যেহেতু মুনাফিক্বগণ এবং দুর্বল প্রকৃতির মুসলিমগণ হুদায়বিয়াহর সফর হতে বিরত থেকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)’র সঙ্গ লাভের পরিবর্তে নিজ নিজ গৃহে অবস্থান করেছিল সেজন্য আল্লাহ তা‘আলা নাবী (ﷺ)-কে তাদের সম্পর্কে নির্দেশ প্রদান করে বলেন,
(سَيَقُوْلُ الْمُخَلَّفُوْنَ إِذَا انطَلَقْتُمْ إِلٰى مَغَانِمَ لِتَأْخُذُوْهَا ذَرُوْنَا نَتَّبِعْكُمْ يُرِيْدُوْنَ أَن يُبَدِّلُوْا كَلَامَ اللهِ قُل لَّن تَتَّبِعُوْنَا كَذَلِكُمْ قَالَ اللهُ مِن قَبْلُ فَسَيَقُوْلُوْنَ بَلْ تَحْسُدُوْنَنَا بَلْ كَانُوْا لَا يَفْقَهُوْنَ إِلَّا قَلِيْلًا) [الفتح: 15].
‘তোমরা যখন গানীমাতের মাল সংগ্রহ করার জন্য যেতে থাকবে তখন পিছনে থেকে যাওয়া লোকগুলো বলবে- ‘আমাদেরকেও তোমাদের সঙ্গে যেতে দাও। তারা আল্লাহর ফরমানকে বদলে দিতে চায়। বল ‘তোমরা কিছুতেই আমাদের সঙ্গে যেতে পারবে না, (খাইবার অভিযানে অংশগ্রহণ এবং সেখানে পাওয়া গানীমাত কেবল তাদের জন্য যারা ইতোপূর্বে হুদাইবিয়াহর সফর ও বাই‘আতে রিযওয়ানে অংশ নিয়েছে) এমন কথা আল্লাহ পূর্বেই বলে দিয়েছেন। তখন তারা বলবে- ‘তোমরা বরং আমাদের প্রতি হিংসা পোষণ করছ।’ (এটা যে আল্লাহর হুকুম তা তারা বুঝছে না) তারা খুব কমই বুঝে।’ [আল-ফাতহ (৪৮) : ১৫]
কাজেই রাসূলে কারীম (ﷺ) যখন খায়বার অভিযানের কথা ঘোষণা করলেন তখন ইরশাদ করলেন যে এ অভিযানে শুধু সে সকল ব্যক্তি অংশ গ্রহণ করতে পারবেন যাঁরা প্রকৃত জিহাদের জন্য আগ্রহী। এ ঘোষণার ফলে তাঁর সঙ্গে শুধু সে সকল লোকই যাওয়ার জন্য যোগ্য বিবেচিত হতে পারেন যাঁরা হুদায়বিয়াহর বৃক্ষের নীচে বাইয়াতে রিযওয়ানে শরীক হয়েছিলেন। তাঁরা সংখ্যায় ছিলেন মাত্র চৌদ্দশত জন।
ঐ সময়ে আবূ হুরাইরাহও (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করে মদীনায় আগমন করেছিলেন। এ সময় সিবা’ বিন ‘উরফুতাহ ফজরের জামাতে ইমামত করছিলেন। সালাত সমাপ্ত হলে আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) তাঁর খিদমতে উপস্থিত হলেন। তিনি তাঁর খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। অতঃপর আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) খিদমতে নাবাবীতে উপস্থিতির জন্য খায়বার অভিমুখে যাত্রা করলেন। তিনি যখন খিদমতে নাবাবীতে উপস্থিত হলেন তখন খায়বার বিজয় পর্ব সমাপ্ত হয়েছে। রাসূলে কারীম (ﷺ) সাহাবায়ে কেরাম (রাযি.)-এর সঙ্গে আলোচনা করে আবূ হুরাইরাহ (রাঃ)ও তাঁর বন্ধুগণকেও গণীমতের অংশ প্রদান করেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খায়বার অভিযানের প্রাক্কালে মুনাফিক্বগণ ইহুদীদের সাহায্যার্থে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। মুনাফিক্ব নেতা আব্দুল্লাহ বিন উবাই খায়বারের ইহুদীগণের নিকট এ মর্মে সংবাদ প্রেরণ করে যে, ‘এখন মুহাম্মাদ (ﷺ) তোমাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করতে যাচ্ছেন। অতএব, তোমরা হুশিয়ার হয়ে যাও এবং উত্তম প্রস্তুতি গ্রহণ কর। দেখ, তোমরা ভুল কর না যেন। উত্তম প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাক, ভয়ের কিছুই নেই। কারণ, এক দিকে তোমাদের যেমন সংখ্যাধিক্য রয়েছে, অন্যদিকে তেমনি অস্ত্রশস্ত্র এবং মাল সামানও অধিক রয়েছে। কিন্তু মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর জনবল যেমন সামান্য, অন্যদিকে তেমনি তিনি প্রায় রিক্তহস্ত তাঁর অস্ত্রশস্ত্র খুব সামান্যই আছে।’
খায়বারবাসী যখন এ সংবাদ অবগত হল তখন বনু গাতফানের সাহায্য লাভের জন্য তারা কেননা বিন আবিল হুক্বাইক্ব এবং হাওয়া বিন ক্বায়সকে সেখানে প্রেরণ করল। কারণ, বনু গাত্বাফান ছিল খায়বারবাসীগণের মিত্র এবং মুসলিমগণের বিরুদ্ধে তাদের সাহায্যকারী। বনু গাতফানের নিকটে তারা এ প্রস্তাবও পাঠাল যে, যদি তারা মুসলিমগণের বিরুদ্ধে জয়লাভে সক্ষম হয় তাহলে খায়বারের উৎপন্ন দ্রব্যের অর্ধেক তাদের দিয়ে দেয়া হবে।
খায়বার যাওয়ার পথে রাসূলে কারীম (ﷺ) পর্বত অতিক্রম করেন। অতঃপর (ইসরকে ‘আসারও বলা হয়) ‘সাহবা’ নামক উপত্যকা দিয়ে গমন করেন। এরপর রাজী নামক উপত্যকায় গিয়ে পৌঁছেন। (এ রাযী’ কিন্তু ঐ রাযী’ নয় যেখানে আযাল ও ক্বারাহর বিশ্বাসঘাতকতার কারণে বনু লাহইয়ান গোত্রের হাতে আট জন সাহাবী (রাযি.) শাহাদাত বরণ করেন, যায়দ ও খুবাইব (রাঃ)-কে বন্দী করা হয় এবং পরে মক্কায় শাহাদতের ঘটনা সংঘটিত হয়।)
রাযী’ হতে মাত্র একদিন ও একরাত্রির ব্যবধানে বনু গাত্বাফানের জনবসতি অবস্থিত ছিল। যুদ্ধ প্রস্তুতি সহকারে বনু গাত্বাফান খায়বারবাসীগণের সাহায্যার্থে খায়বার অভিমুখে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু পথের মধ্যে তাদের পিছন দিক থেকে কিছু শোরগোল শুনতে পেয়ে তারা ধারণা করল যে, তাদের শিশু ও পশুপালের উপর মুসলিমগণ আক্রমণ চালিয়েছে, এ কারণে তারা খায়বারকে মুসলিমগণের হাতে ছেড়ে দিয়ে পিছন ফিরে চলে।
এরপর রাসূলে কারীম (ﷺ) যে দুজন পথ- অভিজ্ঞ ব্যক্তি যাঁরা সৈন্যদের পথ প্রদর্শনের কাজে নিয়োজিত ছিলেন- তাঁদের মধ্যে এক জনের নাম ছিল হুসাইল- তাঁদের নিকট থেকে এমন এক পথের খোঁজ জানতে চাইলেন যে পথ ধরে মদীনার পরিবর্তে তার উত্তরদিক দিয়ে সিরিয়ার পথ ধরে খায়বারে প্রবেশ করা যায়। নাবী কারীম (ﷺ)-এর এ কৌশল অবলম্বনের উদ্দেশ্য ছিল শাম রাজ্যের দিকে ইহুদীদের পলায়নের পথ রোধ করা এবং বনু গাত্বাফান থেকে ইহুদীদের সাহায্য প্রাপ্তির পথ বন্ধ করে দেয়া।
একজন পথ-অভিজ্ঞ বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! ‘আমি আপনাকে সে পথ দিয়ে নিয়ে যাব।’ অতঃপর আগে আগে চলতে থাকলেন। চলার এক পর্যায়ে তাঁরা এমন এক জায়গায় পৌঁছেন যেখান থেকে একাধিক পথ বাহির হয়ে গেছে। তিনি আরয করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ), এ সকল পথ ধরে গিয়ে আপনি গন্তব্য স্থানে পৌঁছতে পারবেন।’
নাবী (ﷺ) বললেন, ‘প্রত্যেকটি পথের নাম বলে দাও।’
তিনি বললেন, ‘এটির নাম হাযান (কঠিন এবং কর্কশ)। নাবী (ﷺ) এ পথ ধরে যাওয়া পছন্দ করলেন না। দ্বিতীয় পথটির নাম বললেন, ‘শাশ’ (বিযুক্তকরণ এবং চাঞ্চল্যকর) নাবী কারীম (ﷺ) এটাও গ্রহণ করলেন না। তিনি তৃতীয়টির নাম বললেন, ‘হাতিব’ (কাষ্ঠ সংগ্রহকারী) নাবী কারীম (ﷺ) এ পথ ধরে চলতেও অস্বীকার করলেন।
হুসাইল বললেন এখন অবশিষ্ট থাকে আর একটি মাত্র পথ। উমার (রাঃ) বললেন, এ পথটির নাম কী? হুসাইল বললেন, ‘এ পথের নাম ‘মারহাব’। নাবী কারীম (ﷺ) এ পথ ধরে চলা পছন্দ করলেন।
সালামাহ বিন আকওয়া’ (রাঃ) বলেছেন যে, নাবী কারীম (ﷺ)-এর সঙ্গে একত্রে খায়বার অভিমুখে পথ চলতে থাকলাম। রাতের বেলা আমরা চলছিলাম। এক ব্যক্তি ‘আমিরকে বললেন, ‘হে ‘আমির! তোমার কিছু অসাধারণ কথা কাহিনী আমাদের শুনাচ্ছ না কেন? ‘আমির ছিলেন একজন কবি। এ কথা শুনে তিনি বাহন থেকে অবতরণ করলেন এবং নিজ সম্প্রদায়ের প্রশংসা সম্পর্কে কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলেন। কবিতার চরণগুলো ছিল নিম্নরূপ :
اللهم لولا أنت ما اهتديـنا ** ولا تَصدَّقْنا ولا صَلَّيـنـا
فاغـفر فِدَاءً لك ما اقْتَفَيْنا ** وَثبِّت الأقدام إن لاقينـا
وألْـقِينْ سكـينة عــلينا ** إنا إذا صِــيحَ بنا أبينــا
وبالصياح عَوَّلُوا عــلينا **
অর্থ : হে আল্লাহ! যদি তুমি অনুগ্রহ না করতে তাহলে আমরা হিদায়াত পেতাম না, সদকাহ করতাম না, সালাত আদায় করতাম না, আমরা তোমার নিকট উৎসর্গকৃত হলাম, তুমি আমাদেরকে ক্ষমা করে দাও। যতক্ষণ আমরা তাকওয়া অবলম্বন করি এবং যদি যুদ্ধ করি তখন আমাদের কদম মযবুত করে রেখ এবং আমাদের উপর শান্তি বর্ষণ কর। যখন আমাদের ভয় প্রদর্শন করা হয় তখন যেন আমরা অটল হয়ে যাই এবং চ্যালেঞ্জকালীন অবস্থায় আমাদের প্রতি লোকেরা আস্থা রেখেছেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ কবিতা আবৃত্তিকারী কে?’
লোকেরা বললেন, ‘‘আমির বিন আকওয়া।’
নাবী কারীম বললেন, ‘আল্লাহ তার উপর রহম করুন।’
সম্প্রদায়ের একজন বললেন, ‘এখন তো তাঁর শাহাদত কার্যকর হয়ে গেল। আপনি তাঁর অস্তিত্বের মাধ্যমে আমাদের উপকৃত হওয়ার সুযোগ কেন দিলেন না।[1]
সাহাবায়ে কেরাম (রাযি.) জানতেন যে যুদ্ধের সময় রাসূলে কারীম (ﷺ) কারো জন্য বিশেষভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করলে তার অর্থই ছিল তাঁর শহীদ হওয়ার ব্যাপারে সুনিশ্চিত হওয়া।[2] খায়বার যুদ্ধে আমেরের ব্যাপারে এ সত্যটি প্রমাণিত হয়েছিল। এ জন্যই সাহাবীগণ আল্লাহর নাবী (ﷺ)-এর দরবারে আরয করলেন যে কেন তাঁর দীর্ঘায়ুর জন্য প্রার্থনা করা হল না যাতে আমরা তাঁর অস্থিত্বের দ্বারা ভবিষ্যতে আরও উপকৃত হতে পারতাম।
খায়বারের সন্নিকটে সাহাবা নামক উপত্যকায় নাবী (ﷺ) আসরের সালাত আদায় করলেন। অতঃপর সামান পত্র চাইলেন। কিন্তু শুধু আনা হল ছাতু এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নির্দেশে তা মাখানো হল। নাবী (ﷺ) এবং সাহাবাবৃন্দ (রাযি.) সে খাবার খেলেন। এরপর নাবী কারীম (ﷺ) মাগরিব সালাতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। অবশ্য সালাতের প্রস্তুতি হিসেবে শুধু কুলি করলেন। সাহাবীগণও (রাঃ) কুলি করলেন। অতঃপর নতুনভাবে অযু না করে সালাত আদায় করলেন।[3] পূর্বের অজুকেই যথেষ্ট মনে করলেন। অতঃপর এশা ওয়াক্তের সালাতও আদায় করলেন।[4]
অগ্রযাত্রার এক পর্যায়ে মুসলিম বাহিনী খায়বারের এত নিকটে গিয়ে উপস্থিত হলেন যে, সেখান থেকে শহর পরিস্কারভাবে দেখতে পাওয়া গেল। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বাহিনীকে থেমে যাওয়ার নির্দেশ প্রদান করায় তারা থেমে গেলেন। অতঃপর তিনি এ পর্যায়ে প্রার্থনা করলেন,
اللَّهُمَّ رَبَّ السَّمَوَاتِ السَّبْعِ وَمَا أَظْلَلْنَ ، وَرَبَّ الأَرَضِينِ السَّبْعِ وَمَا أَقْلَلْنَ ، وَرَبَّ الشَّيَاطِينِ وَمَا أَضْلَلْنَ ، وَرَبَّ الرِّيَاحِ وَمَا ذَرَيْنَ ، فَإِنَّا نَسْأَلُكَ خَيْرَ هَذِهِ الْقَرْيَةِ وَخَيْرَ أَهْلِهَا ، وَنَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَشَرِّ أَهْلِهَا وَشَرِّ مَا فِيهَا، اقدموا بسم الله
অর্থঃ হে আল্লাহ্! সপ্ত আকাশ এবং যার উপর এর ছায়া রয়েছে তাদের প্রভু এবং সপ্ত জমিন ও যাদের সে উঠিয়ে রয়েছে তাদের প্রভু এবং শয়তানসমূহ এবং যাদেরকে তারা ভ্রষ্ট করেছে তাদের প্রতিপালক আমরা আপনার নিকট এ বসতির মঙ্গল, এর বাসিন্দাদের মঙ্গল এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে তার মঙ্গল প্রার্থনা করছি। এ বসতির অনিষ্টতা, এখানে বসবাসকারীদের অনিষ্টতা এবং এখানে যা কিছু আছে তার অনিষ্টতা হতে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। (এরপর বললেন) চল, আল্লাহ্র নামে সামনে অগ্রসর হও।[5]
[2] সহীহুল মুসলিম ২য় খন্ড ১১৫ পৃঃ।
[3] সহীহুল বুখারী ২য় খন্ড ৬০৩ পৃঃ।
[4] মাগাযী আলওয়াকেদ্দী, খায়বার যুদ্ধ ১১২ পৃঃ।
[5] ইবনু হিশাম ২য় খন্ড ৩২২ পৃঃ
যে প্রভাতে খায়বার যুদ্ধ আরম্ভ হয় মুসলিম সৈন্যদল তার পূর্ব রাত্রি খায়বারের সন্নিকটে অতিবাহিত করেন। কিন্তু ইহুদীগণ এ ব্যাপারে কোন খবর পায় নি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিয়ম ছিল, কোন সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ পরিচালনা করতে চাইলে সেখানে গিয়ে রাত্রি যাপন করতেন এবং সকাল না হওয়া পর্যন্ত আক্রমণ পরিচালনা করতেন না। এ প্রেক্ষিতে রাত যখন শেষ হওয়ার উপক্রম হল তখন অন্ধকার থাকা অবস্থায় তিনি ফজরের সালাত আদায় করলেন। অতঃপর ঘোড়সওয়ার মুসলিম সৈন্যগণ খায়বার অভিমুখে অগ্রসর হলেন। এদিকে খায়বারবাসীগণ তাদের প্রাত্যহিক কাজের ন্যায় আজও চাষাবাদের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি নিয়ে মাঠের দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু অগ্রসরমান মুসলিম সৈন্যদের হঠাৎ দেখতে পেয়ে তারা শহরের দিকে দৌড় দিয়ে যেতে যেতে চিৎকার করে বলতে থাকল যে, ‘আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ (ﷺ) তাঁর সৈন্য সহকারে এসে গেছেন। নাবী কারীম (ﷺ) এ দৃশ্য দেখে বললেন, (اللهُ أَكْبَرُ، خَرِبَتْ خَيْبَرَ، اللهُ أَكْبَرُ، خَرِبَتْ خَيْبَرَ، إِنَّا إِذَا نَزَلْنَا بِسَاحَةِ قَوْمٍ فَسَاءَ صَبَاحُ الْمُنْذَرِيْنَ) ‘আল্লাহ আকবর, খায়বার ধ্বংস হল, আল্লাহ আকবর খায়বার ধ্বংস হল। যখন কোন সম্প্রদায়ের ময়দানে অবতরণ করি যাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হয় তাদের সকাল মন্দ হয়ে যায়।[1]
খায়বারের জনবসতি দুটি অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। একটি অঞ্চলে নিম্নলিখিত পাঁচটি দূর্গ ছিল,
১. নায়িম দূর্গ, ২. সা’ব বিন মু’আয দূর্গ, ৩. যুবাইরের কেল্লা দূর্গ, ৪. উবাই দূর্গ, ৫. নিযার দূর্গ।
এসবের প্রথম তিনটি দূর্গের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলকে নাত্বাত বলা হত। অবশিষ্ট দু’টি দূর্গের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অঞ্চল শাক্ব নামে প্রসিদ্ধ ছিল।
খায়বারের জনবসতির দ্বিতীয় অঞ্চলকে কাতিবাহ বলা হত। এর মধ্যে মাত্র তিনটি দূর্গ ছিল,
১. ক্বামূস দূর্গ, (এটা বনু নাযীর গোত্রের আবুল হুক্বাইক্বের দূর্গ ছিল)। ২. ওয়াতীহ দূর্গ, ৩. সুলালিম দূর্গ।
উপরি উল্লেখিত ৮টি দূর্গ ছাড়াও খায়বারের ছোট বড় আরও কিছু সংখ্যক দূর্গ এবং ঘাঁটি ছিল। কিন্তু শক্তি সামর্থ্য ও নিরাপত্তার ব্যাপারে এ সকল দূর্গ পূর্বোক্তগুলোর সমপর্যারের ছিল না। তুলনামূলকভাবে এ দূর্গগুলো ক্ষুদ্রাকারের ছিল।
খায়বার যুদ্ধ প্রথম অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল। দ্বিতীয় অঞ্চলের দূর্গ তিনটিতে যোদ্ধাদের আধিক্য থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধ ছাড়াই মুসলিমগণের হাতে আত্মসমর্পণ করেছিল।
নাবী কারীম (ﷺ) সৈন্যদের শিবির স্থাপনের জন্য স্থান নির্বাচন করলেন। এ প্রেক্ষিতে হুবাব বিন মুনযির (রাঃ) আরয করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! এ কথাটা বলুন যে আল্লাহ তা‘আলা আপনাকে এ স্থানে শিবির স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন না যুদ্ধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা হিসেবে আপনি এটা করছেন? এটা কি আপনার ব্যক্তিগত অভিমত?
নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, ‘না, এটা হচ্ছে নেহাত একটি অভিমতের ব্যাপার। যুদ্ধের জন্য সুবিধাজনক মনে করেই করা হচ্ছে।’
হুবাব বিন মুনযির (রাঃ) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! এ স্থানটি নাত্বাত দূর্গের সন্নিকটে অবস্থিত এবং খায়বারের যুদ্ধ-অভিজ্ঞ সৈনিকগণ এ দূর্গে অবস্থান করছে। সেখান থেকে তারা আমাদের সকল অবস্থা ও অবস্থানের খবর জানতে পারবে, কিন্তু আমাদের পক্ষে তাদের কোন অবস্থার খবর সংগ্রহ করা সম্ভব হবে না। অধিকন্তু, আমরা তাদের নৈশকালীন আক্রমণ থেকেও নিরাপদে থাকব না। তাদের তীর আমাদের নিকট পৌঁছে যাবে কিন্তু আমাদের তীর তাদের নিকট পৌঁছবে না। তাছাড়া, এ স্থানটি খেজুর বাগানের মধ্যে নিচু ভূমিতে অবস্থিত। এ স্থানে রোগ ব্যাধি সংক্রমণেরও আশঙ্কা থাকবে। এ সকল অসুবিধার প্রেক্ষাপটে আপনি এমন কোন স্থানে শিবির স্থাপনের ব্যবস্থা করুন যাতে আমরা এ সকল ক্ষতিকর অবস্থা থেকে মুক্ত থাকতে পারি।’ রাসূলে কারীম (ﷺ) বললেন, ‘তুমি যে পরামর্শ দিলে তা যথার্থ।’ অতঃপর তিনি স্থান পরিবর্তন করে শিবির স্থাপনের নির্দেশ প্রদান করলেন।
অগ্রযাত্রার এক পর্যায়ে মুসলিম বাহিনী খায়বারের এত নিকটে গিয়ে উপস্থিত হলেন যে, সেখান থেকে শহর পরিস্কারভাবে দেখতে পাওয়া গেল। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বাহিনীকে থেমে যাওয়ার নির্দেশ প্রদান করায় তাঁরা থেমে গেলেন। অতঃপর তিনি এ পর্যায়ে প্রার্থনা করলেন,
(اللهم رَبُّ السَّمٰوَاتِ السَّبْعِ وَمَا أَظْلَلْنَ، وَرَبُّ الْأَرْضِيْنَ السَّبْعِ وَمَا أَقْلَلْنَ، وَرَبُّ الشَّيَاطِيْنَ وَمَا أَضْلَلْنَ، وَرَبُّ الرِّيَاحِ وَمَا أَذرِيْنَ، فَإِنَّا نَسْأَلُكَ خَيْرَ هٰذِهِ الْقَرْيَةِ، وَخَيْرَ أَهْلِهَا، وَخَيْرَ مَا فِيْهَا، وَنَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّ هٰذِهِ الْقَرْيَةِ، وَشَرِّ أَهْلِهَا، وَشَرِّ مَا فَيْهَا، أَقْدِمُوْا، بِسْمِ اللهِ).
অর্থ : হে আল্লাহ! সপ্ত আকাশ এবং যার উপর এর ছায়া রয়েছে তাদের প্রভূ এবং সপ্ত জমিন ও যাদের সে উঠিয়ে রয়েছে তাদের প্রভূ এবং শয়তানসমূহ এবং যাদেরকে তারা ভ্রষ্ট করেছে তাদের প্রতিপালক আমরা আপনার নিকট এ বস্তির মঙ্গল, এর বাসিন্দাদের মঙ্গল এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে তার মঙ্গল প্রার্থনা করছি। এ বসতির অনিষ্টতা, এখানে বসবাসকারীদের অনিষ্টতা এবং এখানে যা কিছু আছে তার অনিষ্টতা হতে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। (এরপর বললেন) চল, আল্লাহর নামে সামনে অগ্রসর হও।[1]
যে রাত্রিতে নাবী কারীম (ﷺ) খায়বার সীমানায় প্রবেশ করলেন তখন তিনি বললেন,
(لَأَعْطِيَنَّ الرَّايَةَ غَدًا رَجُلاً يُحِبُّ اللهَ وَرَسُوْلَهُ وَيُحِبُّهُ اللهُ وَرَسُوْلُهُ، [يَفْتَحُ اللهُ عَلٰى يَدَيْهِ ])
‘আগামী কাল আমি এমন এক ব্যক্তির হাতে পতাকা প্রদান করব, যিনি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর প্রতি ভালবাসা রাখেন এবং যাঁকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভালবাসেন।’
রাত্রি শেষে যখন সকাল হল তখন সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খিদমতে উপস্থিত হলেন। প্রত্যেকেরই আশা পতাকা তাঁর হাতেই আসবে। রাসুলে কারীম (ﷺ) বললেন, আলী ইবনু আবূ তালেব কোথায়? সাহাবীগণ (রাঃ) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! তাঁর চোখের পীড়া হয়েছে’’।[1]
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘তাঁকে ডেকে নিয়ে এসো।’ তাঁকে ডেকে আনা হল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজ মুখ থেকে লালা নিয়ে তা তাঁর চোখে লাগিয়ে দিয়ে দু‘আ করলেন। তিনি এমনভাবে আরোগ্য লাভ করলেন, যেন তাঁর পীড়াজনিত কোন যন্ত্রনা ছিল না। অতঃপর তাঁর হাতে পতাকা প্রদান করা হল। তিনি আরয করলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ (ﷺ)! আমি তাদের সঙ্গে ঐ সময় পর্যন্ত যুদ্ধ করব যে, তারা আমাদের মতো হয়ে যাবে।’’
নাবী কারীম (ﷺ) বললেন,
(اُنْفُذْ عَلٰى رِسْلِكَ، حَتّٰى تَنْزِلَ بِسَاحَتِهِمْ، ثُمَّ ادْعُهُمْ إِلَى الْإِسْلَامِ، وَأَخْبِرْهُمْ بِمَا يَجِبُ عَلَيْهِمْ مِنْ حَقِّ اللهِ فِيْهِ، فَوَاللهِ، لَأَنْ يَّهْدِيَ اللهُ بِكَ رَجُلًا وَاحِدًا خَيْرٌ لَّكَ مِنْ أَنْ يَّكُوْنَ لَكَ حُمْرُ النِّعَمِ).
‘শান্তির সঙ্গে চল এবং তাদের ময়দানে অবতরণ কর। অতঃপর তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দাও এবং ইসলামের মধ্যে আল্লাহর যে সমস্ত প্রাপ্য রয়েছে যা তাদের কর্তব্য সে সম্পর্কে তাদেরকে অবহিত কর। আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের মাধ্যমে যদি এক জনকেও হিদায়াত দেন তাহলে তোমাদের জন্য তা লাল উটের চাইতেও উত্তম হবে।[2]
[2] সহীহুল বুখারী খায়বার যুদ্ধ ২য় খন্ড ৯০৫-৬০৬ পৃঃ, কোন কোন বর্ণনা সূত্রে জানা যায় যে, খায়বারের একটি দূর্গ বিজয়ে একাধিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর আলী (রাঃ)-কে পতাকা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বিশেষজ্ঞগণের নিকট গ্রহণযোগ্য হচ্ছে সেটাই যা উপরে উল্লেখিত।
উল্লেখিত ৮টি দূর্গের মধ্যে সর্ব প্রথম নায়িম দূর্গের উপর আক্রমণ পরিচালনা করা হয়। কারণ, অবস্থানগত দিক এবং যুদ্ধ কৌশলের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে আক্রমণ প্রতিহত করার ব্যাপারে এ দূর্গটি ছিল প্রথম শ্রেণীর ও সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ, অধিকন্তু, এটি ছিল মারহাব নামীয় সে পরাক্রান্ত ও পরিশ্রমী ইহুদীর দূর্গ যাকে এক হাজার পুরুষের সমকক্ষ মনে করা হতো।
আলী বিন আবূ ত্বালিব (রাঃ) মুসলিম সৈন্যদের নিয়ে এ দূর্গের সামনে গিয়ে পৌঁছে ইহুদীদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করলেন। তারা এ দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করল এবং তাদের সম্রাট মারহাবের পরিচালনাধীনে মুসলিমগণের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য অবস্থান গ্রহণ করল। প্রথমে মারহাব প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মুসলিমগণকে আহবান জানাল।
যার অবস্থা সম্পর্কে সালামাহ বিন আকওয়া বর্ণনা করেছেন যে, ‘যখন আমরা খায়বারে পৌঁছলাম তখন ইহুদী সম্রাট মারহাব স্বীয় তরবারী হস্তে আত্মম্ভরিতা প্রকাশ করে গর্বভরে বলল,
قد عَلِمتْ خيبر أني مَرْحَب ** شَاكِي السلاح بطل مُجَرَّب
إذا الحروب أقبلتْ تَلَهَّب **
অর্থ : ‘খায়বার অবহিত আছে যে, আমি মারহাব অস্ত্রে সজ্জিত বীর এবং অভিজ্ঞ, যখন যুদ্ধ ও সংঘাত অগ্নিশিখা নিয়ে সামনে আসে।’
এ প্রেক্ষিতে তার প্রতিদ্বন্দ্বী আমার চাচা ‘আমির এগিয়ে এসে বললেন,
قد علمت خيبر أني عامر ** شاكي السلاح بطل مُغَامِر
‘খায়বার জানে যে, আমি ‘আমির, অস্ত্র সজ্জিত, বীর এবং যোদ্ধা।’’
অতঃপর উভয়ে উভয়ের প্রতি আঘাত হানে। মারহাবের তরবারী আমার চাচার ঢালে গিয়ে বিদ্ধ হয়। ‘আমির তাকে নীচ হতে মারার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর তরবারী ছোট থাকার কারণে তিনি ইহুদীর পায়ের গোছার উপর আঘাত হানেন। কিন্তু সে আঘাত মারহাবের পায়ে না লেগে তাঁর নিজের হাঁটুতেই এসে লাগে। নিজের তলোয়ারে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েই অবশেষে তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন। নাবী কারীম (ﷺ) নিজের দুটি আঙ্গুল একত্রিত করে দেখিয়ে তাঁর সম্পর্কে বলেন যে,
(إنَّ لَهُ لَأَجْرَيْنِ ـ وَجَمَعَ بَيْنَ إِصْبَعَيْهِ ـ إِنَّهُ لَجَاهِدٌ مُجَاهِدٌ، قَلَّ عَرَبِيٌّ مَشٰي بِهَا مِثْلَهُ)
‘তিনি দ্বিগুণ সওয়াবের অধিকারী হবেন। তিনি বড় পরিশ্রমী যোদ্ধা ছিলেন। অল্প সংখ্যকই তাঁর মতো কোন আরব জমিনের উপর চলে থাকবে।[1]
যাহোক, ‘আমির (রাঃ)-এর আহত হওয়ার পর মারহাবের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য আলী (রাঃ) গমন করেন।
সালামাহ বিন আকওয়া বর্ণনা করেন, ‘ঐ সময় আলী একটি কবিতার এ চরণ আবৃত্তি করছিলেন,
أنا الذي سمتني أمي حَيْدَرَهْ ** كلَيْثِ غابات كَرِيه المَنْظَرَهْ
أُوفِيهم بالصَّاع كَيْل السَّنْدَرَهْ **
অর্থ : আমি সেই ব্যক্তি আমার মাতা যার নাম রেখেছিলেন হায়দার (বাঘ) বনের বাঘের মতো ভয়ংকর, আমি তাদেরকে ‘সা’ এর বিনিময়ে বর্শার দ্বারা তাদের মাপ পূর্ণ করে দিব।
অতঃপর তিনি মারহাবের মাথার উপর তরবারী দ্বারা এমনভাবে আঘাত করলেন যে, সে সেখানে স্তুপ হয়ে গেল। এভাবে আলী (রাঃ)-এর হাতে বিজয় অর্জিত হল।[2]
যুদ্ধের মাঝে আলী (রাঃ) ইহুদীদের দূর্গের নিকট পৌঁছলেন তখন একজন ইহুদী দূর্গের উঁচু স্থান থেকে উঁকি দিয়ে দেখার পর জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কে? আলী (রাঃ) বললেন, ‘আমি আলী বিন আবূ ত্বালিব।’
ইহুদী বলল, ‘সে গ্রন্থের শপথ! যা মুসা (আঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল, তোমরা সুউচ্চে রয়েছ।’
এরপর মারহাবের ভাই ইয়াসের এ কথা বলে বাহির হল, ‘কে এমন আছে যে, আমার সামনে আসবে?’
তার এ আহবানে যুবাইর (রাঃ) ময়দানে অবতরণ করেন। তাঁকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে দেখে তাঁর মা সাফিয়্যাহ (রাঃ) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমার পুত্র কি শহীদ হয়ে যাবে?’
নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, ‘না, বরং তোমার ছেলে তাকে হত্যা করবে।’ কিছুক্ষণের মধ্যে আল্লাহর রাসূলের উক্তি সত্য প্রমাণিত হল, যুবাইর (রাঃ) ইয়াসিরকে হত্যা করলেন।
এরপর নায়িম দূর্গের নিকট উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে কিছু সংখ্যক নেতৃস্থানীয় ইহুদী নিহত হয়। অবশিষ্ট ইহুদীগণ হতোদ্যম হয়ে পড়ে যার ফলে মুসলিমগণের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে তারা অক্ষম হয়ে পড়ে। কতগুলো সূত্র থেকে জানা যায় যে, এ যুদ্ধ কয়েক দিন যাবত অব্যাহত ছিল এবং মুসলিমগণকে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ দূর্গ থেকে মুসলিমগণের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তারা নিরাশ হয়ে পড়েছিল। এ কারণে অত্যন্ত সঙ্গোপনে তারা এ দূর্গ পরিত্যাগ করে সা’ব নামক স্থানে চলে যায়। ফলে নায়িম দূর্গ মুসলমানদের দখলে চলে আসে।
[2] মারহাবের হত্যাকারীর নামের ব্যাপারে অনেক মত বিরোধ রয়েছে, তাছাড়া এ তথ্যের মধ্যেও মত বিরোধ রয়েছে যে কোন দিন তাকে হত্যা করা হয়েছিল এবং কোন দিন এ দূর্গ জয় করা হয়েছিল। সহীহাইনের বর্ণনা করেছি তা বুখারীর র্বণনাকে প্রধান্য দিয়ে স্থির করেছি।
অত্যন্ত সুরক্ষিত ও মজবুত দূর্গ হিসেবে নায়িম দূর্গের পরেই ছিল সা’ব বিন মু’আয দূর্গের স্থান। মুসলিমগণ হুবাব বিন মুনযির আনসারী (রাঃ)-এর নেতৃত্বাধীনে এ দূর্গের উপর আক্রমণ পরিচালনা করেন এবং তিন দিন যাবত তারা অবরোধ করে রাখেন। তৃতীয় দিবসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ দূর্গের উপর বিজয় লাভের জন্য বিশেষ ভাবে প্রার্থনা করেন।
ইবনু ইসহাক্বের বর্ণনা সূত্রে জানা যায় যে, আসলাম গোত্রের শাখা বনু সাহামের লোকজন, রাসূলে কারীম (ﷺ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করলেন, ‘আমরা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে পড়েছি, আমাদের সহায় সম্পদ বলতে কিছু্ নেই।’ নাবী কারীম (ﷺ) প্রার্থনা করলেন,
(اللهم إِنَّكَ قَدْ عَرَفْتَ حَالَهُمْ، وَأَنَّ لَيْسَتْ بِهِمْ قُوَّةٌ، وَأَنْ لَّيْسَ بِيَدِيْ شَيْءٌ أُعْطِيْهِمْ إِيَّاهُ، فَافْتَحْ عَلَيْهِمْ أَعْظَمَ حُصُوْنِهَا عَنْهُمْ غَنَاءً، وَأَكْثِرْهَا طَعَامًا وَوَدَكًا)
‘হে আল্লাহ! তাঁদের অবস্থা সম্পর্কে আপনি সব চাইতে বেশী জানেন, আপনি অবশ্যই অবগত রয়েছেন যে, তাঁদের সহায় সম্পদ কিছু নেই এবং আমার নিকটেও এমন কিছু নেই যা দিয়ে আমি তাঁদের সাহায্য করতে পারি। অতএব, ইহুদীদের এমন এক দূর্গের উপর তাঁদেরকে বিজয় দান করুন যা তাঁদের জন্য সকল দিক দিয়ে ফলোৎপাদক হয় এবং যেখান থেকে অধিক খাদ্য ও চর্বি হস্তগত হয়।’
এরপর সাহাবীগণ (রাঃ) প্রবল পরাক্রমে আক্রমণ পরিচালনা করলেন এবং মহান আল্লাহ সা’ব বিন মোয়ায দূর্গের উপর মুসলিমগণকে বিজয় প্রদান করলেন। খায়বারে এমন কোন দূর্গ ছিল না যেখানে এ দূর্গের তুলনায় অধিক খাদ্য ও চর্বি ছিল।[1]
আল্লাহ তা‘আলার দরবারে দু‘আ করার পর নাবী কারীম (ﷺ) যখন এ দূর্গে আক্রমণ পরিচালনার জন্য মুসলিমগণকে নির্দেশ প্রদান করলেন তখন আক্রমণকারীদের মধ্যে বনু আসলাম অগ্রভাগে ছিল। এখানেও দূর্গের সামনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সংঘর্ষ হয়। অতঃপর সূর্যাস্ত যাওয়ার পূর্বেই দূর্গটি মুসলিমগণের দখলে আসে। এ দূর্গের মধ্যে মুসলিমগণ কিছু মিনজানীক ও দাববাব[2] যন্ত্রও প্রাপ্ত হন।
ইবনু ইসহাক্বের বর্ণনায় যে কঠিন ক্ষুধার আলোচনা করা হয়েছে তার ফল হচ্ছে লোকেরা (বিজয় অর্জন হতে না হতেই) গাধা যবেহ করল এবং চুলায় চাপিয়ে দিয়ে তা রান্নার আয়োজন করল। রাসূলে কারীম (ﷺ) যখন এ ব্যাপারটি অবগত হলেন তখন গৃহপালিত গাধার মাংস খেতে নিষেধ করে দিলেন।
[2] কাষ্ঠ নির্মিত এবং সুরক্ষিত গাড়ীর ন্যায় নীচে কয়েকজন মানুষ প্রবেশ করে দেওয়ালের নিকটে পৌঁছে শত্রু হতে আত্মরক্ষা করে দূর্গের দেওয়াল ফুটো করতো তাকে দাববাবা বলা হত। বর্তমানে ট্রাঙ্ককে দাববাবা বলা হয়। মিনজানীক এক প্রকার যুদ্ধাস্ত্র দ্বারা বড় বড় প্রস্তর নিক্ষেপ করা হয়, যাকে তোপ বলা যেতে পারে।