আর-রাহীকুল মাখতূম আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী (রহঃ) ৪৩৪ টি
আর-রাহীকুল মাখতূম আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী (রহঃ) ৪৩৪ টি
আকস্মিকভাবে ইসলামী সৈন্য কুরাইশদের মাথার উপর (قُرَيْشٌ تَبَاغَتَ زَحْفَ الْجَيْشِ الْإِسْلاَمِيْ):

রাসূলে কারীম (ﷺ) যখন আবূ সুফইয়ানের নিকট হতে চলে গেলেন তখন আব্বাস (রাঃ) তাঁকে বললেন, ‘শীঘ্র এখন মক্কায় নিজ সম্প্রদায়ের নিকট প্রত্যাবর্তন কর।’ আবূ সুফইয়ান অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে মক্কায় ফিরে এসে উচ্চকণ্ঠে এ বলে আহবান জানালেন, ‘ওহে কুরাইশগণ! মুহাম্মাদ (ﷺ) এমন এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কা আগমন করছেন যার সঙ্গে মোকাবেলা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষমতা কারও নেই। কিন্তু যারা আবূ সুফইয়ানের গৃহে প্রবেশ করবে তারা আশ্রিত হবে। এ কথা শুনে তাঁর স্ত্রী হিন্দা বিনতে ‘উতবাহ এসে তাঁর মোচ ধরে বলল, ‘মেরে ফেল এ চর্বিযুক্ত ও শক্ত মাংসধারী মশককে। এরূপ সংবাদ পরিবেশকারী ও পূর্বাভাষদাতা বিনষ্ট হোক।

আবূ সুফইয়ান বলল, ‘তোমাদের সর্বনাশ হোক। দেখ, তোমাদের জীবন সম্পর্কে এ মহিলা যেন তোমাদের ধোঁকায় নিক্ষেপ না করে। কারণ মুহাম্মাদ (ﷺ) এত অধিক সংখ্যক সৈন্য নিয়ে আগমন করছেন যে, এর সঙ্গে মোকাবেলা করার সাধ্য কারও নেই। এমতাবস্থায় যে আবূ সুফইয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে আশ্রয় লাভ করবে।

লোকেরা বলল, ‘আল্লাহ যেন তোমাকে ধ্বংস করে। তোমার বাড়ি আমাদের কত জনের আশ্রয় স্থান হবে?’

আবূ সুফইয়ান বললেন, ‘আরো কথা আছে। যারা ভিতর থেকে নিজ নিজ ঘরের দরজা বন্ধ রাখবে তারাও আশ্রিত বলে গণ্য হবে। অধিকন্তু, যারা মসজিদুল হারামে গিয়ে প্রবেশ করবে তারাও আশ্রিত বলে গণ্য হবে। এ কথা শোনার পর লোকেরা সকলে নিজ নিজ ঘর ও মসজিদুল হারাম অভিমুখে পলায়ন করতে থাকল।

তবে কিছু সংখ্যক লম্পটকে তারা মুসলিমগণের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিল এবং বলল যে, ‘এদেরকে আমরা অগ্রভাগে রাখছি। যদি কুরাইশগণ কৃতকার্য হয় তাহলে আমরা তাদের সঙ্গে মিলিত হব, কিন্তু যদি তাদের খুব মারধর করা হয় তাহলে আমাদের নিকট হতে যা কিছু চাওয়া হবে আমরা মেনে নিব।

মুসলিমগণের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য এ সকল নির্বোধ কুরাইশগণ ইকরামা বিন আবূ জাহল, সফওয়ান বিন উমাইয়া এবং সোহাইল বিন আমরের পরিচালনায় খান্দাময় একত্রিত হল। তাদের মধ্যে বনু বাকর গোত্রের হেমাস বিন ক্বায়স নামক এক লোকও ছিল যে, ইতোপূর্বে অস্ত্র ঠিক ঠাক করছিল। এ প্রেক্ষিতে তার স্ত্রী এক দিন বলেছিল, ‘আমি যা কিছু দেখছি তা কিসের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে?’

সে বলল, ‘মুহাম্মাদ ও তাঁর সাথীদের সঙ্গে মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।’

স্ত্রী বলল, ‘আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ (ﷺ) এবং তাঁর সঙ্গী সাথীদের মোকাবেলায় কোন কিছুই স্থির হতে পারবে না।’

সে বলল, ‘আল্লাহর শপথ! আমার আশা যে, আমি মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর কোন সঙ্গীকে তোমার খাদেম করে ছাড়ব।’ তারপর সে বলল,

إن يقبلوا اليوم فمالي عِلَّه ** هٰذَا ســلاح كامــل وألَّه

وذو غِرَارَيْن سريع السَّلَّة **

অর্থ : তারা যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসে তবে আমার কোন আপত্তি হবে না। এ হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ অস্ত্র, লম্বা ফলা বিশিষ্ট বর্শা এবং আকস্মিক আক্রমণাত্মক দু’ ধার বিশিষ্ট তরবারী রয়েছে।

খান্দামর যুদ্ধে এ ব্যক্তিও এসেছিল।

যূ-তুওয়া নামক স্থানে ইসলামী সৈন্য (الْجَيْشُ الْإِسْلاَمِيْ بِذِيْ طُوٰى):

অগ্রগমনের এক পর্যায়ে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর বাহিনী মাররুয যাহরান হতে যু তুওয়ায় গিয়ে পৌঁছলেন, সে সময় আল্লাহ প্রদত্ত বিজয়ীর সম্মানের জন্য অত্যধিক বিনয়ের সঙ্গে নাবী কারীম (ﷺ) স্বীয় মস্তক এমন ভাবে অবনমিত রেখেছিলেন যে, দাড়ির লোম সওয়ারীর খড়ির সঙ্গে গিয়ে লাগছিল। নাবী কারীম (ﷺ) যু তুওয়ায় গিয়ে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা বিধান ও বিন্যাস করে নিলেন। ডান পাশে নিযুক্ত করলেন খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ)-কে। সে স্থানে ছিল আসলাম, সুলাইম, গিফার, মুযায়নাহ, জুহায়ানাহ এবং আরও অন্যান্য গোত্রসমূহ। খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ)-কে নির্দেশ দেয়া হল নীচু অঞ্চল দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করতে। কুরাইশগণ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে তাদের সকলকে হত্যা করে দিবে, তারপর সাফা পাহাড়ের উপর নাবী কারীম (ﷺ)-এর সঙ্গে সাক্ষাত করবে।

যুবাইর বিন ‘আউওয়াম (রাঃ) ছিলেন বাম পাশে। তাঁর সঙ্গে ছিল রাসূলে কারীম (ﷺ)-এর পতাকা। নাবী কারীম (ﷺ) তাঁকে দির্দেশ প্রদান করলেন মক্কার উপরিভাগ অর্থাৎ কাদা’ নামক স্থান দিয়ে প্রবেশ করতে এবং হাজূনে গিয়ে পতাকা উত্তোলন করে তথায় তাঁর জন্য অপেক্ষা করতে।

পদাতিক সৈন্যদের নেতৃত্বে ছিলেন আবূ উবাইদাহ (রাঃ)। তাঁকে নির্দেশ প্রদান করেছিলেন, বাতনে ওয়াদীর পথ দিয়ে এমনভাবে অগ্রসর হতে যাতে তিনি রাসূলে কারীম (ﷺ)-এর পূর্বেই মক্কায় অবতরণ করতে সক্ষম হন।

মক্কায় ইসলামী সৈন্যের প্রবেশ (الْجَيْشُ الْإِسْلاَمِيْ يَدْخُلُ مَكَّةَ):

উপর্যুক্ত এ নির্দেশনা লাভের পর ভিন্ন ভিন্ন বাহিনী নিজ নিজ নির্ধারিত পথ ধরে অগ্রসর হতে থাকলেন। খালিদ বিন ওয়ালীদের বাহিনীর সম্মুখে যে সকল মুশরিক এসেছিল তাদের সকলকেই হত্যা করা হল। অবশ্য, তাঁর বন্ধুদের মধ্যে থেকে কুরয বিন জাবির ফিহরী এবং খুনাইস বিন খালিদ বিন রাবী’আহ শাহাদাতের পিয়ালা পান করেন। এর কারণ ছিল এই যে এ দু’ জন সেনা বাহিনী থেকে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ভিন্ন পথ ধরে গমন করছিলেন। সেই অবস্থায় তাদের হত্যা করা হয়।

খান্দামায় পৌঁছানোর পর খালিদ (রাঃ) এবং কুরাইশ লম্পটদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সামান্য সংঘর্ষে বারো জন মুশরিক নিহত হওয়ার পর তাদের মধ্যে পলায়নের হিড়িক পড়ে যায়। হেমাস বিন ক্বায়স- যে মুসলিমগণের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য পূর্ব থেকেই অস্ত্রশস্ত্র ঠিক-ঠাক করে রেখেছিল- যুদ্ধক্ষেত্রে পলায়ন করার পর নিজ গৃহে প্রবেশ করল এবং তার স্ত্রীকে বলল, দরজা বন্ধ করে দাও।’ তার স্ত্রী বলল, ‘ওই কথাটি কোথায় গেল যা তুমি বলতেছিলে?’ উত্তরে সে বলল,

إنك لو شهدت يوم الخندمة إذ فر صفوان وفر عكرمه

واستقبلتنا بالسيوف المسلمه يقطعن كل ساعد وجمجمه

ضربا فلا يسمع إلا غمغمه لهم نهيت خلفنا وخمهمه

অর্থ: ‘তুমি যদি খান্দামায় যুদ্ধের অবস্থা দেখতে যখন সাফওয়ান ও ইকরামা পলায়ন করতে উদ্যত হয় এবং উন্মুক্ত তরবারী দিয়ে আমাদের অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করা হয় যা হাতের কবজি এবং মাথার খুলিগুলোকে এমন ভাবে কর্তন করছিল যে পিছনে তাদের গর্জন ও গোলমাল ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। তবে তুমি নিন্দনীয় একটুও কথা বলতে পারতে না।’

এরপর খালিদ (রাঃ) দৃপ্ত পদে মক্কার গলি পথগুলো অতিক্রম করে সাফা পাহাড়ের উপর রাসূলুল্লাহর (ﷺ) সঙ্গে মিলিত হন।

এদিকে যুবাইর (রাঃ) অগ্রভাগে এগিয়ে গিয়ে হাজুন নামক স্থানে ফাতাহ মসজিদের নিকট রাসূলুল্লাহর (ﷺ) পতাকা উত্তোলন এবং তাঁর জন্য একটি তাঁবু নির্মাণ করেন। অতঃপর সেখানে একটানা অবস্থান করতে থাকলেন যতক্ষণ না রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সেখানে আগমন করলেন।

মাসজিদুল হারামের রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর প্রবেশ ও মূর্তি অপসারণ (الرَّسُوْلُ ﷺ يَدْْخُلُ الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ وَيُطَهِّرُهُ مِنْ الْأَصْنَامِ):

এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উঠলেন এবং সম্মুখে পেছনে ডান ও বাম পাশে মোতায়েন আনসার ও মুহাজির পরিবেষ্টিত অবস্থায় অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে মাসজিদুল হারামে আগমন করলেন। মাসজিদুল হারামে আগমনের পর সর্বাগ্রে তিনি হাজার আসওয়াদ চুম্বন করলেন এবং তার পর আল্লাহর ঘর তাওয়াফ করলেন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাতে একটি কামান (ধনুক) ছিল এবং আল্লাহর ঘরের আশপাশে ও ছাদের উপর ৩৬০টি মূর্তি ছিল। নাবী কারীম (ﷺ) সে ধনুক দ্বারা মূর্তিগুলোকে আঘাত করতে করতে বলেছিল,

‏(‏جَاء الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوْقًا‏) ‏‏[‏الإسراء‏:‏81‏]‏

(‏قُلْ جَاء الْحَقُّ وَمَا يُبْدِئُ الْبَاطِلُ وَمَا يُعِيْدُ‏)‏ ‏[‏سبأ‏:‏49‏]‏

‘হক এসেছে এবং বাতিল বিলুপ্ত হয়েছে। আর বাতিল বিলুপ্ত হওয়ারই বিষয়।’ (আল-ইসরা (১৭) : ১৮]

‘বল- সত্য এসে গেছে, আর মিথ্যের নতুন করে আবির্ভাবও ঘটবে না, আর তার পুনরাবৃত্তিও হবে না।’ [সাবা (৩৪) : ৪৯]

নাবী কারীম (ﷺ)-এর আঘাতে মূর্তিগুলো ভূপতিত হচ্ছিল।

নিজের (ﷺ) উটের পিঠে আরোহণ করে তাওয়াফ সম্পন্ন করেন এবং ইহরাম অবস্থায় না থাকার কারণে শুধু তাওয়াফ করাই যথেষ্ট মনে করেন। তাওয়াফ সম্পন্ন করার পর উসমান বিন ত্বালহাহ (রাঃ)-কে ডেকে নিয়ে তাঁর কাছ থেকে কা‘বা ঘরের চাবি গ্রহণ করেন। অতঃপর তাঁর নির্দেশক্রমে কা‘বা ঘর খোলা হয় এবং তিনি ভিতরে প্রবেশ করেন। এ সময় অভ্যন্তরস্থিত ছবিগুলো তাঁর দৃষ্টিগোচর হয়। তাঁদের মধ্যে ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আঃ)-এর প্রতিকৃতদ্বিয়ও ছিল। তাঁদের হাতে ভবিষ্যত কথন সম্পর্কিত তীর ছিল। এ দৃশ্য দেখে বললেন, ‏قَاتَلَهُمُ اللهُ، وَاللهُ مَا اسْتَقْسَمَا بِهَا قَطٌّ ‘আল্লাহ তা‘আলা ঐ সকল মুশরিকদেরকে ধ্বংস করুন! আল্লাহর কসম! ঐ দু’ জন কখনই ভবিষ্যত জানার জন্য এ ধরণের তীর ব্যবহার করেননি।

কা‘বাহ ঘরের অভ্যন্তরে কাঠের তৈরি একটি কবুতরীর প্রতিকৃতিও তাঁর চোখে পড়ে। এ প্রতিকৃতিটি তিনি নিজ হাতে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে ফেলেন। অন্যান্য মূর্তিগুলোকেও তাঁর নির্দেশে মুছে ফেলা হয়।

কা‘বা ঘরের ভিতরে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সালাত আদায় এবং কুরাইশদের নিকট ভাষণ প্রদান (الرَّسُوْلُ ﷺ يُصَلِّيْ فِي الْكَعْبَةِ ثُمَّ يَخْطُبُ أَمَامَ قُرَيْشٌ):

এরপর নাবী কারীম (ﷺ) ভিতর থেকে কা‘বাহ ঘরের দরজা বন্ধ করে দেন। উসামা ও বিলাল (রাঃ) ভিতরেই ছিলেন। অতঃপর তিনি দরজার সামনের দেয়ালের অভিমুখী হন এবং দেয়াল থেকে মাত্র তিন হাত দূরত্বে থেমে যান। এ অবস্থায় নাবী কারীম (ﷺ)-এর বাম পাশে থাকে দুটি স্তম্ভ, ডান পাশে একটি এবং পিছনে তিনটি। ঐ সময়ে কা‘বাহ ঘরটি ছিল ছয় স্তম্ভবিশিষ্ট। অতঃপর নাবী কারীম (ﷺ) সেখানেই সালাত আদায় করেন। সালাতান্তে আল্লাহর ঘরের ভিতরের অংশগুলো তিনি ঘুরে ফিরে দেখতে থাকেন এবং তাকবীর ও একত্ববাদের আয়াতগুলো উচ্চারণ করতে থাকেন। অতঃপর কা‘বা ঘরের দরজা খুলে দেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কী করেন তা প্রত্যক্ষ করার জন্য বিশাল সংখ্যক কুরাইশ কা‘বাহ ঘরের সম্মুখে কাতারবন্দী অবস্থায় ছিল। দরজার দু’ অংশ ধারণ করে নিম্নভাগে দন্ডায়মান কুরাইশদের সম্বোধন করে নাবী কারীম (ﷺ) বললেন,

‏(‏لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ، صَدَقَ وَعْدَهُ، وَنَصَرَ عَبْدَهُ، وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ، أَلَا كُلُّ مَأْثُرَةٌ أَوْ مَالٌ أَوْ دَمٌ فَهُوَ تَحْتَ قَدَمَيَّ هَاتَيْنِ، إِلَّا سِدَانَةَ الْبَيْتِ وَسِقَايِةَ الْحَاجِّ، أَلَاوَقُتَيْلُ الْخَطَأِ شِبْهُ الْعَمَدِ ـ السَّوْطُ وَالْعَصَا ـ فَفِيْهِ الدِّيَةُ مُغَلَّظَةٌ، مِائَةٌ مِّنْ الْإِبِلِ أَرْبَعُوْنَ مِنْهَا فِيْ بُطُوْنِهَا أَوْلَادٌ‏.‏

يَا مَعْشَرَ قُرَيْشٌ إِنَّ اللهَ قَدْ أَذْهَبَ عَنْكُمْ نخْوَةَ الْجَاهِلِيَّةِ وَتَعَظَّمَهَا بِالْآبَاءِ، النَّاسُ مِنْ آدَمٍ، وَآدَمُ مِنْ تُرَابٍ‏

‘আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই। তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই। তিনি তাঁর অঙ্গীকার পূর্ণ করে দেখিয়েছেন, তাঁর বান্দাদের সাহায্য করেছেন এবং তিনি একক ভাবেই সমস্ত দলকে পরাজিত করেছেন। শুনে রাখ, আল্লাহর ঘরের চাবি সংরক্ষণ এবং হাজীদের পানি পান করানো সম্মান ছাড়া সমস্ত সম্মান, অথবা র্পূণতা, অথবা রক্ত প্রবাহিত করা আমার এ দুই পদতলে রইল। স্মরণ রেখ, ভুলবশত হত্যা যা লাঠি সোটা দ্বারা হয়ে থাকে, তা ইচ্ছাকৃত হত্যার অন্তর্ভুক্ত হবে এবং তার জন্য শোনিতপাতের খেসারত দিতে হবে। অর্থাৎ একশ উট দিতে হবে যার মধ্যে ৪০টি হবে গর্ভবতী।

হে কুরাইশগণ! আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের হতে জাহেলিয়াত যুগের অহংকার এবং পূর্ব পুরুষদের গৌরব খতম করে দিয়েছেন। সমস্ত মানুষ আদম (আঃ)-এর সন্তান এবং তিনি ছিলেন মাটির তৈরি।’

এরপর পরবর্তী আয়াতটি পাঠ করেন,

‏(يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوْبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوْا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللهَ عَلِيْمٌ خَبِيْرٌ) (سورة الحجرات : 13)

‘হে মানব জাতি! আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ এবং একজন মহিলা থেকে সৃষ্টি এবং সম্প্রদায় ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যেন তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট ঐ ব্যক্তি অধিক সম্মানিত যে সর্বাধিক পরহেজগার। অবশ্যই আল্লাহ সব কিছু জ্ঞাত আছেন এবং সব খবর রাখেন। [আল-হুজুরাত (৪৯) : ১৩]

অদ্য কারো কোন নিন্দা নেই (لَا تَثْرِيْبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ):

অতঃপর নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, يَا مَعْشَرَ قُرَيْشٌ مَا تَرَوْنَ أَنِّيْ فَاعِلٌ بِكُمْ‏؟‏‏‏ ‘ওগো কুরাইশ জনগণ! তোমাদের কী ধারণা, তোমাদের সঙ্গে আমি কিরূপ ব্যবহার করব বলে মনে করছ? ’

সকলে বলল, ‘খুব ভাল। আপনি সদয় ভাই এবং সদয় ভাইয়ের পুত্র।’

নাবী কারীম (ﷺ) বললেন,‏ (‏فَإِنِّيْ أَقُوْلُ لَكُمْ كَمَا قَالَ يُوْسُفُ لِإِخْوِتِهِ‏:‏ ‏(‏لاَ تَثْرَيبَ عَلَيْكُمُ‏)‏ اِذْهَبُوْا فَأَنْتُمْ الطُّلَقَاءُ‏) ‘তাহলে তোমরা জেন রাখ যে, আমি তোমাদের সঙ্গে ঠিক সেরূপ কথাই বলছি যেমনটি ইউসুফ (আঃ) তাঁর ভাইদের সঙ্গে বলেছিলেন যে, আজ তোমাদের জন্য কোন নিন্দা নেই।’ যাও, আজ তোমাদের সকলকে মুক্তি দেয়া হল।’

কা‘বা ঘরের চাবি যার অধিকার তাকেই দেয়া হল (مِفْتَاحُ الْبَيْتِ إِلٰى أَهْلِهِ):

এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মাসজিদুল হারামে বসে পড়লেন। আলী (রাঃ) বলেছেন, ‘যার হাতে চাবি ছিল তিনি নাবীজী (ﷺ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে বললেন, ‘হুজুর! আমাদের জন্য হাজীদের পানি পান করানোর সম্মানের সহিত কা‘বা ঘরের চাবি সংরক্ষণের সম্মানও একই সঙ্গে প্রদান করুন।’ আল্লাহ আপনার উপর রহম করুক। অন্য এক বর্ণনা মোতাবেক এ আরযটি আব্বাস (রাঃ) করেছিলেন। অতঃপর নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, উসমান বিন ত্বালহাহ কোথায়? তাঁকে ডাকা হলে নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, ‏(‏هَاكَ مِفْتَاحَكَ يَا عُثْمَانُ، الْيَوْمَ يَوْمَ بِرٌّ وَوَفَاءٌ‏)‏ উসমান! এ নাও তোমার চাবি। অদ্য পুণ্য এবং ওয়াদা পুরণের দিন। তাবাকাত ইবনু সা‘দ (রাঃ)-এর বর্ণনায় আছে যে, চাবি দেয়ার সময় নাবী কারীম (ﷺ) আরও বলেছিলেন,

‏(‏خُذُوْهَا خَالِدَةً تَالِدَةً، لَا يَنْزِعُهَا مِنْكُمْ إِلَّا ظَالِمٌ، يَا عُثْمَانُ إِنَّ اللهَ اِسْتَأَمنكُمْ عَلٰى بِيْتِهِ، فَكِلُوْا مِمَّا يَصِلُ إِلَيْكُمْ مِنْ هٰذَا الْبَيْتِ بِالْمَعْرُوْفِ

‘সর্বক্ষণের জন্যই তুমি এ চাবি গ্রহণ কর। তোমার নিকট থেকে এ চাবি সেই ছিনিয়ে নিবে যে অত্যাচারী হবে। উসমান! আল্লাহ নিজ ঘরের জন্য তোমাকে বিশ্বাসভাজন করেছেন। অতএব, আল্লাহর এ ঘরে ন্যায়সঙ্গত উপায়ে তুমি যা পাবে তা ভোগ করবে।’

কা‘বাহর ছাদে বিলালের আযান (بِلَالٌ يُؤَذِّنُ عَلٰى الْكَعْبَةِ):

তখন সালাতের সময় হয়েছিল তাই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিলাল (রাঃ)-কে নির্দেশ প্রদান করলেন কা‘বাহর ছাদে উঠে আযান দিতে। সে সময় কা‘বার বারান্দায় উপবিষ্ট ছিল আবূ সুফইয়ান বিন হারব, আত্তাব বিন আসীদ এবং হারিস বিন হিশাম।

আত্তাব বলল, ‘আল্লাহ উসাইদকে এ সম্মান প্রদান করেছেন যে, তিনি এ আযান ধ্বনি শুনেন নি, নতুবা তাকে এক অপছন্দনীয় জিনিস (আযান) শুনতে হত। এর প্রেক্ষিতে হারিস বলল, ‘শোন! আল্লাহর কসম! আমি যদি জানতে পারি যে, তা সত্য তাহলে আমি তাদের অনুসারী হয়ে যাব।’

এ প্রেক্ষিতে আবূ সুফইয়ান বলল, ‘দেখ! আল্লাহর কসম! আমি কিছুই বলব না, কারণ, যদি আমি কিছু বলি তবে এ কঙকরগুলো আমার সম্পর্কে সংবাদ দেবে। এরপর নাবী কারীম (ﷺ) তাদের নিকট আগমন করলেন এবং বললেন,‏(‏لَقَدْ عُلِمْتُ الَّذِيْ قُلْتُمْ) ‘এখন তোমরা যে আলাপ করলে তা আমাকে জানানো হয়েছে।’ অতঃপর তিনি তাদের আলাপের কথাগুলো পুনরাবৃত্তি করলেন। এ প্রেক্ষিতে হারিস এবং আত্তাব বলে উঠল, ‘আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)। আল্লাহর কসম! আমাদের সঙ্গে এমন কেউ ছিল না যে, আমাদের কথাবার্তা শুনতে পারে। এ রকম কিছু হলে আমরা বলতাম যে, সে ব্যক্তিই আমাদের কথাবার্তা নাবী কারীম (ﷺ)-এর নিকট পৌঁছে দিয়েছে (তা না হলে তিনি খবর পেলেন কি ভাবে?)’

বিজয়োত্তর শোকরানা সালাত (صَلَاةُ الْفَتْحِ أَوْ صَلَاةُ الشُّكْرِ):

সে দিনই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উম্মু হানী বিনতে আবূ ত্বালীবের ঘরে গমন করেন। সেখানে গোসল করেন এবং তাঁর ঘরেই আট রাকাত সালাত আদায় করেন। সূর্যোদয় ও দ্বিপ্রহরের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি এ সালাত আদায় করেন। এ কারণেই কেউ কেউ বিজয়োত্তর শোকরানা চাশতের সালাত বলে ধারণা করেছেন। উম্মু হানী তাঁর দুজন দেবরকে আশ্রয় দিয়ে রেখেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‏(‏قَدْ أَجَرْنَا مَنْ أَجَرْتِ يَا أَمُّ هَانِئٍّ‏)‏ ‘হে উম্মু হানী তুমি যাদেরকে আশ্রয় দিয়েছ আমিও তারেকে আশ্রয় দিলাম।’ তাঁর এ ঘোষণার কারণ ছিল উম্মু হানীর ভাই আলী (রাঃ) বিন আবূ ত্বালিব এ দুজনকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন। এ কারণে উম্মু হানী এ দুজনকে ঘরের দরজা বন্ধ করে গোপনে রেখেছিলেন। নাবী কারীম (ﷺ) যখন সেখানে গমন করলেন তখন তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন এবং উপর্যুক্ত এ ঘোষণা দিলেন।

বড় বড় পাপীদের রক্ত মূল্যহীন সাব্যস্ত করা হল (إِهْدَارُ دَمِ رِجَالٍ مِّنْ أَكَابِرِ الْمُجْرِمِيْنَ):

মক্কা বিজয়ের দিন রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বড় বড় পাপীদের মধ্য থেকে নয় ব্যক্তির রক্ত মূল্যহীন সাব্যস্ত করে নির্দেশ প্রদান করেন যে, যদি তাদেরকে কা‘বার পর্দার নীচেও পাওয়া যায় তবুও তাদের হত্যা করা হবে। তাদের নাম হচ্ছে যথাক্রমে (১) আবদুল উযযা বিন খাতাল, (২) আব্দুল্লাহ বিন সা‘দ বিন আবূ সারাহ, (৩) ইকরামা বিন আবূ জাহল, (৪) হারিস বিন নুফাইল বিন ওয়াহাব, (৫) মাকীস বিন সাবাবাহ, (৬) হাব্বার বিন আসওয়াদ, (৭) ও (৮) ইবনু খাতালের দুই দাসী যারা কবিতার মাধ্যমে নাবী কারীম (ﷺ)-এর বদনাম রটাত, (৯) সারাহ যে আব্দুল মুত্তালিবের সন্তানদের মধ্যে কারো দাসী ছিল। এর নিকটে হাতেব লিখিত পত্রখানা পাওয়া গিয়েছিল।

ইবনু আবি সারাহর ব্যাপার ছিল উসমান ইবনু আফফান তাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খিদমতে উপস্থিত হলেন এবং তার প্রাণ রক্ষার জন্য সুপারিশ করলেন। নাবী (ﷺ) তাকে ক্ষমা করে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করলেন। কিন্তু এর পূর্বে নাবী কারীম (ﷺ) এ আশায় দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকলেন যে, কোন সাহাবী উঠে এসে তাকে হত্যা করবে। কারণ এ ব্যক্তিই ইতোপূর্বে একবার ইসলাম গ্রহণ করে মদীনা হিজরত করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সে পুনরায় মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল (তবুও তার পরবর্তী সময়ের কার্য কলাপ ইসলামের সৌন্দর্য বর্ধনে আয়নাস্বরূপ ছিল, আল্লাহ তার উপর সন্তুষ্ট হউন)।

ইকরামা বিন আবূ জাহল পলায়নের অবস্থায় ইয়ামানের পথ ধরে চলে যায়। কিন্তু তার স্ত্রী নাবী (ﷺ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করলে তিনি তাকে আশ্রয় প্রদান করেন। এরপর সে ইকরামার পশ্চাদনুসরণ করে তাকে নিয়ে আসে। মক্কায় প্রত্যাবর্তনের পর সে ইসলাম গ্রহণ করে এবং তার ঈমানের অবস্থা খুব ভাল থাকে।

ইবনু খাতাল কা‘বা ঘরের পর্দা ধরে ঝুলছিল। একজন সাহাবী নাবী (ﷺ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে তাঁকে তার সম্পর্কে অবগত করালে তিনি তাকে হত্যার নির্দেশ প্রদান করেন ফলে তাকে হত্যা করা হয়। মাকীস বিন সাবাবাকে নুমায়লাহ বিন আব্দুল্লাহ হত্যা করেন। মাকিসও পূর্বে মুসলিম হয়েছিল। কিন্তু পরে এক আনসারীকে হত্যা করে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল।

হাব্বার বিন আসওয়াদ হচ্ছে সে ব্যক্তি যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কন্যা যায়নাব (রাঃ)-কে তাঁর হিযরতের প্রাক্কালে তীক্ষ্ণ অস্ত্র বিদ্ধ করেছিল যাতে তিনি উটের হাওদা হতে এক খন্ড কঠিন পাথরের উপর পড়ে যান এবং এর ফলে তাঁর গর্ভপাত হয়ে যায়। মক্কা বিজয়ের সময় এ ব্যক্তি পলায়ন করে। পরবর্তী সময়ে সে ইসলাম গ্রহণ করে। অতঃপর তার ঈমানের অবস্থা ভাল থাকে।

ইবনু খাতালের দু’ দাসীর একজনকে হত্যা করা হয়। দ্বিতীয় জন আশ্রয় প্রার্থনা করলে তাকে আশ্রয় দেওয়া হয়। অতঃপর সে ইসলাম গ্রহণ করে। অনুরূপভাবে সারাহর জন্য আশ্রয় চাওয়া হলে তাকে তা দেয়া হয় এবং পরে সে ইসলাম গ্রহণ করে (সার কথা হচ্ছে নয় জনের মধ্যে চার জনকে হত্যা করা হয় এবং পাঁচজনকে ক্ষমা করা হয়। এরা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করে)।

হাফেজ ইবনু হাজার লিখেছেন, ‘যাদের রক্ত মূল্যহীন সাব্যস্ত করা হয় তাদের প্রসঙ্গে আবূ মাশ’আর হারিস বিন ত্বালাতিল খুযা’য়ীরও উল্লেখ রয়েছে। আলী (রাঃ) তাকে হত্যা করেন। ইমাম হাকিম এ তালিকায় কা‘ব বিন যুহাইরের উল্লেখ করেছেন, কা’বের ঘটনা প্রসিদ্ধ ছিল। পরে এসে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রশংসা করেন। এ তালিকাভুক্ত ছিল ওয়াহশী বিন হারব এবং আবূ সুফইয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে ‘উতবাহ যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তাদের মধ্যে ছিল ইবনু খাতালের দাসী আরনাব এবং উম্মু সা‘দ। এদের হত্যা করা হয়েছিল। ইবনু ইসহাক্বও অনুরূপ উল্লেখ করেছেন। এভাবে পুরুষদের সংখ্যা দাঁড়ায় আট এবং মহিলাদের সংখ্যা ছয়। এ পার্থক্যের কারণ এ হতে পারে যে, দু’ জন দাসী আরনব এবং উম্মু সা‘দ ছিল এবং পার্থক্য ছিল শুধু নাম উপনাম অথবা উপাধির।[1]

[1] ফাতহুল বারী ৮ম খন্ড ১১, ১২ পৃঃ।
দেখানো হচ্ছেঃ ৩৪১ থেকে ৩৫০ পর্যন্ত, সর্বমোট ৪৩৪ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে পাতা নাম্বারঃ « আগের পাতা 1 2 3 4 · · · 32 33 34 35 36 · · · 41 42 43 44 পরের পাতা »