আর-রাহীকুল মাখতূম আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী (রহঃ) ৪৩৪ টি
আর-রাহীকুল মাখতূম আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী (রহঃ) ৪৩৪ টি
খায়বার যুদ্ধে দু’দলের প্রাণহানি (قَتْلٰى الْفَرِيْقَيْنِ فِيْ مَعَارِكِ خَيْبَرَ):

খায়বারের বিভিন্ন সংঘর্ষে সর্ব মোট শহীদ মুসলিমগণের সংখ্যা ছিল ষোল জন। বনু কুরাইশের চার জন, বনু আশজা’র এক জন, বনু আসলামের এক জন, খায়বার অধিবাসীদের মধ্যে হতে এক জন এবং বাকীরা অন্যান্য আনসার গোত্রের। তাছাড়া আঠার জনের কথাও বলা হয়ে থাকে। আল্লামা মানসুরপুরী ঊনিশ জনের কথা উল্লেখ করেছেন। অতঃপর তিনি লিখেছেন যে, আমি অন্বেষণ করে তেইশ জনের নাম পেয়েছি। যানীফ বিন ওয়ায়েলার নাম শুধু ওয়াক্বিদী উল্লেখ করেছেন। তাবারী বলেছে্ন শুধু যানীফ বিন হাবীবের নাম। বিশর বিন বারা বিন মারুরের মৃত্যু হয়েছিল যুদ্ধশেষে সে বিষ মিশ্রিত মাংস খাওয়ার ফলে যা যায়নাব ইহুদীয়া পাঠিয়েছিল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট উপঢৌকনস্বরূপ। বিশর বিন আব্দুল মুনযির সম্পর্কে দুটি বর্ণনা রয়েছে। ১. তিনি বদর যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন, ২. খায়বার যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন। আমার মতে প্রথম মতটি অধিক শক্তিশালী ও সমর্থনযোগ্য।[1] অন্য পক্ষ অর্থাৎ ইহুদীগণের মৃত্যুর সংখ্যা ছিল তিরানব্বই।

[1] রহমাতুল্লিল আলামীন ২য় খন্ড ২৬৮-২৭০ পৃঃ।

খায়বারে পৌঁছে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইসলামের দাওয়াত দেয়ার জন্য মুহায়্যিসা বিন মাসউদকে ফাদাক অঞ্চলে ইহুদীদের নিকট প্রেরণ করেছিলেন। ফাদাকবাসীগণ মানসিক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কারণে প্রথমত ইসলাম গ্রহণের প্রতি তেমন আগ্রহ প্রকাশ করে নি। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা যখন খায়বারের ইহুদীদের উপর মুসলিমগণকে বিজয় দান করলেন তখন তারা মনে প্রাণে ভীত হয়ে পড়ল এবং রাসূলে কারীম (ﷺ)-এর নিকট লোক পাঠিয়ে খায়বারবাসীগণের চুক্তির অনুরূপ ফাদাকের উৎপাদনের অর্ধেক দেয়ার প্রতিশ্রুতিসহ সন্ধিচুক্তির প্রস্তাব করল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সানন্দে এ প্রস্তাব গ্রহণ করলেন যার ফলে অত্যন্ত সহজভাবে ফেদাকের উপর মুসলিমগণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হল। এ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলিমগণকে ঘোড়া, উট কিংবা তরবারীর ব্যবহার করতে হয় নি।[1]

[1] ইবনু হিশাম ২য় খন্ড ৩৩৭ ও ৩৫৩ পৃঃ।

খায়বার বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মনের দিক দিয়ে যখন কিছুটা মুক্ত হলেন তখন ওয়াদিল কুরা বা কুরা উপত্যকায় গমন করলেন। সেখানে ইহুদীদের একটি দলের বসবাস ছিল। এক পর্যায়ে আরবদের একটি দল গিয়ে তাদের সঙ্গে মিলিত হয়েছিল।

মুসলিমগণ যখন কোরা উপত্যকায় অবতরণ করলেন তখন ইহুদীগণ তাঁদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করে আক্রমণ করল। তারা পূর্ব হতেই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল। তাদের এ আক্রমণে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর একজন দাস মৃত্যুমুখে পতিত হল। লোকজনেরা বললেন, ‘তার জন্য জান্নাত বরকতময় হোক। নাবী কারীম (ﷺ) বললেন,

(‏كَلَّا، وَالَّذِيْ نَفْسِيْ بِيَدِهِ، إِنَّ الشَّمْلَةَ الَّتِيْ أَخَذَهَا يَوْمَ خَيْبَرَ مِنْ الْمَغَانِمِ، لَمْ تُصِبْهَا الْمَقَاسِمَ، لَتَشْتَعِلُ عَلَيْهِ نَارًا‏)

‘কখনই না। সে সত্তার শপথ! যাঁর হাতে রয়েছে আমার জীবন, খায়বার যুদ্ধে এ ব্যক্তি যুদ্ধ লব্ধ মাল হতে বন্টনের পূর্বেই যে চাদর খানা চুরি করেছিল তা আগুনে পরিবর্তিত হয়ে ওর জন্য দীপ্তিমান হয়ে উঠেছে। রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) এ কথা শুনে একটি ফিতা, দুটি ফিতা কিংবা যিনি যে জিনিস গোপনে নিয়ে গিয়েছিলেন সে সব রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-এর খিদমতে এনে হাজির করলেন। নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, ‏(‏شِرَاكٌ مِّنْ نَّارٍ أَوْ شِرَاكَانِ مِنْ نَّارٍ‏)‏‏ ‘এ একটি কিংবা দুটি ফিতা ছিল আগুনের।’’[1]

অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) মুসলিম বাহিনীকে যুদ্ধের উপযোগী সুশৃঙ্খলভাবে সারিবদ্ধ করলেন। সমগ্র বাহিনীর পতাকা সা‘দ বিন উবাদাহর হাতে সমর্পণ করলেন। একটি পতাকা দিলেন হুবাব বিন মুনযিরকে এবং তৃতীয় পতাকা দিলেন উবাদাহ বিন বিশরকে। এরপর ইহুদীদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করলেন। এ দাওয়াত গ্রহণ না করে তাদের এক ব্যক্তি যুদ্ধের জন্য ময়দানে অবতরণ করল। আল্লাহর নাবী (ﷺ)-এর পক্ষে যুবাইর বিন ‘আউওয়াম (রাঃ) যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে তাঁর কাজ সম্পূর্ণ করলেন। অতৎপর ইহুদীদের পক্ষ থেকে দ্বিতীয় ব্যক্তি ময়দানে অবতীর্ণ হলেন। যুবাইর (রাঃ) তাকেও হত্যা করলেন। এরপর তাদের পক্ষ থেকে তৃতীয় ব্যক্তি ময়দানে অবতরণ করলেন। এর সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য আলী যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে তাকে হত্যা করলেন। এভাবে একে একে তাদের ১১ ব্যক্তি নিহত হয়। যখন একজন নিহত হতো তখন নাবী কারীম (ﷺ) অবশিষ্ট ইহুদীগণকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন।

ঐ দিন যখন সালাতের সময় হতো তখন সাহাবাদের নিয়ে নাবী কারীম (ﷺ) সালাত পড়তেন। সালাতের পর পুনরায় ইহুদীদের সামনে ফিরে যেতেন এবং তাঁদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করতেন।

এভাবে যুদ্ধ করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। দ্বিতীয় দিন সকালে পুনরায় গমন করলেন। তখনো সূর্য বর্শা বরাবর উপরে ওঠেনি এমন সময় তাদের হাতে যা কিছু ছিল তা সম্পূর্ণ নাবী কারীম (ﷺ)-এর হাতে সমর্পণ করে দিল। অর্থাৎ নাবী (ﷺ) শক্তি দিয়ে বিজয় অর্জন করেন এবং আল্লাহ তা‘আলা তাদের সম্পদসমূহের সবটুকুই নাবী কারীম (ﷺ)-এর হাতে গণীমত হিসেবে প্রদান করেন। বহু সাজ-সরঞ্জামাদি সাহাবীগণ (রাযি.)-এর হস্তগত হয়।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ওয়াদিল কুরা নামক স্থানে চার দিন অবস্থান করেন এবং যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সাহাবীগণ (ﷺ)-এর মধ্যে বন্টন করে দেন। তবে জমিজমা খেজুরের বাগানগুলো ইহুদীদের হাতেই ছেড়ে দেন এবং খায়বারবাসীগণের অনুরূপ ওয়াদিল কোরাবাসীগণের সঙ্গেও একটি চুক্তি সম্পাদন করেন।[2]

[1] সহীহুল বুখারী ২য় খন্ড ৬০৮ পৃঃ।

[2] যাদুল মা‘আদ ২য় খন্ড ১৪৬ পৃঃ।

তাইমার ইহুদীগণ যখন খায়বার, ফাদাক এবং ওয়াদিল কুরার অধিবাসীদের পরাভূত হওয়ার খবর পেল তখন তারা মুসলিমগণের বিরুদ্ধে শক্তির মহড়া প্রদর্শন ছাড়াই সন্ধি চুক্তি সম্পাদনের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট দূত প্রেরণ করল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের সন্ধি প্রস্তাব গ্রহণ করে সম্পদাদি সহ বসবাসের অনুমতি দেন।[1] অতঃপর তাদের সঙ্গে সন্ধি চুক্তি সম্পাদন করেন যার ভাষা ছিল নিম্নরূপ:

‘এ দলিল লিখিত হল আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর পক্ষ থেকে বনু আদিয়ার জন্য। তাদের উপর কর ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হল এবং মুসলিমগণ তাদের জিম্মাদা হলেন। তাদের উপর কোন প্রকার অন্যায় করা হবে না এবং দেশ থেকে তাদের বিতাড়িত করা হবে না। রাত্রি হবে তাদের সাহায্যকারী এবং দিন হবে পূর্ণতা প্রদান কারী (অর্থাৎ এ চুক্তি হবে স্থায়ী ব্যবস্থা) এ চুক্তি লিপিবদ্ধ করেন খালিদ বিন সাঈদ।[2]

[1] যাদুল মা‘আদ ২য় খন্ড ১৪৭ পৃঃ।

[2] ইবনু হিশাম ২য় খন্ড ৩৪০ পৃঃ। এ ঘটনা বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ এবং সাধারণ হাদীস পুস্তকে বর্ণিত হয়েছে। যাদুল মা‘আদ ২য় খন্ড ১৪৭ পৃঃ।
মদীনা প্রত্যবর্তন (الْعَوْدَةُ إِلَى الْمَدِيْنَةِ):

তাইমায়াবাসীগণের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের পর নাবী কারীম (ﷺ) মদীনা প্রত্যাবর্তনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। প্রত্যাবর্তনকালে লোকজনেরা একটি উপত্যকার নিকট পৌঁছে সকলে উচ্চৈঃস্বরে বলতে থাকেন ‏(‏اللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ، لاَ إِلٰهَ إِلاَّ اللهُ‏)‏ ‘আল্লাহ আকবর, আল্লাহ আকবর, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। তা শুনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‏(‏إِرْبَعُوْا عَلٰى أَنْفُسِكُمْ، إِنَّكُمْ لاَ تَدْعُوْنَ أَصَمَّ وَلاَ غَائِبًا، إِنَّكُمْ تَدْعُوْنَ سَمِيْعًا قَرِيْبًا‏)‏‏ ‘স্বীয় আত্মার প্রতি কোমলতা প্রদর্শন কর। তোমরা কোন বধির কিংবা অনুপস্থিতকে আহবান করছ না, বরং সে সত্তাকে আহবান করছ যিনি শ্রবণ করছেন এবং নিকটে রয়েছেন।[1]

পথ চলার সময় একবার রাত্রি বেলা দীর্ঘ সময় যাবত চলার পর রাত্রির শেষভাগে পথের মধ্যে কোন এক জায়গায় শিবির স্থাপন করলেন এবং শয্যা গ্রহণের সময় বিলাল (রাঃ)-কে এ বলে তাগাদা দিয়ে রাখলেন যে, ‘রাত্রিতে আমাদের প্রতি খেয়াল রেখ (অর্থাৎ প্রত্যুষে আমাদের জাগিয়ে দিও)।’ কিন্তু বিলাল (রাঃ) ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, তিনি পূর্ব দিকে মুখ করে নিজ সওয়ারীর উপর হেলান দিয়ে বসেছিলেন এবং সে ভাবেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। রাত্রি শেষে সকলের গায়ে রোদের অাঁচ লাগলেও কেউই ঘুম থেকে জাগতে পারেননি। রাসূলুল্লাহ সর্ব প্রথম ঘুম থেকে জেগে ওঠেন এবং সকলকে ঘুম থেকে জাগ্রত করেন। নাবী (ﷺ) সে উপত্যকা হতে বাহির হয়ে সামনের দিকে কিছুদূর অগ্রসর হন। অতঃপর লোকজনদের ফজরের সালাতের ইমামত। বলা হয়ে থাকে যে, এ ঘটনাটি অন্য কোন সফরে ঘটেছিল।[2]

খায়বার সংঘর্ষের বিস্তারিত বিবরণাদি লক্ষ্য করলে জানা যায় যে, নাবী কারীম (ﷺ)-এর মদীনা প্রত্যাবর্তন হয় ৭ম হিজরী সফর মাসের শেষ ভাগে কিংবা রবিউল আওয়াল মাসে।

[1] সহীহুল বুখারী ২য় খন্ড ৬০৫ পৃঃ।

[2] ইবনু হিশাম ২য় খন্ড ৩৪০ পৃঃ। এ ঘটনা বিশেষ ভাবে প্রসি্দ্ধ এবং সাধারণ হাদীস পুস্তকে বর্ণিত হয়েছে। যাদুল মা‘আদ ২য় খন্ড ১৪৭ পৃঃ।
সারিয়্যায়ে আবান বিন সা’ঈদ (سَرِيَّةُ أبَانِ بْنِ سَعِيْدٍ):

সেনাধ্যক্ষগণের তুলনায় নাবী কারীম (ﷺ) অধিক গুরুত্বের সঙ্গে এ কথা বলতেন, যে হারাম মাসগুলো শেষ হওয়ার পর মদীনাকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত রাখা কোন ক্রমেই দূরদর্শিতা কিংবা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। মদীনার আশেপাশে এমন সব বেদুঈনদের অবস্থান ছিল যারা লুটতরাজ এবং ডাকাতি করার জন্য সব সময় মুসলিমগণের অমনোযোগিতাজনিত সুযোগের অপেক্ষায় থাকত। এ কারণে তাঁর খায়বার অভিযানের প্রাক্কালে বেদুঈনদের ভীতি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে আবান বিন সাঈদের (রাঃ) নেতৃত্বে নাজদের দিকে এক বাহিনী প্রেরণ করেন। আবান বিন সাঈদ তার উপর আরোপিত দায়িত্ব পালন শেষে প্রত্যাবর্তন করলে খায়বারে নাবী কারীম (ﷺ)-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাত হয়। ঐ সময় খায়বার বিজয় পর্ব শেষ হয়েছিল। অধিকতর বিশুদ্ধ তথ্য হচ্ছে, অভিযান ৭ম হিজরীর সফর মাসে প্রেরণ করা হয়েছিল। সহীহুল বুখারীতে এর উল্লেখ রয়েছে।[1] হাফেজ ইবনু হাজার লিখেছেন, ‘এ অভিযানের অবস্থা আমি জানতে পারিনি।’’[2]

[1] সহীহুল বূখারী যুদ্ধের অধ্যায়ে দ্রষ্টব্য, ২য় খন্ড ৬০৮-৬০৯ পৃঃ।

[2] ফাতহুল বারী ৭ম খন্ড ৪৯১ পৃঃ।
যাতুর রিক্বা’ যুদ্ধ (غزوة ذات الرِّقَاع‏):

রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) যখন আহযাবের তিনটি অঙ্গের মধ্যে দুটি শক্তিশালী অঙ্গকে বিধ্বস্ত করে দিয়ে কিছুটা নিশ্চিন্ত ও স্বস্তিবোধ করলেন, তখন তৃতীয় অঙ্গটির প্রতি পুরোপুরি মনোযোগদানের সুযোগ লাভ করলেন। তৃতীয় অঙ্গ ছিল ঐ সব বেদুঈন যারা নাজদের বালুকাময় প্রান্তরে শিবির স্থাপন করে বসবাস করত এবং মাঝে মাঝে ডাকাতি ও লুট-তরাজে লিপ্ত হত।

যেহেতু এ বেদুঈনগণ স্থায়ী কোন জনপদ কিংবা শহরের অধিবাসী ছিল না এবং তাদের স্থায়ী কোন দূর্গও ছিল না, সেহেতু মক্কা ও খায়বারের অধিবাসীদের ন্যায় তাদের বশীভূত করা কিংবা অন্যায় ও অনিষ্টতা থেকে তাদের বিরত রাখার ব্যাপারটি ছিল অত্যন্ত কঠিন। কাজেই, তাদের শায়েস্তা করার জন্য তাদের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যের অনুরূপ সন্ত্রাসমূলক ও শাস্তিমূলক কার্যকলাপকেই উপযোগী বলে বিবেচনা করা হচ্ছিল।

এ প্রেক্ষিতে বেদুঈনদের মনে ভয়-ভীতির সঞ্চার, চমক সৃষ্টি এবং মদীনার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল সমূহে আকস্মিক আক্রমণ পরিচালনার উদ্দেশ্যে একত্রিত বেদুঈনদের বিক্ষিপ্ত করার লক্ষ্যে নাবী কারীম (ﷺ) যে শাস্তিমূলক আক্রমণ পরিচালনা করেন তা ‘যাতুর রিক্বা’ যুদ্ধ’ নামে প্রসিদ্ধ রয়েছে।

সাধারণ যুদ্ধ বিশারদ ইতিহাসবিদগণ ৪র্থ হিজরীতে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ইমাম বুখারী (রঃ) বলেছেন যে, ৭ম হিজরীতে তা সংঘটিত হয়েছিল। যেহেতু এ যুদ্ধে আবূ মুসা আশ’আরী ও আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) অংশ গ্রহণ করেছিলেন সেহেতু এটা প্রমাণিত হয় যে, এ যুদ্ধ খায়বার যুদ্ধের পরে সংঘটিত হয়েছিল (সম্ভবত মাসটি ছিল) রবিউল আওয়াল। কারণ খায়বার যুদ্ধের জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন মদীনা হতে বাহির হয়েছিলেন সে সময় আবূ হুরায়রা মদীনায় পৌঁছে ইসলামের ছায়াতলে প্রবিষ্ট হন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি খায়বার গিয়ে যখন খিদমতে নাবাবীতে পৌঁছেন তখন খায়বার বিজয় পর্ব শেষ হয়েছিল।

অনুরূপভাবে আবূ মুসা আশ’আরী (রাঃ) আবিসিনিয়া হতে গিয়ে ঐ সময় খিদমতে নাবাবীতে পৌঁছেছিলেন যখন খায়বার বিজয় সম্পূর্ণ হয়েছিল। যাতুর রিক্বা’ যুদ্ধে সাহাবী (রাঃ) দ্বয়ের অংশগ্রহণ এটাই প্রমাণিত করে যে, এ যুদ্ধ খায়বার যুদ্ধের পর সংঘটিত হয়েছিল।

এ যুদ্ধ সম্পর্কে চরিতলেখকগণ যা কিছু বলেছেন তার সার সংক্ষেপ হচ্ছে, নাবী কারীম (ﷺ) আনমার অথবা বনু গাত্বাফান গোত্রের দুটি শাখা বনু সা’লাবা এবং বনু মোহারেবের লোকজনদের সমবেত হওয়ার সংবাদ পেয়ে আবূ যার কিংবা উসমান ইবনু আফফানের উপর মদীনার তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব অর্পণ করেন এবং ৪০০ শ’ কিংবা ৭০০ শ’ সাহাবা (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে নাজদ অভিমুখে যাত্রা করেন। অতঃপর মদীনা হতে দু’ দিনের দূরত্বে অবস্থিত নাখল নামক স্থানে গিয়ে পৌঁছেন। তথায় বনু গাত্বাফান গোত্রের মুখোমুখী হতে হয়, কিন্তু যুদ্ধ হয় নি। তবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঐ সময় খাওফের (যুদ্ধাবস্থার) সালাত আদায় করেন।

সহীহুল বুখারীতে আবূ মুসা আশয়ারী হতে বর্ণিত হয়েছে যে, ‘আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে বাহির হলাম। আমরা ছিলাম ছয় জন। আমাদের সঙ্গে ছিল একটি উট যার উপর আমরা পালাক্রমে সওয়ার হচ্ছিলাম। এ কারণে আমাদেপর পা ছিদ্র হয়ে গিয়েছিল। আমার পা দুটি আহত হয়েছিল এবং নখ ঝরে পড়েছিল। কাজেই আমরা নিজ নিজ পায়ের উপর ছেঁড়া কাপড় দিয়ে পট্টি বেঁধেছিলাম। এ কারণে এ যুদ্ধের নাম দেয়া হয়েছিল যাতুর রিক্বা’ (ছিন্ন বস্ত্রের যুদ্ধ)।[1]

সহীহুল বুখারীতে জাবির (রাঃ) হতে আরও বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন, ‘যাতুর রিক্বা’ যুদ্ধে আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলাম। (নিয়ম ছিল) আমরা যখন ছায়াদানকারী বৃক্ষের নিকট পৌঁছতাম তখন তা নাবী কারীম (ﷺ)-এর জন্য ছেড়ে দিতাম। এক দফা, নাবী কারীম (ﷺ) শিবির স্থাপন করলেন তখন লোকজনেরা বৃক্ষের ছায়ায় বিশ্রাম গ্রহণের জন্য কাঁটাযুক্ত বৃক্ষের মাঝে এদিক সেদিক এলোমেলো অবস্থায় ছড়িয়ে পড়ল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একটি বৃক্ষের নীচে অবতরণ করেন এবং বৃক্ষের সঙ্গে তরবারী খানা ঝুলিয়ে রেখে শুয়ে পড়েন।

জাবির (রাঃ) বলেছেন, ‘আমরা তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলাম এমন সময় এক মুশরিক এসে নাবী কারীম (ﷺ)-এর তরবারী খানা হাতে নিয়ে বলল, ‘তুমি আমাকে ভয় করছ?’ নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, ‘না’’। সে বলল, ‘তোমাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে?’ নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, ‘আল্লাহ’’। জাবির (রাঃ) বলেছেন, ‘রাসূলে কারীম (ﷺ) হঠাৎ আমাকে ডাক দিলেন। আমরা সেখানে পৌঁছে দেখলাম যে একজন বেদুঈন রাসূল (ﷺ)-এর নিকট বসে রয়েছে।

নাবী (ﷺ) বললেন,

‏(‏إِنَّ هٰذَا اِخْتَرَطَ سَيْفِيْ وَأَنَا نَائِمٌ، فَاسْتَيْقَظَتْ وَهُوْ فِيْ يَدِهِ صَلْتًا‏.‏ فَقَالَ لِيْ‏:‏ مَنْ يَمْنَعُكَ مِنِّيْ‏؟‏ قُلْتُ‏:‏ اللهُ، فَهَا هُوَ ذَا جَالِسٌ‏)‏

আমি শুয়েছিলাম এমন সময় এ ব্যক্তি আমার তরবারী খানা টেনে হাতে নিলে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। সে তরবারী খানা হাতে নিয়ে বলল, ‘আমার হাত থেকে তোমাকে কে রক্ষা করবে?’ আমি বললাম, ‘আল্লাহ’’। এ হচ্ছে সে ব্যক্তি যে বসে রয়েছে।’

অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) তাকে কোন প্রকার তিরস্কার করলেন না বা ধমক দিলেন না।

আবূ আওয়ানার (রাঃ) বর্ণনা সূত্রে আরও বিস্তারিত জানা যায় যে, নাবী কারীম (ﷺ) যখন তার উত্তরে বললেন, ‘আল্লাহ’, তখন তরবারীখানা তার হাত থেকে পড়ে গেল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) তরবারী খানা নিজ হাতে উঠিয়ে নিয়ে বললেন, ‘এখন তোমাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে?’ সে বলল, ‘আপনি ভাল ধৃতকারী প্রমাণিত হলেন।’ (অর্থাৎ দয়া করুন) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‏(‏تَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلٰهَ إِلاَّ اللهُ وَأَنِّيْ رَسُوْلُ اللهِ‏؟‏‏)‏ ‘তুমি কি সাক্ষ্য দিচ্ছ যে, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোন উপাস্য নেই এবং আমি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল (ﷺ)।

সে বলল, ‘আমি অঙ্গীকার করছি যে,আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করব না এবং যারা আপনার সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হবে তাদের সঙ্গেও থাকব না।’

জাবির (রাঃ)-এর বর্ণনায় রয়েছে যে এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে ছেড়ে দেন। অতঃপর সে নিজ সম্প্রদায়ের নিকট গিয়ে বলে, ‘আমি সর্বোত্তম মানুষের নিকট থেকে তোমাদের এখানে আসছি।[2]

সহীহুল বুখারীর বর্ণনায় মুসাদ্দাদ, আবূ আওয়ানা হতে এবং তিনি আবূ বিশর হতে বর্ণনা করেছেন যে, সেই লোকটির নাম ছিল (গাওরাস বিন হারিস)।[3] ইবনু হাজার বলেছেন যে, ওয়াক্বিদীর নিকট এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে এ কথা বলা হয়েছে যে, এ বেদুঈনের নাম ছিল দু’সুর এবং সে ইসলাম কবূল করে নিয়েছিল। কিন্তু ওয়াকেদির কথা থেকে জানা যায় যে এ দুটি ছিল ভিন্ন ভিন্ন ঘটনা যা ভিন্ন ভিন্ন যুদ্ধে সংঘটিত হয়েছিল।[4] আল্লাহই ভাল জানেন।

এ যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তন কালে সাহাবীগণ (রাঃ) একজন মুশরিকা মহিলাকে বন্দী করেন। এর প্রেক্ষিতে তাঁর স্বামী মানত করল যে, সে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর সাহাবীগণ (ﷺ)-এর মধ্যে থেকে এক জনের রক্ত প্রবাহিত করবে। এ উদ্দেশ্যে সে রাত্রিতে বের হল।

শত্রুদের আক্রমণ ও অনিষ্ট থেকে মুসলিমগণের নিরাপত্তা বিধানের জন্য আববাদ বিন বিশর ও আম্মার বিন ইয়াসিরকে পাহারার কাজে নিয়োজিত করা হয়। বন্দী মহিলার স্বামী যে সময়ে সেখানে এসেছিল সে সময় আববাদ (রাঃ) দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছিলেন। তাঁর সালাতের মধ্যেই লোকটি তাঁর প্রতি তীর নীক্ষেপ করে। তিনি সালাত অবস্থায় তাঁর অঙ্গে বিদ্ধ তীরটি বাহির করে নিক্ষেপ করে দেন। অতঃপর সে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় তীর নিক্ষেপ করে। কিন্তু তিনি সালাত ত্যাগ না করেই শেষ সালামের মাধ্যমে সালাত সমাপ্ত করেন। অতঃপর স্বীয় সঙ্গীকে জাগ্রত করেন।

অবস্থা বুঝে সুঝে সঙ্গী বললেন, ‘আপনি আমাকে জাগান নি কেন?

তিনি বললেন, ‘আমি একটি সূরাহ পাঠ করছিলাম। সম্পূর্ণ করা থেকে বিরত হওয়াটা আমি পছন্দ করি নি।[5]

পাষাণ হৃদয় বেদুঈনদের ভীত সন্ত্রস্ত্র করার ব্যাপারে এ যুদ্ধের প্রভাব ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ে আয়োজিত অভিযানসমূহ সম্পর্কে সমীক্ষা চালালে দেখতে পাওয়া যায় যে, এ যুদ্ধের পর গাত্বাফানদের ঐ সমস্ত গোত্র মাথা উঁচু করার আর সাহস পায় নি। তাদের মনোবল ক্রমে ক্রমে শিথিল হতে হতে শেষ পর্যন্ত তাঁরা পরাভূত হল এবং ইসলাম গ্রহণ করে নিল। এমন কি সে সকল বেদুঈনদের কতগুলো গোত্রকে মক্কা বিজয়ের সময় এবং হুনাইন যুদ্ধে মুসলিমগণের সঙ্গে দেখা গিয়েছিল এবং তাদেরকে হুনায়েন যুদ্ধের গণীমতের অংশও প্রদান করা হয়েছিল। আবার মক্কা বিজয় হতে প্রত্যাবর্তনের পর তাদের সদকা গ্রহণের জন্য ইসলামী রাষ্ট্রের কর্মচারীদের প্রেরণ করা হয়েছিল এবং তারা নিয়মিত সদকা ও যাকাত আদায় করেছিল। মূলকথা হচ্ছে, এ কৌশল অবলম্বনের ফলে ঐ তিনটি শক্তি ভেঙ্গে যায় যারা খন্দকের যুদ্ধে মদীনার উপর আক্রমণ চালিয়েছিল এবং যার ফলে সমগ্র অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছিল।

এরপর কতগুলো গোত্র বিভিন্ন অঞ্চলে যে গন্ডগোল ও চক্রান্তমূলক কাজকর্ম আরম্ভ করেছিল মুসলিমগণ খুব সহজেই তাদের আয়ত্বে নিতে সক্ষম হয়েছিল। অধিকন্তু, এ যুদ্ধের পর বড় বড় শহর ও বিভিন্ন দেশ বিজয়ের পথ প্রশস্ত হতে শুরু করে। কারণ, এ যুদ্ধের পর দেশের অভ্যন্তরীণ অবস্থা ইসলাম ও মুসলিমগণের নিরাপত্তা ও শান্তি স্বস্তির জন্য পুরোপুরি অনুকূল হয়ে ওঠে।

[1] সহীহুল বুখারী যাতুর রিক্বা’ যুদ্ধ অধ্যায় ২য় খন্ড ৫৯২ পৃঃ, সহীহুল মুসলিম যাতুর রিক্বা’ অধ্যায় ২য় খন্ড ১১৮ পৃঃ।

[2] শাইখ আব্দুল্লাহ নাজদীকৃত মুখতাসারুস সীরাত ২৬৪ পৃঃ। ফাতহুল বারী ৭ম খন্ড ৪১৬ পৃঃ।

[3] সহীহুল বুখারী ২য় খন্ড ৫৯৩ পৃঃ।

[4] ফাতহুল বারী ৭ম খন্ড ৪১৭-৪২৮ পৃঃ।

[5] যাদুল মা’আদ ২য় খন্ড ১১২ পৃঃ। এ যুদ্ধের বিস্তারিত তথ্যাদির জন্য আরও দ্রষ্টব্য ইবনু হিশাম ২য় খন্ড ২০৩ থেকে ২০৯ পৃঃ। যাদুল মা’আদ ২য় খন্ড ১১০-১১২ পৃঃ। ফাতহুল বারী ৪১৭-১২৮ পৃঃ।

উপরোল্লিখিত যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সপ্তম হিজরীর শওয়াল মাস পর্যন্ত মদীনায় অবস্থান করেন। এ সময় মদীনায় অবস্থান কালে তিনি যে সকল অভিযান প্রেরণ করেন তার বিবরণ নিম্নে লিপিবদ্ধ করা হল-

১. কুদাইদ অভিযান (৭ম হিজরী সফর কিংবা রবিউল আওয়াল মাস) :

বনু মুলাওওয়াহ গোত্রকে শায়েস্তার জন্য গালিব বিন আব্দুল্লাহ লায়সীর পরিচালনাধীনে কুদাইদ নামক স্থানে এ অভিযান প্রেরিত হয়। বনু মলুহ বিশর বিন সোয়াইদের বন্ধুগণকে হত্যা করেছিল। এ হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে এ অভিযান প্রেরিত হয়েছিল। এ অভিযাত্রী দল রাত্রি বেলা আক্রমণ করে বনু মলুহ গোত্রের অনেক লোককে হত্যা করেন এবং গবাদি পশু খেদিয়ে নিয়ে আসেন। শত্রু পক্ষ একটি বড় আকারের বাহিনীসহ মুসলিম বাহিনীকে অনুসরণ করে অগ্রসর হতে থাকে। উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম বাহিনীর উপর পাল্টা আঘাত হানা। কিন্তু তারা যখন মুসলিম বাহিনীর কাছাকাছি এসে পড়েন তখন প্রবল বেগে বৃষ্টিপাত শুরু হয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে প্লাবন দেখা দেয়। এ প্লাবনই উভয় পক্ষের মধ্যে প্রতিরক্ষা প্রাচীর হিসেবে কাজ করে। সে সুযোগে মুসলিম বাহিনী নিরাপত্তা ও শান্তির মধ্য দিয়ে অবশিষ্ট পথ অতিক্রম করেন।

হিসমা অভিযান (৭ম হিজরী, জুমাদাস সানীয়াহ) : এ অভিযান সংক্রান্ত আলোচনা রাজন্যবর্গের নিকট পত্রলিখন অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে।

তুরাবাহ অভিযান (৭ম হিজরী শা‘বান মাস) : এ অভিযান প্রেরণ করা হয়েছিল উমার বিন খাত্তাব (রাঃ)-এর নেতৃত্বে। এ অভিযানে ত্রিশ জন মুসলিম সৈন্য অংশ গ্রহণ করেন। তাঁরা রাত্রি বেলা সফর করতেন এবং দিবা ভাগে আত্মগোপন করে থাকতেন। এ অভিযানের লক্ষ্যস্থল ছিল বনু হাওয়াযিন। মুসলিম অগ্রাভিযানের খবর পেয়ে বনু হাওয়াযিন পলায়ন করে যার ফলে মুসলিম বাহিনী সেখানে কাউকে না পেয়ে মদীনা ফিরে আসেন।

ফাদাক অঞ্চল অভিমুখে অভিযান (৭ম হিজরী শা‘বান মাস) : এ অভিযান প্রেরণ করা হয় বশীর বিন সা‘দ আনসারী (রাঃ)-এর নেতৃত্বে বনু মুররার সংশোধন উপলক্ষে। এ অভিযাত্রী দলের সদস্য সংখ্যা ছিল ত্রিশ জন। বশীর (রাঃ) তাদের অঞ্চলে পৌঁছে ভেড়া বকরী এবং গবাদী পশু খেদিয়ে নিয়ে মদীনার পথে অগ্রসর হন। কিন্তু রাত্রে শত্রুদল তাঁদের পশ্চাদনুসরণ করে। অভিযাত্রীগণ তাদের দিকে তীর নিক্ষেপ করে প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তীর শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে তারা নিরস্ত্র হয়ে পড়েন এবং অবশেষে সকলকেই শাহাদত বরণ করতে হয়। কেবল মাত্র বশীর (রাঃ) আহত অবস্থায় জীবিত থাকেন। আহত অবস্থায় তাকে ফাদাকে আনা হয়। সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত ইহুদীগণের নিকট অবস্থান করেন। সুস্থতা লাভের পর তিনি মদীনায় ফিরে আসেন।

মাইফা’আহ অভিযান (৭ম হিজরীর রমাযান মাস) : এ অভিযান প্রেরণ করা হয় গালিব বিন আব্দুল্লাহ লাইসীর নেতৃত্বে বনু ওয়াল ও বনু আবদ বিন সা’লাবাহর সংশোধন উপলক্ষে এবং বলা হয়েছে যে, জুহায়নাহ গোত্রের শাখা হারাকাতকে শিক্ষা দানের জন্য। অভিযাত্রীদলের সদস্য সংখ্যা ছিল একশ ত্রিশ।

মুসলিম মুজাহিদগণ সংঘবদ্ধভাবে শত্রুদের উপর আক্রমণ পরিচালনা করেন এবং যে কেউ মাথা উঁচু করে আক্রমণ প্রতিহত করতে আসে তাকে হত্যা করেন। অতঃপর শত্রুপক্ষের গবাদি পশুগুলো খেদিয়ে নিয়ে আসেন।

এ অভিযান কালে উসামা বিন যায়দ নাহিক বিন মের্দাসকে (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) বলা সত্ত্বেও হত্যা করেছিলেন। এ প্রেক্ষিতে নাবী কারীম (ﷺ) নিন্দা করে বলেছিলেন,

(‏أَقَتَلْتَهُ بَعْدَ مَا قَالَ‏:‏ لَا إِلٰهَ إِلاَّ اللهُ‏؟‏‏ فَهَلاَّ شَقَقْتَ عَنْ قَلْبِهِ فَتَعْلَمُ أَصَادِقٌ هُوْ أَمْ كَاذِبٌ‏؟‏‏)‏‏.‏

‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলার পরও তুমি তাকে হত্যা করলে? ‘তুমি তার অন্তর চিরে কেন বুঝাবার চেষ্টা করল না? সে সত্যবাদী কি মিথ্যাবাদী ছিল?’

খায়বার অভিযান (৭ম হিজরী, শাওয়াল মাস) : এ অভিযান ছিল ত্রিশ জন ঘোড়সওয়ার সমন্বয়ে গঠিত একটি দল। আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহার (রাঃ) নেতৃত্বে প্রেরিত হয়েছিল এ অভিযান। এ অভিযানের কারণ ছিল, আসীর অথবা বশীর বিন যারাম মুসলিমগণের উপর আক্রমণ পরিচালনার জন্য গাত্বাফানদের একত্রিত করছিল।

মুসলিমগণ যথাস্থানে পৌঁছার পর আসীরকে এ মর্মে আশ্বাস প্রদান করেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে খায়বারের গর্ভনর নিযুক্ত করবেন। তার ত্রিশ জন বন্ধুসহ তাঁদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য তাঁরা তাকে উদ্বুদ্ধ করলেন। কিন্তু কারকা নিয়ার পৌঁছার পর দু’ দলের মধ্যে কিছুটা সন্দেহের সৃষ্টি হওয়ার ফলে আসীর এবং তার ত্রিশ জন সাথী মুসলিমগণের হাতে নিহত হয়। ওয়াক্বিদী এই সারিয়্যাকে খায়বারের কয়েকমাস পূর্বে ৬ষ্ঠ হিজরীর শাওয়াল মাসে সংঘটিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।

ইয়ামান ও জাবার অভিযান (৭ম হিজরী শাওয়াল মাস) : জাবার এর জিম-এ জবর (হরকত) আছে। এটা বনু গাত্বাফান এবং বলা হয়েছে যে, বনু ফাযারা ও বনু উযরা এলাকার নাম। বাশীর বিন কা‘ব আনসারী (রাঃ)-কে তিনশ মুসলিম সৈন্যের একটি দলসহ সেখানে প্রেরণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল মদীনার উপর আক্রমণ চালানোর লক্ষে প্রস্তুতি গ্রহণরত এক বিরাট বাহিনীকে বিক্ষিপ্ত করে দেয়া। অভিযাত্রী মুসলিম বাহিনী রাত্রিবেলা পথ চলতেন এবং দিবাভাগে আত্মগোপন করে থাকতেন। শত্রুরা যখন বশীরের অগ্রাভিযানের সংবাদ অবগত হল তখন তারা পলায়ন করল। বশীরের বাহিনী শত্রুপক্ষের দু’ ব্যক্তিকে বন্দী করতে এবং অনেকগুলো গবাদি পশু আয়ত্বে নিতে সক্ষম হন। বন্দী দু’জনকে খিদমতে নাবাবীতে হাজির করা হলে তারা ইসলাম গ্রহণ করে।

গা-বা অভিযান : ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম এ অভিযান উমরায়ে ক্বাযার পূর্বে ৭ম হিজরীর অভিযান সমূহের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এ অভিযানের মূল কথা হচ্ছে, জাশম বিন মু’আবিয়া গোত্রের এক ব্যক্তি অনেক লোকজন নিয়ে গাবা নামক স্থানে আসে। তার উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য বনু ক্বায়স গোত্রের লোকজনদের একত্রিত করা। এ সংবাদ অবগত হয়ে নাবী কারীম (ﷺ) আবূ হাদরাদ (রাঃ)-কে মাত্র দু’জন সঙ্গীসহ তাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। হাদরাদ (রাঃ) এমন এক যুদ্ধ কৌশল অবলম্বন করেন যার ফলে শত্রুদল শোচনীয় ভাবে পরাজয় বরণ করে। মুসলিম বাহিনী অনেক উট, ভেড়া ও ছাগল খেদিয়ে নিয়ে আসেন।[1]

[1] যাদুল মা’আদ ২য় খন্ড ১৪৯-১৫০ পৃ: এ অভিযানগুলো বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে রহমাতুল্লিল আলামীন ২য় খন্ড ২২৯-২৩১ পৃঃ, যাদুল মা’আদ ২য় খন্ড ১৪৮-১৫০ তালকীহুল ফুহুম, টীকাসহ ৩১ পৃ: আব্দুল্লাহ নাজদী লিখিত সীরাত গ্রন্থের ৩২২-৩২৪ পৃঃ।

ইমাম হাকিম বলেছেন, এ সংবাদ ধারাবাহিকতার সঙ্গে প্রমাণিত যে, যখন যুল ক্বা’দাহর চাঁদ দেখা গিয়েছিল, তখন নাবী কারীম (ﷺ) সাহাবাবৃন্দের (রাঃ) প্রত্যেককেই ক্বাযা হিসেবে নিজ নিজ উমরাহ আদায় করার নির্দেশ প্রদান করেন। যাঁরা হুদায়বিয়াহয় উপস্থিত ছিলেন তাঁরা সকলেই উমরাহ আদায়ে শরীক হবেন, কেউ পিছনে থাকবেন না। এ প্রেক্ষিতে (সে সময়) যাঁরা শহীদ হয়েছিলেন তাঁরা ব্যতীত অবশিষ্ট সকলেই যাত্রা করেন। হুদায়বিয়াহয় উপস্থিত ছিলেন না এমন কিছু সংখ্যক লোকও উমরাহ আদায়ের উদ্দেশ্যে একই সঙ্গে বের হন। এভাবে উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে বহির্গত লোকের সংখ্যা ছিল দু’ হাজার। মহিলা এবং শিশুরা ছিল এ সংখ্যার অধিক।[1]

রাসূলে কারীম (ﷺ) এ সময়ে আবূ রুহম গিফারী (রাঃ)-কে মদীনায় তাঁর দায়িত্বে নিয়োজিত করেন। সঙ্গে নিয়েছিলেন ৬০টি উট এবং সে সব দেখাশোনার দায়িত্বে নিযুক্ত করেছিলেন নাজিয়া বিন জুন্দুব আসলামী (রাঃ)-কে। যুল হুলাইফাতে উমরাহর জন্য ইহরাম বাঁধলেন এবং লাব্বায়িক ধ্বনি উঁচু করলেন। নাবী কারীম (ﷺ)-এর সঙ্গে মুসলিমরাও লাব্বায়িক পড়লেন। মুশরিকদের অঙ্গীকার ভঙ্গের আশঙ্কায় কাফেলার লোকজনদের অস্ত্রশস্ত্র ছিল এবং যুদ্ধ সম্পর্কে পারদর্শী লোকদের সঙ্গে নেয়া হয়েছিল। ইয়া’জুজ নামক উপত্যকায় পৌঁছার পর সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র অর্থাৎ বর্ম, ঢাল, তরবারী, তীর, বর্শা সব কিছু রেখে দেয়া হল এবং ওগুলো তত্ত্বাবধানের জন্য আওস বিন কাওলী আনসারী (রাঃ)-কে ২০০ লোকসহ নিযুক্ত করা হল। আরোহীগণ অস্ত্র ও খাপে রক্ষিত তরবারী নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করলেন।[2]

মক্কায় প্রবেশের সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর কাসওয়া নামক উটের পিঠে আরোহিত ছিলেন। মুসলিমগণ তরবারীগুলো কাঁধে ঝুলন্ত অবস্থায় রেখেছিলেন এবং রাসূলে কারীম (ﷺ)-কে সকলের মধ্যস্থলে রেখে লাব্বায়িক ধ্বনি উচ্চারণ করছিলেন।

মুশরিকরা মুসলিমগণের এ অগ্রাভিযানকে একটি তামাশা সুলভ ব্যাপার মনে করে তা দেখার জন্য বাড়ি থেকে বেরে হয়ে এসে কা‘বা গৃহের উত্তর দিকে অবস্থিত কু’আইক্বি’আন নামক পাহাড়ের উপর গিয়ে বসেছিল এবং কথোপকথন সূত্রে তারা পরস্পর বলাবলি করছিল যে, ‘তোমাদের নিকট এমন একটি দল আসছে ইয়াসরিবের অর্থাৎ মদীনার জ্বর যাদের একদম নষ্ট করে দিয়েছে।’ এ কারণে নাবী কারীম (ﷺ) সাহাবীগণ (রাঃ)-কে এ বলে নির্দেশ প্রদান করলেন যে, প্রথম তিনটি চক্কর যেন তাঁরা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে শেষ করেন। রুকনে ইয়ামানী ও হাজারে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থান স্বাভাবিক অবস্থায় অতিক্রম করবে। সাত চক্কর দৌঁড়ে পালন করার নির্দেশ শুধুমাত্র রহমত ও মমত্ব প্রদর্শনের উদ্দেশ্যেই দেন নি, বরং উল্লেখিত নির্দেশ প্রদানের অভিপ্রায় এই ছিল যে, মুশরিকগণ নাবী কারীম (ﷺ)-এর ক্ষমতা প্রত্যক্ষ করুক।[3] এ ছাড়া রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সাহাবীগণ (রাঃ)-কে ইযতিবার নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। ইযতিবার অর্থ হচ্ছে, ডান কাঁধ খোলা রাখা এবং গায়ের চাদর খানা ডান বগলের নীচ দিয়ে অতিক্রম করিয়ে অগ্র ও পশ্চাৎ উভয় দিক হতে তার দ্বিতীয় কোণটি বাম কাঁধের উপর নিয়ে নেয়া।

রাসূলে কারীম (ﷺ) সেই গিরিপথ ধরে মক্কায় প্রবেশ করলেন যা হাজূনের দিকে বের হয়েছে। নাবী কারীম (ﷺ)-কে দেখার জন্য মুশরিকগণ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। একটানা ‘লাববায়িক’ ধ্বনি উচ্চারণ করে চলছিলেন। অতঃপর হারামে পৌঁছে তিনি নিজ লাঠি দ্বারা হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করলেন এবং কা‘বা ঘর প্রদক্ষিণ করলেন। মুসলিমগণও কা‘বা ঘর প্রদক্ষিণ করলেন। ঐ সময় আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রাঃ) তরবারী কাঁধে ঝুঁলিয়ে রাসূলে কারীম (ﷺ)-এর আগে আগে গমন করছিলেন এবং যুদ্ধাবৃত ছন্দের নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করছিলেন-

বর্ণনা সমূহের মধ্যে উল্লেখিত কবিতাগুলো এবং তার বিন্যাস সম্পর্কে যথেষ্ট মত পার্থক্য রয়েছে। বিক্ষিপ্ত কবিতাগুলোকে আমি একত্রিত করে দিয়েছি।

خلو بني الكفار عنسبيله خلوا فكل الخيرفي رسوله

قد أنزل الرحمن في تنزيله في صحف تتلى عَلٰى رسوله

يا رب إني مؤمن بقيله إني رأيت الحق في قبوله

بأن خير القتال في سليله اليوم نضربكم عَلٰى تنزيله

ضربا يزيل الهام عن مقيله ويذهل الخليل عن خليه

অর্থ : ‘কাফিরগণের পুত্র! এদের পথ ছেড়ে দাও। পথ ছেড়ে দাও এই জন্য যে, যাবতীয় কল্যাণ তাঁর পয়গম্বরত্বে রয়েছে। রহমান স্বীয় কোরআন অবতীর্ণ করেছেন। অর্থাৎ সহীফা সমূহের মধ্যে যা তাঁর পয়গম্বরের উপর পাঠ করা হয়। হে আমার প্রতিপালক! আমি তাঁর কথায় বিশ্বাস স্থাপন করছি এবং তা গ্রহণ করা সত্য বলে আস্থা পোষণ করছি যে, ঐ নিহত হওয়াই সর্বোত্তম যা আল্লাহর পথে হয়। আজ আমরা তাঁর কোরআন অনুযায়ী তোমাদেরকে এভাবে মারব যে মাথার খুলি মাথা হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং বন্ধুকে বন্ধু হতে বেখবর করে দেবে।

আনাস (রাঃ)-এর বর্ণনায় এ কথারও উল্লেখ রয়েছে যে, এ প্রেক্ষিতে উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) বললেন, ‘ওহে রাওয়াহার পুত্র! তুমি রাসূলে কারীম (ﷺ)-এর সামনে এবং আল্লাহর পবিত্র ও মর্যাদামন্ডিত স্থানে কবিতা আবৃত্তি করছ?’

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তখন বললেন, ‏(‏خَلِّ عَنْهُ يَا عُمَرُ، فَلَهُوْ أَسْرَعُ فِيْهِمْ مِّنْ نَضْحِ النَّبْلِ‏)‏‏ ‘হে উমার! ওকে আবৃত্তি করতে দাও। কারণ, এটা তাদের জন্য বর্শার আঘাত হতেও অধিক তীক্ষ্ণ।’’[4]

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং সাহাবীগণ দৌঁড় দিয়ে তিন চক্কর শেষ করলেন। তা প্রত্যক্ষ করে মুশরিকগণ বলতে থাকল, এ সকল লোকজন শক্তি হারিয়ে ফেলেছে তাতো সঠিক নয়[5] বরং এরা সাধারণ লোকজন হতেও অধিক শক্তিশালী।

আল্লাহর ঘর প্রদক্ষিণ সমাপ্ত করে নাবী কারীম (ﷺ) সাফা’ ও মারওয়ার সা’ঈ করলেন। ঐ সময়ে নাবী কারীম (ﷺ)-এর কুরবানীর পশু মারওয়া পর্বতের নিকটে দাঁড়িয়েছিল। সা’ঈ শেষে বললেন, ‘এটা হচ্ছে কুরবানীর জায়গা এবং মক্কার সমস্ত জায়গা কুরবানীর স্থান। এরপর মারওয়ার নিকটে পশুগুলোকে কুরবানী করে দিলেন। অতঃপর মাথা মুন্ডন করলেন। সাহাবাগণও (রাযি.) অনুরূপ করলেন। এরপর কিছু সংখ্যক লোককে ইয়াজেজ পাঠিয়ে দেয়া হল। উদ্দেশ্য ছিল এরা সেখানে গিয়ে অস্ত্রশস্ত্র গুলোকে তত্ত্বাবধান করবেন এবং যাঁরা এ কাজে নিয়োজিত ছিলেন তাঁরা উমরাহ পালন করবেন।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মক্কায় তিন দিন অবস্থান করলেন। চতুর্থ দিবসে যখন সকাল হল তখন মুশরিকগণ আলী (রাঃ)-এর নিকট এসে বলল, ‘তোমাদের সঙ্গীকে বল তিনি যেন এখান থেকে চলে যান। কারণ, সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মক্কা থেকে বেরিয়ে এসে সরফ নামক স্থানে অবতরণ করে অবস্থান করলেন।

মক্কা থেকে বেরিয়ে আসার প্রাক্কালে নাবী কারীম (ﷺ)-এর পিছনে পিছনে হামযাহ (রাঃ)-এর কন্যাও ‘চাচা, চাচা’ শব্দ উচ্চারণ করতে করতে এসে পড়ল। আলী (রাঃ) তাকে কোলে তুলে নিলেন। এরপর তার সম্পর্কে আলী, জা’ফার এবং যায়েদের মধ্যে বিতর্ক হয়ে গেল। প্রত্যেকই দাবী করছিল যে, তিনি তার লালন পালনের জন্য অধিক দাবীদার। নাবী কারীম (ﷺ) জাফরের অনুকূলে মীমাংসা করলেন। কারণ, জাফরের স্ত্রী ছিলেন এ মেয়েটির খালা।

উল্লেখিত উমরাহ পালন কালে নাবী কারীম (ﷺ) মায়মুনা বিনতে হারিস আমেরিয়া (রাঃ)-কে বিবাহ করেন। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার উদ্দেশ্যে মক্কায় পৌঁছার পূর্বে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জা’ফার বিন আবূ ত্বালিবকে মায়মুনা (রাঃ)-এর নিকট প্রেরণ করেন এবং তিনি তাঁর সমস্ত দায়দায়িত্ব আব্বাসকে সমর্পণ করেছিলেন। কারণ, মায়মুনার বোন উম্মুল ফযল ছিলেন তাঁর স্ত্রী। আব্বাস (রাঃ) নাবী কারীম (ﷺ)-এর সঙ্গে মায়মুনার বিবাহ সম্পন্ন করে দেন। অতঃপর মক্কা হতে প্রত্যাবর্তনের সময় নাবী (ﷺ) আবূ রা'ফেকে পিছনে রেখে যান যেন তিনি মায়মুনা (রাঃ)-কে সওয়ারীর উপর আরোহন করে তাঁর খিদমতে নিয়ে যান। যখন সারফ নামক স্থানে পৌঁছলেন তখন নাবী পত্নী মায়মুনা (রাঃ)-কে তাঁর খিদমতে পৌঁছে দেয়া হল।[6]

উল্লেখিত উমরাহকে ‘উমরায়ে ক্বাযা’ এ কারণে বলা হয়ে থাকে যে, তা উমরায়ে হুদায়বিয়াহর ক্বাযা হিসেবেই আদায় করা হয়েছিল। অথবা হুদায়বিয়াহর সন্ধিচুক্তির সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে তা পালন করার কারণে (এ ধরণের সন্ধি বা আপোষকে আরবীতে ক্বাযা বা মুক্বাযাত বলা হয়ে থাকে)। দ্বিতীয় কারণটিকে মুহাক্বিক্বীনে কেরাম অধিকতর গ্রহণযোগ্য বলে সাব্যস্ত করেছেন।[7] প্রকাশ থাকে যে, এ উমরাহ চারটি নামে পরিচিত আছে যথা- উমরায়ে ক্বাযা, উমরায়ে ক্বাযিয়্যা, উমরায়ে ক্বিসাস এবং উমরায়ে সুলহ।[8]

[1] ফাতহুল বারী ৭ম খন্ড ৫০০ পৃঃ।

[2] যাদুল মা‘আদ ২য় খন্ড ১৫১ পৃঃ।

[3] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ১১৮ পৃ, ২য় খন্ড ৬১০-৬১১পৃঃ, সহীহুল মুসলিম ১ম খন্ড ৪১২ পৃঃ।

[4] তিরমিযী- ‘আদব ও অনুমতি’ অধ্যায় কবিতা আবৃত্তি প্রসঙ্গে ২য় খন্ড ১০৭ পৃঃ।

[5] সহীহুল মুসলিম ১ম খন্ড ৪১২ পৃৃৃৃৃৎ&

[6] যাদুল মা‘আদ ২য় খন্ড ১৫২ পৃঃ।

[7] যাদুল মা‘আদ ১ম খন্ড ১৭২ পৃঃ। ফাতহুল বারী ৭ম খন্ড ৫০০ পৃঃ।

[8] যাদুল মা‘আদ ১ম খন্ড ১৭২ পৃঃ, এবং ফাতহুল বারী ৭ম খন্ড ৫০০ পৃঃ।

ক্বাযা উমরাহ থেকে প্রত্যাবর্তন করে তিনি কয়েকটি অভিযানের জন্য প্রেরণ করেন। সেগুলো হলো :

ইবনে আবুল ‘আওজা’ অভিযান (৭ম হিজরীর যুল হিজ্জাহ মাসে সংঘটিত) (سَرِيَّةُ ابْنِ أَبِيْ الْعَوْجَاء) : বনু সুলাইম গোত্রকে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার উদ্দেশ্যে রাসূলে কারীম (ﷺ) আবুল আওজার নেতৃত্বে ৫০ জনের একটি দল প্রেরণ করেন। বনু সুলাইমকে যখন ইসলামের দাওয়াত দেয়া হয় তখন তারা উত্তরে বলল, ‘তোমরা যে কথার দাওয়াত দিচ্ছ আমাদের তার কোনই প্রয়োজন নেই।’ অতঃপর তারা মুসলিমগণের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এ যুদ্ধে আবুল আওজা আহত হন। কিন্তু তা সত্ত্বেও মুসলিমগণ শত্রুদলের দু’ জনকে বন্দী করতে সক্ষম হন।

গালিব বিন আব্দুল্লাহ অভিযান (৮ম হিজরীর সফর মাসে সংঘটিত) (سَرِيَّةُ غَالِبِ بْنِ عَبْدِ اللهِ إِلٰى مَصَابِ أَصْحَابِ بَشِيْرِ بْنِ سَعْدٍ بِفَدَكٍ) : দু’শ লোকের সমন্বয়ে গঠিত দলের সঙ্গে তাঁকে ফাদাক অঞ্চলে বাশীর বিন সা’দের বন্ধুদের শাহাদত স্থলে প্রেরণ করা হয়। তাঁরা শত্রুদের পশুসম্পদ হস্তগত করেন এবং একাধিক ব্যক্তিকে হত্যা করেন।

যাত-ই-আত্বলাহ অভিযান (৮ম হিজরীর রবিউর মাসে সংঘটিত) (سَرِيَّةُ ذَاتِ أَطْلَح) : এ অভিযানের বিবরণ হচ্ছে, বনু কুযা’আহ মুসলিমগণের আক্রমণের উদ্দেশ্যে বড় একটি দলকে একত্রিত করেছিল। নাবী কারীম (ﷺ) যখন এ ব্যাপারটি অবগত হলেন তখন কা‘ব বিন উমাইরের (রাঃ) নেতৃত্বে মাত্র পনের জন সাহাবী (রাযি.)-এর একটি দলকে সেখানে প্রেরণ করেন। সাহাবীগণ তাদের ইসলামের দাওয়াত দিলে তারা তা প্রত্যাখ্যানের পর তীর দ্বারা ছিদ্র করে সকলকে শহীদ করে। মাত্র একজন জীবিত ছিলেন যাকে নিহতদের মধ্য থেকে উঠিয়ে আনা হয়।[1]

যাত-ই ইরক্ অভিযান (৮ম হিজরী রবিউল আওয়াল মাসে সংঘটিত) (سَرِيَّةُ ذَاتِ عِرْقٍ إِلٰى بَنِيْ هَوَازِن) : এ অভিযানের কারণ হচ্ছে, বনু হাওয়াযিন গোত্র বার বার শত্রুপক্ষকে সাহায্য করছিল। কাজেই তাদের শায়েস্তা করার জন্য ৫০ ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত একটি দলকে শুজা’ বিন ওয়াহাব আসদীর (রাঃ) নেতৃত্বে প্রেরণ করা হয়। মুসলিমগণের সঙ্গে শত্রুদের যুদ্ধ হয়নি। তবে শত্রু পক্ষের পশু সম্পদ মুসলিমগণের হস্তগত হয়।[2]

[1] রহমাতুল্লিল আলামীন ২য় খন্ড ২৩১ পৃঃ।

[2] ঐ এবং তালকিহুল ফহুম ৩৩ পৃ: (টীকা)।
দেখানো হচ্ছেঃ ৩১১ থেকে ৩২০ পর্যন্ত, সর্বমোট ৪৩৪ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে পাতা নাম্বারঃ « আগের পাতা 1 2 3 4 · · · 29 30 31 32 33 · · · 41 42 43 44 পরের পাতা »