এদিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-ও শত্রুদের অবস্থানের খবর প্রাপ্ত হয়ে আবূ হাদরাদ আসলামী (রাঃ)-কে এ নির্দেশ প্রদান করে প্রেরণ করলেন যে, মানুষের মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে অবস্থান করবে এবং তাদের সঠিক খোঁজ খবর নিয়ে প্রত্যাবর্তনের পর তা তাঁকে অবহিত করবে।’ প্রাপ্ত নির্দেশ মোতাবেক তিনি তাই করলেন।
৮ম হিজরীর ৬ই শাওয়াল দিবস রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মক্কা হতে রওয়ানা হলেন। এটি ছিল মক্কা আগমনের ঊনিশতম দিবস। নাবী কারীম (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিল বার হাজার সৈন্য। মক্কা বিজয়ের সময় তিনি সঙ্গে এনেছিলেন দশ হাজার সৈন্য এবং মক্কার নও মুসলিমগণের মধ্য হতে সংগ্রহ করেছিলেন আরও দু’ হাজার সৈন্য। এ যুদ্ধের জন্য নাবী কারীম (ﷺ) সফওয়ান বিন উমায়েরের নিকট হতে একশ লৌহ বর্ম নিয়েছিলেন এবং আত্তাব বিন উসাইদকে মক্কার গভর্ণর নিযুক্ত করেছিলেন।
দুপুরের পর এক ঘোড়সওয়ার এসে খবর দিলেন যে, ‘আমি অমূক অমূক পর্বতের উপর আরোহণ করে প্রত্যক্ষ করলাম যে, বনু হাওয়াযিন গোত্র গাট্টি বোচকাসহ যুদ্ধের ময়দানে আগমন করেছে। মহিলা, শিশু, গবাদি সব কিছুই তাদের সঙ্গে রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মৃদু হাসির সঙ্গে বললেন, (تِلْكَ غَنِيْمَةُ الْمُسْلِمِيْنَ غَدًا إِنْ شَاءَ اللهُ) ‘আল্লাহ চায় তো এর সব কিছুই গণীমত হিসেবে কাল মুসলিমগণের হাতে এসে যাবে।’ দিন শেষে রাতের বেলা আনাস বিন আবি মারসাদ গানাভী (রাঃ) স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে নৈশ্য প্রহরীর দায়িত্ব পালন করেন।[1]
হুনাইন যাওয়ার পথে লোকজনেরা একটি বেশ বড় বড় আকারের সতেজ কুলের গাছ দেখতে পেল। তৎকালে এ গাছকে যাতো আনওয়াত বলা হত। আরবের মুশরিকগণ এর উপর নিজেদের অস্ত্র শস্ত্র ঝুলিয়ে রাখত, ওর নিকট পশু যবেহ করত, মন্দির তৈরি করত, এবং মেলা বসাত। মুসলিম বাহিনীর মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক সৈন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বললেন, ‘আমাদের জন্য আপনি যাতো আনওয়াত তৈরি করে দিন যেমনটি তাদের জন্য রয়েছে।’ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন,
(اللهُ أَكْبَرُ، قُلْتُمْ وَالَّذِيْ نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ كَمَا قَالَ قَوْمُ مُوْسٰي: اِجْعَلْ لَنَا إِلٰهًا كَمَا لَهُمْ آلِهَةٌ، قَالَ: إِنَّكُمْ قَوْمٌ تَجْهَلُوْنَ، إِنَّهَا السَّنَنُ، لَتَرْكَبُنَّ سَنَنَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ).
‘আল্লাহ আকবার! সে সত্তার শপথ! যাঁর হাতে রয়েছে আমার জীবন তোমরা ঠিক সেরূপ কথা বলেছ, যেমন বলেছিল মুসা (আঃ)-এর কওম, ‘ইজ্আল লানা ইলা হান, কামা লাহুম আ লিহাহ’ (আমাদের জন্য উপাস্য তৈরি করে দিন যেমন তাদের জন্য উপাস্য রয়েছে :) এটাই রীতিনীতি। তোমরাও পূর্বের রীতিনীতির উপর অবশ্যই আরোহণ করে বসবে।[2]
[2] তিরমিযী বাবুল ফিতান, তোমরা পুর্বপুরুষদের নিয়ম মেনে চলবৈ, প্রসঙ্গ ২য় খন্ড ৪১ পৃঃ।
মঙ্গলবার ও বুধবার পথ চলার পর ১০ই শাওয়াল মধ্য রাত্রি মুসলিম বাহিনী হোনাইনে গিয়ে পৌঁছল। কিন্তু মালিক বিন আওফ পূর্বেই তার বাহিনী নিয়ে সেখানে অবতরণ করে এবং রাতের অন্ধকারে অত্যন্ত সঙ্গোপনে তারা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটকে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে মোতায়েন করে দেয়। অধিকন্তু, তাদের এ নির্দেশও প্রদান করা হয় যে, মুসলিম বাহিনী উপত্যকায় অবতরণ করা মাত্রই যেন প্রবলভাবে তাদের উপর তীর নিক্ষেপ করে তাদের ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলা হয় এবং একযোগে তাদের উপর আক্রমণ চালানো হয়।
এদিকে সাহরীর সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সৈন্যদের শ্রেণী বিন্যাস করে নিলেন এবং পতাকা বেঁধে লোকজনের মধ্যে বিতরণ করলেন। অতঃপর সকালে মুসলিম বাহিনী দ্রুততার সঙ্গে অগ্রসর হয়ে হুনাইন উপত্যকায় উপস্থিত হলেন। শত্রুদের অবস্থান সম্পর্কে তাঁদের জানা ছিল না। তাঁরা জানতেন না যে, শত্রুপক্ষের সাক্বীফ ও হাওয়াযিন গোত্রের বীর সৈনিকগণ এ উপত্যকায় সংকীর্ণ গিরিপথে অবস্থান গ্রহণ করেছে অগ্রসরমান মুসলিম বাহিনীর উপর অতর্কিতভাবে আঘাত হানার উদ্দেশ্যে। এ কারণে সম্পূর্ণ নিরুদ্বিগ্ন চিত্তেই তাঁরা সেখানে অবতরণ করছিলেন। এমন সময় আকস্মিকভাবে তাঁদের তীর বর্ষণ শুরু হয়ে গেল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই শত্রু দলে দলে তাঁদের উপর এক যোগে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আকস্মিক এ আক্রমণের প্রচন্ডতা সামলাতে না পেরে মুসলিম বাহিনী ছত্রভঙ্গ অবস্থায় এমনভাবে দৌঁড়াদৌঁড়ি করতে থাকল যে কেউ কারো প্রতি লক্ষ্য করল না। এ ছিল এক পর্যুদস্ত অবস্থা এবং অবমাননাকর পরাজয়। এমন কি আবূ সুফইয়ান বিন হারব (যিনি নতুন মুসলিম হয়েছিলেন) বললেন, ‘এখন তাদের দৌড়াদৌড়ি সমুদ্রের আগে থামবে না। জাবালাহ অথবা কালাদাহ বিন হাম্বাল চিৎকার করে বললেন, ‘দেখ, জাদু বাতিল হয়ে গেল।’
যাহোক, যখন দৌড় ঝাঁপ অরম্ভ হয়ে গেল তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ডান দিক থেকে উচ্চৈঃস্বরে ডাক দিলেন, ‘ওহে লোকজনেরা! আমার দিকে এসো, আমি মুহাম্মাদ (ﷺ) বিন আব্দুল্লাহ। ঐ সময় কিছু সংখ্যক মুহাজির এবং পরিবারের লোকজন ছাড়া অন্য কেউ তাঁর সঙ্গে ছিলেন না।[1]
ইবনু ইসহাক্বের বর্ণনামতে তাদের সংখ্যা ছিল মাত্র নয় জন। আর ইমাম নাবাবী মতানুসারে তাদের সংখ্যা ছিল বার জন। বিশুদ্ধ কথা সেটাই যা ইমাম আহমাদ ও হাকিম তাঁর মুসতাদরাকে আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, হুনাইন যুদ্ধে আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে ছিলাম। লোকেরা সব পালিয়ে গেল এমতাবস্থায় তাঁর সাথে আনসার ও মুহাজির মিলে মাত্র আশি জন্য অবশিষ্ট ছিল। আমরা সবাই দৃঢ়পদে যুদ্ধ করলাম এবং আমাদের কেউ পলায়ন করেনি’।
ইমাম তিরমিযী হাসান সূত্রে ইবনু ‘উমার হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমরা দেখলাম যে, লোকেরা হুনাইন ছেড়ে পলায়ন করছে। আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে রয়েছেন তিনশত সাহাবা (রাঃ)।
উল্লেখিত সংকটপূর্ণ সময়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে তেজোদীপ্ততা ও বীরত্ব প্রদর্শন করেন তার কোন তুলনা ছিল না। মুসলিম বাহিনীর ইতস্তত বিক্ষিপ্ততা এবং দৌঁড় ঝাঁপের মুখেও তিনি ছিলেন অচল অটল ও শত্রু অভিমুখী এবং সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার জন্য তাঁর খচ্চরকে উত্তেজিত করতে থাকেন। এ সময় তিনি বলতেছিলেন
(أنــا النبي لا كَذِبْ ** أنا ابن عبد المطلب)
অর্থ : আমি সত্যই নাবী, মিথ্যা নই, আমি আব্দুল মুত্তালিবের পৌপুত্র।
কিন্তু সে সময় আবূ সুফইয়ান বিন হারিস (রাঃ) নাবী কারীম (ﷺ)-এর খচ্চরকে রেকাব ধরে টেনে রেখেছিলেন এবং আব্বাস (রাঃ) খচ্চরের রিক্বা’ব ধরে তাকে থামিয়ে রেখেছিলেন। তাঁরা উভয়েই এ কারণে খচ্চরকে থামিয়ে রেখেছিলেন যেন সে দ্রুতগতিতে এগিয়ে না যায়।
এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আপন চাচা আব্বাস (রাঃ)-কে নির্দেশ প্রদান করলেন সাহাবীগণ (রাঃ)-কে উচ্চৈঃস্বরে আহবান জানাতে। (তিনি ছিলেন দরাজ কণ্ঠ বিশিষ্ট)। আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, ‘আমি অত্যন্ত উচ্চ কণ্ঠে আহবান জানালাম, ‘ওহে বৃক্ষ-তলের ব্যক্তিবর্গ। (বাইয়াত রিযওয়ানে অংশ গ্রহণকারীবৃন্দ) কোথায় আছ? আল্লাহর কসম! আমার কণ্ঠ শ্রবণ করা মাত্র তারা এমনভাবে ফিরে এল বাচ্চার ডাক শুনে গাভী যেমনটি ফিরে আসে এবং উত্তরে বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমরা আসছি’। এ সময় এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল যে কোন ব্যক্তি যদি তাঁর উটকে ফিরানোর চেষ্টা করেও ফিরাতে সক্ষম না হলে তিনি নিজ লৌহ বর্ম তার গলায় নিক্ষেপ করে নিজ ঢাল ও তলোয়ার সামলিয়ে নিয়ে উটের পিঠ থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়ত এবং উটকে ছেড়ে দিয়ে এ শব্দের দৌড় দিতে থাকত। এভাবে সমবেত হয়ে যখন নাবী কারীম (ﷺ)-এর নিকট একশ লোকের সমাবেশ ঘটল তখন তাঁরা শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ আরম্ভ করে দিলেন।
এরপর শুরু হল আনসারদের প্রতি আহবান, ‘এসো, এসো আনসারের দল দ্রুত এগিয়ে এসো।’ আনসারদের উদ্দেশ্যে উচ্চারিত এ আহবান বনু হারিস বিন খাযরাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেল। এ দিকে মুসলিম সৈন্যগণ যে গতিতে যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করে গিয়েছিলেন[1] ঠিক সে গতিতেই পুনরায় যুদ্ধক্ষেত্রে আগমন করতে থাকলেন। দেখতে দেখতে কিছুক্ষণের মধ্যে উভয় পক্ষের মধ্যে কালো ধোঁয়ার স্রোতের ন্যায় তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যুদ্ধের ময়দানের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, ‘এখন চুলা উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।’ প্রকৃত পক্ষে যুদ্ধক্ষেত্রে তখন চরম অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। অতঃপর তিনি জমিন থেকে এক মুষ্টি মাটি নিয়ে তা শত্রুদের প্রতি নিক্ষেপ করে দিয়ে বললেন, ‘শাহাতিল উজুহ’ ‘মুখমণ্ডল বিকৃত হোক’। এ এক মুষ্টি মাটি এমনভাবে বিস্তার লাভ করল যে, শত্রুপক্ষের এমন কোন লোক ছিল না যার চক্ষু এ মাটি দ্বারা পরিপূর্ণ হয়নি। এরপর থেকে তাদের যুদ্ধোন্মাদনা ক্রমে ক্রমে স্তিমিত হতে থাকে এবং তাদের অবস্থার পরিবর্তন হয়ে যায়।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাটি নিক্ষেপের কিছুক্ষণের মধ্যেই শত্রুদের পরাজয়ের ধারা সূচিত হয়ে গেল এবং আরও কিছুক্ষণ অতিবাহিত হতে না হতেই তারা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হল। সাক্বীফের সত্তর জন লোক নিহত হল এবং তাদের সঙ্গে যা কিছু সম্পদ অস্ত্র-শস্ত্র, মহিলা, শিশু এবং গবাদি ছিল সবই মুসলিমগণের হস্তগত হল। এটাই হচ্ছে সে পরিবর্তন, যে সম্পর্কে আল্লাহ সুবাহানাহু তা‘আলা কুরআনে ইঙ্গিত করেছেন,
(وَيَوْمَ حُنَيْنٍ إِذْ أَعْجَبَتْكُمْ كَثْرَتُكُمْ فَلَمْ تُغْنِ عَنكُمْ شَيْئًا وَضَاقَتْ عَلَيْكُمُ الأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ ثُمَّ وَلَّيْتُم مُّدْبِرِيْنَ ثُمَّ أَنَزلَ اللهُ سَكِيْنَتَهُ عَلٰى رَسُوْلِهِ وَعَلَى الْمُؤْمِنِيْنَ وَأَنزَلَ جُنُوْدًا لَّمْ تَرَوْهَا وَعذَّبَ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا وَذَلِكَ جَزَاء الْكَافِرِيْنَ) [التوبة:25، 26]
‘হুনায়নের যুদ্ধের দিন, তোমাদের সংখ্যার আধিক্য তোমাদেরকে গর্বে মাতোয়ারা করে দিয়েছিল, কিন্তু তা তোমাদের কোন কাজে আসেনি, যমীন তার বিশালতা নিয়ে তোমাদের কাছে সংকীর্ণই হয়ে গিয়েছিল, আর তোমরা পিছন ফিরে পালিয়ে গিয়েছিলে। তারপর আল্লাহ তাঁর রসূলের উপর, আর মু’মিনদের উপর তাঁর প্রশান্তির অমিয়ধারা বর্ষণ করলেন, আর পাঠালেন এমন এক সেনাবাহিনী যা তোমরা দেখতে পাওনি, আর তিনি কাফিরদেরকে শাস্তি প্রদান করলেন। এভাবেই আল্লাহ কাফিরদেরকে প্রতিফল দিয়ে থাকেন।’ [আত তাওবাহ (৯) : ২৫-২৬]
পরাজিত হওয়ার পর শত্রুদের একটি দল ত্বায়িফ অভিমুখে চলে যায়। অন্য একটি দল নাখলার দিকে পলায়ন করে, অধিকন্তু অন্য একটি দল আওতাসের পথ ধরে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আবূ ‘আমর আশ’আরী (রাঃ)-এর নেতৃত্বে একটি পশ্চাদ্ধাবনকারী দল আওতাসের দিকে প্রেরণ করেন। উভয় দলের মধ্যে সামান্য সংঘর্ষের পর মুশরিক দল পলায়নে উদ্যত হল। তবে এ সংঘর্ষে দলনেতা আবূ ‘আমির আশ’আরী (রাঃ) শহীদ হয়ে যান।
মুসলিম ঘোড়সওয়ারদের একটি দল নাখলার দিকে প্রত্যাবর্তনকারী মুশরিকদের পশ্চাদ্ধাবন করেন এবং দোরাইদ বিন মিম্মাহকে পাকড়াও করেন যাকে রাবী’আহ বিন রাফী হত্যা করেন।
পরাজিত মুশরিকগণের তৃতীয় এবং সব চাইতে বড় দলটির পশ্চাদ্ধাবন ক’রে যাঁরা ত্বায়িফের পথে গমন করেন যুদ্ধ লব্ধ সম্পদ একত্রিত করার পর স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-ও তাঁদের সঙ্গে যাত্রা করেন।
গণীমতের মধ্যে ছিল যুদ্ধ বন্দী ছয় হাজার উট চবিবশ হাজার, বকরি, চল্লিশ হাজারেও বেশী ছিল এবং রৌপ্য চার হাজার উকিয়া (অর্থাৎ এক লক্ষ ষাট হাজার দিরহাম যার পরিমাণ ছয় কুইন্টালের কয়েক কেজি কম হয়)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সকল সম্পদ একত্রিত করার নির্দেশ প্রদান করেন। অতঃপর সেগুলো জেয়েররানা নামক স্থানে জমা রেখে মাসউদ বিন ‘আমর গিফারীকে তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করেন। ত্বায়িফ যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন এবং অবসর না হওয়া পর্যন্ত তিনি গণীমত বন্টন করেননি।
যুদ্ধ বন্দীদের মধ্যে ছিল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দুধ বোন শায়মা বিনতে হারিস। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট আনীত হয়ে সে নিজ পরিচয় পেশ করলে তিনি তার একটি পরিচিত চিহ্নের মাধ্যমে তাকে সহজেই চিনতে পারলেন এবং নিজ চাদর বিছিয়ে তার উপর সসম্মানে বসালেন। অতঃপর তাকে তার কওমের নিকট ফেরত পাঠালেন।
প্রকৃতপক্ষে এ যুদ্ধ ছিল হুনাইন যুদ্ধেরই বিস্তরণ। যেহেতু হাওয়াযিন ও সাক্বীফ গোত্রের অধিক সংখ্যক পরাস্ত ফৌজ মুশরিক বাহিনীর কমান্ডার মালিক বিন আওফ নাসরীর সঙ্গে পলায়ন করে ত্বায়িফে গিয়েছিল এবং সেখানেই দূর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। সেহেতু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হুনাইনের ব্যস্ততা থেকে অবকাশ লাভের পর ত্বায়িফের প্রতি মনোনিবেশ করলেন এবং এ ৮ম হিজরীর শাওয়াল মাসেই ত্বায়িফের উদ্দেশ্যে এক বাহিনী প্রেরণের মনস্থ করলেন।
প্রথমে খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ)-এর নেতৃত্বে এক হাজার সৈন্যর এক তেজস্বী বাহিনী প্রেরণ করলেন। অতঃপর নাবী (ﷺ) নিজেই ত্বায়িফ অভিমুখে রওয়ানা হয়ে গেলেন। পথের মধ্যে নাখলা, ইয়ামানিয়া, কারনে মানাযিল, লিয়াহ প্রভৃতি স্থানের উপর দিয়ে গমন করেন। লিয়াহ নামক স্থানে মালিক বিন আওফের একটি দূর্গ ছিল। নাবী কারীম (ﷺ) দূর্গটি ভেঙ্গে ফেলেন। অতঃপর ভ্রমণ অব্যাহত রেখে ত্বায়িফে গিয়ে পৌঁছেন এবং ত্বায়িফের দূর্গের নিকটবর্তী স্থানে শিবির স্থাপন করে দূর্গ অবরোধ করে রাখলেন। অবরোধ ক্রমে ক্রমে দীর্ঘায়িত হতে থাকে। সহীহুল মুসলিমের হাদীসে আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, এ অবরোধ চল্লিশ দিন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। কোন কোন চরিতকার এ অবরোধের সময়সীমা বিশ দিন বলে উল্লেখ করেছেন। অন্যদের মধ্য থেকে কেউ কেউ দশ দিনের অধিক, কেউ কেউ আঠার দিন এবং কেউ কেউ পনের দিন বলে উল্লেখ করেছেন।[1]
অবরোধ চলাকালে উভয় পক্ষ হতে তীর নিক্ষেপ এবং প্রস্তরখন্ড নিক্ষেপের মতো ঘটনা মাঝে মাঝে ঘটতে থাকে। প্রথমাবস্থায় মুসলিমগণ যখন অবরোধ শুরু করেন তখন দূর্গের মধ্য থেকে তাঁদের উপর এত অধিক সংখ্যক তীর নিক্ষেপ করা হয়েছিল যে, মনে হয়েছিল যেন টিড্ডী দল ছায়া করেছে। এতে কিছু সংখ্যক মুসলিম আহত হন এবং বার জন শহীদ হন। কবর উঠিয়ে তাদেরকে সেখান থেকে বর্তমান ত্বায়িফের মসজিদের নিকট নিয়ে যেতে হয়।
এ পরিস্থিতি হতে নিস্কৃতি লাভের উদ্দেশ্যে রাসূলে কারীম (ﷺ) ত্বায়িফবাসীদের উপর মিনজানিক যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে একাধিক গোলা নিক্ষেপ করেন। যার ফলে দূর্গের দেয়ালে ছিদ্রের সৃষ্টি হয়ে যায় এবং মুসলিমগণের একটি দল দাবাবার মধ্যে প্রবেশ করে আগুন জ্বালানোর জন্য দেয়াল পর্যন্ত পৌঁছে যান। কিন্তু শত্রুগণ তাঁদের উপর লোহার উত্তপ্ত টুকরো নিক্ষেপ করতে থাকে, ফলে কিছু সংখ্যক মুসলিম শহীদ হয়ে যান।
শত্রুদের ঘায়েল করার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যুদ্ধের ভিন্নতর কৌশল হিসেবে আঙ্গুর ফলের বৃক্ষ কর্তন করার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন, কিন্তু মুসলিমগণ অধিক সংখ্যক বৃক্ষ কর্তন করে ফেললে সাক্বীফ গোত্র আল্লাহ ও আত্মীয়তার বরাত দিয়ে বৃক্ষ কর্তন বন্ধ করার জন্য আবেদন জানালে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তা মঞ্জুর করেন।
অবরোধ চলা কালে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ঘোষক ঘোষণা দেন যে, যে গোলাম দূর্গ থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের নিকট আত্ম সমর্পণ করবে সে মুক্ত বা স্বাধীন বলে বিবেচিত হবে। এ ঘোষণার প্রেক্ষিতে তেইশ ব্যক্তি দূর্গ থেকে বের হয়ে এসে মুসলিমগণের দলভুক্ত হয়।[2] এদের মধ্যেই ছিলেন আবূ বাকরাহ (রাঃ)। তিনি দূর্গ হতে দেয়ালের উপর উঠে চরকার সাহায্যে (যার মাধ্যমে কূয়া হতে পানি উত্তোলন করা হয়) ঝুলে পড়ে নীচে নামতে সক্ষম হন। যেহেতু ঘুর্ণিকে আরবী ভাষায় বাকরাহ বলা হয়, সেহেতু নাবী কারীম (ﷺ) তাঁর নাম রেখেছিলেন আবূ বাকরাহ। এ সকল গোলামকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মুক্ত করে দিয়ে এক একজনকে এক একজন মুসলমানের নিকট সমর্পণ করেন। এরূপ করার উদ্দেশ্য ছিল তারা তাদের প্রয়োজনের জিনিস পরস্পরকে পৌঁছে দেবে। এ ঘটনা ছিল দূর্গওয়ালাদের জন বড়ই দুর্বলতার পরিচায়ক।
অবরোধ দীর্ঘায়িত হতে থাকল এবং দূর্গ আয়ত্ত করার কোন সম্ভাবনা দৃষ্টিগোচর হল না, অথচ মুসলিমগণের উপর তীর এবং উত্তপ্ত লোহার আঘাত আসতে থাকল। উপরন্তু দূর্গাবাসীগণ পুরো এক বছরের জন্য পানীয় এবং খাদ্য সম্ভার মজুদ করে নিয়েছিল। এ প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নওফাল বিন মু’আবিয়া দোয়েলীর পরামর্শ তলব করলেন। তিনি বললেন, ‘খেঁকশিয়াল নিজ গর্তে প্রবেশ করেছে। আপনি যদি এ অবস্থার উপর অটল থাকেন তাহলে তাদের ধরে ফেলতে পারবেন, আর যদি ছেড়ে চলে যান তাহলেও তারা আপনাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না।’
এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অবরোধ শেষ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন এবং উমার বিন খাত্তাব (রাঃ)-এর মাধ্যমে ঘোষণা করে দিলেন যে, আগামী কাল মক্কা প্রত্যাবর্তন করতে হবে। কিন্তু এ ঘোষণায় সাহাবীগণ (রাঃ) সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। তাঁরা বলতে লাগলেন, ‘ত্বায়িফ বিজয় না করেই আমরা প্রত্যাবর্তন করব?’ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, (اُغْدُوْا عَلَى الْقِتَالِ) ‘তাহলে আগামী কাল সকালে যুদ্ধ শুরু করতে হবে।’ কাজেই, দ্বিতীয় দিবস মুসলিম বাহিনী যুদ্ধের জন্য গেলেন। কিন্তু আঘাত খাওয়া ছাড়া কোনই সুবিধা করা সম্ভব হল না। এ প্রেক্ষিতে নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, (إِنَّا قَافِلُوْنَ غَداً إِنْ شَاءَ اللهُ) ‘ইন-শা-আল্লাহ আমরা আগামী কাল প্রত্যাবর্তন করব।’
নাবী কারীম (ﷺ)-এর এ প্রস্তাবে সকলেই আনন্দিত হলেন এবং কোন আলাপ আলোচনা ব্যতিরেকেই প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করে দিলেন। এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মৃদু হাসতে থাকলেন। এরপর লোকজনেরা যখন তাঁবুর খুঁটি উঠিয়ে নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন তখন নাবী কারীম (ﷺ) বললেন যে, তোমরা বলতে থাক, (آيِبُوْنَ تَائِبُوْنَ عَابِدُوْنَ، لِرَبِّنَا حَامِدُوْنَ) আমরা প্রত্যাবর্তনকারী, তাওবাকারী, উপাসনাকারী এবং স্বীয় প্রতিপালকের প্রশংসাকারী।
বলা হল যে, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি সাকিফদের বিরুদ্ধে বদ দু‘আ করুন। নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, (اللّٰهُمَّ اهْدِ ثَقِيْفًا، وَائْتِ بِهِمْ) ‘হে আল্লাহ, সাকিফদের হিদায়াত কর এবং তাদেরকে নিয়ে এসো।’
[2] সহীহুল বুখারী ২য় খন্ড ২৬০ পৃঃ।
ত্বায়িফ অবরোধ পর্ব সমাপনান্তে নাবী কারীম (ﷺ) ফিরে আসেন। গণীমত বন্টন ব্যতিরেকেই জি’রানা নামক স্থানে অবস্থান করতে থাকেন। এ বিলম্বের কারণ ছিল হাওয়াযিন গোত্রের প্রতিনিধিদল ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট আগমন করবে এবং তাদের সম্পদাদি ফেরত নিয়ে যাবে। কিন্তু সদিচ্ছা প্রণোদিত বিলম্ব করা সত্ত্বেও তাদের পক্ষ থেকে কেউ যখন আগমন করল না রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তখন গণীমতের মাল বন্টন শুরু করে দিলেন। উদ্দেশ্য ছিল গণীমতের ব্যাপারে বিভিন্ন গোত্রের নেতা এবং মক্কার সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিগণের যারা সন্দিগ্ধ চিত্ত ছিল এবং অনর্থক কথাবার্তা বলাবলি করে বেড়াত তাদের মুখ বন্ধ করা। মুওয়াল্লাফাতুল কলুবগণই[1] সর্বপ্রথম প্রাপ্ত হলো। তাঁদেরকে বড় বড় অংশ দেয়া হল।
আবূ সুফইয়ান বিন হারবকে চল্লিশ উকিয়া (ছয় কিলো হতে কিছু কম) রৌপ্য এবং একশ উট প্রদান করা হল। তিনি বললেন, ‘আমার ছেলে ইয়াযীদ?’ নাবী কারীম (ﷺ) ইয়াযীদকেও অনুরূপ অংশ প্রদান করলেন। তিনি বললেন, ‘আমার ছেলে মু’আবিয়া?’ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকেও অনুরূপ অংশ প্রদান করলেন, (অর্থাৎ তাঁর ছেলেদের সহ শুধু আবূ সুফইয়ানকে আনুমানিক আঠার কিলো রৌপ্য) এবং তিনশ উট দেয়া হয়েছিল।
হাকীম বিন হিযামকে একশ উট দেয়া হয়েছিল। তিনি আরও একশ উটের জন্য আবেদন জানালে পুনরায় তাঁকে একশ উট দেয়া হয়েছিল। অনুরূপ ভাবে সাফওয়ান বিন উমাইয়াকে একশ উট, দ্বিতীয় দফায় আরও একশ উট এবং তৃতীয় দফায় আবারও একশ উট (মোট তিনশ উট) দেয়া হয়েছিল।[2]
হারিস বিন কুলাদাহকেও একশ উট দেয়া হয়েছিল। কিছু সংখ্যক অতিরিক্ত কুরাইশ এবং অন্যান্য নেতাগণকেও কয়েক শ’ উট দেয়া হয়েছিল। অধিকন্তু, অন্যান্য কিছু সংখ্যক নেতাকেও পঞ্চাশ এবং চল্লিশ চল্লিশ করে উট দেয়া হয়েছিল। এমনকি জনগণের মাঝে প্রচার হয়ে গেল যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) এমনভাবে দান খয়রাত করছেন যে, তাদের আর পরমুখাপেক্ষী হওয়ার কোন ভয় নেই। কাজেই, অর্থ সাহায্য গ্রহণের জন্য বেদুঈনদের দল নাবী কারীম (ﷺ)-এর নিকট ভিড় জমাতে থাকল। অতিরিক্ত ভিড় এড়ানোর কারণে একটি বৃক্ষের দিকে সরে পড়তে তিনি বাধ্য হলেন। কিন্তু ঘটনাক্রমে তাঁর চাদর খানা বৃক্ষের সঙ্গে জড়িয়ে গেল। তখন তিনি বললেন :
(أَيُّهَا النَّاسُ، رُدُّوْا عَلٰى رِدَائِيْ، فَوَ الَّذِيْ نَفْسِيْ بِيَدِهِ لَوْ كَانَ عِنْدِيْ عَدَدَ شَجَرٍ تِهَامَةٍ نَعَمًا لَقَسَّمْتُهُ عَلَيْكُمْ، ثُمَّ مَا أَلْفَيْتُمُوْنِيْ بَخِيْلاً وَلَا جُبَاناً وَلَا كَذَّابًا)
ওহে লোক সকল! আমার চাদর ফিরিয়ে দাও। সুতরাং সেই সত্ত্বার কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ, আমার নিকট যদি তুহামাহ বৃক্ষের সমপরিমাণ চতুষ্পদ জন্তু থাকে তবু তা তোমাদের মাঝে বণ্টন করে দেব। তারপর তোমরা দেখবে যে, আমি কৃপণ নই, ভীতও নই আর মিথ্যাবাদীও নই।
তারপর তিনি তাঁর স্বীয় উটের নিকট গিয়ে দাঁড়ালেন এবং এবং খানিকটা লোম উপড়ে নিয়ে হাত উপরে তুলে বললেন,
(أَيُّهَا النَّاسُ، وَاللهِ مَالِىْ مِنْ فَيْئِكُمْ وَلَا هٰذِهِ الْوَبَرَةُ إِلَّا الْخُمُسَ، وَالْخُمُسُ مَرْدُوْدٌ عَلَيْكُمْ)
‘ওহে জনগণ! আল্লাহর কসম! তোমাদের ফাই সম্পদের মধ্যে আমার জন্য কিছুই নেই। এমনকি এ লোমগুলোর পরিমাণও নেই। শুধু এক পঞ্চমাংশ আছে এবং সেটুকুও তোমাদের হাতেই ফিরিয়ে দেয়া হবে।
মুওয়াল্লাফাতুল কুলবুকে দেয়ার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যায়দ বিন সাবেতকে নির্দেশ প্রদান করলেন সৈন্যদের মধ্যে গণীমত বন্টনের জন্য হিসাব কিতাব তৈরি করতে। তিনি যে হিসাব তৈরি করলেন তাতে দেখা গেল যে, প্রত্যেক সাধারণ সৈনিকের অংশে এসেছে চারটি করে উট এবং চল্লিশটি করে বকরি। ঘোড়সওয়ারদের প্রত্যেকের অংশে এসেছে বারটি উট এবং একশ বিশটি বকরি।
এ বন্টনের ভিত্তি ছিল এক কৌশলময় রাজনীতি। কারণ, পৃথিবীতে এমন অনেক লোক আছে যাদের সত্যের পথে আনা হয় বিবেক বুদ্ধির পথ ধরে নয়, বরং পেটের পথ ধরে। অর্থাৎ তৃণভোজী পশুর সামনে এক গুচ্ছ সতেজ ঘাস ধরলে সে যেমন লাফ দিয়ে অগ্রসর হয়ে সেস্থানে পৌঁছে যায়, অনুরূপ ধারায় উল্লেখিত ধরণের লোকজনদের আকৃষ্ট করার প্রয়োজন রয়েছে। যাতে তারা ঈমানের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হয়ে তার জন্য আগ্রহী ও উদ্যমী হতে পারে।[3]
[2] কাযী আয়ায, আশ শিফা বেতা’রিফি হকুকিল মোস্তফা ১ম খন্ড ৮৬ পৃঃ।
[3] মুহাম্মাদ গাজ্জালী, ফিক্বহুস সীরাহ ২৯৮ ও ২৯৯ পৃঃ।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর এ প্রাজ্ঞ রাজনীতির ব্যাপারে প্রাথমিক অবস্থায় কোন কোন লোকের মতো সুস্পষ্ট ধারণা সৃষ্টি না হওয়ার কারণে কিছু কিছু মৌখিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল। বিশেষ করে আনসারদের উপর এর প্রভাব এবং প্রতিক্রিয়া ছিল সব চাইতে বেশী। কারণ, হুনাইন যুদ্ধের সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা থেকে তাঁরা বঞ্চিত হয়েছিলেন। অথচ বিপদের সময় তাঁদেরকেই আহবান জানানো হয়েছিল এবং সে আহবানে সর্বাগ্রে সাড়া দিয়ে তাঁরাই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন এবং এমন বীরবিক্রমে যুদ্ধ করেছিলেন যে, কিছুক্ষণের মধ্যেই কঠিন বিপর্যয় সুন্দর বিজয়ে পরিণত হয়ে যায়। কিন্তু তাঁরা তখন প্রত্যক্ষ করলেন যে, পলায়নকারীদের হাত হল পূর্ণ অথচ তাঁদের হাতই রয়ে গেল শূন্য।[1]
আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে ইবনু ইসহাক্ব বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কুরাইশ এবং অন্যান্য আরব গোত্রগুলোকে গণীমত বন্টন করে দিলেন, আনসারদের ভাগে কিছুই পড়ল না, তখন তাঁরা মনে মনে অত্যন্ত দুঃখিত ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। তাঁদের মনে এতদসংক্রান্ত অনেক প্রশ্নের উদয় হল। এমনকি তাঁদের মধ্য থেকে একজন বলেই বসলেন যে, ‘আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর নিজ কওমের সঙ্গে মিশে গেছেন।’ এ প্রেক্ষিতে সা‘দ (রাঃ) রাসূলে কারীম (ﷺ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে আরয করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ফাই বন্টনের ব্যাপারে আপনি যে ব্যবস্থা অবলম্বন করেছেন তাতে আনসারগণ আপনার প্রতি দুঃখিত এবং মনক্ষুণ্ণ হয়েছেন। আপনি নিজ কওমের লোকজনদের মধ্যেই তা বন্টন করেছেন এবং তাঁদেরকে অনেক বেশী বেশী পরিমাণ দান করেছেন কিন্তু আনসারদের কিছুই দেন নি।’
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন,(فَأَيْنَ أَنْتَ مِنْ ذٰلِكَ يَا سَعْدُ؟) ‘হে সা‘দ! এ সম্পর্কে তোমার ধারণা কী?’ তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমিও তো আমার কওমের লোকজনদের মধ্যে একজন।’
নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, (فَاجْمِعْ لِيْ قَوْمَكَ فِيْ هٰذِهِ الْحَظِيْرَةِ) ‘আচ্ছা তাহলে তোমার কওমের লোকজনকে তুমি অমুক স্থানে একত্রিত কর।’
সা‘দ (রাঃ) তাঁর কওমের লোকজনদের নির্ধারিত স্থানে সমবেত করলেন। কিছু সংখ্যক মুহাজির আগমন করলে তাঁদেরকে সেখানে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হল। কিছু সংখ্যক অন্যলোক সেখানে আগমন করলে তাদের ফিরিয়ে দেয়া হল। যখন সংশ্লিষ্ট লোকজনেরা সেখানে একত্রিত হলেন, তখন সা‘দ (রাঃ) নাবী কারীম (ﷺ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করলেন, ‘আনসারগণ আপনার জন্য একত্রিত হয়েছেন।’
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তৎক্ষণাৎ সেখানে আগমন করলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করার পর বললেন,
(يَا مَعْشَرَ الْأَنْصَارِ، مَا قَالَهٌ بَلَغَتْنِيْ عَنْكُمْ، وَجِدَةٌ وَجَدْتُمُوْهَا عَلٰى فِيْ أَنْفُسِكُمْ؟ أَلَمْ آتِكُمْ ضَلَالاً فَهَدَاكُمُ اللهُ؟ وَعَالَةٌ فَأَغْنَاكُمُ اللهُ؟ وَأَعْدَاءٌ فَأَلَّفَ اللهُ بَيْنَ قُلُوْبِكُمْ؟)
‘ওহে আনসারগণ! কী কারণে তোমরা আমার ব্যাপারে অসন্তুষ্টি পোষণ করেছ? আমি কি তোমাদের নিকট এমন অবস্থায় আসি নি যখন তোমরা পথভ্রষ্ট ছিলে? আল্লাহ তোমাদেরকে হিদায়াত দান করেছেন? তোমরা অসহায় ছিলে তিনি তোমাদেরকে সহায় সম্পদ দান করেছেন, তোমরা পরস্পর পরস্পরের শত্রু ছিলে, তিনি তোমাদের মধ্যে মহববতের বন্ধন সৃষ্টি করে দিয়েছেন। লোকজনেরা বললেন, ‘অবশ্যই, এ সব কিছুই আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর বড়ই অনুগ্রহ।’
অতঃপর নাবী কারীম (ﷺ) বললেন,
(أَمَا وَاللهِ لَوْ شِئْتُمْ لَقُلْتُمْ، فَصَدَقْتُمْ وَلَصُدِّقْتُمْ: أُتِيْتَنَا مُكَذَّبًا فَصَدَّقَنَاكَ، وَمَخْذُوْلاً فَنَصَرْنَاكَ، وَطَرِيْداً فَآوَيْنَاكَ، وَعَائِلاً فَآسَيْنَاكَ).
(أوَجَدْتُمْ يَا مَعْشَرَ الْأَنْصَارِ فِيْ أَنْفُسِكُمْ فِيْ لَعَاعَةٍ مِّنْ الدُّنْيَا تَأَلَّفَّتُ بِهَا قَوْماً لِيُسْلِمُوْا، وَوَكَلْتُكُمْ إِلٰى إسلَامِكُمْ؟ أَلَا تَرْضَوْنَ يَا مَعْشَرَ الْأَنْصَارِ أَنْ يَّذْهَبَ النَّاسُ بِالشَّاةِ وَالْبَعِيْرِ، وَتَرْجِعُوْا بِرَسُوْلِ اللهِ صلى الله عليه وسلم إِلٰى رِحَالِكُمْ؟ فَوَالَّذِيْ نَفْسُ مُحَمَّدٌ بِيَدِهِ، لَوْلَا الْهِجْرَةُ لَكُنْتُ اِمْرُأٌ مِّنَ الْأَنْصَارِ، وَلَوْ سَلَكَ النَّاسُ شِعْبًا، وَسَلَكَتِ الْأَنْصَارُ شِعْباً لَسَلَكْتُ شِعْبَ الْأَنْصَارِ، اللّٰهُمَّ ارْحَمِ الْأَنْصَارَ، وَأَبْنَاءَ الْأَنْصَارِ، وَأَبْنَاءَ أَبْنَاءِ الْأَنْصَارِ).
‘আনসারগণ! তোমরা আমার কথার উত্তর দিচ্ছ না কেন?’ আনসারগণ বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমরা কী উত্তর দিব? এ সব তো আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর অনুগ্রহ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘দেখ, আল্লাহর কসম! ইচ্ছা করলে তোমরা বলতে পার সত্য কথাই বলবে এবং তোমাদের কথা সত্য বলে ধরা নেয়া হবে যে, ‘আপনি আমাদের নিকট এমন সময় এসেছিলেন যখন আপনাকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করা হচ্ছিল। আমরা আপনাকে সত্য বলে স্বীকার করেছি। আপনি যখন ছিলেন বন্ধু-বান্ধব ও সহায় সম্বলহীন তখন আমরা আপনাকে সহায়তা দান করেছিলাম। আপনাকে যখন বিতাড়িত করা হয়েছিল তখন আমরা আপনাকে আশ্রয় দান করেছিলাম। আপনি যখন ছিলেন অভাবগ্রস্ত ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত আমরা তখন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হতে আপনাকে সাহায্য করেছিলাম।’
অতঃপর নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, ‘হে আনসারগণ! একটি নিকৃষ্ট ঘাসের জন্য তোমরা নিজ নিজ অন্তরে অসন্তুষ্ট হয়েছ, অথচ এর মাধ্যমে আমি তোমাদের অন্তরকে একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত করে দিয়েছি যাতে তোমরা মুসলিম হয়ে ইসলামের প্রতি সমর্পিত হয়ে যাও। হে আনসারগণ! তোমরা কি সন্তুষ্ট নও যে, সে সকল লোকেরা উট এবং বকরি নিয়ে ফিরে যাবে, আর তোমরা স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে নিয়ে নিজ কওমের নিকট ফিরে যাবে? সে সত্তার কসম যাঁর হাতে রয়েছে আমার জীবন! যদি হিজরতের বিধান না হতো তবে আমিও হতাম আনসারদের মধ্যকার একজন। যদি অন্যান্য লোকেরা এক পথে চলেন এবং আনসারগণ অন্য পথে চলেন তাহলে আমিও আনসারদের পথে চলব। হে আল্লাহ! আনসারদের তাঁদের সন্তানদের এবং তাঁদের সন্তানদের (অর্থাৎ নাতিপুতিদের) প্রতি রহম করুন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর এ ভাষণ শ্রবণ করে উপস্থিত লোকজনেরা এতই ক্রন্দন করলেন যে, তাঁদের মুখমণ্ডলের দাড়িগুলো ভিজে গেল। তাঁরা বলতে লাগলেন, ‘আমরা এ জন্য সন্তুষ্ট যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাদের অংশে এবং সঙ্গে রয়েছেন।’ অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ফিরে আসেন এবং লোকজনেরাও বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েন।[2]
[2] ইবনু হিশাম ২য় খন্ড ৪৯৯-৫০০ পৃঃ। অনুরূপ বর্ণনা সহীহুল বুখারীতে ২য় খন্ড ৬২০ ও ৬২১ পৃ: রয়েছে।