُطْبَةَ بْنِ عَامِرٍ إِلٰى حَيٍّ مِّنْ خَثْعَمَ بِنَاحِيْةٍ تَبَالَةٍ) (সফর ৯ম হিজরী) : তুরাবাহর নিকটে তাবালা অঞ্চলে খাস’আম গোত্রের একটি শাখার উদ্দেশ্যে এ অভিযান প্রেরণ করা হয়। বিশ ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত একটি দল নিয়ে কুতবাহ এ অভিযানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এ দলের বাহন ছিল ১০টি উট যার উপর তাঁরা পালাক্রমে আরোহন করতেন।
মুসলিম বাহিনী রাত্রি বেলা লক্ষ্যস্থলের উপর আক্রমণ চালান, এর ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। এ সংঘর্ষে উভয় পক্ষের লোকজন হতাহত হয়। মুসলিম বাহিনীর মধ্য থেকে কুতবাহ এবং আরও কয়েক জন নিহত হন। কিন্তু তা সত্ত্বেও মুসলিমগণ কিছু সংখ্যক ভেড়া, বকরি ও শিশুদের মদীনায় নিয়ে আসতে সক্ষম হন।
যাহহাক বিন সুফইয়ান কিলাবীর অভিযান (سَرِيَّةُ الضَّحَّاكِ بْنِ سُفْيَانَ الْكِلَابِيْ إِلٰى بَنِيْ كِلاَبٍ) (৯ম হিজরী, রবিউল আওয়াল মাস): এ অভিযান প্রেরণ করা হয়েছিল বনু কিলাব গোত্রকে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার জন্য। কিন্তু তারা তা অস্বীকার করে এবং যুদ্ধে লিপ্ত হয়। মুসলিম বাহিনী তাদেরকে পরাজিত করেন এবং একজনকে হত্যা করেন।
‘আলক্বামাহ বিন মুজাযযির মুদলিজীর অভিযান (سَرِيَّةُ عَلْقَمَةَ بْنِ مُجَزِّرِ الْمُدْلِجِيِّ إِلٰى سَوَاحِلِ جُدَّةٍ) (৯ম হিজরী, রবিউল আখের) : তিনশ ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত বাহিনীর পরিচালক হিসেবে তাঁকে জিদ্দাহ তীরবর্তী অঞ্চলে প্রেরণ করা হয়। কিছু সংখ্যক হাবশী জিদ্দাহ তীরবর্তী অঞ্চলে একত্রিত হয়ে মক্কাবাসীদের উপর এক ডাকারি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। আলকামা সমুদ্রে অবতরণ পূর্বক এক উপদ্বীপ পর্যন্ত অগ্রসর হন। হাবশীরা মুসলিমগণের আগমনের সংবাদ অবগত হয়ে পলায়ন করে।[2]
আলী বিন আবূ ত্বালীবের অভিযান (سَرِيَّةُ عَلِيِّ بْنِ أَبِيْ طَالِبٍ إِلٰى صَنَمٍ لِطَيْئٍ) (৯ম হিজরী, রবিউল আওয়াল মাস) : তাঁকে তাই গোত্রের ফুলস নামক একটি মূর্তি ভেঙ্গে ফেলার জন্য প্রেরণ করা হয়েছিল। তাঁর পরিচালনাধীনে এ বাহিনীতে ছিল দেড়শ লোক এবং বাহন ছিল একশ উট এবং পঞ্চাশটি ঘোড়া, রণ-পতাকাগুলো ছিল কালো এবং নিশান ছিল সাদা। এ বাহিনী ফজরের সময় হাতেম তাই-এর মহল্লায় আক্রমণ চালিয়ে ফুলসকে ভেঙ্গে ফেলার পর অনেক লোককে বন্দী করে এবং মেষ ও বকরিসহ অনেক গবাদি সম্পদ হস্তগত করেন। বন্দীদের মধ্যে হাতিমতাই এর কন্যাও ছিল। হাতিমতাই-এর পুত্র আদী শাম দেশে পলায়ন করে। মুসলিমগণ ফুলস মূর্তি ধন-ভান্ডারে তিনটি তলোয়ার ও তিনটি যুদ্ধের লৌহবর্ম পেয়েছিলেন। পথের মধ্যে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বন্টন করে নেয়া হয়। অবশ্য কিছু পছন্দসই দ্রব্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জন্য পৃথক করে রাখা হয়। হাতেম তাই-এর পরিবারকে বণ্টন করা হয় নি।
মদীনায় পৌঁছার পর হাতেম তনয়া এই বলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দরবারে আরয করে, ‘হে আল্লাহর রাসূল! এখানে আসা যার পক্ষে সম্ভব ছিল তার কোন খবর নেই। পিতা বিগত এবং আমি বৃদ্ধা। সেবা করার ক্ষমতা আমার নেই। আপনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করুন, আল্লাহ আপনার প্রতি অনুগ্রহ করবেন।’
নাবী কারীম (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেন, (مَنْ وَافَدَكَ؟) ‘তোমার জন্য কার আসার সম্ভাবনা ছিল?
উত্তর দিলেন, ‘আদি বিন হাতেম। সে আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল (ﷺ) থেকে পলায়ন করেছে।’ অতঃপর নাবী কারীম (ﷺ) সেখান থেকে এগিয়ে গেলেন।
দ্বিতীয় দিবস আবার সে সেই কথারই পুনরাবৃত্তি করল এবং রাসূলে কারীম (ﷺ) আবার সে কথাই বললেন, যা গতকাল বলেছিলেন।
তৃতীয় দিবসে আবারও সে সেই কথাই বললে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে মুক্ত করে দিলেন। সে সময় নাবী (ﷺ)-এর পাশে একজন সাহাবী ছিলেন, সম্ভবত আলী (রাঃ), তিনি বললেন, ‘নাবী কারীম (ﷺ)-এর নিকট একটি সওয়ারীও চেয়ে নাও।’ সে একটি সওয়ারীর জন্য আরয করলে নাবী কারীম (ﷺ) তাকে তা সরবরাহ করার জন্য নির্দেশ প্রদান করলেন।
মুক্তি লাভের পর হাতেম তনয়া শাম রাজ্যে নিজ ভাইয়ের নিকট ফিরে গেল। সেখানে সে তার ভাইয়ের নিকট সাক্ষাতের পর সব কিছু সবিস্তারে বর্ণনা করল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সম্পর্কে বলতে গিয়ে সে বলল যে, তিনি এত সুন্দর ভাবে কাজ সম্পাদন করেছেন যে, তোমার পিতাও তেমনটি করতে পারতেন না। তাঁর নিকটে যাও ভরসা অথবা ভয়ের সঙ্গে।
কাজেই আশ্রয় প্রার্থনা কিংবা লিখিত আবেদন ছাড়াই আদী নাবী কারীম (ﷺ)-এর খিদমতে হাজির হল। নাবী কারীম (ﷺ) তাকে নিজ বাড়িতে নিয়ে গেলেন। সে যখন তাঁর সামনে বসল তখন তিনি আল্লাহর প্রশংসা কীর্তন করলেন এবং বললেন, ‘তোমরা কোন জিনিস হতে পলায়ন করছ? লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা হতে কি পলায়ন করছ? যদি সেটাই হয় তাহলে বল তো আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য আছে বলে কি তোমরা মনে কর?’ সে উত্তর দিল ‘না’। কিছুক্ষণ কথোপকথনের পর নাবী কারীম (ﷺ) পুনরায় বললেন, ‘আচ্ছা বল তো, তোমরা কি আল্লাহ আকবর বলা থেকে পলায়ন করছ? তবে কি আল্লাহ হতে কিছু বড় আছে বলে তোমরা মনে কর?’ উত্তরে সে বলল, ‘না’। রাসূলে কারীম (ﷺ) বললেন, ‘শোন ইহুদীদের প্রতি আল্লাহর গজব পতিত হয়েছে এবং খ্রিষ্টানরা পথভ্রষ্ট।’
সে বলল, ‘তবে আমি একনিষ্ঠ মুসলিম।’ তার মুখ থেকে এ কথা শোনার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠল। অতঃপর তাকে এক আনসারীর বাড়িতে রাখার জন্য নির্দেশ দিলেন। সে আনসারীর বাড়িতে থাকত এবং সকাল সন্ধ্যায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খিদমতে উপস্থিত হতো।[3]
আদী হতে ইবনু ইসহাক্ব এ কথাও বর্ণনা করেছেন যে, নাবী কারীম (ﷺ) যখন তাকে নিজ বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বসালেন তখন জিজ্ঞেস করলেন,
‘ওহে আদী বিন হাতেম! তোমরা কি পুরোহিত ছিলে না?’ উত্তরে আদি বলল, ‘অবশ্যই’। অতঃপর নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, ‘তোমরা কি নিজ কওমের মধ্যে যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক চতুর্থাংশ গ্রহণের নীতি অনুসরণ করে চলতে না? সে বলল, ‘আমি বললাম, ‘অবশ্যই’।’ নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, অথচ তোমাদের দ্বীনে এটা বৈধ নয়।’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ’ আল্লাহর কসম! এবং তখনই আমি জেনেছি যে, বাস্তবিক আপনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ), কারণ, আপনি সে কথাও জানেন যা জানা যায় না।’[4]
মুসনাদে আহমাদের বর্ণনা সূত্রে জানা যায় যে, নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, ‘হে আদী! ইসলাম গ্রহণ কর, নিরাপদে থাকবে।’ আমি বললাম, ‘আমি তো নিজেই এক দ্বীনের অনুসারী।’ নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, ‘তোমার দ্বীন সম্পর্কে আমি তোমার চাইতে অধিক অবগত আছি।’ আমি বললাম, ‘আমার দ্বীন সম্পর্কে আমার চাইতেও বেশী জানেন?’ নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, ‘হ্যাঁ’, আচ্ছা বলো তো, এমনটি কি নয় যে, তোমরা পুরোহিত অথচ নিজ কওমের গণীমত থেকে এক চতুর্থাংশ গ্রহণ করতে?’
আমি বললাম, ‘অবশ্যই’। নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, ‘তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে এটা বৈধ নয়।’
তাঁর এ কথার প্রেক্ষিতে বাধ্য হয়ে আমাকে মাথা নত করতে হল।[5]
সহীহুল বুখারীতে আদী হতে বর্ণিত আছে যে, ‘আমি একদা খিদমতে নাবাবীতে উপবিষ্ট ছিলাম। হঠাৎ এক ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত হয়ে অভাব অনটনের অভিযোগ পেশ করল। এরপর অন্য এক ব্যক্তি এসে ছিনতাইয়ের অভিযোগ পেশ করল। নাবী কারীম (ﷺ) বললেন,
(يَا عَدِيٍّ، هَلْ رَأَيْتَ الْحِيْرَةَ؟ فَإِنْ طَالَتْ بِكَ حَيَاةٌ فَلَتَرَيَنَّ الظَّعِيْنَةَ تَرْتَحِلُ مِنْ الْحِيْرَةِ حَتّٰى تَطُوْفَ بِالْكَعْبَةِ، لَا تَخَافُ أَحَداً إِلاَّ اللهُ، وَلَئِنْ طَالَتْ بِكَ حَيَاةٌ لَتُفْتَحُنَّ كُنُوْزَ كِسْرٰي، وَلَئِنْ طَالَتْ بِكَ حَيَاةٌ لَتَرَيَنَّ الرَّجُلَ يَخْرُجُ مِلْءَ كَفِّهِ مِنْ ذَهَبٍ أَوْ فِضَّةٍ، وَيَطْلُبُ مَنْ يَقْبَلُهُ فَلَا يَجِدُ أَحَداً يَقْبَلُهُ مِنْهُ...)
‘আদি, তুমি কি হীরা দেখেছ? জীবন যদি দীর্ঘায়িত হয় তাহলে দেখবে যে পর্দানশীন মহিলাগণ হীরা হতে নিরাপদে চলে আসবে, কা‘বা ঘরের তাওয়াফ করবে এবং আল্লাহ ছাড়া তার আর কোন কিছুর ভয় থাকবে না। তোমার জীবন দীর্ঘায়িত হলে তোমরা কিসরার ধন-ভান্ডার জয় করবে এবং দেখবে যে, লোকজনেরা হাত ভর্তি করে সোনা রুপা বাহির করবে, কিন্তু তালাশ করেও সে সব গ্রহণ করার মতো লোকজন পাবে না।’
এ বিষয় প্রসঙ্গে আদী বলেছেন, ‘আমি দেখেছি যে, পর্দানশীন মহিলারা হীরা হতে এসে কা‘বা ঘরে তাওয়াফ করছে এবং আল্লাহ ছাড়া তাদের আর কোন কিছুরই ভয় নেই। তিনি আরও বলেছেন, ‘আমি নিজেই সে সব লোকজনের মধ্যে ছিলাম যারা কিসরা বিন হুরমুজের ধন-ভান্ডার জয় করেছিল। তাছাড়া, তোমাদের জীবন যদি দীর্ঘায়িত হয় তাহলে তোমরাও ঐ সব কিছু দেখে নিতে পারবে যা নাবী আবুল কাসেম (ﷺ) বলেছেন যে, মানুষ হাত ভর্তি করে সোনারুপা বাহির করবে।[6]
[2] ফাতহুল বারী ৮ম হিজরী ৫৯ পৃঃ।
[3] যাদুল মা’আদ ২য় খন্ড ২০৫ পৃঃ।
[4] ইবনু হিশাম ২য় খন্ড ৫৮১ পৃঃ।
[5] মুসনাদে আহমাদ ৪র্থ খন্ড ২৫৭ ও ৩৭৮ পৃঃ।
[6] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৫০৭ পৃঃ।
মক্কা বিজয়ের যুদ্ধ ছিল সত্য মিথ্যা এবং ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্যকারী যুদ্ধ। এ যুদ্ধের পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর রিসালাত সম্পর্কে আরববাসীগণের মনে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কিংবা সন্দেহের আর কোন অবকাশই রইল না। এ কারণে, পরিস্থিতির মোড় সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তিত হয়ে গেল। এবং মানুষ আল্লাহর দ্বীনে দলে দলে প্রবিষ্ট হতে থাকল। এ সম্পর্কিত বিস্তারিত বিবরণ ‘প্রতিনিধি প্রেরণ’ অধ্যায়ে উপস্থাপিত হবে এবং ‘বিদায় হজ্জ’ সম্পর্কিত আলোচনায়ও এ সম্পর্কে কিছুটা আঁচ করা সম্ভব হবে। যাহোক, আলোচ্য সময়ে অভ্যন্তরীণ সমস্যা বলতে আর তেমন কিছুই ছিল না। ফলে মুসলিমগণ শরীয়তের শিক্ষা বিস্তার এবং ইসলামের প্রচার প্রসারে একনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ লাভ করেন।
ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার এমনি এক পর্যায়ে মদীনার উপর এমন এক শক্তির দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হচ্ছিল যা কোন কারণ ব্যতিরেকেই মুসলিমগণকে এখানে সেখানে ত্যক্ত বিরক্ত করে চলছিল। ইতিহাসে এরা রোমক বা রোমীয় নামে পরিচিত। তদানীন্তন পৃথিবীতে এরা ছিল সর্বাধিক সৈন্য সম্পদে সমৃদ্ধ। ইতোপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে যে, এ বিরক্তিকর কাজ আরম্ভ করে শোরাহবীল বিন ‘আমর গাসসানী নাবী কারীম (ﷺ)-এর দূত হারিস বিন উমাইর আযদীকে (রাঃ) হত্যা করার মাধ্যমে। তাছাড়া এ হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যায়দ বিন হারিসাহ (রাঃ)-এর অধিনায়কত্বে যে সৈন্যদল প্রেরণ করেছিলেন এবং যাঁরা মুতাহ নামক স্থানে রোমক বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিলেন সে কথাও ইতোপূর্বে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু এ সৈন্যদল সে আত্মগর্বী অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণে সক্ষম হন নি। অবশ্য এর ফলে দূরের ও নিকটের আরব অধিবাসীদের উপর মুসলিমগণের প্রভাব প্রতিপত্তির একটি অনুকূল অবস্থার সৃষ্টি হয়ে যায়।
বস্তুত আরব গোত্রসমূহের উপর মুসলিমগণের প্রভাব প্রতিফলিত হওয়ার কারণে তাদের মধ্যে সৃষ্ট সচেতনতা এবং রোমকদের নাগপাশ থেকে নিজেদের মুক্ত করার জন্য সৃষ্ট সংকল্পের ব্যাপারটিকে উপেক্ষা করা তাদের পক্ষে কোনক্রমেই সম্ভব ছিল না। এ ব্যাপারে রোমকদলে যে ভয় ছিল তা ক্রমে ক্রমে সীমান্তের দিকে সম্প্রসারিত হচ্ছিল। বিশেষ করে আরব ভূখন্ডের সীমান্তবর্তী শাম রাজ্যের জন্য তারা একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে শক্তি সঞ্চয়ের পূর্বেই ইসলামী শক্তিকে সম্পূর্ণরূপে পিষ্ট করে দেয়ার প্রয়োজন অনুভব করলেন রোমক সম্রাট যাতে রোম সাম্রাজ্যের সংলগ্ন আরব এলাকা থেকে ভবিষ্যতে কোন ফেতনা কিংবা হাঙ্গামার সম্ভাবনা না থাকে।
উপরোক্ত কারণসমূহের প্রেক্ষাপটে মুতাহ যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পর একটি বছর পূর্ণ হতে না হতেই রোম সম্রাট রোম সাম্রাজ্যের অধিবাসীদের মধ্য থেকে এবং অধীনস্থ আরব গোত্রসমূহ অর্থাৎ গাসসান পরিবার ও অন্যান্য বিভিন্ন গোত্র থেকে সৈন্য সংগ্রহের কাজ শুরু করে দিল এবং এক রক্তক্ষয়ী ও চূড়ান্ত ফয়সালাকারী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকল।
এদিকে মদীনায় ক্রমে ক্রমে খবর আসতে থাকে যে, মুসলিমগণের বিরুদ্ধে এক চূড়ান্ত ও মীমাংসাকারী যুদ্ধের জন্য রোমক সম্রাট অত্যন্ত ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে চলেছেন। রোমক সম্রাটের এহেন সমর প্রস্তুতির সংবাদে স্বাভাবিকভাবেই মুসলিমগণের মনে কিছু অস্বস্তির ভাব সৃষ্টি হয়েছিল এবং কোন অস্বাভাবিক শব্দ শোনা মাত্র তাদের কান খাড়া হয়ে যাচ্ছিল। তাঁদের মনে এ রকম একটি ধারণারও সৃষ্টি হয়েছিল যে, না জানি কখন রোমক বাহিনীর স্রোত এসে আঘাত হানে। ৯ম হিজরীর ঠিক এমনি সময়েই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজ বিবিগণের উপর অসন্তুষ্ট হয়ে এক মাসের ইলা[1] করেন এবং তাঁদের সঙ্গ পরিহার করে একটি ভিন্ন কক্ষে নির্জনতা অবলম্বন করেন।
প্রাথমিক অবস্থায় সাহাবায়ে কেরাম প্রকৃত সমস্যা অনুধাবন করতে সক্ষম হননি। তাঁরা ধারণা করেছিলেন যে, নাবী কারীম (ﷺ) তাঁর পত্নীদের তালাক দিয়েছেন এবং এ কারণে তাঁদের অন্তরে দারুণ দুঃখ বেদনার সৃষ্টি হয়েছিল। উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) এ ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন যে, ‘আমার একজন আনসারী বন্ধু ছিল, আমি যখন খিদমতে নাবাবীতে উপস্থিত না থাকতাম, তখন তিনি আমার নিকট সংবাদাদি পৌঁছে দিতেন এবং তিনি যখন উপস্থিত না থাকতেন তখন আমি তাঁর নিকট তা পৌঁছে দিতাম।’ তাঁরা উভয়েই মদীনার উপকণ্ঠে বাস করতেন। তাঁরা পরস্পর পরস্পরের প্রতিবেশী ছিলেন এবং পালাক্রমে খিদমতে নাবাবীতে উপস্থিত থাকতেন ঐ সময়ে আমরা গাসসানী সম্রাটকে ভয় করতাম। কারণ, আমাদের বলা হয়েছিল যে, তারা আমাদের আক্রমণ করবে এবং এ ভয়ে আমরা সব সময় ভীত থাকতাম।’
একদিন আমার এ আনসারী বন্ধু আকস্মিক দরজায় করাঘাত করতে করতে বলতে থাকলেন, ‘খুলুন, খুলুন’ আমি বললাম, ‘গাসসানীরা কি এসে গেল?’ তিনি বললেন, ‘না’ বরং এর চাইতেও কঠিন সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর স্ত্রীদের থেকে পৃথক হয়ে গিয়েছেন।[2]
ভিন্ন এক সূত্র থেকে বিষয়টি এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, উমার (রাঃ) বললেন, ‘আমাদের মাঝে সাধারণভাবে এ কথা প্রচারিত হয়েছিল যে, গাসসান গোত্রের লোকজনেরা আমাদের আক্রমণ করার জন্য ঘোড়ার পায়ে নাল লাগাচ্ছে। একদিন আমার বন্ধু তাঁর পালাক্রমে খিদমতে নাবাবীতে হাজির হন। অতঃপর বাদ এশা তিনি বাড়ি ফিরে এসে দরজায় জোরে জোরে আঘাত করতে করতে বলতে থাকেন, ‘এরা কি শুয়ে পড়েছেন? ’ আতঙ্কিত অবস্থায় আমি যখন ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম তখন তিনি বললেন যে, একটি বড় ঘটনা ঘটেছে। আমি বললাম, ‘গাসসানীরা কি এসে গেছে?’ তিনি বললেন, ‘না’ বরং এর চাইতেও কঠিন সমস্যা হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর বিবিদেরকে তালাক।’ শেষ পর্যন্ত[3]
উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) বর্ণিত ঘটনা থেকে সহজেই অনুমান ও অনুধাবন করা যায় যে, রোমকগণের যুদ্ধ প্রস্তুতি মুসলিমগণকে কতটা চিন্তিত এবং বিচলিত করে তুলেছিল। মদীনায় মুনাফিক্বদের শঠতা ও চক্রান্ত সমস্যাটিকে আরও প্রকট করে তুলেছিল। অথচ মুনাফিক্বরা এ কথাটি ভালভাবেই অবগত ছিল যে, উদ্ভূত সমস্যার প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিজয়ী হয়েছেন এবং পৃথিবীর কোন শক্তিকেই তিনি কখনো ভয় করেন না। অধিকন্তু, এ কথাটিও তারা ভালভাবেই অবগত ছিল যে, যারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করেছে তারা সকলেই পর্যুদস্ত এবং ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। তবুও অন্তরে অন্তরে তারা একটি ক্ষীণ আশা পোষণ করে আসছিল যে, যুগের আবর্তনের গতিধারায় মুসলিমগণের বিরুদ্ধে তাদের লালিত প্রতিহিংসার অগ্নি একদিন না একদিন প্রজ্জ্বলিত হবেই এবং খুব সম্ভব এটাই হচ্ছে কাঙ্ক্ষিত সময়। তাদের সেই কল্পিত সুযোগের প্রেক্ষাপটে তারা একটি মসজিদের আকার আকৃতিতে (যা মাসজিদে ‘যেরার’ ‘ক্ষতিকর নামে প্রসিদ্ধ ছিল) ষড়যন্ত্রের আড্ডাখানা তৈরি করল। এর উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমগণের মধ্যে দলাদলি সৃষ্টি এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে কারীম (ﷺ)-এর কুফরী করা ও মুসলিমগণের সঙ্গে লড়াইয়ের উদ্দেশে গোপনে তথ্য সরবরাহের কেন্দ্র হিসেবে তা ব্যবহার করা। তাদের এ অসদুদ্দেশ্যকে ঢেকে রাখার কৌশলস্বরূপ সেখানে সালাত আদায়ের জন্য তারা নাবী কারীম (ﷺ)-কে অনুরোধ জানায়।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে সেখানে সালাত পড়ানোর অনুরোধ জানানোর পিছনে উদ্দেশ্য ছিল যে, মুসলিমগণ কোনক্রমেই যেন চিন্তাভাবনা করার সুযোগ না পায় যে, সেখানে তাঁদের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। তাছাড়া এ মসজিদে যাতায়াতকারীদের ব্যাপারে ঘুণাক্ষরেও যেন কোন সন্দেহের সৃষ্টি না হয় এটাও ছিল অন্যতম উদ্দেশ্য। এমনিভাবে এ মসজিদটি মুনাফিক্ব ও তাদের দোসরদের নিরাপদ আড্ডা ও গোপন কার্যকলাপের কেন্দ্রে পরিণত হয়।
কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ মসজিদে সালাত আদায় করার ব্যাপারটি যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন না করা পর্যন্ত বিলম্বিত করেন। কারণ, যুদ্ধ প্রস্তুতির জন্য তাঁকে অতিমাত্রায় ব্যস্ত থাকতে হচ্ছিল। এর ফলে তাদের দুরভিসন্ধির ব্যাপারে মুনাফিক্বগণ কৃতকার্য হতে সক্ষম হল না। অধিকন্তু, যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তনের পূর্বেই আল্লাহ তাদের অসদুদ্দেশ্যের যবনিকা উন্মোচন করে দিলেন। কাজেই, যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ মসজিদে সালাত আদায় না করে তা বিধ্বস্ত করে দেন।
[2] সহীহুল বুখারী ২য় খন্ড ৭৩০ পৃঃ।
[3] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৩৩৪ পৃঃ।
মুসলিমগণ যখন ক্রমাগতভাবে উপর্যুক্ত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েই চলেছিলেন এমন সময় শাম রাজ্য হতে আগমণকারী তৈল বাহক [1] দলের মাধ্যমে আকস্মিকভাবে জানা গেল যে, হিরাকল ৪০ হাজার সৈন্যের সমন্বয়ে এক যুদ্ধ প্রিয় বাহিনী গঠন করেছে এবং রোমের একজন প্রখ্যাত কমান্ডারের অধিনায়কত্বে এ বাহিনীকে ন্যস্ত করেছে। তাছাড়া, নিজ পতাকার আওতায় খ্রিষ্টান গোত্রসমূহের মধ্যে লাখম জোযাম ও অন্যান্য গোত্রগুলোও একত্রিত করেছে এবং তাদের বাহিনীর অগ্রবর্তী দলটি বালকা’ নামক স্থানে পৌঁছে গেছে। এমনিভাবে এক ভয়াবহ বিপদ মূর্তরূপে মুসলিমগণের সামনে আত্মপ্রকাশ করেছে।
এমনি এক নাজুক পরিস্থিতির মুখে আরও বিভিন্নমুখী সমস্যার ফলে অবস্থা অত্যন্ত জটিল এবং সঙ্গীন হয়ে উঠল। সময়টা ছিল অত্যন্ত গরম। মানুষ ছিল অসচ্ছলতা এবং দুর্ভিক্ষের কবলে। যান বাহনের সংখ্যাও ছিল খুব সীমিত। বাগ-বাগিচার ফলমূলে পরিপক্কতা এসে গিয়েছিল। ফলমূল সংগ্রহ এবং ছায়ার জন্য বাগ-বাগিচায় অবস্থান করাটা মানুষের অধিকতর পছন্দনীয় ছিল। এ সব কারণে তাৎক্ষণিক যুদ্ধ যাত্রার জন্য তারা মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল না। তদুপরি, পথের দূরত্ব এবং সফরের ক্লেশকিষ্টতা তাদের মনকে দারুনভাবে প্রভাবিত করছিল।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) গভীর মনোনিবেশ সহকারে সমস্যা সংকুল পরিস্থিতির এবং বিভিন্নমুখী প্রতিকূলতা পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছিলেন। তিনি এটা পরিস্কার ভাবে উপলব্ধি করছিলেন যে এ চরম সংকটময় মুহূর্তে যদি রুমীগণের সঙ্গে মোকাবেলা করার ব্যাপারে শৈথিল্য কিংবা গড়িমসি করা হয়, কিংবা আরও অগ্রসর হয়ে তারা যদি মদীনার দ্বার প্রান্তে এসে উপস্থিত হয় তাহলে ইসলামী দাওয়াত ও মুসলিমগণের জন্য তা হবে অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং অমবমাননাকর। এতে মুসলিমগণের সামরিক মর্যাদা দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ হবে এবং যে অজ্ঞতার কারণে হুনাইন যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী প্রচন্ডভাবে আঘাত প্রাপ্ত হয়েছিল তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। অধিকন্তু, যুগের আবর্তন-বিবর্তনের ধারায় মুনাফিক্বগণ যে সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে এবং ফাসেক আবূ ‘আমির ফাসেকের মাধ্যমে রোম সম্রাটের সংগে ঐক্যবন্ধন সৃষ্টি করেছে তা পিছন দিক থেকে পেটে খঞ্জর ঢুকিয়ে দেয়ার শামিল। আর সামনের দিক থেকে রুমীদের সৈনিক প্লাবন রক্ষক্ষয়ী আঘাত হানবে তাদের উপর। এমনিভাবে অর্থহীন হয়ে যাবে সে সকল অসাধারণ প্রচেষ্টা ও পরিশ্রম যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও তাঁর সাহাবাবৃন্দ ব্যয় করেছিলেন আল্লাহর দ্বীনের প্রচার ও প্রসার কার্যে, অকৃতকার্যতায় পর্যবসিত হয়ে যাবে সে সময় দুর্লভ সাফল্য যা অর্জন করা হয়েছিল অসামান্য ত্যাগ তিতিক্ষা, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে।
ইসলাম ও মুসলিমগণের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত নিয়ে সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণ আলোচনা পর্যালোচনা পর বিভিন্নমুখী সমস্যা সত্ত্বেও নাবী কারীম (ﷺ) সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন যে, মুসলিম অধ্যূষিত অঞ্চলে রুমীদের প্রবেশের সুযোগ না দিয়ে বরং তাদের আঞ্চলিক সীমানার মধ্যেই তাদের সঙ্গে এক চূড়ান্ত ফয়সালাকারী সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া বিশেষ প্রয়োজন।
রোমকদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উত্তম যুদ্ধ প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য সাহাবীগণকে নির্দেশ প্রদান করেন। তাছাড়া, মক্কার বিভিন্ন গোত্র এবং অধিবাসীদের নিকট সংবাদ প্রেরণ করেন যুদ্ধের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার জন্য। এ সব ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর একটা নীতি ছিল তিনি যখনই কোন যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন তখন যুদ্ধের ব্যাপারে গোপনীয়তা অবলম্বন করতেন। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং প্রকট অভাব অনটনের কারণে এবার তিনি সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করে দিলেন যে, রুমীগণের যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এর পিছনে উদ্দেশ্য ছিল যোদ্ধাগণ যেন উত্তম প্রস্তুতি সহকারে যুদ্ধ যাত্রা করেন। যুদ্ধের জন্য তিনি সাহাবীগণকে প্রবলভাবে উৎসাহিত করতে থাকেন। এ সময়েই যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করার ব্যাপারেই সূরাহ তাওবার একটি অংশ অবতীর্ণ হয়। সঙ্গে সঙ্গে সাদকা খয়রাত করার ফযীলত বর্ণনা করা হয় এবং আল্লাহর পথে আপন আপন উত্তম সম্পদ ব্যয় করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়।