চতুর্থ হিজরীর মুহাররম মাসের ৫ তারীখে এ মর্মে একটি সংবাদ পাওয়া যায় যে, খালিদ বিন সুফইয়ান হুযালী মুসলিমগণকে আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে সৈন্য সংগ্রহ করছে। শত্রুপক্ষের এ দুরভিসন্ধি নস্যাৎ করার লক্ষ্যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আব্দুল্লাহ ইবনু উনাইস (রাঃ)-কে প্রেরণ করেন।
আব্দুল্লাহ বিন উনাইস (রাঃ) মদীনার বাইরে ১৮ দিন অবস্থানের পর মুহাররমের ২৩ তারীখে প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি খালিদকে হত্যা করে তার মস্তক সঙ্গে নিয়ে আসেন। নাবী কারীম (ﷺ)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে তিনি যখন মস্তকটি তাঁর সম্মুখে উপস্থাপন করেন তখন তিনি তাঁর হাতে একটি ‘আসা’ (লাঠি) প্রদান করে বলেন, ‘এটা কিয়ামতের দিন আমার ও তোমার মাঝে একটি নিদর্শন হয়ে থাকবে। যখন তাঁর মৃত্যুর সময় নিকবর্তী হল এ প্রেক্ষিতে তিনি সেই আসাটিকে তাঁর লাশের সঙ্গে কবরে দেয়ার জন্য অসিয়ত করলেন।[1]
চতুর্থ হিজরীর সফর মাসে ‘আযাল’ এবং ‘ক্বারাহ’ গোত্রের কয়েক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে আরজ করে যে, তাদের মধ্যে কিছু কিছু ইসলামের চর্চা রয়েছে। কাজেই, কুরআন ও দ্বীন শিক্ষাদানের জন্য তাদের সঙ্গে কয়েকজন সাহাবী (রাঃ)-কে পাঠালে ভাল হয়। সে মোতাবেক রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইতিহাসবিদ ইবনু ইসহাক্বের মতে ছয় জন এবং সহীহুল বুখারীর বর্ণনা মতে দশ জন সাহাবা কিরাম (রাঃ)-কে তাদের সঙ্গে প্রেরণ করেন। ইবনে ইসহাক্বের মতে মুরশেদ বিন আবূ মুরশেদ গানাভীকে এবং সহীহুল বুখারীর বর্ণনা মতে ‘আসিম বিন উমার বিন খাত্তাবের নানা ‘আসিম বিন সাবেতকে এ দলের নেতৃত্বে প্রদান করা হয়। এরা যখন রাবেগ এবং জেদ্দাহর মধ্যবর্তী স্থানের হোযাইল গোত্রের ‘রাযী’ নামক ঝর্ণার নিকটে পৌঁছান তখন আযাল এবং ক্বারাহর উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গ হুযাইল গোত্রের শাখা বানু লাহয়ানকে তাদের উপর আক্রমণ চালানোর জন্য লেলিয়ে দেয়।
এ গোত্রের একশত তীরন্দাজ তাঁদের অনুসন্ধান করতে থাকে। পদচিহ্ন অনুসরণ করতে করতে গিয়ে নাগালের মধ্যে তাদের পেয়ে যায়। সাহাবাগণ একটি পাহাড়ের চূড়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। এ অবস্থায় বনু লাহয়ান তাদের চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলার পর বলতে থাকে, ‘তোমাদের সঙ্গে এ মর্মে আমরা ওয়াদাবদ্ধ হলাম যে তোমরা যদি নীচে নেমে আস তাহলে আমরা কাউকেও হত্যা করব না। ‘আসিম তাদের প্রস্তাবে সম্মত না হয়ে সঙ্গীদের নিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হলেন। কিন্তু শত্রুপক্ষের অবিরাম তীর বর্ষণের ফলে ৭ জন শাহাদতবরণ করেন। জীবত রইলেন ৩ জন। তারা হচ্ছেন খুবাইব (রাঃ), যায়দ বিন দাসিন্নাহ (রাঃ) এবং আরও একজন। আবারও বনু লাহয়ান তাদের ওয়াদা পুনর্ব্যক্ত করলে তাঁরা নীচে নেমে আসেন।
কিন্তু নাগালের মধ্যে পেয়েই তারা ওয়াদা ভঙ্গ করে ধনুকের ছিলা দ্বারা তাঁদের বেঁধে ফেলে। অঙ্গীকার ভঙ্গের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তৃতীয় সাহাবী তাদের সঙ্গে যেতে অস্বীকার করেন। তারা তাঁকে জোর করে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকে, কিন্তু না পেরে শেষ পর্যন্ত তাঁকে হত্যা করে। এদিকে খুবাইব (রাঃ) এবং যায়দ বিন দাসিন্নাহকে (রাঃ) মক্কায় নিয়ে গিয়ে বিক্রয় করে দেয়। এ সাহাবীদ্বয় বদরের যুদ্ধে মক্কার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের হত্যা করেছিলেন।
খুবাইব (রাঃ) কিছু দিন যাবৎ বন্দী অবস্থায় মক্কাবাসীদের নিকট থাকেন। অতঃপর মক্কাবাসীগণ তাঁকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে হারাম শরীফের বাইরে তানঈমে নিয়ে যায়। তাঁকে শূলে চড়ানোর পূর্ব মুহূর্তে তিনি বলেন, ‘দু’ রাকআত সালাত পড়ার জন্য সময় ও সুযোগ আমাকে দেয়া হোক।’ তাঁকে সময় দেয়া হলে তিনি দু’ রাকআত সালাত আদায় করেন। সালাতান্তে সালাম ফেরানোর পর তিনি বলেন, ‘যদি তোমাদের এ বলার ভয় না থাকত যে আমি যা কিছু করছি তা ভয় পাওয়ার কারণে করছি তাহলে আরও দীর্ঘ সময় যাবৎ এ সালাত আদায় করতাম।’
এরপর তিনি বলেন,
(اللهُمَّ أَحْصِهِمْ عَدَدًا وَاقْتُلْهُمْ بَدَدًا وَلاَ تُبْقِ مِنْهُمْ أَحَدًا)
‘হে আল্লাহ! তাদেরকে এক এক করে গুণে নাও। অতঃপর তাদেরকে বিক্ষিপ্তভাবে মৃত্যু দাও এবং কাউকেও অবশিষ্ট রেখো না।
এ কথার পর তিনি নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করেন:
অর্থ: আমার শত্রুগণ তাদের দলবল ও তাদের গোত্রসমূহকে আমার চারদিকে একত্রিত করেছে এবং তাদের সকলেই এক স্থানে একত্রিত হয়েছে।
তারা আমার হত্যার দৃশ্য অবলোকন করার জন্য তাদের সন্তান-সন্ততি এবং নারীদেরকেও একত্রিত করেছে। আর আমাকে হত্যা করার জন্য প্রকান্ড ও সুদৃঢ় এক খেজুর বৃক্ষের নিকটবর্তী করা হয়েছে।
অর্থঃ হে আরশের মালিক (আল্লাহ)! আমাকে হত্যার ব্যাপারে আমার সঙ্গে তারা যা করতে চায় তুমি আমাকে তাতে ধৈর্য্য ধারণের শক্তি দান কর। কারণ, অল্প সময়ের মধ্যেই তারা আমার মাংসগুলোকে টুকরো টুকরো করে ফেলবে এবং মৃত্যুর মাধ্যমে আমার সকল আশা আকাঙ্ক্ষার নিরসন ঘটাবে।
আমাকে হত্যার পূর্বে কুফরী গ্রহণ করা কিংবা মৃত্যুবরণ করা এ দুয়ের মধ্যে যে কোন একটি গ্রহণ করার সুযোগ তারা দিয়েছিল, কিন্তু কুফরী গ্রহণ না করে ধর্মের পথে মৃত্যুকেই বেছে নিয়েছি। তখন আমার নয়ন যুগল বিনা অস্থিরতায় অশ্রু প্রবাহিত করেছে, অর্থাৎ মৃত্যুর ভয়ে আমি অস্থির হই নি, বরং তাদের অন্যায় আচরণ ও নির্বুদ্ধিতার কারণে ক্ষোভে দুঃখে আমার নয়ন যুগল অশ্রু-সিক্ত হয়েছে।
لَسْتُ أُبَالِيْ حِيْنَ أُقْتَلُ مُسْلِمًا عَلٰى أَيِّ جَنْبٍ كَانَ لِلهِ مَصْرَعِي
وَذَلِكَ فِيْ ذَاتِ الْإِلَهِ وَإِنْ يَشَأْ يُبَارِكْ عَلٰى أَوْصَالِ شِلْوٍ مُمَزَّعِ
আমি যখন মুসলিম হিসেবে আল্লাহর পথে কাফিরদের হাতে নিহত হচ্ছি তখন আমার হত্যা যে কোন অবস্থায়ই হোক না কেন, আমি কোন কিছুকে ভয় করি না।
আমি জানি যে, মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই আমার মৃত্যু হচ্ছে। মহান আল্লাহ ইচ্ছা করলে আমার শরীরের বিখন্ডীকৃত প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গেই বরকত দান করতে পারেন।’
এরপর খুবাইব (রাঃ)-কে আবূ সুফইয়ান বলল, ‘তোমার নিকট এটা কি পছন্দনীয় যে, তোমার পরিবর্তে মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে আমাদের এখানে পেয়ে তার গ্রীবা কর্তন করা হবে আর তুমি নিজ আত্মীয় স্বজনসহ জীবিত থাকবে?’ তিনি বললেন, ‘না, আল্লাহর শপথ! আমার নিকট এটাই তো সহনীয় নয় যে, আমি আপন আত্মীয়-স্বজন নিয়ে বেঁচে থাকি এবং তার পরিবর্তে মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে যেখানে তিনি অবস্থান করছেন একটি কাঁটার আঘাত লেগে যায় এবং সে আঘাতে তিনি ব্যথিত হন।’
এরপর মুশরিকরা তাঁকে শূলে চড়িয়ে হত্যা করল এবং তাঁর লাশ দেখানোর জন্য লোক নিযুক্ত করে দিল। কিন্তু ‘আমির বিন উমাইয়া যামরী (রাঃ) তথায় আগমন করলেন এবং রাত্রিবেলা অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে লাশ উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে কাফন-দাফন করলেন। খুবাইব (রাঃ)-কে হত্যা করেছিল উক্ববাহ বিন হারিস। খুবাইব (রাঃ) তার পিতা হারিসকে বদর যুদ্ধে হত্যা করেছিলেন।
সহীহুল বুখারীতে বর্ণিত আছে যে, খুবাইব (রাঃ) সর্বপ্রথম সম্মানিত ব্যক্তি যিনি হত্যার মুহূর্তে দু’ রাক‘আত সালাত আদায় করার প্রথা চালু করেছিলেন। বন্দী অবস্থায় তাঁকে আঙ্গুর ফল খেতে দেখা গিয়েছিল, অথচ সেই সময় মক্কায় খেজুরও পাওয়া যাচ্ছিল না।
দ্বিতীয় সাহাবী যাকে এ ঘটনায় ধরা হয়েছিল তিনি ছিলেন যায়দ বিন দাসিন্নাহ। সাফওয়ান বিন উমাইয়া তাকে ক্রয় করে নিয়ে হত্যা করে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করে।
কুরাইশগণ ‘আসিম (রাঃ)-এর দেহের অংশ বিশেষ আনয়নের জন্য লোক প্রেরণ করে। উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে সনাক্ত করা। কারণ বদর যুদ্ধে তিনি বিশিষ্ট কোন এক কুরাইশ প্রধানকে হত্যা করেছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা তাদের উপর এমন এক ভীমরুলের ঝাঁক প্রেরণ করলেন যারা কুরাইশ লোকজনদের দুরভিসন্ধি থেকে এ লাশ হেফাজত করল। কুরাইশদের পক্ষে লাশের কোন অংশ গ্রহণ করা সম্ভব হল না। ‘আসিম আল্লাহর দরবারে প্রকৃতই এ প্রার্থনা করেছিলেন যে, তাঁকে যেন কোন মুশরিক স্পর্শ করতে না পারে এবং তিনিও যেন কোন মুশরিককে স্পর্শ না করেন। উমার যখন এ ঘটনা অবগত হলেন তখন বললেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা মু’মিন বান্দাকে তাঁর মৃত্যুর পরেও হেফাজত করেন যেমনটি করেন জীবিত অবস্থায়।[1]
যে মাসে রাযী এর ঘটনা সংঘটিত হয় ঠিক সেই মাসেই বি’রে মাউনার বেদনাদায়ক ঘটনাও সংঘটিত হয়। এ ঘটনা রাযী’র ঘটনার চাইতেও কঠিন ও বেদনাদায়ক।
এ ঘটনার সংক্ষিপ্ত সার হচ্ছে, আবূ বারা’ ‘আমির বিন মালিক যিনি ‘মুলায়েবুল আসিন্নাহ’ উপাধিতে ভূষিত ছিলেন (বর্শা নিয়ে যিনি খেলা করেন) এক দফা মদীনায় নাবী কারীম (ﷺ)-এর খিদমতে উপস্থিত হলেন। নাবী কারীম (ﷺ) তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন কিন্তু তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন না কিংবা তা থেকে সরেও গেলেন না। তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! যদি আপনি দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার জন্য সাহাবীগণকে (রাঃ) নাজদবাসীগণের নিকট প্রেরণ করেন তাহলে তারা আপনার দাওয়াত গ্রহণ করবে বলে আশা করি।’
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, (إِنِّيْ أَخَافُ عَلَيْهِمْ أَهْلَ نَجْدٍ) ‘নাজদবাসীদের থেকে নিজ সাহাবীগণ সম্পর্কে আমি ভয় করছি।’
আবূ বারা‘ বললেন, ‘তারা আমার আশ্রয়ে থাকবেন।’
এ কারণে ইতিহাসবিদ ইবনু ইসহাক্বের বর্ণনা মতে ৪০ জন এবং সহীহুল বুখারীর তথ্য মোতাবেক ৭০ জন সাহাবাকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর সঙ্গে প্রেরণ। ৭০ জনের সংখ্যাটি সঠিক বলে প্রমাণিত। মুনযির বিন আমিরকে (বনু সায়েদা গোত্রের সঙ্গে যার সম্পর্ক ছিল এবং ‘মু’নিক লিইয়ামূত’ (মৃত্যুর জন্য স্বাধীনকৃত) উপাধিতে ভূষিত ছিলেন, দলের নেতা নিযুক্ত করেন। এ সাহাবাবৃন্দ (রাঃ) ছিলেন বিজ্ঞ, ক্কারী, এবং শীর্ষ স্থানীয়। তাঁরা দিবা ভাগে জঙ্গল থেকে জ্বালানী সংগ্রহ করে তার বিনিময়ে আহলে সুফফাদের জন্য খাদ্য ক্রয় করতেন ও কুরআন শিক্ষা করতেন এবং শিক্ষা দিতেন এবং রাত্রি বেলা আল্লাহর সমীপে মুনাজাত ও সালাতের জন্য দন্ডায়মান থাকতেন। এ ধারা অবলম্বনের মাধ্যমে তাঁরা মাউনার কূপের নিকট গিয়ে পৌঁছলেন। এ কূপটি বনু ‘আমির এবং হাররাহ বনু সুলাইমের মধ্যস্থলে অবস্থিত ছিল।
সেই স্থানে শিবির স্থাপনের পর এ সাহাবীগণ (রাঃ) উম্মু সুলাইমের ভ্রাতা হারাম বিন মিলহানকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পত্রসহ আল্লাহর শত্রু ‘আমির বিন তোফাইলের নিকট প্রেরণ করেন। কিন্তু পত্রটি পাঠ করা তো দূরের কথা তার ইঙ্গিতে এক ব্যক্তি হারামকে পিছন দিক থেকে এত জোরে বর্শা দ্বারা আঘাত করল যে, দেহের অপর দিক দিয়ে ফুটা হয়ে বের হয়ে গেল। বর্শা-বিদ্ধ রক্তাক্তদেহী হারাম বলে উঠলেন, ‘আল্লাহর মহান! কাবার প্রভূর কসম! আমি কৃতকার্য হয়েছি।’
এরপর পরই আল্লাহর শত্রু আমির অবশিষ্ট সাহাবাদের (রাঃ) আক্রমণ করার জন্য তার গোত্র বনু আমিরকে আহবান জানাল। কিন্তু যেহেতু তাঁরা আবূ বারা’র আশ্রয়ে ছিলেন সেহেতু তারা সেই আহবানে সাড়া দিল না। এদিক থেকে সাড়া না পেয়ে সে বনু সুলাইমকে আহবান জানাল। বুন সুলাইমের তিনটি গোত্র উমাউয়া, রে’ল এবং যাকওয়ান। এ আহবানে সাড়া দিয়ে তৎক্ষণাৎ সাহাবীগণ (রাঃ)-কে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলল। প্রত্যুত্তরে সাহাবায়ে কেরাম যুদ্ধে লিপ্ত হলেন এবং একজন বাদে সকলেই শাহাদত বরণ করলেন। কেবলমাত্র কা‘ব বিন যায়দ (রাঃ) জীবিত ছিলেন। তাঁকে শহীদগণের মধ্য থেকে উঠিয়ে আনা হয়। খন্দকের যু্দ্ধ পর্যন্ত তিনি জীবিত ছিলেন।
তাছাড়া আরও দু’জন সাহাবী- ‘আমর বিন উমাইয়া যামরী (রাঃ) এবং মুনযির বিন উক্ববা বিন আমির (রাঃ) উট চরাচ্ছিলেন। ঘটনাস্থলে তাঁরা পাখী উড়তে দেখে সেখানে গিয়ে পৌঁছেন। অতঃপর মুনযির তাঁর বন্ধুগণের সংখ্যা মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন এবং যুদ্ধ করতে করতে শাহাদতবরণ করেন। ‘আমর বিন উমাইয়া যামরীকে বন্দী করা হয়। কিন্তু যখন তারা অবগত হয়ে যে, মুযার গোত্রের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক রয়েছে তখন আমির তার কপালের চুল কেটে দিয়ে তার মায়ের পক্ষ হতে- যার উপর একটি দাসকে স্বাধীন করার মানত ছিল- তাঁকে মুক্ত করে দেয়।
‘আমর বিন উমাইয়া যামরী (রাঃ) এ বেদনা-দায়ক ঘটনার খবর নিয়ে মদীনায় পৌঁছলেন। ৭০ জন বিজ্ঞ মুসলিমের এ হৃদয় বিদারক শাহাদাত উহুদ যুদ্ধের ক্ষতকে আরও বহুগুণে বর্ধিত করে তোলে। কিন্তু উহুদের তুলনায় এ ঘটনা আরও মর্মান্তিক ছিল এ কারণে যে, উহুদ যুদ্ধে মুসলিমগণ শত্রুদের সঙ্গে মুখোমুখী যুদ্ধ করে শাহাদত বরণ করেন, কিন্তু এক্ষেত্রে মুসলিমগণ চরম এক বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
‘আমর বিন উমাইয়া যামরী (রাঃ) প্রত্যাবর্তন কালে কানাত উপত্যাকার প্রান্তভাবে অবস্থিত কারকারা নামক স্থানে পৌঁছে একটি বৃক্ষের ছায়ায় অবতরণ করেন। বনু কিলাব গোত্রের দু’ ব্যক্তিও তথায় অবস্থান গ্রহণ করে। তারা উভয়েই যখন ঘুমে নিমগ্ন হয়ে পড়ে তখন ‘আমর বিন উমাইয়া (রাঃ) তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলল। তাঁর ধারণা ছিল যে, এদের হত্যা করে তার সঙ্গীদের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করলেন। অথচ তাদের দু’ জনের নিকট রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পক্ষ থেকে অঙ্গীকার ছিল, কিন্তু ‘আমর বিন উমাইয়া (রাঃ) তা জানতেন না। কাজেই, মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পর যখন তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে ব্যাপারটি অবহিত করেন তখন তিনি বললেন যে, (لَقَدْ قَتَلْتَ قَتِيْلَيْنِ لَأَدِيَنَّهُمَا) ‘তুমি এমন দুজনকে হত্যা করেছ যাদের শোনিত পাতের খেসারত অবশ্যই আমাকে করতে হবে।’ এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মুসলিম এবং তাঁদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ইহুদীদের নিকট থেকে শোনিত পাতের খেসারত একত্রিত করার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এটাই পরিণামে বনু নাযীর যুদ্ধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।[1] এর বিবরণ পরবর্তীতে আসছে।
মা’উনাহ এবং রাযী’র উল্লেখিত বেদনা-দায়ক ঘটনাবলীতে যা মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে সংঘটিত হয়েছিল রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এতই ব্যথিত[2] হয়েছিলেন এবং এ পরিমাণ চিন্তিত ও মর্মাহত[3] হন যে, যে সকল গোত্র ও সম্প্রদায় বিশ্বাসঘাতকতা ক’রে সাহাবীগণকে (রাঃ) হত্যা করে নাবী কারীম (ﷺ) এক মাস যাবৎ তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর সমীপে বদ দু‘আ করতে থাকেন। তিনি ফজরের সালাতে রে’ল যেকওয়ান, লাহইয়ান এবং উসাইয়া গোত্রের বিরুদ্ধে বদ্-দোয়া করেন এবং বললেন যে, (عُصَيَّةٌ عَصَتْ اللهَ وَرَسُوْلَهُ) ‘উসাইয়া আল্লাহ এবং তার রাসূলের নাফারমানী করেছে।’
আল্লাহ তা‘আলা সে সম্পর্কে স্বীয় নাবীর উপর আয়াত অবতীর্ণ করেন যা পরবর্তী কালে মানসুখ হয়ে যায়। সেই আয়াত ছিল এইরূপ- (بَلِّغُوْا عَنَّا قَوْمَنَا أَنَا لَقِيْنَا رَبَّنَا فَرَضِيَ عَنَّا وَرَضِيْنَا عَنْهُ) ‘আমার সম্প্রদায়কে এ কথা বলে দাও যে, আমরা আপন প্রতিপালকের সঙ্গে মিলিত হয়েছি। তিনি আমাদের উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন, আমারও তাঁর উপর সন্তুষ্ট হয়েছি। এরপর থেকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কুনুত পাঠ করা ছেড়ে দেন।[4]
[2] ইমাম ওয়াক্বিদী লিখেছেন যে, ‘রাযী’’ এবং ‘মউনা’ ঘটনার সংবাদ রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট একই রাত্রিতে পৌঁছেছিল।
[3] আনাস (রাঃ) হতে ইবনে সা‘দ বর্ণনা করেন যে, বীরে মাউনার মর্মান্তিক ঘটনায় নাবী কারীম (সাঃ)-কে যে পরিমাণ ব্যথিত ও মর্মাহত হতে দেখা গিয়েছিল অন্য কোন ব্যাপারেই তাঁকে এত অধিক পরিমাণে মর্মাহত হতে দেখি নাই। শাইখ আব্দুল্লাহ রচিত মুখতাসারুস সীরাহ ২৬০ পৃঃ।
[4] সহীহুল বুখারী ২য় খন্ড ৫৮৬-৫৮৮।
ইতোপূর্বে আমি উল্লেখ করেছি যে, ইসলাম এবং মুসলিমগণের নামে ‘ইহুদীগণ জ্বলে পুড়ে’ যেতে থাকে। কিন্তু যেহেতু তারা ছিল ভীরু ও কারপুরুষ এবং যুদ্ধের ময়দানে পেরে ওঠার ক্ষমতা তাদের ছিল না, সেহেতু তারা শঠতা ও প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করত। যুদ্ধের পরিবর্তে তারা ষড়যন্ত্র ও হীন কূটকৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে নানাভাবে দুঃখ-কষ্ট দেয়ার কাজে লিপ্ত থাকত। অবশ্য বনু ক্বায়নুক্বার দেশত্যাগ এবং কা‘ব বিন আশরাফির হত্যার ঘটনা সংঘটিত হওয়ার ফলে তাদের মনোবল ভেঙ্গে পড়ে এবং তাদের চক্রান্তমূলক কাজকর্মে কিছুটা ভাটা পড়ে যায়। কিন্তু উহুদের যুদ্ধের পর তাদের পূর্বের আচরণ ধারায় আবার তারা ফিরে আসে, অর্থাৎ চক্রান্তমূলক ক্রিয়াকর্ম পুনরায় শুরু করে দেয়। তারা প্রকাশ্যে শত্রুতা আরম্ভ করে, অঙ্গীকার ভঙ্গ এবং মদীনার মুনাফিক্ব ও মক্কার মুশরিকদের সাহায্য করতে থাকে।[1]
সব কিছু অবগত হওয়া সত্ত্বেও নাবী কারীম (ﷺ) অত্যন্ত ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে চলতে থাকেন। কিন্তু রাযী ও মউনার বেদনাদায়ক ঘটনাবলীর মাধ্যমে তারা সীমাহীন ঔদ্ধত্য ও বাড়াবাড়ির পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে নাবী কারীম (ﷺ)-কে খতম করার এমন এক কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করে যা নিম্নে উল্লেখিত হল :
কয়েকজন সাহাবা (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইহুদীদের নিকট গমন করে বনু কিলাব গোত্রের সেই দু’ ব্যক্তির শোনিতপাতের খেসারত সম্পর্কে কথোপকথন করছিলেন ‘আমর বিন উমাইয়া যামরী ভুলক্রমে যাদের হত্যা করেছিলেন। তাদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির কারণে এ ব্যাপারে সহায়তা করা ছিল আশু কর্তব্য।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন তাদের সঙ্গে কথোপকথনরত ছিলেন তারা বলল, ‘আবুল কাশেম! আমরা আপনার কথা মতোই কাজ করব। আপনি এখানে অবস্থান করুন, আমরা আপনার প্রয়োজন পূরণ করছি।’ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের এক বাড়ির দেয়ালের সঙ্গে গা লাগিয়ে বসে পড়লেন এবং তাদের ওয়াদা পূরণের অপেক্ষায় রইলেন। নাবী কারীম (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলেন আবূ বাকর (রাঃ), উমার (রাঃ), আলী (রাঃ) এবং আরও কয়েকজন সাহাবা কেরামের (রাঃ) একটি দল।
এদিকে ইহুদীগণ গোপনে একত্রিত হলে শয়তান তাদের পেয়ে বসল এবং তাদের ভাগ্য লিখনে যে দুভার্গ্যের প্রসঙ্গটি লিপিবিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল সে তাকে আরও সুশোভন করে উপস্থাপন করল। এ প্রেক্ষিতে তারা নাবী কারীম (ﷺ)-কে হত্যার এক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে পরস্পর বলাবলি করল, ‘কে এমন আছে যে, এই চাকীটা নিয়ে দেয়ালের উপর উঠে যাবে, অতঃপর নাবী কারীম (ﷺ)-এর মাথার উপর তা নিক্ষেপ করে তাকে হত্যা করবে?’
দুর্ভাগা ইহুদী ‘আমর বিন জাহহাশ বলল, ‘আমি’।
তাদের মধ্যে থেকে সালাম বিন মুশকিম বলল, ‘তোমরা এমন কর না, কারণ আল্লাহর কসম! তোমরা যা করতে চাচ্ছ সে সম্পর্কে তাঁকে অবগত করিয়ে দেয়া হবে। অধিকন্তু, আমাদের এবং তাঁদের মধ্য যে অঙ্গীকারনামা রয়েছে, এ কাজ হবে তারও বিপরীত।’
কিন্তু তারা তার কথায় কর্ণপাত না করে তাদের চক্রান্তমূলক কর্মকান্ড বাস্তবায়নের ব্যাপারে অটল রইল। এদিকে মহান রাববুল আলামীনের পক্ষ থেকে জিবরাঈল (আঃ) আগমন করে নাবী কারীম (ﷺ)-কে ইহুদী চক্রান্তের ব্যাপারটি অবগত করিয়ে দিলেন। তিনি সেখান থেকে দ্রুত গাত্রোত্থান করে মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হয়ে যান। পরে সাহাবাবৃন্দ এসে তাঁর সঙ্গে মিলিত হয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আপনি সেখান থেকে চলে এলেন, অথচ আমরা কিছুই বুঝতে পারলাম না। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইহুদী চক্রান্তের বিষয়টি তখন তাঁদের নিকট ব্যক্ত করলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘ইহুদীগণ এক ভয়ংকর চক্রান্ত করেছিল যা আল্লাহ তা‘আলা আমাকে অবগত করেছেন।’
মদীনা প্রত্যাবর্তনের পর পরই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাৎক্ষণিকভাবে মুহাম্মাদ বিন মাসলামাকে বনু নাযীরের নিকট এ নির্দেশসহ প্রেরণ করেন যে, তারা যেন অবিলম্বে মদীনা থেকে বেরিয়ে অন্যত্র চলে যায়। মুসলিমগণের সঙ্গে তারা আর বসবাস করতে পারবে না। মদীনা পরিত্যাগ করে যাওয়ার জন্য তাদের দশ দিন সময় দেয়া হল। এ নির্ধারিত সময়ের পরে তাদের মধ্য থেকে যাকে মদীনায় পাওয়া যাবে তার গ্রীবা কর্তন করা হবে। এ নির্দেশ প্রাপ্তির পর মদীনা পরিত্যাগ করে যাওয়া ছাড়া ইহুদীদের আর কোন গত্যন্তর রইল না।
নাবী কারীম (ﷺ)-এর পক্ষ থেকে নির্দেশ প্রাপ্তির পর মদীনা পরিত্যাগের জন্য তারা প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। কিন্তুমুনাফিক্ব নেতা আব্দুল্লাহ বিন উবাই উল্লেখিত সময়ের মধ্যেই মদীনা ত্যাগ না করে আপন আপন স্থানে দৃঢ়তার সঙ্গে অবস্থান করতে থাকার জন্য পরামর্শ দেয়। সে বলে যে, তার নিকট দুই হাজার সাহসী সৈন্য রয়েছে, যারা তাদের দূর্গাভ্যন্তরে থেকে তাদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে তৈরি থাকবে। অধিকন্তু, যদি তাদের দেশ থেকে বের করে দেয়া হয় তাহলে তাদের সঙ্গে তারাও দেশত্যাগ করবে, যদি তাদের যুদ্ধে লিপ্ত হতে হয় তারা তাদের সাহায্য করবে এবং তাদের কোন ব্যাপারেই তারা কারো নিকট মাথা নত করবে না। তাছাড়া বনু কুরাইযাহ এবং বনু গাত্বাফান যারা তোমাদের ‘হালীফ’ (সহযোগী) তারাও তাদের সাহায্য করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
(لَئِنْ أُخْرِجْتُمْ لَنَخْرُجَنَّ مَعَكُمْ وَلَا نُطِيْعُ فِيْكُمْ أَحَدًا أَبَدًا وَإِن قُوْتِلْتُمْ لَنَنصُرَنَّكُمْ) [الحشر:11]
‘তোমরা যদি বহিস্কৃত হও, তাহলে অবশ্য অবশ্যই আমরাও তোমাদের সাথে বেরিয়ে যাব, আর তোমাদের ব্যাপারে আমরা কক্ষনো কারো কথা মেনে নেব না। আর যদি তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হয়, তাহলে আমরা অবশ্য অবশ্যই তোমাদেরকে সাহায্য করব।’ [আল-হাশর (৫৯) : ১১]
আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের পক্ষ থেকে এ প্রস্তাব পাওয়ার পর ইহুদীদের মনোবল বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় এবং তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে মদীনা পরিত্যাগ না করে বরং মুসলিমগণকে মোকাবেলা করবে। তাদের নেতা হুওয়াই বিন আখতাবের বিশ্বাস ছিল যে, মুনাফিক্ব নেতা যা বলেছে তা সে পূরণ করবে। এ কারণে প্রত্যুত্তরে সে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলে পাঠাল যে তারা কিছুতেই তাদের ঘরবাড়ি পরিত্যাগ করে যাবে না। তিনি যা করতে চান তা করতে পারেন।
এতে সন্দেহের অবকাশ নেই যে, মুসলিমগণের জন্যে এ পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কারণ, ইতিহাসের সংকটপূর্ণ অধ্যায়ে শত্রুদের সঙ্গে মোকাবেলা করার ব্যাপারটি তেমন আশা কিংবা উৎসাহব্যঞ্জক ছিল না। এর পরিণতি যে অত্যন্ত ভয়াবহ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল তা অস্বীকার করা যায় না। তখন সমগ্র আরব জাহান ছিল মুসলিমগণের বিরুদ্ধে এবং মুসলিমগণের দুটি প্রচারক দলকে নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হতে হয়েছিল। তাছাড়া বনু নাযীরের ইহুদীগণ এতই শক্তিশালী ছিল যে, তাদের হাত হতে অস্ত্রশস্ত্র নামানো মোটেই সহজ সাধ্য ছিল না। অধিকন্তু তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার ব্যাপারটিও বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আশঙ্কামুক্ত ছিল না। কিন্তু ‘বীরে মাউনার’ বেদনাদায়ক ঘটনার পূর্বে ও পরে পরিস্থিতি যে ভাবে মোড় নিয়েছিল যার ফলশ্রুতি ছিল অঙ্গীকার ভঙ্গ ও মুসলিমগণকে নির্মমভাবে হত্যা এবং যা মুসলিমগণের মনে এ সকল অপরাধ সম্পর্কে অভূতপূর্ব এক সচেতনতা ও চৈতন্যের উন্মেষ ঘটিয়েছিল, তার ফলে মুসলিমগণের মনে প্রতিশোধ গ্রহণের অনুভূতি এবং ইচ্ছা ও হয়েছিল তীব্র।
এ কারণে তাঁরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন যে, যেহেতু বনু নাযীর নাবী কারীম (ﷺ)-কে হত্যার এক ঘৃণ্য চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছিল সেহেতু যে কোন মূল্যে যুদ্ধ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। তাতে ফলাফল যাই হোক না কেন।
এমনি এক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে নাবী কারীম (ﷺ) যখন হুওয়াই বিন আখতাবের নিকট থেকে তার নির্দেশনার প্রত্যুত্তর প্রাপ্ত হলেন তখন তিনি এবং তাঁর উপস্থিত সাহাবীগণ (রাঃ) আল্লাহ আকবার ধ্বনিতে ফেটে পড়লেন। তৎক্ষণাৎ শুরু হয়ে গেলে যুদ্ধ প্রস্তুতি। আব্দুল্লাহ বিন উম্মু মাকতুমের উপর মদীনার প্রশাসন পরিচালনার দায়িত্বভার অর্পণের পর বনু নাযীর অভিমুখে রওয়ানা হয়ে গেলেন মুসলিম বাহিনী। পতাকা ছিল আলী বিন আবূ ত্বালীবের হাতে। বনু নাযীর এলাকায় পৌঁছে মুসলিম বাহিনী তাদের দূর্গ অবরোধ করেন।
এদিকে বনু নাযীর দূর্গ অভ্যন্তরে অবস্থান গ্রহণ করে দূর্গ প্রাচীর থেকে তীর এবং প্রস্তর নিক্ষেপ করতে থাকে। যেহেতু খেজুর বাগানগুলো তাদের ঢাল বা যুদ্ধাবরণ হিসেবে বিদ্যমান ছিল সেহেতু সেগুলোকে কেটে ফেলার কিংবা পুড়িয়ে ফেলার জন্য নাবী কারীম (ﷺ) নির্দেশ প্রদান করেন। পরে এর প্রতি ইঙ্গিত করে হাসসান (রাঃ) বলেছেন,
وهان عَلٰى سَرَاةِ بني لُؤي ** حـريـق بالبُوَيْرَةِ مسـتطيـر
অর্থ: বনু লুওয়াইদের নেতাদের জন্য এটা অতি সাধারণ কথা ছিল যে, বুওয়াইরাতে অগ্নিশিখা প্রজ্জ্বলিত হবে (বনু নাযীরের খেজুরের বাগানের নাম ছিল বুওয়াইরা) এর প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ তা‘আলা নাযিল করেন,
(مَا قَطَعْتُمْ مِّن لِّيْنَةٍ أَوْ تَرَكْتُمُوْهَا قَائِمَةً عَلٰى أُصُوْلِهَا فَبِإِذْنِ اللهِ) [الحشر: 5]
‘তোমরা খেজুরের যে গাছগুলো কেটেছ আর যেগুলোকে তাদের মূলকান্ডের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে দিয়েছ, তা আল্লাহর অনুমতিক্রমেই (করেছ)।’ [আল-হাশর (৫৯) : ৫]
যাহোক, যখন তাদের অবরোধ করা হল তখন বনু কুরাইযাহ তাদের থেকে পৃথক রইল। আব্দুল্লাহ বিন উবাইও প্রতিশ্রুতি পালন করল না। তাছাড়া, তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ গাত্বাফান গোত্রও সাহায্যার্থে এগিয়ে এল না। মোট কথা, তাদের এ সংকট কালে কেউই তাদের কোনভাবেই সাহায্য করল না। এ কারণেই আল্লাহ তা‘আলা তাদের এ ঘটনার দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে আয়াত নাযিল করেন,
(كَمَثَلِ الشَّيْطَانِ إِذْ قَالَ لِلْإِنسَانِ اكْفُرْ فَلَمَّا كَفَرَ قَالَ إِنِّيْ بَرِيءٌ مِّنْكَ) [الحشر: 16]
‘(তাদের মিত্ররা তাদেরকে প্রতারিত করেছে) শয়ত্বানের মত। মানুষকে সে বলে- ‘কুফুরী কর’। অতঃপর মানুষ যখন কুফুরী করে তখন শয়ত্বান বলে- ‘তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।’ [আল-হাশর (৫৯) : ১৬]
অবরোধ বেশী দীর্ঘদিন হয় নি, অবরোধ অব্যাহত ছিল ছয় রাত্রি মতান্তরে পনের রাত্রি। এর মধ্যেই আল্লাহ তা‘আলা তাদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার করে দেন। যার ফলে তাদের মনোবল ভেঙ্গে পড়ে এবং তারা অস্ত্র সংবরণ করতে সম্মত হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট তারা প্রস্তাব করে যে মদীনা পরিত্যাগ করে তারা অন্যত্র চলে যেতে প্রস্তুত রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের প্রস্তাবে সম্মতি জ্ঞাপন করে এ নির্দেশ প্রদান করেন যে, অস্ত্রশস্ত্র ছাড়া অন্যান্য যে সব দ্রব্য তারা উটের পিঠে বোঝাই করে নিয়ে যেতে পারবে তা নিয়ে যাবে। পরিবার পরিজনও তাদের সঙ্গে যেতে পারবে।
এ স্বীকৃতির পর বনু নাযীর অস্ত্র সমর্পণ করে। অতঃপর গৃহাদির জানালা দরজাগুলো যাতে উটের পিঠে বোঝাই করে নিয়ে যেতে পারে এ উদ্দেশ্যে নিজ হাতে নিজ নিজ ঘরবাড়িগুলো ধ্বংস করে ফেলে। এদের কোন কোন লোককে ছাদের কড়া এবং দেয়ালের খুঁটি নিয়ে যেতেও দেখা যায়। অতঃপর শিশু ও মহিলাদের উটের পিঠে সওয়ার করিয়ে ছয়শত উটের উপর সব কিছু বোঝাই করে নিয়ে রওয়ানা হয়ে যায়। অধিক সংখ্যক ইহুদী এবং তাদের প্রধানগণ যেমন হুয়াই বিন আখতাব এবং সালাম বিন আবিল হুক্বাইক্ব খায়বার অভিমুখে যায়। এক দল যায় সিরিয়া অভিমুখে। শুধু ইয়ামিন বিন ‘আমর এবং আবূ সাঈদ বিন ওয়াহাব ইসলাম গ্রহণ করে। কাজেই, তাদের মালামালের উপর হাত দেয়া হয় নি।
আরোপিত শর্তাদির পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বনু নাযীরের অস্ত্রশস্ত্র, জমিজমা ও বাড়িঘর নিজ অধিকারভুক্ত করে নেন। অস্ত্রশস্ত্র মধ্যে ছিল ৫০টি লৌহ বর্ম, ৫০টি হেলমেট এবং ৩৪০টি তরবারী।
বনু নাযীরের ঘরবাড়ি জমিজমা ও বাগ বাগিচার উপর একমাত্র নাবী কারীম (ﷺ)-এর পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত ছিল। এ সংক্রান্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে তাঁর এতটুকু স্বাধীনতা ছিল যে, ইচ্ছা করলে তিনি সব নিজ অধিকারে রেখে দিতে পারেন, কিংবা যাকে ইচ্ছা দিয়েও দিতে পারেন। ফলে তিনি যুদ্ধ লব্ধ অর্থ সম্পদের ন্যায় এ সবের এক পঞ্চমাংশ বাহির করেননি। কারণ আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে ‘ফাই’ (ফাও) সম্পদের ন্যায় সে সব সম্পদ দান করেছিলেন। উট, ঘোড়া কিংবা তরবারী ব্যবহার করে তা জয় করা হয় নি। কাজেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ বিশেষ অধিকার বলে পূর্বে হিজরতকারীগণের মধ্যে সেই সম্পদ বন্টন করে দেন। তবে অভাবগ্রস্ত থাকার কারণে আনসারী সাহাবী আবূ দুজানাহ (রাঃ) এবং সাহল বিন হুনাইফ (রাঃ)-কে কিছু অংশ প্রদান করেন। অধিকন্তু, একটি ছোট অংশ নিজের জন্য সংরক্ষণ করেন যদ্দ্বারা নিজ পবিত্র বিবিগণের পূর্ণ এক বছরের ব্যয় করতেন। অবশিষ্টাংশ যুদ্ধ প্রস্তুতি এবং অস্ত্র সংগ্রহের কাজে ব্যয় করেন।
বনু নাযীর যুদ্ধ ৪র্থ হিজরীর রবিউল আওয়াল মোতাবেক ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দের আগষ্ট মাসে সংঘটিত হয়েছিল। এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ তা‘আলা পুরো সূরাহ হাশর অবতীর্ণ করেন। এতে ইহুদীগণের দেশান্তর পর্বটি চিত্রায়ন করে মুনাফিক্বগণের শঠতাপূর্ণ ক্রিয়াকর্মের পর্দা উন্মোচিত হয়েছে এবং লব্ধ সম্পদের হুকুমসমূহ উল্লেখ প্রসঙ্গে মুহাজির ও আনসারগণের প্রশংসা করা হয়েছে। অধিকন্তু, এও বলা হয়েছে যে, যুদ্ধের প্রয়োজনে শত্রুদের বৃক্ষ কর্তন কিংবা তাতে অগ্নি সংযোগ করে তা জ্বালিয়ে দেয়া যেতে পারে। এরূপ করাকে ভূপৃষ্টে বিপর্যয় সৃষ্টি করা বলা চলে না। অতঃপর ঈমানদারদের জন্য তাকওয়ার অপরিহার্যতা এবং পরকাল প্রস্তুতির জন্য বিশেষভাবে তাগিদ দেয়া হয়েছে। উল্লেখিত বিষয়াদি বর্ণনার পর আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় হামদ ও সানা বর্ণনার পর নিজ নাম ও গুণাবলীর মাধ্যমে সূরাহটি সমাপ্ত করেন।
ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূরাহ হাশর সম্পর্কে বলতেন, এ সূরাহটিকে সূরাহ বনী নাযীর বল।[2]
ইবনু ইসহাক্ব এবং অধিকাংশ সীরাত রচয়িতাদের বর্ণনামতে এটাই হচ্ছে বনু নাযার যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত সার।
অন্যপক্ষে আবূ দাউদ, আব্দুর রাজ্জাক এবং অন্যান্য সীরাত রচয়িতাগণ এ যুদ্ধের চিত্র অন্যভাবে বর্ণনা করেছেন তা হলো-
বদর যুদ্ধের পর কাফির মুরাইশগণ ইহুদীদের নিকট এ মর্মে একখানা পত্র লেখে যে, আপনারা হলেন সুদক্ষ তীরন্দায ও সুরক্ষিত দুর্গের অধিবাসী। আপনারা আমাদের কুরাইশ ভাইদের সাথে হয়তো যুদ্ধ করবেন নয়তো আমরা যা করবার তা করে বসবো। আর এতে আমাদের ও আপনাদের সম্রান্ত মহিলাদের মধ্যে কোন বাধা থাকবেন অর্থাৎ তাদের ইযযত লুণ্ঠন করা হবে। কুরাইশদের এ পত্র পাওয়ার সাথে সাথে বনু রাযী’র গোত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে দেয়। অতঃপর তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট দূত পাঠিয়ে খবর দেয় যে, আপনি আপনার ত্রিশজন সাৰ্থীসহ আমাদের কাছে আগমন করুন এবং আমরাও আমাদের ত্রিশজন পণ্ডিতকে প্রেরণ করবো। এরপর আমরা অমুক স্থানে একত্রিত হবো। এতে তারা আমাদের এবং আপনাদের মাঝে ফায়সালাকারী হবে। তারা আপনার কথা শ্রবণ করবে। অতঃপর যদি আমাদের পণ্ডিতগণ আপনার কথাকে সত্যায়ন করে এবং আপনার প্রতি ঈমান আনে তবে আমরা সকলেই আপনার প্রতি ঈমান আনবো। এ কথা মোতাবেক নাবী (ﷺ) তাঁর ত্রিশজন সাহাবা (রাঃ)-কে নিয়ে বের হলেন। অন্যদিকে ইহুদীদেরও ত্রিশজন পণ্ডিত বের হলো। এমতাবস্থায় তারা কোন এক উন্মুক্ত প্রাস্তরে একত্রিত হবেন, তখন কতক ইহুদী পরস্পর বলাবলি করতে লাগলো যে, তোমরা কিভাবে তাদের মোকাবালায় পেরে উঠবে অথচ তার সাথে ত্রিশজন জানবাজ সাহাবা (রাঃ) রয়েছেন? যারা সকলেই মুহাম্মাদের মৃত্যুর পূর্বে নিজেদের মৃত্যুকে পছন্দ করে। সুতরাং তোমরা মুহাম্মাদের নিকট এ বলে খরব পাঠাও যে, আমরাই কিভাবে বুঝবো বা তারাই বা কিভাবে বুঝবে অথচ তারা ত্রিশজন লোক। অর্থাৎ এসাথে বেশিসংখ্যক লোক হলো বিষয় বুঝতে কষ্টকর হবে। তাই আপনার সাখীদের থেকে কেবল তিনজনকে সাথে নিয়ে আসেন এবং আমাদেরও তিন পণ্ডিত গিয়ে আপনার সাথে কথাবার্তা বলবে। তারা আপনার উপর ঈমান নিয়ে আসলে আমরা সকলে আপনার প্রতি ঈমান নিয়ে আসবো এবং আপনাকে সত্য নাবী বলে বিশ্বাস করবো। এ কথামতো নাবী (ﷺ) তিনজন সাহাবা (রাঃ)-কে সাথে নিয়ে রওয়ানা হলেন এবং ইহুদীরা খানাযিয নামক স্থানে মিলিত হয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে অকস্যাৎ আক্রমণ করে নিঃশেষ করে দেওয়ার চক্রান্ত করতে লাগল। এ সংবাদ অবগত হয়ে বনু নাযীরের এক ইহুদী শুভাকাঙ্ক্ষী মহিলা তার ভাইকে খবর প্রেরণ করে। সে ছিল একজন মুসলিম আনসার। ঐ মহিলা তাকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে বনু নাযীরের দূরভীসন্ধামূলক চক্রান্ত সম্পর্কে অবগত করে। অতঃপর তার ভাই দ্রুতগতিতে আগমন করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বনু নাযীরের লোকেদের কাছে পৌছার পূর্বেই তাঁকে ইহুদী চক্রান্ত সম্পর্কে সংবাদ দেওয়ার ফলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পথিমধ্যে হতে ফিরে যান। পরদিন সকালেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সৈন্যবাহিনী নিয়ে বনু নাযীরকে অবরোধ করে। তিনি তাদেরকে এ নির্দেশ দেন যে, তোমরা আমাদের সাথে কোন প্রকার অন্যায় আচরণ না করার মর্মে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে সন্ধি সম্পাদন ব্যতীত নিরাপদে বসবাস করতে পারবে না। কিন্তু তারা তা অস্বীকার করে। ফলে তিনি মুসলমানদের নিয়ে তাদের সাথে যুদ্ধ করেন। পরদিন সকালে তিনি (ড°) বনু নায়ীরকে ছেড়ে দিয়ে বাহিনীসহ বনু কুরাইযাহর উপর আক্রমন করেন এবং তাদেরকেও একই আহবান জানান। তারা এতে রাযি হয়ে যায়। ফলে তিনি পরদিন সকালে সেখান হতে ফিরে এসে আবার বনু নাযীরকে আক্রমন করেন। শেষ পর্যন্ত তারা অস্ত্র ব্যতীত উটের পিঠে যা বহন করে নিয়ে যাওয়া যাবে তা নিয়ে যাওয়ান অনুমতি সাপেক্ষে আত্মসমর্পণ করে। অতঃপর বনু নায়ীর উটের পিঠে তাদের মালসীমানা, ঘর-বাড়ি, দরজা-জানালা ইত্যাদি চাপিয়ে বহন করে নিয়ে যায়। তারা বের হয়ে যাওয়ার সময় নিজ হাতে তাদের বাড়িঘরকে ধ্বংশ করে দেয়। তারা সিরিয়া অভিমুখে চলে যায় এবং তাদের কোন কাফেলা এই প্রথম সিরিয়া গমন করে।
[2] ইবনু হিশাম ২য় খন্ড ১৯০-১৯২ পৃঃ। যাদুল মা’আদ ২য় খন্ড ৭১ ও ১১০ পৃ: এবং সহীহুল বুখারী ২য় খন্ড ৫৭৪-৫৭৫ পৃঃ।
কোন প্রকার ত্যাগ স্বীকার ছাড়াই বুন নাযীর যুদ্ধে মুসলিমগণের এক চমৎকার সাফল্য লাভ সম্ভব হয়। এর ফলে মদীনায় বসবাসকারী মুসলিমগণের অবস্থা বেশ মজবুত হয়ে ওঠে। পক্ষান্তরে মুনাফিক্বগণ বহুলাংশে হীনবল হয়ে পড়ে। এরপর থেকে প্রকাশ্যে মুসলিমগণের বিরুদ্ধে কোন কিছু করার সাহস তারা হারিয়ে ফেলে। এবার রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঐ সকল বেদুঈনের খবরাখবর নেয়ার জন্য উদ্যোগী হন যারা উহুদ যুদ্ধের পর মুসলিমগণকে এক কঠিন বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছিল এবং অত্যন্ত অন্যায়ভাবে ইসলাম প্রচারকদের উপর হামলা চালিয়ে তাঁদের হত্যা করেছিল। এমনি এক অবস্থার প্রেক্ষাপটে তাদের সাহস এতই বেড়ে গিয়েছিল যে, তারা মদীনা আক্রমণেরও চিন্তা ভাবনা করছিল।
বনু নাযীর যুদ্ধ হতে মুক্ত হয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন সেই ওয়াদাভঙ্গকারী বেদুঈনদের শায়েস্তা করার কথা চিন্তা ভাবনা করছিলেন এমন সময় হঠাৎ সংবাদ প্রাপ্ত হন যে, বুন গাতফানের দু’টি গোত্র বুন মোহারেব এবং বনু সালাবাহ মুসলিমগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বেদুঈন ও পল্লীবাসীদের মধ্য থেকে সৈন্য সংগ্রহ করছে। এ সংবাদ প্রাপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নাবী কারীম (ﷺ) নাজ্দ আক্রমণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে থাকেন। উদ্দেশ্য ছিল সেই সকল পাষাণ হৃদয় বেদুঈনদের মনে এমন ভাবে ভীতির সঞ্চার করা যাতে মুসলিমগণের বিরুদ্ধে পূর্বের ন্যায় কোন কার্যক্রমের পুনরাবৃত্তি করতে তারা সাহসী না হয়।
এদিকে উদ্ধত বেদুঈনদের মধ্য থেকে যারা লুণ্ঠনের প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল মুসলিমগণের আকস্মিক আক্রমণে তারা ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় পলায়ন করে পাহাড়ের চূড়ায় আশ্রয় গ্রহণ করে। মুসলিমগণ এ সকল লুণ্ঠনকারী গোত্র সমূহের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পর নিরাপদে মদীনা প্রত্যাবর্তন করেন।
জীবনী লেখকগণ এ সময়ে একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেছেন যা ৪র্থ হিজরীর রবিউল আখের কিংবা জুমাদাল উলা মাসে নাজদে সংঘটিত হয়েছিল। তাঁরা এ যুদ্ধকেই ‘যাতুর রিক্বা’ বলে উল্লেখ করেছেন। অবশ্য এ সময় নাজদ ভূমিতে একটি যুদ্ধ যে সংঘটিত হয়েছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ, তখন মদীনার পরিস্থিতি ঠিক সেই রূপই ছিল। উহুদ যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তনের সময় পরবর্তী বছর মদীনা প্রান্তরে যুদ্ধের জন্য আবূ সুফইয়ান যে আহবান জানিয়েছিল এবং মুসলিমরা মঞ্জুর করে নিয়েছিলেন সেই সময়টা ক্রমেই নিকটবর্তী হয়ে আসছিল। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা কোনক্রমেই সমীচীন ছিল না যে, বেদুঈন ও গ্রামবাসীদেরকে তাদের ঔদ্ধত্য ও হঠকারিতার উপর প্রতিষ্ঠিত রেখে দিয়ে বদরের মতো ভয়াবহ যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার জন্য মদীনাকে মুজাহিদশূন্য অবস্থায় রাখা হবে। বরং এটাই অত্যন্ত জরুরী ব্যাপার ছিল যে, বদর প্রান্তরে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার পূর্বেই ঐ সকল বেদুঈনের উপর এমনভাবে আঘাত হানা যাতে তারা কোন অবস্থাতেই মদীনামুখী হওয়ার সাহস না পায়।
প্রসঙ্গক্রমে এটা বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, ৪র্থ হিজরীর রবিউল আখের কিংবা জুমাদাল উলা মাসে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল তাকে যাতুর রিক্বা’ যুদ্ধ বলে যে অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছে আমার অনুসন্ধান মোতাবেক তা বিশুদ্ধ নয়। কারণ, যাতুর রিক্বা’ যুদ্ধে আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) এবং আবূ মুসা আশআরী (রাঃ) উপস্থিত ছিলেন এবং আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) খায়বার যুদ্ধের মাত্র কয়েক দিন পূর্বে ইসলাম গ্রহণের পর খায়বারেই নাবী (ﷺ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়েছিলেন। গাযওয়ায়ে যাতুর রিক্বা যে খায়বার যুদ্ধের পরে সংঘটিত হয়েছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই।
৪র্থ হিজরীর বেশ কিছু কাল পর যে যাতুর রিকা যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল তার দ্বিতীয় প্রমাণ হচ্ছে, এ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) খাওফের সালাত[1] আদায় করেছিলেন। খাওফের সালাত সর্ব প্রথম আদায় করা হয় গাযওয়ায়ে আসফানে। আর গাযওয়ায়ে ‘উসফান যে খন্দক যুদ্ধের পরে সংঘটিত হয়েছিল এতে কোন সন্দেহ নেই। খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ৫ম হিজরীর শেষ ভাগে। প্রকৃতপক্ষে গাযওয়ায়ে আসফান ছিল হুদায়রিয়া সফরের একটি প্রাসঙ্গিক ঘটনা। আর হুদায়বিয়াহ সফর ছিল ৬ষ্ঠ হিজরীর শেষ ভাগের ঘটনা। সেখান থেকে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) খায়বার অভিমুখে রওয়ানা হয়েছিলেন। এ সূত্র থেকেও প্রমাণিত হচ্ছে যে, যাতুর রিকা যুদ্ধ খায়বার যুদ্ধের পরেই সংঘটিত হয়েছিল।
মরুচারী আরবদের প্রভাব প্রতিপত্তির মূল উৎপাটন করা এবং বেদুঈনদের অনিষ্ট থেকে স্বস্তিলাভের পর মুসলিমগণ তাদের প্রবল পরাক্রান্ত শত্রু কুরাইশদের সঙ্গে পুনরায় যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার জন্য প্রস্তুতি শুরু করে দেন। কারণ বছর দ্রুত শেষ হয়ে আসছিল এবং উহুদ যুদ্ধ শেষে এক পক্ষের ঘোষিত এবং অন্য পক্ষের সমর্থিত সময় ক্রমেই ঘনিয়ে আসছিল। রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) এবং সাহাবা কিরাম (রাঃ)-এর জন্য এটা অবশ্য কর্তব্য ছিল যে, তারা যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে আবূ সুফইয়ান এবং কওমের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন এবং হিকমত ও কৌশলের সঙ্গে যুদ্ধে যাঁতা ঘোরাবেন যে, যে দল বেশী হিদায়াত প্রাপ্ত এবং স্থায়িত্ব লাভের উপযুক্ত, অবস্থার মোড় সঙ্গতভাবে তাদের দিকেই ফিরে যাবে।
সুতরাং ৪র্থ হিজরীর শা‘বান মোতাবেক ৬২৬ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) মদীনার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আব্দুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা (রাঃ)-এর উপর ন্যস্ত করে বিঘোষিত বদর অভিমুখে রওয়ানা হন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন দেড় হাজার সাহাবী এবং ঘোড়া ছিল দশটি। তিনি পতাকা প্রদান করেন আলী (রাঃ)-এর হস্তে। অতঃপর বদরে পৌঁছে মুশরিকদের অপেক্ষায় শিবির সন্নিবেশ করেন। অপর দিকে আবূ সুফইয়ান পঞ্চাশ জন ঘোড়সওয়ার সহ দুই হাজার মুশরিক সৈন্য নিয়ে রওয়ানা হয়। অতঃপর মক্কা হতে এক মরহালা দূরত্বে মাররুয্যাহরান নামক স্থানে পৌঁছে মাজিন্নাহ নামক প্রসিদ্ধ ঝর্ণার নিকট শিবির স্থাপন করে, কিন্তু মক্কা হতে রওয়ানা হওয়ার পর থেকেই যুদ্ধের ব্যাপারে সে নিরুৎসাহিত বোধ করতে থাকে। মুসলিমগণের সঙ্গে বারংবার যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার কথা চিন্তা করে অন্তঃকরণ ভয়ে প্রকম্পিত হতে থাকে। মাররুয্যাহরানে পৌঁছিয়ে সে সম্পূর্ণরূপে মনোবল হারিয়ে ফেলে এবং মক্কা প্রত্যাবর্তনের অজুহাত খুঁজতে থাকে। অবশেষে সে নিজ সঙ্গী সাথীদের বলল, ‘হে কুরাইশগণ, এ সময়টি যুদ্ধের উপযুক্ত সময় নয়। ঐ সময় হচ্ছে যুদ্ধের জন্য উপযুক্ত যখন ভূমি সজীব থাকবে, জীবজানোয়ার ঘাস খেতে পাবে এবং তোমরাও দুগ্ধ পান করতে পারবে। এখন শুষ্ক অবস্থা বিরাজমান রয়েছে। অতএব আমি প্রত্যাবর্তন করার মনস্থ করেছি, তোমরাও আমার সঙ্গে প্রত্যাবর্তন কর।
অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল যে সৈন্যদের সকলেই যেন ভীত সন্ত্রস্ত্র হয়ে পড়েছিল। কারণ, কোন প্রকার বিরোধিতা ছাড়াই সকলেই ফিরে যাওয়ার প্রস্তাবে সম্মতি জ্ঞাপন করল। সফর অব্যাহত রাখা কিংবা মুসলিমগণের সঙ্গে যুদ্ধ করার ব্যাপারে কেউই মত দেয়নি।
এদিকে মুসলিমগণ আট দিন পর্যন্ত বদর প্রান্তরে শত্রুদের প্রতীক্ষায় থাকেন এবং এরই মধ্যে ব্যবসায়ের পণ্যাদি বিক্রয় করে এক দিরহামকে দু’ দিরহামে পরিণত করতে থাকেন। এরপর অত্যন্ত শান শওকাতের সঙ্গে তাঁরা মদীনা প্রত্যাবর্তন করেন। এ যুদ্ধকে ‘গাযওয়ায়ে বদরে মাওঊদ (ওয়াদাকৃত বদর যুদ্ধ), বদরে সানিয়াহ (দ্বিতীয় বদর যুদ্ধ), বদরে আখির (শেষ বদর যুদ্ধ) এবং বদরে সুগরা (ছোট বদর যুদ্ধ) নামে পরিচিত।[1]
বদর হতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রত্যাবর্তনের পর চতুর্দিকে শান্তি ও নিরাপত্তার এক সুন্দর বাতাবরণ সৃষ্টি হয়ে যায় এবং সমগ্র ইসলামী হুকুমাতের মধ্যে শান্তি স্বস্তির বাসন্তী হাওয়া প্রবাহিত হতে থাকে। এ সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরবের শেষ সীমা পর্যন্ত মনোযোগ দানের উপযোগী মানসিক প্রশান্তি ও অবকাশ লাভ করেন। পরিস্থিতির উপর মুসলিমগণের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং শত্রু-মিত্র সকলেরই তা উপলব্ধি এবং স্বীকৃতি প্রদানের প্রেক্ষিত সৃষ্টির কারণে এর বিশেষ প্রয়োজনও ছিল।
কাজেই দ্বিতীয় বদর যুদ্ধের পর ছয় মাস পর্যন্ত পরিপূর্ণ প্রশান্তির মধ্যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মদীনায় অবস্থান করেন। অতঃপর তিনি অবগত হন যে, সিরিয়ার নিকটবর্তী দুমাতুল জানদাল নামক স্থানের আশপাশে বসবাসরত গোত্রগুলো ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে গমনাগমনকারী লোকজনদের উপর চড়াও হয়ে তাদের মালপত্রাদি লুটপাট করে নিয়ে যায়। অধিকন্তু তিনি এ সংবাদও অবগত হন যে, মদীনা আক্রমণের উদ্দেশ্যে তারা এক বিরাট সৈন্যবাহিনী সংগ্রহ করেছে।
এ প্রেক্ষিতে সে’বা বিন ‘উরফুতাহ গিফারী (রাঃ)-কে মদীনায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করে এক হাজার মুসলিম সৈন্যের সমন্বয়ে গঠিত এক বাহিনীসহ নাবী কারীম (ﷺ) অকূস্থলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে যান। এটি ছিল ৫ম হিজরী ২৫শে রবিউল আওয়ালের ঘটনা। পথ প্রদর্শক হিসেবে সঙ্গে নেয়া হয়েছিল বনু ‘উযরাহ গোত্রের মাযকূর নামক এক ব্যক্তিকে।
এ অভিযানে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) রাত্রি বেলায় পথ চলতেন এবং দিবাভাগে আত্মগোপন করে থাকতেন। উদ্দেশ্য ছিল শত্রুপক্ষের উপর আকস্মিক আক্রমণ পরিচালনা করা। তাঁরা যখন লক্ষ্যস্থানের নিকটবর্তী হলেন তখন জানতে পারলেন যে, তারা বাইরে গেছে। কাজেই, তাদের গবাদি পাল ও রাখালদের উপর আক্রমণ চালিয়ে কিছু সংখ্যক গবাদি পশু হস্তগত করা হয়। অন্যগুলো নিয়ে রাখালেরা পলায়ন করে।
যতদূর পর্যন্ত দুমাতুল জানদালের অধিবাসীদের সংবাদ জানা গেছে তা হচ্ছে, যে দিকে সুযোগ পেল সে সেদিকে পলায়ন করল। দুমাতুল জানদাল উপস্থিত হয়ে মুসলিমগণ কাউকেও পেলেন না। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সেখানে কয়েক দিন অবস্থান করে এদিক সেদিক লোক পাঠালেন, কিন্তু কেউ তাদের নাগালের মধ্যে পড়ে নি। অবশেষে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মদীনা প্রত্যাবর্তন করেন। এ অভিযান কালে উয়াইনা বিন হাসানের সহিত সন্ধি চুক্তি সম্পাদিত হয়। দুমাতুল জানদাল হচ্ছে সিরিয়া সীমান্তে অবস্থিত একটি শহর। এখান থেকে দামেশকের দূরত্ব পাঁচ রাত্রির পথ এবং মদীনার দূরত্ব পনের রাত্রির পথ।
এ আকস্মিক ও মীমাংসাসূচক অভিযান এবং কূটনৈতিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করেন; এর ফলে যুগ প্রবাহের মোড় মুসলিমগণের অনুকূলে পরিবর্তিত হয় এবং অভ্যন্তরীণ ও বহিরস্থ বিপদাপদের কাঠিন্য, যা তাঁদের চতুর্দিকে পরিবেষ্টন করে রেখেছিল তা হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। মুনাফিক্বেরা নীরব এবং নিরাশ হয়ে বসে পড়ে। ইহুদীদের একটি গোত্রকে দেশ থেকে বহিস্কার করা হয়। অন্যান্যরা সত্যের সমর্থন ও চুক্তিবন্ধতার প্রতি বিশ্বস্ততা প্রদর্শণ। বেদুঈন এবং কুরাইশেরা দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সব কিছুর প্রেক্ষাপটে মুসলিমগণ ইসলাম প্রচার করার এবং রাববুল আলামীনের পয়গাম দেশ দেশান্তরে পৌঁছে দেয়ার এক অভূতপূর্ব সুযোগ লাভ করেন।
এক বছরকালব্যাপী উপর্যুপরি সামরিক অভিযান এবং কর্মকান্ডের প্রেক্ষাপটে আরব উপদ্বীপে শান্তি ও স্বস্তির বাতাবরণ সৃষ্টি হয়েছিল এবং সর্বত্র সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ বিরাজমান ছিল। কিন্তু যে সকল ইহুদীকে নিজেদের দুষ্কর্ম ও চক্রান্তের কারণে নানা প্রকার অপমান ও লাঞ্ছনার আস্বাদ গ্রহণ করতে হয়েছিল তখনো তাদের চৈতন্যোদয় হয়নি। বিশ্বাসঘাতকতা, শঠতা, অঙ্গীকারভঙ্গ, ধোকাবাজি, আমানতের খেয়ানত ইত্যাদি নানাবিধ অপকর্মের অশুভ ফলাফল থেকে কোন শিক্ষাই তাদের হয়নি। কাজেই, মদীনা থেকে বহিস্কৃত হয়ে খায়বার যাওয়ার পর মুসলিম ও মূর্তিপূজকদের মধ্যে যে সামরিক টানাপোড়েন চলছিল তার ফলাফল কী দাঁড়ায় তা প্রত্যক্ষ করার জন্য তারা অপেক্ষমান থাকে। কিন্তু যখন তারা প্রত্যক্ষ করল যে, পরিস্থিতি ক্রমেই মুসলিমগণের অনুকূলে যাচ্ছে এবং তাঁদের শাসন ক্ষমতা বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছে তখন তারা হিংসার আগুনে জ্বলেপুড়ে মরতে লাগল এবং নানা প্রকার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হল। শেষ বারের মতো মুসলিমগণকে এমন এক চরম আঘাত হানার জন্য তারা প্রস্তুতি শুরু করে দিল যাতে তাঁদের জীবন প্রদীপ চিরতরে নির্বাপিত হয়ে যায়। কিন্তু যেহেতু মুসলিমগণের সঙ্গে সরাসরি মোকাবেলা করার সাহস তাদের ছিল না সেহেতু এক অত্যন্ত বিপজ্জনক পন্থা অবলম্বন করল যা নিম্নে লিপিবদ্ধ করা হল :
বনু নাযীর গোত্রের ২০ জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি মক্কার কুরাইশগণের নিকট উপস্থিত হয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার জন্য তাদের উদ্বুদ্ধ করতে থাকে এবং যুদ্ধে তাদের সাহায্য সহযোগিতা করার জন্যও নিশ্চয়তা প্রদান করে। সেহেতু উহুদ যুদ্ধের দিন কুরাইশরা পুনরায় মুসলিমগণের সঙ্গে বদরে মোকাবেলা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা পালন করতে ব্যর্থ হয় এবং এর ফলে যোদ্ধা হিসেবে তাদের যে সুখ্যাতির হানি হয় তা পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যেই বনু নাযীরের প্রস্তাব তাদের উৎসাহিত করে এবং তারা তা মেনে নেয়।
এরপর ইহুদীগণের এ দলটি বনু গাত্বাফান গোত্রের নিকট যায় এবং কুরাইশদের মতো তাদেরকেও যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। এ প্রেক্ষিতে তারাও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। অধিকন্তু, এ প্রতিনিধি দলটি আরবের অবশিষ্ট গোত্রগুলোর নিকট ঘোরাফিরা করে তাদেরকেও যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ এবং উৎসাহিত করতে থাকে। যার ফলে তারা অনেকেই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। এভাবে ইহুদীগণ অত্যন্ত কার্যকরভাবে নাবী কারীম (ﷺ), ইসলামী দাওয়াত এবং মুসলিমগণের বিরুদ্ধে কাফির মুশরিকদের বড় বড় গোত্র এবং দলগুলোকে উত্তেজিত ও উদ্বুদ্ধ করে যুদ্ধের জন্য তৈরি করে নেয়।
অতঃপর নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী দক্ষিণদিক হতে কুরাইশ কিনানাহ এবং তুহামায় বসবাসরত দ্বিতীয় হালিফ (চুক্তিবদ্ধ) গোত্রসমূহ মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হয়ে যায়। এদের সংখ্যা ছিল চার হাজার এবং সার্বিক নেতৃত্বে ছিল আবূ সুফইয়ান। এ বাহিনী মাররুয যাহরান গিয়ে পৌঁছলে বনু সুলাইম গোত্র এসে তাদের সঙ্গে যোগদান করে। ঐ সময় পূর্বদিক হতে গাত্বাফানী গোত্র ফাযারা, মুররাহ এবং আশজা গোত্র রওয়ানা হয়ে যায়। ফাযারাহর সেনাপতি ছিলেন উয়াইনাহ বিন হাসান, মুররাহর গোত্রের নেতৃত্বে ছিল হারিস বিন আউফ এবং বনু আশজা গোত্রের নেতৃত্বে ছিল মিসআর বিন রুহাইলাহ। তাদের নেতৃত্বাধীনে বনু আসাদ এবং অন্যান্য বিভিন্ন গোত্রের অনেক লোকজনও এসেছিল।
উল্লেখিত গোত্রগুলো একটি নির্দিষ্ট সময় এবং নির্ধারিত কর্মসূচি মোতাবেক মদীনা অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছিল। এ প্রেক্ষিতে কয়েক দিনের মধ্যেই মদীনার আশপাশে দশ হাজার সৈন্যের এক দুর্ধর্ষ বাহিনী সমবেত হল। তারা এত বেশী সংখ্যক সৈন্য সংগ্রহ করেছিল যে মদীনার মহিলা, শিশু, বৃদ্ধ ও যুবকের সমষ্টিগত সংখ্যার চাইতেও তাদের সৈন্য সংখ্যা ছিল বেশী। শত্রুপক্ষের এ সৈন্য সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গ যদি আকস্মিকভাবে মদীনার দেয়াল পর্যন্ত পৌঁছে যেত তাহলে মুসলিমগণের জন্য তা হতো অত্যন্ত বিপজ্জনক। তখন এতে আশ্চর্য হওয়ার মতো কিছুই থাকত না যে, মুসলিমগণের মূলোৎপাটন করে তাঁদের সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হত।
কিন্তু মদীনার নেতৃত্ব ছিল অত্যন্ত সজাগ ও সচেতন মস্তিস্ক এবং পরিচালনা ছিল নিচ্ছিদ্র যত্মশীল। তাঁর সচেতন হস্তের আঙ্গুলগুলো সর্বক্ষণ পরিস্থিতির নাড়ির গতির উপর ছিল বিদ্যমান। পরিস্থিতির গতিধারার প্রেক্ষাপটে সংঘটিত ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার ঠিক ঠিক আঁচ অনুমান ও তথ্য পরিবেশন এবং তা থেকে মুক্ত থাকার জন্য তিনি উপযুক্ত সময়ে যথার্থ পদক্ষেপ অবলম্বন করে আসছিলেন। কাজেই কাফিরদের বিশাল বাহিনী যখনই মদীনা অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার জন্য সচেষ্ট হল তখনই মদীনার সংবাদ সরবরাহকারীগণ পরিচালকের নিকট ত্বরিৎ সংবাদ পরিবেশন করলেন।
সংবাদ প্রাপ্ত হওয়া মাত্রই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নেতৃস্থানীয় সাহাবাগণের পরামর্শ বৈঠক আহবান করেন এবং প্রতিরোধ সংক্রান্ত পরিকল্পনার ব্যাপারে সলা পরামর্শ করেন। শুরার প্রতিনিধিগণ অনেক চিন্তা ভাবনার পর সর্বসম্মতক্রমে সালামাহন ফারসী (রাঃ)-এর একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেন। সালামাহন ফারসীর (রাঃ) প্রস্তাবটির ভাষ্য ছিল নিম্নরূপ :
‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! পারস্যে যখন আমাদেরকে অবরোধ করা হতো তখন আমরা আমাদের পার্শ্ববর্তী স্থানে পরিখা খনন করে নিতাম।’
প্রতিরোধ সংক্রান্ত এ প্রস্তাবটি ছিল অত্যন্ত হেকমতপূর্ণ ও সম্ভাবনাময়। আরববাসীগণ এ প্রস্তাবের হেকমত সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না। এ প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তা বাস্তবায়ণের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ অবলম্বন করেন। এতে প্রতি দশ জনের উপর ৪০ (চল্লিশ) হাত পরিখা খননের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। দায়িত্ব প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে মুসলিমগণ অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পরিখা খননে আত্মনিয়োগ করেন। নাবী কারীম (ﷺ) এ কাজে সকলকে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত করতে থাকেন এবং নিজেও পুরোপুরিভাবে ওতে অংশগ্রহণ করেন। সাহল বিন সা‘দ হতে বুখারী শরীফে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে আমরা খন্দকে ছিলাম। লোকজনেরা খনন করছিলেন এবং আমরা কাঁধে করে মাটি বহন করছিলাম। এ সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পাঠ করলেন, (اللَّهُمَّ لاَ عَيْشَ إِلاَّ عَيْشُ الْآخِرَةِ، فَاغْفِرْ لِلْمُهَاجِرِيْنَ وَالْأَنْصَارِ) অর্থ: ‘হে আল্লাহ! পরকালীন জীবন তো হচ্ছে প্রকৃত জীবন, অতএব মুহাজিরীন এবং আনসারগণকে ক্ষমা করে দাও।[1]
আনাস হতে বর্ণিত অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন খন্দকের দিকে আগমন করলেন তখন প্রত্যক্ষ করলেন যে, এক শীতের সকালে আনসার ও মুহাজিরীনগণ খনন করছেন। তাদের নিকট এমন কোন দাস নেই যে তাদের পরিবর্তে দাসগণ এ কাজ করে দেয়। তাদের কষ্ট এবং ক্ষুধার ভাব দেখে রাসুল্লাহ (ﷺ) বললেন,
اللهم إن العيش عيش الآخرة ** فاغفـر للأنصـار والمهـاجرة
‘হে আল্লাহ! অবশ্যই, পরকালীন জীবনটাই প্রকৃত জীবন। অতএব, আনসার এবং মুহাজিরগণকে ক্ষমা করে দিন।
আনসার এবং মুহাজিরগণ প্রত্যুত্তরে বললেন,
نحـن الذيـن بايعـوا محمـداً ** عَلٰى الجهـاد ما بقيـنا أبداً
অর্থ: ‘আমরা সেই ব্যক্তি যারা মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর হস্তে জিহাদের বাইআত করেছি, আমাদের এ প্রতিজ্ঞা চূড়ান্ত ও স্থায়ী।[2]
সহীহুল বুখারীতে বারা’ বিন আযিব হতে বর্ণিত আছে, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে খন্দকের মাটি বহনরত অবস্থায় প্রত্যক্ষ করেছি। এ মাটি বহন করার কারণে তাঁর দেহ মুবারক ধূলি ধূসরিত হয়ে উঠেছিল। এ অবস্থায় তাঁকে আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহার কবিতার নিম্নোক্ত চরণগুলো আবৃত্তি করতে শুনেছিলাম :
اللهم لولا أنت ما اهتدينا ** ولا تصـدقنـا ولا صلينــا
فأنزلن سكينـة علينـا ** وثبت الأقـدام إن لاقينــا
إن الألى رغبوا علينـا ** وإن أرادوا فتـنـة أبينـــا
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! যদি তোমার অনুগ্রহ না হতো তাহলে আমরা হিদায়াত প্রাপ্ত হতাম না, আমরা দান খায়রাত করতাম না এবং সালাত আদায় করতাম না। অতএব আমাদের প্রতি শান্তি বর্ষণ কর এবং কাফিরদের সঙ্গে যদি আমাদের মোকাবেলা হয় তাহলে আমাদেরকে ধৈর্য্যদান করিও। তারা আমাদের বিরুদ্ধে লোকদের প্ররোচিত করেছে। যদি তারা ফেৎনা সৃষ্টি করতে চায় তাহলে আমরা কখনই মাথা নত করব না।
বারা’ বিন আযিব বলেছেন, ‘শেষের শব্দগুলো রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অধিক টান দিয়ে উচ্চারণ করছিলেন, অন্য একটি বর্ণনায় করিতাটির শেষাংশ ছিল নিম্নরূপ :
إن الألى قـد بغـوا علينـا ** وإن أرادوا فـتنـة أبينـا
অর্থ: ‘তারা আমাদের উপর অত্যাচার করেছে এব তারা যদি আমাদেরকে ফেৎনায় নিক্ষেপ করতে চায়, আমরা কখনই মাথা নত করে তা মেনে নেব না।’[3]
মুসলিমগণ একদিকে এতই আবেগের সঙ্গে কাজ করছিলেন, অপর দিকে তাঁদের ক্ষুধার তাড়না এত অধিক ছিল যে, তা চিন্তা করতে গেলে অন্তর ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, পরিখা খননরত মুসলিমগণের জন্য যে সামান্য পরিমাণ খাদ্য দ্রব্য আনা হয়েছিল তা ছিল অত্যন্ত দুর্গন্ধযু্ক্ত। এ দুর্গন্ধযুক্ত খাদ্যই তাঁরা গ্রহণ করেছিলেন।[4]
আবূ ত্বালহাহ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট আমরা ক্ষুধার অভিযোগ করলাম এবং নিজ নিজ পেটের আবরণ উন্মোচন করে পেটের সঙ্গে বেঁধে রাখা পাথর দেখালাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আপন পেটের আবরণ উন্মোচণ করে দেখালেন যে, তাঁর পেটের দুটি পাথর বাঁধা আছে।[5]
পরিখা খননকালে নবুওয়াতের কতিপয় নিদর্শনও প্রকাশিত হয়। সহীহুল বুখারীর বর্ণনায় আছে যে, নাবী কারীম (ﷺ)-এর তীব্র ক্ষুধার ব্যাপারটি অবগত হয়ে জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) একটি বকরীর বাচ্চা যবেহ করলেন এবং তাঁর স্ত্রী এক সা’ (আনুমানিক আড়াই কেজি) যব পিসে আটা তৈরি করলেন। অতঃপর কয়েকজন বিশিষ্ট সাহাবীসহ একান্তে তাঁর বাসায় তশরীফ আনয়নের জন্য নাবী কারীম (ﷺ)-কে অনুরোধ পেশ করলেন। কিন্তু নাবী কারীম (ﷺ) পরিখা খননরত সকল সাহাবী (রাঃ)-কে (যাদের সংখ্যা ছিল এক হাজার) সঙ্গে নিয়ে তাঁর গৃহে গমন করলেন।
আল্লাহ তা‘আলার অশেষ অনুগ্রহে এ স্বল্প খাদ্যে সাহাবীগণের সকলেই পূর্ণ পরিতৃপ্তির সঙ্গে আহার করলেন অথচ মাংসের পাত্রে সাবেক পরিমাণ মাংস অবশিষ্ট রইল এবং আটার পাত্রেও সাবেক পরিমাণ আটা অবশিষ্ট থাকা অবস্থায় ক্রমাগতভাবে রুটি তৈরি হতে থাকল।[6]
তাঁর পিতা এবং মামাকে খাওয়ানোর উদ্দেশ্যে নু’মান ইবনু বাশীরের বোন অল্প খেজুরসহ খন্দকের নিকট আগমন করলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তা চেয়ে নিয়ে একটি কাপড়ের উপর ছড়িয়ে দেন। অতঃপর খননরত সাহাবীদের দাওয়াত দিয়ে তা খেতে বললেন। সাহাবীগণ খেতে থাকলে খেজুরের পরিমাণ ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকল। পূর্ণ পরিতৃপ্তি সহকারে সকল সাহাবীর খাওয়ার পরেও এ পরিমাণ খেজুর অবশিষ্ট রইল যে, তার কিছু পরিমাণ কাপড়ের বাইরেও পড়েছিল।[7]
খন্দক খনন কালে উপর্যুক্ত ঘটনাবলীর চাইতেও উল্লেখযোগ্য আরও ইমাম বুখারী (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। জাবির বলেন, আমরা পরিখা খনন কাজে নিয়োজিত থাকা অবস্থায় একটি অত্যন্ত শক্ত পাথর আমাদের কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করল। কয়েকজন সাহাবী নাবী কারীম (ﷺ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরজ করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! একটি অত্যন্ত শক্ত গোছের পাথর আমাদের খনন কাজে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছে।’
নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, ‘আমি অবতরণ করছি’, অতঃপর তিনি যখন সেখানে তশরীফ আনয়ন করলেন তখনো তাঁর পেটের উপর একটি পাথর বাঁধা ছিল। আমরাও তিন দিন যাবৎ কোন প্রকার খাদ্য দ্রব্য গ্রহণ করি নি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন এ খন্ডের উপর আঘাত করলেন তখন তা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে স্তুপে পরিণত হয়ে গেল।[8]
বারা’ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, ‘খন্দক খনন কালে এক স্থানে একটি অত্যন্ত শক্ত পাথর দৃষ্টিগোচর হল। এ পাথরটিকে কোদাল দ্বারা আঘাত করলে সে আঘাতে পাথরটির কিছুই হল না, বরং কোদাল প্রত্যাঘাত খেয়ে ফিরে আসতে থাকল। উপায়ান্তর না দেখে নাবী কারীম (ﷺ)-কে ব্যাপারটি অবহিত করা হল। ব্যাপারটি অবগত হয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সেখানে আগমন করলেন এবং কোদাল হাতে নিয়ে বিসমিল্লাহ বলার পর পাথরটিকে আঘাত করলেন। এ আঘাতের ফলে পাথরের একটি অংশ ভেঙ্গে পড়ল। তখন তিনি বললেন,
(اللهُ أَكْبَرُ، أُعْطِيْتُ مَفَاتِيْحُ الشَّامِ، وَاللهِ إِنِّيْ لَأَنْظُرُ قُصُوْرَهَا الْحُمُرِ السَّاعَةِ)
‘আল্লাহ আকবার! আমার হাতে সিরিয়া দেশের চাবি কাঠি দেয়া হয়েছে। আল্লাহ সাক্ষী আছে, সেখানকার লাল দালানগুলো আমার দৃষ্টিগোচর হচ্ছে।’
অতঃপর যখন তিনি দ্বিতীয়বার আঘাত করলেন তখন অন্য একটি অংশ ভেঙ্গে পড়ল। তিনি বললেন,
(اللهُ أَكْبَرُ، أُعْطِيْتُ فَارِسٌ، وُاللهِ إِنِّيْ لَأَبْصِرُ قَصْرَ الْمَدَائِنِ الْأَبْيَضِ الْآنَ)
‘আল্লাহ আকবার! আমাকে পারস্য সাম্রাজ্য দেয়া হয়েছে। আল্লাহ সাক্ষী, এ সময় আমি মাদায়েনের সাদা দালানাগুলো প্রত্যক্ষ করছি। অতঃপর বিসমিল্লাহ্ সহকারে তিনি তৃতীয় বার আঘাত করলেন। তখন পাথরটির অবশিষ্টাংশ ভেঙ্গে পড়ল। এবার তিনি বললেন,
(اللهُ أَكْبَرُ، أُعْطِيْتُ مَفَاتِيْحُ الْيَمَنِ، وَاللهِ إِنِّيْ لِأَبْصِرُ أَبْوَابَ صَنَعَاءِ مِنْ مَكَانِيْ)
‘আল্লাহ আকবার! আমাকে ইয়ামান রাজ্যের চাবিগুলো প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ সাক্ষী, এখন আমি সানআর সিংহদ্বার প্রত্যক্ষ করছি।[9] সালমান ফারসী (রাঃ)-এর রেওয়ায়েত থেকে ইবনু ইসহাক্ব অনুরূপ বর্ণনা প্রদান করেছেন।[10]
যেহেতু উত্তর দিক ছাড়া অন্যান্য সব দিক থেকেই মদীনা নগরী পাহাড়, পর্বত এবং খেজুর বাগান দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল সেহেতু একজন বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ ও দক্ষ সৈনিক হিসেবে যথার্থই তিনি ধারণা করেছিলেন যে, মদীনার উপর এত বিশাল এক বাহিনীর আক্রমণ একমাত্র উত্তর দিক থেকেই সম্ভব হতে পারে এবং সেই দিকেই তিনি পরিখা খনন করেছিলেন।
মুসলিমগণ পরিখা খনন কাজ একটানা অব্যাহত রাখেন। দিবা ভাগে তাঁরা খনন কাজ চালিয়ে যেতেন এবং সন্ধ্যাবেলা ঘরে ফিরে যেতেন। এভাবে মদীনার পার্শ্ববর্তী দেয়াল পর্যন্ত কাফিরদের সুসজ্জিত সৈন্যদল পৌঁছার পূর্বেই নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী খন্দক তৈরির কাজ সম্পন্ন্ হয়ে যায়।[11]
এদিকে চার হাজার সৈন্য সমন্বয়ে গঠিত কুরাইশ বাহিনী মদীনার নিকটবর্তী রূমাহ, জুরফ এবং জাগাবার মধ্যবর্তী মাজমাউল আসয়াল নামক স্থানে শিবির স্থাপন করে। অন্যদিকে গাত্বাফান এবং তাদের নাজদী সঙ্গীরা ছয় হাজার সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে উহুদের পূর্ব পাশে যামবে নাকনী নামক স্থানে শিবির স্থাপন করে। এহেন পরিস্থিতির প্রতি ইঙ্গিত করে মহান আল্লাহ বলেন,
(وَلَمَّا رَأَى الْمُؤْمِنُوْنَ الْأَحْزَابَ قَالُوْا هٰذَا مَا وَعَدَنَا اللهُ وَرَسُوْلُهُ وَصَدَقَ اللهُ وَرَسُوْلُهُ وَمَا زَادَهُمْ إِلَّا إِيْمَانًا وَتَسْلِيْمًا) [الأحزاب: 22].
‘মু’মিনরা যখন সম্মিলিত বাহিনীকে দেখল তখন তারা বলে উঠল- আল্লাহ ও তাঁর রসূল এরই ওয়া‘দা আমাদেরকে দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূল সত্য বলেছেন। এতে তাদের ঈমান ও আনুগত্যের আগ্রহই বৃদ্ধি পেল।’ [আল-আহযাব (৩৩) : ২২]
কিন্তু মুনাফিক্ব এবং দুর্বল অন্তঃকরণের লোকদের দৃষ্টি যখন সেই বিশাল সৈন্যবাহিনীর উপর পতিত হতো তখন তাদের অন্তর প্রকম্পিত হতে থাকল। এদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
(وَإِذْ يَقُوْلُ الْمُنَافِقُوْنَ وَالَّذِيْنَ فِيْ قُلُوْبِهِم مَّرَضٌ مَّا وَعَدَنَا اللهُ وَرَسُوْلُهُ إِلَّا غُرُوْرًا) [ الأحزاب: 12].
‘ আর স্মরণ কর, যখন মুনাফিক্বরা এবং যাদের অন্তরে রোগ আছে তারা বলছিল- আল্লাহ ও তাঁর রসূল আমাদেরকে যে ওয়া‘দা দিয়েছেন তা ধোঁকা ছাড়া আর কিছুই নয়।’ [আহযাব (৩৩) : ১২]
যাহোক, শত্রুপক্ষের সঙ্গে মোকাবেলার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তিন হাজার সৈন্যের এক বাহিনীসহ অগ্রসর হলেন এবং সালা পর্বতকে পিছনে রেখে শিবির স্থাপন করলেন, সম্মুখভাগে ছিল খন্দক যা মুসলিম এবং কাফিরদের মধ্যে একটি প্রতিবন্ধক প্রাচীর হিসেবে বিদ্যমান ছিল। মুসলিম প্রতীক চিহ্ন (কোড পরিভাষা) ছিল[حٰم~ لاَ يُنْصَرُوْنَ] (হামীম, তাদেরকে সাহায্য করা হবে না)। এ সময় মদীনার দায়িত্বভার অর্পণ করা হয় ইবনু উম্মু মাকতুমের উপর। মদীনার মহিলা এবং শিশুদেরকে নগরের দূর্গ ও গর্তসমূহে সুরক্ষিত রাখা হয়।
আক্রমণের উদ্দেশ্যে মুশরিকগণ যখন মদীনার দিকে অগ্রসর হল তখন প্রত্যক্ষ করল যে, একটি প্রশস্ত পরিখা তাদের এবং মুসলিমগণের মধ্যে প্রতিবন্ধক হিসেবে বিদ্যমান রয়েছে। অনন্যোপায় হয়ে তাদেরকে অবরোধ সৃষ্টির কথা ভাবতে হল অথচ যুদ্ধের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার সময় এ রকম কোন চিন্তা ভাবনা কিংবা প্রস্তুতি তাদের ছিল না। কারণ প্রতিরোধের এ পরিকল্পনা তাদের নিজেদের কথা অনুযায়ী এমন একটি চাতুর্যপূর্ণ কৌশল যে সম্পর্কে আরবগণের কোন ধারণা ছিল না। কাজেই, এ ধরণের রণ-কৌশল সম্পর্কে তারা চিন্তাই করে নি।
খন্দকের নিকট উপস্থিত হয়ে মুশকিরগণ তাদের ধারণাতীত এ রণ-কৌশল প্রত্যক্ষ করে অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হয়ে উঠল এবং ক্ষিপ্রতার সঙ্গে চক্কর দিতে থাকল। এ অবস্থায় তারা এমন কোন দুর্বল স্থানের অনুসন্ধান করছিল যেখান দিয়ে অবতরণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হতে পারে। এদিকে মুসলিমগণ তাদের গতিবিধির প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখাছিলেন এবং তারা যাতে খন্দকের নিকটবর্তী হতে সাহসী না হয় এ উদ্দেশ্যে মাঝে মাঝে তীর নিক্ষেপ করছিলেন যাতে তারা খন্দকের মধ্যে লাফ দিয়ে পড়তে কিংবা অংশ বিশেষ ভরাট করে ফেলে পথ তৈরি করে নিতে না পারে।
এদিকে কুরাইশ আশ্বারোহীগণ এটা কিছুতেই সহ্য করতে পারছিল না যে খন্দকের পাশে অবরোধ সৃষ্টি করে ফলাফলের আশায় অনর্থক অনির্দিষ্ট কাল যাবৎ তারা বসে থাকবে। এ জাতীয় ব্যবস্থা ছিল তাদের অভ্যাস ও শানের সম্পূর্ণ বিপরীত। কাজেই, তাদের একটি দল যার মধ্যে ছিল ‘আমর বিন আবদে উদ্দ, ইকরামা বিন আবূ জাহল এবং যারবার বিন খাত্তাব একটি সংকীর্ণ স্থান দিয়ে খন্দক পার হয়ে গেল এবং তাদের ঘোড়াগুলোও সালায়ার মধ্যবর্তী স্থানে চক্কর দিতে থাকল। পক্ষান্তরে আলী এবং কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) খন্দকের যে অংশ দিয়ে তারা প্রবেশ করেছিল সেখানে অবস্থান নিয়ে তাদের পথ বন্ধ করে দিলেন। এর প্রেক্ষিতে ‘আমর বিন আবদে উদ্দ সামনা সামনি মোকাবেলার জন্য উচ্চ কণ্ঠে আহবান জানাল। আলী (রাঃ) তার সঙ্গে মোকাবেলার জন্যে মুখোমুখী হয়ে এমন এক বাক্য উচ্চারণ করেন যার ফলে অত্যন্ত ক্রোধান্বিত অবস্থায় সে ঘোড়া হতে লাফ দিয়ে অবতরণ করে। সে অশ্বের পদযুগল কর্তন ও অবয়ব বিকৃত করত- সে অন্যতম বীর ও সাহসী মুশরিক ছিল। আলী (রাঃ)-এর সম্মুখে এসে পড়ে। অতঃপর উভয়ের মধ্যে শুরু হল মোকাবেলা। চলল উভয়ের মধ্যে আক্রমণ ও প্রতি আক্রমণের পালা। অবশেষে প্রবল আঘাত হেনে আলী (রাঃ) তাকে হত্যা করেন। এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে অন্যান্য মুশরিকগণ ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় খন্দক পেরিয়ে পলায়ন করে। তারা এতই ভীত হয়ে পড়েছিল যে, পলায়নের সময় ইকরামা তার বর্শা ফেলে দিয়ে পলায়ন করে।
মুশরিকগণ কোন কোন সময় খন্দক অতিক্রম করে যাওয়ার কিংবা এর প্রশস্ততা কমিয়ে পথ তৈরি করে নেয়ার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালায়, কিন্তু মুসলিমগণও খন্দক থেকে তাদের দূরে রাখার লক্ষে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বিভিন্ন ব্যবস্থা অবলম্বন করে যেতে থাকেন। তারা অদম্য সাহস এবং দক্ষতার সঙ্গে তীর নিক্ষেপ করেন এবং প্রতিপক্ষের তীরন্দাযির মোকাবেলা করে তাদের সকল প্রকার প্রচেষ্টাকে বিফল করে দেন।
শত্রুপক্ষের সঙ্গে অব্যাহত মোকাবেলা করার কারণে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং সাহাবীগণ (রাঃ)-এর পক্ষে সালাত আদায় করা সম্ভব হয় নি। যেমনটি সহীহাইনের মধ্যে জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, খন্দকের দিন উমার বিন খাত্তাব আগমন করেন এবং কাফিরগণ সম্পর্কে কিছু ভালমন্দ কথা বলার পর আরজ করেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! অদ্য সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় খুব কষ্টে সালাত আদায় করতে সক্ষম হয়েছি।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন,(وَأَنَا وَاللهِ مَا صَلَّيْتُهَا) ‘আল্লাহ তা‘আলার শপথ! আমি এখনো সালাত আদায় করতে পারি নি।’
এরপর আমরা নাবী কারীম (ﷺ)-এর সঙ্গে বুতহান নামক স্থানে অবতরণ করি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সেখানে অযু করেন এবং আমরাও অযু করি। অতঃপর তিনি আসরের সালাত আদায় করেন। এটি ছিল সূর্য অস্তমিত হয়ে যাওয়ার পরের কথা। এরপর মাগরিবের সালাত আদায় করা হয়।[12]
নির্দিষ্ট সময়ে এ সালাত আদায় করতে না পারার কারণে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এতই মর্মাহত হয়েছিলেন যে, মুশরিকদের বিরুদ্ধে তিনি বদ দু‘আ করেছিলেন। বুখারী শরীফে আলী (রাঃ)-এর রিওয়ায়েতে বর্ণিত আছে যে, খন্দকের দিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন,
(مَلَأَ اللهُ عَلَيْهِمْ بُيُوْتَهِمْ وَقُبُوْرَهِمْ نَارًا، كَمَا شَغَلُوْنَا عَنْ الصَّلاَةِ الْوُسْطٰى حَتّٰى غَابَتِ الشَّمْسُ)
‘হে আল্লাহ! ঐ সকল মুশরিকের বাড়িঘর ও কবর এমনভাবে আগুণে পরিপূর্ণ করে দাও যেভাবে তারা আমাদেরকে ‘সালাতে উস্তা’ বা মধ্যবর্তী সলাত আদায় করা থেকে বিরত রেখেছে এবং এভাবে সূর্য অস্তমিত হয়ে গেছে।[13]
মুসনাদে আহমাদ এবং মুসনাদে শাফেয়ীতে বর্ণিত আছে যে, মুশরিকগণ নাবী কারীম (ﷺ)-কে জোহর, আসর, মাগরিব ও এশার সালাত আদায় করা থেকে বিরত রাখে। এ প্রেক্ষিতে তিনি একত্রে এ সালাত আদায় করেন। ইমাম নাবাবী বলেন, ‘উল্লেখিত বর্ণনা সমূহের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের ব্যাপারে সমাধান হবে, খন্দক যুদ্ধের কয়েকদিন পর্যন্ত এ সমস্যা চালু ছিল। কাজেই, কোন দিন এ রকম এবং অন্য দিন ভিন্ন রকম অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল।[14]
এখান থেকে এ কথাও প্রমাণিত হয় যে, মুশরিকগণের পক্ষ থেকে খন্দক অতিক্রম করার প্রচেষ্টা এবং মুসলিমগণের পক্ষ থেকে অব্যাহত প্রতিরোধ কয়েক দিন পর্যন্ত চালু ছিল একটি বিরাট প্রতিবন্ধক, এই জন্যে সামানাসামনি সংগ্রামের সুযোগ সৃষ্টি হয় নি। যুদ্ধের গতিধারা তীর নিক্ষেপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
অবশ্য, তীর নিক্ষেপের ফলে উভয় পক্ষেরই কয়েক ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করতে হয় কিন্তু তাদের সংখ্যা আঙ্গুলে গণনা করা সম্ভব। মুসলিম মৃত ব্যক্তিদের সংখ্যা ছিল ছয় জন এবং মুশরিকদের পক্ষে দশ জন। এর মধ্যে এক কিংবা দু’ জন তরবারির আঘাতে নিহত হয়েছিল।
ঐ দু’ প্রতিপক্ষ দলের পরস্পর পরস্পরের প্রতি তীর নিক্ষেপের এক পর্যায়ে সা‘দ বিন মু’আয তীরবিদ্ধ হন। তীরের আঘাতে তাঁর হাতের মূল শিরা কর্তিত হয়। হেববান বিন আরাক নামক এক কুরাইশীর তীরের আঘাতে তিনি আহত হন। আহত হওয়ার পর তিনি প্রার্থনা করেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি জানো যে, যে সম্প্রদায় তোমার রাসূল (ﷺ)-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে এবং তাকে দেশ হতে বাহির করে দিয়েছে, তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার ব্যাপারটি আমার নিকট যত প্রিয়, অন্য কোন সম্প্রদায়ের নিকট ততটা প্রিয় নয়। হে আল্লাহ! আমি মনে করি যে, এখন তুমি তাদের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধকে শেষ পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছ। কিন্তু যুদ্ধের ব্যাপারে এখনো যদি কোন কিছু অবশিষ্ট থাকে তাহলে আমাকে তাদের জন্য অবশিষ্ট রেখে দাও যেন আমি তাদের সঙ্গে জিহাদে লিপ্ত হতে পারি। আর যদি তুমি যুদ্ধ শেষ করে থাক তাহলে এ আঘাতকে বাকী রেখে এটাকে আমার মৃত্যুর কারণ করে দাও।[15] তিনি তাঁর দু’আয় সর্বশেষে বলেছেন, বনু কুরাইযাহর ব্যাপারে আমার চক্ষু শীতল না হওয়া পর্যন্ত আমাকে মৃত্যু দিও না।
যে প্রকারেই হোক এক দিকে মুসলিমগণ শত্রুদের সামনাসামনি হয়ে উদ্ভূত সমস্যাবলী সমাধানে তৎপর রয়েছেন, অন্য দিকে ষড়যন্ত্রকারী এবং কপটদের শঠতা স্বর্প আপন গর্তের মধ্যে কুন্ডলী পাকাচ্ছে এবং প্রচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে যে, তারা মুসলিমগণের দেহে গরল ঢেলে দেবে। যেমন বনু নাযীরের বড় অপরাধী হুওয়ায় বিন আখতাব বনু কুরাইযাহর আবাসস্থলে এসে তাদের নেতা কা‘ব বিন আসাদ কোরযীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। এ কা‘ব বিন আসাদ হচ্ছে সেই ব্যক্তি যে বনু কোরাইয়ার পক্ষ থেকে অঙ্গীকার পালনের অধিকার রাখত এবং যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে এ চুক্তি করেছিল যে, যুদ্ধের সময় সে তাঁকে সাহায্য করবে। (যেমনটি ইতোপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে) হুওয়ায় এসে যখন দরজায় করাঘাত করে তখন সে ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু হুওয়ায় তার সঙ্গে এমন এমন সব কথাবার্তা বলতে থাকে যে, শেষ পর্যন্ত তাঁর জন্য সে দরজা খুলে দেয়। হুওয়ায় বলল, ‘হে কা‘ব! আমি তোমার নিকট যুগের ইজ্জত এবং জোয়ারের সাগর নিয়ে এসেছি। আমি নেতা ও পরিচালকগণসহ মুশরিকদেরকে নিয়ে এসে রুমার মাজমাউল আসয়ালে অবতরণ করিয়েছি। তাছাড়া, বনু গাত্বাফানকে তাদের পরিচালক ও নেতৃবৃন্দসহ উহুদের নিকট যামবে নাকমীতে শিবির স্থাপন করেছি। তারা আমার সঙ্গে এ মর্মে অঙ্গীকার করেছে,
‘মুহাম্মাদ এবং তার সঙ্গী সাথীদের সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন না করা পর্যন্ত তারা এখান থেকে ফিরে যাবে না।’
কা‘ব বলল, ‘আল্লাহর কসম! তুমি আমার নিকট যুগের অপমান এবং বর্ষণ-মুখর মেঘমালা নিয়ে এসেছ যা শুধু বিজলীর চমক দিচ্ছে। কিন্তু ওর মধ্যে ফলোৎপাদক কিছুই নেই; হুওয়াই, আমি দুঃখিত আমাকে আমার আপন অবস্থার উপর থাকতে দাও। আমি মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর মধ্যে সততা ও বিশ্বাস রক্ষা ছাড়া অন্য কোন কিছুই দেখি নি।’
কিন্তু হুওয়াই অনবরত তার চুলের খোপা এবং কাঁধের মধ্যে মোচড় দিতে এবং ফুসলাতে থাকল। এভাবেই তাকে বশীভূত করে ফেলল। অবশ্য এ ব্যাপারে হুওয়াইকে কা’বের সঙ্গে একটি অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে হয়। অঙ্গীকারটি ছিল এরূপ যে, কুরাইশগণ যদি মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে হত্যা না করে ফিরে আসার পথ ধরে তাহলে সেও তাদের সঙ্গে তাদের দূর্গে প্রবেশ করবে। অতঃপর তাদের অবস্থা যা হবে তারও তাই হবে। উভয়ের এ অঙ্গীকারের ফলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে কা’বের সম্পাদিত চুক্তি ভঙ্গ হয়ে যায় এবং এর ফলে মুসলিমগণের সহযোগী হয়ে দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে তাদের শত্রুদের পক্ষাবলম্বন করে।[16]
এরপর বনু কুরাইযাহর ইহুদীগণ প্রকৃত পক্ষে যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজ কর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। ইবনু ইসহাক্বের বর্ণনা সূত্রে জানা যায় যে, সাফিয়্যাহ বিনতে আব্দুল মুত্তালিব (রাঃ) হাস্সান বিন সাবেত (রাঃ)-এর ‘ফারে’ নামক দূর্গের মধ্যে অবস্থান করছিলেন। মহিলা এবং শিশুদের সঙ্গে হাস্সানও (রাঃ) সেখানে ছিলেন। সাফিয়্যাহ (রাঃ) বলেন, ‘আমাদের নিকটবর্তী স্থান দিয়ে এক জন ইহুদী গমন করল এবং দূর্গের চারদিকে ঘোরাফিরা করতে থাকল। এটি হচ্ছে সেই সময়ের ঘটনা যখন বনু কুরাইযাহ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে সম্পাদিত অঙ্গীকার ভঙ্গ করে চুক্তির শর্তাবলী থেকে নিজেদের মুক্ত করে নিয়েছিল। আর আমাদের এবং তাঁদের মধ্যে এমন কেউই ছিল না যে, তাদের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মুসলিমগণকে নিয়ে শত্রুদের মোকাবেলায় ব্যাপৃত ছিলেন। আমাদের নিকট আসতে পারতেন না। এ জন্য আমি বললাম, ‘হে হাস্সান! আপনি তো দেখতে পাচ্ছেন যে এ ইহুদী আমাদের দূর্গের চতুর্দিকে ঘোরাফিরা করছে। আল্লাহর কসম! আমি আশঙ্কা করছি যে, এ ব্যক্তি অন্যান্য ইহুদীদেরকে আমাদের দুর্বলতা সম্পর্কে সচেতন করে দেবে। এদিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) শত্রুর মোকাবেলায় এতই ব্যস্ত রয়েছেন যে, তাঁরা আমাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসতে পারবেন না। সুতরাং আপনি গিয়ে তাকে হত্যা করে আসুন।
উত্তরে হাসান (রাঃ) বললেন, ‘আল্লাহর কসম! আপনি জানেন যে, আমি এ কাজের লোক নই।’ সাফিয়্যাহ বললেন, ‘আমি এখন নিজেই কোমর বাঁধলাম। তারপর স্তম্ভের একটি কাঠ নিলাম এবং দূর্গ হতে বের হয়ে ঐ ইহুদীর কাছে গেলাম। অতঃপর ঐ কাঠ দ্বারা আঘাত করে করে তার দফা শেষ করে দিলাম এবং দূর্গে ফিরে এসে হাসান (রাঃ)-কে বললাম, যান, এখন তার অস্ত্রশস্ত্র ও আসবাব পত্রগুলো নিয়ে আসুন। সে পুরুষ লোক বলে আমি তার অস্ত্র খুলিনি। আমার এ কথা শুনে হাসান (রাঃ) বললেন, তার অস্ত্র এবং আসবাবপত্রের আমার কোন প্রয়োজন নেই।[17]
প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে, মুসলিম শিশু এবং মহিলাগণের হেফাযতের উপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ফুফুর ঐ ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপের অত্যন্ত গভীর এবং তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে। এ পদক্ষেপের ফলে সাধারণ ইহুদীগণের মনে এ ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল যে এ দূর্গবাসীগণের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সৈন্য মোতায়েন রয়েছে এবং এ কারণেই তারা দূর্গের উপর চড়াও হওয়ার সাহস করে নি। অথচ দূর্গের মধ্যে তখন কোন সৈন্যই ছিল না।
তবে মূর্তিপূজক আক্রমণকারীদের সঙ্গে তাদের একাত্মতার প্রমাণস্বরূপ তারা তাদের জন্য রসদ সরবরাহ করতে থাকে। ঐ পর্যন্ত মুসলিম বাহিনী তাদের রসদবাহী বিশটি উট আটক করেছিলেন। যাহোক, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন ইহুদীগণের অঙ্গীকার ভঙ্গের সংবাদ অবগত হলেন তখন তিনি এ সম্পর্কিত তথ্যানুসন্ধানের জন্য তৎক্ষণাৎ মনোনিবেশ করলেন। উদ্দেশ্য ছিল বনু কুরাইযাহর মনোভাব অবহিত হওয়ার পর প্রয়োজন বোধে সে আলোকে সামরিক কৌশল পুনর্বিন্যাস করে দেয়া।
কাজেই, এ ব্যাপারে তথ্যানুসন্ধানের জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সা‘দ বিন মু’আয, সা‘দ বিন উবাদাহ, আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা এবং খাওয়াত বিন জোবায়ের (রাঃ)-কে প্রেরণ করেন। বনু কুরাইযাহ সম্পর্কে যে তথ্য পরিবেশিত হয়েছে তা সঠিক না মিথ্যা সে ব্যাপারে অনুসন্ধান চালানোর জন্য তিনি তাদের পরামর্শ দেন। যদি সঠিক হয় তাহলে আভাষ ইঙ্গিতে শুধু তাঁর কাছেই তা ব্যক্ত করার জন্য পরামর্শ দেন। সৈন্যদের মনোবল অটুট রাখার জন্যই এ ব্যবস্থা। পক্ষান্তরে, যদি তারা অঙ্গীকার মান্য করে চলে তাহলে তা সর্ব সমক্ষে প্রকাশ ও আলোচনা করার জন্য পরামর্শ দান করেন।
যখন তারা বনু কুরাইযাহর নিকট গিয়ে পৌঁছলেন তখন তাদের চরম বিশৃঙ্খল ও উত্তেজিত অবস্থায় দেখতে পেলেন। তারা প্রকাশ্যে গালিগালাজ করল, শত্রুতামূলক কথাবার্তা বলল এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি অবমাননা সূচক উক্তি করল। তারা এমন সব কথাবার্তাও বলল, ‘আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে? আমাদের এবং মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর মধ্যে কোন অঙ্গীকার নেই।’
বনু কুরাইযাহর এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করার পর নাবী কারীম (ﷺ)-এর নিকট ফিরে এসে তাঁরা ইঙ্গিতে বললেন, আযল ও কারাহ। এর অর্থ হল আযল ও কারাহ গোত্র যেমন রাজী এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাহাবাগণের সঙ্গে অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছিল, বনু কুরাইযাহর ইহুদীগণও অনুরূপভাবে অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে।
[2] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৩৯৭ পৃ, ২য় খন্ড ৫৮৮ পৃ: ।
[3] সহীহুল বুখারী ২য় খন্ড ৫৮৯ পৃঃ।
[4] সহীহুল বুখারী, ২য় খন্ড ৫৮৮ পৃঃ।
[5] জামে তিরমিযী, মিশকাত ২য় খন্ড ৪৪৮ পৃঃ।
[6] এ ঘটনা সহীহুল বুখারীতে বর্ণিত আছে দ্র: ২য় খন্ড ৫৮৮-৫৮৯ পৃঃ।
[7] ইবনে হিশাম ২য় খন্ড ২১৮ পৃঃ।
[8] সহীহুল বুখারী ২য় খন্ড ৫৮৮ পৃঃ।
[9] সুনানে নাসায়ী ২য় খন্ড, মুসনাদে আহমাদ। নাসায়ীতে এ শব্দগুলো নাই এবং নাসায়ীতে জনৈক সাহাবী কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে।
[10] ইবনু হিশাম ২য় খন্ড ২১৯ পৃঃ।
[11] ইবনু
[12] সহীহুল বুখারী, ২য় খন্ড ৫৯০ পৃ:
[13] সহীহুল বুখারী, ২য় খন্ড ৫৯ পৃঃ।
[14] শাইখ আব্দুল্লাহ রচিত ‘মুখতাসারুস’’ সীরাহ ২৮৭ পৃ: এবং ইমাম নাবাবীর শাবহে মুসলিম ১ম খন্ড ২২৭ পৃঃ।
[15] ইবনু হিশাম ২য় খন্ড ২২৭ পৃঃ।
[16] ইবনু হিশাম ২য় খন্ড ২২০-২২১ পৃঃ।
[17] ইবনু হিশাম ২য় খন্ড ২২৮ পৃঃ।
এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সাহাবাগণের গোপনীয়তা রক্ষা করা সত্ত্বেও প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে সকলেই ওয়াকেবহাল হয়ে গেলেন এবং এর ফলে আসন্ন এক বিপদের আভাষ ক্রমেই তাদের সামনে প্রকাশ পেতে থাকল। প্রকৃতই মুসলিমগণ সে সময় এক অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন। পিছনে ছিল বনু কুরাইযাহ যাদের আক্রমণ প্রতিরোধ করার মতো উপযুক্ত কোন ব্যবস্থাই মুসলিমগণের ছিল না। সম্মুখভাগে ছিল অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত মুশরিক বাহিনী যাদের সম্মুখ থেকে সরে আসা কোন ক্রমেই সম্ভব ছিল না। অধিকন্তু, মুসলিম শিশু ও মহিলাগণ বিশেষ কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যতিরেকেই বিশ্বাসঘাতক ইহুদীগণের সন্নিকটে অবস্থান করছিলেন। বিভিন্ন কারণে মুসলিমগণ দারুণ দুর্ভাবনার মধ্যে নিপতিত হন যার সম্পর্কে এ আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে,
(وَإِذْ زَاغَتْ الْأَبْصَارُ وَبَلَغَتِ الْقُلُوْبُ الْحَنَاجِرَ وَتَظُنُّوْنَ بِاللهِ الظُّنُوْنَا هُنَالِكَ ابْتُلِيَ الْمُؤْمِنُوْنَ وَزُلْزِلُوْا زِلْزَالًا شَدِيْدًا)[ الأحزاب:10،
‘ তখন তোমাদের চক্ষু হয়েছিল বিস্ফারিত আর প্রাণ হয়েছিল কণ্ঠাগত; আর তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে নানা রকম (খারাপ) ধারণা পোষণ করতে শুরু করেছিলে, এখানে মু’মিনদেরকে পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং তাদেরকে প্রচন্ড কম্পনে প্রকম্পিত করা হয়েছিল।’ [আল-আহযাব (৩৩) : ১০]
এমনি জটিল এক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে কতগুলো মুনাফিক্বও মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। তারা বলতে লাগল, ‘মুহাম্মাদ (ﷺ) আমাদের সঙ্গে ওয়াদা করতেন যে, আমরা কায়সার ও কিসরার ধন ভান্ডার ভোগ করব, অথচ এখন অবস্থা হচ্ছে, প্রস্রাব এবং পায়খানার জন্য বের হলেও জীবনের ভয় রয়েছে। কোন কোন মুনাফিক্ব তাদের সম্প্রদয়ের নিকট এমন কথাও বলল যে, ‘আমাদের ঘরবাড়িগুলো শত্রুদের সামনে খোলা পড়ে রয়েছে। সুতরাং আমাদেরকে আমাদের ঘরবাড়িতে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হোক।’ সেই সময় পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াল যে, বনু সালামাহ গোত্রের লোকজনদের মন ভেঙ্গে গেল এবং তাঁরা ফিরে যাওয়ার চিন্তা ভাবনা করতে থাকল। এ সব লোকের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করলেন,
(وَإِذْ يَقُوْلُ الْمُنَافِقُوْنَ وَالَّذِيْنَ فِيْ قُلُوْبِهِم مَّرَضٌ مَّا وَعَدَنَا اللهُ وَرَسُوْلُهُ إِلَّا غُرُوْرًا وَإِذْ قَالَت طَّائِفَةٌ مِّنْهُمْ يَا أَهْلَ يَثْرِبَ لَا مُقَامَ لَكُمْ فَارْجِعُوْا وَيَسْتَأْذِنُ فَرِيْقٌ مِّنْهُمُ النَّبِيَّ يَقُوْلُوْنَ إِنَّ بُيُوْتَنَا عَوْرَةٌ وَمَا هِيَ بِعَوْرَةٍ إِن يُرِيْدُوْنَ إِلَّا فِرَارًا) [الأحزاب: 12، 13].
‘ আর স্মরণ কর, যখন মুনাফিক্বরা এবং যাদের অন্তরে রোগ আছে তারা বলেছিল- আল্লাহ ও তাঁর রসূল আমাদেরকে যে ওয়া‘দা দিয়েছেন তা ধোঁকা ছাড়া আর কিছুই নয়। স্মরণ কর, যখন তাদের একদল বলেছিল- হে ইয়াসরিববাসী! তোমরা (শত্রুর আক্রমণের বিরুদ্ধে) দাঁড়াতে পারবে না, কাজেই তোমরা ফিরে যাও। আর তাদের একদল এই বলে নাবীর কাছে অব্যাহতি চাচ্ছিল যে, আমাদের বাড়ীঘর অরক্ষিত অথচ ওগুলো অরক্ষিত ছিল না, আসলে পালিয়ে যাওয়াই ছিল তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য।’ [আল-আহযাব (৩৩) : ১২-১৩]
এদিকে সৈন্যদের অবস্থা যখন ছিল এরূপ, অন্যদিকে তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বনু কুরাইযাহর অঙ্গীকার ভঙ্গের সংবাদ অবগত হওয়ার পর বস্ত্র দ্বারা মুখমণ্ডল আবৃত অবস্থায় দীর্ঘ সময় চিৎ হয়ে শুয়ে রইলেন। নাবী কারীম (ﷺ)-এর এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে লোকজনদের দুর্ভাবনা আরও বৃদ্ধি প্রাপ্ত হল। কিন্তু কিছু সময় পরই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মুখমণ্ডল আশার আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠল, ‘আল্লাহর আকবার বলে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
(أَبْشِرُوْا يَا مَعْشَرَ الْمُسْلِمِيْنَ بِفَتْحِ اللهِ وَنَصْرِهِ)
‘ওহে মুসলিমগণ সাহায্য এবং তোমাদের বিজয়ের শুভ সংবাদ শুনে নাও।’
অতঃপর উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলার লক্ষ্যে নাবী কারীম (ﷺ) এক কর্মসূচি প্রণয়ন করেন এবং তার ব্যবস্থা হিসেবে মদীনার নিরাপত্তা বিধানের জন্য সেনা বাহিনীর একটি অংশকে সেখানে প্রেরণ করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল শিশু ও মহিলাদের অরক্ষিত অবস্থার সুযোগ নিয়ে কুচক্রী ইহুদীগণ যাতে তাদের আক্রমণ করতে না পারে তা সুনিশ্চিত করা।
কিন্তু সে সময় এমন এক কূটনৈতিক পদক্ষেপের প্রয়োজন ছিল যার মাধ্যমে শত্রুদের বিভিন্ন দলের ঐক্যের মধ্যে ফাটল সৃষ্টির মাধ্যমে এক এক দলকে অন্যান্য দল থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন করে ফেলা সম্ভব হয়। এ প্রেক্ষিতে নাবী কারীম (ﷺ) বনু গাত্বাফান গোত্রের দু’ নেতা উয়াইনাহ বিন হিসন এবং হারিস বিন আওফের সঙ্গে মদীনার উৎপাদনের ১/৩ অংশ দেয়ার শর্তে এমন একটি সন্ধিচুক্তি সম্পাদনের মনস্থ করলেন যার ফলে এ দুই নেতা নিজ নিজ গোত্রের লোকজনদের নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করে এবং এ অবস্থায় মুসলিমগণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া কুরাইশ বাহিনীর উপর প্রবল পরাক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন।
এ কূটনৈতিক কৌশল সম্পর্কে সলা-পরামর্শের এক পর্যায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন সা‘দ বিন মু’আয এবং সা‘দ বিন উবাদাহর সঙ্গে আলোচনা করেন তখন তারা উভয়ে এক বাক্যে আরজ করেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যদি আল্লাহর তরফ থেকে এ নিদের্শ লাভ করেন তাহলে কোন প্রশ্ন ছাড়াই তা স্বীকৃত হবে, আর যদি আপনি আমাদের জন্যই তা করতে চান তাহলে আমাদের এর কোন প্রয়োজন নেই। যখন এ সকল লোকজন এবং আমরা সকলেই মূর্তিপূজক ছিলাম তখন এরা অতিথি সেবা এবং ক্রয় বিক্রয় ছাড়া অন্য কোন উপায়ে একটি শষ্য কণারও লোভ করতে পারে নি। আর এখন আল্লাহ আমাদেরকে ইসলামের নূর দ্বারা ধন্য করেছেন এবং আপনার মাধ্যমে ইজ্জত দান করেছেন। আমরা তাদেরকে নিজ সম্পদ দান করব? আল্লাহর শপথ! আমরা তো তাদেরকে শুধু তলোয়ারের আঘাত করব। তাদেরকে অন্য কিছু প্রদান করার জন্য আমরা প্রস্তুত নই। নাবী কারীম (ﷺ) তাদেরকে মতামতকে সঠিক সাব্যস্ত করলেন এবং বললেন (إِنَّمَا هُوَ شَيْءٌ أَصْنَعُهُ لَكُمْ لِمَا رَأَيْتُ الْعَرَبَ قَدْ رَمَتْكُمْ عَنْ قَوْسٍ وَاحِدَةٍ) ‘সমগ্র আরব তোমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছে বলে শুধু তোমাদের খাতিরেই আমি এরূপ করতে চেয়েছিলাম।
কিন্তু আল্লাহ তা‘আলাভ দয়াপরবশ হয়ে এমন এক ব্যবস্থা অবলম্বন করলেন যে, শত্রুদের নিজেদের মধ্যেই বিভেদ ও বিচ্ছেদ সৃষ্টি হয়ে গেল এবং এর ফলে তাদের সৈন্যদের মনোবল ভেঙ্গে পড়ল এবং প্রখরতা স্তিমিত হয়ে পড়ল। ঘটনাটি হল, বনু গাত্বাফান গোত্রের নুয়াইম ইবনু মাসউদ ইবনু ‘আমির আশজাঈ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খিদমতে হাজির হয়ে আরজ করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমি মুসলিম হয়ে গেছি। কিন্তু আমাদের সম্প্রদায়ের লোকেরা আমার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ জানতে পারেনি। সুতরাং আপনি আমাকে কোন আদেশ করুন।’
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, (إِنَّمَا أَنْتَ رَجُلٌ وَّاحِدٌ، فَخَذِّلْ عَنَّا مَا اسْتَطَعْتَ، فَإِنَّ الْحَرْبَ خَدْعَةٌ) ‘ব্যক্তি হিসেবে যেহেতু তুমি নিতান্তই একক, সেহেতু কোন সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ তোমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে তাঁদের ঐক্যে ফাটল ধারানো এবং তাদের মনোবল নষ্ট করার মতো কোন কৌশল তুমি অবলম্বন করতে পার। কারণ, শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করার ব্যাপারে এ সব কূটকৌশল অত্যন্ত মূল্যবান। যুদ্ধ অর্থ হচ্ছে কূটকৌশলের খেলা। এ প্রেক্ষিতে নুয়াইম তৎক্ষণাৎ বুন কুরাইযাহর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলেন।
জাহেলিয়াত যুগে বনু কোরাইয়ার সঙ্গে নুয়াইমের সুসম্পর্ক ছিল। তিনি সেখানে গিয়ে বললেন, আপনাদের এবং আমার মধ্যে যে পারস্পরিক সুসম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে, আপনারা অবশ্যই তার স্বীকৃতি প্রদান করবেন। তারা বলল, ‘জী হ্যাঁ।’
নুয়াইম বললেন, ‘তাহলে আপনারা এ কথাটাও অবশ্যই স্বীকার করবেন যে কুরাইশদের ব্যাপারটা আপনাদের ব্যাপার হতে সম্পূর্ণ ভিন্নতর। এ অঞ্চল আপনাদের নিজেদের। এখানে আপনাদের ঘরবাড়ি সহায় সম্পদ সব কিছুই রয়েছে। আরও রয়েছে পরিবার পরিজন। এ সব কিছু পরিত্যাগ করে অন্য কোথাও যাওয়া আপনাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু কুরাইশ ও গাত্বাফান এ দুই গোত্র এসেছে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর সঙ্গে যুদ্ধ করতে। আর আপনারা হাত মিলিয়েছেন যুদ্ধ পিপাসু এমন দুই গোত্রের সঙ্গে এখানে যাদের ঘরবাড়ি সহায় সম্পদ কিংবা পরিবার পরিজন বলতে কিছুই নেই। এ কারণে, এখানে কোন সুযোগ সুবিধা লাভের সম্ভাবনা থাকলে তারা পদক্ষেপ নেবে, নচেৎ গোলমাল সৃষ্টি করে বিদায় হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে, এখানেই আপনাদের থাকতে হবে এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) থাকবে। আপনারা যদি তাঁর শত্রুপক্ষের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাদের সাহায্য করেন তাহলে যে ভাবেই হোক তিনি অবশ্যই এর প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন।’ নুয়াইমের মুখে এ কথা শোনা মাত্রই বনু কুরাইযা সতর্ক হয়ে বলল, ‘নুয়াইম! বলুন এখন কী করা যায়?’ তিনি বললেন, ‘যে পর্যন্ত কুরাইশ তাদের কিছু সংখ্যক লোক বন্ধক হিসেবে আপনাদের জিম্মায় না রাখবে আপনারা তাদের সহযোগী হয়ে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করবেন না।’
বনু কুরাইযাহ বলল, ‘আপনি অত্যন্ত সঙ্গত কথাই বলেছেন।’
এরপর নুয়াইম সোজা কুরাইশদের নিকট গিয়ে উপস্থিত হলেন। অতঃপর বললেন, ‘আপনাদের প্রতি আমার যে ভালবাসা এবং সদিচ্ছা রয়েছে তা অবশ্যই আপনাদের বোধগম্য রয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি।’
তারা বলল, ‘জী হ্যাঁ’।
নুয়াইম বললেন, ‘বেশ তাহলে শুনুন, ‘ইহুদীগণ মুহাম্মাদ (ﷺ) এবং তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে তাদের স্বীকৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে এবং এ কারণে তারা লজ্জিতও হয়েছে। বর্তমানে তারা এ শর্তে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে যে, বন্ধক হিসেবে তারা আপনাদের নিকট থেকে কিছু সংখ্যক লোক গ্রহণ করার পর মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর নিকট সমর্পণ করবে এবং এর মাধ্যমে অঙ্গীকার ভঙ্গের ঘাটতি পূরণ করে নেবে। কাজেই ইহুদীগণ বন্ধক হিসেবে কুরাইশদের নিকট থেকে কিছু সংখ্যক লোক চাইলেও কিছুতেই তা দেয়া যাবে না। এরপর নুয়াইম গাত্বাফান গোত্রে গিয়ে কুরাইশদের নিকট যা বলেছিলেন তার পুনারাবৃত্তি করলেন। এতে তারাও সজাগ হয়ে উঠল।
এরপর শুক্রবার ও শনিবারের মধ্যবর্তী রাত্রিতে কুরাইশগণ ইহুদীগণের নিকট এ পয়গাম প্রেরণ করে যে, তাদের অবস্থা কোন সুবিধাজনক স্থানে নেই। ঘোড়া এবং উটগুলো মারা যাচ্ছে। অতএব, ওদিক থেকে আপনারা এবং এদিক থেকে আমরা উভয় দল এক সঙ্গে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর আক্রমণ পরিচালনা করি। এর উত্তরে ইহুদীগণ বলল, ‘আজ শনিবার এবং আপনারা অবগত আছেন যে, আমাদের পূর্ব পুরুষগণের মধ্যে যারা এ দিবসে শরীয়তের আদেশ অমান্য করেছিল কিভাবে তাদের উপর শাস্তি অবতীর্ণ হয়েছিল। অধিকন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত আপনারা আপনাদের কিছু সংখ্যক লোককে বন্ধক হিসেবে আমাদের নিকট না রাখবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করব না।।
সংবাদ বাহক যখন ইহুদীদের নিকট থেকে এ উত্তর নিয়ে ফেরৎ এল তখন কুরাইশ এবং গাত্বাফানগণ বলল, ‘আল্লাহর কসম! নুয়াইমতো সত্যই বলেছিল।’ কাজেই, তারা ইহুদীগণকে এ কথা বলে পাঠাল, ‘আল্লাহর কসম! আপনাদের হাতে কোন লোককে বন্ধক রাখব না। আসুন আপনারা আমাদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ুন এবং আমরা উভয় পক্ষ এক যোগে দুই দিক থেকে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর বাহিনীকে আক্রমণ করি। এ কথা শুনে বনু কুরাইযাহর লোকেরা পরস্পর পরস্পরকে বলল, ‘আল্লাহর কসম! নুয়াইম তোমাদেরকে সত্যই বলেছিলেন।’ এভাবে উভয় পক্ষের পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতা এবং নির্ভরশীলতার পথ বন্ধ হয়ে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়ে গেল। যার ফলশ্রুতিতে তাদের সাহস এবং মনোবল ভেঙ্গে পড়ল।
এ সময় মুসলিমগণ আল্লাহ তা‘আলার সমীপে নিম্নলিখিত দু’আ করছিলেন :
(اللهم اسْتُرْ عَوْرَاتَنَا وَآمِنْ رَوْعَاتَنَا)
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আপনি আমাদের দোষত্রুটি ঢেকে রাখুন এবং আমাদেরকে ভয়ভীতি এবং বিপদাপদ থেকে নিরাপদ রাখুন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিম্নরূপ দু’আ করেছিলেন :
(اللهم مُنْزِلُ الْكِتَابِ، سَرِيْعُ الْحِسَابِ، اَهْزِمِ الْأَحْزَابَ، اللهم اَهْزِمْهُمْ وَزَلْزِلْهُمْ)
অর্থ : হে আল্লাহ! হে কিতাব অবতীর্ণকারী! দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী! এ সেনাবাহিনীকে পরাভূত করুন। হে আল্লাহ! তাদেরকে পরাভূত করুন এবং প্রকম্পিত করুন।[18]
অবশেষে আল্লাহ আপন রাসূল (ﷺ) এবং মুসলিমদের দু’আ কবুল করে মুশরিকদের ঐক্যে ফাটল সৃষ্টি করেন এবং মনোবল ভেঙ্গে দেন। অতঃপর তাদের উপর উত্তপ্ত বায়ুর তুফান প্রেরণ করেন। যা তাদের তাঁবু উপড়িয়ে দেয়, মৃত পাত্রসমূহ উলটিয়ে দেয়, তাঁবুর খুঁটিসমূহ উৎপাটন করে ফেলে এবং সব কিছুকে তছনছ করে ফেলে। এর সঙ্গে প্রেরণ করেন ফিরিশতা বাহিনী যাঁরা তাদের অবস্থানকে নড়চড় করে দেন এবং অন্তরে ত্রাসের সঞ্চার করেন।
সেই তীব্র শীতের রাত্রিতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হুযায়ফা বিন ইয়ামান (রাঃ)-কে প্রেরণ করেন মুশরিকদের সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। তিনি যখন তাদের সমাবেশ স্থলের নিকট পৌঁছেন তখন প্রত্যক্ষ করেন যে, প্রত্যাবর্তনের জন্য তাঁদের প্রস্তুতিপর্ব প্রায় সম্পন্ন। হুযায়ফা নাবী কারীম (ﷺ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে তাদের ফেরৎ যাত্রা সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করেন। প্রভাতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) প্রত্যক্ষ করেন যে, তাদের প্রত্যাবর্তনের ফলে ময়দান একদম পরিষ্কার হয়ে গেছে। কোন প্রকার সাফল্য লাভ ছাড়াই গভীর অসন্তোষ এবং ক্রোধসহ মুসলিমগণের শত্রুদের আল্লাহ তা‘আলা ফেরৎ পাঠিয়ে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য একাকী যথেষ্ট হয়েছেন। মোট কথা এভাবে আল্লাহ আপন ওয়াদা পূরণ করেছেন এবং নিজ সৈন্যদের ইজ্জত প্রদান করেছেন। এ অবস্থার প্রেক্ষাপটে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মদীনা প্রত্যাবর্তন করেন।
বিশুদ্ধ মতে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ৫ম হিজরীর শাওয়াল মাসে এবং মুশগিরকগণ আনুমানিক এক মাস যাবৎ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং মুসলিমগণকে অবরোধ করে রেখেছিল। প্রাপ্ত উৎসগুলোর উপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে এটা প্রতীয়মান হয় যে, অবরোধ সূচিত হয়েছিল শাওয়াল মাসে এবং এর পরিসমাপ্তি ঘটেছিল জুল কা’দা মাসে। ইতিহাসবিদ ইবনু সায়াদের বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে দিন খন্দক থেকে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন সে দিনটি ছিল বুধবার এবং জুলকা‘দা মাস শেষ হতে অবশিষ্ট ছিল সাত দিন।
আহযাব যুদ্ধ প্রকৃতপক্ষে ক্ষয়ক্ষতির যুদ্ধ ছিল না, বরং সেটা প্রকৃত পক্ষে স্নায়ুযুদ্ধ ছিল। এতে কোন প্রকার ক্ষয়ক্ষতির সংঘর্ষ সংঘটিত হয় নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও ইসলামের ইতিহাসে এ যুদ্ধ ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এ যুদ্ধের ফলশ্রুতিতে মুশরিকদের মনোবল ভেঙ্গে পড়ে এবং সর্ব সমক্ষে এটা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, আরবের কোন শক্তির পক্ষেই মদীনার মুসলিমগণের ক্রমবিকাশমান এ শক্তিকে নিঃশেষ করা সম্ভব নয়। কারণ, আহযাব যুদ্ধের জন্য বিশাল বাহিনী সংগৃহীত হয়েছিল, এর চাইতে অধিক শক্তিশালী বাহিনী সংগ্রহ করা তাদের জন্য সম্ভবপর ছিল না। এ জন্য আহযাব থেকে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,
(الآنَ نَغْزُوْهُمْ، وَلَا يَغْزُوْنَا، نَحْنُ نَسِيْرُ إِلَيْهِمْ)
অর্থ : ‘এখন থেকে আমরাই তাদের উপর আক্রমণ করব, তারা আমাদের উপর আক্রমণ করবে না। এখন আমাদের সৈন্যরা তাদের দিকে যাবে।’ (সহীহুল বুখারী ২য় খন্ড ৫৯০ পৃঃ)
খন্দকের যুদ্ধ প্রান্তর থেকে যেদিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) প্রত্যাবর্তন করলেন সে দিন যুহরের সময় যখন তিনি উম্মু সালামাহ (রাঃ)-এর গৃহে গোসল করছিলেন তখন জিবরাঈল (আঃ) আগমন করলেন এবং বললেন, ‘আপনি কি অস্ত্রশস্ত্র খুলে রেখে দিয়েছেন? ফিরিশতাগণ কিন্তু এখনো অস্ত্রশস্ত্র খোলেন নি। আমিও শত্রুদের পশ্চাদ্ধাবন করে সরাসরি এখানেই চলে আসছি। উঠুন এবং স্বীয় সঙ্গীসাথীদের নিয়ে বনু কুরাইযাহ অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকুন। আমি অগ্রভাগে গিয়ে তাদের দূর্গসমূহে কম্পন সৃষ্টি করে তাদের অন্তরে ভয় ভীতির সঞ্চার করে দিব।’ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে এ সকল কথা বলার পর জিবরাঈল (আঃ) ফিরিশতাগণের দলভুক্ত হয়ে যাত্রা করলেন।
এদিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একজন সাহাবীর মাধ্যমে ঘোষণা করে দিলেন যে যাঁরা শ্রবণ ও আনুগত্যের উপর দন্ডায়মান আছেন তাঁরা আসরের সালাত পড়বেন বনু কুরাইযাহ গিয়ে। এরপর ইবনু উম্মু মাকতুম (রাঃ)-এর উপর মদীনার তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব অর্পণ করলেন এবং আলী (রাঃ)-এর হাতে যুদ্ধের পতাকা দিয়ে বুন কুরাইযাহ অভিমুখে প্রেরণ করলেন। যখন তিনি বনু কুরাইযাহর দূর্গসমূহের নিকট গিয়ে পৌঁছলেন তারা তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উপর গালিগালাজের বৃষ্টি বর্ষণ করছিল।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মুহাজিরীন ও আনসারদের একটি সুসংগঠিত দল নিয়ে অগ্রসর হলেন এবং বনু কুরাইযাহর ‘আন্না’ নামক এক কূপের পাশে অবতরণ করলেন। অন্যান্য সাধারণ মুসলিমগণও যুদ্ধের ঘোষণা শুনে দ্রুতগতিতে বনু কুরাইযা অভিমুখে যাত্রা করলেন। পথে আসর সালাতের সময় হয়ে গেল। তখন কেউ কেউ বললেন, ‘আমাদের যেভাবে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে আমরা সেই ভাবেই কাজ করব। আমরা বনু কুরাইযাহয় গিয়ে আসর সালাত আদায় করব।’ এ কারণে কেউ কেউ এশার পর আসর সালাত আদায় করেন।
কিন্তু কোন কোন সাহাবা এ কথাও বলেন, ‘নাবী কারীম (ﷺ)-এর উদ্দেশ্য এটা ছিল না যে, সালাতের ব্যাপারে আমরা অন্য মত কিংবা পথ অবলম্বন করি। বরং তিনি এটাই চেয়েছিলেন যে, বিলম্ব না করে আমরা যেন বনু কুরাইযাহর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি। যাঁরা এ ধারণা পোষণ করেছিলেন তাঁরা পথেই সময় মতো আসর সালাত আদায় করে নিয়েছিলেন। তবে ব্যাপারটি যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট পেশ করা হয় তখন তিনি এ প্রসঙ্গে কোন পক্ষকেই ভাল-মন্দ কোন কিছুই বলেন নি।
যে প্রকারেই হোক বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে মুসলিম সৈন্যদল বনু কুরাইযাহ ভূমিতে গিয়ে পৌঁছলেন এবং নাবী কারীম (ﷺ)-এর সঙ্গে মিলিত হলেন। অতঃপর বনু কুরাইযাহর দূর্গসমূহকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেললেন। মুসলিম বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ছিল তিন হাজার এবং অশ্বের সংখ্যা ছিল ত্রিশটি।
বনু কুরাইযাহর ইহুদীগণ যখন আঁটষাট অবরুদ্ধ অবস্থার মধ্যে নিপতিত হল তখন ইহুদী নেতা কা‘ব বিন আসাদ তাদের সামনে তিনটি পরিবর্তনশীল প্রস্তাব উপস্থাপন করল। সেগুলো হচ্ছে যথাক্রমে:
- হয় ইসলাম গ্রহণ করে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর দ্বীনে প্রবেশ করে স্বীয় জানমাল এবং সন্তান সন্ততির ধ্বংস প্রাপ্তি থেকে রক্ষা করবে, এ প্রস্তাব উপস্থাপন কালে কা‘ব বিন আসাদ এ কথাও বলেছিল যে, ‘আল্লাহর শপথ! তোমাদের নিকট এটা সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তিনি হচ্ছেন প্রকৃতই একজন নাবী এবং রাসূল। অধিকন্তু তিনি হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যার সম্পর্কে তোমরা স্বীয় আল্লাহর কিতাবে অবগত হয়েছ।’
- অথবা স্বীয় সন্তান সন্তুতিগণকে স্বহস্তে হত্যা করবে। অতঃপর তলোয়ার উত্তোলন করে নাবী (ﷺ)-এর দিকে অগ্রসর হয়ে সর্ব শক্তি প্রয়োগ করে যুদ্ধ করবে। পরিণামে হয় আমরা বিজয়ী হব, নতুবা সমূলে নিঃশেষ হয়ে যাব।
- অথবা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং সাহাবা কেরাম (ﷺ)-কে ধোঁকা দিয়ে শনিবার দিবস তাঁদের উপর আক্রমণ পরিচালনা করবে। কারণ এ ব্যাপারে তাঁরা নিশ্চিন্ত থাকবেন যে, এ দিবসে কোন যুদ্ধ বিগ্রহ অনুষ্ঠিত হবে না।
কিন্তু ইহুদীগণ এ তিনটি প্রস্তাবের একটিও মঞ্জুর করল না। তার ফলে কা‘ব বিন আসাদ রাগান্বিত হয়ে বলল, ‘মায়ের কোলে জন্মগ্রহণ করার পর তোমরা কেউই একটি রাতও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে অতিবাহিত করনি।
এ প্রস্তাব তিনটি প্রত্যাখ্যানের পর বনু কুরাইযাহর সামনে শুধুমাত্র যে পথটি অবশিষ্ট রইল তা হল, তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট অস্ত্রশস্ত্র নিক্ষেপ করে আত্মসমর্পণ করবে এবং আপন ভাগ্য নির্ধারণের ব্যাপারটি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দেবে। কিন্তু তারা আরও ভেবে চিন্তে স্থির করল যে অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্বে অর্থাৎ অস্ত্র সমর্পণের পূর্বে তাদের সঙ্গে সাহায্য চুক্তিতে আবদ্ধ মুসলিমগণের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলাপ আলোচনা করবে। সম্ভবত এর মাধ্যমে অস্ত্র ত্যাগের ফলাফল সম্পর্কে তারা কিছুটা ধারণা লাভ করতে সক্ষম হবে।
এ প্রেক্ষিতে তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট এ মর্মে প্রস্তাব পাঠাল যে, ‘আবূ লুবাবাকে তাদের নিকট প্রেরণ করা হোক।’ যেহেতু আবূ লুবাবার সঙ্গে তারা মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ ছিল সেহেতু তার সঙ্গে তাদের পরামর্শ করা প্রয়োজন। অধিকন্তু আবূ লুবাবার বাগ-বাগিচা, সন্তান-সন্ততি এবং গোত্রীয় লোকেরা ছিল সেই অঞ্চলেরই বাসিন্দা।
যখন আবূ লুবাবা সেখানে উপস্থিত হল তখন পুরুষগণ তাকে দেখে দৌঁড়ে তার নিকট এল এবং শিশু ও মহিলাগণ করুন কণ্ঠে ক্রন্দন শুরু করল। এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে আবূ লুবাবার অন্তরে ভাবাবেগের সৃষ্টি হল। ইহুদীগণ বলল, ‘আবূ লুবাবা! আপনি কি যুক্তিযুক্ত মনে করেছেন যে, বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আমরা মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর নিকট অস্ত্রশস্ত্র সমর্পণ করি?’
বলল, ‘হ্যাঁ’, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে হাত দ্বারা কণ্ঠনালির দিকে ইঙ্গিত করল, যার অর্থ ছিল হত্যা। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে সে উপলব্ধি করল যে, ব্যাপারটি হচ্ছে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর সুস্পষ্ট খিয়ানত। এ কারণে সে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট প্রত্যাবর্তন না করে সরাসরি মসজিদে নাবাবীতে গিয়ে উপস্থিত হল এবং নিজেই নিজেকে মসজিদের একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে ফেলে শপথ করল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) স্বহস্তে তাকে না খোলা পর্যন্ত সে এ অবস্থাতেই থাকবে এবং আগামীতে কোন দিন বনু কুরাইযাহর ভূমিত প্রবেশ করবে না। এদিকে তার প্রত্যাবর্তনে বিলম্বিত হওয়ার ব্যাপারটি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) গভীর মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ করছিলেন। অতঃপর তিনি প্রকৃত ব্যাপারটি অবগত হয়ে বললেন,
(أَمَا إِنَّهُ لَوْ جَاءَنِيْ لَاَسْتَغْفَرْتُ لُهُ، أَمَا إِذْ قَدْ فَعَلَ مَا فَعَلَ فَمَا أَنَا بِالَّذِيْ أَطْلَقَهُ مِنْ مَكَانِهِ حِتّٰى يَتُوْبَ اللهَ عَلَيْهِ)
‘যদি সে আমার নিকট আসত তাহলে আমি তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতাম। কিন্তু যেহেতু সে নিজের মতকে প্রাধান্য দিয়ে নিজেই এ কাজ করে বসেছে সেহেতু আল্লাহ তা‘আলা যতক্ষণ তার তওবা কবুল না করছেন ততক্ষণ আমি তাকে বন্ধন মুক্ত করতে পারব না।’
এদিকে আবূ লুবাবার কূটকৌশল জনিত গোপন ইঙ্গিত থাকা সত্ত্বেও বনু কুরাইযা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট অস্ত্র সমর্পণ করারই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল এবং তিনি যা উপযুক্ত বিবেচনা করবেন তা তারা নির্বিবাদে মেনে নেবে বলে স্থির করল। অথচ দীর্ঘকাল যাবৎ এ অবরোধের ধকল সহ্য করার মতো সামর্থ্য ও সহনশীলতা বুন কুরাইযাহর ছিল। কারণ এক দিকে যেমন তাদের নিকট প্রচুর খাদ্য ও পানীয় মজুদ ছিল, পানির ঝরণা এবং কূপ ছিল অন্যদিকে তেমনি মজবুত ও সুসংরক্ষিত দূর্গও ছিল। পক্ষান্তরে মুসলিমগণকে উন্মুক্ত আকাশের নীচে রক্ত জমাটকারী শীত ও ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছিল এবং খন্দক যুদ্ধের প্রথমাবস্থা থেকেই অবিরাম যুদ্ধ ব্যস্ততার মধ্যে থাকার দরুন ক্লান্তির ও অবসাদের অন্ত ছিল না। কিন্তু বনু কুরাইযাহর যুদ্ধ ছিল প্রকৃতপক্ষে আঞ্চলিক বিদ্বেষ প্রসূত এক বিরোধমূলক ব্যাপার। আল্লাহ তা‘আলা তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করে দিয়েছিলেন, এর ফলে তাদের যুদ্ধোন্মাদনা এবং উদ্যম ক্রমেই স্তিমিত হয়ে পড়ছিল। তাদের ক্রমবিলীয়মান এ উদ্যম ঐ সময় শেষ সীমায় গিয়ে পৌঁছিল যখন আলী ইবনু আবূ ত্বালিব এবং জোবায়ের বিন ‘আউওয়াম (রাঃ) তাদের দূর্গ তোরণের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং আলী (রাঃ) বজ্র নিনাদে ঘোষণা করলেন যে, ‘আল্লাহর সেনাগণ! আল্লাহ শপথ! আমি হয় সেই অমৃতের পেয়ালা থেকে পান করব যা হামযাহ করেছে আর না হয় এটা সুনিশ্চিত যে, এ দূর্গ জয় করব।’
আলী (রাঃ)-এর এ প্রাণপণ সংকল্পের কথা অবগত হয়ে বনু কুরাইযা তড়িঘড়ি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সমীপে নিজেদের সমর্পণ করে দিল যাতে তিনি তাদের জন্য যা সঙ্গত বলে বিবেচনা করবেন এরূপ একটি পন্থা অবলম্বন করেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পুরুষদের বন্দী করার নির্দেশ প্রদান করায় মুহাম্মাদ বিন মাসলামা আনসারীর তত্ত্বাবধানে বনু কুরাইযাহর সকল পুরুষ লোককে বন্দী করা হল এবং মহিলা, শিশু ও অক্ষম পুরুষদের সযত্নে পৃথকভাবে রাখা হল। আওস গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিগণ এ বলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট আবেদন পেশ করল যে, ‘বনু ক্বায়নুক্বা’ গোত্রের সঙ্গে আপনি যে আচরণ করেছেন তা আপনিই উত্তমরূপে অবগত আছেন। আপনার স্মরণ থাকতে পারে যে, ‘বনু ক্বায়নুক্বা’ গোত্র আমাদের ভাই খাযরাজ গোত্রের হালীফ ছিলেন এবং এ সকল লোকজন আমাদের হালীফ আছেন। অতএব অনুগ্রহ করে তাদের উপর ইহসান করুন।’
নাবী কারীম (ﷺ) বললেন,
(أَلَا تَرْضُوْنَ أَنْ يَّحْكُمَ فِيْهِمْ رَجُلٍ مِّنْكُمْ؟)
‘আপনারা কি এ ব্যাপারে সন্তুষ্ট নন যে, আপনাদেরই এক ব্যক্তি তাদের সম্পর্কে মীমাংসা করে দেবেন? তারা জবাব দিল,
(فَذٰكَ إِلٰى سَعْدِ بْنِ مُعَاذٍ)
‘এমনটি হলে আমাদের সন্তুষ্ট না হওয়ার কোনই কারণ নেই।’
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘ভালো কথা, এ ব্যাপারটি সা‘দ বিন মু’আয এর দায়িত্বে রইল।’
তারা বলল, ‘আমরা এর উপর সন্তুষ্ট আছি।’
অতঃপর সা‘দ বিন মু’আযকে ডেকে পাঠানো হল। তিনি তখন মদীনায় অবস্থান করছিলেন। সৈন্যদের সঙ্গে বনু কুরাইযায় আগমন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় নি। কারণ, খন্দকের যুদ্ধে তাঁর হাতের শিরা কর্তিত হওয়ার ফলে তিনি আহত হয়েছিলেন। তাঁকে একটি গাধার পৃষ্ঠে আরোহণ করিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খিদমতে হাজির করা হয়। যখন তিনি সেখানে গিয়ে পৌঁছলেন তখন গোত্রীয় লোকজন চতুর্দিকে থেকে তাঁকে ঘিরে ধরে বলতে থাকলেন, ‘হে সা‘দ! স্বীয় হালীফদের সাথে উত্তম ও কল্যাণকর মীমাংসা করবেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আপনাকে এ জন্যই বিচারক নির্বাচিত করেছেন যে, আপনি তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবেন। কিন্তু তিনি তাদের কথার উত্তর না দিয়ে চুপচাপ রইলেন। কিন্তু লোকজন এ ব্যাপারে তাঁকে বারবার অনুরোধ জানাতে থাকলেন। এ প্রেক্ষিতে তিনি বললেন, ‘এখন এমন এক সময় সমাগত যখন সা‘দ আল্লাহ তা‘আলা সম্পর্কে কোন নিন্দুকের নিন্দার চিন্তা কিংবা ভয় করেন না। এ কথা শোনার পর কিছু লোক মদীনায় আসে এবং বন্দীদের মৃত্যু অনিবার্য বলে ঘোষণা করে।
এরপর সা‘দ (রাঃ) যখন নাবী কারীম (ﷺ)-এর নিকট পৌঁছলেন তখন তিনি ইরশাদ করলেন, (قُوْمُوْا إِلٰى سَيِّدِكُمْ) ‘তোমরা উঠে তোমাদের নেতার দিকে এগিয়ে যাও।’ যখন তাঁকে অবতরণ করিয়ে আনা হল তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে বললেন, ‘হে সা‘দ! এ সব লোকজন আপনার মীমাংসার উপর আস্থাশীল হয়ে আত্মসমর্পণ করেছে।’
সা‘দ বললেন, ‘আমার মীমাংসা কি এদের উপর প্রযোজ্য হবে?’
জবাবে লোকেরা বলল, ‘জী হ্যাঁ’।
তিনি বললেন, ‘মুসলিমগণের উপরেও কি?’
লোকেরা বলল, ‘জী হ্যাঁ’।
তিনি আবারও বললেন, ‘এখানে যাঁরা উপস্থিত রয়েছেন তাদের উপরেও কি তা প্রযোজ্য হবে?’ তাঁর ইঙ্গিত ছিল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)’র অবতরণ স্থানের দিকে, কিন্তু সম্মান ও ইজ্জতের কারণে মুখমণ্ডল ছিল অন্যদিকে ফেরানো।
প্রত্যুত্তরে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘হ্যাঁ, আমার উপরেও হবে।’
সা‘দ বললেন, ‘তাহলে তাদের সম্পর্কে আমার বিচারের রায় হচ্ছে এই যে, পুরুষদের হত্যা করা হোক, মহিলা ও শিশুদের বন্দী করে রাখা হোক এবং সম্পদসমূহ বন্টন করে দেয়া হোক।’
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, (لَقَدْ حَكَمْتَ فِيْهِمْ بِحُكْمِ اللهِ مِنْ فَوْقِ سَبْعِ سَمَوَاتٍ) ‘আপনি তাদের ব্যাপারে ঠিক সেই বিচারই করেছেন যেমনটি করেছেন আল্লাহ তা‘আলা সাত আসমানের উপর।’
সা'দের এ বিচার ছিল অত্যন্ত ন্যায় ও ইনসাফ ভিত্তিক। কারণ, বনু কুরাইযা মুসলিমগণের জীবন মরণের জন্য অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতিতে যা করতে চেয়েছিলেন তা ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ ও বিভীষিকাময়। অঙ্গীকার ভঙ্গের একটি জঘন্য অপরাধও তারা করেছিল। অধিকন্তু, মুসলিমগণকে নিঃশেষ করে ফেলার জন্য তারা দেড় হাজার তরবারী, দুই হাজার বর্শা, যুদ্ধে ব্যবহারোপযোগী তিন শত লৌহবর্ম এবং পাঁচ শত প্রতিরক্ষা ঢাল সংগ্রহ করে রেখেছিল। পরবর্তী কালে সেগুলো মুসলিমগণের অধিকারে আসে।
এ সিদ্ধান্তের পর রাসূলে কারীম (ﷺ)-এর নির্দেশে বনু কুরাইযাহ গোত্রের লোকজনকে মদীনায় এনে বনু নাজ্জার গোত্রের হারেসের কন্যার বাড়িতে তাদের আবদ্ধ করে রাখা হয়। অতঃপর মদীনার বাজারে একটি পরিখা খনন করে বন্দীদের এক একটি দলকে সেখানে নিয়ে গিয়ে শিরঃচ্ছেদ করা হয়। এহেন অবস্থায় নিপতিত অবশিষ্ট কিংকর্তব্যবিমূঢ় বন্দীগণ যখন স্বীয় নেতা কা‘ব বিন আসাদের নিকট জানতে চাইল যে, ‘যাদের এখান থেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাদের সঙ্গে কিরূপ আচরণ করা হচ্ছে।’
সে বলল, ‘এতটুকু উপলব্ধি করার মতো সাধারণ বোধও কি তোমাদের নেই। তোমরা কি লক্ষ্য করছ না যে, যাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তারা আর ফিরে আসছে না। কোন অনুরোধকারীর অনুরোধ রক্ষা করা হচ্ছে না। আল্লাহর শপথ! হত্যা ব্যতিরেকে আর কিছুই হচ্ছে না।’
এভাবে বন্দীদের সকলের (যাদের সংখ্যা ছয় এবং সাত শতের মধ্যবর্তী ছিল) শিরচ্ছেদ করা হয়।
উল্লেখিত ব্যবস্থাপনার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও পরিপক্ক অঙ্গীকার ভঙ্গকারী বনু কুরাইযাহর বিশ্বাসঘাতকতা ও বিদ্রোহের সম্পূর্ণরূপে মূলোৎপাটন করে ফেলা হয়। মুসলিমগণকে নিঃশেষ করে ফেলার উদ্দেশ্যে তাঁদের দুঃখ দুর্দশা ও দারুন দুঃসময়ে শত্রুদের সাহায্য দান করে তারা যে জঘন্য যুদ্ধ অপরাধ করেছিল তাতে তারা যথার্থই প্রাণদন্ড পাওয়ার যোগ্য হয়ে গিয়েছিল।
বনু কুরাইযাহর ন্যায় বনু নাযীর গোত্রের নিকৃষ্ট শয়তান ও আহযাব যুদ্ধের বড় অপরাধী হুয়াই বিন আখতাবও তার নানা অন্যায় অত্যাচারের কারণে শাস্তি পাওয়ার যোগ্য হয়ে পড়েছিল। এ ব্যক্তি উম্মুল মু’মিনীন সাফিয়্যাহ (রাঃ)-এর পিতা ছিল। কুরাইশ এবং গাত্বাফানদের সঙ্গে যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর যখন বনু কুরাইযাকে অবরোধ করা হয় এবং তারা দূর্গ মধ্যে অবরুদ্ধ জীবন যাপন করতে থাকে তখন বনু কুরাইযাহর সঙ্গে হুয়াই বিন আখতাবও দূর্গের মধ্যে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকে। কারণ, আহযাব যুদ্ধের সময় এ ব্যক্তি যখন কা‘ব বিন আসাদকে বিশ্বাসঘাতকতা ও গাদ্দারী করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে এসেছিল তখন সে অঙ্গীকার করেছিল তখন চলছিল সে অঙ্গীকারেরই বাস্তবায়ন।
তাকে যখন খিদমতে নাবাবীতে নিয়ে আসা হল তখন সে এক জোড়া পরিধেয় বস্ত্র দ্বারা নিজেকে আবৃত করে রেখেছিল। এ পোষাককে সে নিজেই প্রত্যেক দিক থেকে এক এক আঙ্গুল করে চিরে রেখেছিল যাতে তাকে লুণ্ঠিত মালামালের মধ্যে গণ্য করা না হয়। তার হাত দুটি গ্রীবার পেছন দিকে দড়ি দ্বারা একত্রে বাঁধা অবস্থায় ছিল। সে রাসূলে কারীম (ﷺ)-কে লক্ষ্য করে বলল, ‘আমি আপনার শত্রুতার জন্য নিজে নিজেকে নিন্দা করি নি। কিন্তু যে আল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধ করে সে পরাজিত হয়।’
অতঃপর লোকজনকে সম্বোধন করে বলল, ‘ওহে লোকেরা, আল্লাহর ফায়সালায় কোন অসুবিধা নেই। এটাতো ভাগ্যের লিখিত ব্যাপার। এটি হচ্ছে এক বড় হত্যাকান্ড যা বনু ইসরাইলের উপর আল্লাহ তা‘আলা লিপিবদ্ধ করে দিয়েছেন।’ এরপর সে বসে পড়ল এবং তার গলা কেটে দেয়া হল।
এ ঘটনায় বনু কুরাইযাহর এক মহিলাকেও হত্যা করা হয়। সে খাল্লাদ বিন সুযাইদ (রাঃ)-এর উপর যাঁতার একটি পাট নিক্ষেপ করে তাঁকে শহীদ করেছিল। তাই এ হত্যাকান্ডের প্রতিদান হিসেবেই তাকে হত্যা করা হয়।
এ ঘটনা প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নির্দেশ প্রদান করেন যে, যাদের নাভির নিম্নদেশের লোম গজিয়েছে তাদের হত্যা করা হোক। আতিয়া কুরাযীর তখনো সে লোম গজায়নি যার ফলে তাকে জীবিত ছেড়ে দেয়া হয়। পরবর্তী কালে তিনি ইসলাম গ্রহণ করে অন্যতম সাহাবী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন।
সাবেত বিন ক্বায়স যুবাইর বিন বাতা এবং তার পরিবারবর্গকে তাঁকে হেবা করে (দান) দেওয়ার জন্য আবেদন পেশ করেন। এর কারণ হল, যুবাইর সাবেতের উপর কিছু ইহসান করেছিল। তার আবেদন মঞ্জুর করে যুবাইর এবং তার পরিবারবর্গকে তাকে দিয়ে দেয়া হয়। অতঃপর সাবিত বিন ক্বায়স যুবাইরকে বলেন যে, ‘রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) তোমাকে এবং তোমার পরিবারবর্গকে আমার অনুরোধ আমাকে দিয়ে দিয়েছেন।
এখন আমি সকলকে তোমার হাওয়ালা বা জিম্মার প্রদান করছি। (অর্থাৎ তুমি তোমার পরিবার পরিজনসহ মুক্ত)। কিন্তু যুবাইর বিন বাতা যখন জানতে পারল যে তার গোত্রীয় সকলকেই হত্যা করা হয়েছে তখন সে বলল, ‘সাবেত তোমার উপর আমি যে ইহসান করেছিলাম তাকেই মাধ্যম করে আমি বলছি যে, তুমিও আমার উপর একটু ইহসান করো অর্থাৎ আমার গোত্রীয় ভাইদের ভাগ্যে যা ঘটেছে আমার ভাগ্যেও তাই ঘটতে দাও। এ প্রেক্ষিতে তার শিরোচ্ছেদ করে তাকেও তার গোত্রীয় ইহুদী ভাইদের দলভুক্ত করে দেয়া হয়। তবে সাবিত যুবাইর বিন বাতার সন্তান আব্দুর রহমানকে হত্যার হাত থেকে রক্ষা করেন। পরবর্তী কালে ইসলাম গ্রহণ করে তিনি সাহাবীর মর্যাদা লাভ করেন।
অনুরূপভাবে বনু নাজ্জারের একজন মহিলা উম্মুল মুনযির সালামাহ বিনতে ক্বায়স আরজী পেশ করল যে, সামওয়াল কুরাযীর সন্তান রিফাআ’হকে তাঁর জন্য হেবা করা হোক। তাঁর আরজী গ্রহণ করে রিফাআ’হকে তাঁর নিকট সমর্পণ করা হয়। এভাবে রিফাআ’হকে তিনি মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেন। পরে রিফাআ’হ ইসলাম গ্রহণ করে সাহাবীর মর্যাদা লাভ করেন।
বনু কুরাইযাহর আরও কিছু সংখ্যক লোক অস্ত্র শস্ত্র নিক্ষেপণ ও আত্মসমর্পণের পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কাজেই, তাদের জীবন, ধনসম্পদ ও সন্তানাদি সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকে। এ রাত্রিতেই ‘আমর বিন সা’দী নামক এক ব্যক্তি যে বনু কুরাইযাহর অঙ্গীকার ভঙ্গের ব্যাপারে অংশ গ্রহণ না করে দূর্গ থেকে বাহির হয়ে যায়। প্রহরীদের কমান্ডার মুহাম্মাদ বিন মসলামা তাকে দেখে চিনতে পারেন এবং ছেড়ে দেন। পরে তার আর কোন খোঁজ পাওয়া যায় নি।
রাসূলে কারীম (ﷺ) বনু কুরাইযাহর ধন সম্পদের এক পঞ্চমাংশ বাহির করে নিয়ে বন্টন করে দেন। ঘোড়সওয়ারদের তিন অংশ প্রদান করেন। এক অংশ আরোহীদের জন্য এবং দু’ অংশ ঘোড়াগুলোর জন্য। যাঁরা পদব্রজে গমন করেছিলেন তাঁদের এক অংশ প্রদান করেন। কয়েদী এবং শিশুদেরকে সা‘দ বিন যায়দ আনসারীর তত্ত্বাবধানে নাজ্দ দেশে প্রেরণ করে তাদের বিনিময়ে ঘোড়া এবং অস্ত্রশস্ত্র ক্রয় করে নেয়া হয়।
রাসূলে কারীম (ﷺ) বনু কুরাইযাহর মহিলাদের মধ্য থেকে রায়হানা বিনতে ‘আমর বিন খানাফাকে নিজের জন্য মনোনীত করেন। ইবনু ইসহাক্বের বর্ণনা হতে নাবী (ﷺ)’র ওফাত প্রাপ্তি পর্যন্ত রায়হানা তাঁর মালিকানাতেই ছিলেন।[1] কিন্তু কালবীর বর্ণনামতে নাবী কারীম (ﷺ) ৬ষ্ঠ হিজরীতে তাঁকে মুক্তি দিয়ে তাঁর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। পরে বিদায় হজ্জ্ব পালন শেষে যখন তিনি মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন তখন তাঁর মৃত্যু হয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে জান্নাতুল বাকী নামক কবরস্থানে কবরস্থ করেন।[2]
বনু কুরাইযাহ গোত্রের সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সমস্যাবলীর যখন চূড়ান্ত সমাধান হয়ে গেল তখন সৎ বান্দা সা‘দ বিন মু‘আযের যে প্রার্থনা আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয়েছে তা প্রকাশের সময় এসে গেল যার উল্লেখ আহযাব যুদ্ধের আলোচনায় এসেছে। তাই তার ক্ষত বিদীর্ণ হয়ে গেল। ঐ সময় তিনি মসজিদে নাবাবীতে অবস্থান করছিলেন। নাবী কারীম (ﷺ) তাঁর জন্য মসজিদেই শিবির স্থাপন করে দিয়েছিলেন যাতে নিকটে থেকেই তাঁর সেবা শুশ্রূষা করা যায়। ‘আয়িশাহ (রাঃ)-এর বিবরণ সূত্রে জানা যায় যে, তাঁর বিদীর্ণ ক্ষতস্থান থেকে রক্ত প্রবাহিত হয়। মসজিদে বনু গেফার গোত্রের লোকজনের কয়েকটি শিবিরও ছিল। যেহেতু তাদের দিকে রক্ত বয়ে যাচ্ছিল তারা দেখে বলল, ‘ওহে শিবির ওয়ালা! এগুলো কী যা তোমাদের দিক থেকে আমাদের দিক বয়ে আসছে? তাঁরা লক্ষ্য করলেন যে, সা’দের ক্ষতস্থান হতে রক্তস্রোত প্রবাহিত হচ্ছিল। অতঃপর তিনি এ আহত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।[3]
বুখারী এবং মুসলিম শরীফে জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল কারীম (ﷺ) ইরশাদ করলেন,
(اِهْتَزَّ عَرْشُ الرَّحْمٰنِ لِمَوْتِ سَعْدِ بْنِ مُعَاذٍ)
সা‘দ বিন মু’আয (রাঃ)-এর মৃত্যুতে আল্লাহ তা‘আলার আরশ কেঁপে উঠল।[4] ইমাম তিরমিযী আনাস হতে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং যা বিশুদ্ধ বলে সাব্যস্ত করেছেন যে, যখন সা‘দ বিন মু’আয (রাঃ)-এর জানাযা উঠানো হল তখন মুনাফিক্বগণ বলল, ‘এর লাশ কতই না হালকা। রাসূল কারীম (ﷺ) বললেন,
(إِنَّ الْمَلَائِكَةَ كَانَتْ تَحْمِلُهُ)
‘আল্লাহর ফিরিশতাগণ তাঁর লাশ উত্তোলন করেছিলেন।[5]
বনু কুরাইযাহর অবরোধ কালে একজন মুসলিম শহীদ হন। তাঁর নাম ছিল খাল্লাদ বিন সুওয়াইদ। তিনি ছিলেন সে সাহাবী যাঁর উপর বনু কুরায়যার এক স্ত্রীলোক যাঁতার একটি পাট নিক্ষেপ করেছিল। এছাড়া হযরত উকাশার ভাই আবূ সিনান বিন মিহসান এ অবরোধকালে মৃত্যু বরণ করেন।
যতদূর জানা যায় আবূ লুবাবা ছয় রাত্রি পর্যন্ত খুঁটির সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় সময় অতিবাহিত করেন। প্রত্যেকবার সালাতের সময় তাঁর স্ত্রী এসে বাঁধন খুলে দিত। সালাত শেষে পুনরায় তিনি খুঁটির সঙ্গে নিজেকে বেঁধে ফেলতেন। অতঃপর প্রত্যুষে তাঁর তওবা কবুল সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উপর ওহী নাযিল হয়। সে সময় নাবী কারীম (ﷺ) উম্মু সালামাহ (রাঃ)-এর ঘরে অবস্থান করছিলেন। আবূ লুবাবা বর্ণনা করেন যে, উম্মু সালামাহ আপন গৃহের দরজায় দাঁড়িয়ে আমাকে বললেন, ‘হে আবূ লুবাবা! শুভ সংবাদ, সন্তুষ্ট হয়ে যাও আল্লাহ তা‘আলা তোমার তওবা কবুল করেছেন। এ কথা শ্রবণ করে উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম (রাযি.) তাঁর বাঁধন খুলে দেয়ার জন্য দ্রুতবেগে বেরিয়ে গেলেন। কিন্তু রাসূল কারীম (ﷺ) ছাড়া অন্য কারো হাতে বাঁধন খুলে নিতে তিনি অস্বীকার করলেন। তাই ফজরের সালাতের জন্য বাহির হয়ে নাবী কারীম (ﷺ) যখন সেখানে দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন তাঁর বাঁধন খুলে দেন।
এ যুদ্ধ সংঘটিত হয় যূল ক্বা’দাহ মাসে।[6] পঁচিশ দিন পর্যন্ত বনু কুরাইযাহর অবরোধ স্থায়ী থাকে। সূরাহ আহযাবে আল্লাহ তা‘আলা খন্দকের যুদ্ধ এবং বনু কুরাইযাহর যুদ্ধ সম্পর্কে অনেক আয়াত অবতীর্ণ করেন এবং এ দু’ যুদ্ধের বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করেন। মু’মিন ও মুনাফিক্বদের বিভিন্ন অবস্থার বিস্তারিত বিবরণ এতে পাওয়া যায়। সূরাহ আহযাবের এ বিষয় সংশ্লিষ্ট আয়াতে কারীমাসমূহে শত্রুদের বিভিন্ন দলের ভাঙ্গন ও উদ্যমহীনতা এবং আহলে কিতাবের অঙ্গীকার ভঙ্গের ফলাফল সম্পর্কে সুস্পষ্ট আলোকপাত হয়।
[2] তালকিহুল ফহুম ১২ পৃঃ।
[3] সহীহুল বুখারী ২য় খন্ড ৫৯১ পৃঃ।
[4] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৫৩৬ পৃ: সহীহুল মসলিম ২য় খন্ড ২৯৪ পৃঃ, এবং জামে তিরমিযী ২য় খন্ড ২২৫ পৃঃ।
[5] জামে তিরমিযী ২য় খন্ড ২২৫ পৃঃ।
[6] ইবনু হিশাম, ২য় খন্ড ২৩৮ পৃঃ, যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ জানার জন্য দ্র: ইবনু হিশাম ২য় খন্ড ২৩৬-২৩৭ পৃঃ। সহীহুল বুখারী ২য় খন্ড ৫৯১ পৃঃ, যাদুল মা‘আদ ২য় খন্ড।