আর-রাহীকুল মাখতূম আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী (রহঃ) ৪৩৪ টি
আর-রাহীকুল মাখতূম আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী (রহঃ) ৪৩৪ টি

আব্দুর রহমান বিন আওফ হতে বর্ণিত আছে যে, ‘বদরের যুদ্ধের দিন আমি সৈন্যদের সারিতে ছিলাম। এমতাবস্থায় হঠাৎ ডানে এবং বামে অল্প বয়স্ক দুজন যুবককে দেখতে পেলাম। তাদের উপস্থিতিতে আমি নিজেকে নিরাপদ মনে করতে পারলাম না। এমন অবস্থায় ওদের একজন তার সঙ্গীকে এড়িয়ে আমার কাছে এসে বলল। ‘চাচাজান আবূ জাহল কোনটি, আমাকে দেখিয়ে দিন।’

আমি বললাম, ‘ভাতিজা, তাকে তোমার কী প্রয়োজন।’ সে বলল, ‘আমাকে বলা হয়েছে যে, সে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে মন্দ বলেছে। সেই সত্ত্বার কসম! যার হাতে রয়েছে আমার জীবন, যদি আমি তাকে দেখতে পাই তাহলে যতক্ষণ আমাদের মধ্যে যার মৃত্যু পূর্বে অবধারিত হয়েছে সে মৃত্যুবরণ না করবে ততক্ষণ আমার অস্তিত্ব তার অস্তিত্ব থেকে পৃথক হবে না।’

তিনি বলেছেন যে, ‘আমি তার এ কথায় একদম অভিভূত হয়ে পড়লাম।’

তিনি আরও বলেছেন যে, ‘দ্বিতীয় জনও এসে ইঙ্গিতে আমাকে ঐ একই কথাই বলল। তারপর আমি প্রত্যক্ষ করলাম যে, আবূ জাহল লোকজনদের মাঝে চক্কর দিয়ে বেড়াচ্ছে। আমি তাদের উদ্দেশ্যে বললাম আরে দেখছ না, ঐ যে, তোমাদের শিকার যার সম্পর্কে তোমরা আমাকে জিজ্ঞাসা করছিলে।’

তিনি বর্ণনা করেছেন যে, ‘এ কথা শোনা মাত্র তারা উভয়ে তরবারী নিয়ে লাফ দিয়ে এগিয়ে চলল এবং সেই কুখ্যাত নরাধমকে হত্যা করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট প্রত্যাবর্তন করল।’

নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, ‘তোমাদের উভয়ের মধ্যে কে তাকে হত্যা করেছ?’

তারা উভয়েই বলল, ‘আমি হত্যা করেছি।’

নাবী কারীম (ﷺ) পুনরায় বললেন, ‘তোমরা কি নিজ নিজ তরবারী মুছে ফেলেছ?’

তারা বলল, ‘না’’।

তারপর নাবী কারীম (ﷺ) উভয়ের তরবারী দেখলেন এবং বললেন, ‘তোমরা উভয়েই তাকে হত্যা করেছ।’

অবশ্য আবূ জাহলের সামান অর্থাৎ জিনিসপত্রগুলো তিনি মু’আয বিন ‘আমর বিন জামুহকে প্রদান করেন। আবূ জাহলের এ দু’হত্যাকারীর নাম হল, (১) মু’আয বিন ‘আমর বিন জামুহ এবং (২) মু’আয বিন আফরা-।[1]

ইবনে ইসহাক্ব বর্ণনা করেছেন যে, মু’আয বিন ‘আমর বিন জামুহ বলেছেন, ‘আমি মুশরিকদিগকে আবূ জাহল সম্পর্কে বলতে শুনলাম যে, সে ঘন গাছগুলোর মতো বর্শা ও তরবারীর ভিড়ের মধ্যে ছিল। তারা একথাও বলছিল যে, আবুল হাকাম পর্যন্ত কেউ পৌঁছতে পারবে না।’

মু’আয বিন ‘আমর আরও বলেছেন যে, ‘যখন আমি একথা শুনলাম তখন তাকে আমার লক্ষ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে নিলাম এবং তার প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ করে রাখলাম। তারপর যখন সুযোগ পেয়ে গেলাম তখনই আক্রমণ করে বসলাম এবং এমনভাবে আঘাত করলাম যে, তার পা দ্বিখন্ডিত হয়ে খুলে পড়ে গেল। আল্লাহর কসম! যখন তার পায়ের অর্ধাংশ খুলে পড়ে গেল তখন আমি তার সাদৃশ্য শুধু ঐ ফলের বীচি দ্বারা বর্ণনা করতে পারি যা হাতুড়ির সাহায্যে আলগা করা হয় এবং এর এক অংশ থেকে অন্য অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

তিনি আরও বর্ণনা করেছেন যে, ‘এদিকে আমি যখন আবূ জাহলকে আঘাত করলাম অন্য দিকে তখন তার ছেলে ইকরামা আমার কাঁধে তরবারীর আঘাত করল এবং তাতে আমার হাত কেটে গিয়ে চামড়ার সঙ্গে ঝুলে গেল এবং যুদ্ধের জন্য প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াল। আমি সেটি পিছনে টেনে নিয়ে সাধারণভাবে যুদ্ধ করতে থাকলাম। কিন্তু সে যখন আমাকে খুবই কষ্ট দিতে লাগল তখন আমি তার উপর আমার পা রেখে জোরে টান দিয়ে তাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললাম।[2]

এরপর আবূ জাহলের নিকট পৌঁছে যান মু’আয বিন আফরা। তিনি তাকে এত জোরে আঘাত করেন যে, তার ফলে সে সেখানেই স্ত্তপে পরিণত হয়ে যায়। সে সময় শুধু তার শ্বাস-প্রশ্বাসটুকু অবশিষ্ট ছিল। এরপর মু’আয বিন আফরা যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়ে যান।

যখন যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘কে আছ এমন যে, দেখে আসবে আবূ জাহলের অবস্থা কি হল। এ কথা শুনে সাহাবীগণ (রাঃ) তার খোঁজে বিক্ষিপ্তভাবে নানাদিকে চলে গেলেন। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) তাকে এমন অবস্থায় পেলেন যে, তখনো তার শ্বাস-প্রশ্বাস যাওয়া আসা করছিল। তিনি তার গ্রীবার উপর পা রেখে মাথা কেটে নেয়ার জন্য দাড়ি ধরলেন এবং বললেন, ‘ওহে আল্লাহর শত্রু! শেষে আল্লাহ তোমাকে এভাবে অপমানিত করলেন? সে বলল, ‘আমাকে কী প্রকারে লাঞ্ছিত করলেন?’ যে ব্যক্তিকে তোমরা হত্যা করছো তার চেয়ে উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন লোক কেউ আছে কি? অথবা যে লোকটিকে তোমরা হত্যা করছো তার চেয়ে উঁচু সম্মানের কোন লোক আছে কি?’ তারপর সে বলল, ‘যদি আমাকে কৃষকরা ছাড়া অন্য কেউ হত্যা করত তবে কতই না ভাল হতো!’ তারপর সে বলল, ‘আচ্ছা, আমাকে বলত আজ বিজয় লাভ কার হয়েছে?’ আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) উত্তরে বললেন, ‘আল্লাহ এবং তার রাসূল (ﷺ)-এর।’ তারপর সে আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ)-কে বলল- যিনি তার গ্রীবার উপর পা রেখেছিলেন- হে বকরীর রাখাল! তুমি বড় উঁচু ও কঠিন জায়গায় চড়ে গিয়েছো। প্রকাশ থাকে যে, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) মক্কায় বকরী চরাতেন।

এ কথোপকথনের পর আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) তার মস্তক কেটে নিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খিদমতে নিয়ে গিয়ে হাজির করে দিলেন এবং আরয করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এটা আল্লাহর শত্রু আবূ জাহলের মস্তক।’ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তিনবার বললেন,

‏‏(‏اللهُ الَّذِيْ لَا إِلٰهَ إِلَّا هُوَ‏؟‏‏)‏

‘‘সত্যিই, ঐ আল্লাহর শপথ যিনি ছাড়া অন্য কোন মা’বূদ নেই।’ তারপর বললেন,

‏‏(‏اللهُ أَكْبَرُ، الحَمْدُ لِلهِ الَّذِيْ صَدَقَ وَعْدَهُ، وَنَصَرَ عَبْدَهُ، وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ، اِنْطَلَقَ أُرْنِيَهُ‏)

অর্থঃ আল্লাহ সবচেয়ে মহান। ঐ আল্লাহর সমুদয় প্রশংসা যিনি তাঁর ওয়াদাকে সত্য প্রমাণিত করেছেন। স্বীয় বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং একাই সমস্ত দলকে পরাজিত করেছেন।’

এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘চলো আমাকে তার মৃত দেহ দেখাও।’ (আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, ‘আমি তাঁকে নিয়ে গিয়ে তার মৃতদেহ দেখালাম। তিনি বললেন, ‘ঐ ব্যক্তি এ উম্মতের ফিরাউন।’

[1] সহীহুল বুখারী ১/৪৪৪ পৃঃ, ২/৫৬৮ পৃঃ, মিশকাত ২/৩৫২ পৃঃ, অন্য বর্ণনায় দ্বিতীয় নাম মোআওয়ায বিন আফরা বলা হয়েছে। ইবনে হিশাম ১ম খন্ড ৬৩৫ পৃঃ, আবূ জাহলের জিনিসপত্র এক জনকে এ কারণে দেয়া হয়েছিল যে, পরে মু’আয (মুআওয়ায) সেই যুদ্ধেই শহীদ হয়েছিলেন। তবে আবূ জাহলের তরবারী আব্দুল্লাহ বিন মাসউদকে দেয়া হয়েছিল। কারণ, সেই তার মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিলেন। দ্রঃ সুনানে আবূ দাউদ, বাবু মান আজাযা আলা জীবীহিন ২য় খন্ড ৩৭৩ পৃঃ।

[2] মু’আয বিন আমর বিন জামুহ উসমান (রাঃ)-এর খিলাফত পর্যন্ত জীবিত ছিলেন।
ঈমানের উজ্জ্বলতায় গৌরবোজ্জ্বল চিত্রাবলী (مِنْ رَوَائِعِ الْإِيْمَانِ فِيْ هٰذِهِ الْمَعْرِكَةِ):

উমায়ের ইবনু হাম্মাম (রাঃ) এবং আউফ ইবনু হারিস ইবনু আফরা’র (রাঃ) ঈমান দীপ্ত চরিত কথার বিষয়াবলী ইতোপূর্বে বর্ণিত হয়েছে। প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে এ যুদ্ধে পদে পদে এমন সব দৃশ্য দৃষ্টিগোচর হয়েছে যেগুলোতে ঈমানী শক্তি ও মৌলিক নীতিমালার পরিপক্কতা সুস্পষ্ট ও সমুজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। এ যুদ্ধে পিতা ও পুত্র এবং ভাই ও ভাইয়ের মধ্যে দল বিভাগ বা শ্রেণীবিন্যাস হয়েছে, আর মূল নীতির ব্যাপারে মতানৈক্যের কারণে তরবারী কোষমুক্ত হয়েছে। এভাবে অত্যাচারিত ব্যক্তিও অত্যাচারীর উপর আঘাত হেনে ক্রোধাগ্নি প্রশমিত করেছে। পরবর্তী আলোচানা থেকে এর যথার্থতা প্রমাণিত হবে।

১. ইবনু ইসহাক্ব ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নাবী কারীম (ﷺ) সাহাবীগণ (রাঃ)-কে বলেন,

‏‏(‏إِنِّيْ قَدْ عَرَفْتُ أَنَّ رَجُالًا مِنْ بَنِيْ هَاشِمٍ وَغَيْرِهِمْ قَدْ أَخْرَجُوْا كُرْهًا، لَا حَاجَةَ لَهُمْ بِقِتَالِنَا، فَمَنْ لَقِىْ أَحَدًا مِنْ بَنِيْ هَاشِمٍ فَلَا يَقْتُلْهُ، وَمَنْ لَقِىَ أَبَا الْبَخْتَرِيِّ بْنِ هِشَامٍ فَلَا يَقْتُلْهُ، وَمَنْ لَقِىْ الْعَبَّاسَ بْنَ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَلَا يَقْتُلْهُ، فَإِنَّهُ إِنَّمَا أُخْرِجَ مُسْتَكْرَهًا‏)

‘আমি জানি যে, বনু হাশিম এবং আরও কোন কোন গোত্রের কতগুলো লোককে জোর করে যুদ্ধ ক্ষেত্রে আনয়ন করা হয়েছে। আমাদের যুদ্ধের সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই। সুতরাং বনু হাশিমের কোন লোক কারো তরবারীর সামনে পড়ে গেলে সে যেন তাকে হত্যা না করে। আবুল বাখতারী বিন হিশাম কারো সামনে এসে পড়লে তাকে যেন সে হত্যা না করে। আর আব্বাস ইবনু আব্দুল মুত্তালিব কারো সামনে পড়ে গেলে তাকেও যেন হত্যা করা না হয়। কেননা তাকে জোর করে এ যুদ্ধে নিয়ে আসা হয়েছে।’

এ কথা শুনে ‘উতবাহর পুত্র আবূ হুযাইফা (রাঃ) বললেন, ‘আমরা কি আমাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা ও আত্মীয়স্বজনকে হত্যা করব, আর আব্বাস (রাঃ)-কে ছেড়ে দিব? আল্লাহর কসম! যদি তিনি আমার সামনে পড়ে যান তবে আমি তাকে তরবারীর লাগাম পরিয়ে দিব। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট এ খবর পৌঁছলে তিনি উমার ইবনু খাত্তাব (রাঃ)-কে বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর চাচার চেহারার উপর কি তরবারীর আঘাত করা হবে?’ উত্তরে উমার (রাঃ) বলেন, ‘আমাকে ছেড়ে দিন, আমি তরবারী দ্বারা এ ব্যক্তির গর্দান উড়িয়ে দেই। কেননা, এ ব্যক্তি মুনাফিক্ব হয়ে গেছে।’

পরবর্তীকালে আবূ হুযাইফা (রাঃ) বলতেন, ‘ঐ দিন আমি যে কথা বলে ফেলেছিলাম তার কারণে আমি কোন সময় মনে শান্তি পাই না। এ ব্যাপারে বরাবরই আমার মনে ভয় থেকে যায়। এটা হতে মুক্ত হওয়ার একটি মাত্র উপায় হলো আমার শাহাদতের মাধ্যমে এর কাফ্ফারা হয়ে যাওয়া।’ অবশেষে ইয়ামামার যুদ্ধে তিনি শহীদ হয়ে যান।

২. আবুল বাখতারীকে হত্যা করতে নিষেধ করার কারণ ছিল এ ব্যক্তি মক্কায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে কষ্ট দেয়া হতে সবচেয়ে বেশী বিরত থেকে ছিল। সে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে কোন প্রকারের কষ্ট দিত না এবং তার পক্ষ হতে তিনি কখনো কোন অপছন্দনীয় কথা শোনেননি। আর এ ব্যক্তি ঐ লোকদের একজন ছিল যারা বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবের বয়কট পত্রটি ছিঁড়ে ফেলেছিল।

কিন্তু তা সত্ত্বেও আবুল বাখতারী শেষে নিহতই হয়েছিল। ঘটনাটি হল মুজাযযার ইবনু যিয়াদ বালাভী (রাঃ)-এর সাথে তার লড়াই হয়। তার সাথে তার অন্য এক সঙ্গীও ছিল। দুজন এক সাথে যুদ্ধ করছিল। মুজাযযার (রাঃ) তাকে বলেন, ‘হে আবুল বাখতারী! আপনাকে হত্যা করতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদেরকে নিষেধ করেছেন।’ সে বলে ‘আমার সাথীকেও কি?’ মুজাযযার (রাঃ) উত্তরে বলেন, ‘না, আল্লাহর কসম! আপনার সাথীকে আমরা ছেড়ে দিতে পারি না।’ সে তখন বলল, ‘আল্লাহর কসম! তাহলে আমি এবং সে দুজনই মরবো।’ এরপর দুজনই যুদ্ধ শুরু করে দেয়। মুজাযযার (রাঃ) বাধ্য হয়ে তাকেও হত্যা করেন।

৩. মক্কায় জাহেলিয়াত যুগে আব্দুর রহমান ইবনু আউফ (রাঃ) ও উমাইয়া ইবনু খালফের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধুত্ব ছিল। বদর যুদ্ধের দিন উমাইয়া ইবনু খালফ তার ছেলে আলীর হাত ধরে দাঁড়িয়েছিল। এমন সময় আব্দুর রহমান ইবনু আউফ (রাঃ) সেখান দিয়ে গমন করেন। তিনি শত্রুর নিকট হতে কিছু লৌহ বর্ম ছিনিয়ে নিয়ে তা উটের পিঠে বোঝাই করে নিয়ে যাচ্ছিলেন। উমাইয়া তাঁকে দেখে বলে, ‘তুমি আমার কোন প্রয়োজন বোধ কর কি? আমি তোমার এ লৌহ বর্মগুলো হতে উত্তম। আজকের মতো দৃশ্য আমি কোন দিন দেখিনি। তোমার দুধের কি প্রয়োজন নেই।’ সে একথা দ্বারা বুঝাতে চেয়েছিল যে, আমাকে বন্দী করবে তাকে মুক্তি পণ হিসেবে বহু দুগ্ধবতী উট প্রদান করব।’

তার এ কথা শুনে আব্দুর রহমান ইবনু আউফ (রাঃ) লৌহবর্মগুলো ফেলে দিয়ে পিতা-পুত্র দুজনকে গ্রেফতার করে সামনে অগ্রসর হলেন।

আব্দুর রহমান (রাঃ) বলেন, ‘আমি উমাইয়া এবং তার পুত্রের মাঝে হয়ে চলছিলাম এমতাবস্থায় উমাইয়া আমাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি কে ছিল যে তার বক্ষে উটপাখির পালক লাগিয়ে রেখে ছিল।’ আমি উত্তরে বললাম উনি ছিলেন হামযাহ ইবনু আব্দুল মুত্তালিব (রাঃ)। সে তখন বলল এ সেই ব্যক্তি যে আমাদের মধ্যে ধ্বংস রচনা করে রেখেছিল।’

আব্দুর রহমান (রাঃ) বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি দুজনকে নিয়ে চলছিলাম অকস্মাৎ বিলাল (রাঃ) উমাইয়াকে আমার সাথে চলতে দেখে নেন। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, এ উমাইয়া মক্কায় বিলাল (রাঃ)-এর উপর অমানুষিক উৎপীড়ন করেছিল। বিলাল (রাঃ) বললেন, ‘এ হচ্ছে কাফিরদের নেতা উমাইয়া ইবনু খালফ । হয় আমি বাঁচবো না হয় সে বাঁচবে। আমি বললাম, হে বিলাল (রাঃ) এটা হচ্ছে আমার বন্দী। তিনি আবার বললেন, এখন দুনিয়াতে হয় আমি থাকবো, না হয় সে থাকবে।’ তারপর তিনি অত্যন্ত উচ্চৈঃস্বরে ডাক দিয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহর আনসারগণ! এ হচ্ছে কুফর নেতা উমাইয়া ইবনু খালফ। এখন হয় আমি থাকবো, অথবা সে থাকবে। আব্দুর রহমান (রাঃ) বললেন, ‘ইতোমধ্যে জনগণ আমাদেরকে কংকণের মতো বেষ্টনীর মধ্যে নিয়ে নিল। আমি তাকে বাঁচাবার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু একটি লোক তার পুত্রের পায়ে তরবারীর আঘাত হেনে দিলো। আর সাথে সাথে সে পড়ে গেল। ও দিকে উমাইয়া এত জোরে চিৎকার করল যে, এরূপ চিৎকার আমি কখনই শুনিনি। আমি বললাম, ‘পালিয়ে যাও। কিন্তু আজ পালাবার কোন উপায় নেই। আল্লাহর কসম! আজ আমি তোমার কোন উপকার করতে পারবো না।’ আব্দুর রহমান (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, জনগণ তরবারী দ্বারা তাদের দুজনকে কেটে ফেলে তাদের জীবন লীলা শেষ করে দেয়। এরপর আব্দুর রহমান (রাঃ) বলতেন, ‘আল্লাহ বিলালের উপর রহম করুন। আমার লৌহবর্মও গেল এবং আমার বন্দীর ব্যাপারে আমাকে ব্যাকুলও হতে হলো।’

ইমাম বুখারী (রহ.) আব্দুর রহমান বিন ‘আওফ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, উমাইয়াহ বিন খালফ এ মর্মে আমার সাথে একটি চুক্তিপত্র লিখেছিল যে, সে মক্কায় আমার পরিবার-পরিজনকে হেফাজত করবে আর আমি মদীনায় তার পরিবার-পরিজনকে হেফাজত করবো। অতঃপর বদর যুদ্ধের দিন মানুষেরা ঘুমিয়ে পড়ার পর পাহাড়ের দিকে গেলাম তাকে হেফাজ করার জন্য। কিন্তু পথিমধ্যে বিলাল দেখে ফেলে। অতঃপর আনসারদের দলে গিয়ে এ বলে ঘোষণা দেয় যে,হয় আমি মরব, অথবা উমাইয়া বিন খালাফ মরবে। এরপর বিলালের সাথে আনসারদের এক দল যোদ্ধা আমাদেরকে নিকেট আসতে থাকে। আমি যখন এ আশঙ্কা করলাম যে লোকেরা আমাদের ধরে ফেলবে তখন আমি উমাইয়ার ছেলেকে আমার পেছনে নিয়ে নিলাম যাতে তারা তাকে হত্যা করতে না পারে। কিন্তু লোকেরা তাকে হত্যা করে ফেলল। আর তার পিতার শরীর খুব ভারী ছিল। লোকেরা আমার কাছে পৌছলে আমি উমাইয়া ইবনু খালফকে বললাম, ‘তুমি হাঁটুর ভরে বসে পড়।’ সে বসে গেল এবং আমি তার উপর চড়ে বসলেন। কিন্তু লোকেরা নীচ দিয়ে তরবারী মেরে উমাইয়াকে হত্যা করল।

কোন একটি তরবারীর আঘাতে আব্দুর রহমান ইবনু আউফ (রাঃ)-এর পা আহত হয়েছিল।[1] আবদুর রহমান পরবর্তীতে তার পায়ের সেই আঘাতের চিহ্ন দেখিয়েছেন।

৪. উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) তার মামা আস ইবনু হিশাম ইবনু মুগীরাহকে হত্যা করেন। সেদিন আত্মীয় সম্পর্কের প্রতি ভ্রুক্ষেপই করেননি। কিন্তু মদীনায় ফিরে আসার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)’র চাচা ‘আব্বাসকে বললেন, (সে সময় ‘আব্বাস বন্দী ছিলেন) হে ‘আব্বাস! আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন। আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমার পিতা খাত্তাব ইসলাম গ্রহণের চেয়ে আপনার ইসলাম গ্রহণটা অধিক প্রিয়। অধিকন্তু আপনার ইসলাম গ্রহণের ফলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যার পরই না খুশি হতেন।

৫. আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ) স্বীয় পুত্র আব্দুর রহমানকে ডাক দিয়ে বলেছিলেন যখন সে মুশরিকদের পক্ষে যুদ্ধ করেছিল ‘ওরে দুরাচার আমার মাল কোথায়’’? আব্দুর রহমান উত্তরে বলেছিল :

لَمْ يَبْقَ غَيْرُ شَكَّةٍ ويَعْبُوْب ** وصَارِمٍ يَقْتُلُ ضُلاَّل الشِّيَبْ

অর্থাৎ অস্ত্র, শস্ত্র, দ্রুতগামী অশ্ব এবং ঐ তরবারী ছাড়া কিছুই বাকী নেই যা বার্ধক্যের ভ্রষ্টতার সমাপ্তি ঘটিয়ে থাকে।

৬. যখন মুসলিমরা মুশরিকদেরকে গ্রেফতার করতে শুরু করেন তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ছাউনীর মধ্যে অবস্থান করছিলেন এবং সা‘দ ইবনু মু’আয (রাঃ) তরবারী হাতে দরজার উপর পাহারা দিচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) লক্ষ্য করলেন যে, সা‘দ (রাঃ)-এর চেহারায় মুসলিমদের এ কার্যকলাপ অপছন্দনীয় হওয়ার লক্ষণ প্রকাশিত হচ্ছে। তাই, তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে সা‘দ (রাঃ), আল্লাহর কসম! বুঝা যাচেছ যে, মুসলিমদের এ কার্যকলাপ তোমার পছন্দ হচ্ছে না, তাই নয় কি? সা‘দ (রাঃ) উত্তরে বললেন, ‘জ্বী হ্যাঁ’’, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম! মুশরিকদের সাথে এটাই প্রথম যুদ্ধ, যার সুযোগ আল্লাহ তা‘আলা আমাদের দান করেছেন। সুতরাং মুশরিকদেরকে ছেড়ে দেয়ার পরিবর্তে অধিক সংখ্যায় হত্যা করে ফেলাই আমার নিকট বেশী পছন্দনীয়।’

৭. এ যুদ্ধে উকাশাহ ইবনু মুহসিন আসাদী (রাঃ)-এর তরবারী ভেঙ্গে যায়। তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খিদমতে হাযির হলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে কাঠের একটা ভাঙ্গা থাম্বা প্রদান করেন এবং বলেন ‘উকাশাহ (রাঃ) তুমি এটা দ্বারাই যুদ্ধ কর’। উকাশাহ (রাঃ) ওটা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট হতে নিয়ে নড়ানো মাত্রই একটা লম্বা, শক্ত সাদা চকচকে তরবারীতে পরিবর্তিত হয়। তারপর তিনি ওটা দ্বারাই যুদ্ধ করেন এবং শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলা মুসলিমগণকে বিজয় দান করেন। ঐ তরবারীখানা স্থায়ীভাবে উকাশাহ (রাঃ)-এর কাছেই থাকে এবং তিনি ওটাকে বিভিন্ন যুদ্ধে ব্যবহার করেন। অবশেষে আবূ বাকর (রাঃ)-এর খিলাফতকালে ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে তিনি শহীদ হন। ঐ সময়েও ঐ তরবারীটি তার কাছেই ছিল।

৮. যুদ্ধ শেষে মুসআ’ব ইবনু উমায়ের আবদারী (রাঃ) তার ভাই আবূ উযায়ের ইবনু উমায়ের আবদারীর পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন। আবূ উযায়ের মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল এবং ঐ সময় একজন আনসারী সাহাবী তাঁর হাত বাঁধছিলেন। মুসআব (রাঃ) ঐ আনসারীকে বললেন ‘এ ব্যক্তির মাধ্যমে আপনি আপনার হাতকে দৃঢ় করুন। এর মা খুবই ধনবতী মহিলা। অবশ্যই সে আপনাকে উত্তম মুক্তিপণ দিবে।’ একথা শুনে আবূ উযায়ের তার ভাই মুসআ’ব (রাঃ)-কে বলল, ‘আমার ব্যাপারে তোমার উপদেশ এটাই?’ মুসআ’ব (রাঃ) উত্তরে বললেন, ‘হ্যাঁ, তোমার পরিবর্তে এ আনসারই আমার ভাই।’

৯. মুশরিকদের মৃতদেহগুলোকে যখন কূপে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেয়া হলো এবং ‘উতবাহ ইবনু রাবীআহকে কূপের দিকে হেঁচড়িয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হলো তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার পুত্র আবূ হুযাইফা (রাঃ)-এর চেহারার প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন। তখন দেখলেন যে, তিনি দুঃখিত হয়েছেন এবং তার চেহারা পরিবর্তিত হয়েছে। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আবূ হুযাইফাহ, নিশ্চয়ই তোমার পিতার এ অবস্থা দেখে তোমার অন্তরে কিছু অনুভূতি জেগেছে, তাই না?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আল্লাহর শপথ! আমার পিতার ব্যাপারে এবং তার হত্যার ব্যাপারে আমার অন্তরে একটুও শিহরণ উঠেনি। তবে অবশ্যই আমার পিতা সম্পর্কে আমি জানতাম যে, তার মধ্যে বিবেক, বুদ্ধি, দূরদর্শিতা ও ভদ্রতা রয়েছে। এ জন্য আমি আশা করতাম যে, এ গুণাবলী তাকে ইসলাম পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিবে। কিন্তু এখন তার পরিণাম দেখে এবং আমার আশার বিপরীত কুফরের উপর তার জীবনের সমাপ্তি দেখে আমি দুঃখিত হয়েছি। তাঁর এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর মঙ্গলের জন্যে দুআ করলেন এবং তার সাথে উত্তমরূপে বাক্যালাপ করলেন।

[1] যা’দুল মায়া’দ ২য় খন্ড ৮৯ পৃঃ। সহীহুল বুখারীর ১ম খন্ড ১০৮ পৃঃ। কিতাবুল অকালাহ এর মধ্যে এ ঘটনাটি কিছু বেশী আংশিক ব্যাখ্যা সহ বর্ণিত হয়েছে।
উভয় দলের নিহত ব্যক্তিবর্গ (قَتْلَى الْفَرِيْقَيْنِ):

এ যুদ্ধ মুশরিকদের প্রকাশ্য পরাজয় এবং মুসলিমদের সুস্পষ্ট বিজয়ের উপর সমাপ্ত হয়। এতে চৌদ্দজন মুসলিম শহীদ হন, ছয় জন মুহাজির এবং আট জন আনসার। কিন্তু মুশরিকরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের সত্তর জন নিহত এবং সত্তর জন বন্দী হয়। এদের অধিকাংশই ছিল নেতৃস্থানীয় লোক।

যুদ্ধ শেষে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিহতদের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘তোমরা তোমাদের নাবী (ﷺ)-এর কতই না নিকৃষ্ট গোষ্ঠী ও গোত্র ছিলে। তোমরা আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছ। তোমরা আমাকে বন্ধুহীন ও সহায়কহীনরূপে ছেড়ে দিয়েছো যখন অন্যরা আমার পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। তোমরা আমাকে বের করে দিয়েছ, যখন অন্যরা আমাকে আশ্রয় দিয়েছে।’ এরপর তাঁর নির্দেশক্রমে তাদের টেনে হেঁচড়ে বদরের একটি কূপে নিক্ষেপ করা হয়।

আবূ ত্বালহাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নাবী (ﷺ)-এর আদেশক্রমে বদরের দিন কুরাইশদের চবিবশ জন বড় বড় নেতার মৃত দেহ বদরের একটি নোংরা কূপে নিক্ষেপ করা হয়।

তাঁর নিয়ম ছিল যখন তিনি কোন কাওমের উপর বিজয় লাভ করতেন তখন তিন দিন পর্যন্ত যুদ্ধ ক্ষেত্রেই অবস্থান করতেন। সুতরাং যখন বদরে তৃতীয় দিবস সূচিত হল তখন তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী তাঁর সওয়ারীর উপর হাওদা উঠিয়ে দেয়া হলো। তারপর তিনি পদব্রজে চলতে থাকলেন এবং তাঁর পিছনে পিছনে তাঁর সাহাবীগণও চললেন। অবশেষে তিনি কূপের ধারে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং তাদেরকে তাদের নাম ধরে ও তাদের পিতাদের নাম ধরে ডাকতে শুরু করলেন। (তিনি বললেন) হে অমুকের পুত্র অমুক, হে অমুকের পুত্র অমুক! তোমরা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর আনুগত্য করতে এটা কি তোমাদের জন্য খুশীর বিষয় হতো না। কেননা, আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আমরা তো তা সত্য পেয়েছি। আর তোমাদের প্রতিপালক তোমাদেরকে যা কিছু বলেছিলেন তা তোমরা সত্যরূপে পেয়েছ কি?’ উমার (রাঃ) তখন আরয করলেন ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আপনি এমন দেহসমূহের সঙ্গে কথা বলছেন যে গুলোর আত্মা নেই, ব্যাপার কী?’ নাবী (ﷺ) উত্তরে বললেন, ‘যে সত্ত্বার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! আমি যা কিছু বলছি তা এদের চেয়ে বেশী তোমরা শুনতে পাওনা।’ রেওয়াইয়াতে রয়েছে যে, নাবী (ﷺ) বলেন, ‘তোমরা এদের চেয়ে বেশী শুনতে পাওনা। কিন্তু এরা উত্তর দিতে পারে না।[1]

[1] সহীহুল বুখারী ও সহীহুল মুসলিম। মিশকাত, ২য় খন্ড ৩৪৫ পৃঃ।
মক্কায় পরাজয়ের খবর (مَكَّةُ تَتَلَقّٰى نَبَأَ الْهَزِيَمْةِ):

মুশরিকরা বদর প্রান্তর হতে বিশৃঙ্খল, ছত্রভঙ্গ ও ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় মক্কামুখী হয়। শরম ও সংকোচের কারণে তাদের ধারণায় আসছিল না যে, কিভাবে তারা মক্কায় প্রবেশ লাভ করবে।

ইবনু ইসহাক্ব বলেন যে, যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম কুরাইশদের পরাজয়ের সংবাদ বহন করে মক্কায় পৌঁছেছিল, সে হলো হাইসামান ইবনু আব্দুল্লাহ কুযায়ী। জনগণ তাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘যুদ্ধের খবর কী?’ সে উত্তরে বলল, ‘‘উতবাহ ইবনু রাবীআহ, শায়বাহ ইবনু রাবীআহ, আবুল হাকাম ইবনু হিশাম, উমাইয়া ইবনু খালফসহ আরো কিছু সংখ্যক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে যারা সবাই নিহত হয়েছে। সে যখন নিহতদের তালিকায় সম্ভ্রান্ত কুরাইশদের নাম উল্লেখ করতে শুরু করল তখন হাতীমের উপর উপবিষ্ট সাফওয়ান ইবনু উমাইয়া বলল, ‘আল্লাহর কসম! যদি তার স্বাভাবিক জ্ঞান থেকে থাকে তবে তাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস কর?’ জনগণ তখন তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা বলত সাফওয়ান ইবনু উমাইয়ার কী হয়েছে?’ সে উত্তরে বলল ‘ঐ দেখ, সে হাতীমে উপবিষ্ট রয়েছে। আল্লাহর কসম! তার পিতা ও ভ্রাতাকে নিহত হতে স্বয়ং আমিই দেখেছি।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ)’র আযাদকৃত দাস আবূ রাফি (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ ‘আমি ঐ সময় আব্বাস (রাঃ)-এর গোলাম ছিলাম। আমাদের বাড়িতে ইসলাম প্রবেশ করেছিল। আব্বাস (রাঃ) মুসলিম হয়েছিলেন, উম্মুল ফযল (রাঃ) মুসলিম হয়েছিলেন এবং আমিও মুসলিম হয়েছিলাম। তবে অবশ্যই আব্বাস (রাঃ) তার ইসলাম গোপন রেখেছিলেন। এদিকে আবূ লাহাব বদর যুদ্ধে হাযির হয়নি। যখন কুরাইশদের পরাজয়ের খবর তার কানে পৌঁছল তখন লজ্জায় ও অপমানে তার মুখ কালো হয়ে গেল। পক্ষান্তরে আমরা নিজেদের মধ্যে শক্তি ও সম্মান অনুভব করলাম। আমি দুর্বল মানুষ ছিলাম, তীর বানাতাম এবং যমযম কক্ষে বসে তীরের হাতল ছিলতাম। আল্লাহর কসম! ঐ সময় আমি কক্ষে বসে তীর ছিলছিলাম। উম্মুল ফযল (রাঃ) আমার পাশেই বসেছিলেন এবং যে খবর এসেছিল তাতে আমরা খুশী ও আনন্দিত ছিলাম। ইতোমধ্যে আবূ লাহাব জঘন্যভাবে তার পদদ্বয় টেনে টেনে আমাদের কাছে এসে কক্ষপ্রান্তে বসে পড়লো। তার পৃষ্ঠ আমার পৃষ্ঠের দিকে ছিল। হঠাৎ গোলমাল শোনা গেল, ‘আবূ সুফইয়ান ইবনু হারিস ইবনু আব্দুল মুত্তালিব এসে গেছে।’ আবূ লাহাব তাকে বলল, ‘হে আমার প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্র। আমার কাছে এসো। আমার জীবনের শপথ! তোমার নিকট হতে খবর পাওয়া যাবে।’ তিনি আবূ লাহাবের কাছে বসে পড়লেন। জনগণ দাঁড়িয়ে ছিল। আবূ লাহাব বলল, লোকদের কী অবস্থা? ‘বল ভাতিজা, যুদ্ধের খবর কী?’ তিনি উত্তরে বললেন, ‘কিছুই নয়, এটুকুই বলা যথেষ্ট যে, লোকদের মুসলিমদের সাথে মোকাবেলা হয়েছে এবং আমরা আমাদের কাঁধগুলো তাদেরকে সোপর্দ করেছি। তারা আমাদের ইচ্ছামত হত্যা করেছে এবং বন্দী করেছে। তা সত্ত্বেও আমি আমাদের লোকদেরকে তিরষ্কার করতে পারি না। প্রকৃতপক্ষে আমাদের মোকাবালা এমন কতিপয় লোকের সঙ্গে হয়েছিল যারা আসমান ও জমিনের মধ্যস্থানে সাদাকালো মিশ্রিত ঘোড়ার উপর সওয়ার ছিল। আল্লাহর শপথ! না তারা কোন কিছু ছেড়ে দিচ্ছিল, না কোন জিনিস তাদের মোকাবালায় টিকতে পারছিল।’

আবূ রাফি (রাঃ) বলেন, আমি স্বীয় হাত দ্বারা তাঁবুর প্রান্ত উঠালাম, তারপর বললাম, ‘আল্লাহর শপথ! তারা ছিলেন ফিরিশতা’। আমার এ কথা শুনে আবূ লাহাব তার হাত উঠিয়ে ভীষণ জোরে আমার গালে এক চড় লাগিয়ে দিল। আমি তখন তার সাথে লড়ে গেলাম। কিন্তু সে আমাকে উঠিয়ে মাটিতে ফেলে দিল। তারপর আমার উপর হাঁটুর ভরে বসে আমাকে প্রহার করতে লাগল। আমি দুর্বল প্রমাণিত হলাম। কিন্তু ইতোমধ্যে উম্মুল ফযল উঠে তাঁবুর একটি খুঁটি নিয়ে তাকে এমনভাবে মারলেন যে, তার মাথায় ভীষণভাবে আঘাত লাগল। আর সাথে সাথে উম্মুল ফযল (রাঃ) বলে উঠলেন, ‘তার মনিব নেই বলে তাকে দুর্বল মনে করছো। আবূ লাহাব তখন লজ্জিত হয়ে উঠে চলে গেল। এরপর আল্লাহর কসম! মাত্র সাত দিন অতিবাহিত হয়েছে এরই মধ্যে আল্লাহর হুকুমে সে আদাস নামক কঠিন পীড়ায় আক্রান্ত হলো এবং এতেই তার জীবনলীলা শেষ হয়ে গেল। আদাসার ফোড়াকে আরবরা বড়ই কুলক্ষণ মনে করত। তাই, তার মৃত্যুর পর তার পুত্ররা তার গোর-কাফন না করে তিন দিন পর্যন্ত তাকে উপরেই রেখে দেয়। কেউই তার নিকটে গেল না এবং তার দাফন-কাফনের ব্যবস্থাও করলনা। অবশেষে যখন তার পুত্ররা আশঙ্কা করল যে, তাকে এভাবে রেখে দিলে জনগণ তাদেরকে তিরস্কার করবে তখন তারা একটি গর্ত খনন করে ঐ গর্তের মধ্যে তার মৃত দেহকে কাঠ দ্বারা ঢেকে ফেলে দিল এবং দূর থেকেই ঐ গর্তের মধ্যে পাথর নিক্ষেপ করে তাকে ঢেকে ফেললো।

মোট কথা, এভাবে মক্কাবাসীগণ তাদের লোকদের সুস্পষ্ট পরাজয়ের খবর পেলো এবং তাদের স্বভাবের উপর এর অত্যন্ত খারাপ প্রতিক্রিয়া হলো। এমনকি তারা নিহতদের উপর বিলাপ করতে নিষেধ করে দিল যাতে মুসলিমরা তাদের দুঃখে আনন্দিত হওয়ার সুযোগ না পায়।

এ ব্যাপারে একটি চিত্তাকর্ষক ঘটনা রয়েছে। তা হচ্ছে বদরের যুদ্ধে আসওয়াদ ইবনু আব্দুল মুত্তালিবের তিনটি পুত্র মারা যায়। তাদের জন্য সে কাঁদতে চাচ্ছিল। সে ছিল অন্ধ লোক। একদা রাত্রে সে এক বিলাপকারিণী মহিলার বিলাপের শব্দ শুনতে পেল। তৎক্ষণাৎ সে তার গোলামকে বলল ‘তুমি গিয়ে দেখ তো, বিলাপ করার কি অনুমতি পাওয়া গেছে? কুরাইশরা কি নিহতদের জন্য ক্রন্দন করছে? তাহলে আমিও আমার পুত্র আবূ হাকিমের জন্য ক্রন্দন করব। কেননা, আমার বুক জ্বলে যাচ্ছে।’ গোলাম ফিরে এসে খবর দিল ‘মহিলাটি তো তার এক হারানো উটের জন্য ক্রন্দন করছে।’ এ কথা শুনে আসওয়াদ নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না। আবেগে সে নিম্নের বিলাপ পূর্ণ কবিতাটি বলে ফেললোঃ

أتبكي أن يضل لها بـعـير ** ويمنعها من النوم السهود

فلا تبكي على بكر ولكـن ** على بدر تقاصرت الجدود

على بدر سراة بني هصيص ** ومخزوم ورهط أبي الوليد

وبكى إن بكيت على عقيل ** وبكى حارثا أسد الأسود

وبكيهم ولا تسمى جميعـا ** وما لأبي حكيمة من نديد

ألا قد ساد بعدهـم رجال ** ولولا يوم بدر لم يسودوا

অর্থঃ ‘তার উট হারিয়ে গেছে এজন্যে কি সে কাঁদছে? আর ওর জন্যে অনিদ্রা কি তার নিদ্রাকে হারাম করে দিয়েছে। (হে মহিলা) তুমি উটের জন্যে ক্রন্দন করো না, বরং বদরের (নিহতদের) জন্যে ক্রন্দন করো, যেখানে ভাগ্য বিপর্যয় ঘটে গেছে। হ্যাঁ, হ্যাঁ, বদরের (বেদনাদায়ক ঘটনার) জন্যে ক্রন্দন করো যেখানে বনু হাসীস, বনু মাখযূম, আবুল ওয়ালীদ প্রভৃতি গোত্রের অসাধারণ ব্যক্তিবর্গ (সমাধিস্থ) রয়েছে। যদি ক্রন্দন করতেই হয় তবে আকীলের জন্যে ক্রন্দন করো এবং হারিসের জন্যে ক্রন্দন করো যারা ছিল সিংহদের সিংহ। তুমি ঐ লোকদের জন্যে ক্রন্দন করো এবং সবার নাম নিও না। আর আবূ হাকীমার তো কোন সমকক্ষই ছিল না। দেখ ওদের পরে এমন লোকেরা নেতা হয়ে গেছে যে, ওরা থাকলে এরা নেতা হতে পারত না।’

মদীনায় বিজয়ের শুভ সংবাদ (المَدِيْنَةُ تَتَلَقّٰى أَنْبَاءَ النَّصْرِ):

এদিকে মুসলিমদের বিজয় পূর্ণতায় পৌঁছে গেলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মদীনাবাসীকে অতি শীঘ্র শুভ সংবাদ দেয়ার জন্যে দুজন দূতকে প্রেরণ করেন। একজন আব্দুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা (রাঃ) যাকে মদীনার উচ্চ ভূমি অঞ্চলের অধিবাসীদের নিকট প্রেরণ করা হয় এবং অপর জন যায়দ ইবনু হারিসাহ (রাঃ) যাকে মদীনার নিম্নভূমি অঞ্চলের অধিবাসীদের নিকট পাঠানো হয়।

ঐ সময়ে ইয়াহুদী ও মুনফিকরা এ গুজব রটিয়ে দিয়েছিল। যে মুসলিমরা পরাজিত হয়েছে। এমন কি এ গুজবও তারা রটিয়েছিল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে হত্যা করা হয়েছে। সুতরাং একজন মুনাফিক্ব যখন যায়দ ইবনু হারিস (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উষ্ট্র কাসওয়ার উপর সাওয়ার হয়ে আসতে দেখলো তখন বলে উঠল ‘সত্যিই মুহাম্মাদ (ﷺ) নিহত হয়েছেন। দেখ, এটা তো তারই উট। আমরা এটাকে চিনি। আর এ ব্যক্তি যায়দ ইবনু হারিসাহ (রাঃ) পরাজিত হয়ে পালিয়ে এসেছে এবং সে এত ভীত সন্ত্রস্ত হয়েছে যে, কী বলবে তা বুঝতে পারছে না।’ মোট কথা, যখন দুজন দূত মদীনায় পৌঁছলেন তখন মুসলিমরা তাদেরকে ঘিরে নেন এবং তাদের মুখে বিস্তারিত খবর শুনতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত তাদের দৃঢ় বিশ্বাস হয় যে, মুসলিমরা বিজয় লাভ করেছেন। এরপর চতুর্দিকে আনন্দের ঢেউ উথলে ওঠে এবং মদীনার আকাশ-বাতাস তাকবীর ধ্বনিতে মুখরিত হতে থাকে। যে সব মর্যাদাসম্পন্ন নেতৃস্থানীয় সাহাবী মদীনাতেই রয়ে গিয়েছিলেন তাঁরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে এ প্রকাশ্য বিজয়ের মুবারকবাদ জানাবার জন্যে বদরের রাস্তার উপর বেরিয়ে পড়েন।

উসামাহ ইবনু যায়দ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, ‘আমাদের নিকট এ সুসংবাদ ঐ সময় পৌঁছে যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কন্যা ও উসমান (রাঃ)-এর সহধর্মিনী রুকাইয়া (রাঃ)-কে দাফন করে মাটি বরাবর করা হয়েছিল। তাঁর শুশ্রূষার জন্যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে উসমান (রাঃ)-এর সাথে মদীনায় রেখে গিয়েছিলেন।

মুসলিম সেনাবাহিনী মদীনার পথে (الجَيْشُ النَّبَوِيْ يَتَحَرَّكُ نَحْوَ الْمَدِيْنَةِ):

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যুদ্ধ শেষে তিন দিন বদরে অবস্থান করেন এবং তখনও তিনি যুদ্ধক্ষেত্র হতে যাত্রা শুরু করেননি এর মধ্যেই গণীমতের মাল নিয়ে সৈন্যদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয় এবং এ মতভেদ চরম সীমায় পৌঁছে যায়। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নির্দেশ দেন যে, যার কাছে যা আছে তা যেন সে তাঁর কাছে জমা দেয়। সাহাবীগণ (রাঃ) তাঁর এ নির্দেশ পালন করেন এবং এরপর আল্লাহ তা‘আলা ওহীর মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করে দেন।

উবাদাহ ইবনু সামিত (রাঃ) বর্ণনা করেছেনঃ ‘আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে মদীনা হতে যাত্রা শুরু করে বদর প্রান্তরে উপনীত হলাম। লোকদের (মুশরিকদের) সাথে আমাদের যুদ্ধ হলো এবং আল্লাহ তা‘আলা শত্রুদেরকে পরাজিত করলেন। তারপর আমাদের মধ্যে একটি দল তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল এবং তাদেরকে ধরতে ও হত্যা করতে লাগল। আর একটি দল গণীমতের মাল লুট করতে ও জমা করতে থাকল। অন্য একটি দল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে চতুর্দিকে থেকে পরিবেষ্টন করে থাকলেন যাতে শত্রুরা প্রতারণা করে তাকে কোন কষ্ট দিতে না পারে। যখন রাত্রি হলো এবং প্রতিটি দল একে অপরের সাথে মিলিত হলো তখন গণীমত একত্রিতকারীরা বলল, ‘আমরা এগুলো জমা করেছি। সতুরাং এতে অন্য কারো কোন অংশ নেই।’ শত্রুদের পশ্চাদ্ধাবনকারীরা বলল, ‘তোমরা আমাদের চেয়ে বেশী এর হকদার নও। কেননা, আমরা এ মাল হতে শত্রুদের তাড়ানো ও দূর করানোর কাজ করেছি।’ আর যারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হিফাযতের কাজ করেছিল তারা বলল ‘আমরা এ আশঙ্কা করেছিলাম যে, আমাদের অবহেলার কারণে শত্রুরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কোন ক্ষতি সাধন করতে পারে। এ জন্যে আমরা তার হিফাযতের কাজে নিয়োজিত থেকেছি। সুতরাং আমরা এর বেশী হকদার।’ তখন আল্লাহ তা‘আলা নিম্নের আয়াত অবতীর্ণ করলেন :

(‏يَسْأَلُوْنَكَ عَنِ الأَنفَالِ قُلِ الأَنفَالُ لِلهِ وَالرَّسُوْلِ فَاتَّقُوْا اللهَ وَأَصْلِحُوْا ذَاتَ بِيْنِكُمْ وَأَطِيْعُوْا اللهَ وَرَسُوْلَهُ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِيْنَ‏)‏ ‏[‏الأنفال‏:‏1‏]‏‏

‘‘তারা তোমাকে যুদ্ধে প্রাপ্ত সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে। বল, ‘যুদ্ধে প্রাপ্ত সম্পদ হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের; কাজেই তোমরা আল্লাহকে ভয় কর আর নিজেদের সম্পর্ককে সুষ্ঠু সুন্দর ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত কর। তোমরা যদি মু’মিন হয়ে থাক তবে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য কর।’ (আল-আনফাল ৮ : ১)

এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ গনীমতের মাল মুসলিমদের মধ্যে বন্টন করে দেন।[1]

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তিন দিন বদরে অবস্থানের পর মদীনার পথে যাত্রা শুরু করেন। তাঁর সাথে মুশরিক বন্দীরাও ছিল এবং মুশরিকদের নিকট হতে প্রাপ্ত গণীমতের মালও ছিল। তিনি তাদের পাহারার দায়িত্ব আব্দুল্লাহ ইবনু কা‘ব (রাঃ)-এর উপর অর্পণ করেন। যখন তিনি সাফরা উপত্যকায় গিরিপথ হতে বের হয়ে একটি টিলার উপর বিশ্রাম গ্রহণ করেন তখন তিনি সেখানে গণীমাতের এক পঞ্চমাংশ বের করে নিয়ে বাকী মাল মুসলিমদের মধ্যে সমভাবে বন্টন করে দেন। আর সাফরা উপত্যকাতেই তিনি নাযর ইবনু হারিসের হত্যার নির্দেশ দেন। এ ব্যক্তি বদরের যুদ্ধে মুশরিকদের পতাকা ধরে রেখেছিল এবং সে কুরাইশদের বড় বড় অপরাধীদের একজন ছিল। ইসলামের শত্রুতায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে কষ্ট প্রদানে সে বড় ভূমিকা পালন করেছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নির্দেশক্রমে আলী (রাঃ) তাকে হত্যা করেন।

এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরকুয যুবয়্যাহ নামক স্থানে পৌঁছে উকবাহ ইবনু আবী মুআইত্বকে হত্যা করার আদেশ জারী করেন। এ লোকটি যেভাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে কষ্ট দিয়েছিল তার কিছু আলোচনা ইতোপূর্বে করা হয়েছে। এ সেই ব্যক্তি যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সালাতের অবস্থায় তাঁর পিঠের উপর উটের ভূঁড়ি চাপিয়ে দিয়েছিল এবং সে তার গলায় চাদর জড়িয়ে দিয়ে তাঁকে মেরে ফেলার ইচ্ছা করেছিল এবং আবূ বাকর (রাঃ) সেখানে সময়মত এসে না পড়লে সে তো তাকে গলা টিপে মেরেই ফেলত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন তাকে হত্যা করার নির্দেশ দেন তখন সে বলে ওঠে ‘হে মুহাম্মাদ (ﷺ) আমার সন্তানদের জন্য কে আছে?’ তিনি উত্তরে বললেন, ‘আগুন’’। তারপর আসিম ইবনু সাবিত (রাঃ) এবং মতান্তরে আলী (রাঃ) তার গর্দান উড়িয়ে দেন।[2]

সামরিক নীতি অনুযায়ী এ দুরাচার ব্যক্তিদ্বয়ের হত্যা অপরিহার্য ছিল। কেননা, তারা শুধু বন্দী ছিল না, বরং আধুনিক পরিভাষার দিক থেকে যুদ্ধ অপরাধীও ছিল।

[1] মুসনাদে আহমাদ ৫ম খন্ড ৩২৩ ও ৩২৪ পৃঃ এবং হাকিম ২য় খন্ড ৩২৮ পৃঃ।

[2] এ হাদীসটি সহীহুল গ্রন্থসমূহে বর্ণিত যথা সুনানে আবূ দাউদ , আওনুল মা’বুদে ৩য় খন্ড ১২ পৃঃ।
অভ্যর্থনাকারী প্রতিনিধিদল (وُفُوْدُ التَّهْنِئَةِ):

এরপর যখন মুসলিম সেনাবাহিনী রাওহা নামক স্থানে পৌঁছেন তখন ঐ মুসলিম প্রতিনিধি দলের সাথে তাদের সাক্ষাৎ হয় যারা দূতদ্বয় মারফত বিজয়ের শুভ সংবাদ শুনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর অভ্যর্থনার জন্যে এবং তাকে বিজয়ের মুবারকবাদ জানাবার জন্যে মদীনা হতে বের হয়ে এসেছিলেন। যখন তারা মুবারকবাদ পেশ করলেন তখন সালামাহহ ইবনু সালামাহ্ (রাঃ) বললেন, ‘আপনারা আমাদেরকে মুবারকবাদ দিচ্ছেন কেন? আল্লাহর শপথ! আমাদের মোকাবেলা তো টেকো মাথাবিশিষ্ট বুড়োদের সাথে হয়েছিল, যারা ছিল উটের মত।’ তার এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মুচকি হেসে বললেন, ‘ভ্রাতুষ্পুত্র, এরাই ছিল কওমের নেতৃস্থানীয় লোক বা নেতা।’

তারপর উসায়েদ ইবনু হুযায়ের (রাঃ) আরয করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আল্লাহর জন্যেই সমস্ত প্রশংসা যে, তিনি আপনাকে সফলতা দান করেছেন এবং আপনার চক্ষুদ্বয় শীতল করেছেন। আল্লাহর কসম! আমি একথা মনে করে বদরে গমন হতে পিছনে থাকি নি যে, আপনার মোকাবেলা শত্রুদের সাথে হবে। আমি তো ধারণা করেছিলাম যে, এটা শুধু কাফেলার ব্যাপার। আমি যদি বুঝতাম যে, শত্রুদের মুখোমুখী হতে হবে তবে আমি কখনো পিছনে থাকতাম না।’ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তখন তাকে বললেন? তুমি সত্য কথাই বলেছ।

এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মদীনা মুনাওওরায় বিজয়ীর বেশে এমনভাবে প্রবেশ করলেন যে, মদীনা শহর এবং তাঁর আশপাশের শত্রুদের উপর তাঁর চরম প্রভাব প্রতিফলিত হল। এ বিজয়ের ফলে মদীনার বহু লোক দলে দলে এসে ইসলাম গ্রহণ করলেন। এ সময়েই আব্দুল্লাহ ইবনু উবাই এবং তার সঙ্গীরা শুধু লোক দেখানো ইসলাম গ্রহণ করে।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মদীনায় আগমনের এক দিন পর বন্দীদের আগমন ঘটে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদেরকে সাহাবীগণের (রাঃ) মধ্যে বন্টন করে দেন এবং তাদের সঙ্গে উত্তম ব্যবহারের পরামর্শ প্রদান করেন। এ পরামর্শের কারণে সাহাবীগণ (রাঃ) নিজেরা খেজুর খেতেন এবং বন্দীদেরকে রুটি খাওয়াতেন। কেননা মদীনায় খেজুর ছিল সাধারণ খাদ্য এবং রুটি ছিল বিশেষ মূল্যবান খাদ্য।

বন্দীদের সম্বন্ধে পরামর্শ (قَضِيَّةُ الْأَسَارِى):

মদীনায় প্রত্যাবর্তন করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সাহাবীদের সঙ্গে বন্দীদের ব্যাপারে পরামর্শ করেন। আবূ বাকর (রাঃ) নিবেদন করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! এরা সবাই আমাদের চাচাত ভাই, বংশীয় লোক এবং আত্মীয়। আমার মতে মুক্তিপণ হিসেবে কিছু কিছু অর্থ নিয়ে এদেরকে মুক্তি দেয়া উচিত। এতে আমাদের সাধারণ তহবিল যথেষ্ট অর্থ সঞ্চিত হবে। পক্ষান্তরে অল্প দিনের মধ্যে এদের সবার পক্ষে ইসলাম গ্রহণ করাও সম্ভব হবে। তখন তাদেরকে আমাদের সহায়ক শক্তি হিসেবে আমরা ব্যবহার করতে পারব।

তারপর নাবী কারীম (ﷺ) খাত্তাবের পুত্রকে (উমার (রাঃ)) সম্বোধন করে বললেন, হে খাত্তাবের পুত্র, তোমার অভিমত কী? উত্তরে উমার (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম! এ ব্যাপারে আমি আবূ বকরের সঙ্গে একমত হতে পারছিনা। আমার মত হচ্ছে যে, অমুককে (যিনি উমারের আত্মীয় ছিলেন) আমার হাওয়ালা করে দেন, আমি তাকে হত্যা করি। আকীল বিন আবি তালেবকে আলীর হাওয়ালা করে দিন। তিনি তাকে হত্যা করবেন এবং অমুককে (যিনি হামযাহর ভাই ছিলেন) হামযাহর হালওয়ালা করে দিন, তিনি তাকে হত্যা করবেন। যাতে করে আল্লাহ এটা বোঝেন যে, আমাদের অন্তরে মুশরিকদের সম্পর্কে কোন প্রকার দুর্বলতা নেই। আর এরা ছিল মুশরিকদের সার্বক্ষণিক অগ্রণী নেতা। এরা ইসলামের চির শত্রু এবং মুসলিমদের প্রাণের বৈরী। আমাদেরকে নির্যাতিত করতে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করতে এবং আল্লাহর সত্য ধর্মকে জগতের পৃষ্ঠ হতে মুছে ফেলতে এরা সাধ্যপক্ষে চেষ্টার কোন ত্রুটি করেনি। এরা অন্যায়, অধর্ম ও অত্যাচারের সাক্ষাৎ প্রতিমূর্তি। এদেরকে অবিলম্বে হত্যা করে ফেলা হোক। প্রত্যেক মুসলিম উলঙ্গ তরবারী হাতে দন্ডায়মান হোক এবং নিজ হাতে নিজের আত্মীয়বর্গের মুন্ডপাত করুক, আমার এটাই মত।’

উমার (রাঃ) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আবূ বাকর (রাঃ)-এর মতকেই পছন্দ করলেন, আমার মতকে পছন্দ করলেন না। সুতরাং বন্দীদের নিকট থেকে মুক্তিপণ নেয়ার সিন্ধান্ত গৃহীত হলো। পরের দিন আমি সকাল সকাল রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং আবূ বাকর (ﷺ)-এর খিদমতে হাযির হলাম। দেখি যে, তাঁরা দুজনই ক্রন্দন করছেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলুন, আপনারা কেন কাঁদছেন? যদি ক্রন্দনের কোন কারণ থাকে তাহলে আমিও ক্রন্দন করব। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উত্তরে বললেন ‘মুক্তিপণ গ্রহণ করার কারণে তোমার সঙ্গীদের উপর যে জিনিস পেশ করা হয়েছে সে কারণেই কাঁদছি।’ আর তিনি নিকটবর্তী একটি গাছের প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন, ‘আমার সামনে তাদের শাস্তিকে এ গাছের চেয়েও বেশী নিকটবর্তীরূপে পেশ করা হয়েছে।’ তারপর আল্লাহ তা‘আলা নিম্নলিখিত আয়াত নাযিল করেন,

(‏مَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَن يَكُوْنَ لَهُ أَسْرَى حَتّٰى يُثْخِنَ فِي الأَرْضِ تُرِيْدُوْنَ عَرَضَ الدُّنْيَا وَاللهُ يُرِيْدُ الآخِرَةَ وَاللهُ عَزِيْزٌ حَكِيْمٌ لَّوْلاَ كِتَابٌ مِّنَ اللهِ سَبَقَ لَمَسَّكُمْ فِيْمَا أَخَذْتُمْ عَذَابٌ عَظِيْمٌ‏)‏ ‏[‏الأنفال‏:‏67، 68‏]‏‏

‘‘কোন নাবীর জন্য এটা সঠিক কাজ নয় যে, দেশে (আল্লাহর দুশমনদেরকে) পুরোমাত্রায় পরাভূত না করা পর্যন্ত তার (হাতে) যুদ্ধ-বন্দী থাকবে। তোমরা দুনিয়ার স্বার্থ চাও আর আল্লাহ চান আখিরাত (এর সাফল্য), আল্লাহ প্রবল পরাক্রান্ত, মহাবিজ্ঞানী। - আল্লাহর লেখন যদি পূর্বেই লেখা না হত তাহলে তোমরা যা (মুক্তিপণ হিসেবে) গ্রহণ করেছ তজ্জন্য তোমাদের উপর মহাশাস্তি পতিত হত।’ (আল-আনফাল ৮ : ৬৭-৬৮)

আল্লাহর পক্ষ থেকে আগিই সে নির্দেশ এসেছিল তা হল:

(‏فَإِمَّا مَنًّا بَعْدُ وَإِمَّا فِدَاء‏)‏

‘অতঃপর তখন হয় অনুকম্পা; নয় মুক্তিপণ’। (মুহাম্মাদ : ৪ আয়াত)

যেহেতু এ বিধানে বন্দীদের নিকট হতে মুক্তিপণ নেয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে সেহেতু মুক্তিপণ গ্রহণ করার কারণে সাহাবীগণ (রাঃ)-কে শাস্তি দেয়া হয় নি, বরং তাদেরকে শুধু তিরস্কার ও নিন্দা করা হয়েছে যে, ভালোভাবে কাফেরদেরকে উত্তম মাধ্যম দেয়ার আগেই বন্দী করে নিয়েছিলেন এবং এ জন্যও যে, তাঁরা এমন যুদ্ধ অপরাধীদের নিকট থেকে মুক্তিপণ গ্রহণ করেছিলেন যারা বড় অপরাধী ছিল, যাদের উপর আধুনিক আইনও মুকদ্দমা না চালিয়ে ছাড়ত না, এদের মুকদ্দমার ফায়সালাও সাধারণত মৃত্যুদন্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদন্ড হতো।

যা হোক, আবূ বাকর (রাঃ)-এর অভিমত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল বলে মুশরিকদের নিকট হতে মুক্তিপণ গৃহীত হয়। মুক্তিপণের পরিমাণ চার হাজার দিরহাম পর্যন্ত ছিল। মক্কাবাসীগণ লেখা পড়াও জানত, পক্ষান্তরে মদীনাবাসীগণ লেখাপড়া জানত না বললেই চলে। এ জন্যে এ সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়েছিল যে, যে মুক্তিপণ দিতে অসমর্থ হবে সে মদীনার দশজন ছেলেকে লেখাপড়া শিখাবে। যখন এ ছেলেগুলো উত্তমরূপে লেখাপড়া শিখে নিবে তখন এটাই তার মুক্তিপণ হিসেবে বিবেচিত হবে।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কয়েকজন বন্দীর উপর অনুগ্রহও করেছেন এবং তাদেরকে মুক্তিপণ ছাড়াই মুক্ত করে দিয়েছেন। এ তালিকায় মুত্তালিব ইবনু হানতাব, সাইফী ইবনু আবী রিফাআহ এবং আবূ ইযযাহ জুমাহীর নাম পাওয়া যায়। শেষের দুজনকে উহুদের যুদ্ধে বন্দী ও হত্যা করা হয়। (বিস্তারিত বিবরণ সামনে আসছে)।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) স্বীয় জামাতা আবুল আসকেও বিনা মুক্তিপণে এ শর্তে ছেড়ে দেন যে, সে তার কন্যা যায়নাব (রাঃ)-এর পথ রোধ করবে না। এর কারণ এই ছিল যে, যায়নাব (রাঃ) আবুল আসের মুক্তিপণ হিসেবে কিছু মাল পাঠিয়েছিলেন যার মধ্যে একটি হারও ছিল। এ হারটি প্রকৃত পক্ষে খাদীজাহ (রাঃ)-এর ছিল। যায়নাব (রাঃ)-কে আবুল আসের নিকট বিদায় দেয়ার সময় তিনি তাকে এ হারটি প্রদান করেছিলেন। হারটি দেখে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মধ্যে ভাবাবেগ সৃষ্টি হয়। তাই, তিনি সাহাবীদের (রাঃ) নিকট অনুমতি চান যে, আবুল আসকে মুক্তিপণ ছাড়াই মুক্ত করে দেয়া হোক। সাহাবীগণ সন্তুষ্টচিত্তে এটা মেনে নেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আবুল আসকে এ শর্তে ছেড়ে দেন যে, সে যায়নাব (রাঃ)-এর পথরোধ করতে পারবে না। এ শর্তানুসারে আবুল আস তাঁর পথ ছেড়ে দেয় এবং যায়নাব (রাঃ) মদীনায় হিজরত করেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যায়দ ইবনু হারিসাহ (রাঃ) এবং একজন আনসারী সাহাবী (রাঃ)-কে এ উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন যে, তাঁরা বাতনে ইয়াজিজ নামক স্থানে অবস্থান করবেন, যায়নাব (রাঃ) তাদের পাশ দিয়ে গমনকালে তাঁরা তাঁর সাথী হয়ে যাবেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর এ নির্দেশ অনুযায়ী তাঁরা দুজন যায়নাব (রাঃ)-কে সাথে নিয়ে মদীনায় ফিরে আসেন। যায়নাব (রাঃ)-এর হিজরতের ঘটনাটি খুবই দীর্ঘ ও হৃদয়বিদারক।

বন্দীদের মধ্যে সুহায়েল ইবনু ‘আমরও ছিল। সে ছিল বড় বাকপটু ভাল বক্তা। উমার (রাঃ) আরয করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! সুহায়েল ইবনু আমরের সামনের দাঁত দুটি ভেঙ্গে দেয়া হোক, যাতে সে কোন জায়গায় বক্তা হয়ে আপনার বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিতে না পারে।’ কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর এ আবেদন প্রত্যাখ্যান করলেন। কেননা এটা মুসলাহ (নাক, কান কর্তিত) এর অন্তর্ভুক্ত। যার কারণে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ হতে পাকড়াও এর আশঙ্কা থাকবে।

সা‘দ ইবনু নু’মান (রাঃ) উমরাহ করার জন্যে বের হলে আবূ সুফইয়ান তাকে বন্দী করে ফেলেন। আবূ সুফইয়ানের পুত্র ‘আমরও বদরযুদ্ধে বন্দীদের একজন ছিল। ‘আমরকে আবূ সুফইয়ানের নিকট পাঠিয়ে দিলে তিনি সা‘দ (রাঃ)-কে ছেড়ে দেন।

এ যুদ্ধ সম্পর্কে কুরআনের পর্যালোচনা (القُرْآنُ يَتَحَدَّثُ حَوْلَ مَوْضُوْعِ الْمَعْرِكَةِ):

এ যুদ্ধ সম্পর্কে সূরাহ আনফাল অবতীর্ণ হয়। প্রকৃতপক্ষে এ সূরাহটি এ যুদ্ধের উপর আল্লাহ প্রদত্ত এক বিশদ বর্ণনা। আর আল্লাহ তা‘আলার এ বর্ণনা বাদশাহ ও কমান্ডারদের বিজয় বর্ণনা হতে সম্পূর্ণ পৃথক। এ বিশদ বর্ণনার কয়েকটি কথা হচ্ছে :

আল্লাহ তা‘আলা সর্বপ্রথম মুসলিমদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ঐ অসতর্কতা ও চারিত্রিক দুর্বলতার প্রতি যা মোটের উপর তাদের মধ্যে বাকী রয়ে গিয়েছিল। আর যেগুলোর মধ্যে কিছু কিছু এ যুদ্ধে প্রকাশও পেয়ে গিয়েছিল। তাদের এ মনোযোগ আকর্ষণের উদ্দেশ্য ছিল তারা নিজেদেরকে এ সব দুর্বলতা হতে পবিত্র করে পরিপূর্ণতা লাভ করবে।

এরপর মহান আল্লাহ এ বিজয়ে স্বীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও গায়েবী সাহায্যের অন্তভুক্তির বর্ণনা দিয়েছেন। এর উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমরা নিজেদের সাহস ও বীরত্বের প্রতারণায় যেন না পড়ে। কেননা, এর ফলে স্বভাব ও প্রকৃতির মধ্যে গর্ব ও অহংকার সৃষ্টি হয়। বরং তারা যেন আল্লাহ তা‘আলার উপরই নির্ভরশীল হয় এবং তাঁর ও তাঁর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আনুগত্য স্বীকার করে।

তারপর ঐ সব মহৎ উদ্দেশ্যের আলোচনা করা হয়েছে যার জন্যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে পা রেখেছিলেন এবং এর মধ্যে ঐ চরিত্র ও গুণাবলী চিহ্ণিত করা হয়েছে যা যুদ্ধসমূহে বিজয়ের কারণ হয়ে থাকে।

তারপর মুশরিক মুনাফিক্ব, ইহুদী এবং যুদ্ধবন্দীদেরকে এমন মর্মস্পর্শী উপদেশ দেয়া হয় যাতে তারা সত্যের সামনে ঝুঁকে পড়ে এবং ওর অনুসারী হয়ে যায়।

এরপর মুসলিমগণকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদের ব্যাপারে সম্বোধন করে এ বিজয়ের সমুদয় বুনিয়াদী নিয়ম-কানুন ও নীতিমালা বুঝানো হয় ও বলে দেয়া হয়।

তারপর এ স্থানে ইসলামী দাওয়াতের জন্যে যুদ্ধ ও সন্ধির যে নীতিমালার প্রয়োজন ছিল ও গুলোর বিশ্লেষণ ও বিবরণ দেয়া হয়েছে। যাতে মুসলিমদের যু্দ্ধ এবং জাহেলিয়াত যুগের যুদ্ধের মধ্যে স্বাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং চরিত্র ও কর্মের ক্ষেত্রে মুসলিমদের উৎকৃষ্টতা লাভ হয়, আর দুনিয়ার মানুষ উত্তমরূপে জেনে নেয় যে, ইসলাম শুধু মাত্র একটা মতবাদ নয়, বরং সে যে নীতিমালা ও রীতিনীতির প্রতি আহবানকারী, স্বীয় অনুসারীদেরকে ওগুলো অনুযায়ী আমল করার শিক্ষাও দিয়ে থাকে।

তারপর ইসলামী হুকুমতের কয়েকটি দফা বর্ণনা করা হয়েছে যেগুলো দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামী হুকমতের গন্ডীর মধ্যে বসবাসকারী মুসলিম ও এর বাইরে বসবাসকারী মুসলিমদের মধ্যে কতই না পার্থক্য রয়েছে।

হিজরী ২য় সনে রমাযানের রোযা এবং সাদকায়ে ফিতর ফরজ করা হয়, আর যাকাতের বিভিন্ন নিসাব ও ধনের পরিমাণ যা থাকলে যাকাত ফরজ হয়, নির্দিষ্ট করা হয়। সাদকায়ে ফিতর ফরজ ও যাকাতের নিসাব নির্দিষ্ট করণের ফলে ঐ বোঝা ও কষ্ট অনেকাংশ হালকা হয়ে গেল যা বহু সংখ্যক দরিদ্র মুহাজির বহণ করে আসছিলেন। কেননা, তাঁরা জীবিকার সন্ধানে ভূপৃষ্ঠে ঘুরেও জীবিকার ব্যবস্থা করতে অপারগ হচ্ছিলেন।

তারপর অত্যন্ত সুন্দর ও মোক্ষম ব্যবস্থা এই ছিল যে, মুসলিমরা তাদের জীবনে যে প্রথম ঈদ উদযাপন করেছিলেন তা ছিল ২য় হিজরীর শাওয়াল মাসের ঈদ, যা বদর যুদ্ধের প্রকাশ্য বিজয়ের পর হাযির হয়েছিল। কতই না সুন্দর ছিল এ সৌভাগ্যের ঈদ, যে সৌভাগ্য আল্লাহ তা‘আলা মুসলিমদের মস্তিষ্কে বিজয় ও সম্মানের মুকুট পরানোর পর দান করেছিলেন। আর কতই না ঈমানের ছিল এ ঈদের সালাতের দৃশ্য যা মুসলিমরা নিজেদের ঘর হতে বের হয়ে তকবীর তাওহীদ ধ্বনিতে গগণ পবন মুখরিত মাঠে গিয়ে আদায় করে থাকেন। ঐ সময় অবস্থা ছিল মুসলিমদের অন্তরে ছিল আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতরাশি ও তাঁর দেয়া সাহায্যের কারণে তাঁর করুণা ও সন্তুষ্টি লাভের আগ্রহে উচ্ছ্বসিত এবং বিজয়োন্মাদনার উল্লাসে পরিপূর্ণ। তাদের ললাটগুলো তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের জন্যে ঝুঁকে পড়েছিল। আল্লাহ তা‘আলা এ নিয়ামতের বর্ণনা নিম্নের আয়াতে দিয়েছেনঃ

(‏وَاذْكُرُوْا إِذْ أَنتُمْ قَلِيْلٌ مُّسْتَضْعَفُوْنَ فِي الأَرْضِ تَخَافُوْنَ أَن يَتَخَطَّفَكُمُ النَّاسُ فَآوَاكُمْ وَأَيَّدَكُم بِنَصْرِهِ وَرَزَقَكُم مِّنَ الطَّيِّبَاتِ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُوْنَ‏)‏ ‏[‏الأنفال‏:‏26‏]‏‏.

‘‘স্মরণ কর সে সময়ের কথা যখন তোমরা ছিলে সংখ্যায় অল্প, দুনিয়াতে তোমাদেরকে দুর্বল হিসেবে গণ্য করা হত। তোমরা আশঙ্কা করতে যে, মানুষেরা তোমাদের কখন না হঠাৎ ধরে নিয়ে যায়। এমন অবস্থায় তিনি তোমাদেরকে আশ্রয় দিলেন, তাঁর সাহায্য দিয়ে তোমাদেরকে শক্তিশালী করলেন, তোমাদের উত্তম জীবিকা দান করলেন যাতে তোমরা (তাঁর নির্দেশ পালনের মাধ্যমে) কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।’ (আল-আনফাল ৮ : ২৬)

দেখানো হচ্ছেঃ ১৬১ থেকে ১৭০ পর্যন্ত, সর্বমোট ৪৩৪ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে পাতা নাম্বারঃ « আগের পাতা 1 2 3 4 · · · 14 15 16 17 18 · · · 41 42 43 44 পরের পাতা »