নাবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর বাল্য, কৈশোর এবং প্রথম যৌবনে পেশাভিত্তিক সুনির্দিষ্ট কোন কাজ-কর্মের কথা পাওয়া যায় না। তবে নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন সূত্রের মাধ্যমে জানা যায় যে, বনু সা‘দ গোত্রে দুধমা’র গৃহে থাকাবস্থায় অন্যান্য বালকদের সঙ্গে ছাগল চরানোর উদ্দ্যেশে মাঠে গমন করতেন।[1] মক্কাতেও কয়েক কীরাত অর্থের বিনিময়ে তিনি ছাগল চরাতেন।[2]
অধিকন্তু, কৈশোরে চাচা আবূ ত্বালীবের সঙ্গে বাণিজ্য উপলক্ষে তিনি সিরিয়া গমন করেছিলেন। বর্ণিত আছে যে, তিনি (ﷺ) সায়িব বিন আবূ মাখযূমীর সাথে ব্যবসা করতেন এবং তিনি একজন ভাল অংশীদার ছিলেন। না তোষামোদী ছিলেন, না ঝগড়াটে ছিলেন। তিনি যখন মক্কা বিজয়ের সময় আগমন করেন তখন তাকে সাদর সম্ভাষন জানান এবং বললেন, হে আমার ভাই এবং ব্যবসায়ের অংশীদার।
তারপর যখন তিনি পঁচিশ বছর বয়সে পদার্পণ করেন তখন খাদীজাহ (রাঃ)-এর সম্পদ নিয়ে ব্যবসার উদ্দেশ্যে শাম দেশে গমন করেন। ইবনে ইসহাক্ব হতে বর্ণিত আছে যে, খাদীজাহ (রাঃ) বিনতে খুওয়াইলিদ এক সম্ভ্রান্ত সম্পদশালী ও ব্যবসায়ী মহিলা ছিলেন। ব্যবসায়ে অংশীদারিত্ব এবং প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী লভ্যাংশের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে তিনি ব্যবসায়ীগণের নিকট অর্থলগ্নী করতেন। পুরো কুরাইশ গোত্রই জীবন জীবিকার জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যে লিপ্ত থাকতেন। যখন খাদীজাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সত্যবাদিতা, উত্তম চরিত্র, সদাচার এবং আমানত হেফাজতের নিশ্চয়তা সম্পর্কে অবগত হলেন তখন তিনি মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর নিকট এক প্রস্তাব পেশ করলেন যে, তিনি তাঁর অর্থ নিয়ে ব্যবসার উদ্দেশ্যে তাঁর দাস মায়সারার সঙ্গে শাম দেশে গমন করতে পারেন। তিনি স্বীকৃতিও প্রদান করেন যে, অন্যান্য ব্যবসায়ীগণকে যে হারে লভ্যাংশ বা মুনাফা প্রদান করা হয় তাঁকে তার চাইতে অধিকমাত্রায় মুনাফা প্রদান করা হবে। মুহাম্মাদ (ﷺ) এ প্রস্তাব গ্রহণ করলেন এবং তার অর্থ সম্পদ নিয়ে দাস মায়সারার সঙ্গে শাম দেশে গমন করলেন।[3]
[2] সহীহুল বুখারী, আল এজারত্ব বাবু রাইল গানামে আলা কাবারিতা ১ম খন্ড ৩০১ পৃঃ।
[3] ইবনে হিশাম ১ম খন্ড ১৮৭-১৮৮ পৃঃ।
সিরিয়া থেকে যুবক নাবী (ﷺ)-এর প্রত্যাবর্তনের পর ব্যবসা বাণিজ্যের খতিয়ান করা হল। হিসাব নিকাশ করে আমানতসহ এত বেশী পরিমাণ অর্থ তিনি পেলেন ইতোপূর্বে কোন দিনই তা পাননি। এতে খাদীজাহ (রা.)-এর অন্তর তৃপ্তির আমেজে ভরে ওঠে। অধিকন্তু, তাঁর দাস মায়সারার কথাবার্তা থেকে মুহাম্মাদ (ﷺ) মিষ্টভাষিতা, সত্যবাদিতা, উন্নত চিন্তা-ভাবনা, আমানত হেফাজত করার ব্যাপারে একাগ্রতা ইত্যাদি বিষয় অবগত হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাবোধ ক্রমেই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হতে থাকে এবং তাঁকে পতি হিসেবে পাওয়ার একটা গোপন বাসনা ক্রমেই তাঁর মনে দানা বেঁধে উঠতে থাকে। এর পূর্বে বড় বড় সরদার, নেতা ও প্রধানগণ অনেকেই তাঁর নিকট বিয়ের প্রস্তাব পাঠান কিন্তু তিনি কোনটিই মঞ্জুর করেননি। অথচ মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে স্বামী রূপে পাওয়ার জন্য তিনি যার পরনাই ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। তিনি নিজ অন্তরের গোপন বাসনা ও ব্যাকুলতার কথা তাঁর বান্ধবী নাফীসা বিনতে মুনাবিবহ এর নিকট ব্যক্ত করলেন এবং বিষয়টি নিয়ে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর সঙ্গে আলোচনা করার জন্য তাঁকে অনুরোধ জানালেন। নাফীসা খাদীজাহ (রাঃ)-এর প্রস্তাব সম্পর্কে নাবী কারীম (ﷺ)-এর সঙ্গে আলোচনা করলেন। নাবী কারীম (ﷺ) এ প্রস্তাবে সম্মতি জ্ঞাপন করে বিষয়টি চাচা আবূ ত্বালীবের সঙ্গে আলোচনা করলেন। আবূ ত্বালিব এ ব্যাপারে খাদীজাহ (রাঃ)-এর পিতৃব্যের সঙ্গে আলোচনার পর বিয়ের প্রস্তাব পেশ করেন এবং এক শুভক্ষণে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত দুইটি প্রাণ বিশ্বমানবের অনুকরণ ও অনুসরণযোগ্য পবিত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যান। বিবাহ অনুষ্ঠানে বনু হাশিম ও মুযারের প্রধানগণ উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানের সৌষ্ঠব বৃদ্ধি করেন।
নাবী কারীম (ﷺ) এবং খাদীজাহ (রাঃ)-এর মধ্যে শুভ বিবাহপর্ব অনুষ্ঠিত হয় শাম দেশ থেকে প্রত্যাবর্তনের দু’মাস পর। তিনি সহধর্মিনী খাদীজাহকে মোহরানা স্বরূপ ২০টি উট প্রদান করেন। ঐ সময় খাদীজাহ (রাঃ)-এর বয়স হয়েছিল ৪০ বছর। বংশ-মর্যাদা, সহায়-সম্পদ, বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সমাজের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়া। তিনি ছিলেন উত্তম চরিত্রের এক অনুপমা মহিলা এবং নাবী কারীম (ﷺ)-এর প্রথমা সহধর্মিনী। তাঁর জীবদ্দশায় তিনি আর অন্য কোন মহিলাকে বিবাহ করেন নাই।[1]
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সন্তানদের মধ্যে ইবরাহীম ব্যতীত অন্যান্য সকলেই ছিলেন খাদীজাহ (রাঃ)-এর গর্ভজাত সন্তান। নাবী দম্পতির প্রথম সন্তান ছিলেন কাসেম, তাই উপনাম হয় ‘আবুল কাসেম’। তারপর যথাক্রমে জন্মগ্রহণ করেন যায়নাব, রুকাইয়্যাহ, উম্মে কুলসুম, ফাত্বিমাহ ও আব্দুল্লাহ। আব্দুল্লাহর উপাধি ছিল ‘ত্বাইয়িব’ এবং ‘ত্বাহির’।
নাবী কারীম (ﷺ)-এর সকল পুত্র সন্তানই বাল্যাবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তবে কন্যাদের মধ্যে সকলেই ইসলামের যুগ পেয়েছেন, মুসলিম হয়েছেন এবং মুহাজিরের মর্যাদাও লাভ করেছেন। কিন্তু ফাত্বিমাহ (রাঃ) ব্যতীত কন্যাগণ সকলেই পিতার জীবদ্দশাতেই মৃত্যু বরণ করেন। ফাত্বিমাহ (রাঃ)-এর মৃত্যু হয়েছিল নাবী কারীম (ﷺ)-এর ছয় মাস পর।[2]
[2] ইবনে হিশাম ১ম খন্ড ১৯০-১৯১ পৃঃ, ফিক্বহুস সীরাহ ৬০ পৃঃ। ফাতহুল বারী ৭ম খন্ড ১৫০ পৃঃ। তারীখের বই সমূহে কিছু মতভেদের কথা উলেখিত হয়েছে। তবে আমার নিকট যা অধিক গ্রহণযোগ্য তা এখানে লিপিবদ্ধ করলাম।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন পঁয়ত্রিশ বছরে পদার্পণ করেন তখন কুরাইশগণ ক্বাবা’হ গৃহের পুনঃনির্মাণ কাজ আরম্ভ করেন। কারণ, ক্বাবা’হ গৃহের স্থানটি চতুর্দিকে দেয়াল দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় ছিল মাত্র। দেয়ালের উপর কোন ছাদ ছিল না। এ অবস্থার সুযোগ গ্রহণ করে কিছু সংখ্যক চোর এর মধ্যে প্রবেশ করে রক্ষিত বহু মূল্যবান সম্পদ এবং অলঙ্কারাদি চুরি করে নিয়ে যায়। ইসমাঈল (আঃ)-এর আমল হতেই এ ঘরের উচ্চতা ছিল ৯ হাত।
গৃহটি বহু পূর্বে নির্মিত হওয়ার কারণে দেয়ালগুলোতে ফাটল সৃষ্টি হয়ে যে কোন মুহূর্তে তা ভেঙ্গে পড়ার মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। তাছাড়া সেই বছরেই মক্কা প্লাবিত হয়ে যাওয়ার কারণে ক্বাবা’হমুখী জলধারা সৃষ্টি হয়েছিল। তাছাড়া প্রবাহিত হওয়ায় ক্বাবা’হগৃহের দেওয়ালের চরম অবনতি ঘটে এবং যে কোন মুহূর্তে তা ধ্বসে পড়ার আশঙ্কা ঘণীভূত হয়ে ওঠে। এমন এক নাজুক অবস্থার প্রেক্ষাপটে কুরাইশগণ সংকল্পবদ্ধ হলেন ক্বাবা’হ গৃহের স্থান ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার উদ্দেশ্যে তা পুনঃনির্মাণের জন্য।
ক্বাবা’হ গৃহ নির্মাণের উদ্দেশ্যে সকল গোত্রের কুরাইশগণ একত্রিত হয়ে সম্মিলিতভাবে কতিপয় নীতি নির্ধারণ করে নিলেন। সেগুলো হচ্ছে যথাক্রমেঃ ক্বাবা’হ গৃহ নির্মাণ করতে গিয়ে শুধুমাত্র বৈধ অর্থ-সম্পদ (হালাল) ব্যবহার করা হবে। এতে বেশ্যাবৃত্তির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ, সুদের অর্থ এবং হক নষ্ট করে সংগৃহীত হয়েছে এমন কোন অর্থ নির্মাণ কাজে ব্যবহার করা চলবে না। এ সকল নীতির প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন করে নির্মাণ কাজ আরম্ভ করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা হল।
নতুন ইমারত তৈরির জন্য পুরাতন ইমারত ভেঙ্গে ফেলা প্রয়োজন। কিন্তু আল্লাহর ঘর ভেঙ্গে ফেলার কাজে হাত দিতে কারো সাহস হচ্ছে না, অবশেষে ওয়ালীদ বিন মুগীরাহ মাখযুমী সর্বপ্রথম ভাঙ্গার কাজে হাত দিলেন এবং অন্যেরা ভীত-সম্ভ্রন্ত চিত্তে তা প্রত্যক্ষ করতে থাকলেন। কিন্তু কিছু অংশ ভেঙ্গে ফেলার পরও যখন তাঁরা দেখলেন যে তাঁর উপর কোন বিপদ আপদ আসছে না তখন সকলেই ভাঙ্গার কাজে অংশ গ্রহণ করলেন। যখন ইবরাহীম (আঃ)-এর ভিত্তি পর্যন্ত ভেঙ্গে ফেলা হল তখন নির্মাণ কাজ শুরু হল। প্রত্যেক গোত্র যাতে নির্মাণ কাজে অংশ গ্রহণের সুযোগ লাভ করে তজ্জন্য কোন্ গোত্র কোন্ অংশ নির্মাণ করবেন পূর্বাহ্নেই তা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এ প্রেক্ষিতে প্রত্যেক গোত্রই ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রস্তর সংগ্রহ করে রেখেছিলেন। বাকূম নামক একজন রুমীয় মিস্ত্রির তত্ত্বাবধানে নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছিল। নির্মাণ কাজ যখন কৃষ্ণ প্রস্তরের স্থান পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছল তখন নতুনভাবে এক সমস্যার সৃষ্টি হল। সমস্যাটি হল ‘হাজারে আসওয়াদ’ তথা ‘কৃষ্ণ প্রস্তর’টি স্থাপন করার মহা গৌরব অর্জন করবেন তা নিয়ে। এ ব্যাপারে ঝগড়া ও কথা কাটাকাটি চার বা পাঁচ দিন চললো।
সকলেই নিজে বা তাঁর গোত্র কৃষ্ণ প্রস্তরটি যথাস্থানে স্থাপন করার দাবীতে অনড়। সকলেরই এক কথা, এ কাজটি তাঁরাই করবেন। কেউই সামান্য ছাড় দিতেও তৈরি নন। সকলেরই একই কথা, একই জেদ। জেদ ক্রমান্বয়ে রূপান্তরিত হল রেষারেষিতে। রেষারেষির পরবর্তী পর্যায় হচ্ছে রক্তারক্তি। এ ব্যাপারে রক্তারক্তি করতেও তাঁরা পিছপা হবেন না। সকল গোত্রের মধ্যেই চলছে সাজ সাজ রব। শুরু হয়েছে অস্ত্রের মহড়া। একটু নরমপন্থীগণ সকলেই আতঙ্কিত কখন যে যুদ্ধ বেধে যায় কে তা জানে।
এমন বিভীষিকাময় এক অবস্থার প্রেক্ষাপটে বর্ষীয়ান নেতা আবু্ উমাইয়া মাখযূমী এ সমস্যা সমাধানের একটি সূত্র খুঁজে পেলেন। তিনি সকলকে লক্ষ্য করে প্রস্তাব করলেন যে, আগামী কাল সকালে যে ব্যক্তি সর্ব প্রথম মসজিদুল হারামে প্রবেশ করবেন তাঁর উপরেই এ বিবাদ মীমাংসার দায়িত্ব অর্পণ করা হোক। সকলেই এ প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করলেন। আল্লাহর কী অপার মহিমা! দেখা গেল সকল আরববাসীর প্রিয়পাত্র ও শ্রদ্ধেয় আল-আমিনই সর্ব প্রথম মসজিদুল হারামে প্রবেশ করেছেন। নাবী কারীম (ﷺ)-এর এভাবে আসতে দেখে সকলেই চিৎকার করে বলে উঠল :
هٰذَا الْأَمِيْنُ، رَضَيْنَاهُ، هٰذَا مُحَمَّدٌ،
আমাদের বিশ্বাসী, আমরা সকলেই এর উপর সন্তুষ্ট, তিনিই মুহাম্মাদ (ﷺ)।
তারপর নাবী কারীম (ﷺ) যখন তাঁদের নিকটবর্তী হলেন তখন ব্যাপারটি সবিস্তারে তাঁর নিকট পেশ করা হল। তখন তিনি এক খানা চাদর চাইলেন। তাঁকে চাদর দেয়া হলে তিনি মেঝের উপর তা বিছিয়ে দিয়ে নিজের হাতে কৃষ্ণ প্রস্তরটি তার উপর স্থাপন করলেন এবং বিবাদমান গোত্রপতিগণকে আহবান জানিয়ে বললেন, ‘আপনারা সকলে চাদরের পার্শ্ব ধরে উত্তোলন করুন। তাঁরা তাই করলেন। চাদর যখন কৃষ্ণ প্রস্তর রাখার স্থানে পৌছল তখন তিনি স্বীয় মুবারক হস্তে কৃষ্ণ প্রস্তরটি উঠিয়ে যথাস্থানে রেখে দিলেন। এ মীমাংসা সকলেই হৃষ্টচিত্তে মেনে নিলেন। অত্যন্ত সহজ, সুশৃঙ্খল এবং সঙ্গত পন্থায় জ্বলন্ত একটি সমস্যার সমাধান হয়ে গেল।
এ দিকে কুরাইশগণের নিকট বৈধ অর্থের ঘাটতি দেখা দিল। এ জন্যই উত্তর দিক হতে ক্বাবা’হ গৃহের দৈর্ঘ আনুমানিক ছয় হাত পর্যন্ত কমিয়ে দেয়া হল। এ অংশটুকুই ‘হিজর’ ‘হাতীম’ নামে প্রসিদ্ধ। এবার কুরাইশগণ ক্বাবা’হর দরজা ভূমি হতে বিশেষভাবে উঁচু করে দিলেন যেন এর মধ্য দিয়ে সেই ব্যক্তি প্রবেশ করতে পারে যাকে তাঁরা অনুমতি দেবেন। যখন দেয়ালগুলো পনের হাত উঁচু হল তখন গৃহের অভ্যন্তর ভাগে ছয়টি পিলার বা স্তম্ভ নির্মাণ করা হল এবং তার উপর ছাদ দেয়া হল। ক্বাবা’হ গৃহের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে একটি চতুর্ভূজের রূপ ধারণ করল। বর্তমানে ক্বাবা’হ গৃহের উচ্চতা হচ্ছে পনের মিটার। কৃষ্ণ প্রস্তর বিশিষ্ট দেয়াল এবং তার সামনের দেয়াল অর্থাৎঃ দক্ষিণ ও উত্তর দিকের দেয়াল হচ্ছে দশ দশ মিটার। কৃষ্ণ প্রস্তর মাতাফের জায়গা হতে দেড় মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। দরজা বিশিষ্ট দেয়াল এবং এর সাথে সামনের দেয়াল অর্থাৎ পূর্ব এবং পশ্চিম দিকের দেয়াল বার মিটার করে। দরজা রয়েছে মেঝে থেকে দু’মিটার উঁচুতে। দেয়ালের পাশেই চতুর্দিকে নীচু জায়গা এক বৃদ্ধিপ্রাপ্ত চেয়ার সমতুল্য অংশ দ্বারা পরিবেষ্টিত আছে যার উচ্চতা পঁচিশ সেন্টিমিটার এবং গড় প্রস্থ ত্রিশ সেন্টিমিটার। একে শাজে বওয়া (চলন্ত দুর্লভ) বলা হয়। এটাও হচ্ছে প্রকৃত পক্ষে বায়তুল্লাহর অংশ। কিন্তু কুরাইশগণ এটাও ছেড়ে দিয়েছিলেন।[1]
বিভিন্ন মানুষের জীবনের বিভিন্ন স্তরে ভিন্ন ভিন্নভাবে যে সকল সদগুণাবলির বিকাশ পরিলক্ষিত হয়ে থাকে সে সবগুলোর চরম উৎকর্ষ সাধন হয়েছিল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর অস্তিত্বের সবটুকু জুড়ে। তিনি ছিলেন চিন্তা-চেতনার যথার্থতা, পারদর্শিতা এবং ন্যায় পরায়ণতার এক জ্বলন্ত প্রতীক। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে প্রদান করা হয়েছিল সুষমামন্ডিত দেহ সৌষ্ঠব, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, যাবতীয় জ্ঞানের পরিপূর্ণতা এবং উদ্দেশ্য সাধনে সাফল্য লাভের নিশ্চয়তা। তিনি দীর্ঘ সময় যাবৎ নীরবতা অবলম্বনের মাধ্যমে নিরবছিন্ন ধ্যান ও অনুসন্ধান কাজে রত থাকতে এবং বিষয়ের খুঁটিনাটি সম্পর্কে সুদূর প্রসারী চিন্তা ভাবনার মাধ্যমে ন্যায় ও সত্যের উদঘাটন করতে সক্ষম হতেন। তিনি তাঁর সুতীক্ষ্ণ বুদ্ধি বিবেচনা এবং নির্ভুল নিরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার দ্বারা মানব সমাজের প্রকৃত অবস্থা, দল বা গোত্র সমূহের গতিবিধি ও মন-মানসিকতা, মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়গুলো অনুধাবনের মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হতেন। যার ফলে শত অন্যায়, অশ্লীলতা এবং অনাচার পরিবেষ্টিত সমাজে বসবাস করেও তিনি ছিলেন সবকিছুর উর্ধ্বে, সবকিছু থেকে মুক্ত ও পবিত্র। শরাবপায়ীদের সাথে বসবাস করেও কোনদিন তিনি শরাব স্পর্শ করেননি, দেবদেবীর আস্তানায় যবেহকৃত পশুর মাংস্ তিনি কখনো খাননি এবং মূর্তির নামে অনুষ্ঠি কোন প্রকার খেলাধূলায় তিনি কখনো অংশ গ্রহণ করেননি।
জীবনের প্রথমস্তর থেকেই তিনি তৎকালীন সমাজে প্রচলিত যাবতীয় মিথ্যা উপাস্যকে ঘৃণা করতেন এবং সে ঘৃণার মাত্রা এতই অধিক ছিল যে, তাঁর দৃষ্টিতে আর অন্য কোন জিনিস এত নিন্দনীয় ও অপছন্দনীয় ছিল না। এমনকি লাত ও উযযার নামে শপথ করার ব্যাপারটি তাঁর কানে গেলে তিনি তা সহ্য করতেই পারতেন না।[1]
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে আল্লাহর খাস রহমত, হেফাজত, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রত্যক্ষ পরিচালনাধীনে লালিত পালিত, পরিচালিত এবং নিয়ন্ত্রিত হয়েছেন সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। অতএব, যখনই পার্থিব কোন ফায়দা লাভের দিকে প্রবৃত্তি আকৃষ্ট বা আকর্ষিত হয়েছে অথবা অপছন্দনীয় কিংবা অনুসরণীয় রীতিনীতি অনুসরণের প্রতি আখলাক আকৃষ্ট হয়েছে তখন আল্লাহ তা‘আলার প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রন সেখানে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইবনে আসীরের একটি বর্ণনা সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘আইয়ামে জাহেলিয়াতের লোকেরা যে সকল কাজ করেছে দু’বার ছাড়া আর কখনো সে ব্যাপারে আমার খেয়াল জাগেনি। কিন্তু সে দু’বারের বেলায় আল্লাহ তা‘আলা আমার এবং সে কাজের মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। এর পর কখনো সে ব্যাপার সম্পর্কে আমার কোন খেয়াল জন্মে নি যে পর্যন্ত না আল্লাহ তা‘আলা আমাকে পয়গম্বরীর মর্যাদা প্রদান করেছেন।
এ ঘটনা ছিল, যে বালকের সঙ্গে আমি মক্কার উপরিভাগে ছাগল চরাতাম এক রাত্রে তাকে বললাম, ‘তুমি আমার ছাগলগুলো একটু দেখাশোনা করো, আমি মক্কায় যাই এবং সেখানে অন্যান্য যুবকগণের মতো যৌবন সংশিষ্ট আবৃত্তি অনুষ্ঠানে যোগদান করি।’
সে বলল, ‘ঠিক আছে। এর পর আমি বাহির হলাম এবং তখনো মক্কার প্রথম ঘরের নিকটেই ছিলাম এমন সময় কিছু বাদ্যযন্ত্রের শব্দ এসে কানে পৌঁছল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোথা থেকে বাদ্যযন্ত্রের এ শব্দ ভেসে আসছে?’
লোকেরা বলল, ‘অমুকের বিবাহ হচ্ছে, তারই বাজনা বাজছে’’। আমি সেই যন্ত্র সঙ্গীত শ্রবণের জন্য সেখানে বসে পড়লাম। অমনি আল্লাহ তা‘আলার নিয়ন্ত্রণ আমার শ্রবণ শক্তির উপর আরোপিত হল। তিনি আমার কর্ণের কাজ বন্ধ করে দিলেন এবং আমি সেখানে শুয়ে পড়লাম। তারপর সূর্যের তাপে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। তার পর আমি আমার সে বন্ধুর নিকট চলে গেলাম এবং তার জিজ্ঞাসার জবাবে ঘটনাটি তার নিকট বিস্তারিত বর্ণনা করলাম। এর পর আবার এক রাত্রি আমার বন্ধুর নিকট বসেছিলাম এবং মক্কায় পৌঁছে তদ্রুপ ঘটনার সম্মুখীন হলাম। তদন্তর আর কখনো অনুরূপ ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করি নি।[2]
সহীহুল বুখারীতে জাবির বিন আব্দুল্লাহ কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে যে, যখন ক্বাবা’হ গৃহের নিমার্ণ কাজ চলছিল তখন নাবী কারীম (ﷺ) এবং আব্বাস (রাঃ) প্রস্তর বহন করে আনছিলেন। আব্বাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বললেন, ‘স্বীয় লুঙ্গি আপন কাঁধে রাখ তাহলে প্রস্তর বহন জনিত যন্ত্রণা থেকে মুক্ত থাকবে। কিন্তু তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন। তাঁর দৃষ্টি আকাশের দিকে উঠে গেল এবং তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। জ্ঞান ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে তিনি চিৎকার করতে লাগলেন, ‘আমার লুঙ্গি, আমার লুঙ্গি’’। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর লুঙ্গি বেঁধে দেয়া হল। অন্য বর্ণনা সূত্রে জানা যায় যে, এরপর তাঁর লজ্জাস্থান আর কোন দিনই দেখা যায় নি।[3]
নাবী কারীম (ﷺ)-এর কাজকর্ম ছিল সব চাইতে আকর্ষণীয়, চরিত্র ছিল সর্বোত্তম এবং মহানুভবতা ছিল সর্বযুগের সকলের জন্য অনুসরণ ও অনুকরণযোগ্য। তিনি ছিলেন সর্বাধিক শিষ্টাচারী, নম্র-ভদ্র, সদালাপী ও সদাচারী। তিনি ছিলেন সব চাইতে দয়াদ্র চিত্ত, দূরদর্শী, সূক্ষ্ণদর্শী ও সত্যবাদী। মিথ্যা কখনো তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। তাঁর সত্যবাদিতার জন্য তিনি এতই প্রসিদ্ধ এবং প্রশংসনীয় ছিলেন যে আরববাসীগণ সকলেই তাঁকে ‘আল-আমীন’ বলে আহবান জানাতেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ছিলেন আরববাসীগণের মধ্যে সব চাইতে নির্ভরযোগ্য আমানতদার। খাদীজাহ (রাঃ) সাক্ষ্য দিতেন যে, ‘তিনি অভাবগ্রস্তদের বোঝা বহন করতেন, নিঃস্ব ও অসহায়দের জন্য যথোপযুক্ত ব্যবস্থা অবলম্বন করতেন। ন্যায্য দাবীদারদের তিনি সহায়তা করতেন এবং অতিথি পরায়ণতার জন্য মশহুর ছিলেন।[4]
[2] হাদীসটি হাকিম ও যাহাবী বিশুদ্ধ বলেছেন। কিন্তু ইবনে কাসীর আল বেদায়া ও নেহায়া গ্রন্থে ২য় খন্ড ২৮৭ পৃঃ একে দুর্বল বলেছেন।
[3] সহীহুল বুখারী ক্বা‘বা নির্মাণ অধ্যায় ১ম খন্ড ৫৪০ পৃঃ।
[4] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৩ পৃষ্ঠা।
আলোচনা ও অনুধাবনের সুবিধার্থে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পয়গম্বরী জীবন কালকে আমরা দুইটি অংশে বিভক্ত করে নিয়ে আলোচনা করতে পারি। কাজকর্মের ধারা প্রক্রিয়া এবং সাফল্য। সাফল্যের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে দেখা যাবে যে এর এক অংশ থেকে ছিল ভিন্নধর্মী এবং ভিন্নতর বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যময়। অংশ দুটি হচ্ছে যথাক্রমেঃ
১. মক্কায় অবস্থান কাল প্রায় তের বছর
২. মদীনায় অবস্থান কাল দশ বছর
তারপর মক্কী ও মাদীনী উভয় জীবনকাল বৈশিষ্ট্য ও কর্ম প্রক্রিয়ার ব্যাপারে ছিল স্তর ক্রমিক এবং ভিন্নধর্মী। তাঁর পয়গম্বরী জীবনের উভয় অংশ পর্যালোচনা এবং পরীক্ষণ করলে অনুক্রমিক স্তরগুলো সমীক্ষা করে দেখা বহুলাংশে সহজতর হয়ে উঠবে।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মক্কাবস্থান কাল এবং কর্মপ্রক্রিয়াকে তিনটি আনুক্রমিক স্তরে বিভক্ত করে নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। সেগুলো হচ্ছে:
১. সর্ব সাধারণের অবগতির অন্তরালে গোপন দাওয়াতী কর্মকান্ডের স্তর (তিন বছর)।
২. মক্কাবাসীগণের নিকট প্রকাশ্য দাওয়াত ও তাবলীগী কাজের স্তর (৪র্থ বছর থেকে ১০ম বছরের শেষ নাগাদ)।
৩. মক্কার বাইরে ইসলামের দাওয়াত গ্রহণ ও বিস্তৃতির স্তর (১০ম নুবুওয়াতী বর্ষের শেষ ভাগ হতে হিজরত পর্যন্ত।।
মদীনার জীবন এবং মদীনায় অবস্থান কালের স্তর অনুযায়ী বিস্তৃত আলোচনা যথাক্রমে সন্নিবেশিত হবে।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন চল্লিশে পদার্পণ করলেন, ঐ সময় তাঁর এত দিনের বিচার বিবেচনা, বুদ্ধিমত্তা ও চিন্তা-ভাবনা যা জনগণ এবং তাঁর মধ্যে ব্যবধানের এক প্রাচীর সৃষ্টি করে চলেছিল তা উন্মুক্ত হয়ে গেল এবং ক্রমান্বয়ে তিনি নির্জনতা প্রিয় হয়ে উঠতে থাকলেন। খাবার এবং পানি সঙ্গে নিয়ে মক্কা নগরী হতে দু’মাইল দূরত্বে অবস্থিত হেরা পর্বত গুহায় গিয়ে ধ্যানমগ্ন থাকতে লাগলেন। এটা হচ্ছে ক্ষুদ্র আকার-আয়তনের একটি গুহা। এর দৈর্ঘ্য হচ্ছে চার গজ এবং প্রস্থ পৌনে দু’গজ। এর নীচ দিকটা তেমন গভীর ছিল না। একটি ছোট্ট পথের প্রান্তভাগে অবস্থিত পর্বতের উপরি অংশের একত্রে মিলে মিশে ঠিক এমন একটি আকার আকৃতি ধারণ করেছিল যা শোভাযাত্রার পুরোভাগে অবস্থিত আরোহী শূন্য সুসজ্জিত অশ্বের মতো দেখায়।
পুরো রমাযান রাসূলুল্লাহ (ষাঃ) হেরা গুনায় অবস্থান করে আল্লাহ তা’আলার ইবাদাত বন্দেগীতে লিপ্ত থাকেন। বিশ্বের দৃশ্যমান বস্তুনিচয়ের অন্তরাল থেকে যে মহাশক্তি প্রতিটি মুহুর্তে সকল কিছুকে জীবন, জীবিকা ও শক্তি জাগিয়ে চলেছেন, সেই মহা মহীয়ান ও গরীয়ান সত্ত্বার ধ্যানে মশগুল থাকতেন। স্বগোত্রীয় লোকদের অর্থহীন বহুত্ববাদী বিশ্বাস ও পৌত্তলিক ধ্যান-ধারণা তাঁর অন্তরে দারুন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করত। কিন্তু তাঁর সামনে এমন কোন পথ খোলা ছিল না যে পথ ধরে তিনি শান্তি ও স্বস্তির সঙ্গে পদচারণা করতে সক্ষম হতেন।[1]
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নির্জন-প্রিয়তা ছিল প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা‘আলার ব্যবস্থাপনার একটি অংশ।
এভাবে আল্লাহ তা‘আলা ভবিষ্যতের এক মহতী কর্মসূচীর জন্য তাঁকে প্রস্তুত করে নিচ্ছিলেন। যে আত্মার নসীবে নবুয়তরূপী এক মহান আসমানী নেয়ামত নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে এবং যিনি পথভ্রষ্ট ও অধঃপতিত মানুষকে সঠিকপথ নির্দেশনা দিয়ে করবেন ধন্য তাঁর জন্য যথার্থই প্রয়োজন সমাজ জীবনের যাবতীয় ব্যস্ততা, জীবন যাত্রা নির্বাহের যাবতীয় ঝামেলা এবং সমস্যা থেকে মুক্ত থেকে নির্জনতা অবলম্বনের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য লাভ করা। আল্লাহ তা‘আলা যখন মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে বিশ্বব্যবস্থায় সব চাইতে মর্যাদাশীল ও দায়িত্বশীল-আমানতদার মনোনীত করে তাঁর কাঁধে দায়িত্বভার অর্পণের মাধ্যমে বিশ্বমানবের জীবন বিধানের রূপরেখা পরিবর্তন এবং অর্থহীন আদর্শের জঞ্জাল সরিয়ে শাশ্বত আদর্শের আঙ্গিকে ইতিহাসের পরিমার্জিত ধারা প্রবর্তন করতে চাইলেন, তখন নবুয়ত প্রদানের প্রাককালে তাঁর জন্য একমাসব্যাপী নির্জনতা অবলম্বন অপরিহার্য করে দিলেন যাতে তিনি গভীর ধ্যানের সূত্র ধরে দিব্যজ্ঞান লাভের পথে অগ্রসর হতে সক্ষম হন। নির্জন হেরা গুহার সেই ধ্যানমগ্ন অবস্থায় তিনি বিশ্বের আধ্যাত্মিক জগতে পরিভ্রমণ করতেন এবং সকল অস্তিত্বের অন্তরালে লুক্কায়িত অদৃশ্য রহস্য সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা ও গবেষণা করতেন যাতে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে নির্দেশ আসা মাত্রই তিনি বাস্তবায়নের ব্যাপারে ব্রতী হতে পারেন।[2]
[2] ফী যিলালিল কুরআন: পারা ২৯, পৃষ্ঠা ১৬৬-১৬৭।
নাবী কারীম (ﷺ)-এর বয়সের ৪০তম বছর যখন পূর্ণ হল- এটাই হচ্ছে মানুষের পূর্ণত্ব প্রাপ্তির বয়স এবং বলা হয়েছে যে, এ বয়স হচ্ছে পয়গম্বরগণের নবুয়ত প্রাপ্তির উপযুক্ত বয়স-তখন নবুওয়তের কিছু স্পষ্ট লক্ষণ প্রকাশ হতে লাগল। সে লক্ষণগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে স্বপ্নের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছিল। তিনি যখনই কোন স্বপ্ন দেখতেন তা প্রতীয়মান হতো সুবহে সাদেকের মত। এ অবস্থার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হল ছয়টি মাস যা ছিল নবুওয়তের সময় সীমার ছয়চল্লিশতম অংশ এবং নবুওয়তের সময়সীমা ছিল তেইশ বছর। এরপর তিনি যখন হেরাগুহায় নিরবচ্ছিন্ন ধ্যানে নিমগ্ন থাকতেন এবং এভাবে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এবং বছরের পর বছর অতিবাহিত হতে হতে তৃতীয় বর্ষ অতিবাহিত হতে থাকল তখন আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবীর মানুষের উপর স্বীয় রহমত বর্ষণের ইচ্ছা করলেন। তারপর আল্লাহ রাববুল আলামীন জিবরাঈল (আঃ)-এর মাধ্যমে তাঁর কুরআনুল কারীমের কয়েকটি আয়াতে করীমা নাযিল করে মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে নবুওয়তের মহান মর্যাদা প্রদানে ভূষিত করেন।[1]
বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত প্রমাণাদি গভীরভাবে অনুধাবন করলেই জিবরাঈল (আঃ)’র আগমনের প্রকৃত দিন তারিখ ও সময় অবগত হওয়া সম্ভব হবে। আমাদের সন্ধানের ভিত্তিতে বলা যায় যে, এ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল রমাযান মাসে ২১ তারিখ মঙ্গলবার দিবাগত রাত্রে। খ্রীষ্টিয় হিসাব অনুযায়ী দিনটি ছিল ৬১০ খ্রীষ্টাব্দের ১০ই আগষ্ট। চান্দ্রমাসের হিসাব অনুযায়ী নাবী কারীম (ﷺ)-এর বয়স ছিল চল্লিশ বছর ছয় মাস বার দিন এব সৌর হিসাব অনুযায়ী ছিল ৩৯ বছর ৩ মাস ২০ দিন।[2]
আসুন, এখন আমরা উম্মুল মুমিনীন আয়িশাহ (রাঃ)-এর বর্ণনা থেকে বিস্তারিত বিবরণ জেনে নেই। এটা নৈসর্গিক নূর বা আসমানী দীপ্তির মতো এমন এক আলোক রশ্নি ছিল যা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে অবিশ্বাস ও ভ্রষ্টতার অন্ধকার বিদূরিত হতে থাকে, জীবনের গতিধারা পরিবর্তিত হতে থাকে এবং ইতিহাসের পট পরিবর্তিত হয়ে নতুন নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি হতে থাকে। আয়িশাহ (রাঃ) বলেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট ওহী অবতীর্ণ হয়েছিল ঘুমের অবস্থায় স্বপ্নযোগে, তিনি যখন যে স্বপ্নই দেখতেন তা প্রভাত রশ্মির মতো প্রকাশিত হতো। তারপর ক্রমান্বয়ে তিনি নির্জনতা প্রিয় হতে থাকলেন। নিরবাচ্ছিন্ন নির্জনতায় ধ্যানমগ্ন থাকার সুবিধার্থে তিনি হিরা গুহায় অবস্থান করতেন। কোন কোন সময় গৃহে প্রত্যাবর্তণ না করে রাতের পর রাত তিনি এবাদত বন্দেগী এবং গভীর ধ্যানে নিমগ্ন থাকতেন। এ জন্য খাদ্য এবং পানীয় সঙ্গে নিয়ে যেতেন। সে সব ফুরিয়ে গেলে পুণরায় তিনি গৃহে প্রত্যাবর্তন করতেন।
পূর্বের মতো খাদ্য এবং পানীয় সঙ্গে নিয়ে পুনরায় তিনি হেরা গুহায় গিয়ে ধ্যান মগ্ন হতেন। ওহী নাযিলের মাধ্যমে তাঁর নিকট সত্য প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত এভাবেই তিনি হেরাগুহার নির্জনতায় অবস্থান করতে থাকেন।
এমনভাবে একদিন তিনি যখন ধ্যানমগ্ন অবস্থায় ছিলেন তখন আল্লাহর দূত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর নিকট আগমন করে বললেন, ‘তুমি পড়’’। তিনি বললেন, ‘পড়ার অভ্যাস আমার নেই।’ তারপর তিনি তাঁকে অত্যন্ত শক্তভাবে ধরে আলিঙ্গন করলেন এবং ছেড়ে দিয়ে বললেন, ‘তুমি পড়’’। তিনি আবারও বললেন, ‘আমার পড়ার অভ্যাস নেই’’। তারপর তৃতীয় দফায় আমাকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করার পর ছেড়ে দিয়ে বললেন ‘পড়-
(اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ) [العلق:1: 3])
অর্থঃ সেই প্রভুর নামে পড় যিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে রক্ত পিন্ড থেকে। পড় সেই প্রভূর নামে যিনি তোমাদের জন্য অধিকতর দয়ালু।’’[3]
তারপর ওহীর আয়াতগুলো অন্তরে ধারণ করে নাবী কারীম (ﷺ) কিছুটা অস্থির ও স্পন্দিত চিত্তে খাদীজাহ বিনতে খোওয়ালেদের নিকট প্রত্যাবর্তন করলেন এবং বললেন, ‘আমাকে বস্ত্রাবৃত করো, আমাকে বস্ত্রাবৃত করো।’ খাদীজাহ (রাঃ) তাঁকে শায়িত অবস্থায় বস্ত্রাবৃত করলেন। এভাবে কিছুক্ষণ থাকার পর তাঁর অস্থিরতা ও চিত্ত স্পন্দন প্রশমিত হলে তিনি তাঁর সহধর্মিনীকে হেরা গুহার ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করলেন। তাঁর অস্থিরতা ও চিত্ত চাঞ্চল্যের ভাব লক্ষ্য করে খাদীজাহ (রাঃ) তাঁকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘কোন ভয় করবেন না, আপনি ধৈর্য ধরুন। আল্লাহ কখনো আপনাকে অপমান করবেন না। আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে আপনি সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলেন। অভাবগ্রস্তদের অভাব মোচনের চেষ্টা করেন। অসহায়দের আশ্রয় প্রদান করেন। মেহমানদের আদর-যত্ন করেন, অতিথিদের আতিথেয়তা প্রদান করেন এবং ঋণগ্রস্তদের ঋণের দায় মোচনে সাহায্য করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ আপনাকে অপদস্থ করবেন না।’
এরপর খাদীজাহ (রাঃ) তাঁকে স্বীয় চাচাত ভাই ওয়ারাকা বিন নাওফাল বিন আসাদ বিন আব্দুল উযযার নিকট নিয়ে গেলেন। জাহেলিয়াত আমলে অরকা খ্রীষ্টান ধর্ম অবলম্বন করেছিলেন এবং ইবরাণী ভাষা পড়তে ও লিখতে শিখেছিলেন। এক সময় তিনি ইবরাণী ভাষায় কিতাব লেখতেন। কিন্তু যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে সে সময় তিনি অত্যন্ত বৃদ্ধ এবং অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। খাদীজাহ (রাঃ) তাঁকে বললেন, ‘ভাইজান, আপনি আপনার ভাতিজার কথা শুনুন। তিনি কী যেন সব কথাবার্তা বলছেন এবং অস্থির হয়ে পড়ছেন।’
অরাকা বললেন, ‘ভাতিজা, বলতো তুমি কী দেখেছ? কী হয়েছে তোমার?
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যা কিছু প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং হিরাগুহায় যেভাবে যা ঘটেছিল সব কিছু সবিস্তারে বর্ণনা করলেন অরাকার নিকট।
আনুপূর্বিক সব কিছু শ্রবণের পর বিস্ময়-বিহবল কণ্ঠে অরাকা বলে উঠলেন, ‘ইনিই তো সেই মানুষ যিনি মুসা (আঃ)-এর নিকটেও আগমন করেছিলেন।’[4]
তারপর বলতে থাকলেন, ‘হায়! হায়! যেদিন আপনার স্বজাতি এবং স্বগোত্রীয় লোকেরা আপনার উপর নানাভাবে জুলম অত্যাচার করবে এবং আপনাকে দেশ থেকে বহিস্কার করবে সেদিন যদি আমি শক্তিমান এবং জীবিত থাকতাম।’
অরাকার মুখ থেকে এ কথা শ্রবণের পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘একী! ওরা আমাকে দেশ থেকে বহিস্কার করবে?’
ওয়ারাকা বললেন, ‘হ্যাঁ, তারা অবশ্যই আপনাকে দেশ থেকে বহিস্কার করবে।’ তিনি আরও বললেন ‘শুধু আপনার কথাই নয়, অতীতে এ রকম বহু ঘটনা ঘটেছে। যখনই জনসমাজে সত্যের বার্তা বাহক কোন সাধক পুরুষের আবির্ভাব ঘটেছে তখনই তার স্বাগোত্রীয় লোকেরা নানাভাবে তার উপর জুলম, নির্যাতন চালিয়েছে এবং তাঁকে দেশ থেকে বহিস্কার করেছে।’ তিনি আরও বললেন, ‘মনে রাখুন আমি যদি সেই সময় পর্যন্ত জীবিত থাকি তাহলে সর্ব প্রকারে আপনাকে সাহায্য করব।’ কিন্তু এর অল্পকাল পরেই ওরাকা মৃত্যু মুখে পতিত হন। এ দিকে ওহী আসাও সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।[5]
[2] ওহী নাজিল শুরুর মাস দিন এবং তারিখঃ নাবী কারীম (সাঃ)-এর ওহী প্রাপ্তি এবং নবুওয়ত লাভের মহান মর্যাদায় ভূষিত হওয়ার মাস ও দিন তারিখ সম্পর্কে ইতিহাসবিদগণের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। অধিক সংখ্যক চরিতকারগণ এ ব্যাপারে অভিন্ন মত পোষণ করে থাকেন যে মাসটি ছিল রবিউল আওয়াল। কিন্তু অন্য এক দল বলেন যে, মাসটি ছিল রমাযানুল মুবারক। কেউ কেউ আবার এ কথাও বলে থাকেন যে মাসটি ছিল রজব। (দ্রষ্টব্য- শাইখ আবদুল্লাহ রচিত মুখতাসারুস ‘সীরাহ’ পৃষ্ঠা ৭৫) দ্বিতীয় দলের মতটি অধিকতর গ্রহণযোগ্য বলে আমাদের মনে হয়, অর্থাৎ যাঁরা বলেন যে, এটা রমাযান মাসে অবতীর্ণ হয়েছিল তাঁদের মত কারণ, আল্লাহ পাক কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেছেনঃ
{شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ} ( البقرة : ১৮৫) {إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ} (القدر : ১)
দ্বিতীয় মতটি গ্রহণযোগ্য হওয়ার আরও একটি কারণ হচ্ছে নাবী কারীম (সাঃ) রমাযান মাসেই হেরা গুহায় অবস্থান করতেন এবং এটাও জানা যায় যে, জিবরাঈল (আঃ) সেখানে আগমন করতেন, অধিকমুত যাঁরা রমাযান মাসে ওহী অবতীর্ণ হওয়ার কথা বলেছেন কোন তারীখে তা অবতীর্ণ হয়েছিল সে ব্যাপারেও বিভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন রমাযান মাসের ৭ তারীখে, কেউ বলেছেন ১৭ তারীখে, কেউ বা আবার বলেছেন ১৮ তারীখে তা অবতীর্ণ হয়েছিল (দ্রষ্টব্য- মুখতাসারুস সীরাহ ৭৫ পৃঃ, রাহমাতুল্লিল আলামীন ১ম খন্ড ৪৯ পৃঃ) আল্লামা খুযরী অত্যন্ত জোরের সঙ্গে বলেছেন যে, তারীখটি ছিল ১৭ই রমাযান (দৃষ্টব্য- তারীখে খুযরী ১ম খন্ড ৬৯ পৃঃ এবং তারীকুত্তাশরীউল ইসলামী ৫-৭ পৃঃ)।
আমার মতে ২১শে রমাযান এ জন্য গ্রহণযোগ্য যে, যদিও এটার স্বপক্ষে কেউ নাই, তবুও অধিক সংখ্যক চরিতকার এ ব্যাপারে এক মত হয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নবুওয়ত প্রাপ্তির দিনটি ছিল সোমবার। এ সমর্থন পাওয়া যায় আবূ কাতাদাহর সেই বর্ণনা থেকে, যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট সোমবারের রোযা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল, তিনি উত্তর দিয়েছিলেন যে, ‘এ হচ্ছে সেই দিন যেদিন আমি ভূমিষ্ট হয়েছিলাম এবং আমার নিকট ওহী নাযিল করে আমাকে নুবুওয়াত প্রদান করা হয়েছিল।’’(সহীহুল মুসলিম শরীফ ১ম খন্ড ৩৬৮ পৃঃ, মুসনদে আহমাদ ২৯৭ পৃঃ, বায়হাকী ৪র্থ খন্ড ২৮৬ ও ৩০০ পৃঃ, হাকিম ২য় খন্ড ২৬৬ পৃঃ)। সেই রমাযান মাসে সোমবার হয়েছিল ৭, ১৪, ২১ ও ২৮ তারীখগুলোতে। এ দিকে সহীহুল হাদীস সূত্রে এটা প্রমাণিত ও স্বীকৃত হয়েছে যে, পবিত্র কদর রাত্রি রমাযান মাসের শেষ দশ দিনের মধ্যে বিজোড় রাত্রিগুলোকেই ধরা হয়ে থাকে।
এখন আমরা এক দিকে কুরআন কারীম থেকে অবগত হচ্ছি যে, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, {إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ} (القدر : ১) তাছাড়া, আবূ কাতাদার বর্ণিত হাদীস সূত্রে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সোমবার দিবস নবুওয়ত প্রাপ্ত হয়েছিলেন। তৃতীয় সূত্রে পঞ্জিকার হিসেবে জানা যায়, ঐ বছর রমাযান মাসে কোন্ কোন্ তারীখ সোমবার ছিল। অতএব নির্দিষ্টভাবে জানা যায় যে, নাবী কারীম (সাঃ) নবুওয়তপ্রাপ্ত হয়েছিলেন ২১শে রমাযানের রাত্রিতে। সুতরাং এটা ছিল ওহী অবতীর্ণ হওয়ার প্রথম তারিখ।
[3] {عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ} পর্যন্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়।
[4] তাবারী ২য় খন্ড ২০৭ পৃঃ। ইবনে হিশাম ১ম খন্ড ২৩৭-২৩৮ পৃঃ। শেষে কিছুটা অংশ সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। এ বর্ণনার বৈধতা নিয়ে আমার মনে কিছুটা দ্বিধা আছে। সহীহুল বুখারীর বর্ণনাভঙ্গী এবং তার বিভিন্ন বর্ণনার সমন্বয় সাধনের পর আমি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর মক্কাভিমুখে প্রত্যাবর্তন এবং অরাকার সাথে সাক্ষাৎ ওহী অবতীর্ণ হওয়ার পর সেদিনই ঘটে ছিল। অবশিষ্ট হেরাগুহার অবস্থান তিনি মক্কা হতে ফিরে গিয়ে পূর্ণ করেছিলেন।
[5] সহীহুল বুখারী- ওহী নাযিলের বিবরণ অধ্যায় ১ম খন্ড ২ ও ৪৩ পৃষ্ঠা। শব্দের কিছু কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে সহীহুল বুখারী কেতাবুত তাফসীর এবং তা‘বিরুর রুইয়া পর্বেও বর্ণিত হয়েছে।
কত দিন যাবৎ ওহী বন্ধ ছিল সেই ব্যাপারে ইতিহাসবেত্তাগণ কয়েকটি মতামত পেশ করেছেন। সেগুলোর মধ্যে সঠিক কথা হলো ওহী বন্ধ ছিল মাত্র কয়েকদিন। কতদিন যাবৎ ওহী বন্ধ ছিল সে ব্যাপারে ইবনে সা‘দ ইবনে আব্বাস হতে একটি উদ্ধৃতি বর্ণনা করেছেন যা এ দাবীর পৃষ্ঠপোষকতা করে। কোন কোন সূত্রে এ কথাটি প্রচারিত হয়ে এসেছে যে, আড়াই কিংবা তিন বছর যাবৎ ওহী অবতীর্ণ বন্ধ ছিল; কিন্তু তা সঠিক নয়।
এ বিষয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা এবং এতদসম্পর্কিত বর্ণনা ও বিজ্ঞজনের মতামতসমূহের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাতের ফলে আমার নিকট একটি কিছু অপ্রচলিত বিষয় প্রকাশিত হয়েছে এবং বিজ্ঞজনের মধ্যে এ বিষয়ে দ্বিমত প্রত্যক্ষ করা যায় না তা হলো :
নবুওয়াতের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হেরা গুহায় কেবলমাত্র একমাস ধরে নির্জনে কাটাতেন; আর সেটি হলো প্রত্যেক বছরের রামাযান মাস। নবুওয়াতের বছর ছিল এ তিন বছরের শেষ বছর। এই রামাযানের পুরো মাস অবস্থানের শেষে শাওয়াল মাসের প্রথম সকালে বিশ্বজাহানের নাবী শেষ নাবী ওহী লাভে ধন্য হয়ে বাড়িতে ফিরে আসেন।
তাছাড়া বুখারী, মুসলিমের বর্ণনা হতে জানা যায় যে, ওহী বন্ধ হওয়ার পর দ্বিতীয় বার ওহী অবতীর্ণ হয় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন নির্জনে পুরো মাস অবস্থানের পর ফিরে আসছিলেন সে সময়।
আমি (সফিউর রহমান) বলছিঃ এ হাদীস সাক্ষ্য দেয় যে, ওহী বন্ধ হওয়ার পর দ্বিতীয়বার ওহী অবতীর্ণ হয় সেই দিন যেদিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে রামাযান মাসে ওহীপ্রাপ্ত হন সেই মাসের শেষ হওয়ার পর শাওয়াল মাসের প্রথম দিন। কেননা এটাই ছিল হেরা গুহায় তার শেষ অবস্থান। আর যখন এটা প্রমাণিত হলো যে, তাঁর নিকট প্রথম ওহী অবতীর্ণ হয়েছিল ২১ রামাযানে তখন এটা নিশ্চিতরূপেই অবধারিত হয়ে গেল যে, ওহী বন্ধ থাকার সময়কাল ছিল মাত্র ১০ দিন। অতঃপর নবুওয়াতের প্রথম বছর শাওয়াল মাসের প্রথম দিবস শুক্রবার সকালে পুনরায় ওহী অবতীর্ণ হয়। হতে পারে এর রহস্য হচ্ছে রামাযানের শেস দশ দিন নির্জনে অবস্থান এবং ইতিকাফ পূর্ণকরণ এবং শাওয়ালের প্রথম দিবসকে উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য ঈদের দিন হিসেবে বিশেষত্ব দান। আল্লাহ অধীক জ্ঞাত।
ওহী বন্ধ থাকার সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অত্যন্ত চিন্তিত এবং বিচলিত বোধ করতেন। সহীহুল বুখারী শরীফের তাবীর (স্বপ্নের ব্যাখ্যা) পর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, ওহী বন্ধ হয়ে গেলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এতই বিচলিত ও বিব্রতবোধ করতেন এবং তাঁর দুশ্চিন্তা ও অস্বস্তিবোধ এতই অধিক বৃদ্ধি পেত যে, পর্বত শিখর হতে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুবরণ করার জন্য তিনি মনস্থির করে ফেলতেন। কিন্তু এ উদ্দেশ্যে যখনই তিনি পর্বত শীর্ষে আরোহণ করেছেন তখন জিবরাঈল (আঃ) তাঁর দৃষ্টিগোচর হয়েছেন। জিবরাঈল (আঃ) তাঁকে লক্ষ্য করে বলেছেন, ‘হে মুহাম্মাদ (ﷺ) আপনি আল্লাহর সত্যনবী।’ এতদশ্রবণে তাঁর প্রাণের অস্বস্তি ভাব স্তিমিত হয়ে আসত, মনে লাভ করতেন অনাবিল শান্তি, তারপর ফিরে আসতেন গৃহে। আবারও কোন সময় কিছু বেশীদিনের জন্য ওহী বন্ধ থাকলে একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি হতো।[1]
হাফেয ইবনে হাজার বলেন যে, নাবী (ﷺ) -এর উপর প্রথম ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় তিনি কিছুটা ভয়-ভীতির সঙ্গে বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়েন। তাঁর মানসিকতার ক্ষেত্রে কিছুটা বিহবলতার ভাবও পরিলক্ষিত হতে থাকে। এ প্রেক্ষিতেই আল্লাহ রাববুল আলামীন কিছুদিন ওহী নাযিল বন্ধ রাখেন, যাতে তিনি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ লাভ করেন।[1] ঠিক তাই হলো, নাবী কারীম (ﷺ) প্রথম ওহী নাযিলের অসুবিধা থেকে মুক্ত হয়ে যখন মন মানসিকতার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক হয়ে উঠলেন, তখন তাঁর এ ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গেল যে, তিনি আল্লাহর বার্তা বাহক বা রাসূল মনোনীত হয়েছেন। এবং তাঁর নিকট যিনি ওহী নিয়ে আগমন করেছিলেন তিনি হচ্ছেন আসমানী দূত বা ওহীবাহক। এভাবে রহস্যাবৃত ব্যাপারটি যখন তাঁর নিকট পরিস্কার হয়ে গেল তখনই তিনি পরবর্তী ওহীর জন্য উন্মুখ হয়ে উঠলেন। ওহী গ্রহণের জন্য মানসিকভাবে যখন প্রস্তুত হয়ে গেলেন, তখন জিবরাঈল (আঃ) পুনরায় ওহী নিয়ে আগমন করলেন। সহীহুল বুখারীর মধ্যে জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট থেকে ওহী নিয়ে আগমন বন্ধের ঘটনা শ্রবণ করেন। ঘটনার বর্ণনা প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,
(جَاوَرْتُ بِحِرَاءٍ شَهْرًا فَلَمَّا قَضَيْتُ جَوَارِىْ هَبَطْتُّ [فَلَمَّا اِسْتَبْطَنْتُ الْوَادِيَ] فَنُوْدِيْتُ، فَنَظَرْتُ عَنْ يَّمِيْنِيْ فَلَمْ أَرَ شَيْئًا، وَنَظَرْتُ عَنْ شِمَالِيْ فَلَمْ أَرَ شَيْئًا، وَنَظَرْتُ أَمَامِيْ فَلَمْ أَرَ شَيْئًا، وَنَظَرْتُ خَلْفِيْ فَلَمْ أَرَ شَيْئًا، فَرَفَعْتُ رَأْسِىْ فَرَأَيْتُ شَيْئًا، [فَإِذَا الْمَلَكُ الَّذِيْ جَاءَنِيْ بِحِرَاءٍ جَالِسٌ عَلٰى كُرْسِيٍّ بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ، فَجُئِثْتُ مِنْهُ رُعْبًا حَتّٰى هَوِيْتُ إِلَى الْأَرْضِ] فَأَتَيْتُ خَدِيْجَةَ فَقُلْتُ: [زَمِّلُوْنِيْ، زَمِّلُوْنِيْ]، دَثِّرُوْنِىْ، وَصُبُّوْا عَلَىَّ مَاءً بَارِدًا)، قَالَ : (فَدَثَّرُوْنِىْ وَصَبُّوْا عَلَىَّ مَاءً بَارِدًا، فَنَزَلَتْ : (يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ قُمْ فَأَنذِرْ وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ) [المدثر: 1: 5])
‘‘আমি পথ ধরে চলছিলাম এমন সময় হঠাৎ আকাশ থেকে একটি আওয়াজ আমার শ্রুতিগোচর হল। আকাশের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই আমি সেই ফিরিশতাকে দেখতে পেলাম যিনি আমার নিকট হেরা গুহায় আগমন করেছিলেন। তিনি আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যস্থানে কুরশীতে উপবিষ্ট ছিলেন। ভয়ে বিস্ময়ে আমার দৃষ্টি অবনত হয়ে এল। তারপর আমার সহধর্মিণীর নিকট এসে বললাম, ‘আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও।’ তিনি আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দিলেন। তারপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘ওহে বস্ত্র আবৃত (ব্যক্তি)! ২. ওঠ, সতর্ক কর। ৩. আর তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর। ৪. তোমার পোশাক পরিচ্ছদ পবিত্র রাখ। ৫. (যাবতীয়) অপবিত্রতা থেকে দূরে থাক। [মুদ্দাসসির (৭৪) : ১-৫] পর্যন্ত ওহী অবতীর্ণ করেন এরপর থেকে অবিরামভাবে ওহী অবতীর্ণ হতে থাকে।[2]
এ ক'টি আয়াত নবুওয়াতের প্রাথমিক অবস্থায় ওহী বন্ধ হওয়ার কয়েকদিন পর অবতীর্ণ হয়। তার উপর দায়িত্ব অর্পনের দুটি স্তর রয়েছে যা ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করা হলো-
প্রথমত : রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উপর নবুওয়াতের প্রচার ও ভীতি প্রদর্শনের দায়িত্ব অর্পন।
এ মর্মে আল্লাহর বাণী : (قُمْ فَأَنذِرْ) অর্থাৎ মানবমণ্ডলী অজ্ঞতা, পাপাচার, পথভ্রষ্টতা, মহান আল্লাহর ব্যতীত বাতিল উপাস্যের ইবাদত করা, তাঁর সত্ত্বা, গুণাবলী, তাঁর হক ও কর্মসমূহের সাথে শিরক বা অংশীস্থাপন করা থেকে যদি বিরত না হয় তবে তাদেরকে আল্লাহর কঠিন আযাব সম্পর্কে ভীতি প্রদর্শন করো।
দ্বিতীয়ত ; রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উপর আল্লাহর নির্দেশিত বিষয়সমূহের সাথে তার সত্ত্বার সমন্বয় সাধন করা এবং তার উপর স্বয়ং অটল থাকা। ঐসব বিষয়কে কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই সযত্নে সংরক্ষণ করা। আর যারা আল্লাহ তা’আলার উপর বিশ্বাস স্থাপর করবে তাদের জন্য একটি উত্তম আদর্শ বনে যাওয়া। যথা পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করছেন, (وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ) অর্থাৎ একনিষ্ঠভাবে তার বড়ত্ব ঘোষণা করে এবং তার সাথে আর কাউকে শরীক করো না। এরপর আল্লাহ তা’আলা বলেন, (وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ) এর বাহ্যিক অর্থ : শরীর ও কাপড়-চোপড়ের পবিত্রতা অর্জন। কেননা যে ব্যক্তি আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হবে তার জন্য এটা শোভনীয় নয় যে, সে অপবিত্র ও নোংরা অবস্থায় দণ্ডায়মান হবে। আর এখানে প্রকৃতপক্ষে যে পবিত্রতা উদ্দেশ্য তা হচ্ছে, যাবতীয় শিরক ও পাপকৰ্ম থেকে বিরত থাকা এবং উত্তম চরিত্রে ভূষিত হওয়া। (وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ) অর্থাৎ আল্লাহর অসন্তোষ ও শাস্তি অবধারিত হওয়ার কারণসমূহ থেকে নিজেকে বিরত রাখো। অধিকন্তু তার আনুগত্যকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে এবং পাপকৰ্ম পরিহার করো। আল্লাহ বলেন, (وَلَا تَمْنُنْ تَسْتَكْثِرُ) অর্থাৎ তুমি যেসব উত্তম আমল কর না কেন মানুষের নিকট তার প্রতিদান কামনা করো না অথবা এর বিনিময়ে দুনিয়াতে আল্লাহর কাছে এর চেয়ে কোন ভাল ফলাফল আশা করো না।
পরবর্তী আয়াতসমূহে মানুষদেরকে এক আল্লাহর দিকে আহ্বান করা, তাদেরকে তার শাস্তি ও পাকড়াও থেকে ভীতি প্রদর্শন এবং দীনের কারণে মানুষের পক্ষ থেকে যে বিরোধিতার সম্মুখীন হবেন, তাদের দ্বারা অত্যাচারিত-নির্যাতিত হবেন ঐ সব বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেন, (وَلِرَبِّكَ فَاصْبِرْ) অর্থাৎ আপনি আপনার পরওয়ার দিগরের সন্তষ্টি অর্জনার্থে ধৈর্য্যধারণ করুন।
উল্লেখিত আয়াতসমূহের প্রারম্ভিক সুরে মহান আল্লাহ তা’আলার এক উদাত্ত আহবান সুস্পষ্ট, যে আহবানে নাবী কারীম (ﷺ)-কে নবুওয়াতের মহা মর্যাদাপূর্ণ কাজের জন্য ঘুম থেকে জাগ্রত হতে এবং ঘুমের আচ্ছাদন ও বিছানার উষ্ণতা পরিত্যাগ করে আল্লাহর একত্ববাদের বাণী প্রচারে লিপ্ত হওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে :
يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ قُمْ فَأَنْذِرْ
ওহে বস্ত্র আবৃত (ব্যক্তি)। ২. ওঠ, সতর্ক কর। (আল-মুদাসসির ৭৪ - ১-২)
বলা হয়ে থাকে যে, যে নিজের জন্যই বাঁচতে চায় সে আরাম আয়েশে গা ভাসিয়ে চলতে পারে। কিন্তু আপনাকে এক বিরাট ও মহান দায়িত্বে আত্মনিয়োগ করতে হচ্ছে তখন ঘুমের সঙ্গে আপনার কী সম্পর্ক? আরাম আয়েশের সঙ্গে আপনার কি সম্পর্ক? আপনার গরম বিছানার কী প্রয়োজন? কী প্রয়োজন আপনার সুখময় জীবন যাপনের? আপনি উঠে পড়ুন এবং ঐ মহানকাজে ঝাঁপিয়ে পড়ুন। আপনার ঘুম এবং আরাম আয়েশের সময় এখন অতিক্রান্ত। এখন আপনাকে অবিরাম পরিশ্রম করে যেতে হবে এবং দীর্ঘ ও কষ্টদায়ক সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করতে হবে।
আল্লাহর পথে আহবান এবং কালেমার দাওয়াত ও তাবলীগী নেসাবের কাজ হচ্ছে অতীব উঁচু দরের কাজ। কিন্তু এ পথে চলার ব্যাপারটি হচ্ছে অত্যন্ত ভয়ভীতিজনক এবং বিপদ-সংকুল। এ কাজ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে শান্তির নীড় ঘর-বাড়ি, সুখময় পারিবারিক পরিবেশ, আরাম-আয়েশ স্নিগ্ধ শয্যা থেকে টেনে বের করে এনে দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা এবং দুঃখ কষ্টের অথৈ সাগরে নিক্ষেপ করে দিল। এনে দাঁড় করিয়ে দিল মানুষের বাহ্যিক পোষাকী আচরণ এবং শঠতাপূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রকৃতিগত দ্বিধা-দ্বন্দ্বের দারুণ টানা-পোড়েনের মাধ্যমে।
তারপর, নাবী কারীম (ﷺ) তার অবস্থা এবং দায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কে সজাগ হয়ে গেলেন এবং বিশ বছরেরও অধিককাল যাবৎ সেই জাগ্রত অবস্থার মধ্য দিয়েই অতিবাহিত করলেন। এ দীর্ঘ কাল যাবৎ সুখ-শান্তি, আরাম-আয়েশ বলতে তার আর কিছুই রইল না। সব কিছুকেই তিনি করলেন বিসর্জন। তার জীবন নিজের কিংবা পরিবার পরিজনদের জন্য আর রইল না। তার জীবন রইল আল্লাহর কাজের জন্য দায়বদ্ধ। তার কাজ ছিল আল্লহির প্রতি বিশ্ববাসীকে আহ্বান জানানো। বিশ্বের বুক থেকে সর্বপ্রকার অসত্য, অন্যায় ও মিথ্যার মূলোৎপাটন এবং ন্যায় ও সত্যের প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষকে পথ-পদর্শন।
‘আল্লাহর পথে আহ্বান’, ‘সত্যের প্রতিষ্ঠা’ ইত্যাদি কথাগুলো আপাতঃ দৃষ্টিতে ততটা কঠিন কিংবা দুঃসাধ্য মনে নাও হতে পারে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এর চেয়ে কঠিন এবং কষ্টসাধ্য কাজ পৃথিবীতে আর কিছুই হতে পারে না। রেসালাতের আমানত হচ্ছে বিশ্বের বুকে সব চেয়ে দায়িত্বপূর্ণ এবং দুর্বহ আমানত। এ আমানত হচ্ছে এক পক্ষে বিশ্বময় মানবের চরম উৎকর্ষ ও বিকাশের আমানত এবং অন্য পক্ষে যাবতীয় বাতিল এবং গায়রুল্লাহর প্রভাব প্রতিহত করে তাকে ধ্বংস করার আমানত। কাজেই তার কাধে যে বোঝা চাপান হয়েছিল তা ছিল সমগ্র মানবতার বোঝা । সমস্ত মতবাদের বোঝা এবং ময়দানে ময়দানে জেহাদ ও তা প্রতিহত করার বোঝা। বিশ বছরেরও অধিক কাল যাবৎ অবিরামভাবে তিনি ব্যাপক ও বহুমুখী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করেন। সেই দীর্ঘ কাল যাবৎ, অর্থাৎ যখন তিনি আসমানী আহবান শ্রবণের মাধ্যমে অত্যন্ত কঠিন ও কন্টকময় দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেন, তখন থেকেই তাকে কোন এক অবস্থা অন্য কোন অবস্থা সম্পর্কে বিন্দুমাত্রও গাফেল কিংবা উদাসীন রাখতে পারে নি। আল্লাহ তা’আলা তাকে আমাদের এবং সমগ্র মানবতার পক্ষ হতে উত্তম বিনিময় প্রদান করুন।[3]
[2] সহীহুল বুখারী- ‘কেতাবূত তাফসীর, বাবু অর রুজযা ফাহজুর’’ (অশালীন কাজ পরিহার করন) অধ্যায় ২য় খন্ড ৭৩৩ পৃঃ। এ প্রসঙ্গে অন্যান্য কিছু অধিক বর্ণিত হয়েছে। নাবী (সাঃ) বলেন, ‘আমি হেরায় এতেক্বাফ করি। যখন আমার এতেক্বাফ সম্পূর্ণ হয় তখন আমি নীচে অবতরণ করি। সে সময় আমি বাতনে ওয়াদী অতিক্রম করি তখন আমাকে ডাক দেয়া হয়। আমি তাকাই ডানে, বামে, সামনে, পিছনে কিন্তু কিছুই দেখতে পাই না। এর পর যখন উপরে দৃষ্টিপাত করি তখন এ ফিরিশতাকে দেখতে পাই।’’
যেবছর রামাযান মাসে গারে হেরায় এতেক্বাফ করেছিলেন এবং যে রমাযান মাসে তাঁর উপর ওহী অবতীর্ণ হয় তা ছিল ৩য় রমাযান, অর্থাৎ শেষ রমাযান। তাঁর নিয়ম ছিল যখন তাঁর রমাযানের এতেক্বাফ পূর্ণ হত তখন তিনি প্রথম শাওয়ালে প্রত্যুষেই মক্কা প্রত্যাবর্তন করতেন। উপরি উল্লেখিত বর্ণনার সঙ্গে এ কথাটি জুড়ে দিলে এটা দাঁড়ায় যে, ইয়া আইউহাল মোদ্দাস্সির (হে বস্ত্রাবৃত ব্যক্তি) ওহীটি প্রথম ওহীর দশ দিন পরে প্রথম শাওয়ালে অবতীর্ণ হয়েছিল। অর্থাৎ ওহী বন্ধের পূর্ণ সময়কাল কাল ছিল ১০ দিন।
[3] ফী- যিলালিল কুরআন (সূরাহ মুযযাম্মিল ও মুদ্দাসসির, পারা ২৯, পৃষ্ঠা নং ১৬৮-১৭১।
এখানে আমরা আলোচনার মূল বিষয়াদি থেকে একটু সরে গিয়ে, অর্থাৎ রিসালাত ও নবুওয়াতের বরকতময় বিষয়াদির বিস্তৃত বিবরণ লিপিবদ্ধ করার পূর্বে ওহীর প্রকৃতি ও প্রকারভেদ সম্পর্কে কিছুটা আলোচনা করার প্রয়োজন বোধ করছি। কারণ, এটাই হচ্ছে রেসালাতের উৎস এবং প্রচারের উপায়। ওহীর প্রকৃতি এবং প্রকারভেদ সম্পর্কে আল্লামা ইবনে কাইয়্যেম যে আলোচনা করেছেন তা নিম্নে লিপিবদ্ধ করা হলঃ
১. সত্য স্বপ্নঃ স্বপ্নের মাধ্যমে নাবী কারীম (ﷺ)-এর উপর ওহী অবতীর্ণ হয়।
২. ফিরিশতা দেখা না দিয়ে অর্থাৎ অদৃশ্য অবস্থান থেকেই রাসূল (ﷺ)-এর অন্তরে ওহী প্রবেশ করিয়ে দেন। এ প্রসঙ্গে নাবী কারীম (ﷺ) যেমনটি ইরশাদ করেছেনঃ
(إن روح القدس نفث في روعى أنه لن تموت نفس حتى تستكمل رزقها، فاتقوا الله وأجملوا في الطلب، ولا يحملنكم استبطاء الرزق على أن تطلبوه بمعصية الله ، فإن ما عند الله لا ينال إلا بطاعته)
অর্থঃ ‘জিবরাঈল (আঃ) ফিরিশতা আমার অন্তরে এ কথা নিক্ষেপ করলেন যে, কোন আত্মা সে পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবে না যে পর্যন্ত তার ভাগ্যে যতটুকু খাদ্যের বরাদ্দ রয়েছে পুরোপুরিভাবে তা পেয়ে না যাবে। অতএব, তোমরা আল্লাহকে সমীহ কর এবং রুজি অন্বেষণের জন্য ভাল পথ অবলম্বন কর। রুজি প্রাপ্তিতে বিলম্ব হওয়ায় তোমরা আল্লাহর অসন্তোষের পথ অন্বেষণে যেন উদ্বুদ্ধ না হও। কারণ, আল্লাহর নিকট যা কিছু রয়েছে তা তাঁর আনুগত্য ছাড়া পাওয়া দুস্কর।
৩. ফেরেশতা মানুষের আকৃতি ধারণপূর্বক নাবী কারীম (ﷺ)-কে সম্বোধন করতেন। তারপর তিনি যা কিছু বলতেন নাবী কারীম (ﷺ) তা মুখস্থ করে নিতেন। এ অবস্থায় সাহাবীগণ (রাঃ)ও ফেরেশতাকে দেখতে পেতেন।
৪. ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় নাবী কারীম (ﷺ)-এর নিকট ঘন্টার টুন টুন ধ্বনির মতো ধ্বনি শোনা যেত। ওহী নাযিলের এটাই ছিল সব চাইতে কঠিন অবস্থা। টুন টুন ধ্বনির সংকেত প্রকাশ করতে করতে ফিরিশতা ওহী নিয়ে আগমন করতেন এবং নাবী (ﷺ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। ওহী নাযিলের সময় কঠিন শীতের দিনেও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কপাল থেকে ঘাম ঝরতে থাকত। তিনি উষ্ট্রের উপর আরোহণরত অবস্থায় থাকলে উট বসে পড়ত। এক দফা এইভাবে ওহী নাযিল হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উরু যায়দ বিন সাবেত (ﷺ)-এর উরুর উপর ছিল। তখন তাঁর উরুতে এতই ভারবোধ হয়েছিল যে মনে হয়েছিল যেন উরু চূর্ণ হয়ে যাবে।
৫. নাবী কারীম (ﷺ) ফিরিশতাকে কোন কোন সময় নিজস্ব জন্মগত আকৃতিতে প্রত্যক্ষ করতেন এবং আল্লাহর ইচ্ছায় সেই অবস্থাতেই তিনি তাঁর নিকট ওহী নিয়ে আগমন করতেন। নাবী কারীম (ﷺ)-এর এ রকম অবস্থা দু’বার সংঘটিত হয়েছিল যা আল্লাহ তা‘আলা সূরাহ ‘নাজমে’ উল্লেখ করেছেন।
৬. পবিত্র মি’রাজ রজনীতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন আকাশের উপর অবস্থান করছিলেন সেই সময় আল্লাহ তা‘আলা নামায এবং অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে সরাসরি হুকুমের মাধ্যমে ওহীর ব্যবস্থা করেছিলেন।
৭. আল্লাহ তা‘আলার সঙ্গে নাবী কারীম (ﷺ)-এর সরাসরি কথোপকথন যেমনটি হয়েছিল, তেমনি মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে হয়েছিল। মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে যে আল্লাহ তা‘আলার কথোপকথন হয়েছিল কুরআন কারীমে তা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলার সঙ্গে নাবী কারীম (ﷺ)-এর কথোপকথনের ব্যাপারটি হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে (কুরআন দ্বারা নয়)।
কোন কোন লোক পর্দা বা আবরণ ব্যতিরেকে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর সামনা-সামনি কথোপকথনের মাধ্যমে ওহী নাযিলের অষ্টম রীতির কথা বলেছেন। কিন্তু ইসলামের পূর্বসূরীদের হতে শুরু করে পরবর্তীদের সময়কাল পর্যন্ত এ পদ্ধতিতে ওহী নাযিলের ব্যাপারে মতভেদ চলে আসছে।[1]