নাবী কারীম (ﷺ) মিশর ও ইসকান্দারিয়ার সম্রাট জুরাইজ বিন মাত্তার[1] নামে একটি মূল্যবান পত্র প্রেরণ করেন। তার উপাধি ছিল মুক্বাওক্বিস। পত্রখানার বিষয়বস্তু ছিল নিম্নরুপ :
(بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ مِنْ مُّحَمَّدٍ عَبْدِ اللهِ وَرَسُوْلِهِ إِلَى الْمُقَوْقِسِ عَظِيْمِ الْقِبْطِ، سَلَامٌ عَلٰى مَنْ اِتَّبَعَ الْهُدٰى، أَمَّا بَعْدُ، فَإِنِّيْ أَدْعُوْكَ بِدِعَايَةِ الْإِسْلَامِ، أَسْلِمْ تَسْلَمْ، وَأَسْلِمْ يُؤْتِكَ اللهُ أَجْرَكَ مَرَّتَيْنِ، فَإِنْ تَوَلَّيْتَ فَإِنَّ عَلَيْكَ إِثْمَ أَهْلِ الْقِبْــطِ،
(يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلٰى كَلَمَةٍ سَوَاء بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلاَّ نَعْبُدَ إِلاَّ اللهَ وَلاَ نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلاَ يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضاً أَرْبَابًا مِّنْ دُوْنِ اللهِ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقُوْلُوْا اشْهَدُوْا بِأَنَّا مُسْلِمُوْنَ)
বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম
আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর পক্ষ হতে কিবত প্রধান মুক্বাওক্বিসের প্রতি-
সালাম তার উপর যে হিদায়াত অনুসরণ করবে। অতঃপর আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তিতে থাকবেন। ইসলাম গ্রহণ করুন, আল্লাহ আপনাদেরকে দ্বিগুণ সওয়াব প্রদান করবেন। কিন্তু আপনি যদি মুখ ফিরিয়ে নেন তাহলে কিবতীগণের পাপ বর্তিবে আপনারই উপর। হে কিবতীগণ এমন একটি কথার প্রতি তোমরা এগিয়ে এসো যা আমাদের ও তোমাদের মাঝে সমান তা এই যে আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও উপাসনা করব না এবং কাউকেও তাঁর অংশীদার করব না। অধিকন্তু, আমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকেও রব বা প্রভূ বানাবো না। অতঃপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে বলে দাও যে, ‘সাক্ষী থাক, আমরা মুসলিম।[2]
এ পত্রখানা পৌঁছানোর জন্য হাতিব বিন আবী বালতাআ’হ-কে মনোনীত করা হয়। তিনি মুক্বাওক্বিসের দরবারে উপস্থিত হয়ে বললেন, ‘এ পৃথিবীর উপর তোমাদের পূর্বে এ ব্যক্তি গত হয়ে গিয়েছেন যিনি নিজেই নিজেকে বড় প্রভূ মনে করতেন। আল্লাহ তাঁকে শেষ ও প্রথমের জন্য মানুষের শিক্ষণীয় করেছেন। প্রথমে তো তাঁর দ্বারাই মানুষ হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করেছেন। অতঃপর তাঁকেই প্রতিশোধের লক্ষ্য স্থলে পরিণত করেছেন। অতএব, অন্যদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন এবং এমন যেন না হয় যে, অন্যেরা আপনার থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে।’
মুক্বাওক্বিস বলল, ‘আমাদের একটি ধর্ম আছে এবং যতক্ষণ এর চাইতে উত্তম কিছু না পাব ততক্ষণ আমরা তা পরিত্যাগ করতে পারব না।’ হাতেব বিন আবি বাতলাত’ বলেন ‘আমরা আপনাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি যে ধর্মকে আল্লাহ তা‘আলা অন্যান্য সকল ধর্মের পরিপূরক হিসেবে তৈরি করেছেন। দেখুন, এ নাবী (ﷺ) মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। কুরাইশরা এ ব্যাপারে সব চাইতে শক্তভাবে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করেছে এবং ইহুদীরা সব চাইতে বেশী শত্রুতা করেছে। কিন্তু খ্রিষ্টানগণ সব চাইতে নিকটে থেকেছে। আমার জীবনের শপথ! মুসা (আঃ) যে ভাবে ঈসা (আঃ) সম্পর্কে শুভ সংবাদ দিয়েছেলেন, আমরা কুরআন মজীদের প্রতি আপনাদের ঐ ভাবে দাওয়াত দিতেছি, যেমনটি আপনারা তওরাতের অনুসারীদের ইঞ্জিলের প্রতি দাওয়াত দিয়েছিলেন। যখন যে সম্প্রদায়ের মাঝে যে নাবীর আবির্ভাব হয় তখন সেই সম্প্রদায়ের লোকজনদের সেই নাবীর উম্মত হিসেবে গণ্য করা হয়। সে নাবীর আনুগত্য করা তখন সে সম্প্রদায়ের লোকজনদের অবশ্য করণীয় কর্তব্য হয়ে পড়ে। আপনারা এ নাবীর অনুসরণ করেছেন। আমরা কিন্তু আপনাদেরকে মসীহ-র দ্বীন হতে বিরত থাকতে বলছিনা, বরং তারই দ্বীনের পরিপূরক ব্যবস্থার অনুসরণের জন্য দাওয়াত দিচ্ছি।
মুক্বাওক্বিস বললেন, ‘এ নাবীর ব্যাপারে আমি চিন্তাভাবনা করলাম। এতে আমি এটুকু পেলাম যে, তিনি কোন অপছন্দীয় কথা কিংবা কাজের নির্দেশ প্রদান করেননি এবং কোন পছন্দনীয় কথা কিংবা কাজ হতে নিষেধও করেননি। তাকে ভ্রষ্ট যাদুকর কিংবা মিথ্যুক ভবিষ্যদ্বক্তা বলেও মনে হয় না, বরং আমি তাঁর নিকট নবুওয়াতের এ সকল নিদর্শন পাচ্ছি যে তিনি গোপনকে প্রকাশ করেন এবং পরামর্শের সংবাদ দিতেছেন। আমি এ ব্যাপারে অধিক চিন্তাভাবনা করব। মুক্বাওক্বিস নাবী কারীম (ﷺ)-এর পত্রখানা হাতে নিয়ে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে হাতীর দাঁতের তৈরি একটি বাক্সে রাখলেন এবং তাতে সীলমোহর লাগিয়ে তা যত্ন সহকারে রেখে দেয়ার জন্য একজন দাসীর হাতে দিলেন। অতঃপর আরবী ভাষা লিখতে সক্ষম একজন কেরানী (লেখক) কে ডাকিয়ে নিয়ে রাসূলে কারীম (ﷺ)-এর খিদমতে নিম্নবর্ণিত পত্রখানা লিখলেন।
(بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ . لِمُحَمَّدِ بْنِ عَبْدِ اللهِ مِنْ الْمُقَوْقِسِ عَظِيْمِ الْقِبْطِ، سَلَامٌ عَلَيْكَ، أَمَّا بَعْدُ:
فَقَدْ قَرَأْتُ كِتَابَكَ، وَفَهِمْتُ مَا ذَكَرْتَ فِيْهِ، وَمَا تَدْعُوْ إِلَيْهِ، وَقَدْ عَلِمْتُ أَنَّ نَبِيًّا بَقِيٌّ، وَكُنْتُ أَظُنُّ أَنَّهُ يَخْرِجُ بِالشَّامِ، وَقَدْ أَكْرَمْتُ رَسُوْلَكَ، وَبَعَثْتُ إِلَيْكَ بِجَارِيْتِيْنَ، لَهُمَا مَكَانٌ فِيْ الْقِبْطِ عَظِيْمٌ، وَبِكِسْوَةٍ، وَأَهْدَيْتُ بَغْلَةً لِتَرْكَبِهَا، وَالسَّلَامُ عَلَيْكَ).
বিসমিললাহির রহমানির রাহীম, মুহাম্মাদ (ﷺ) বিন আব্দুল্লাহর প্রতি মহান মুক্বাওক্বিস কিবতের পক্ষ হতে :
‘আপনি আমার সালাম গ্রহণ করুন। অতঃপর, আপনার পত্র আমার হস্তগত হয়েছে। পত্রে উল্লেখিত আপনার কথাবার্তা ও দাওয়াত আমি উপলব্ধি করেছি। এখন যে একজন নাবীর আবির্ভাব ঘটবে সে বিষয়ে আমার ধারণা রয়েছে। আমরা ধারণা ছিল যে, শাম রাজ্য থেকে আবির্ভূত হবেন।
আমি আপনার প্রেরিত সংবাদ বাহকের যথাযোগ্য সম্মান ও ইজ্জত করলাম। আপনার প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ আপনার খিদমতে দুটি দাসী প্রেরণ করলাম। কিবতীদের মাঝে যারা বড় মর্যাদার অধিকারিণী। অধিকন্তু, আপনার পরিধানের জন্য কিছু পরিচ্ছদ এবং বাহন হিসেবে ব্যবহারের জন্য একটি খচ্চর পাঠালাম সামান্য উপঢৌকন হিসেবে। অতঃপর আপনার খিদমতে পুনরায় সালাম পেশ করলাম।’
মুক্বাওক্বিস এর অতিরিক্ত আর কিছুই লিখেন নি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা প্রদর্শন করলেও তিন কিন্তু ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করেননি। তাঁর প্রেরিত দাসী দুটির নাম ছিল মারিয়া এবং শিরীন। খচ্চরের নাম ছিল দুলদুল। খচ্চরটি মু’আবিয়ার সময় পর্যন্ত জীবিত ছিল।[3]
নাবী কারীম (ﷺ) মারিয়াকে বিবাহ করেন। তাঁর গর্ভে নাবী পুত্র ইবরাহীম জন্মলাভ করেন। শিরীনকে হাসসান বিন সাবেত আনসারীর হাতে দেয়া হয়।
[2] ইবনুল কাইয়্যেম রচিত যাদুল মা‘আদ ৩/৬১ পৃঃ। অল্পদিন পূর্বে এ পত্র হস্তগত হয়েছে। ডক্টর হামিদুল্লাহ সাহেব যে ফটোকপি ছেপেছেন তাতে এবং যাদুল মাআদে লিখিত পত্রে কেবল দুটি অক্ষরের পার্থক্য আছে। যাদুল মা‘আদে আছে,‘আসলিম তাসলাম, আসলিম ইয়ুতিকাল্লাহ........ আল ডক্টর হামিদুল্লাহ কর্তৃক প্রকাশিত ফটোকপির পত্রে আছে, ‘ফাআসলিম তাসলাম ইযুতিকাল্লাহু। এ ভাবে যাদুল মা‘আদে আছে ‘ইসমু আহলিল কিবতি’ এবং পত্রে আছে ‘ইসমুল কিবতি’ দ্রষ্টব্য ‘রাসূলে আকরাম কী সিয়াসী জিন্দেগী’’ পৃ: ১৩৬-১৩৭ ।
[3] যাদুল মাআদ ৩য় খন্ড ৬১ পৃঃ।
নাবী কারীম (ﷺ) পারস্য সম্রাট কিসরার (খসরু) নিকট একটি পত্র প্রেরণ করেন। এ প্রত্রের বিষয়বস্তু ছিল নিম্নরূপ :
(بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ . مِنْ مُحَمَّدٍ رَّسُوْلِ اللهِ إِلٰى كِسْرٰى عَظِيْمِ فَـارِسٍ، سَـلَامٌ عَلٰى مَنْ اِتَّبَعَ الْهُدٰي، وَآمَنَ بِاللهِ وَرَسُوْلِهِ، وَشَهِدَ أَنَّ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ، وَأَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ، وَأَدْعُوْكَ بِدِعَايَةِ اللهِ، فَإِنِّيْ أَنَا رَسُوْلُ اللهِ إِلَى النَّاسِ كَافَّةً، لِيُنْذِرَ مَنْ كَانَ حَيًّا وَيَحِقُّ الْقَوْلُ عَلٰى الْكَافِرِيْنَ، فَأََسْلِمْ تَسْلَمْ، فَإِنْ أَبِيْتَ فَإِنَّ إِثْمَ الْمَجُوْسِ عَلَيْكَ).
বিসমিল্লাহির রমানির রাহীম
আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর পক্ষ থেকে পারস্য সম্রাট কিসরার প্রতি।
সে ব্যক্তির উপর সালাম যে হেদায়াতের অনুসরণ করবে, আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং সাক্ষ্য প্রদান করবে যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ উপাসনার যোগ্য নেই। আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয়। তাঁর কোন অংশীদার নেই এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) তাঁর বান্দা ও রাসূল। আমি আপনাদেরকে আল্লাহর দিকে আহবান করছি। কারণ, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে মানব জাতির জন্য প্রেরিত, যাতে পাপাচারের খারাপ পরিণতি সম্পর্কে জীবিতদের সতর্ক করে দেয়া যায় এবং কাফিরদের নিকট সত্য প্রকাশিত হয় (অর্থাৎ দলিল প্রমাণাদি পুরোপুরি কার্যকর থাকে) অতঃপর তুমি ইসলাম গ্রহণ কর তাহলে নিরাপদে থাকবে। আর যদি তা অস্বীকার কর তাহলে তোমার উপর অগ্নি পূজকদের পাপও বর্তিবে।
এ পত্র বহনের দূত হিসেবে নাবী কারীম (ﷺ) আব্দুল্লাহ বিন হুযাফাহ সাহমীকে মনোনীত করেন। তিনি এ পত্রখানা বাহরাইনের প্রধানের নিকট সমর্পণ করেন। কিন্তু এ কথাটা জানা নেই যে, বাহরাইনের শাসনকর্তা এ পত্রখানা তার নিজস্ব লোক মারফত কিসরার নিকট পাঠিয়েছিলেন, না আব্দুল্লাহ বিন হুযাফা সাহমীকেই প্রেরণ করেছিলেন। যাহোক, যখন এ পত্রখানা কিসরাকে পড়ে শোনানো হয় সে তা ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে দাম্ভিকতার সঙ্গে বলল, ‘আমার প্রজাদের অন্তর্ভুক্ত একজন নিকৃষ্ট দাস তার নিজ নাম আমার নামের পূর্বে লিখেছে।’
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন কিসরার এ ঔদ্ধত্যের কথা অবগত হলেন তখন বললেন, ‘আল্লাহ যেন তার সাম্রাজ্যকে ছিন্ন ভিন্ন করে বিনষ্ট করে ফেলেন।’ এবং যা তিনি বললেন বাস্তবক্ষেত্রে তাই কার্যকর হয়ে গেল।
অতঃপর কিসরা তার ইয়ামানের গভর্ণর বাজানকে এ বলে লিখল যে, ‘দুজন কর্মঠ এবং শক্তিশালী লোক পাঠিয়ে হিজাযের সেই লোককে আমার দরবারে হাজির কর।’ কিসরার নিদের্শানুযায়ী বাজান দু’ ব্যক্তিকে মনোনীত করল এবং তাদের হতে একটি পত্র রাসূলে কারীম (ﷺ)-এর নিকট প্রেরণ করল। পত্রে রাসূলে কারীম (ﷺ)-কে কিসরা প্রাসাদে উপস্থিত হওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
যখন তারা মদীনা গিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সামনে উপস্থিত হল তখন তাদের একজন বলল, ‘সম্রাট কিসরা ইয়ামানের গভর্নর বাজানের নিকট একটি পত্রের মাধ্যমে নির্দেশ প্রদান করেছেন একজন লোক পাঠিয়ে আপনাকে কিসরা প্রাসাদে হাজির করার জন্য। বাজান প্রধান সে নির্দেশ পালনার্থে আপনার নিকট আমাদের প্রেরণ করেছেন। অতএব, আপনি আমাদের কিসরা প্রাসাদে চলুন। সঙ্গে সঙ্গে উভয়েই ধমকের সুরে কথাবার্তাও বলল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘আগামী কাল সাক্ষাত কর।’
এদিকে মদীনায় যখন এ চিত্তাকর্ষক ঘটনা সংঘটিত হচ্ছিল তখন কিসরা প্রাসাদে খসরু পারভেজের পরিবারে তার বিরুদ্ধে এক বিদ্রোহের অগ্নিশিখা প্রচন্ডবেগে প্রজ্জ্বলিত হচ্ছিল। এর ফলশ্রুতিতে কায়সারের সৈন্য দলের হাতে পারস্য সৈন্যদের পর পর পরাজয়ের পর খসরুর ছেলে শিরওয়াই পিতাকে হত্যা করে সিংহাসনে আরোহণ করে। এ ঘটনা সংঘটিত হয় ৭ম হিজরীর ১০ই জুমাদাল উলা মঙ্গলবার রাত্রে।[1] ওহীর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ ঘটনা সম্পর্কে অবহিত হন।
পরবর্তী প্রভাতে যখন পারস্য প্রতিনিধিদ্বয় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দরবারে উপস্থিত হল তখন তিনি তাদেরকে এ ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করেন। তারা বলল, ‘বুদ্ধি-সুদ্ধি কিছু আছে কি? এ আপনি কী বললেন? এ থেকে অনেক কিছু সাধারণ কথাও আমরা আপনার অপরাধগুলোর অন্তর্ভুক্ত গণনা করেছি। তবে কি আপনার এ কথা বাদশাহর নিকট লিখে পাঠাব?’
নাবী (ﷺ) বললেন, ‘হ্যাঁ, তাকে আমার এ সংবাদ জানিয়ে দাও এবং এ কথাও বলে দাও যে আমার দ্বীন ও আমার শাসন ঐ পর্যন্ত পৌঁছবে যেখানে কিসরা পৌঁছেছে, বরং তার চাইতেও অগ্রসর হয়ে ঐ জায়গায় গিয়ে থামবে যার আগে উট এবং ঘোড়ার পা যাবে না। তোমরা উভয়ে তাকে এ কথাও বলে দিবে যে, যদি সে মুসলিম হয়ে যায় তাহলে তার আয়ত্ত্বাধীনে যা কিছু সমস্তই তাকে দিয়ে দেয়া হবে এবং তাকে তোমাদের জাতির জন্য বাদশাহ করে দেয়া হবে।’
এরপর তারা দুজন মদীনা থেকে যাত্রা করে বাজানের নিকট গিয়ে পৌঁছল এবং তাকে বিস্তারিতভাবে সব কিছুই অবহিত করল। কিছু সময় পরে এ মর্মে একটি পত্র এল যে, শিরওয়াইহ আপন পিতাকে হত্যা করেছে। শিরওয়াইহ তার পত্র মাধ্যমে এ উপদেশও প্রদান করল যে, যে ব্যক্তি সম্পর্কে আমার পিতা তোমাদের পত্র লিখেছিল পুনরায় নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত তাঁকে উত্তেজিত করবে না।’
এ ঘটনার ফলে বাজান এবং তার পারসীয়ান বন্ধুগণ (যারা ইয়ামানে অবস্থান করছিল) মুসলিম হয়ে গেল।[2]
[2] আল্লামা খূযরী ‘মোহযারাত ১ম খন্ড ১৪৭ পৃঃ, ফাতহুলবারী ৮ম খন্ড ১২৭-১২৮ পৃ: এবং রহমাতুল্লিল আলামীন দ্রঃ।
সহীহুল বুখারীর একটি দীর্ঘ হাদীসে এ পত্রখানার বিষয়বস্তু বর্ণিত হয়েছে। নাবী কারীম (ﷺ) এ পত্রখানা রোম সম্রাট হিরাক্বল এর নিকট প্রেরণ করেছিলেন। এ পত্রখানার বিষয়বস্তু হচ্ছে নিম্নরূপ :
(بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ . مِنْ مُحَمَّدٍ عَبْدِ اللهِ وَرَسُوْلِهِ إِلٰى هِرَقِلَ عَظِيْمِ الرُّوْمِ، سَلَامٌ عَلٰى مَنْ اِتَّبَعَ الْهُدٰي، أَسْلِمْ تَسْلَمْ أَسْلِمْ يُؤْتِكَ اللهُ أَجْرَكَ مَرَّتَيْنِ، فَإِنْ تَوَلَّيْتَ فَإِنَّ عَلَيْكَ إِثْمُ الْأُرَيْسِيِّيْنَ (يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلٰى كَلَمَةٍ سَوَاء بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلاَّ نَعْبُدَ إِلاَّ اللهَ وَلاَ نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلاَ يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضاً أَرْبَابًا مِّنْ دُوْنِ اللهِ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقُوْلُوْا اشْهَدُوْا بِأَنَّا مُسْلِمُوْنَ)) [آل عمران:64].
বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম
আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর পক্ষ হতে রোম সম্রাট হিরাক্বল (হিরাক্লিয়াস) এর প্রতি-
সেই ব্যক্তির উপর সালাম যে হেদায়াতের অনুসরণ করে চলবে। আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন নিরাপদে থাকবেন। ইসলাম গ্রহণ করুন আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ প্রতিদান করবেন। কিন্তু যদি আপনি মুখ ফিরিয়ে নেন তাহলে আপনার উপর প্রজাবৃন্দেরও পাপ বর্তাবে। হে আল্লাহর গ্রন্থপ্রাপ্ত সম্প্রদায়! এমন এক কথার প্রতি আসুন যা আমাদের ও আপনাদের মাঝে সমান তা এই যে, আমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও উপাসনা করব না, তাঁর সঙ্গে কাউকেও শরীক বা অংশীদার করব না। তা সত্ত্বেও যদি লোকজন মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে বলে দাও যে, তোমরা সাক্ষী থাক যে, আমরা মুসলিম।[1]
এ পত্র প্রেরণের জন্য নাবী কারীম (ﷺ) দূত মনোনীত করলেন দাহয়াহ বিন খলীফা কালবীকে। নাবী (ﷺ) তাঁকে নির্দেশ প্রদান করলেন যে, তিনি যেন এ পত্র খানা বসরার প্রধানের নিকট সমর্পণ করেন। অতঃপর তিনি সেটা পৌঁছে দেবেন ক্বায়সারের নিকট। এরপর এ প্রসঙ্গে যা কিছু সংঘটিত হয়েছিল তাঁর বিবরণ সহীহুল বুখারীতে ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত আছে। তিনি বর্ণনা করেন যে, আবূ সুফইয়ান বিন হারব তাঁর নিকট বর্ণনা করেছেন যে, হিরাক্বল তাঁকে একটি কুরাইশ দলের সঙ্গে ডেকে পাঠান। এ দলটি হুদায়বিয়াহ সন্ধিচুক্তির আওতায় নিরাপত্তা লাভ হেতু শামদেশে গিয়েছিল ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে। এঁরা ঈলিয়া (বায়তুল মুক্বাদ্দাস) নামক স্থানে তাঁর নিকট উপস্থিত হলেন।[2]
হিরাক্বল তাঁদেরকে তাঁর দরবারে আহবান করলেন। ঐ সময় তাঁর পাশে রোমের প্রধান প্রধান ব্যক্তিগণ উপস্থিত ছিলেন। অতঃপর তিনি তাঁর দোভাষীর মাধ্যমে মুসলিমগণের উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘যে ব্যক্তি নিজেকে নাবী বলে দাবী করেছেন তাঁর সঙ্গে আপনাদের মধ্যে কে সর্বাপেক্ষা ঘনিষ্ট?’ আবূ সুফইয়ানের বর্ণনা যে, ‘আমি বললাম, আমি সর্বাপেক্ষা ঘনিষ্ট।’
হিরাক্বল বললেন, ‘তাকে আমার নিকট নিয়ে এসো এবং তার সঙ্গী সাথীদেরকেও তার পেছনে বসাও।’’
এরপর হিরাক্বল নিজ দোভাষীকে বললেন, ‘আমি এ ব্যক্তিকে এ নাবী সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করব। এ যদি মিথ্যা বলে তবে তোমরা তা মিথ্যা বলে প্রমাণ করবে।’
আবূ সুফইয়ান বলল, ‘আল্লাহর কসম! মিথ্যা বলার কারণে আমাকে মিথ্যুক বলে আ্যখায়িত করার ভয় যদি না থাকত তবে আমি অবশ্যই নাবী (ﷺ) সম্পর্কে মিথ্যা বলতাম।’
আবূ সুফয়ান বলেছেন, ‘এরপর নাবী (ﷺ) সম্পর্কে হিরাক্বল আমাকে প্রথম যে প্রশ্নটি জিজ্ঞেস করেছিলেন তা হচ্ছে তোমাদের মধ্যে তাঁর বংশ মর্যাদা কেমন?
আমি বললাম, ‘তিনি উচ্চ বংশোদ্ভূত।’
হিরাক্বল বললেন, ‘তবে এ কথা তাঁর পূর্বে তোমাদের মধ্যে অন্য কেউ কি বলেছিল।?’
আমি বললাম, ‘না’’, হিরাক্বল পুনরায় বললেন, ‘তাঁর পূর্ব পুরুষদের মধ্যে কেউ কি রাজা ছিল? আমি বললাম, ‘না’। হিরাক্বল বললেন, ‘আচ্ছা তবে সম্মানিত লোকজন তাঁর অনুসরণ করেছে, না দুর্বল লোকজন?’
আমি বললাম, ‘বরং দুর্বল লোকজন।’
হিরাক্বল জিজ্ঞেস করলেন, ‘এদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে না কমছে?’
আমি বললাম, ‘কমছে না, বরং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
হিরাক্বল বললেন, ‘এ দ্বীন গ্রহণের পর কোন ব্যক্তি কি বিদ্রোহী হয়ে ধর্মত্যাগ করছে?’
আমি বললাম, ‘না’
হিরাক্বল বললেন, ‘তিনি যখন থেকে এ সব কথা বলছেন তাঁর পূর্বে কি তাঁকে তোমরা কোন মিথ্যার সঙ্গে জড়িত দেখেছ?’
আমি বললাম, ‘না’
হিরাক্বল বললেন, ‘তিনি কি অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন?’
আমি বললাম, না, তবে এখন আমরা তাঁর সঙ্গে সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ রয়েছি। এর মধ্যে বেশ দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়েছে। জানি না, এ ব্যাপারে এরপর তিনি কী করবেন।’
এ প্রসঙ্গে আবূ সুফইয়ান বলেছেন যে, এ বাক্যটি ছাড়া অন্য কথা তাঁর বিপক্ষে বলার সুযোগ আমি পাই নি।
হিরাক্বল বললেন, ‘কোন সময় তাঁর সঙ্গে কি তোমরা যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত হয়েছ?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ’
হিরাক্বল বললেন, ‘তোমাদের এবং তাঁর যুদ্ধের অবস্থা কিরূপ ছিল?
আবূ সুফইয়ান বললেন, আমাদের ও তাঁর মাঝে যে যুদ্ধ হয়েছিল তা ছিল বালতির ন্যায় অর্থাৎ তিনি আমাদের পরাজিত করেছেন এবং আমরা তাঁকে পরাজিত করেছি।’
হিরাক্বল বললেন, ‘তিনি তোমাদেরকে কী ধরণের কথাবার্তা এবং কাজকর্মের নির্দেশ করেন?’
আমি বললাম,
يقول: اعبدوا الله وحده ولا تشركوا به شيئا واتركوا ما يقول اٰباؤكم ويأمرنا بالصلاة والصدق والعفاف والصلة
‘তিনি আমাদেরকে একমাত্র আল্লাহর উপাসনা করতে, তাঁর সঙ্গে কাউকেও শরীক না করতে, আমাদের পূর্বপুরুষেরা যা বলতেন তা ছেড়ে দিতে, সালাত কায়েম করতে, সত্যবাদিতা, পাপ এড়িয়ে চলা ও পুণ্যশীল আচরণ করতে এবং আত্মীয়দের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে নির্দেশ দিতেছেন।’
এরপর হিরাক্বল তাঁর দোভাষীকে বললেন, ‘তুমি ঐ ব্যক্তিকে (আবূ সুফইয়ানকে) বল যে, আমি এ নাবীর সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞেস করলাম তখন তুমি বললে যে, তিনি হচ্ছেন উচ্চবংশোদ্ভূত ব্যক্তি। এটাই নিয়ম যে নিজ জাতির ক্ষেত্রে নাবীগণ উচ্চ বংশীয় হয়ে থাকেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম যে, (নবুওয়াতের) এ কথা তাঁর পূর্বেও কি তোমাদের মধ্যে কেউ বলেছিল? তুমি উত্তর দিয়েছ ‘না’। আমি বলছি যে, এর পূর্বে অন্য কেউ যদি এ কথা বলে থাকত তাহলে আমি বলতাম যে এ ব্যক্তি এমন এক কথার অনুকরণ করছে যা এর পূর্বে বলা হয়েছিল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম যে তাঁর পিতা কিংবা পিতৃব্যের মধ্যে কেউ কি বাদশাহী করেছেন। এর উত্তরে তুমি বলেছ, ‘না’’। এ প্রসঙ্গে আমি বলছি যে, যদি পিতা কিংবা পিতৃব্যের মধ্য হতে কেউ বাদশাহী করেছেন বলে প্রমাণিত হতো তাহলে বলতাম যে, এ ব্যক্তি পিতা কিংবা পিতৃব্যের রাজত্বের দাবীদার হওয়ার প্রেক্ষাপটেই এ কথা বলছেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইতোপূর্বে তাঁকে কি মিথ্যুক বলে দোষারোপ করা হয়েছে? তুমি বললে, ‘না’ আমি ভাল ভাবেই জানি যে, যে লোক মানুষের সঙ্গে মিথ্যাচরণ করে না সে আল্লাহর সম্পর্কে মিথ্যা বলতে পারে না। আমি জিজ্ঞেস করলাম যে, তাঁর অনুসরণকারীগণ বিত্তশালী ও প্রভাবশালী লোক, না নিম্নবিত্ত ও দুর্বলতর শ্রেণীর লোক। তার উত্তরে তুমি বললে যে, দরিদ্র এবং দুর্বলতর শ্রেণীর লোকেরাই তাঁর অনুসরণ করে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে এ শ্রেণীর লোকেরাই পয়গম্বরদের অনুসারী হয়ে থাকেন।
আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, ‘এ দ্বীনে প্রবেশ করার পর কি কেউ বিরক্ত হয়ে মুরতাদ হয়ে যায়?’ উত্তরে তুমি বলেছ, ‘না’। প্রকৃতপক্ষে ব্যাপারটি হচ্ছে, দ্বীনে প্রবেশকারী ব্যক্তি ঈমানের আস্বাদ পেয়ে গেলে এরূপই হয়ে থাকে।
আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম যে তিনি কি অঙ্গীকার ভঙ্গ করে থাকেন?
উত্তরে তুমি বলেছিলে, ‘না’।
পয়গম্বরের ব্যাপার এ রকমই হয়ে থাকে। তিনি কখনো অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন না।
আমি এ প্রশ্নও করেছিলাম যে, তিনি কী ধরণের কথা এবং কাজের নির্দেশ প্রদান করেছেন? উত্তরে তুমি বললে যে, তিনি একমাত্র আল্লাহর উপাসনা করতে এবং তাঁর সঙ্গে কাউকেও শরীক না করার জন্য বলেছেন। অধিকন্তু, মূর্তিপূজা থেকে বিরত থাকতে, সলাত কায়েম করতে এবং সত্যবাদিতা, মিথ্যাচারিতা হতে বেঁচে থাকতে ও পূণ্যশীলতা অবলম্বন করতে বলেছেন।
এ প্রসঙ্গে এখন কথা হচ্ছে, তাঁর সম্পর্কে তুমি যা কিছু বলেছ তা যদি সঠিক ও সত্য হয়, তাহলে এ ব্যক্তি খুব শীঘ্রই আমার দু’ পদতলের জায়গার অধিকার লাভ করবেন। আমার জানা ছিল যে, এ নাবীর আবির্ভাব ঘটবে। কিন্তু আমার ধারণা ছিল না যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে আসবেন। যদি নিশ্চিত হতাম যে আমি তাঁর নিকট পৌঁছতে সক্ষম হব তাহলে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য কষ্ট স্বীকার করতাম। আর যদি তাঁর নিকটবর্তী হতাম তাহলে তাঁর পদদ্বয় ধৌত করে দিতাম।’
এরপর হিরাক্বল রাসূলে কারীম (ﷺ)-এর প্রেরিত পত্রখানা চেয়ে নিয়ে পাঠ করলেন। পত্রখানা পাঠ করে যখন শেষ করলেন তখন সেখানে শ্রুত কণ্ঠস্বরসমূহ ক্রমান্বয়ে উচ্চমার্গে উঠতে থাকল এবং শেষ পর্যন্ত খুব শোরগোল সৃষ্টি হয়ে গেল। হিরাক্বলের নির্দেশে আমাদের তখন সেখান থেকে বের করে দেয়া হল। আমাদের যখন বাইরে নিয়ে আসা হল তখন আমি আমার সঙ্গীদের বললাম, ‘আবূ কাবশার[3] ছেলের ব্যাপারটি বড় শক্তিশালী হয়ে গেল। তার সম্পর্কে বনু আসফার[4] (রোমীয়দের) সম্রাট ভয় করছেন। আমার বিশ্বাস হচ্ছে যে, এর পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দ্বীন জয়যুক্ত হয়ে যাবে। এমনকি আল্লাহ আমার অন্তরে ইসলামের স্থান করে দিলেন।
এ ক্বায়সারের উপর নাবী কারীম (ﷺ)-এর মুবারক পত্রের যে প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছিল তা আবূ সুফইয়ান নিজেই প্রত্যক্ষ করেছিলেন। এ মুবারক পত্র যে ক্বায়সারকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল তার দ্বিতীয় প্রমাণ হচ্ছে, এর প্রভাবে তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দূত দাহইয়া কালবী (ﷺ)-কে অর্থ সম্পদ এবং মূল্যবান পোশাক দ্বারা পুরস্কৃত করেছিলেন। কিন্তু দাহইয়া কালবী (রাঃ) যখন এ সকল উপঢৌকনসহ প্রত্যাবর্তন করছিলেন তখন হুসমা নামক স্থানে জোযাম গোত্রের কিছু সংখ্যক লোক তাঁর কাছ থেকে সব কিছু লুট পাট করে নিয়ে যায়। দেহয়া মদীনা প্রত্যাবর্তনের পর নিজ গৃহে না গিয়ে খিদমতে নাবাবীতে উপস্থিত হন এবং নাবী কারীম (ﷺ)-কে সব কিছু অবহিত করেন।
ঘটনা সবিস্তারে অবগত হয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যায়দ বিন হারিসাহ (ﷺ)-এর নেতৃত্বাধীনে পাঁচ শত সাহাবা কেরামের (রাঃ) একটি দলকে হুসমা অভিমুখে প্রেরণ করেন। যায়দ (রাঃ) রাত্রিবেলা অতর্কিতভাবে জুযাম গোত্রের উপর আক্রমণ পরিচালনা করে তাদের কিছু সংখ্যক লোককে হত্যা করেন এবং বেশ কিছু সংখ্যক গবাদি পশু ও মহিলাকে আটক করে নিয়ে আসেন। গবাদি পশুর মধ্যে ছিল এক হাজার উট ও পাঁচ হাজার ছাগল। আটককৃতদের মধ্যে ছিল এক শত মহিলা এবং শিশু।
যেহেতু নাবী কারীম (ﷺ) এবং জোযাম গোত্রের মধ্যে পূর্ব হতেই সন্ধিচুক্তি বলবৎ ছিল সেহেতু এ গোত্রের অন্যতম নেতা যায়দ বিন রিফাআ’হ জুযামী কালবিলম্ব না করে নাবী কারীম (ﷺ) সমীপে উপস্থিত হয়ে বাদানুবাদ ও বিতর্কে লিপ্ত হয়ে ঘটনার প্রতিবাদ করলেন। এ গোত্রের কিছু লোকজনসহ যায়দ বিন রিফাআ’হ পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এ প্রেক্ষিতে দাহয়াহ কালবী যখন ডাকাত দলের কবলে পতিত হলেন তখন তিনি তাঁর সাহায্যও করেছিলেন। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর প্রতিবাদ গ্রহণ করে গণিমতের সম্পদে এবং আটককৃতদের ফেরতদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
সাধারণ যুদ্ধের ইতিহাস বিশারদগণ উল্লেখিত ঘটনাকে হুদায়াবিয়া সন্ধির পূর্বের ব্যাপার বলে উল্লেখ করেছেন।
কিন্তু তা হচ্ছে চরম ভ্রান্তির ব্যাপার। কারণ, ক্বায়সারের নিকট মুবারক পত্র প্রেরণের ঘটনাটি ছিল হুদায়বিয়াহ সন্ধির পরের। এ জন্যই আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম বলেছেন যে, এ ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল নিঃসন্দেহে হুদায়বিয়াহ সন্ধির পরে।[5]
[2] ঐ সময় কায়সার সে কথার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের জন্য হিমস হতে ঈলিয়া (বায়তুল মোকদ্দাস) গিয়েছিল যে, আল্লাহ তার হাতে পারস্যবাসীকে পরাজিত করেছে। (সহীহুল মুসলিম ২য় খন্ড ৯৯ পৃঃ) এর বিস্তারিত বিবরণ হচেছ পারস্যবাসী খসরু পারভেজকে হত্যা করার পর রোমীদের নিকট হতে তাদের দখলকৃত অঞ্চলসমূহ ফেরতের শর্তে সন্ধি করল এবং তারা ক্রুমও ফেরত দিল। যে কারণে খ্রিষ্টানদের বিশ্বাস যে এর উপর ঈ্যসা (আঃ)-কে ফাঁসী দেয়া হয়েছিল। উ্ক্ত সন্ধির পর কায়সার ক্রুশকে স্বস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং প্রকাশ্যে বিজয়ের প্রেক্ষিতে আল্লাহ তা’আলার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দের অর্থাৎ ৭ম হিজরী তে (ঈলিয়া) বায়তুল মোকাদ্দাস গিয়েছিল।
[3] অবু কাবশার ছেলে বলতে স্বয় নাবী কারীম (সাঃ)-কে বুঝান হয়েছে। নাবী কারীম (সাঃ)-এর দাদা কিংবা নানা উভয়ের মধ্যে কোন এক জনের উপনাম ছিল আবূ কাবশা। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এ উপনামটি ছিল নাবী কারীম (সাঃ)-এর দুধ পিতার, অর্থাৎ হালীমাহ সা’দিয়ার স্বামীর। যাহোক, আবূ কাবশা নামটির পরিচিতি তেমন একটা ছিল না। তৎকালীন আরবের একটি নিয়ম ছিল এ রকম যে, কেউ কারো দোষ বাহির করার ইচ্ছা করত তখন তাকে তার পূর্ব পুরুষদের মধ্যে হতে কোন অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করে দেয়া হত।
[4] বনু আসফার বলতে আসফারের সন্তান বুঝানো হয়েছে। আসফার অর্থ হলুদ রঙ। রোমীদেরকে বনু আসফার বলা হত। কারণ রোমের যে ছেলের মাধ্যমে রোমীয় বংশের উদ্ভব হয়েছিল কোন কারণে সে আসফার উপাধিতে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল।
[5] দ্রষ্টব্য আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম রচিত যাদুল মা‘আদ ২য় খন্ড ১২২ পৃঃ, তালকিহুল ফোহুমের পৃষ্ঠার হাশিয়াহ ২৯ পৃঃ।
মুনযির বিন সাভী ছিলেন বাহরাইনের গভর্ণর। ইসলামের দাওয়াত প্রদান করে নাবী কারীম (ﷺ) তাঁর নিকট একটি পত্র প্রেরণ করেন। পত্রখানা বহন করেন আলা ইবনুল হাযরামী (রাঃ)। পত্র পাওয়ার পর মুনযির রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে এ মর্মে উত্তর প্রদান করেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আপনার পত্রখানা আমি বাহরাইনবাসীগণকে পাঠ করে শুনিয়ে দিলাম। কতগুলো লোক ইসলামের ভালবাসা এবং পবিত্রতার মনোভাব ব্যক্ত করে তার সুশীতল ছায়া তলে আশ্রয় গ্রহণ করল। কিন্তু কিছু সংখ্যক লোক বিরূপ মনোভাব ব্যক্ত করে মুখ ফিরিয়ে নিল। আমার জমিনে ইহুদী এবং অগ্নি উপাসকও আছে। অতএব এ ব্যাপারে আপনি আপনার নিজস্ব কর্ম প্রক্রিয়া অবলম্বন করুন।
প্রত্যুত্তরে রাসূলে কারীম (ﷺ) তাঁকে এ পত্র লিখলেন,
(بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ . مِنْ مُحَمَّدٍ رَّسُوْلِ اللهِ إِلَى الْمُنْذِرِ بْنِ سَاوِيْ، سَلَامٌ عَلَيْكَ، فَإِنِّيْ أَحْمَدُ إِلَيْكَ اللهَ الَّذِيْ لَا إِلٰهَ إِلَّا هُوَ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ، أَمَّا بَعْدُ، فَإِنِّيْ أَذْكُرُكَ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ، فَإِنَّهُ مَنْ يَنْصَحُ فَإِنَّمَا يَنْصَحُ لِنَفْسِهِ، وَإِنَّهُ مَنْ يُّطِيْعُ رُسُلِيْ وَيَتَّبِعُ أَمْرَهُمْ فَقَدْ أطَاعَنِيْ، وَمْنَ نَصَحَ لَهُمْ فَقَدْ نَصَحَ لِيْ، وَإِنَّ رُسُلِيْ قَدْ أَثْنَوْا عَلَيْكَ خَيْراً، وَإِنِّيْ قَدْ شَفَعْتُكَ فِيْ قَوْمِكَ، فَاتْرُكْ لَلْمُسْلِمِيْنَ مَا أَْسَلُمْوا عَلَيْهِ، وَعَفَوْتَ عَنْ أَهْلِ الذُّنُوْبِ، فَاقْبِلْ مِنْهُمْ، وَإِنَّكَ مَهْمَا تَصْلِحُ فَلَمْ نَعْزِلْكَ عَنْ عَمَلِكَ. وَمَنْ أَقَامَ عَلٰى يَهُوْدِيَةٍ أَوْ مَجُوْسِيَةٍ فَعَلَيْهِ الْجِزْيِةُ).
বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম
‘আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর পক্ষ হতে মুনযির বিন সাভীর নিকট পত্র-
আপনার প্রতি সালাম বর্ষিত হোক। সর্ব প্রথমে আমি ঐ আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করছি যিনি ব্যতীত অন্য কেউ প্রশংসা কিংবা উপাসনার উপযুক্ত নয়। আমি আরও সাক্ষ্য দিতেছি যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) তাঁর বান্দা এবং প্রেরিত রাসূল।
অতঃপর আমি তোমাদেরকে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। এটা অবশ্যই স্মরণ থাকা প্রয়োজন যে, যে ব্যক্তি সৌজন্য প্রদর্শন করবে এবং পুণ্য অর্জন করবে সে নিজের উপকারার্থে তা করবে এবং যে ব্যক্তি আমার প্রতিনিধির অনুকরণ ও তাঁর নির্দেশাবলীর আনুগত্য করবে সে যেন আমারই আনুগত্য করবে। যে তাঁর সঙ্গে সৌজন্যমূলক ব্যবহার করবে, সে যেন আমারই সঙ্গে তা করল। আমার প্রতিনিধিগণ আপনার প্রশংসা করেছে এবং আপনার জাতি সম্পর্কে আমি আপনার সুপারিশ গ্রহণ করেছি। অতএব, মুসলিমগণ যে অবস্থার মধ্যে ঈমান এনেছে তাদরকে সেই অবস্থার মধ্যে ছেড়ে দিন। আমি অপরাধীদের অপরাধ মাফ করে দিয়েছি। অতএব, তাদেরকে গ্রহণ করে নিন এবং যতক্ষণ আপনি সংশোধনের পথ অবলম্বন করে থাকবেন আমরা আপনাদেরকে আপনাদের কাজ হতে অপসারিত করব না। তবে যারা ইহুদী ধর্ম অথবা মাজূসিয়াতের উপর বিদ্যমান থাকবে তাদের উপর (জিজিয়া) কর প্রযোজ্য হবে।[1]
নাবী কারীম (ﷺ) ইয়ামামার গভর্ণর হাওযাহ বিন আলীর নিকট যে পত্র প্রেরণ করেছিলেন তা নিম্নে লিপিবদ্ধ করা হল।
(بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ . مِنْ مُحَمَّدٍ رَّسُوْلِ اللهِ إِلٰى هَوْذَةَ بْنِ عَلِيْ، سَلَامٌ عَلٰى مَنْ اِتَّبَعَ الْهُدٰى، وَاعْلَمْ أَنَّ دِيْنِيْ سَيَظْهَرُ إِلٰى مُنْتَهَي الْخفِّ وَالْحَافِرِ، فَأَسْلِمْ تَسْلَمْ، وَأجْعَلْ لَكَ مَا تَحْتَ يَدَيْكَ).
বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম
আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর পক্ষ হতে হাওযাহ বিন আলীর প্রতি-
সে ব্যক্তির উপর শান্তি বর্ষিত হোক যে হেদায়াতের অনুসরণ করে। আপনাদের জানা উচিত যে আমার দ্বীন উট এবং ঘোড়াগুলোর উপস্থিতির শেষ পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে থাকবে। অতএব, ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তিতে থাকবেন। আপনার অধীনস্থ যা কিছু আছে তা আপনার জন্য স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত রাখব।’
এ পত্রখানা বহনের জন্য দূত বা প্রতিনিধি হিসেবে সালীত্ব বিন ‘আমর আমেরীকে (রাঃ) মনোনীত করা হয়। সালীত্ব (রাঃ) এ মোহরাঙ্কিত পত্রখানা নিয়ে হাওযাহর নিকট গমন করেন। হাওযাহ তাঁকে যথেষ্ট আদর আপ্যায়ন ও আতিথ্য প্রদান করেন। সালীত (রাঃ) তাঁকে পত্রখানা পাঠ করে শোনান। পত্রের মর্ম অবগত হওয়ার পর তিনি মধ্যম পন্থায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খিদমতে লিখলেন,
ما احسن ما تدعون اليه واجمله والعرب تهاب مكانى فاجعل لي بعض الامر اتبعك
‘আপনি যে বিষয়ের প্রতি আহবান জানাচ্ছেন তার উৎকর্ষতা এবং শ্রেষ্ঠতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসার কিছুই নেই। এ ব্যাপারে আমার অন্তরে যথেষ্ট ভয় ভীতির সঞ্চার হয়েছে এবং আমি কিছু খিদমত প্রদানের মনস্থ করেছি। অতএব, আমার উপর কিছু কাজ কর্মের দায়িত্ব অর্পণ করা হলে আমি আপনার আনুগত্য করার জন্য প্রস্তুত আছি।’ তিনি সালীত্ব (রাঃ)-কে অনেক উপঢৌকনও প্রদান করেন। তাঁকে হিজরের তৈরি কাপড় চোপড়ও প্রদান করেন। সালীত্ব (রাঃ) এ সকল উপঢৌকনসহ মদীনায় ফিরে এসে খিদমতে নাবাবীতে উপস্থিত হন এবং সব কিছুর সম্পর্কে অবহিত করেন।
নাবী কারীম (ﷺ)-কে পত্রখানা পাঠ করে শোনানো হলে তিনি বললেন,
(لَوْ سَأَلَنِيْ قِطْعَةً مِّنْ الْأَرْضِ مَا فَعَلَتُ، بَادٍ، وَبَادِ مَا فِيْ يَدِيْهِ)
‘যদি সে জমিনের একটি অংশ আমার নিকট থেকে চায় তবুও আমি তাকে তা দিব না। সে নিজে ধ্বংস হবে এবং তার হাতে যা কিছু আছে সবই ধ্বংস হবে’’। অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মক্কা বিজয়ের পর ফিরে আসেন তখন জিবরাঈল (আঃ) এ সংবাদ প্রদান করেন যে, হাওযার মৃত্যু হয়েছে।
নাবী কারীম (ﷺ) বললেন,
(أَمَا إِنَّ الْيَمَامَةَ سَيَخْرِجُ بِهَا كَذَّابٌ يَتَنَبّيٰ، يُقْتَلُ بَعْدِيْ)
‘শোন! ইয়ামামায় একজন মিথ্যুকের আবির্ভাব ঘটবে যাকে আমার পর হত্যা করা হবে।’
একজন বলে উঠলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! তাকে কে হত্যা করবে।’ নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, (أَنْتَ وَأَصْحَابُكَ) ‘তুমি ও তোমার সাথীরা। বাস্তবিক পক্ষে তাই হয়েছিল।[1]
নাবী কারীম (ﷺ) তাঁর নিকট যে পত্র লিখেছিলেন তার বিষয়বস্তু নিম্নে লিপিবদ্ধ করা হল:
(بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ . مِنْ مُحَمَّدٍ رَّسُوْلِ اللهِ إِلَى الْحَارِثِ بْنِ أَبِيْ شَمْرٍ، سَلَامٌ عَلٰى مَنْ اِتَّبَعَ الْهُدٰى، وَآمَنَ بِاللهِ وَصَدَقَ، وَإِنِّيْ أَدْعُوْكَ إِلٰى أَنْ تُؤْمِنَ بِاللهِ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ، يِبْقِيْ لَكَ مُلْكَكَ).
বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম
‘আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর পক্ষ হতে হারিস বিন আবি শামর গাসসানীর প্রতি। সে ব্যক্তির উপর শান্তি বর্ষিত হোক যে ঈমান এনেছে, বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং হেদায়াতের অনুসরণ করে। আমি আপনাদের আহবান জানাচ্ছি যে, সেই আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করুন যিনি একক এবং অদ্বিতীয়, তাঁর কোনই অংশীদার নেই এবং যিনি একমাত্র উপাসনার উপযুক্ত। ইসলামের দাওয়াত কবুল করুন, আপনাদের জন্য আপনাদের রাজত্ব স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে।’
এ পত্র প্রেরণ করা হয় আসাদ বিন খুযায়মাহ গোত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাহাবী শুজা’ বিন অহাবে (রাঃ)-এর হাতে। যখন তিনি এ পত্রখানা হারেসের হাতে সমর্পণ করেন তখন সে বলল, ‘আমার রাজত্ব কে ছিনিয়ে নিতে পারে? আমি তার উপর আক্রমণ পরিচালনা করব।’ সে ইসলাম গ্রহণ করলো না।
এতদ শ্রবণে বাদশাহ ক্বায়সার তার সাহসী পদক্ষেপের প্রশংসা করে তাকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার অনুমতি দেয়। হারিস শুজা’ বিন ওয়াহাবকে উর্দী কাপড় খাদ্যসামগ্রী দিয়ে উত্তমপন্থায় বিদায় করেন।
নাবী কারীম (ﷺ) আম্মানের সম্রাট জাইফার এবং তাঁর ভাই আবদের নামে একটি পত্র প্রেরণ করেন। তাদের উভয়ের পিতার নাম ছিল জুলান্দাই। পত্রের বিষয়বস্তু ছিল নিম্নরূপ :
(بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ . مِنْ مُحَمَّدٍ رَّسُوْلِ اللهِ إِلٰى جَيْفَرَ وَعَبْدِ ابْنِيْ الْجَلَنْدِيْ، سَلَامٌ عَلٰى مَنْ اِتَّبَعَ الْهُدٰي، أَمَّا بَعْدُ:
فَإِنِّيْ أَدْعُوْكُمَا بِدِعَايَةِ الْإِسْلَامِ، أَسْلِمَا تَسْلِمَا، فَإِنِّيْ رَسُوْلُ اللهَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى النَّاسِ كَافَّةً، لِأُنْذِرُ مَنْ كَانَ حَيًّا وَيَحِقُّ الْقَوْلُ عَلَى الْكَافِرِيْنَ، فَإِنَّكُمَا إِنْ أَقْرَرْتُمَا بِالْإِسْلَامِ وَلَّيْتُكُمَا، وَإِنْ أَبَيْتُمَا [أَنْ تُقِرَّا بِالْإِسلَامِ] فَإِنَّ مُلْكَكُمَا زَائِلٌ، وَخَيْلِيْ تَحِلُّ بِسَاحَتِكُمَا، وَتَظْهَرُ نُبُوَّتِيْ عَلٰى مُلْكِكُمَا)
বিসমিল্লাহির রহামানির রহীম
মুহাম্মাদ (ﷺ) বিন আব্দুল্লাহর পক্ষ হতে জালান্দাই’র দু’ পুত্র জাইফার এবং আবদের নামে।
শান্তি বর্ষিত হোক সে ব্যক্তির উপর যিনি হেদায়াতের অনুসরণ করে চলেন। অতঃপর আমি আপনাদের দু’জনকে ইসলামের দাওয়াত দিতেছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তিতে থাকবেন। কারণ, আমি আল্লাহর রাসূল হিসেবে বিশ্বমানবের নিকট প্রেরিত হয়েছি যাতে জীবিত ব্যক্তিদের শেষ পরিণতির বিভীষিকা হতে সতর্ক করে দেই এবং কাফিরদের উপর আল্লাহর কথা সত্য প্রমাণিত হয়। যদি আপনারা দুইজন ইসলামের দাওয়াত গ্রহণ করেন তবে আপনাদেরকেই শাসক এবং গভর্ণর নিযুক্ত করে দিব। কিন্তু আপনারা যদি ইসলামের দাওয়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন তাহলে আপনাদের রাজত্ব শেষ হয়ে যাবে। আপনাদের রাজত্বে ঘোড়সওয়ার সৈন্যদের আক্রমণ পরিচালিত হবে এবং আপনাদের রাজত্বের উপর আমার নবুয়ত জয়যুক্ত হবে।
এ পত্র বহনের জন্য প্রতিনিধি হিসেবে ‘আমর বিন আসকে মনোনীত করা হয়। তিনি বর্ণনা করেছেন, ‘মদীনা থেকে যাত্রা করে আমি আম্মানে গিয়ে পৌঁছি এবং আবদের সঙ্গে সাক্ষাত করি। দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনিই অধিক দূরদর্শী এবং কোমল স্বভাবের ছিলেন। আমি বললাম, আমি আপনার এবং আপনার ভাইয়ের নিকট রাসূলে কারীম (ﷺ)-এর প্রতিনিধি হিসেবে আগমন করেছি।’ তিনি বললেন, বয়স এবং রাজত্ব উভয় দিক দিয়েই আমার ভাই আমার চাইতে বড় এবং আমার ঊর্ধ্বতন। এ কারণে আমি আপনাকে তাঁর নিকট পৌঁছে দিচ্ছি যেন তিনি আপনার পত্রখানা পাঠ করেন।
অতঃপর তিনি বললেন, ‘বেশ! আপনি কোন কথার দাওয়াত দিচ্ছেন?’
আমি বললাম, ‘আমরা এক আল্লাহর প্রতি আহবান জানাচ্ছি যিনি একক এবং অদ্বিতীয়, যাঁর কোন অংশীদার নেই এবং যিনি ব্যতীত আর কেউ উপাসনার উপযুক্ত নয়। আমরা বলছি যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য যাদের উপাসনা করা হচ্ছে তাদের পরিত্যাগ করুন এবং সাক্ষ্য প্রদান করুন যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর বান্দা এবং প্রেরিত পুরুষ।’
আবদ বললেন, ‘হে ‘আমর! আপনি নিজ সম্প্রদায়ের নেতার পুত্র। বলুন আপনার পিতা কী কী করেছেন? কারণ, তাঁর কার্যক্রম হবে আমাদের অনুসরণীয়।’
আমি বললাম, তিনি তো মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন ছাড়াই মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছেন। কিন্তু আমার দুঃখ হচ্ছে, যদি তিনি ইসলাম গ্রহণ করতেন এবং নাবী (ﷺ)-এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতেন। তাহলে কতই না ভাল হত! আমিও তাঁর পূর্বে তাঁর মতোই ছিলাম। কিন্তু আল্লাহ আমার প্রতি ইসলামের হিদায়াত প্রদান করেছেন।’
অবদ বললেন, ‘আপনি কখন তার আনুগত্য স্বীকার করেছেন?’
আমি বললাম, ‘অল্প কিছু দিন হল।’’
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কোথায় ইসলাম গ্রহণ করেছেন?’
আমি বললাম, ‘নাজ্জাশীর নিকট। তিনিও ইসলাম গ্রহণ করেছেন।’
আবদ জিজ্ঞেস করলেন, ‘তাঁর সম্প্রদায় ও সাম্রাজ্যের লোকেরা কী করল?’
আমি বললাম, তাঁকে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত রেখে তাঁর আনুগত্য করে।’
তিনি বললেন, মন্ত্রী পরিষদ এবং রাহিবগণও কি আনুগত্য করেছে?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ’।
আবদ বললেন, ‘হে ‘আমর, এ কী বলছেন। কারণ, মানুষের কোন অভ্যাস মিথ্যার চাইতে অপমানজনক আর কিছুই নেই।’
আমি বললাম, ‘আমি মিথ্যা বলছি না এবং ‘আমর মিথ্যা বলা বৈধ মনে করে না।’
আবদ বললেন, ‘আমি মনে করছি, হিরাক্বল নাজ্জাশীর ইসলাম গ্রহণের খবর জানেন না।’
আমি বললাম, ‘কেন নয়?’
আবদ বললেন, আপনি এ কথা কিভাবে জানলেন?
আমি বললাম, নাজ্জাশী হিরাক্বলকে কর দিতেন কিন্তু যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলেন তখন বললেন, ‘আল্লাহর কসম! এখন যদি তিনি আমার নিকট একটি টাকাও চান তবুও আমি তা দেব না।’
হিরাক্বল যখন এ সংবাদ অবগত হলেন, তখন তাঁর ভাই ইয়ানক বললেন, ‘আপনার দাস যদি আপনাকে টাকা না দেয় তাহলে কি আপনি তাকে ছেড়ে দেবেন? তাছাড়া, সে যদি আপনার পরিবর্তে অন্য এক জনের দ্বীন অবলম্বন করে? হিরাক্বল বললেন, ‘এ ব্যক্তি যিনি এক নতুন দ্বীন পছন্দ করেছেন এবং নিজের জন্য তা অবলম্বন করেছেন। এখন আমি তার কী করতে পারি? আল্লাহর কসম! যদি আমার নিজের রাজত্বের লোভ না থাকত তাহলে তিনি যা করেছেন আমিও তাই করতাম।’
আবদ বললেন, ‘‘আমর দেখুন! আপনি কী বলছেন?’
আমি বললাম, ‘আল্লাহর কসম! আমি আপনাকে সত্যই বলছি।’ আবদ বললেন, ভাল, তাহলে আমাকে বলুন, ‘তিনি কোন্ কথা কিংবা কাজের দির্দেশনা দিচ্ছেন এবং কোন্ কথা কিংবা কাজ থেকে নিষেধ করছেন।’
আমি বললাম, ‘মহিমান্বিত আল্লাহর আনুগত্যের নির্দেশ দিচ্ছেন এবং তাঁর অবাধ্যতা থেকে নিষেধ করছেন, সৎ এবং আত্মীয়তা সম্পর্ক স্থাপনের নির্দেশ প্রদান করছেন। অন্যায়, অনাচার, ব্যভিচার, মদ্যপান, প্রস্ত্তরমূর্তি এবং ক্রুশের আরাধনা বা উপাসনা থেকে বিরত থাকার আদেশ দিচ্ছেন।’
আবদ বললেন, ‘যে সব কথার প্রতি আহবান জানাচ্ছেন তা কতই না উত্তম! যদি আমার ভাইও এ কথার উপর আমার অনুসরণ করত তাহলে যানবাহনে চড়ে যাত্রা করতাম। এমন কি মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করতাম এবং সত্যায়ন করতাম। কিন্তু আমার ভাইয়ের রাজত্বের মোহ এতই বেশী যে কিছুতেই কারো অধীনতা স্বীকার করতে তিনি রাজী নন।’
আমি বললাম, ‘যদি সে ইসলাম গ্রহণ করে তবে রাসূলে কারীম (ﷺ) তাঁর সম্প্রদায়ের উপর তাঁর রাজত্ব স্থায়ী করে দেবেন এবং তাদের যারা সম্পদশালী তাদের নিকট থেকে সাদকা গ্রহণ করে দরিদ্রদের মধ্যে তা বন্টন ও বিতরণ করে দেবেন।’
আবদ বললেন, ‘এ তো বড় ভাল কথা। আচ্ছা বল তো সাদকা কী?
প্রত্যুত্তরে আমি সম্পদশালীদের বিভিন্ন সম্পদের মধ্য থেকে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কর্তৃক নির্ধারিত পরিমাণ বাহির করে নিয়ে দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণের ব্যাপারটিকে যে সাদকা বলা হয় সে প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করলাম। যখন উটের প্রসঙ্গ এল তখন তিনি বললেন, ‘হে ‘আমর! আমাদের সে চতুষ্পদ জন্তুর মধ্য থেকেও কি সাদকা দিতে হবে যা নিজেই বিচরণ করতে থাকে?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ’।
আবদ বললেন, ‘আল্লাহর শপথ! আমার মনে হয় না যে, আমার সম্প্রদায় স্বীয় রাজত্বের প্রশস্ততা এবং সংখ্যাধিক্যতা সত্ত্বেও এটা মেনে নেবেন।’
‘আমর বিন আসের বর্ণনায় আছে যে, ‘আমি তাঁর বারান্দায় কয়েক দিন অবস্থান করলাম। তিনি তাঁর ভাইয়ের নিকট গিয়ে আমার সকল কথা তাঁর নিকট ব্যক্ত করলেন। অতঃপর একদিন তিনি আমাকে তাঁর নিকট ডেকে পাঠালেন। আমি ভিতরে প্রবেশ করলে প্রহরীগণ আমার বাহু ধরে বসল। তিনি বললেন, ওকে ছেড়ে দাও। আমাকে ছেড়ে দেয়া হল। আমি বসতে চাইলাম কিন্তু প্রহরীগণ আমাকে বসতে দিল না। আমি সম্রাটের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে তিনি বললেন, ‘আপনার কথা কী তা বলে দিন।’ আমি তখন মোহরকৃত পত্রখানা তাঁর হস্তে সমর্পণ করলাম।
তিনি সীল মোহর খুলে পত্রখানা পাঠ করলেন। পাঠ শেষ হলে পত্রখানা তিনি তাঁর ভাইয়ের হাতে দিলেন। তাঁর ভাইও তা পাঠ করলেন। এ প্রসঙ্গে আমি লক্ষ্য করলাম যে সম্রাটের তুলনায় তাঁর ভাই ছিলেন অধিক মাত্রায় কোমল স্বভাবের।
সম্রাট জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাকে বল, কুরাইশগণ কিরূপ আচরণ অবলম্বন করেছে?’
আমি বললাম, ‘সকলেই তাঁর আনুগত্য স্বীকার করেছে, কেউ কেউ আল্লাহর দ্বীনের প্রতি উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত হয়ে এবং অন্যেরা তরবারীর দ্বারা পরাভূত হয়ে।’
সম্রাট জিজ্ঞেস করলেন, ‘তাঁর সঙ্গে কেমন লোকেরা আছেন?’
আমি বললাম, ‘ঐ সকল লোকেরা আছেন যাঁরা পূর্ণ সন্তুষ্টির সঙ্গে স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং সব কিছুর উপর একে প্রধান্য দিয়েছেন। তাঁরা আল্লাহর প্রদত্ত হিদায়াত এবং আপন বিবেকের আলোকে এ কথা উপলব্ধি করলেন যে পূর্বে তাঁরা ভ্রষ্টতার মধ্যে নিপতিত ছিলেন। আমি জানি না যে, এ অঞ্চলে এখন আপনি ছাড়া আর অন্য কেউ দ্বীনের বাহিরে অবশিষ্ট আছে। আপনি যদি ইসলাম গ্রহণ করে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর আনুগত্য না করেন তাহলে ঘোড়সওয়ার বাহিনী আপনাকে পদদলিত করবে এবং আপনাদের সজীবতাকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলবে। ইসলাম গ্রহণ করুন নিরাপদে থাকবেন এবং রাসূলে কারীম (ﷺ) আপনাকে আপনার কওমের শাসক নিযুক্ত করবেন। ইসলাম গ্রহণ করলে কোন ঘোড়সওয়ার কিংবা পদাতিক আপনার এলাকায় প্রবেশ করবে না।’
সম্রাট বললেন, ‘আমাকে একটু চিন্তাভাবনা করার সময় দাও। আগামী কাল আবার এসো।’ অতঃপর আমি তাঁর ভাইয়ের নিকট আবার ফিরে গেলাম।
তিনি বললেন, ‘‘আমর! আমার আশা হচ্ছে, যদি রাজত্বের লোভ জয়ী না হয় তাহলে সে ইসলাম গ্রহণ করে নেবে।’
‘আমর বিন আস (রাঃ) বললেন, ‘দ্বিতীয় দিবস পুনরায় সম্রাটের নিকট গেলাম কিন্তু তিনি অনুমতি প্রদানে অস্বীকার করলেন এ কারণে আমি তাঁর ভাইয়ের নিকট ফিরে গিয়ে বললাম যে, সম্রাটের সাক্ষাত লাভ আমার পক্ষে সম্ভব হয় নি। এ প্রেক্ষিতে তাঁর ভাই আমাকে তাঁর নিকট পৌঁছে দিলেন।
তিনি বললেন, ‘তোমার দাওয়াতের ব্যাপারে আমি চিন্তাভাবনা করেছি। যদি আমি রাজত্ব এমন এক ব্যক্তির নিকট সমর্পণ করে দেই যাঁর নিপুণ ঘোড়সওয়ার এখানে পৌঁছেও নি তখন আমি আরবের মধ্যে সব চাইতে দুর্বল ব্যক্তিতে পরিগণিত হয়ে যাব। পক্ষান্তরে, যদি তাঁর ঘোড়সওয়ার বাহিনী এখানে পৌঁছে যায় তাহলে এমন এক সংগ্রাম আরম্ভ হয়ে যাবে যেমনটি ইতোপূর্বে তাঁদের সঙ্গে আর কখনো হয় নি।’
আমি বললাম, ‘আচ্ছা তাহলে আগামী কাল আমি ফেরত চলে যাচ্ছি।’ যখন আমার ফেরত যাওয়ার ব্যাপারটি তাঁদের মনে একটি স্থির বিশ্বাসের সৃষ্টি করল তখন তিনি তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে এককভাবে আলাপ আলোচনা করলেন এবং বললেন, ‘এ পয়গম্বর যাঁদের উপরী বিজয়ী হয়েছেন তাঁদের তুলনায় প্রকৃতপক্ষে আমাদের তেমন কোন স্থানই নেই। অধিকন্তু, তিনি যাঁদের নিকট দাওয়াত প্রেরণ করেছেন তাঁরা সকলেই সে দাওয়াত গ্রহণ করে নিয়েছেন।
অতএব, পরবর্তী দিবস সকালে তাঁরা পুনরায় আমাকে আহবান জানালেন। আমি সেখানে উপস্থিত হলে সম্রাট এবং তার ভাই উভয়েই ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং নাবী কারীম (ﷺ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করলেন। সাদকা গ্রহণ করা এবং লোকজনদের মধ্যে মীমাংসা করার জন্য আমাকে স্বাধীন ভাবে ছেড়ে দিলেন এবং আমার বিরুদ্ধাচারীদের বিরুদ্ধে সাহায্যকারীর ভূমিকা অবলম্বন করলেন।[1]
এ ঘটনা সূত্রে এটা জানা যাচ্ছে যে, অন্যান্য শাসক কিংবা বাদশাহের তুলনায় এ দুই জনের নিকট প্রেরিত পত্র বেশ বিলম্বে কার্যকর হয়েছিল। সম্ভবত এটি ছিল মক্কা বিজয়ের পরের ঘটনা।
উপরি উল্লেখিত পত্র সমূহের মাধ্যমে নাবী কারীম (ﷺ) পৃথিবীর অধিকাংশ রাজা বাদশাহর নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছিলেন। এ প্রেক্ষাপটে কেউ কেউ ইসলামের দাওয়াত গ্রহণ করেছিলেন, কেউ কেউ অস্বীকারও করেছিলেন। কিন্তু এর ফলে এ সুবিধাটুকু হল যে, যারা দ্বীন অস্বীকার করল তারাও এ ব্যাপারে মনোযোগী হল এবং নাবী কারীম (ﷺ)-এর নাম ও তাঁর দ্বীন তাদের নিকট বেশ পরিচিত হয়ে উঠল।
প্রকৃত পক্ষে এ যুদ্ধ ছিল বনু ফাযারার একটি দলের বিরুদ্ধে। ওরা রাসূলে কারীম (ﷺ)-এর গৃহপালিত পশু লুটপাট করে নিয়ে যাওয়ার কারণে সূত্রপাত হয়েছিল এ যুদ্ধের।
হুদায়বিয়াহর পরে এবং খায়বারের পূর্বে এটি ছিল একমাত্র যুদ্ধ যা রাসূলে কারীম (ﷺ)-এর সামনে সংঘটিত হয়েছিল। ইমাম বুখারী (রঃ) এ পর্বটি নির্ধারণ করে বলেন যে, খায়বারের মাত্র তিন দিন পূর্বে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এ যুদ্ধের অন্যতম বিশিষ্ট সৈনিক সালামাহ বিন আকওয়া’ (রাঃ) হতেও একই কথা বর্ণিত হয়েছে। তাঁর বর্ণনা সহীহুল মুসলিম শরীফে দেখা যেতে পারে। যুদ্ধ বিশারদ ইতিহাসবিদগণের অধিকাংশের মতে আলোচ্য যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল হুদায়বিয়াহ সন্ধির পূর্বে। কিন্তু সহীহুল বুখারীতে যে কথা বর্ণিত হয়েছে আহলে মাগাযীদের বর্ণনায় তুলনায় তাই অধিক বিশুদ্ধ।[1]
এ যুদ্ধের সেরা বীর সালামাহ বিন আকওয়া (রাঃ) হতে যে সকল বর্ণনা পাওয়া যায় তাঁর সারাংশ হচ্ছে, নাবী কারীম (ﷺ) চারণের উদ্দেশ্যে তাঁর সোয়ারীর উট পাঠিয়েছিলেন চারণভূমিতে স্বীয় দাস রাবাহর তত্ত্বাবধানে। আবূ ত্বালহাহর ঘোড়াসহ আমিও তাঁর সঙ্গে ছিলাম। সকাল নাগাদ আকস্মিকভাবে আব্দুর রহমান ফাযারী এ পশুপালের উপর হামলা চালিয়ে রাখালকে হত্যার করার পর পশুপাল নিয়ে পলায়ন করে। আমি বললাম, ‘রাবাহর এ ঘোড়া লও। তুমি একে ত্বালহাহর নিকট পৌঁছে দিও এবং রাসূলে কারীম (ﷺ)-কে এ দুর্ঘটনার সংবাদ দেবে। অতঃপর একটি ছোট পাহাড়ের উপর গিয়ে দাঁড়াই এবং মদীনামুখী হয়ে তিন বার চিৎকার করি, হায় প্রাতঃকালীন আক্রমণ! এরপর আক্রমণকারীদের পিছন পিছন আমি অগ্রসর হতে থাকি। এ পর্যায়ে তাঁদের উপর তীর নিক্ষেপ করতে করতে এ চরণটি আবৃতি করতে থাকি,
[خُذْها] أنا ابنُ الأكْـوَع ** واليـومُ يـومُ الرُّضّع
অর্থ : আমি আকওয়ার পুত্র এবং অদ্য দুগ্ধপানের দিন, অর্থাৎ অদ্য জানা যাবে যে, কে নিজ মায়ের দুধ পান করেছে।
সালামাহ বিন আকওয়া’ বলেছেন যে, আল্লাহর শপথ! আমি অবিরাম তীর নিক্ষেপের দ্বারা তাদের ক্ষতবিক্ষত করতে থাকি। যখন কোন ঘোড়সওয়ার আমাকে লক্ষ্য করে ফিরে আসত তখন আমি কোন গাছের আড়ালে বসে গা ঢাকা দিতাম। যতক্ষণ তারা পর্বতের অপ্রশস্ত রাস্তায় প্রবেশ না করল ততক্ষণ আমি পর্বতের উপর উঠে গেলাম এবং পাথর ছুঁড়ে ছুঁড়ে তাঁদের অগ্রগতি সম্পর্কে আঁচ করতে থাকলাম। যে পর্যন্ত না রাসূলে কারীম (ﷺ)-এর উটগুলো তারা তাদের পিছনে ছেড়ে না দিল সে পর্যন্ত আমি একই ধারায় কাজ করে চললাম। তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উটগুলো ছেড়ে দিলেও আমি তাদের পিছু ধাওয়া অব্যাহত রেখে তীর ছুঁড়তে থাকলাম। তারা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে অগ্রসর হতে থাকল। তাদের গতির মাত্রা ঠিক রাখার প্রয়োজনে বোঝা হালকা করার উদ্দেশ্যে ত্রিশেরও অধিক চাদর এবং বর্শা তারা ফেলে দিয়ে যায়। যে সকল জিনিস তারা ফেলে যাচ্ছিল চিহ্নস্বরূপ সে সবের উপর আমি পাথর চাপা দিয়ে রাখছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল, রাসূলে কারীম (ﷺ) এবং তাঁর সঙ্গীগণ যেন চিনতে পারেন যে, এগুলো হচ্ছে শত্রুদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নেয়া সম্পদ।
এরপর মাটির একটি অপ্রশস্ত মোড়ে বসে তারা দুপুরের খাবার খেতে লাগল। আমিও একটি চূড়ার উপর গিয়ে বসলাম। আমাকে এ অবস্থায় দেখে তাদের মধ্য থেকে চার জন পর্বতের উপর উঠে আমার দিকে আসতে থাকল। (যখন তারা এতটুকু নিকটে এসে গেল যাতে আমার কথা শুনতে পাবে তখন) আমি বললাম, ‘তোমরা কি আমাকে চেন? আমার নাম সালামাহ বিন আকওয়া।’ তোমাদের মধ্য হতে যার পিছনে আমি ধাওয়া করব তাকে খুব সহজেই নাগালের মধ্যে পেয়ে যাব। কিন্তু তোমাদের মধ্য থেকে কেউ আমার পিছু ধাওয়া করলে কখনই আমার নাগাল পাবে না।’
আমার এ কথা শোনার পর তারা চার জনই ফিরে গেল। আমি কিন্তু আমার জাগাতেই রয়ে গেলাম। আমি সেখানেই অপেক্ষামান থাকলাম যে পর্যন্ত না রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ঘোড়সওয়ারগণকে বৃক্ষসারির মধ্যে অগ্রসরমান অবস্থায় দেখতে পেলাম। সকলের পুরোভাগে ছিলেন আখরাম (রাঃ)। তাঁর পিছনে ছিলেন আবূ ক্বাতাদাহ (রাঃ) এবং তাঁর পিছনে ছিলেন মিকদাদ বিন আসওয়াদ।
ঘটনাস্থলে পৌঁছে আব্দুর রহমান ও আখরামের টক্কর লাগে। আখরাম আব্দুর রহামানের ঘোড়াকে আঘাত করলে তা আহত হয়। কিন্তু আব্দুর রহমান বর্শা নিক্ষেপ করে আখরামকে শহীদ করে দেয় এবং তাঁর ঘোড়ার পিঠে উঠে বসে। ঠিক এমনি সময় আবূ কাতাদা (রাঃ) বর্শা দ্বারা আব্দুর রহমানকে আঘাত করেন। এ আঘাতের ফলে সে আহত হয়। অন্যেরা পশ্চাদপসরণ করে পলায়ন করে। আমরা তাদের অনুসরণ করে আগ্রসর হতে থাকি। আমি আমার পায়ের ভরে লাফ দিয়ে দিয়ে চলছিলাম। সূর্যাস্তের কিছু পূর্বে তারা একটি ঘাটি অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকে যেখানে ছিল যূ ক্বারাদ নামে একটি ঝরণা। তাঁরা পিপাসার্ত থাকার কারণে সেখানে পানি পান করার ইচ্ছা করেছিলেন। কিন্তু আমি তাদেরকে ঝরণা থেকে দূরে থাকতে বাধ্য করার ফলে তাঁরা এক ফোঁটা পানি পান করতে সক্ষম হয় নি। রাসূলে কারীম (ﷺ) এবং ঘোড়সওয়ার সাহাবীগণ (রাঃ) আমার নিকট পৌঁছেন সূর্যাস্তের পর।
আমি আরয করলাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তারা ছিল পিপাসার্ত, যদি আপনি আমার সঙ্গে একশত লোক দেন তাহলে আমি পালানসহ তাদের ঘোড়াগুলো ছিনিয়ে আনতে পারি এবং তাদের গলা ধরে আপনার দরবারে তাদের হাজির করে দিতে পারি।’
নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, ‘আকওয়ার পুত্র! তুমি অনেক করেছ এখন একটু ক্ষান্ত হও, এ সময় বনু গাত্বাফান গোত্রে তাদের আপ্যায়িত করা হচ্ছে।’
রাসূলে কারীম (ﷺ) এ যুদ্ধের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে বলেন, ‘আজকের আমাদের সব চাইতে উত্তম ঘোড়সওয়ার আবূ ক্বাতাদাহ এবং উত্তম পদাতিক সালামাহ বিন আকওয়া।’
সালামাহ বলেন, ‘যুদ্ধলব্ধ অর্থ হতে নাবী কারীম (ﷺ) আমাকে দু’ অংশ প্রদান করেন। এক অংশ পদাতিক হিসেবে এবং অন্য অংশ ঘোড়সওয়ার হিসেবে। অধিকন্তু, মদীনা প্রত্যাবর্তনের পথে আমাকে (সম্মানের নিদর্শন স্বরূপ) তাঁর আযবা নামক উটের উপর নিজের পিছনে আরোহণ করিয়ে নেন।
এ যুদ্ধের সময় রাসূলে কারীম (ﷺ) মদীনার পরিচালনা ভার ইবনু উম্মু মাকতুমের উপর অর্পণ করেছিলেন এবং পতাকা বহনের দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন মিক্বদাদ বিন আমরের উপর।[2]
[2] পূর্বোক্ত উৎস সমূহ।
খায়বার ছিল মদীনার উত্তরে আশি (৮০) কিংবা ষাট মাইল দূরত্বে অবস্থিত একটি বড় শহর। যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে তখন সেখানে একটি দূর্গ ছিল এবং চাষাবাদেরও ব্যবস্থা ছিল। বর্তমানে সেটি একটি জন বসতি এলাকায় পরিণত হয়েছে। এখানকার আবহাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য তেমন উপযোগী নয়।
হুদায়বিয়াহর সন্ধির ফলে রাসূলে কারীম (ﷺ) যখন আহযাব যুদ্ধের তিনটি শক্তির মধ্যে সব চাইতে শক্তিশালী দল কুরাইশদের শত্রুতা থেকে মুসলিমগণকে নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত মনে করলেন, তখন অন্য দু’টি শক্তি ইহুদী ও নাজদ গোত্রসমূহের সঙ্গেও একটি সমঝোতায় আসার চিন্তাভাবনা করতে থাকলেন। উদ্দেশ্য ছিল এ সকল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে শত্রুতা ও বৈরীভাব পরিহারের মাধ্যমে মুসলিমগণের শান্তি ও স্বস্তিপূর্ণ নিরাপদ জীবন যাপন এবং ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে অধিক পরিমাণে আত্মনিয়োগ।
যেহেতু খায়বার ছিল বিভিন্ন ষড়যন্ত্রকারী ও কোন্দলকারীদের আড্ডা, সৈনিক মহড়ার কেন্দ্র এবং প্ররোচনা, প্রবঞ্চনা ও যুদ্ধের দাবানল সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু সেহেতু এ স্থানটি সর্বাগ্রে মুসলিমগণের মনোযোগদানের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার বিশেষ প্রয়োজন ছিল। এ প্রসঙ্গে এখন একটি প্রশ্ন উঠতে পারে যে, খায়বার সম্পর্কে মুসলিমগণের যে ধারণা তা যথার্থ ছিল কি না, এ ব্যাপারে মুসলিমগণের ধারণা যে যথার্থ ছিল তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
কারণ, এ খায়বারবাসী খন্দক যুদ্ধে মুশরিক শক্তিগুলোকে সংগঠিত করে মুসলিমগণের বিরুদ্ধে লিপ্ত হতে সাহায্য এবং উৎসাহিত করেছিল। তাছাড়া, মুসলিমগণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও বিশ্বাসঘাতকতার জন্য এরাই বনু কুরাইযাহকে সর্বতোভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল। অধিকন্তু, এরাই তো ইসলামী সমাজের পঞ্চম বাহিনীভুক্ত মুনাফিক্বদের সঙ্গে, আহযাব যুদ্ধের তৃতীয় শক্তি বনু গাত্বাফান এবং বেদুঈনদের সঙ্গে অনবরত যোগাযোগ রেখে চলছিল এবং নিজেরাও যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল। তাঁরা তাদের এ সমস্ত কার্যকলাপের মাধ্যমে মুসলিমগণের একটা চরম অস্বস্তিকর অবস্থা ও অগ্নি পরীক্ষার মধ্যে নিপতিত করেছিল। এমন কি নাবী কারীম (ﷺ)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র তারা করেছিল। এ সমস্ত অস্বস্তিকর অবস্থার প্রেক্ষাপটে অন্যন্যোপায় হয়ে মুসলিমগণ বার বার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হতে বাধ্য হয়েছিলেন। এ সকল যুদ্ধের মাধ্যমে কোন্দল সৃষ্টিকারী ও ষড়যন্ত্রকারীদের নেতা ও পরিচালক সালামাহ বিন আবিল হুকাইক এবং আসির বিন যারেমকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়া অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। অথচ শত্রুমনোভাবাপন্ন ইহুদীদের শায়েস্তা করার ব্যাপারটি মুসলিমগণের জন্য ততোধিক প্রয়োজনীয় ছিল।
কিন্তু এ ব্যাপারে যথাযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণে মুসলিমগণ যে কারণে বিলম্ব করেছিলেন তা হচ্ছে, কুরাইশ মুশরিকগণ ইহুদীদের তুলনায় অনেক বেশী শক্তিশালী যুদ্ধভিজ্ঞ ও উদ্ধত ছিল এবং শক্তি সামর্থ্যে মুসলিমগণের সমকক্ষ ছিল। কাজেই কুরাইশদের সঙ্গে একটা বোঝাপড়ার পূর্বে ইহুদীদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে শক্তি ও সম্পদ ক্ষয় করাকে নাবী কারীম (ﷺ) সঙ্গত মনে করেননি। কিন্তু কুরাইশদের সঙ্গে যখন একটা সমঝোতায় আসা সম্ভব হল তখনই ইহুদীদের ব্যাপারে মনোযোগী হওয়ার অবকাশ তিনি লাভ করলেন এবং তাদের হিসাব গ্রহণের জন্য ময়দান পরিস্কার হয়ে গেল।
ইবনু ইসহাক্ব সূত্রে জানা যায় যে, হুদায়বিয়াহ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলে কারীম (ﷺ) পুরো যিলহাজ্জ মাস এবং মুহাররম মাসের কয়েক দিন মদীনায় অবস্থান করেন। অতঃপর মুহাররম মাসেরই শেষভাগে কোন এক সময়ে খায়বার অভিমুখে যাত্রা করেন। মুফাসসিরগণের বর্ণনা রয়েছে যে খায়বারের ব্যাপারে আল্লাহর যে ওয়াদা ছিল তা নিম্নে কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,
(وَعَدَكُمُ اللهُ مَغَانِمَ كَثِيْرَةً تَأْخُذُوْنَهَا فَعَجَّلَ لَكُمْ هٰذِهِ) [الفتح: 20]
‘আল্লাহ তোমাদেরকে বিপুল পরিমাণ গানীমাতের ও‘য়াদা দিয়েছেন যা তোমরা লাভ করবে। এটা তিনি তোমাদেরকে আগেই দিলেন।’ [আল-ফাতহ (৪৮) : ২০]
এর অর্থ ছিল হুদায়বিয়াহর সন্ধি এবং অনেক গণীমতের সম্পদ এর অর্থ ছিল খায়বার প্রসঙ্গ।