এরপর চতর্দিক হতে যুদ্ধের অগ্নিশিখা প্রজ্জ্বলিত হয়ে ওঠে এবং সারাটা ময়দানে ভীষণ যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। মুশরিকদের পতাকা প্রতিষ্ঠিত ছিল যুদ্ধক্ষেত্রের কেন্দ্রস্থলে। বনু আবদিদ্দার নিজেদের কমান্ডার ত্বালহাহ ইবনু আবী ত্বালহাহর হত্যার পর একের পর এক পতাকাধারণ করতে থাকে। কিন্তু তারা সবাই নিহত হয়। সর্বপ্রথম ত্বালহাহর ভাই উসমান ইবনু আবী ত্বালহাহ পতাকা উঠিয়ে নেন এবং নিম্নের ছন্দ পাঠ করতে করতে সম্মুখে অগ্রসর হয় :
إنَّ عَلٰى أهْل اللوَاء حقــاً ** أن تُخْضَبَ الصَّعْدَة أو تَنْدَقَّا
অর্থ : ‘পতাকাধারীদের অবশ্য কর্তব্য হচ্ছে, তাদের পতাকা রক্তে রঞ্জিত হবে অথবা ছিঁড়ে যাবে।’
এ ব্যক্তিকে হামযাহ ইবনু আবদিল মুত্তালিব (রাঃ) আক্রমণ করেন এবং তাঁর কাঁধে এমন জোরে তরবারীর আঘাত করেন যে, ওটা তার হাতসহ কাঁধ কেটে দেয় এবং দেহ ভেদ করে নাভি পর্যন্ত পৌঁছে যায়, এমন কি ফুসফুসও দেখতে পাওয়া যায়।
এরপর আবূ সা‘দ ইবনু আবী ত্বালহাহ ঝান্ডা উঠিয়ে নেয়। তার উপর সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (রাঃ) তীর চালিয়ে দেন এবং ওটা ঠিক তার গলায় লেগে যায়, ফলে তার জিহবা বেরিয়ে আসে এবং তৎক্ষণাৎ সে মৃত্যুবরণ করে।
কিন্তু কোন কোন জীবনী লেখকের উক্তি হল, আবূ সা‘দ বাইরে বেরিয়ে এসে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ডাক দেয় এবং আলী (রাঃ) অগ্রসর হয়ে তার মোকাবালা করেন। উভয়ে একে অপরের উপর তরবারীর আঘাত করে। কিন্তুু আলী (রাঃ)-এর তরবারীর আঘাতে আবূ সা‘দ নিহত হয়।
এরপর মুসাফে‘ ইবনু ত্বালহাহ ইবনু আবী ত্বালহাহ পতাকা উঠিয়ে ধরে। কিন্তু আ’সিম ইবনু সা’বিত ইবনু আবী আফলাহ (রাঃ) তাঁকে তীর মেরে হত্যা করেন। তারপর তার ভাই কিলাব ইবনু ত্বালহাহ ইবনু আবী ত্বালহাহ ঝান্ডা তুলে ধরে। কিন্তু যুবাইর ইবনু ‘আউওয়াম (রাঃ) তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং তার প্রাণ নাশ করেন। অতঃপর ঐ দুজনের ভাই জিলাস ইবনু ত্বালহাহ ইবনু আবী ত্বালহাহ পতাকা উত্তোলন করে। কিন্তু ত্বালহাহ ইবনু উবাইদুল্লাহ (রাঃ) তীর মেরে তার জীবন শেষ করে দেন। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, আ’সিম ইবনু সাবিত ইবনু আবী আফলাহ (রাঃ) তীর মেরে তাকে খতম করে দেন।
এরা একই পরিবারের ছয় ব্যক্তি ছিল। অর্থাৎ সবাই আবূ ত্বালহাহ আব্দুল্লাহ ইবনু উসমান ইবনু আবদিদ্দারের পুত্র অথবা পৌত্র ছিল, যারা মুশরিকদের ঝান্ডার হিফাযত করতে গিয়ে মারা পড়ল। এরপর বনু আবদিদ্দার গোত্রের আরতাত ইবনু শুরাহবীল নামক আর একটি লোক পতাকা উঠিয়ে নেয়। কিন্তু আলী ইবনু আবূ ত্বালিব (রাঃ) এবং মতান্তরে হামযাহ ইবনু আবদিল মুত্তালিব (রাঃ) তাকে হত্যা করেন। অতঃপর শুরাইহ ইবনু ক্বারিয পতাকা তুলে ধরে। কিন্তু কুযমান তাতে হত্যা করে। কুযমান মুনাফিক্ব ছিল এবং ইসলামের পরিবর্তে গোত্রীয় মর্যাদা রক্ষার উত্তেজনায় যুদ্ধ করতে এসেছিল।
শুরাইহর পর আবূ যায়দ ‘আমর ইবনু আবদি মানাফ আবদারী পতাকা সামলিয়ে নেয়। কিন্তু তাকেও কুযমান হত্যা করে ফেলে। তারপর শুরাহবীল ইবনু হাশিম আবদারীর এক পুত্র ঝান্ডা উঠিয়ে নেয়। কিন্তু কুযমানের হাতে সেও মারা পড়ে।
বনু আবদিদ্দার গোত্রের এ দশ ব্যক্তি, যারা মুশরিকদের পতাকা উঠিয়েছিল, সবাই মারা গেল। এরপর গোত্রের কোন লোকই জীবিত থাকল না যে পতাকা উঠাতে পারে। কিন্তু ঐ সময় ‘সওয়াব’ নামক তাদের এক হাবসী গোলাম লাফিয়ে গিয়ে পতাকা উঠিয়ে নেয় এবং তার পূর্ববর্তী পতাকাবাহী মনিবদের চেয়েও বেশী বল বিক্রমে যুদ্ধ করে। শেষ পর্যন্ত এক এক করে তার হাত দ’ুটি কর্তিত হয়। কিন্তু এর পরেও সে পতাকা পড়তে দেয় নি। বরং নিজের হাঁটুর ভরে বসে বক্ষ ও কাঁধের সাহায্য পতাকা খাড়া করে রাখে। অবশেষে সে কুযমানের হাতে নিহত হয়। ঐ সময়েও সে বলছিল, ‘হে আল্লাহ! এখন তো আমি কোন ওযর বাকী রাখি নি!’ ঐ গোলাম অর্থাৎ সওয়াব নিহত হওয়ার পর পতাকা ভূমির উপর পড়ে যায় এবং ওটা উঠাতে পারে এমন কেউই বেঁচে রইল না। এ কারণে ওটা পড়েই রইল।
একদিকে মুশরিকদের পতাকা যুদ্ধের কেন্দ্রস্থলে প্রতিষ্ঠিত ছিল, অন্য দিকে যুদ্ধক্ষেত্রের অন্যান্য অংশসমূহেও কঠিন যুদ্ধ চলছিল। মুসলিমগণের সারিসমূহের উপর ঈমানের রূহ ছেয়ে ছিল। এ কারণে তারা মুশরিক ও কাফির সৈন্যদের উপর ঐ জলপ্লাবনের মতো ভেঙ্গে পড়ছিলেন যার সামনে কোন বাঁধ টিকে থাকে না। এ সময় মুসলিমরা ‘আমিত’, ‘আমিত’ (মেরে ফেল, মেরে ফেল) বলছিলেন এবং এ যুদ্ধে এটাই তাঁদের নিদর্শনের রীতি ছিল।
এদিকে আবূ দুজানাহ (রাঃ) তার লাল পাগড়ী বেঁধে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর তরবারী উঠিয়ে নেন এবং ওর হক আদায় করার দূঢ় সংকল্প গ্রহণ করেন ও যুদ্ধ করতে করতে বহু দূর পর্যন্ত ঢুকে পড়েন। যে মুশরিকের সাথেই তাঁর মোকাবালা হতো তাঁকেই তিনি হত্যা করে ফেলতেন। তিনি মুশরিকদের সারিগুলো উলট-পালট করে দেন।
যুবাইর ইবনু ‘আউওয়াম (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, ‘যখন আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট তরবারী চাই এবং তিনি আমাকে তা না দেন তখন আমার অন্তরে চোট লাগে। আমি মনে মনে চিন্তা করি যে, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ফুফু সাফিয়্যাহর পুত্র এবং একজন কুরাইশ। আমি তাঁর নিকট গিয়ে আবূ দুজানার (রাঃ) পূর্বেই তরবারী চাই।’
কিন্তু তিনি আমাকে তা না দিয়ে আবূ দুজানা (রাঃ)-কে দিয়ে দেন। এ জন্য আমি আল্লাহর নামে শপথ করি যে, আবূ দুজানা (রাঃ) তরবারী দ্বারা কী করেন তা আমি অবশ্যই দেখব। সুতরাং আমি তাঁর পিছনে পিছনে থাকতে লাগলাম। দেখি যে, তিনি তার লাল পাগড়ীটি বের করে মাথায় বেঁধে নিলেন। তাঁর এ কাজ দেখে আনসারগণ মন্তব্য করলেন, ‘আবূ দুজানা (রাঃ) মৃত্যুর পাগড়ী বেঁধেছেন।’ অতঃপর তিনি নিম্নের কবিতা বলতে বলতে যুদ্ধ ক্ষেত্রের দিকে অগ্রসর হলেন:
أنا الذي عاهـدني خليلي ** ونحـن بالسَّفْح لدى النَّخِيل
ألا أقوم الدَّهْرَ في الكَيول ** أضْرِبْ بسَيف الله والرسول
অর্থাৎ ‘আমি খেজুর বাগান প্রান্তে আমার বন্ধু রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট এ অঙ্গীকার করেছি যে, কখনই আমি সারির পিছনে থাকব না, (বরং সামনে অগ্রসর হয়ে) আল্লাহ এবং তার রাসূল (ﷺ)-এর তরবারী চালনা করব।’
এরপর তিনি যাকেই সামনে পেতেন তাকে হত্যা করে ফেলতেন। এ দিকে মুশরিকদের মধ্যেও একজন লোক ছিল যে আমাদের কোন আহতকে পেলেই তাকে শেষ করে ফেলত। এ দুজন ক্রমে ক্রমে নিকটবর্তী হতে যাচ্ছিল। আমি আল্লাহ তা‘আলার নিকট প্রার্থনা করলাম যে, যেন তাদের দুজনের মধ্যে সংঘর্ষ লেগে যায়। ঘটনা ক্রমে হলোও তাই। উভয়ে একে অপরের উপর আঘাত হানল। কিন্তু আবূ দুজানা (রাঃ) এ আক্রমণ ঢাল দ্বারা প্রতিরোধ করলেন এবং মুশরিকের তরবারী ঢালে আটকে থেকে গেল। এরপর তিনি ঐ মুশরিকের উপর তরবারীর আক্রমণ চালালেন এবং সেখানেই সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।[1]
এরপর আবূ দুজানাহ (রাঃ) মুশরিকদের সারিগুলো ছিন্ন-ভিন্ন করতে করতে সামনে এগিয়ে গেলেন এবং শেষ পর্যন্ত কুরাইশী নারীদের নেত্রী পর্যন্ত পৌঁছে গেলেন। কিন্তু সে যে নারী এটা তাঁর জানা ছিল না। তিনি স্বয়ং বর্ণনা করেছেন, ‘আমি একটি লোককে দেখলাম যে, সে খুব জোরে শোরে মুশরিক সেনাবাহিনীকে উত্তেজিত করছে। সুতরাং আমি তাকে আমার নিশানার মধ্যে নিয়ে ফেললাম। কিন্তু যখন আমি তাঁকে তরবারী দ্বারা আক্রমণ করার ইচ্ছা করলাম তখন সে হায়! হায়! চিৎকার করে উঠল। তখন আমি বুঝতে পারলাম যে, সে একজন মহিলা। আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর তরবারী দ্বারা একজন মহিলাকে হত্যা করে তা কলংকিত করলাম না।’
এ মহিলাটি ছিল হিন্দা বিনতু ‘উতবাহ। আমি আবূ দুজানা (রাঃ)-কে দেখলাম যে, তিনি হিন্দা বিনতু ‘উতবাহর মাথার মধ্যভাগে তরবারী উঁচু করে ধরলেন এবং পরক্ষণেই সরিয়ে নিলেন। আমি বললাম আল্লাহ এবং তার রাসূলই (ﷺ) ভাল জানেন।[2]
এদিকে হামযাহও (রাঃ) সিংহের ন্যায় বীর বিক্রমে যুদ্ধ করছিলেন এবং মধ্যভাগের সেনাবাহিনীর মধ্যে ঢুকে পড়ছিলেন। তাঁর সামনে মুশরিকদের বড় বড় বীর বাহাদুরেরা টিকতে পারছিল না। কিন্তু বড়ই আফসোসের কথা, এ ক্ষেত্রে তিনিও শাহাদত বরণ করেন। কিন্তু তাঁকে সামনা সামনি বীর পুরুষের মতো শহীদ করা হয় নি বরং কাপুরুষের মতো গুপ্তভাবে শহীদ করা হয়েছিল।
[2] ইবনু হিশাম, ২য় খন্ড ৬৯ পৃঃ।
হামযাহ (রাঃ)-এর ঘাতকের নাম ছিল ওয়াহশী ইবনু হারব। আমরা তার শাহাদতের ঘটনা ওয়াহশীর নিজের ভাষাতেই বর্ণনা করছি। সে বর্ণনা করেছে, ‘আমি জুবাইর ইবনু মুতইমের গোলাম ছিলাম। তার চাচা তুআইমাহ ইবনু আদী বদরের যুদ্ধে নিহত হয়েছিল। যখন কুরাইশরা উহুদের যুদ্ধে বের হয় তখন জুবাইর ইবনু মুত‘ইম আমাকে বলে, ‘তুমি যদি মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর চাচা হামযাহ (রাঃ)-কে আমার চাচার বিনিময়ে হত্যা কর তবে তোমাকে আযাদ করে দেয়া হবে।’ তার এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে আমিও লোকদের সাথে রওয়ানা হয়ে যাই। আমি ছিলাম একজন হাবশী লোক এবং হাবশীদের মতো বর্শা নিক্ষেপের কাজে আমি খুব পারদর্শী ছিলাম। আমার বর্শা লক্ষ্যভ্রষ্ট হতো খুবই কম। লোকদের মধ্যে যুদ্ধ যখন চরমে পৌঁছে তখন আমি বের হয়ে হামযাহ (রাঃ)-কে খুঁজতে লাগলাম। অবশেষে আমি তাঁকে লোকদের মাঝে দেখতে পাই। তাঁকে ছায়া রং-এর উট বলে মনে হচ্ছিল। তিনি লোকদেরকে ছত্রভঙ্গ করে চলছিলেন।
আল্লাহর শপথ! আমি তাঁকে হত্যা করার প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলাম এবং একটি বৃক্ষ অথবা একটি পাথরের আড়ালে লুকিয়ে থেকে আমার নিকটে তাঁর আসার প্রতীক্ষা করছিলাম, ইতোমধ্যে সিবা’ ইবনু আবদিল উযযা আমার আগে গিয়ে তাঁর নিকট পৌঁছে যায়। তিনি তাকে উচ্চৈঃস্বরে ডাক দিয়ে বলেন, ‘ওরে লজ্জাস্থানের চামড়া কর্তনকারীর পুত্র, মজা দেখ।’ এ কথা বলেই তিনি এত জোরে তাকে তরবারীর আঘাত করেন যে, তার মাথা দেহচ্যুত হয়ে যায়।
এর সাথে সাথেই আমি বর্শা উঠিয়ে নেই এবং যখন তিনি আমার আওতার মধ্যে এসে পড়েন তখন আমি তাঁর দিকে ওটা ছুঁড়ে দেই এবং ওটা তাঁর নাভির নীচে লেগে যায় এবং পদদ্বয়ের মধ্যভাগ দিয়ে পার হয়ে যায়। তিনি আমার দিকে ধাওয়া করার ইচ্ছা করেন, কিন্তু অসমর্থ হন। আমি তাঁকে ঐ অবস্থায় ছেড়ে দেই। শেষ পর্যন্ত তিনি ইহকাল ত্যাগ করেন। এরপর আমি তাঁর মৃত দেহের নিকট গিয়ে বর্শা বের করে দেই এবং সৈন্যদের মধ্যে গিয়ে বসে পড়ি। (আমার কাজ সমাপ্ত হয়েছিল) তিনি ছাড়া আর কারো সাথে আমার কোন সম্বন্ধ ছিল না। আমি শুধু আযাদ হওয়ার জন্যেই তাঁকে হত্যা করেছিলাম। সুতরাং আমি মক্কায় ফিরে গেলে আমাকে আযাদ করে দেয়া হয়।[1]
আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর সিংহ হামযাহ (রাঃ)-এর শাহাদতের ফলে মুসলিমগণের অপূরণীয় ক্ষতি হয়, কিন্তু তা সত্ত্বেও যুদ্ধে মুসলিমগণেরই পাল্লা ভারী থাকে। আবূ বাকর (রাঃ), উমার (রাঃ), আলী (রাঃ), যুবাইর (রাঃ), মুসআব ইবনু উমায়ের (রাঃ), ত্বালহাহ ইবনু উবাইদুল্লাহ (রাঃ), আব্দুল্লাহ ইবনু জাহশ (রাঃ), সা‘দ ইবনু মু’আয (রাঃ), সা‘দ ইবনু উবাদাহ (রাঃ), সা‘দ ইবনু রাবী (রাঃ), নযর ইবনু আনাস (রাঃ), প্রভৃতি মহান ব্যক্তিবর্গ এমন বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন যে, মুশরিকরা হতোদ্যম ও নিরুৎসাহ হয়ে পড়ে এবং তাদের দেহের শক্তি হ্রাস পায়।
এদিকে আর এক দৃশ্য চোখে পড়ে। উপর্যুক্ত আত্মত্যাগীদের মধ্যে আর একজন হচ্ছেন হানযালাতুল গাসীল (রাঃ), যিনি এক অদ্ভূত মাহাত্ম্য নিয়ে যুদ্ধ ক্ষেত্রে উপস্থিত হয়েছিলেন। তিন ঐ আবূ আমির রাহিবের পুত্র, যে পরবর্তী কালে ফাসিক নামে প্রসিদ্ধ হয় এবং যার বর্ণনা ইতোপূর্বে উল্লেখিত হয়েছে। হানযালা (রাঃ) নব বিবাহিত ছিলেন। যখন যুদ্ধে গমনের জন্য ঘোষণা দেয়া হয় তখন তিনি নববধূকে আলিঙ্গন করছিলেন। যুদ্ধের ঘোষণা শোনা মাত্রই তিনি নববধূর বক্ষ ছেড়ে দিয়ে জিহাদের জন্যে বেরিয়ে পড়েন। যখন উহুদ প্রান্তরে ভীষণ যুদ্ধ চলছে তখন তিনি মুশরিকদের সারিগুলো ভেদ করে তাদের সেনাপতি আবূ সুফইয়ান পর্যন্ত পৌঁছে গেলেন এবং তাকে প্রায় ধরাশায়ী করতেই যাচ্ছিলেন। কিন্তু মহান আল্লাহ তাঁর ভাগ্যেই শাহাদত লিখে রেখেছিলেন। তাই যেমনই তিনি আবূ সুফইয়ানকে লক্ষ্য করে তরবারী উঁচু করে ধরেছেন, তেমনই শাদ্দাদ ইবনু আউস তাঁকে দেখে ফেলে এবং তৎক্ষণাৎ তাঁকে আক্রমণ করে। ফলে তিনি নিজেই শহীদ হয়ে গেলেন।
জাবালে রুমতের উপর যে তীরন্দাযদেরকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মোতায়েন করেছিলেন তাঁরাও যুদ্ধের গতি মুসলিমগণের অনুকূলে আনবার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মক্কার ঘোড়সওয়াররা খালিদ ইবনু ওয়ালীদের নেতৃত্বে এবং আবূ আমির ফাসিকের সহায়তায় মুসলিম সৈনিকদের বাম বাহু ভেঙ্গে দেয়ার জন্যে তিন বার ভীষণ আক্রমণ চালায়। কিন্তু মুসলিম তীরন্দাযগণ তীর নিক্ষেপের মাধ্যমে তাদেরকে এমনভাবে ঘায়েল করে দেন যে তাদের তিনটি আক্রমণই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।[1]
কিছুক্ষণ ধরে এরূপ ভীষণ যুদ্ধ চলতে থাকে এবং মুসলিমগণের ক্ষুদ্র বাহিনী যুদ্ধে পূর্ণভাবে আধিপত্য বিস্তার করে থাকে। অবশেষে মুশরিকদের মনোবল ভেঙ্গে পড়ে। তাদের সারিগুলো ডান, বাম, সম্মুখ ও পিছন দিক হতে ছত্রভঙ্গ হতে থাকে। মনে হচ্ছিল যেন তিন হাজার মুশরিককে সাতশ নয়, বরং ত্রিশ হাজার মুসলিমগণের সাথে মোকাবালা করতে হচ্ছে। আর এদিকে মুসলিমরা ঈমান, বিশ্বাস এবং বীরত্বের অত্যন্ত উঁচুমানের মনোবল নিয়ে তরবারী চালনা করছিলেন।
কুরাইশরা যখন মুসলিমগণের একাধিকবার আক্রমণ প্রতিহত করার জন্যে তাদের সর্বশক্তি প্রয়োগ করা সত্ত্বেও অক্ষমতা অনুভব করল এবং তাদের মনোবল এমনভাবে ভেঙ্গে পড়ল যে, সওয়াবের হত্যার পর কারো সাহস হল না যে, যুদ্ধ চালু রাখার জন্যে তাদের ভূপতিত পতাকার নিকটবর্তী হয়ে ওটাকে উঁচু করে ধরে, তখন তারা পালিয়ে যাবার পন্থা অবলম্বন করল এবং মুসলিমগণের উপর হতে প্রতিশোধ গ্রহণের কথা সম্পূর্ণরূপে ভুলে গেল।
ইবনু ইসহাক্ব বলেন যে, আল্লাহ তা‘আলা মুসলিমগণের উপর স্বীয় সাহায্য নাযিল করেন এবং তাঁদের সাথে কৃত ওয়াদা পুর্ণ করেন। মুসলিমরা মুশরিকদেরকে তরবারী দ্বারা এমনভাবে কর্তন করতে লাগলেন যে, তারা শিবির থেকেও পালিয়ে গেল এবং নিঃসন্দেহে তাদের পরাজয় ঘটে গেল।
আব্দুল্লাহ ইবনু যুবাইর (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, তাঁর পিতা বলেছেন, ‘আল্লাহর শপথ আমি দেখি যে, হিন্দা বিনতু ‘উতবাহ এবং তার সঙ্গিনীদের পদনালী দেখা যাচ্ছে। তারা কাপড় উপরে উঠিয়ে নিয়ে পলায়ন করছে। তাদের গ্রেফতারীতে কম বেশী কোনই প্রতিবন্ধকতা ছিল না।[1]
সহীহুল বুখারীতে বারা‘ ইবনু আ’যিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘মুশরিকদের সাথে আমাদের মোকাবালা হলে তাদের মধ্যে পলায়নের হিড়িক পড়ে যায়, এমনকি আমি নারীদেরকে দেখি যে, তারা পায়ের গোছা হতে কাপড় উঠিয়ে নিয়ে দ্রুত বেগে পালিয়ে যাচ্ছে। তাদের পায়ের অলংকার দেখা যাচ্ছিল।’[2]
আর এ সুযোগে মুসলিমরা মুশরিকদের উপর তরবারী চালাতে চালাতে ও তাদের পরিত্যক্ত মাল জমা করতে করতে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করছিলেন।’
[2] সহীহুল বুখারী ২য় খন্ড ৫৭৯ পৃঃ।
তীরন্দাযবাহিনী এতক্ষণ পর্বতমূলে অবস্থান গ্রহণ ক’রে নিজেদের কর্তব্য পালন করে আসছিলেন। কিন্তু এ আশাতীত জয়ের উল্লাসে এখন তাঁরা আত্মবিস্মৃত হয়ে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে তাঁদেরকে যে কোন অবস্থায় তাঁদের স্থান ত্যাগ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছিলেন তা তাঁরা সম্পূর্ণরূপে ভুলে গিয়ে গণীমত সংগ্রহের জন্য সমরক্ষেত্রের দিক ছুটে যেতে লাগলেন। সে জন্য যুদ্ধের চেহারা বদলে গেল। মুসলিমগণ ভীষণভাবে ক্ষতির স্বীকার হলেন, স্বয়ং নাবী (ﷺ) শহীদ হতে বেঁচে গেলেন!! আর এ কারণেই মুসলিম ভীতি যেটা বদর যুদ্ধের পরিণামে মুশরিকদের হৃদয়ে ঢুকে পড়েছিল সেটা অনেকটা দূরভীত হতে লাগল। তার মূল কারণ হচ্ছে দুনিয়া প্রীতি, গণীমতের মালের লোভ। সুতরাং সে সময় তারা এক অপরকে বলছিল, গণীমত.......! গণীমত.......! তোমাদের সঙ্গীগণ জিতে গেছেন........ আর অপেক্ষা কিসের? তাঁদের নায়ক আব্দুল্লাহ ইবনু যুবাইর (রাঃ) তাঁদেরকে নিবারিত করার জন্যে যথাসাধ্য চেষ্টা করলেন। তিনি তাঁদেরকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কঠোর নিষেধের কথা স্মরণ করে দিলেন। কিন্তু তাঁর অধীনস্থ সৈনিকগণ সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে বলতে লাগলেন, ‘এখন আমাদের সম্পূর্ণ জয় হয়েছে, সুতরাং এখন আর এখানে বসে থাকব কিসের জন্য?’[1] এ কথা বলে তাঁদের অধিকাংশ সৈনিকই স্থান ত্যাগ করে ময়দানের দিকে ছুটে গেলেন। আব্দুল্লাহ (রাঃ) মাত্র নয়জন লোককে নিয়ে ঐ স্থানে বসে রইলেন। যারা নিজ দায়িত্ব পালনে অটল থাকলেন যে, হয় তাঁদের প্রস্থানের অনুমতি দেওয়া হবে অন্যথা তাঁরা আমৃত্যু সেখানে অবস্থান করবেন।
এরূপ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কঠোর আদেশ এবং সেনাপতির নিষেধ অমান্য করার ফলও ফলতে শুরু হল। আরবের বিখ্যাত বীর এবং রণকুশলী সেনাপতি খালিদ ইবনু ওয়ালীদ ঘোড়সওয়ার সেনাদল নিয়ে চারদিকে চক্রাকারে সুযোগের সন্ধান করে বেড়াচ্ছিল। সে আর কালবিলম্ব না করে সেই অরক্ষিত পথের দিকে নক্ষত্রবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল এবং দেখতে দেখতে পশ্চাদদিক দিয়ে মুসলিমগণের মাথার উপর এসে উপস্থিত হ’ল। শ্রেষ্ঠবীর আব্দুল্লাহ তাঁর সহচর কয়েকজনকে নিয়ে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আদেশ পালন করে চললেন। কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যে তাঁরা সবাই শাহাদত বরণ করলেন। এদিকে মুসলিম সৈন্যরা নির্ভাবনায় গণীমতের মাল সংগ্রহ করতে ব্যাপৃত আছেন। এমন সময় প্রথমে খালিদের ঘোড়সওয়ার সেনাদল এবং তার পর অন্যান্য ঘোড়সওয়ার ও পদাতিক সেনাদল অতর্কিত অবস্থায় তাদেরকে ভীষণভাবে আক্রমণ করল এবং সতর্ক হবার আগেই বহু মুসলিমকে কুরাইশদের হাতে নিহত হতে হল। কুরাইশদের জাতীয় পতাকা এতক্ষণ মাটিতে গড়াগড়ি যাচ্ছিল। খালিদের এ আক্রমণ এবং মুসলিমগণের উপস্থিত সংকটাপন্ন অবস্থা দেখে আমরাহ বিনতু আলকামা নামে জনৈকা কুরাইশ বীরাঙ্গনা আবার তা তুলে ধরল। সম্পূর্ণ পরাজয়ের পর ভূলুণ্ঠিত জাতীয় পতাকাকে পুনরায় যুদ্ধ ক্ষেত্রে উড্ডীয়মান হতে দেখে ছুটে বিক্ষিপ্ত ও পলায়নপর কুরাইশ সৈন্যগণ আবার সেই পতাকার দিকে ছুটে আসল এবং তারা আবার দলবদ্ধভাবে মুসলিমগণকে আক্রমণ করল। এবার মুসলিমরা অগ্রপশ্চাৎ দু’ দিক হতে আক্রান্ত হয়ে যাঁতার মধ্যস্থলে পড়লে যে অবস্থা হয় তাই হল।
এ সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মাত্র নয়জন[1] সাহাবীসহ পিছনে রয়ে গিয়েছিলেন[2] এবং মুসলিমগণের শৌর্যবীর্য ও মুশরিকদের শোচনীয় অবস্থার দৃশ্য অবলোকন করছিলেন। এমন সময় হঠাৎ খালিদ ইবনু ওয়ালীদের ঘোড়সওয়ার সৈন্যগণ তাঁর দৃষ্টি গোচর হয়। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সামনে দু’টি পথ ছিল। আর তা হচ্ছে, হয় তিনি তাঁর নয় জন সহচরসহ দ্রুত গতিতে পলায়ন করে কোন এক সুরক্ষিত স্থানে চলে যেতেন এবং স্বীয় সেনা বাহিনীকে যারা ভিড়ের মধ্যে পড়ে যেতে চাচ্ছিলেন, তাদের ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিতেন, নয়তো নিজের জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে স্বীয় সাহাবীদেরকে ডাক দিতেন এবং এক নির্ভরযোগ্য সংখ্যক সাহাবাকে নিজের কাছে একত্রিত করে তাদের মাধ্যমে অবরোধ ভেঙ্গে দিয়ে নিজের সেনাবাহিনীর জন্যে উহুদ পাহাড়ের উপরিভাগের দিকে চলে যাওয়ার পথ করে দিতেন। এ চরম সংকটময় মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর তুলনাবিহীন বীরত্ব প্রকাশিত হয়েছে। কেননা তিনি নিজের জীবন রক্ষা করে পালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে নিজের জীবনকে বিপদের মুখে নিক্ষেপ করে সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-এর জীবন রক্ষা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
তাই তো তিনি খালিদ ইবনু ওয়ালীদের ঘোড়সওয়ার সৈন্যদেরকে দেখা মাত্রই উচ্চেঃস্বরে স্বীয় সাহাবীদেরকে ডাক দেন, ‘ওরে আল্লাহর বান্দারা এদিকে..........।’ অথচ তিনি জানতেন যে, তাঁর ঐ শব্দ মুসলিমগণের পূর্বে মুশরিকদেরই কানে পৌঁছবে। আর হলোও তাই। যেমন দেখা গেল যে, তাঁর ঐ আওয়াজ শুনে মুশরিকরা অবগত হল যে, এ মুহূর্তে তাঁর অবস্থান কোথায় রয়েছে। যার ফলে তাদের একটি বাহিনী মুসলিমগণের পূর্বেই তাঁর নিকটে এসে পড়ে এবং বাকী ঘোড়সওয়াররা দ্রুততার সাথে মুসলিমগণকে ঘিরে ফেলতে শুরু করে। এখন দুটি ভিড়ের বিস্তারিত বিবরণ পৃথক পৃথকভাবে উল্লেখ করছি।
[2] এর দলীল আললাহ পাকের এ এরশাদ {وَالرَّسُولُ يَدْعُوكُمْ فِي أُخْرَاكُمْ } (১৫৩) سورة آل عمران ‘এবং রাসূল (সাঃ) তোমাদেরকে তোমাদের পিছন হতে আহবান করছিলেন।’’