সাফওয়ানের রক্ত মূল্যহীন সাব্যস্ত করা হয় নি, কিন্তু যেহেতু সে ছিল কুরাইশদের একজন বড় নেতা সেহেতু তার নিজ জীবনের ভয় ছিল যথেষ্ট এ কারণে সে পলায়ন করেছিল। উমায়ের বিন অহাব জোমাহী রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে তার জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করেন। নাবী কারীম (ﷺ) তাকে আশ্রয় প্রদান করেন এবং এর প্রতীকস্বরূপ তাকে তাঁর সে পাগড়িটি প্রদান করেন মক্কায় প্রবেশ কালে যা তিনি নিজ মস্তকে বেঁধে রেখেছিলেন। উমায়ের যখন সাফওয়ানের নিকট পৌঁছল তখন সে জেদ্দা হতে ইয়ামান যাওয়ার উদ্দেশ্যে সমুদ্রে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। উমায়ের তাকে ফিরিয়ে আনলেন। তাকে দু’ মাস সময় দেবার জন্য সে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে অনুরোধ জানালে তিনি বললেন, ‘তোমাকে চার মাস দেয়া হল।’ এরপর সাফওয়ান ইসলাম গ্রহণ করেন। তার স্ত্রী পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাদের উভয়ের বিবাহ বন্ধন পূর্ববৎ বহাল রাখলেন।
ফুযালাহ একজন বীর পুরুষ ছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন তাওয়াফ করছিলেন তখন সে তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁর নিকট এসেছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে তার গোপন কুমতলবের কথা বলে দিলে সে মুসলিম হয়ে যায়।
বিজয়ের দ্বিতীয় দিবসে ভাষণ দেয়ার জন্য আল্লাহর নাবী (ﷺ) জনতার সম্মুখে দন্ডায়মান হলেন। ভাষণের প্রারম্ভে আল্লাহর প্রশংসা ও স্তব-স্তুতি বর্ণনার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,
(أَيُّهَا النَّاسُ، إِنَّ اللهَ حَرَّمَ مَكَّةَ يَوْمَ خَلَقَ السَّمٰوَاتِ وَالْأَرْضِ، فَهِيَ حَرَامٌ بِحُرْمَةِ اللهِ إِلٰى يَوْمِ الْقِيَامَةِ، فَلَا يَحِلُّ لِاِمْرِئٍ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيِوْمِ الْآخِرِ أَنْ يَّسْفِكَ فَيْهَا دَماً، أَوْ يَعْضُدُ بِهَا شَجَرَةً، فَإِنْ أَحَدٌ تَرَخَّصَ لِقِتَالِ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ فَقُوْلُوْا: إِنَّ اللهَ أَذِنَ لِرَسُوْلِهِ وَلَمْ يَأْذَنْ لَكُمْ، وَإِنَّمَا حَلَّتْ لِيْ سَاعَةً مِّنْ نَهَارٍ، وَقَدْ عَادَتْ حُرْمَتُهَا الْيَوْمَ كَحُرْمَتِهَا بِالْأَمْسِ، فَلْيُبَلِّغُ الشَّاهِدُ الْغَائِبَ)
‘ওহে লোক সকল! আল্লাহ যেদিন আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন সে দিন মক্কাকে হারাম (নিষিদ্ধ শহর) করে দিয়েছেন। এ কারণে কেয়ামত পর্যন্ত তা হারাম বা পবিত্র থাকবে। যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং পরকালে বিশ্বাসী হবে তার এটা বৈধ হবে না যে, সে এখানে রক্তপাত ঘটাবে অথবা এখানকার কোন বৃক্ষ কর্তন করবে। কেউ যদি এ কারণে জায়েয মনে করে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এখানে যুদ্ধ করেছেন তবে তাকে বলে দাও যে, আল্লাহ স্বয়ং তাঁর রাসূল (ﷺ)-কে অনুমতি প্রদান করেছিলেন। কিন্তু তোমাদেরকে অনুমতি দেন নি এবং আমার জন্যও শুধুমাত্র দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তা বৈধ করেছিলেন। অতঃপর আজ তার পবিত্রতা অনুরূপ ফিরে এসেছে গতকাল তার পবিত্রতা অত:পর যারা উপস্থিত আছে তারা অনুপস্থিতদের নিকট এ বাণী পৌঁছে দিবে।
অন্য এক বর্ণনায় এতটুকু অতিরিক্ত রয়েছে যে, لَا يَعْضِدُ شَوْكَهُ، وَلَا يَنْفِرُ صَيْدَهُ وَلَا تَلْتَقِطُ سَاقِطَتَهُ إِلَّا مَنْ عَرَّفَهَا، وَلَا يَخْتَلِىُ خَلَاهُ এখানে কোন কাঁটা কাটা বৈধ নয়, শিকার তাড়ান ঠিক নয় এবং পড়ে থাকা কোন জিনিস উঠানোও ঠিক নয় তবে সে ব্যক্তি নিতে পারবে যে, সে সম্পর্কে প্রচার করবে। তাছাড়া, কোন প্রকার ঘাস ও উপড়ানো যাবে না।
আব্বাস (রাঃ) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! কিন্তু ইযখির ঘাসের অনুমতি দিন (আরবের প্রসিদ্ধ ঘাস যা উর্মির ন্যায় হয় এবং চা ও ঔষুধ হিসেবে ব্যবহার হয়। কারণ, এটা কর্মকার এবং বাড়ির নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস) নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, (إِلَّا الْإِذْخِر) ‘বেশ, ইযখিরের অনুমতি রইল।’
ওই দিন বনু খুযা’আহ বনু লাইসের এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিল। কারণ, জাহেলিয়াত আমলে বনু লাইসের হাতে তাদের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সে সম্পর্কে বললেন,
(يَا مَعْشَرَ خُزَاعَةَ، اِرْفَعُوْ أَيْدِيَكُمْ عَنْ الْقَتْلِ، فَلَقَدْ كَثُرَ الْقَتِلُ إِنْ نَفَعَ، وَلَقَدْ قَتَلَتُمْ قِتْيَالًا لَأَدِّيَنَّهُ، فَمَنْ قَتَلَ بَعْدَ مَقَامِيْ هٰذَا فَأَهْلُهُ بِخَيْرِ النّٰظِرِيْنَ، إِنْ شَاءُوْا فَدَمٌ قَاتَلَهُ، وَإِنْ شَاءُوْا فَعَقَلَهُ)
‘ওহে খুযা’আহ সম্প্রদায়ের লোকজনেরা তোমরা নিজের হাতকে হত্যা ও খুন হতে নিবৃত্ত রাখ। কারণ, হত্যায় যদি কোন উপকার পাওয়া যেত তাহলে এ যাবত যত হত্যা সংঘটিত হয়েছে তা থেকে কোন উপকার লাভ সম্ভব হত, কিন্তু কোথায় সে লাভ? তোমরা এমন এক জনকে হত্যা করেছ যার শোনিত পাতের খেসারত অবশ্যই আমাকে দিতে হবে। অতঃপর এ স্থানে যদি কেউ কাউকে হত্যা করে তবে নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের দুটি বিষয়ের অধিকার থাকবে। হয় তারা নিহত ব্যক্তির বিনিময় হত্যাকারীকে হত্যা করবে, কিংবা শোণিত পাতের খেসারত গ্রহণ করবে।
অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, এর পর ইয়ামানের আবূ শাহ নামক এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আরয করল, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমার জন্য তা লিখে দিন।’ নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, ‘আবূ শাহর জন্য লিখে দাও।’
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন মক্কা বিজয়ের পরিপূর্ণতা অর্জন করলেন এবং এটা সর্বজনবিদিত ব্যাপার যে মক্কাই ছিল নাবী কারীম (ﷺ)-এর আবাসস্থল এবং জন্মভূমি ও মাতৃভুমি, এ প্রসঙ্গে আনসারগণ পরস্পর বলাবলি করতে থাকলেন যে, নিজ শহর ও জন্মভূমি বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কি মক্কাতেই অবস্থান করতে থাকবেন? ঐ সময় তিনি হাত দু‘টো উত্তোলন করে সাফা পাহাড়ের উপর প্রার্থনারত ছিলেন। প্রার্থনা শেষে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কী কথা বলেছ? তারা বললেন, ‘তেমন কিছু নয় হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)।’ কিন্তু আল্লাহর নাবী (ﷺ) বিষয়টি জানাবার ব্যাপারে মত পরিবর্তন না করায় তাঁরা তাঁদের আলোচনার বিষয়টি তাঁর নিকট প্রকাশ করলে তিনি বললেন, (مَعَاذَ اللهِ، الْمَحْيَا مَحْيَاكُمْ، وَالْمَمَاتُ مَمَاتُكُمْ)‘আল্লাহর আশ্রয়, এখন জীবন এবং মরণ তোমাদের সঙ্গেই হবে।’
আল্লাহ তা‘আলা যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং মুসলিমগণের মক্কা বিজয় দান করেন, তখন মক্কাবাসীদের উপর একটি অধিকার সুস্পষ্ট হয়ে যায় এবং তাদের বিশ্বাস দৃঢ়মূল হয়ে যায় যে ইসলাম ছাড়া কৃতকার্যতার আর কোন পথই নেই। এ জন্যই তারা ইসলামের আনুগত্য ও আজ্ঞাবর্তী হওয়ার শপথ গ্রহণের জন্য একত্রিত হয়। সাফা পাহাড়ে উপবিষ্ট অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মক্কাবাসীদের আজ্ঞানুবর্তিতা শপথ গ্রহণ শুরু করেন। উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) নাবী কারীম (ﷺ)-এর উপবেশন স্থানের নীচে বসে জনগণের অঙ্গীকার গ্রহণ করছিলেন। লোকজনেরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট এ বলে ও‘য়াদা করেন যে, ‘আপনার কথা আমরা শ্রবণ করব এবং সাধ্যমতো তা মান্য করে চলব।’
তাফসীর মাদারিকের মধ্যে উল্লেখিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন পুরুষদের বাইয়াত গ্রহণ সমাপ্ত করে অবকাশ প্রাপ্ত হলেন তখন সাফা পাহাড়ের উপরেই মহিলাদের বাইয়াত গ্রহণ আরম্ভ করলেন। উমার (রাঃ) নাবী কারীম (ﷺ)-এর নীচে অবস্থান করে তাঁর নির্দেশমতো বাইয়াত গ্রহণ করছিলেন এবং তাঁদের নিকট নাবী কারীম (ﷺ)-এর বাণী পৌঁছে দিচ্ছিলেন।
উল্লেখিত সময়ের মধ্যে আবূ সুফইয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে উতবাহ বেশভূষার পরিবর্তন সহকারে আগমন করল। প্রকৃতই হামযাহ (রাঃ)-এর লাশের সঙ্গে সে যে গর্হিত আচরণ করেছিল সে কারণেই ভীত সন্ত্রস্ত্র ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যদি তাকে চিনে ফেলেন।
এদিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বাইয়াত গ্রহণ কালে ইরশাদ করলেন, (أُبَايِعْكُنَّ عَلٰى أَلَّا تُشْرِكْنَ بِاللهِ شَيْئًا) ‘আমি তোমাদের নিকট এ বলে অঙ্গীকার গ্রহণ করছি যে, আমরা কখনও আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করব না।’
উমার (রাঃ) ঐ কথার পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে মহিলাদের বাইয়াত গ্রহণ করেন যে, তারা কখনও আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করবে না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করলেন, ‘চুরি করবে না।’ এ প্রেক্ষিতে হিন্দা বলে উঠল, ‘আবূ সুফইয়ান কৃপণ ব্যক্তি। তার সম্পদ থেকে তার অজানতে আমি যদি কিছু নেই তাহলে?’ আবূ সুফইয়ান সেখানেই উপস্থিত ছিলেন, বললেন, আমার সম্পদ থেকে তুমি যা নিয়ে নেবে তা তোমার জন্য হালাল হবে।’
হিন্দাকে চিনতে পেরে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মৃদু হাসলেন এবং বললেন, ‘তুমিই হিন্দা।’
হিন্দা বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমিই হিন্দা।’ অতীতে যা কিছু হয়েছে আমাকে ক্ষমা করে দিন। নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন।’
অতঃপর নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, (وَلَا يَزْنِيْنَ) ‘ব্যভিচার করবে না।’
প্রত্যুত্তরে হিন্দা বলল, ‘আচ্ছা স্বাধীন মহিলারা কি কখনো জেনা করে?’
নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, (وَلَا يَقْتُلْنَ أَوْلَادَهُنَّ) ‘নিজ সন্তানদের হত্যা করবে না।’
হিন্দা বলল, ‘বাল্যকালে আমরাও তাদের লালন-পালন করেছি, কিন্তু বয়োঃপ্রাপ্ত হওয়ার পর আপনারা তাদের হত্যা করেছেন। এ জন্য তারা এবং আপনিই ভাল জানেন।’ প্রকাশ থাকে যে হিন্দা সন্তান হাঞ্জালা বিন আবূ সুফইয়ান বদরের যুদ্ধে নিহত হয়েছিল। হিন্দার মুখ থেকে এ কথা শুনে উমার (রাঃ) হাসতে হাসতে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লেন এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-ও মৃদু মৃদু হাসলেন।
অতঃপর নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, (وَلَا يَأْتِيْنَ بِبُهْتَانٍ) ‘কাউকেও মিথ্যা অপবাদ দেবেনা।’ হিন্দা বলল, ‘আল্লাহর কসম! মিথ্যা অপবাদ অত্যন্ত খারাপ কথা। আপনি বাস্তবিকই হিদায়াত এবং উত্তম চরিত্রের নির্দেশ প্রদান করছেন।’ এরপর নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, (وَلَا يَعْصِيْنَكَ فِيْ مَعْرُوْفٍ) ‘কোন সদুপদেশে রাসূল (ﷺ)-এর অবাধ্য হবে না।’ হিন্দা বলল, ‘আল্লাহর কসম, আমরা এমন মনোভাব নিয়ে এ বৈঠকে বসি নি যে, আপনার আবাধ্য হব।’
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খিদমত থেকে ফিরে এসে হিন্দা তার উপাস্য মূর্তিটি ভেঙ্গে ফেলে। মূর্তি ভাঙ্গার সময় সে বলছিল, ‘আমরা তোমার সম্পর্কে ভ্রান্তির মধ্যে নিপতিত ছিলাম। আমাদের সে ভুল এখন ভেঙ্গে গেছে।’’[1]
সহীহুল বুখারীতে বর্ণিত আছে, হিন্দা বিনতে ‘উতবাহ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকটে এসে আরজ করলো, হে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জমিনের বুকে তার চেয়ে বেশী প্রিয় আমার নিকটে কেউ ছিল না যে আপনাকে অপমান করতে পারে। অতঃপর আজকের দিনে জমিনের বুকে আমার নিকট সেই অধিক প্রিয় আপনাকে যে অপমান করে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। অতঃপর আবার বললো, হে রাসূলুল্লাহ! আবু সুফইয়অন খুব কৃপণ লোক। আমি যদি তার সম্পদ হতে আমাদের পরিবারের জন্য ব্যয় করি তা অন্যায় হবে?’ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করলেন, না অন্যায় হবে না, তবে তা নিতে হবে ইনসাফের সাথে।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মক্কায় ঊনিশ দিন অবস্থান করেন। উল্লেখিত সময়ের মধ্যে তিনি ইসলামের পুনরুজ্জীবন প্রক্রিয়ায় তৎপর থাকেন এবং মানুষকে হিদায়াত ও তাকওয়ার আদেশ দিতে থাকেন। উল্লেখিত সময়ের মধ্যেই নাবী কারীম (ﷺ)-এর নির্দেশক্রমে আবূ উসাইদ (রাঃ) খুযা’য়ী নতুন ভাবে হারামের সীমানার স্তম্ভ খাড়া করেন এবং ইসলামের দাওয়াত প্রদান ও মক্কার পার্শ্ববর্তী স্থানসমূহের মূর্তিগুলো ভেঙ্গে ফেলা হয়। অধিকন্তু নাবী কারীম (ﷺ)-এর পক্ষ থেকে ষোষণাকারী মক্কায় ঘোষণা করতে থাকেন যে নিজ গৃহে কোন মূর্তি রাখবেন না। যদি ঘরে মূর্তি থাকে তাকে অবশ্যই তা ভেঙ্গে ফেলতে হবে।
১. মক্কা বিজয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যাবতীয় কাজকর্ম সুসম্পন্ন করার পর যখন তিনি কিছুটা অবকাশ লাভ করলেন তখন ৮ম হিজরীর ২৫ রমযান উযযা নামক দেব মূর্তি বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ)-এর নেতৃত্বে একটি ছোট সৈন্যদল প্রেরণ করলেন। উযযা মূর্তির মন্দিরটি ছিল নাখলা নামক স্থানে। এটি ভেঙ্গে ফেলে খালিদ (রাঃ) প্রত্যাবর্তন করলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, (هَلْ رَأَيْتَ شَيْئًا؟)‘তুমি কি কিছু দেখেছিলে?’ খালিদ (রাঃ) বললেন, ‘না’ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করলেন, (فَإِنَّكَ لَمْ تَهْدِمْهَا فَارْجِعْ إِلَيْهَا فَاهْدِمْهَا) ‘তাহলে প্রকৃতপক্ষে তুমি তা ভাঙ্গ নি। পুনরায় যাও এবং তা ভেঙ্গে দাও।’ উত্তেজিত খালিদ (রাঃ) কোষমুক্ত তরবারি হস্তে পনুরায় সেখানে গমন করলেন। এবারে বিক্ষিপ্ত ও বিস্ত্রস্ত চুলবিশিষ্ট এক মহিলা তাঁদের দিকে বের হয়ে এল। মন্দির প্রহরী তাকে চিৎকার করে ডাকতে লাগল। কিন্তু এমন সময় খালিদ (রাঃ) তরবারি দ্বারা তাকে এতই জোরে আঘাত করলেন যে, তার দেহ দ্বিখন্ডিত হয়ে গেল। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে তিনি এ সংবাদ অবগত করালে তিনি বললেন, (نَعَمْ، تِلْكَ الْعُزّٰى، وَقَدْ أَيِسَتْ أَنْ تَعْبُدَ فِيْ بِلَادِكُمْ أَبَدًا) ‘হ্যাঁ’, সেটাই ছিল উযযা। এখন তোমাদের দেশে তার পূজা অর্চনার ব্যাপারে সে নিরাশ হয়ে পড়েছে (অর্থাৎ কোন দিন তার আর পূজা অর্চনা হবে না)।
২. এরপর নাবী কারীম (ﷺ) সে মাসেই ‘আমর ইবনুল ‘আস (রাঃ)-কে ‘সুওয়া’ নামক দেবমূর্তি ভাঙ্গার জন্য প্রেরণ করেন। এ মূর্তিটি ছিল মক্কা হতে তিন মাইল দূরত্বে ‘রিহাত’ নামক স্থানে বনু হুযাইলের একটি দেবমূর্তি। ‘আমর যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছেন তখন প্রহরী জিজ্ঞেস করল, ‘তোমরা কী চাও?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর নাবী (ﷺ) এ মূর্তি ভেঙ্গে ফেলার জন্য আমাদের নির্দেশ প্রদান করেছেন।’
সে বলল, ‘তোমরা এ মূর্তি ভেঙ্গে ফেলতে পারবে না।’
‘আমর (রাঃ) বললেন, ‘কেন?’
সে বলল, ‘প্রাকৃতিক নিয়মেই তোমরা বাধাপ্রাপ্ত হবে।’
‘আমর (রাঃ) বললেন, ‘তোমরা এখনও বাতিলের উপর রয়েছ? তোমাদের উপর দুঃখ, এই মূর্তিটি কি দেখে কিংবা শোনে?’
অতঃপর মূর্তিটির নিকট গিয়ে তিনি তা ভেঙ্গে ফেললেন এবং সঙ্গীসাথীদের নির্দেশ প্রদান করলেন ধন ভান্ডার গৃহটি ভেঙ্গে ফেলতে। কিন্তু ধন-ভান্ডার থেকে কিছুই পাওয়া গেল না। অতঃপর তিনি প্রহরীকে বললেন, ‘বল, কেমন হল?’
সে বলল, ‘আল্লাহর দ্বীন ইসলাম আমি গ্রহণ করলাম।’
৩. এ মাসেই সা‘দ বিন যায়দ আশহালী (রাঃ)-এর নেতৃত্বে বিশ জন ঘোড়সওয়ার সৈন্য প্রেরণ করেন মানাত দেবমূর্তি ধ্বংসের উদ্দেশ্যে। কুদাইদের নিকট মুশাল্লাল নামক স্থানে আওস, খাযরাজ, গাসসান এবং অন্যান্য গোত্রের উপাস্য ছিল এ ‘মানত’ মূর্তি। সা‘দ (রাঃ)-এর বাহিনী যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছেন তখন মন্দিরের প্রহরী বলল, ‘তোমরা কী চাও?’
তাঁরা বললেন, ‘মানাত দেবমূর্তি ভেঙ্গে ফেলার উদ্দেশ্যে আমরা এখানে এসেছি।’
সে বলল, ‘তোমরা জান এবং তোমাদের কার্য জানে।’
সা‘দ মানাত মূর্তির দিকে অগ্রসর হতে গিয়ে একজন উলঙ্গ কালো ও বিক্ষিপ্ত চুল বিশিষ্ট মহিলাকে বেরিয়ে আসতে দেখতে পেলেন। সে আপন বক্ষদেশ চাপড়াতে চাপড়াতে হায়! রব উচ্চারণ করছিল।
প্রহরী তাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘মানাত! তুমি এ অবাধ্যদের ধ্বংস কর।’
কিন্তু এমন সময় সা‘দ তরবারির আঘাতে তাকে হত্যা করলেন। অতঃপর মূর্তিটি ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দিলেন। ধন-ভান্ডারে ধন-দৌলত কিছুই পাওয়া যায় নি।
৪. উযযা নামক দেবমূর্তিটি ভেঙ্গে ফেলার পর খালিদ বিন ওয়ালীদ (ﷺ) প্রত্যাবর্তন করলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ৮ম হিজরী শাওয়াল মাসেই বনু জাযামাহ গোত্রের নিকট তাঁকে প্রেরণ করেন। উদ্দেশ্য ছিল আক্রমণ না করে ইসলাম প্রচার। খালিদ (রাঃ) মুহাজির, আনসার এবং বনু সুলাইম গোত্রের সাড়ে তিনশ লোকজনসহ বনু জাযীমাহর নিকট গিয়ে ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন। তারা (ইসলাম গ্রহণ করেছি) বলার পরিবর্তে (আমরা স্বধর্ম ত্যাগ করেছি, আমরা স্বধর্ম ত্যাগ করেছি) বলল। এ কারণে খালিদ (রাঃ) তাদের হত্যা এবং বন্দী করতে আদেশ দিলেন। তিনি সঙ্গী সাথীদের এক একজনের হস্তে এক এক জন বন্দীকে সমর্পণ করলেন। অতঃপর এ বলে নির্দেশ প্রদান করলেন যে, ‘প্রত্যেক ব্যক্তি তাঁর নিকটে সমর্পিত বন্দীকে হত্যা করবে। কিন্তু ইবনু উমার এবং তাঁর সঙ্গীগণ এ নির্দেশ পালনে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলেন। অতঃপর যখন নাবী কারীম (ﷺ)-এর খিদমতে উপস্থিত হলেন তখন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলেন। তিনি দু’ হাত উত্তোলন করে দু’বার বললেন, (اللهم إِنِّيْ أَبْرَأُ إِلَيْكَ مِمَّا صَنَعَ خَالِدًا) ‘হে আল্লাহ! খালিদ যা করেছে আমি তা হতে তোমার নিকটে নিজেকে পবিত্র বলে ঘোষণা করছি।’[1]
এ পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র বনু সুলাইম গোত্রের লোকজনই নিজ বন্দীদের হত্যা করেছিল। আনসার ও মহাজিরীনগণ হত্যা করেননি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আলী (রাঃ)-কে প্রেরণ করে তাদের নিহত ব্যক্তিদের শোণিত খেসারত এবং ক্ষতিপূরণ প্রদান করেন। এ ব্যাপারটিকে কেন্দ্র করে খালিদ (রাঃ) ও আব্দুর রহমান বিন আওফ (রাঃ)-এর মাঝে কিছু উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় এবং সম্পর্কের অবণতি হয়েছিল। এ সংবাদ অবগত হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন,
(مَهَلًّا يَا خَالِدُ، دَعْ عَنْكَ أَصْحَابِيْ، فَوَاللهِ لَوْ كَانَ أَحَدٌ ذَهَبًا، ثُمَّ أَنْفَقَتْهُ فِيْ سَبِيْلِ اللهِ مَا أَدْرَكَتْ غُدْوَةَ رَجُلٍ مِّنْ أَصْحَابِيْ وَلَا رَوْحَتَهُ)
‘খালিদ থেমে যাও, আমার সহচরদের কিছু বলা হতে বিরত থাক। আল্লাহর কসম! যদি উহুদ পাহাড় সোনা হয়ে যায় এবং তার সমস্তই তোমরা আল্লাহর পথে খরচ করে দাও তবুও আমার সাহাবাদের মধ্য হতে কোন এক জনেরও এক সকাল কিংবা এক সন্ধ্যার ইবাদতের নেকী অর্জন করতে পারবে না।[2]
মক্কা বিজয়ের যুদ্ধ ছিল প্রকৃত মীমাংসাকারী যুদ্ধ এবং মক্কা বিজয়ই ছিল প্রকৃত বিজয় যা মুশরিকদের শক্তিমত্তা ও অহংকারকে এমনভাবে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল যে, আরব উপদ্বীপে শিরক বা মূর্তিপূজার আর কোন অবকাশ ছিল না। কারণ, মুসলিম ও মুশরিক এ উভয় পক্ষ বহির্ভূত সাধারণ শ্রেণীর মানুষ অত্যন্ত কৌতুহলের সঙ্গে ব্যাপারটি লক্ষ্য করে যাচ্ছিল যে, মুসলিম ও মুশরিকদের সংঘাতের পরিণতিটা কী রূপ নেয়। সাধারণ গোষ্ঠিভূক্ত মানুষ এটা ভাল ভাবেই অবগত ছিল যে, যে শক্তি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে কেবলমাত্র সে শক্তিই হারামের উপর স্বীয় অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে। তাদের বিশ্বাসকে অধিক বলীয়ান করেছিল অর্ধশতাব্দী পূর্বে সংঘটিত আবরাহ ও তার হস্তী বাহিনীর ঘটনা। আল্লাহর ঘরের উপর আক্রমণ চালানোর উদ্দেশ্যে অগ্রসরমান হস্তীবাহিনী কিভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত ও নিশ্চিহ্ন হয়েছিল তা তৎকালীন আরবাসীগণ সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছিল।
প্রকাশ থাকে যে, হুদায়বিয়াহর সন্ধিচুক্তি ছিল এ বিরাট বিজয়ের চাবি কাঠি। এ সন্ধি চুক্তির ফলেই শান্তি ও নিরাপত্তার পথ প্রশস্ত হয়েছিল, মানুষ প্রকাশ্যে একে অন্যের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতে এবং ইসলাম সম্পর্কে মত বিনিময় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। মক্কায় যাঁরা গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এ চুক্তির ফলে তাঁরা স্বীয় দ্বীন সম্পর্কে প্রাকাশ্যে কথাবার্তা বলা ও প্রচারের সুযোগ লাভ করেন, এ চুক্তির ফলে শান্তি ও নিরাপত্তার একটি বাতাবরণ সৃষ্টি হওয়ার ফলে বহু লোক ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এর ফলে ইসলামী সৈন্যের সংখ্যাও অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হতে থাকে। ইতোপূর্বে যেক্ষেত্রে কোন যুদ্ধেই তিন হাজারের বেশী মুসলিম সৈন্যের সমাবেশ সম্ভব হয় নি, সেক্ষেত্রে মক্কা বিজয়ের অভিযানে দশ হাজার মুসলিম সৈন্য অংশ গ্রহণ করেন।
এ মীমাংসাকারী যুদ্ধ মানুষের দৃষ্টির সম্মুখে সৃষ্ট পর্দা উন্মোচিত করে দিয়েছিল যা ইসলাম গ্রহণের পথে ছিল একটি বিরাট অন্তরায়স্বরূপ। এ বিজয়ের পর সমগ্র আরব উপদ্বীপের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক গগণ প্রদীপ্ত সূর্যালোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল। মক্কা বিজয়ের পর ধর্মীয় ও প্রশাসনিক দায়-দায়িত্ব মুসলিমগণের হাতে এসে গিয়েছিল।
হুদায়বিয়াহর সন্ধি চুক্তির পর মুসলিমগণের অনুকূলে পরিবর্তনের যে সহায়ক ধারা সূচিত হয়েছিল, মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তা পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়ে। অধিকন্তু, এ বিজয়ের ফলে সমগ্র আরব উপদ্বীপে মুসলিমগণের অধিকার ও আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। যার ফলে আরবের গোত্রসমূহের সামনে একটি মাত্র পথ খোলা রইল যে, তারা বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধির আকারে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে ইসলামের দাওয়াত কবুল করবে এবং ইসলামের বিস্তৃতির জন্য বিশ্বের বিভিন্ন ভূখন্ডে ছড়িয়ে পড়বে। এ মর্মে তাদের প্রস্তুতিপর্ব পরবর্তী দু' বছরে পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়।
[2] এ যুদ্ধ সম্পর্কিত বিস্তারিত বিবরণ নিম্নলিখিত উৎস সমূহ থেকে নেয়া হয়েছে। ইবনু হিশাম ২য় খন্ড ২৮৯-৪৩৭ পৃঃ, সহীহুল বুখারী ১ম ন্ড জিহাদ পর্ব এবং হজ্জ ২য় খন্ড ৬১২-৬২৫ পৃঃ, ফাতহুল বারী ৮ম খন্ড ৩-২৭ পৃঃ, সহীহুল মুসলিম ১ম খন্ড ৪৩৭-৪৩৯ পৃঃ, ২য় খন্ড ১০২, ১০৩, ১৩০ পৃঃ, যাদুল মা‘আদ ২য় খন্ড ১৬০-১৬৮ পৃঃ, শাইখ আব্দুল্লাহ রচিত মুখতাসারুস সীরাহ ৩২২-৩৫১ পৃঃ।
এ স্তর হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নবুওয়াত জীবনের শেষ স্তর যা তাঁর ইসলামী দাওয়াতের সে ফলাফল সমূহের প্রতিনিধিত্ব করে যা দীর্ঘ তেইশ বছরের কঠোর পরিশ্রম, অজস্র সমস্যা ও সংকট নিরসন,, অসহনীয় দুঃখ-যন্ত্রণা ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জন করেছিলেন। তাঁর ঘটনাবহুল জীবন ছিল অবিমিশ্র বিজয় ও কৃতকার্যতার অভূতপূর্ব ও অভাবিতপূর্ব ঘটনার সমাহার। তবে এসবের মধ্যে সব চাইতে উল্লেখযোগ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ কৃতকার্যতা ছিল মক্কা বিজয়। প্রকৃতপক্ষে এ বিজয় ছিল বিজয়পূর্ব এবং বিজয়োত্তর দু’ যুগের মধ্যে যুগসৃষ্টিকারী একটি ঘটনা এবং দু’ বৈপরীত্যের সীমান্ত রেখা। আরব অধিবাসীগণের দৃষ্টিতে কুরাইশগণ ছিল দ্বীনের সংরক্ষক এবং তত্ত্বাবধায়ক, কুরাইশগণের পরাজয়ের ফলে আরব উপদ্বীপের জনগণের মূর্তিপূজার ভিত, চিরতরে উৎপাটিত হয়ে গেল এবং ইসলামের ভিত সুপ্রতিষ্ঠিত হল।
এই শেষের স্তরকে দু’ পর্যায়ে বিভক্ত করা যায় :
(১) সাধনা এবং লড়াই ও
(২) ইসলাম গ্রহণের জন্য জাতি এবং গোত্রসমূহের দৌড়।
এ দু’ পরিস্থিতির একে অন্যের সঙ্গে বিজড়িত এবং এ স্তরের মধ্যে আগের পিছনের এবং একে অন্যের মাঝেও সংঘটিত হয়ে এসেছে। তবে এ পুস্তক প্রণয়নের ক্ষেত্রে আমরা একটি থেকে অন্যটিকে পৃথকভাবে আলোচনা করব। কাজেই পিছনের আলোচনা গুলোতে যে সংগ্রাম যুদ্ধের আলোচনা চলে এসেছে পরবর্তী যুদ্ধ তারই আনুষঙ্গিক প্রেক্ষাপটে আলোচিত হবে।
মুসলিমগণের মক্কা বিজয় এক আকস্মিক অভিযানের ফলশ্রুতি। যার ফলে আরব গোত্রসমূহ প্রায় হতভম্ব এবং কিংকর্তব্যবিমৃঢ় হয়ে পড়েছিল। তাদের এবং পার্শ্ববর্তী গোত্রসমূহের এতটুকু ক্ষমতা ছিল না যে, তারা এ আকস্মিক অভিযানকে প্রতিহত করতে পারে। এ কারণে কিছু সংখ্যক জেদী অপরিণামদর্শী ও আত্মগর্বী গোত্র ছাড়া আর সব গোত্রই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট আত্মসমর্পণ করেছিল। এই জেদী ও আত্মগর্বী গোত্রগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল হাওয়াযিন এবং সাকাফ গোত্র। এদের সঙ্গে মুযার জোশাম এবং সা’দ বিন বকরের গোত্রসমূহ এবং বনু হেলালের কিছু সংখ্যক লোক। এ সব গোত্রের সম্পর্ক ছিল কাইসে আইলানের সঙ্গে। পরাজয় স্বীকার ক’রে মুসলিমগণের নিকট আত্মসমর্পণ করাকে তারা অত্যন্ত অপমানজনক বলে মনে করছিল। এ কারণে ঐ সকল গোত্র মালিক বিন আওফ নাসরীর নেতৃত্বে একত্রিত হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল যে, তারা মুসলিমগণকে আক্রমণ করবে।
এ সিদ্ধান্তের পর মুসলিমগণের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ ক’রে মালিক বিন আওফের নেতৃত্বে তারা যাত্রা করল। সম্পদাদি, গবাদি, শিশু সন্তানেরাও ছিল তাদের সঙ্গে। সম্মুখ ভাগে অগ্রসর হয়ে তারা আওতাস উপত্যকায় শিবির স্থাপন করল। এটি হুনাইনের নিকটে বনু হাওয়াযিন গোত্রের অঞ্চলভুক্ত একটি উপত্যকা। কিন্তু এ উপত্যকাটি হুনাইন হতে পৃথক। হুনাইন হচ্ছে অন্য একটি উপত্যকা যা যুল মাজায নামক স্থানের সন্নিকটে অবস্থিত। সেখান থেকে আরাফাতের পথ দিয়ে মক্কার দূরত্ব দশ মাইলেরও বেশী।[1]
আওতাসে অবতরণের পর লোকজনেরা তাদের নেতার নিকট একত্রিত হল। তাদের মধ্যে দোরাইদ বিন সেম্মাও ছিল। এ ব্যক্তি অত্যন্ত বার্ধক্য ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছিল। কাজেই, যুদ্ধ-বিগ্রহ সম্পর্কিত তথ্যাদি অবগত হয়ে পরামর্শ দান ছাড়া আর কোন কিছুই করার উপযুক্ততা তার ছিল না। কিন্তু প্রকৃতই সে ছিল একজন বাহাদুর দাঙ্গাবাজ ও বিজ্ঞ যোদ্ধা। সে জিজ্ঞেস করল তোমরা কোন্ উপত্যকায় অবস্থান করছ?’ উত্তর দেয়া হল, ‘আওতাস উপত্যকায়।’ সে বলল, ‘ঘোড়সওয়ারদের জন্য উত্তম ভ্রমণ স্থান বটে। না, কঙ্করময়, না খানা খন্দক বিশিষ্ট, না খারাপ নিম্নভূমি। কিন্তু ব্যাপারটি কি যে, আমি উটের উচ্ছ্বাস ধ্বনি, গাধার চিৎকার, শিশুদের ক্রন্দন এবং বকরীর ব্যা ব্যা ধ্বনি শুনতে পাচ্ছি?’
লোকজনেরা বলল, ‘মালিক বিন আওফ সৈন্যদের সঙ্গে তাদের মহিলাদের, শিশুদের, গবাদি এবং সম্পদাদি নিয়ে এসেছেন। এ প্রেক্ষিতে দোরাইদ মালিক ইবনু আওফাকে ডেকে নিয়ে বললেন, ‘তুমি কি ভেবে এমন কাজ করেছ?’
সে বলল, ‘আমি চিন্তা করেছি যে, প্রত্যেক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিবার এবং সম্পদাদি থাকবে, যাতে সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণের উত্তেজনা নিয়ে তারা যুদ্ধ করে।’
দুরাইদ বলল, ‘আল্লাহর কসম! তুমি ভেড়ার রাখাল বটে, যুদ্ধে যদি পরাজিত হও তাহলে কোন বস্তু কি তোমাকে রক্ষা করতে পারবে? দেখ! আর যদি তুমি যুদ্ধে বিজয়ী হও তাহলে তলোয়ার এবং বর্শা দ্বারাই তো তুমি উপকৃত হতে। আর যদি পরাজয় বরণ কর তাহলে তোমাদের পরিবার পরিজন এবং সহায় সম্পদ সর্ব ব্যাপারেই অপমানের শিকার হতে হবে।
অতঃপর কতগুলো গোত্র এবং নেতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদের পর দোরাইদ বলল, ‘হে মালিক! তুমি বনু হাওয়াযিন গোত্রের মহিলা এবং শিশুদেরকে ঘোড়সওয়ারদের গলায় ঝুলিয়ে নিয়ে এসে খুব একটা ভাল কাজ কর নি। তাদেরকে তাদের অঞ্চলে উচ্চ ও সংরক্ষিত স্থানে পাঠিয়ে দাও। এরপর ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করে বিধর্মীদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হও। যদি তোমরা জয়ী হও তাহলে পিছনের নারী শিশুরা তোমাদের সংগে এসে মিলিত হবে, আর যদি তোমরা পরাজিত হও তাহলেও তোমাদের পরিবারবর্গ ধন সম্পদ এবং গবাদিগুলো সংরক্ষিত থাকবে।’
কিন্তু জেনারেল কমান্ডার মালিক এ পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করে বলল, ‘আল্লাহর কসম! আমি এমনটি করব না। তুমি বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছ এবং তোমার বিচার বুদ্ধিও লোপ পেয়েছে। আল্লাহর শপথ! হয় হাওয়াযিন আমার আনুগত্য করবে, নতুবা আমি এই তলোয়ারের উপর নির্ভর করব এবং তা আমার পিঠের এক দিক হতে অপর দিকে বেরিয়ে যাবে। প্রকৃতপক্ষে মালিক এটা সহ্য করতে পারল না যে, এ যুদ্ধে দোরাইদের সুনাম হবে কিংবা ওর পরামর্শ মতো কাজ করতে হবে। হাওয়াযিন বলল, ‘আমরা তোমার আনুগত্য করছি।’ এর প্রেক্ষিতে দোরাইদ বলল, ‘এ এমন যুদ্ধ যাতে আমি অংশ গ্রহণ তো করবই না, বরং মনে করব যে, আমার নাগালের বাইরে চলে গেছে।’
يا ليتنـي فيها جـَذَعْ ** أخُبُّ فيها وأضَعْ
أقود وطْفَاءَ الزَّمَــعْ ** كأنها شـاة صَدَعْ
দুঃখ আমি যদি এ সময় যুবক হতাম, পূর্ণ উদ্যমের সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি করতাম। পায়ের লম্বা চুল বিশিষ্ট এবং মধ্যম প্রকারের বকরীর মতো ঘোড়ার পরিচালনা করতাম।
এরপর মালিকের ঐ গোয়েন্দা আসলে যাদের প্রেরণ করা হয়েছিল মুসলিমগণের অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে খোঁজ খবর সংগ্রহের উদ্দেশ্য তারা প্রত্যাবর্তন করল। তাদের এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল যে, তাদের হাত,পা এবং দেহের বিভিন্ন অঙ্গের সন্ধিস্থলেও চিড় ধরে গিয়েছিল। তাদের এ অবস্থা দেখে মালিক বলল, ‘তোমরা ধ্বংস হও, তোমাদের এ কী অবস্থা হয়েছে? তারা বলল, ‘আমরা যখন কিছু সংখ্যক সাদা-কালো মিশ্রিত ঘোড়ার উপর সাদা মানুষ দেখেছি, আল্লাহর কসম! তখন থেকে আমাদের এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যা তুমি প্রত্যক্ষ করছ।’