শহীদদের দাফন কাফন এবং মহা মহিমান্বিত আল্লাহর গুণগান ও তাঁর নিকট দু‘আর কাজ শেষ করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মদীনার পথে যাত্রা শুরু করেন। যুদ্ধকালে সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) হতে প্রেম ও আত্মত্যাগের অসাধারণ ঘটনাবলী প্রকাশিত হয়েছিল, ঠিক তেমনই পথ চলাকালে মুসলিম মহিলাগণ হতেও সত্যবাদিতা ও আত্মত্যাগের বিস্ময়কর ঘটনাবলী প্রকাশ পেয়েছিল।
পথে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে হামনাহ বিনতে জাহশ (রাঃ)-এর সাক্ষাৎ হয়। তাঁকে তাঁর ভ্রাতা আব্দুল্লাহ ইবনু জাহশ (রাঃ)-এর শাহাদতের সংবাদ দেয়া হয়। তিনি ইন্নালিল্লাহ পাঠ করেন ও তাঁর মাগফিরাতের জন্য দু‘আ করেন। তারপর তাঁর মামা হামযাহ ইবনু আব্দুল মুত্তালিব (রাঃ)-এর শাহাদতের খবর দেয়া হয়। তিনি আবার ইন্নালিল্লাহ পড়েন ও তাঁর মাগফিরাতের জন্য দুআ করেন। এরপর তাঁকে তাঁর স্বামী মুসআব ইবনু উমায়ের (রাঃ)-এর শাহাদতের সংবাদ দেয়া হয়। এ খবর শুনে তিনি অস্থিরভাবে চিৎকার করে উঠেন এবং হাউ মাউ করে কাঁদতে শুরু করেন। এ দেখে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, (إِنَّ زَوْجَ الْمَرْأَةِ مِنْهَا لَبِمَكَانٍ) ‘স্ত্রীর কাছে স্বামীর বিশেষ এক মর্যাদা আছে।’[1]
অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বনু দীনার গোত্রের এক মহিলার পাশ দিয়ে গমন করেন যার স্বামী, ভ্রাতা এবং পিতা এ তিন জন শাহাদতের পিয়ালা পান করেছিলেন। তাঁকে এদের শাহাদতের সংবাদ দেয়া হলে তিনি বলে ওঠেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খবর কী?’ সাহাবীগণ উত্তর দেন, ‘হে উম্মু ফুলান, তুমি যেমন চাচ্ছ তিনি তেমনই আছেন (অর্থাৎ তিনি বেঁচে আছেন।)।’ মহিলাটি বললেন, ‘তাঁকে একটু আমাকে দেখিয়ে দিন, আমি তার দেহ মুবারক একটু দেখতে চাই।’ সাহাবীগণ ইঙ্গিতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে দেখিয়ে দিলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি তাঁর দৃষ্টি পড়া মাত্রই হঠাৎ তিনি বলে উঠলেন, (كُلُّ مُصِيْبَةٍ بَعْدَكَ جَلَلٌ) অর্থাৎ ‘আপনাকে পেলে সব বিপদই নগণ্য।’[2]
পথে চলাকালেই সা‘দ ইবনু মু’আয (রাঃ)-এর মা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে আসেন। ঐ সময় সা‘দ ইবনু মু’আয (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এ ঘোড়ার লাগাম ধরেছিলেন। তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! ইনি আমার মাতা।’ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তখন ‘মারহাবা’ বলেন। অতঃপর তাঁর অভ্যর্থনার জন্যে থেমে যান এবং তাঁর পুত্র ‘আমর ইবনু মু’আয (রাঃ)-এর শাহাদতের উপর সমবেদনাসূচক কালেমা পাঠ করে তাঁকে সান্ত্বনা দেন এবং ধৈর্য্যধারণের উপদেশ দেন। তখন তিনি বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যখন আমি আপনাকে নিরাপদ দেখতে পেয়েছি তখন সব বিপদই আমার কাছে অতি নগণ্য।’ তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উহুদের শহীদদের জন্যে দু‘আ করেন এবং বলেন, (يَا أُمَّ سَعْدٍ، أَبْشِرِيْ وَبَشِّرِيْ أَهْلَهُمْ أَنْ قَتْلاَهُمْ تَرَافَقُوْا فِي الْجَنَّةِ جَمِيْعًا، وَقَدْ شَفَعُوْا فِيْ أَهْلِهِمْ جَمِيْعاً) ‘হে উম্মু সা‘দ (রাঃ) তুমি খুশী হয়ে যাও এবং শহীদদের পরিবারের লোকদেরকে সুসংবাদ শুনিয়ে দাও যে, তাঁদের শহীদরা সবাই এক সাথে জান্নাতে রয়েছে। আর তাঁদের পরিবারের লোকদের ব্যাপারে তাঁদের সবারই শাফাআত কবুল করা হবে।’
সা‘দ (রাঃ)-এর মাতা (রাঃ) তখন বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! তাদের উত্তরাধিকারীদের জন্যেও দু‘আ করুন।’ তিনি বললেন,(اللّٰهُمَّ أَذْهِبْ حُزْنَ قُلُوْبِهِمْ، وَاجْبِرْ مُصِيْبَتِهِمْ، وَأَحْسِنْ الخَلْفَ عَلٰى مَنْ خُلِّفُوْ) ‘হে আল্লাহ! তাঁদের অন্তরের দুঃখ দূর করে দিন, তাঁদের বিপদের বিনিময় প্রদান করুন এবং জীবিত ওয়ারিসদেরকে উত্তমরূপে দেখা শোনা করুন।’[3]
[2] ইবনু হিশাম, ২য় খন্ড, ৯৯ পৃঃ।
[3] আস সীরাতুল হালবিয়্যাহ, ২য় খন্ড ৪৭ পৃঃ।
সেদিন হিজরী তৃতীয় সনের ৭ই শাওয়াল শনিবার সন্ধ্যার পূর্বেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মদীনায় পৌঁছেন। বাড়িতে তিনি তাঁর নিজের তরবারীটি ফাতিমাহ (রাঃ)-কে দিয়ে বলেন, ‘মা! এর রক্ত ধুয়ে দাও। আল্লাহর কসম! এটা আজ আমার নিকট খুবই সঠিক প্রমাণিত হয়েছে।’ তারপর আলী (রাঃ)ও তাঁর তরবারীখানা ফাতিমাহ (রাঃ)-এর দিকে বাড়িয়ে দিলেন এবং বললেন, (اِغْسِلِيْ عَنْ هٰذَا دَمَهُ يَا بُنَيَّةُ، فَوَاللهِ لَقَدْ صَدَقَنِيْ الْيَوْمَ) ‘এটারও রক্ত ধুয়ে ফেল। আল্লাহর শপথ! এটাও আজ অত্যন্ত সঠিক প্রমাণিত হয়েছে।’ তাঁর এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে বললেন, (لَئِنْ كُنْتَ صَدَقْتَ الْقِتَالَ، لَقَدْ صَدَقَ مَعَكَ سَهْلُ بْنُ حُنَيْفٍ وَأَبُوْ دُجَانَةَ) ‘তুমি যদি নিঃস্বার্থভাবে যুদ্ধ করে থাক তবে তোমার সাথে সুহায়েল ইবনু হুনায়েফ (রাঃ) এবং দুজানাহ (রাঃ)ও নিঃস্বার্থভাবে যুদ্ধ করেছে।[1]
অধিকাংশ বর্ণনাকারী একমত যে, মুসলিম শহীদদের সংখ্যা ছিল সত্তর জন, যাঁদের মধ্যে অধিক সংখ্যকই ছিলেন আনসার, অর্থাৎ তাঁদের পঁয়ষট্টি জন লোক শহীদ হয়েছিলেন, খাযরাজ গোত্রের একচল্লিশ জন এবং আউস গোত্রের চবিবশ জন। একজন ইহুদী নিহত হয়েছিল এবং মুহাজির শহীদদের সংখ্যা ছিল মাত্র চারজন।
অধিকাংশ বর্ণনাকারী একমত যে, মুসলিম শহীদদের সংখ্যা ছিল সত্তর জন, যাঁদের মধ্যে অধিক সংখ্যকই ছিলেন আনসার, অর্থাৎ তাঁদের পঁয়ষট্টি জন লোক শহীদ হয়েছিলেন, খাযরাজ গোত্রের একচল্লিশ জন এবং আউস গোত্রের চবিবশ জন। একজন ইহুদী নিহত হয়েছিল এবং মুহাজির শহীদদের সংখ্যা ছিল মাত্র চারজন।
এখন বাকী থাকল কুরাইশদের নিহতদের সংখ্যা নিয়ে কথা। ইবনু ইসহাক্বের বর্ণনা অনুযায়ী তাদের সংখ্যা ছিল বাইশ জন। কিন্তু আসহাবে মাগাযী এবং আহলুসসিয়ার এ যুদ্ধের যে বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন এবং যাতে যুদ্ধের বিভিন্ন স্থানে নিহত মুশরিকদের যে আলোচনা এসেছে তাতে গভীরভাবে চিন্তা করে হিসাব করলে এ সংখ্যা বাইশ নয়, বরং সাঁইত্রিশ হয়। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলাই সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী।[1]
মুসলিমরা উহুদ যুদ্ধ হতে ফিরে এসে (তৃতীয় হিজরী সনের ৮ই শাওয়াল শনিবার ও রবিবার মর্ধবর্তী) রাত্রে উদ্বেগপূর্ণ অবস্থায় রাত্রি অতিবাহিত করেন। যুদ্ধ তাঁদেরকে ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলেছিল। তবুও তাঁরা মদীনার পথে ও গমনাগমন স্থলে সারারাত পাহারা দিতে থাকেন এবং তাঁদের প্রধান সেনাপতি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হিফাযতের বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। কেননা, যে কোন দিক থেকেই তাঁর আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
এদিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যুদ্ধে সৃষ্ট অবস্থার উপর গভীর চিন্তা করে সারা রাত কাটিয়ে দেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, যদি মুশরিকরা এ চিন্তা করে যে, যুদ্ধ ক্ষেত্রে তাদের পাল্লা ভারী থাকা সত্ত্বেও তারা কোন উপকার লাভ করতে পারেনি, তাহলে তারা অবশ্যই লজ্জিত হবে এবং রাস্তা হতে ফিরে এসে মদীনার উপর দ্বিতীয়বার আক্রমণ চালাবে এ জন্যে তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন যে, যে প্রকারেই হোক তাদের পশ্চাদ্ধাবন করতে হবে।
আহলে সিয়ারের বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উহুদ যুদ্ধের দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ তৃতীয় হিজরীর ৮ই শাওয়াল রবিবারে সকালে ঘোষণা করেন যে, শত্রুদের মোকাবেলার জন্যে বের হতে হবে। সাথে সাথে তিনি এ ঘোষণাও দেন যে, (لاَ يَخْرُجُ مَعَنَا إِلاَّ مَنْ شَهِدْ الْقِتَالَ) যারা উহুদ যুদ্ধে শরীক ছিল শুধু তারাই যাবে। এর পরেও আব্দুল্লাহ ইবনু উবাই তাদের সাথে যাবার অনুমতি চাইলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে অনুমতি দিলেন না। এ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে মদীনার মুসলিম পল্লীটি শয্যার উপর লাফিয়ে উঠলেন। সব শোক, সব সন্তাপ, সব জ্বালা, সব যন্ত্রণা বিস্মৃত হয়ে তাঁরা গত কালের রক্ত রঞ্জিত অস্ত্রগুলো তুলে নিলেন হাতে এবং উৎসাহের সাথে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খিদমতে সমবেত হতে লাগলেন। দেখতে দেখতে মুসলিম বাহিনী মদীনা ত্যাগ করে গেলেন।
জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রাঃ) যিনি উহুদ যুদ্ধে শরীক হওয়ার সুযোগ লাভ করেননি, এ যুদ্ধে শরীক হওয়ার জন্য নাবী কারীম (ﷺ)-এর খিদমতে আরজ পেশ করলেন। তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমি চাচ্ছি যে, আপনি যে সকল যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করবেন আমিও যেন সে সকল যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার সুযোগ লাভ করি। কিন্তু যেহেতু এ যুদ্ধে (উহুদ) আমার পিতা তাঁর সন্তানদের দেখাশোনার জন্য আমাকে বাড়িতে রেখে দেন সেহেতু আমি তাতে শরীক হতে পারিনি। অতএব, আমাকে অভিযানে অংশ গ্রহণ করার সুযোগ দান করা হোক।’ রাসূল কারীম (ﷺ) তাঁকে অনুমতি প্রদান করলেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আগের মতো রণসাজে সজ্জিত হয়ে ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করে অগ্রগামী হয়ে চলতে থাকলেন। আর সবাই চলছিলেন পায়ে হেঁটে। কর্মসূচী অনুযায়ী মদীনা হতে আট মাইল দূরে হামরাউল আসাদ নামক স্থানে পৌঁছে তাঁরা শিবির স্থাপন করলেন।
এখানে অবস্থান কালে মা‘বাদ ইবনু আবূ মা‘বাদ খুযায়ী রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খিদমতে হাজির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে। আবার এটাও কথিত আছে যে, সে শিরকের উপরেই প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু সে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)’র শুভাকাঙ্ক্ষী ছিল। কেননা, খুযাআহ ও বনু হাশিমের মধ্যে বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সাহায্যের চুক্তি ছিল। যাহোক, সে বলল, ‘হে মুহাম্মাদ (ﷺ)! আপনার ও আপনার সহচরদের ক্ষয় ক্ষতিতে আমি অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছি। আমি কামনা করছিলাম যে, আল্লাহ আপনাদেরকে নিরাপদে রাখবেন। তার এ সহানুভূতি প্রকাশে খুশী হয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে বললেন, ‘তুমি আবূ সুফইয়ানের নিকট গমন কর এবং তাকে হতোদ্যম করে দাও।’
এদিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে আশঙ্কা করছিলেন যে, মুশরিকরা মদীনায় প্রত্যাবর্তনের কথা চিন্তা ভাবনা করবে তা ছিল সম্পূর্ণ সত্য।
মুশরিকরা মদীনা হতে ছত্রিশ মাইল দূরে ‘রাওহা’ নামক স্থানে পৌঁছে যখন শিবির স্থাপন করল তখন তারা পরস্পর পরস্পরকে তিরস্কার ও ভৎর্সনা করতে লাগল। তারা পরস্পর বলাবলি করতে লাগল যে, আমরা কোন কাজই করতে পারলাম না এবং আমাদের উদ্দেশ্য সফল হল না। আবূ সুফইয়ান, ইকরামা প্রভৃতি দলপতিগণ বলতে লাগল, ‘মুহাম্মাদ (ﷺ) আহত এবং তার অধিক সংখ্যক ভক্তই আঘাতে জর্জরিত, এ অবস্থায় মদীনা আক্রমণ না করে ফিরে যাওয়া আমাদের পক্ষে কোনক্রমেই যুক্তিসম্মত হচ্ছে না। মুসলিমগণকে সমূলে উৎপাটিত ও সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করার জন্যই আমরা এত উদ্যোগ আয়োজন করলাম এবং সবকিছুই বিধ্বস্ত করে ফেললাম। এখন তার সুযোগ উপস্থিত হয়েছে, অথচ আমরা ফিরে যাচ্ছি, দু’দিন পরেই তারা আবারও সামলিয়ে উঠবে, তখন আমাদের উদ্দেশ্য সহজ সাধ্য হবে না। কেননা, তাদের শান-শওকত ও শক্তি কিছুটা খর্ব হলেও তাদের মধ্যে এখনো কিছু সংখ্যক লোক থেকে গেছে যারা আবার তোমাদের মাথাব্যথার কারণ হবে। অতএব, তোমাদের উচিত যে, মদীনায় ফিরে গিয়ে তাদের মূলোৎপাটন করে ফেলবে।
আবূ সুফইয়ান বিভিন্ন গোত্রের যে সমস্ত লোকদেরকে নানাভাবে প্রলুব্ধ করে নিজেদের দলে আনয়ন করেছিলেন তারা বলতে লাগল, ‘কী করতে এসেছিলাম আর কী করে যাচ্ছি। মদীনা আক্রমণ করে ধর্মের শত্রুদেরকে বিধ্বস্ত করে ফেলব, মদীনার সমস্ত ধন-সম্পদ লুটে নিব, তাদের যুবতী ও কুমারীদের সতীত্ব নষ্ট করব এবং যা খুশী তাই করব। কিন্তু এখন দেখছি এ সব কিছুই হল না। আমাদেরকে উল্টো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। তাই তারা সিদ্ধান্ত করল যে, মদীনা আক্রমণ করতেই হবে। উমাইয়ার পুত্র সাফওয়ান এর প্রতিবাদ করল বটে, কিন্তু কেউই তার কথা গ্রাহ্য করল না।
কিন্তু এ ধরণের কথাবার্তা থেকে ধারণা করা যায় যে, এটা ছিল মুশরিক কুরাইশদের একটি সাধারণ অভিমত। যারা উভয় পক্ষের শক্তি সামর্থ্য সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখত না। কিন্তু সাফওয়ান বিন উমাইয়া, যিনি একজন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন, তিনি এ মতের বিরোধিতা করেন এবং বলেন, ‘হে লোক সকল! তোমরা এরূপ কাজ কর না। আমার ভয় হয় যে, মদীনার যারা উহুদ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে নি তারাও তোমাদের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করবে। তোমরা এ অবস্থায় ফিরে চল। এখন বিজয় রয়েছে তোমাদেরই। অন্যথায় আমার ভয় হয় যে, যদি এখন মদীনা আক্রমণ কর তাহলে বিপদে পড়ে যাবে। কিন্তু অধিক সংখ্যক লোকই এ মত গ্রহণ করল না এবং সিদ্ধান্ত হল যে, মদীনা আক্রমণ করতে হবে।
তখনো তারা শিবির ছেড়ে বের হয়নি এমন সময় মা’বাদ ইবনু আবি মা’বাদ খুযায়ী তথায় গিয়ে হাজির হল। মা’বাদের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে আবূ সুফইয়ান কিছুই জানত না। তাই তাকে দেখেই আবূ সুফইয়ান সাগ্রহে বলে উঠলেন, ‘এ যে, মা’বাদ’। সংবাদ কী? মা’বাদ উত্তর দিল, ‘সংবাদ আর কী, এখনই সরে পড়।’ আবূ সুফইয়ান প্রশ্ন করলেন, ‘ব্যাপার কী, মুহাম্মাদ (ﷺ) সম্বন্ধে কোন সংবাদ আছে না কি?’ মা’বাদ জবাবে বলল, ‘আছে বৈ কি। মুহাম্মাদ (ﷺ) বিপুল আয়োজনে অগ্রসর হচ্ছেন। এবার মদীনার প্রত্যেক মুসলিমই যোগদান করেছে।’ এ কথা শুনে আবূ সুফইয়ান বললেন, ‘আরে সর্বনাশ! তুমি বলছ কী? তাদের অবশিষ্ট শক্তিটুকু বিনষ্ট করতে, তাদেরকে সমূলে উৎপাটিত করতে দৃঢ় সংকল্প করে আমরা মদীনার দিকে অগ্রসর হতে যাচ্ছি, মুহাম্মাদ (ﷺ) প্রত্যুষে আবার যুদ্ধ যাত্রা করেছে, এটাও কি সম্ভব? তুমি বলছ কী?’ মা’বাদ জবাব দিল ‘বলছি ভালই, এখনও মানে মানে সরে পড়। মুসলিম বাহিনী এসে পড়তে বেশী দেরী নেই, শীঘ্রই সরে পড়।’
আবূ সুফইয়ান তখন সকলকে মক্কার পথে যাত্রা করার আদেশ প্রদান করলেন। কুরাইশ বাহিনী আর কাল বিলম্ব না করে স্বদেশ অভিমুখে রওয়ানা হল। তবে আবূ সুফইয়ান একটা কাজ করল যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) যেন মুশরিকদের পশ্চাদ্ধাবন না করেন এ জন্যে তাদের পাশ দিয়ে গমনকারী আব্দুল ক্বায়স গোত্রের এক কাফেলার লোকদেরকে বলেন, ‘আপনারা মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে আমাদের একটি পয়গাম পৌঁছিয়ে দিবেন কি? আমি ওয়াদা করছি যে, আপনারা যখন মক্কা আসবেন তখন আমি এর বিনিময়ে আপনাদের উটগুলো যতো বহন করতে পারে ততো কিশমিস প্রদান করব।’
ঐ লোকগুলো বলল, ‘জ্বী হ্যাঁ পারব।’
আবূ সুফইয়ান তখন তাদেরকে বললেন, ‘মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে এ খবর পৌঁছে দিবেন যে, আমরা তাঁকে ও তাঁর সঙ্গীদেরকে খতম করে দেয়ার জন্যে দ্বিতীয়বার আক্রমণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি।’
এরপর এ কাফেলা যখন হামরাউল আসাদে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং সাহাবায়ে কিরামের পাশ দিয়ে গমন করে তখন তাদেরকে আবূ সুফইয়ানের এ পয়গাম শুনিয়ে দেয় এবং বলে,
(إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوْا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيْمَاناً وَقَالُوْا حَسْبُنَا اللهُ وَنِعْمَ الْوَكِيْلُ فَانقَلَبُوْا بِنِعْمَةٍ مِّنَ اللهِ وَفَضْلٍ لَّمْ يَمْسَسْهُمْ سُوْءٌ وَاتَّبَعُوْا رِضْوَانَ اللهِ وَاللهُ ذُوْ فَضْلٍ عَظِيْمٍ) [آل عمران: 173، 174].
‘তোমাদের বিরুদ্ধে লোক (মুশরিকরা) জামায়েত হয়েছে, সুতরাং তোমরা তাদেরকে ভয় কর, কিন্তু এটা তাঁদের বিশ্বাস দৃঢ়তর করেছিল এবং তাঁরা বলেছিলেন, ‘আল্লাহই আমাদের জন্যে যথেষ্ট এবং তিনি কত উত্তম কর্ম বিধায়ক!’ তারপর তাঁরা আল্লাহর অবদান ও অনুগ্রহসহ ফিরে এসেছিলেন, কোন অনিষ্ট তাঁদেরকে স্পর্শ করে নি, এবং আল্লাহ যাতে সন্তুষ্ট তাঁরা তারই অনুসরণ করেছিলেন এবং আল্লাহ বড় অনুগ্রহশীল (সূরাহ আল-ইমরান (৩) : ১৭৩-১৭৪)
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) রবিবার হামরাউল আসাদে পৌঁছেছিলেন এবং সোমবার, মঙ্গলবার এবং বুধবার অর্থাৎ তৃতীয় হিজরীর ৯ই, ১০ই এবং ১১ই শাওয়াল তথায় অবস্থান করেছিলেন, এরপর মদীনায় ফিরে এসেছিলেন। ফিরবার পূর্বে আবূ উযযা জুমহী রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাতে বন্দী হয়। এ ছিল ঐ ব্যক্তি যে বদরের যুদ্ধে বন্দী হওয়ার পর দারিদ্র ও কন্যার আধিক্যের কারণে বিনা মুক্তিপণে মুক্তি পেয়েছিল। শর্ত ছিল, সে ভবিষ্যতে কখনও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বিরুদ্ধে কাউকেও সাহায্য করবে না। কিন্তু সে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে কবিতার মাধ্যমে নাবী (ﷺ) ও সাহাবায়ে কিরামের বিরুদ্ধে জনগণকে উত্তেজিত করতে থাকে। অতঃপর উহুদ যুদ্ধে মুসলিমগণের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে সে নিজেও আগমন করে, তাকে গ্রেফতার করে যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)’র খিদমতে হাযির করা হয় তখন সে বলতে শুরু করে : ‘মুহাম্মাদ (ﷺ) আমার অপরাধ ক্ষমা করুন, আমার প্রতি অনুগ্রহ করুন এবং আমার শিশু সন্তানদের খাতিরে আমাকে ছেড়ে দিন। আমি অঙ্গীকার করছি যে, এরূপ অপরাধমূলক কাজ আর কখনও করব না।’ নাবী (ﷺ) উত্তরে বলেন,
(لَا تَمْسَحُ عَارِضِيْكَ بِمَكَّةَ بَعْدَهَا وَتَقُوْلُ : خَدَعْتُ مُحَمَّداً مَرَّتَيْنِ، لَا يُلْدَغُ الْمُؤْمِنُ مِنْ جُحْرٍ مَرَّتَيْنِ)
‘এখন এটা হতে পারে না যে, মক্কায় ফিরে গিয়ে নিজের কপালে হাত মেরে বলবে, ‘আমি মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে দু’দুবার প্রতারিত করেছি। মু’মিনকে এক ছিদ্র হতে দু’বার দংশন করা হয় না।’ এরপর তিনি যুবাইর (রাঃ)-কে অথবা আ’সিম ইবনু সাবিত (রাঃ)-কে তার গর্দান উড়িয়ে দেয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। তাঁরা তাকে হত্যা করেন।
অনুরূপভাবে মক্কার একজন গুপ্তচরও মারা যায়। তার নাম ছিল মুআবিয়া ইবনু মুগীরা ইবনু আবিল আস। সে ছিল আব্দুল মালিক ইবনু মারওয়ানের নানা। উহুদের দিন মুশরিকরা যখন মক্কার দিকে ফিরে যায় তখন সে তার চাচাতো ভাই উসমান ইবনু আফফান (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসে। উসমান (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট তার জন্যে নিরাপত্তা প্রার্থনা করেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে এ শর্তে নিরাপত্তা প্রদান করেন যে, সে যদি মদীনায় তিন দিনের বেশী অবস্থান করে তবে তাকে হত্যা করে দেয়া হবে। কিন্তু মদীনা যখন মুসলিম সৈন্য হতে শূন্য হয়ে গেল তখন এ লোকটি কুরাইশের গোয়েন্দাগিরি করার জন্য মদীনায় তিন দিনের বেশী থেকে যায়।
অতঃপর যখন মুসলিম সেনাবাহিনী মদীনায় ফিরে আসে তখন সে পালাবার চেষ্টা করে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যায়দ ইবনু হারিসাহ (রাঃ) ও আম্মার ইবনু ইয়াসার (রাঃ)-কে নির্দেশ দেন তারা যেন ঐ ব্যক্তির পিছু নিয়ে তাকে হত্যা করেন।[1]
হামরাউল আসাদ অভিযানের বর্ণনা পৃথক নামে দেয়া হলেও প্রকৃত পক্ষে এটা উহুদ যুদ্ধেরই একটা অংশ ও পরিশিষ্ট।
এই হলো উহুদ যুদ্ধে জয়-পরাজয় পর্যালোচনা। ঐতিহাসিকগণ এ যুদ্ধের যথেষ্ট পর্যালোচনা করেছেন যে এ যুদ্ধে জয়লাভ হয়েছে না পরাজয় হয়েছে? এ যুদ্ধে মুশরিকরা তাদের সপক্ষে ভাল কিছু করতে পেরেছিল এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। অধিকন্তু যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ মূলত তাদের হাতেই ছিল। অন্যপক্ষ নিজেদের কর্মদোষে মুসলমানদেরই জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল বেশি। হ্যাঁ মুমিদিনের একটি দলের মনমানসিকতা একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছিল এবং যুদ্ধের হাল কুরাইশদের পক্ষেই ছিল। তবে এমন কতক বিবেচ্য বিষয় রয়েছে যার বলে আমরা সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি না যে, মুশরিকদের বিজয় হয়েছিল। যেমন আমরা বলতে পারি, মাক্কী বাহিনী মুসলমি শিবিরের দখল নিতে পারে নি এবং ব্যাপক ও কঠিন বিপদের মুহূর্তেও মাদানী বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করে মদিনায় পালিয়ে যায় নি বরং তারা অত্যন্ত বীরত্বের সাথে নেতৃত্ত্বের কেন্দ্রে একত্রিত হয়। আর ততাদের হাত এমন ভেঙ্গে পড়েনি যে, মাক্বী বাহিনী তাদেরকে পশ্চাদ্ধাবন করতে পারে এবং মদিনা বাহিনীর একজন সৈন্যও মাক্বী বাহিনীর হাতে বন্দী হয় নি। কাফিররা মুসলিমদের থেকে কোন গনীমতের মালও সংগ্রহ করতে পারেনি। মুসলিম সৈন্যবাহিনী তাদের শিবিরে অবস্থান করেছে; কিন্তু মুশরিকরা তৃতীয় দফায় যুদ্ধের জন্য সেখানে অবস্থান করেনি এমনকি জয়লাভকারী বাহিনীর যে সাধারণ নীতি আছে, তারা যুদ্ধ ময়দানে এক, দু বা তিনদিন অবস্থান করবে- মাক্কী বাহিনী তাও করেনি। বরং তারা দ্রুত প্রত্যাবর্তন করে এবং মুসলমানদের পূর্বেই তারা যুদ্ধ ময়দান পরিত্যাগ করে। পরে মুশরিক বাহিনী যথাসাধ্য চেষ্টা করেও নারী ও ধনসম্পদ লুণ্ঠনের জন্য মদিনাদে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়নি। অথচ স্পষ্ট বিজয়ের এটা অন্যতম লক্ষণ।
সবকিছু পর্যালোচনা করে আমরা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি যে, মক্কার কুরাইশদের পক্ষে বিজয় লাভ না হলেো এটা সম্ভব হয়েছিল যে, যুদ্ধের পট পরিবর্তনের পর মুসলিমদের সীমাহীন ও যথেষ্ট ক্ষতি সাধনের পরও রেহাই পেয়ে যায়। তবে এটাকে মুশরিকদের বিজয় কক্ষনোই বলা যায় না। বরং আবূ সুফইয়ানের দ্রুত পলায়ন করা ও প্রত্যাবর্তন করা থেকে এটা সহজেই অনুমান করা যায় যে, তৃতীয় দফায় যুদ্ধ করলে তার বাহিনীর নিদারুন ক্ষতি হওয়ার ব্যাপারে সে খুবই ভীত ছিল। আর বিশেষ করে গাযওয়ায়ে হামরাউল আসাদ আবূ সুফইয়ানের স্বীয় অবস্থান হতে আরো ভালোভাবে বোঝা যায়।
এরূপ অবস্থায় আমরা এ যুদ্ধকে এক দলের বিজয় ও অন্য দলের পরাজয় না বলে অমীমাংসিত যুদ্ধ বলতে পারি, যাতে উভয় দল নিজ নিজ সফলতা ও ক্ষয়-ক্ষতির অংশ লাভ করেছে। অতঃপর যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন এবং নিজেদের শিবিরকে শত্রুদের অধিকারে ছেড়ে দেয়া ছাড়াই যুদ্ধ করা হতে বিরত হয়েছে। আর অমীমাংসিত যুদ্ধ তো এটাকেই বলা হয়। এদিকে আল্লাহ তা‘আলা ইঙ্গিত করে বলেছেন :
(وَلاَ تَهِنُوْا فِيْ ابْتِغَاء الْقَوْمِ إِن تَكُوْنُوْا تَأْلَمُوْنَ فَإِنَّهُمْ يَأْلَمُوْنَ كَمَا تَأْلَمونَ وَتَرْجُوْنَ مِنَ اللهِ مَا لاَ يَرْجُوْنَ) [النساء: 104]
এ (শত্রু) কওমের পশ্চাদ্ধাবনে দুর্বলতা দেখাবে না, কেননা যদি তোমরা কষ্ট পাও, তবে তোমাদের মত তারাও তো কষ্ট পায়, আর তোমরা আল্লাহ হতে এমন কিছু আশা কর, যা তারা আশা করে না। [আন-নিসা (৪) : ১০৪]
এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ক্ষতি সাধনে ও ক্ষতি অনুভব করণে এক সেনা বাহিনীকে অন্য সেনা বাহিনীর সাথে উপমা দিয়েছেন। যার মর্মার্থ হল, দু্ই পক্ষেরই অবস্থান সমপর্যায়ের ছিল। উভয় পক্ষই এমন অবস্থায় ফিরে এসেছে যে, কেউ কারোরই উপর জয়ী হতে পারে নি।
পরবর্তীতে কুরআন নাযিল হলে তাতে এ যুদ্ধের এক একটি মনযিলের উপর আলোকপাত করা হয়েছে এবং বিশদ ব্যাখ্যা করে ঐ কারণগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে যেগুলোর ফলে মুসলিমগণকে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল। আর এ ধরণের ফায়সালাকৃত সময়ে ঈমানদার এবং এ উম্মতকে (যারা অন্যান্য উম্মতের মোকাবেলায় শ্রেষ্ঠ উম্মত হওয়ার সৌভাগ্য লাভ হয়েছে) যে সব উঁচু ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য লাভের জন্যে অস্তিত্বে আনা হয়েছে, ওগুলোর দিক দিয়ে এখনও তাদের বিভিন্ন দলের মধ্যে কী কী দুর্বলতা রয়েছে সেগুলো বলে দেয়া হয়েছে।
অনুরূপভাবে কুরআন মাজীদে মুনাফিক্বদের বর্ণনা দিয়ে তাদের প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশ করে দেয়া হয়েছে। তাদের অন্তরে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর বিরুদ্ধে যে শত্রুতা লুক্কায়িত ছিল তা জানিয়ে দেয়া হয়েছে। আর সরলমনা মুসলিমগণের অন্তরে এ মুনাফিক্বরা এবং তাদের ভাই ইহুদীরা যে কুমন্ত্রণা ছড়িয়ে রেখেছিল তা দূরীভূত করা হয়েছে। এ প্রশংসনীয় হিকমত এবং উদ্দেশ্যের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে যা এ যুদ্ধের ফল ছিল।
এ যু্দ্ধ সম্পর্কে সূরাহ আল-ইমরানের ষাটটি আয়াত নাযিল হয়েছে। সর্ব প্রথম যুদ্ধের প্রাথমিক মনযিলের উল্লেখ করে ইরশাদ হয়েছে,
(وَإِذْ غَدَوْتَ مِنْ أَهْلِكَ تُبَوِّىءُ الْمُؤْمِنِيْنَ مَقَاعِدَ لِلْقِتَالِ) [ آل عمران: 121 ]
(স্মরণ কর) যখন তুমি সকাল বেলায় তোমার পরিজন হতে বের হয়ে মু’মিনদেরকে যুদ্ধের জন্য জায়গায় জায়গায় মোতায়েন করছিলে। [আলু ‘ইমরান (৩) : ১২১]
তারপর শেষে এ যুদ্ধের ফলাফল ও রহস্যের উপর ব্যাপক আলোকপাত করে ইরশাদ হয়েছে,
(مَا كَانَ اللهُ لِيَذَرَ الْمُؤْمِنِيْنَ عَلٰى مَآ أَنتُمْ عَلَيْهِ حَتّٰى يَمِيْزَ الْخَبِيْثَ مِنَ الطَّيِّبِ وَمَا كَانَ اللهُ لِيُطْلِعَكُمْ عَلٰى الْغَيْبِ وَلَكِنَّ اللهَ يَجْتَبِيْ مِن رُّسُلِهِ مَن يَشَاء فَآمِنُوْا بِاللهِ وَرُسُلِهِ وَإِن تُؤْمِنُوْا وَتَتَّقُوْا فَلَكُمْ أَجْرٌ عَظِيْمٌ)
অসৎকে সৎ থেকে পৃথক না করা পর্যন্ত তোমরা যে অবস্থায় আছ, আল্লাহ মু’মিনদেরকে সে অবস্থায় ছেড়ে দিতে পারেন না এবং আল্লাহ তোমাদেরকে গায়িবের বিধান জ্ঞাত করেন না, তবে আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের মধ্যে যাকে ইচ্ছে বেছে নেন, কাজেই তোমরা আল্লাহ এবং তাঁর রসূলগণের প্রতি ঈমান আন। যদি তোমরা ঈমান আন আর তাকওয়া অবলম্বন কর, তাহলে তোমাদের জন্য আছে মহাপুরস্কার।’ [আলু ‘ইমরান (৩) : ১৭৯]
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম এ সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে লিখেছেন।[1] হাফেয ইবনু হাজার (রঃ) বলেছেন যে, ওলামারা (ইসলামী পন্ডিতগণ) বলেছেন যে, গাযওয়ায়ে উহুদ ও তার মধ্যে মুসলিমগণের পরাজয়ে মহান আল্লাহর গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ও উপকার নিহিত ছিল। যেমন অবাধ্যতার প্রায়শ্চিত্ত ও বাধা না মানার দুর্বিপাক সম্পর্কে মুসলিম জাতিকে সতর্ক করা, কারণ তীরন্দাযগণকে নিজ স্থানে জয় ও পরাজয় উভয় অবস্থাতেই স্থির থাকার জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাঁরা তার বিরুদ্ধাচরণ করে কেন্দ্র পরিত্যাগ করেছিল যার পরিণতি হিসেবে এ পরাজয়। একটি উদ্দেশ্য রাসূলগণের সুন্নাতের প্রকাশ করা, তাঁদেরকে প্রথমে বিপদে ফেলে শেষে বিজয়ী করা হয়। আর তাতে এ রহস্যও লুক্কায়িত আছে যে, যদি তাঁদেরকে বরাবর বিজয়ী করা হয়, তাহলে মুসলিম সমাজে এমন সব লোকের অনুপ্রবেশ ঘটবে যারা মু’মিন নয়। তখন সৎ ও অসৎ এর মধ্যে পার্থক্য করা সম্ভব হবে না। আর যদি বরাবর পরাজয়ের পর পরাজয়ের সম্মুখীন হতো তাহলে নাবী প্রেরণের উদ্দেশ্যই সফল হবে না। কাজেই আকাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য পূরণের জন্য জয় পরাজয় দুটিরই প্রয়োজন আছে যাতে সৎ ও অসৎ এর মধ্যে পার্থক্য হয়ে যায়। কারণ মুনাফিক্বদের কপটতা মুসলিমগণের নিকট গোপন ছিল। যখন এ ঘটনা সংঘটিত হল তখন মুনাফিক্বগণ কথা ও কর্মে প্রকাশ করে দিল। আর মুসলিমগণ জানতে পারল যে, তাঁদের মধ্যেই নিজেদের শত্রু বর্তমান। কাজেই মুসলিমগণ তাদের মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত ও সতর্ক হলেন।
একটা উদ্দেশ্য বা রহস্য এটাও ছিল যে, কোন কোন ক্ষেত্রে সাহায্য আসতে বিলম্ব ঘটলে নম্রতার সৃষ্টি হয় ও আত্ম-অহংকার নিঃশেষ হয়ে যায়। কাজেই পরীক্ষায় পড়ে যখন মুসলিমগণ বিপন্ন হয়ে পড়লেন তখন তাঁরা ধৈর্য্য অবলম্বন করলেন আর মুনাফিক্বগণ হা-হুতাশ আরম্ভ করে দিল।
একটা উদ্দেশ্য এটাও ছিল যে, আল্লাহ তা‘আলা বিশ্বাসীগণের জন্য পুরস্কারের ক্ষেত্রে এমন অনেক মর্যাদা (জান্নাত) তৈরি করেছেন, যেখানে তাঁদের আমল দ্বারা পৌঁছা সম্ভব নয়। কাজেই বিপদ ও পরীক্ষার মধ্যে এমন অনেক উপায় নিহিত রেখেছেন যদ্দ্বারা তাঁরা সেই সব মর্যাদায় পৌঁছতে পারেন।
আর একটা হিকমত বা রহস্য ছিল, শাহাদত লাভ আওলিয়া কিরামের সর্বাপেক্ষা বড় পদমর্যাদা। কাজেই এ পদমর্যাআ তাঁদের জন্য সরবরাহ করে দেয়া হয়েছিল।
আরও একটি রহস্য নিহিত ছিল যে, আল্লাহ তা‘আলা নিজ শত্রুদেরকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন। কাজেই তাদের ধ্বংসের ব্যবস্থা করেন। অর্থাৎ কুফরী, অত্যাচার ও আল্লাহর ওলীগণকে কষ্ট দেওয়াতে সীমাতিরিক্ত অবাধ্যতা (করার পরিণতিতে) ঈমানদারগণকে গোনাহ হতে পাক ও পরিচ্ছন্ন করলেন ও বিধর্মী কাফিরগণকে ধ্বংস ও নিঃশেষ করলেন।[2]
[2] ফাতহুল বারী ৭ম খন্ড ৩৪৭ পৃঃ।
উহুদের অপ্রত্যাশিত ও দুঃখজনক পরিস্থিতি মুসলিমগণের সুখ্যাতি ও শক্তি সামর্থ্যের উপর দারুণ প্রতিক্রিয়ার সূচনা করে। এতে তাঁদের মনোবলের জোয়ার ধারায় কিছুটা ভাটার সৃষ্টি হয়ে যায় এবং এর ফলে বিরুদ্ধবাদীগণের অন্তর থেকে ক্রমান্বয়ে মুসলিম ভীতি হ্রাস পেতে থাকে। এ প্রেক্ষাপটে মুসলিমগণের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সমস্যাদি বৃদ্ধি প্রাপ্ত হতে থাকে এবং বিভিন্ন দিক থেকে মদীনার উপর বিপদাপদ ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়ে যায়। ইহুদী, মুনাফিক্ব এবং বেদুঈনগণ প্রকাশ্য শত্রুতায় লিপ্ত হয় এবং মুসলিমগণকে অপমান করার জন্য প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। তাদের এ চক্রান্ত ও শত্রুদের উদ্দেশ্য ছিল এমনভাবে ইসলামের মূলোৎপাটন করে ফেলা যাতে কোনদিনই মুসলিমগণ আর মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। উহুদের পর দুই মাস অতিক্রান্ত হতে না হতেই এ লক্ষে বনু আসাদ গোত্র মদীনা আক্রমণের উদ্দেশ্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে।
অন্যদিকে চতুর্থ হিজরীর সফর মাসে ‘আযাল এবং ক্বারাহ গোত্র এমন এক চক্রান্তমূলক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে যার ফলে ১০ জন সাহাবীকে শাহাদতের পেয়ালা পান করতে হয়। অধিকন্তু, এ সফর মাসেই বনু ‘আমির প্রধান হীন চক্রান্ত ও শঠতার মাধ্যমে ৭০ জন সাহাবী (রাযি.)-কে শহীদ করে। এ ঘটনাকে ‘বীরে মাউনাহর ঘটনা’ বলা হয়। ঐ সময়ে বনু নাজিরও প্রকাশ্যে শত্রুতা আরম্ভ করে দেয়। এমনকি ৪র্থ হিজরীর রবিউল আওয়াল মাসে তারা নাবী কারীম (ﷺ)-কে হত্যার জন্যও চেষ্টা করে। এদিকে বনু গাতফানের সাহস এতই বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয় যে, চতুর্থ হিজরীর জমাদাল উলা মাসে মদীনা আক্রমণের সময়সূচি নির্ধারণ করে বসে।
মূল কথা হচ্ছে, উহুদ যুদ্ধে মুসলিমগণের যে মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়েছিল তারই প্রেক্ষাপটে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাদের একের পর এক নানা বিপদাপদের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। কিন্তু নাবী কারীম (ﷺ) তাঁর অসাধারণ প্রজ্ঞা প্রসূত পরিচালনার মাধ্যমে সকল প্রকার চক্রান্ত, শঠতা ও বৈরিতা অতিক্রম করে পুনরায় গৌরব ও মর্যাদার সু্উচ্চ আসনে মুসলিমগণকে প্রতিষ্ঠিত করতে পুরোপুরি সক্ষম হন। এ ব্যাপারে নাবী কারীম (ﷺ)-এর সর্ব প্রথম পদক্ষেপ ছিল হামরাউল আসাদ পর্যন্ত মুশরিকগণের পশ্চাদ্ধাবন করা। এ পদক্ষেপের ফলে নাবী কারীম (ﷺ)-এর সৈন্যদলের মর্যাদা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত ও স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
কারণ, এ পদক্ষেপ এতই গুরুত্ব ও বীরত্বপূর্ণ ছিল যে, এর ফলে প্রতিপক্ষগণ, অর্থাৎ মুশরিক, মুনাফিক্ব ও ইহুদীগণ একদম স্তম্ভিত ও হতবাক হয়ে যায়। অতঃপর রাসূলে কারীম (ﷺ) আরও এমন সব সামারিক পদক্ষেপ অবলম্বন করেছিলেন যা শুধু মুসলিমগণের হৃতগৌরব পুন: প্রতিষ্ঠায় সাহায্যই করে নি, বরং তার বৃদ্ধিপ্রাপ্তিতেও প্রভূত সাহায্য করেছিল। পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে এ বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করা হচ্ছে।
উহুদ যুদ্ধের পর সর্ব প্রথম মুসলিমগণের বিরুদ্ধাচরণ করে বনু আসাদ বিন খুযায়মাহ গোত্র। মদীনায় এ মর্মে খবর পৌঁছায় যে, খুওয়াইলিদের দু’ ছেলে ত্বালহাহ ও সালামাহ নিজদলের লোকজন এবং অনুসারীদের নিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উপর আক্রমণ পরিচালনার জন্য বনু আসাদকে আহবান জানাচ্ছে। এ সংবাদ অবগত হয়ে নাবী কারীম (ﷺ) অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে আনসার ও মুহাজিরদের সমন্বয়ে দেড় শত সৈন্যের এক বাহিনী গঠন করেন এবং আবূ সালামাহর হস্তে পতাকা প্রদান করে তাঁর নেতৃত্বাধীনে সেই বাহিনী প্রেরণ করেন। বনু আসাদের প্রস্তুতি গ্রহণের পূর্বেই আবূ সালামাহ (রাঃ) অতর্কিতভাবে তাদের আক্রমণ করেন, যার ফলে তারা হতচকিত হয়ে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে এবং পলায়ন করে। মুসলিম বাহিনী তাদের পরিত্যক্ত উট ও বকরীর পাল এবং প্রাপ্ত গণীমতের মালামালসহ নিরাপদে মদীনা ফিরে আসেন। এ অভিযানে মুসলিম বাহিনীকে মুখোমুখী সংঘর্ষে লিপ্ত হতে হয় নি।
এ অভিযান সংঘটিত হয়েছিল চতুর্থ হিজরী মুহাররম মাসের চাঁদ উদিত হওয়ার পর। এ অভিযান থেকে প্রত্যাবর্তনের পর আবূ সালামাহ (রাঃ)-এর উহুদ যুদ্ধে আহত হওয়ার কারণে প্রাপ্ত ব্যথা পুনরায় বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় এবং অল্প কালের মধ্যেই তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন।[1]