রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পথিমধ্যেই ছিলেন এমতাবস্থায় তিনি আবূ সুফইয়ানের বাণিজ্য কাফেলা এবং মক্কা সেনাবাহিনী সম্পর্কে অবহিত হন। উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে আসন্নপ্রায় সমস্যাটির খুটিনাটি সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনার পর তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস হয় যে, এখন একটি রক্ষক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। সুতরাং এখন এমনভাবে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন যে দুর্দমনীয় সাহস, বীরত্ব এবং নির্ভীকতার উপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। কারণ, এটা নিশ্চিত সত্য যে, মক্কা বাহিনীকে যদি এ এলাকায় যথেচ্ছ চলতে ফিরতে দেয়া হয় তাহলে তাদের সামরিক মর্যাদা যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়ে যাবে এবং রাজনৈতিক প্রাধান্য বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়বে। পক্ষান্তরে এর ফলে মুসলিমদের শক্তি হ্রাস পাবে এবং আঞ্চলিক সুযোগ সুবিধাও সীমিত হয়ে পড়বে। এর ফলশ্রুতিতে ইসলামী দাওয়াতকে একটি নিষ্প্রাণ আদর্শ মনে করে যাদের অন্তরে ইসলামের প্রতি হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতা রয়েছে এরূপ প্রত্যেক লোক ইসলামের ক্ষতি সাধনে উঠে পড়ে লেগে যাবে। এ ছাড়াও মক্কা বাহিনীর মদীনার দিকে অগ্রসর হয়ে এ যুদ্ধকে মদীনার চার প্রাচীর পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে মুসলিমগণকে যে তাদের আবাসস্থানেই ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার সাহস ও চেষ্টা করবে না তারও কোন নিশ্চয়তা নেই। ‘জী হ্যাঁ’ মুসলিম সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে যদি সামান্য পরিমাণও অবহেলা, আলস্য কিংবা কাপুরুষত্ব প্রদর্শিত হতো তাহলে এ সবের যথেষ্ট সম্ভাবনা ও আশঙ্কা ছিল। আর যদি এরূপ নাও হতো তাহলেও মুসলিমদের সামরিক প্রভাব প্রতিপত্তি এবং সুখ্যাতির উপর যে এ সবের একটি মন্দ ও প্রতিকূল প্রতিক্রিয়া প্রতিফলিত হতো তাতে কোনই সন্দেহ নেই।
অবস্থার এ আকস্মিক ভয়াবহ পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উচ্চ পর্যায়ের এক সামরিক পরামর্শ সভার আয়োজন করলেন। এ সভায় তিনি বর্তমান সংকটজনক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে নেতৃস্থানীয় ও সাধারণ সৈনিকদের সঙ্গে মত বিনিময় করলেন। অবস্থার এ আকস্মিক মোড় পরিবর্তনের ফলে আসন্ন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের কথা অবগত হয়ে একটি দলের হৃৎকম্প উপস্থিত হল। এ দলটি সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা করলেন,
(كَمَا أَخْرَجَكَ رَبُّكَ مِن بَيْتِكَ بِالْحَقِّ وَإِنَّ فَرِيْقاً مِّنَ الْمُؤْمِنِيْنَ لَكَارِهُوْنَ يُجَادِلُوْنَكَ فِي الْحَقِّ بَعْدَمَا تَبَيَّنَ كَأَنَّمَا يُسَاقُوْنَ إِلَى الْمَوْتِ وَهُمْ يَنظُرُوْنَ) [الأنفال:5، 6]
‘(তারা যেমন প্রকৃত মু’মিন) ঠিক তেমনি প্রকৃতভাবেই তোমার প্রতিপালক তোমাকে তোমার ঘর হতে বের করে এনেছিলেন যদিও মু’মিনদের একদল তা পছন্দ করে নি। ৬. সত্য স্পষ্ট করে দেয়ার পরও তারা তোমার সঙ্গে বাদানুবাদে লিপ্ত হয়েছিল, (তাদের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল) তারা যেন চেয়ে চেয়ে দেখছিল যে, তাদেরকে মৃত্যুর দিকে তাড়িয়ে নেয়া হচ্ছে।’ (আল-আনফাল ৮ : ৫-৬)
কিন্তু সামরিক বাহিনীর নেতৃস্থানীয় লোকদের মধ্য থেকে আবূ বাকর (রাঃ) উঠে দাঁড়ালেন এবং অতি চমৎকার কথা বললেন। তারপর উমার (রাঃ) উঠে দাঁড়িয়ে আরয করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আল্লাহ তা‘আলা আপনাকে যে পথ প্রদর্শন করেছেন সে পথে আপনি চলতে থাকুন। আমরা সর্বাবস্থায় আপনার সঙ্গে রয়েছি। আল্লাহর কসম! আমরা আপনাকে ঐ কথা বলব না, যে কথা ইসরাঈল মুসা (আঃ)-কে বলেছিল তা হলঃ
(فَاذْهَبْ أَنتَ وَرَبُّكَ فَقَاتِلا إِنَّا هَاهُنَا قَاعِدُوْنَ) [المائدة:24]
‘‘কাজেই তুমি আর তোমার প্রতিপালক যাও আর যুদ্ধ কর, আমরা এখানেই বসে রইলাম।’ (আল-মায়িদাহ ৫ : ২৪)
কিন্তু আমাদের ব্যাপার ভিন্ন। আমরা বরং বলব, ‘আপনি ও আপনার প্রভু যুদ্ধ করুন, আমরা সর্বাবস্থায় আপনাদের সঙ্গে থেকে যুদ্ধ করব। যিনি আপনাকে এক মহা সত্য প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! যদি আপনি আমাদেরকে বারকে গিমাদ পর্যন্ত নিয়ে যান তবুও আমরা পথরোধকারীদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে আপনার সঙ্গে সেখানেও গমন করব।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁদের সম্পর্কে উত্তম কথা বললেন, এবং তাদের জন্য দুআ করলেন। এ তিনজন নেতাই ছিলেন মুহাজির। সেনাবাহিনীতে আনসারদের তুলনায় মুহাজির সৈন্যের সংখ্যা ছিল অনেক কম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আনসারদেরও মতামত জানার প্রয়োজন বোধ করলেন। কেননা, সেনাবাহিনীতে সংখ্যায় তাঁরাই ছিলেন অধিক এবং যুদ্ধের ব্যয়ভার বহনের চাপও ছিল প্রকৃতপক্ষে তাঁদের উপরেই বেশী। অবশ্য, ‘আক্বাবাহ’র বাইআতের স্বীকৃতি মোতাবেক মদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করা তাদের জন্য অপরিহার্য ছিল না। এ প্রেক্ষিতে তিনি উপর্যুক্ত তিন মহান নেতার বক্তব্য শোনার পর পুনরায় বললেন, উপস্থিত ভ্রাতৃবৃন্দ! বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের করণীয় সম্পর্কে তোমরা আমাকে পরামর্শ দাও।’
আনসারদের উদ্দেশ্যেই তিনি এ কথাগুলো বলেছিলেন। আনসার অধিনায়ক ও পতাকাবাহক সা‘দ ইবনু মু’আয (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর এ কথার প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করে আরয করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! মনে হয় আপনি আমাদের মতামতই জানতে চাচ্ছেন।’
প্রত্যুত্তরে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘হ্যাঁ’’।
তখন তিনি বললেন, ‘আমরা তো আপনার উপর ঈমান এনেছি, আপনার সত্যতা স্বীকার করেছি এবং এ সাক্ষ্য দিয়েছি যে, আপনি যা কিছু নিয়ে এসেছেন সবই সত্য এবং ওগুলো শোনা ও মান্য করার পর আমরা আপনাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। সুতরাং হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আপনি যা ইচ্ছা করেছেন তা পূরণার্থে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে যান। যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তার শপথ! আপনি আদেশ করলে আমরা উত্তাল সাগরেও ঝাঁপ দিতে পারি। জগতের দুর্গমতম স্থানকেও পদদলিত করতে পারি, ইনশাআল্লাহ! আমাদের একজন লোকও পিছনে থাকবে না। যু্দ্ধ বিগ্রহে আপনি আমাদের প্রত্যক্ষ করবেন সাহসী ও নির্ভীক বীর পুরুষের ভূমিকায়। সম্ভবতঃ আল্লাহ তা‘আলা আপনাকে আমাদের মাঝে এমন নৈপুণ্য প্রদর্শন করাবেন যা প্রত্যক্ষ করে আপনার চক্ষুদ্বয় শীতল হয়ে যাবে। সুতরাং যেখানে ইচ্ছা আপনি আমাদেরকে নিয়ে চলুন। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের কাজেকর্মে বরকত দান করুন।’
অন্য এক রেওয়ায়াতে আছে যে, সা‘দ ইবনু মু’আয (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট আরয করেন, ‘আপনি হয়ত আশঙ্কা করছেন যে, আনসারগণ তাঁদের শহরে থেকেই শুধু আপনাকে সাহায্য করা কর্তব্য মনে করছেন। এ কারণে আমি তাদের পক্ষ থেকে বলছি এবং তাঁদের পক্ষ থেকেই উত্তর দিচ্ছি যে, আপনার যেখানে ইচ্ছা হয় চলুন, যার সঙ্গে ইচ্ছে সম্পর্ক ঠিক রাখুন এবং যার সঙ্গে ইচ্ছা সম্পর্ক ছিন্ন করুন। আমাদের ধন-সম্পদ হতে যে পরিমাণ ইচ্ছা গ্রহণ করুন এবং যা ইচ্ছে ছেড়ে দিন। তবে যেটুকু আপনি গ্রহণ করবেন তা আমাদের নিকট যেটুকু ছেড়ে দেবেন তার চাইতে অধিক পছন্দনীয় হবে। আর এ ব্যাপারে আপনি যে ফায়সালাই করবেন, আমাদের ফায়সালা তারই অনুসারী হবে। আল্লাহর কসম! আপনি যদি অগ্রসর হয়ে বারকে গিমাদ পর্যন্ত চলে যান তাহলেও আমরা আপনার সঙ্গেই যাব। আর যদি আপনি আমাদের নিয়ে ঐ সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে চান তবে আমরাও এতে ঝাঁপিয়ে পড়ব।’
সা'দের এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর চেহারা মুবারক আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি বললেন,
(سِيْرُوْا وَأَبْشِرُوْا، فَإِنَّ اللهَ تَعَالٰى قَدْ وَعَدَنِىْ إِحْدٰى الطَّائِفَتَيْنِ، وَاللهِ لَكَأَنِّيْ الْآنَ أَنْظُرُ إِلٰى مَصَارِعِ الْقَوْمِ).
‘‘চলো এবং আনন্দিত চিত্তে চলো। আল্লাহ আমার সঙ্গে দুটি দলের মধ্য হতে একটির ওয়াদা করেছেন। আল্লাহর কসম! আমি যেন এসময় (কাফির) সম্প্রদায়ের বধ্যভূমি দেখতে পাচ্ছি।
এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যাফরান হতে সামনে অগ্রসর হন এবং কয়েকটি পাহাড়ী মোড় অতিক্রম করেন যেগুলোকে আসাফির বলা হয়। সেখান থেকে আরও অগ্রসর হয়ে ‘দাব্বাহ’ নামক এক জনপদে অবতরণ করেন। তারপর ‘হিনান’ নামক পাহাড়কে ডান দিকে ছেড়ে দিয়ে অগ্রসর হতে থাকেন এবং পরবর্তী পর্যায়ে বদরের নিকটবর্তী স্থানে অবতরণ করেন।
এখানে পৌঁছেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার ‘সওর’ গুহার সঙ্গী ও সব চাইতে ঘনিষ্ট বন্ধু আবূ বাকর (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে শত্রু বাহিনীর সন্ধান নেয়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন। দুর হতে তাঁরা মক্কা বাহিনীর শিবির এবং অবস্থান সম্পর্কে সমীক্ষারত ছিলেন। এমন সময় একজন বৃদ্ধ আরবকে তাঁরা পেয়ে গেলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঐ বৃদ্ধকে কুরাইশ বাহিনী এবং মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর সাহাবীদের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। দু’বাহিনী সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদের উদ্দেশ্য ছিল যেন সে তাঁকে চিনতে না পারে। বৃদ্ধ বললেন, ‘আপনারা কোন কওমের সম্পর্কযুক্ত তা না জানালে আমি কিছুই বলব না।’
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন ঠিক আছে, ‘আপনি বলে দিলে আমরাও বলে দিব।’
সে বলল, ‘এটা ওটার বিনিমিয় তো?’
তিনি উত্তর দিলেন ‘হ্যাঁ’।
সে তখন বলল, ‘আমি জানতে পেরেছি যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) এবং তাঁর সঙ্গীরা অমুক দিন মদীনা থেকে বের হয়েছেন। সংবাদ দাতা, আমাকে সঠিক বলে থাকলে আজ তারা অমুক জায়গায় রয়েছেন।
সে ঠিক ঐ জায়গাটিরই নাম ঠিকানা বলে দিল যেখানে ঐ সময় মুসলিম বাহিনী অবস্থান করছিলেন।
তারপর সে বলল, আমি এটাও অবগত হয়েছিল যে, কুরাইশ বাহিনী অমুক দিন মক্কা থেকে বের হয়েছে সংবাদ দাতা আমাকে সঠিক সংবাদ বলে থাকলে তারা আজ অমুক জায়গায় অবস্থান করছে।’
সে ঠিক ঐ জায়গারই নাম বলল, যেখানে ঐ সময় কুরাইশ বাহিনী অবস্থান করছিল।
বৃদ্ধ নিজের কথা শেষ করে বলল, ‘আচ্ছা তবে এখন বলুন, আপনারা কোন সম্প্রদায়ভুক্ত।’
উত্তরে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘আমরা এক পানি হতেই (উদ্ভূত)।’
এ কথা বলেই তিনি ফিরে চললেন। আর বৃদ্ধ বক্ বক্ করতেই থাকল, কোন্ পানি হতে? ইরাকের পানি হতে কি?
ঐ দিনই সন্ধ্যায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) শত্রুদের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য নতুনভাবে এক গোয়েন্দা বাহিনী গঠন করেন। এ বাহিনীর ব্যবস্থাপনার জন্য আলী ইবনু আবূ ত্বালিব (রাঃ), যুবাইর ইবনু ‘আউওয়াম (রাঃ) এবং সা‘দ ইবনু ওয়াক্কাস (রাঃ)-কে প্রেরণ করেন। এ গোয়েন্দা বাহিনী সরাসরি বদরের প্রস্রবণে গিয়ে পৌঁছেন। সেখানে দুজন গোলাম মক্কা বাহিনীর জন্য পানির পাত্র পূর্ণ করছিল। মুসলিম গোয়েন্দা বাহিনী এ দুজন পানি বাহককে বন্দী করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট হাযির করেন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সালাতরত ছিলেন। উপস্থিত সাহাবীগণ ঐ গোলামদ্বয়কে বিভিন্ন ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকলেন। উত্তরে তারা বলল যে, ‘আমরা কুরাইশদের পানি বাহক। পাত্রে পানি ভর্তি করে আনার জন্য তারা আমাদের পাঠিয়েছিল।
তাদের এ জবাবে সাহাবীগণ সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। তাদের আশা ছিল যে, এরা দুজন হবে আবূ সুফইয়ানের লোক। কেননা, তাদের অন্তরে তখনো এ ক্ষীণ আশা বিরাজমান ছিল যে, তারা আবূ সুফইয়ানের বাণিজ্য কাফেলার উপর জয়যুক্ত হবেন। সুতরাং তারা ঐ গোলামদ্বয়কে কিছু মারপিটও করেন। তারা তখন বাধ্য হয়ে বলল যে, তারা আবূ সুফইয়ানের কাফেলার লোক। এ কথা বলার পর তাদের মারপিট বন্ধ করা হয়।
ততক্ষণে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সালাত আদায় শেষ করেছেন। সাহাবীগণের এহেন আচরণে বিরক্ত হয়ে তিনি বললেন, ‘গোলামদ্বয় যখন সত্য কথা বলল, তখন তোমরা তাদের মারপিট করলে, অথচ যখন মিথ্যা কথা বলল তখন তাদের ছেড়ে দিলে। আল্লাহর কসম! তারা দুজন সঠিক কথাই বলেছিল যে, তারা কুরাইশের লোক।’
এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঐ গোলাম দ্বয়কে বললেন, আচ্ছা এখন আমাকে কুরাইশদের সম্পর্কে খবর দাও।’
তারা বলল, ‘ঐ যে টিলাটি, যা উপত্যকার শেষ প্রান্তে দেখা যাচ্ছে, কুরাইশরা তারই পিছনে অবস্থান করছে।’
তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘তারা কতজন আছে’’? উত্তরে তারা বলল, ‘অনেক’।
তিনি আবারও জিজ্ঞেস করলেন, তাদের সংখ্যা কত?’ তারা বলল ‘আমাদের তা জানা নেই।’
তিনি পুনরায় প্রশ্ন করলেন, ‘প্রত্যহ কটি উট জবেহ করা হয়?’
তারা জবাব দিল, ‘একদিন নয়টি এবং আরেক দিন দশটি’’। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মন্তব্য করলেন, ‘তাহলে তো তাদের সংখ্যা নয়শ ও এক হাজারের মাঝামাঝি হবে।’
তারপর তিনি তাদেরকে পুনরায় প্রশ্ন করলেন, ‘তাদের সঙ্গে সম্ভ্রান্ত কুরাইশদের কে কে আছে’’?
উত্তরে তারা বলল, ‘রাবী’আহর দু’পুত্র ‘উতবাহ ও শায়বাহ, আবুল বাখতারী ইবনু হিশাম, হাকীম ইবনু হিযাম, নাওফাল ইবনু খুওয়াইলিদ, হারিস ইবনু আমির, তোআইমাহ ইবনু আদী, নাযর ইবনু হারিস, যামআহ ইবনু আসওয়াদ, আবূ জাহল ইবনু হিশাম, উমাইয়া ইবনু খালফ এবং আরও অনেকে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘মক্কা তার কলিজার টুকরোগুলোকে তোমাদের পাশে এনে নিক্ষেপ করেছে।’
মহা মহিমান্বিত আল্লাহ রাববুল আলামীন এ রাত্রেই বৃষ্টি বর্ষণ করলেন। মক্কা বাহিনীর উপর বর্ষিত হল সেই বৃষ্টির ধারা মুষল ধারে। প্রবল বৃষ্টির কারণে মক্কা বাহিনীর অগ্রগমন কিছুটা বাধাপ্রাপ্ত হল। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর উপর তা বর্ষিত হল আল্লাহ পাকের বিশেষ এক রহমত রূপে। আল্লাহর রহমতের এ বৃষ্টি শয়তানের সৃষ্ট অপবিত্রতা থেকে মুসলিমদের পবিত্র করে এবং ভূমিকে সমতল ও মসৃন করে। এর ফলে বেশ অনুকূল অবস্থার সৃষ্টি করে। পদচারণার ক্ষেত্রে অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার কারণে তাদের অন্তরেও দৃঢ়তার ভাব সৃষ্টি হয়ে যায়।
এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) স্বীয় সেনাবাহিনীকে দ্রুত পথে চলার নির্দেশ দেন যাতে তাঁরা মুশরিক বাহিনীর পূর্বেই বদরের প্রস্রবণের নিকট পৌঁছে যান এবং প্রস্রবণের উপর নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। মুশরিক বাহিনী যাতে কোনভাবেই প্রস্রবণের উপর অধিকার লাভ করতে না পারে সেটাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। এ প্রেক্ষিতে তিনি এবং তাঁর বাহিনী এশার সময় বদরের নিকট অবতরণ করেন। এ সময় হাববাব ইবনু মুনযির (রাঃ) একজন অভিজ্ঞ সামরিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রশ্ন করলেন। ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এ স্থানে আপনি আল্লাহর নির্দেশ ক্রমে অবতরণ করেছেন, না শুধু যুদ্ধের কৌশল হিসেবেই আপনি এ ব্যবস্থা অবলম্বন করেছেন। ‘কেননা এর অগ্র কিংবা পশ্চাদগমনের আমাদের কোন সুযোগ নেই’’?
প্রত্যুত্তরে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘শুধু যুদ্ধের কৌশল হিসেবেই আমি এ ব্যবস্থা অবলম্বন করেছি।’
এ কথা শুনে হুবাব (রাঃ) বললেন, ‘এটা উপযুক্ত স্থান নয়। আরও সামনের দিকে এগিয়ে চলুন এবং কুরাইশ বাহিনীর সব চাইতে নিকটে যে প্রস্রবণ রয়েছে সেখানে শিবির স্থাপন করুন। তারপর অন্যান্য সব প্রস্রবণ বন্ধ করে দিয়ে নিজেদের প্রস্রবণের উপর চৌবাচ্চা তৈরি করে তাতে পানি ভর্তি করে নেব। এরপর কুরাইশ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হলে আমরা পানি পাব কিন্তু তারা তা পাবে না।
তাঁর এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘তুমি উত্তম পরামর্শ দিয়েছ।’ এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর বাহিনীকে অগ্রগমনের নির্দেশ প্রদান করলেন এবং অর্ধেক রাত যেতে না যেতেই কুরাইশ বাহিনীর সব চাইতে নিকটবর্তী প্রস্রবণের নিকট পৌঁছে গিয়ে শিবির স্থাপন করলেন। তারপর সেখানে একটি চৌবাচ্চা বা জলাধার তৈরি করে নিয়ে অবশিষ্ট সমস্ত প্রস্রবণ বন্ধ করে দিলেন।
প্রস্রবণের উপর মুসলিম বাহিনীর যখন শিবির স্থাপন কাজ সম্পন্ন হল তখন সা‘দ ইবনু মু’আয (রাঃ) প্রস্তাব করলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সৈন্য পরিচালনা বা নেতৃত্ব প্রদানের কেন্দ্রস্থল রূপে একটি ছাউনী নির্মাণ করে দেয়া হোক, যেখানে তিনি অবস্থান করবেন। আল্লাহ না করুন বিজয়ের পরিবর্তে আমাদেরকে যদি পরাজিত হতে হয় কিংবা অন্য কোন অসুবিধাজনক অবস্থার সম্মুখীন হতে হয় তাহলে পূর্ব থেকেই তাঁর নিরাপত্তার জন্য আমরা যেন প্রস্তুত থাকতে পারি। তাঁর এ প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে সমর্থিত হলো। তারপর তাঁরা আরয করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমরা আপনার জন্য একটি বস্ত্রের ছাউনী নির্মাণ করার মনস্থ করেছি। আপনি ওর মধ্যে অবস্থান করবেন এবং আপনার সওয়ারীগুলো পাশে তৈরি অবস্থায় থাকবে। তারপর আমরা শত্রুদের সঙ্গে মোকাবেলা করব। যদি আল্লাহ পাক আমাদের মান মর্যাদা রক্ষা করে শত্রুদের উপর বিজয় দান করেন তবে সেটা তো হবে আমাদের একান্ত আকাঙ্ক্ষিত ও পছন্দনীয়। আর আল্লাহ না করুন যদি আমরা অন্য অবস্থার সম্মুখীন হই তবে আপনি সওয়ারীর উপর আরোহণ করে আমাদের কওমের ঐ সকল লোকের নিকট চলে যাবেন যারা পিছনে রয়ে গেছেন। হে আল্লাহর নাবী (ﷺ)! প্রকৃতপক্ষে আপনার পিছনে এরূপ লোকেরা রয়েছেন যাঁদের তুলনায় আপনার প্রতি আমাদের ভালবাসা বেশী নয়। যদি তারা অনুমান করতে পারতেন যে, আপনি যুদ্ধের সম্মুখীন হয়ে পড়বেন তবে কখনই তারা পিছনে থাকতেন না। আল্লাহ তা‘আলা তাঁদের মাধ্যমে আপনাকে হিফাযত করবেন। তাঁরা আপনার শুভাকফঙ্ক্ষী এবং তাঁরা আপনার সঙ্গে থেকে যুদ্ধ করবেন।’
তাঁদের এ কথায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) খুশী হলেন ও তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাঁদের কল্যাণের জন্যে দুআ করলেন।
সাহাবীগণ যুদ্ধ ক্ষেত্রের উত্তর পূর্বে একটি উঁচু টিলার উপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জন্য আরীশ (তাঁবু) নির্মাণ করলেন যেখান থেকে পূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রটি দৃষ্টি গোচর হতো। তারপর তাঁর ঐ আরীশের রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে সা‘দ ইবনু মু’আয (রাঃ)-এর নেতৃত্বে আনসারী যুবকদের একটি বাহিনী নির্বাচন করা হলো।
এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সৈন্যদেরকে বিন্যস্ত করেন[1] এবং যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হন। সেখানে তিনি স্বীয় পবিত্র হাত দ্বারা ইশারা করে করে যাচ্ছিলেন, ‘এটা হবে ভাবীকাল ইনশাআল্লাহ[2] অমুকের বধ্যভূমি এবং এটা আগামী কাল হলে ইনশাআল্লাহ অমুকের বধ্যভূমি।’ এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সেখানে একটি গাছের মূলের পাশে রাত্রি যাপন করেন এবং মুসলিমরাও পূর্ণ শান্তিতে রাত্রি অতিবাহিত করেন। তাঁদের অন্তর আল্লাহর উপর ভরসায় পরিপূর্ণ ছিল। তাঁদের এ আশা ছিল যে, প্রত্যুষেই তাঁরা স্বচক্ষে প্রতিপালকের শুভ সংবাদের বাণী দেখতে পাবেন। আল্লাহ পাক বলেন,
(إِذْ يُغَشِّيْكُمُ النُّعَاسَ أَمَنَةً مِّنْهُ وَيُنَزِّلُ عَلَيْكُم مِّن السَّمَاء مَاء لِّيُطَهِّرَكُم بِهِ وَيُذْهِبَ عَنكُمْ رِجْزَ الشَّيْطَانِ وَلِيَرْبِطَ عَلٰى قُلُوْبِكُمْ وَيُثَبِّتَ بِهِ الأَقْدَامَ) [الأنفال:11].
‘‘স্মরণ কর, যখন আল্লাহ তাঁর নিকট হতে প্রশান্তি ধারা হিসেবে তোমাদেরকে তন্দ্রায় আচ্ছন্ন করেছিলেন, আকাশ হতে তোমাদের উপর বৃষ্টিধারা বর্ষণ করেছিলেন তোমাদেরকে তা দিয়ে পবিত্র করার জন্য। তোমাদের থেকে শায়ত্বনী পংকিলতা দূর করার জন্য, তোমাদের দিলকে মজবুত করার জন্য আর তা দিয়ে তোমাদের পায়ের ভিত শক্ত করার জন্য।’ (আল-আনফাল ৮ : ১১)
এ রাতটি ছিল হিজরী ২য় সনের ১৭ই রমাযানের জুমুআহর রাত। ঐ মাসেরই ৮ই অথবা ১২ই তারীখে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মদীনা থেকে রওয়ানা হয়েছিলেন।
[2] মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে আনাস (রাঃ) হতে, মিশকাত ২য় খন্ড ৫৪৩ পৃঃ।
অপরপক্ষে কুরাইশরা উপত্যকার বাইরে দিকে তাদের শিবিরে রাত্রি যাপন করে। আর প্রত্যুষে পুরো বাহিনী সহ টিলা হতে অবতরণ করে বদরের দিকে রওয়ানা হয়। একটি দল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাউযের দিকে অগ্রসর হয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘তাদেরকে ছেড়ে দাও।’ তাদের মধ্যে যেই পানি পান করেছিল সেই এ যুদ্ধে নিহত হয়েছিল। শুধু হাকীম ইবনু হিযামের প্রাণ বেঁচেছিল। সে পরে মুসলিম হয়েছিল এবং পাকা মুসলিমই হয়েছিল। তার নিয়ম ছিল যে, যখন সে দৃঢ় শপথ করত তখন বলত ঐ সত্ত্বার শপথ! যিনি আমাকে বদরের দিন হতে পরিত্রাণ দিয়েছেন।
ওদিকে কুরাইশ সৈন্যদলে মহা কোলাহল শুরু হয়েছে। কেউ অহংকার ভরে চিৎকার করছে এবং কেউ ক্রোধভরে মাটিতে পদাঘাত করছে। এ সময় কুরাইশ দলপতির আদেশক্রমে উমায়ের ইবনু অহাব নামক এক ব্যক্তি মুসলিমদের সংখ্যা নির্ণয় করার জন্য অশ্বরোহণে তাদের চারদিক প্রদক্ষিণ করে চলে যায়। স্বদলে ফিরে এসে উমায়ের বলতে শুরু করে মুসলিমদের সংখ্যা কমবেশি তিনশ হবে এবং তাদের পশ্চাতে সাহায্য করারও কেউ নেই। তরবারী ছাড়া আত্মরক্ষার জন্যে কোন উপকরণ তাদের সাথে নেই, এটাও আমি উত্তমরূপে বুঝতে পেরেছি। কিন্তু তারা এমন সুবিন্যস্তভাবে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হয়ে আছে যে, আমরা আমাদের একটি প্রাণের বিনিময় ছাড়া তাদের একটি প্রাণনাশ করতে পারবো না। কাজেই এ যুদ্ধে আমাদের পক্ষের অন্তত তিনশত প্রাণ উৎসর্গ না করে আমরা কোন ক্রমেই বিজয় লাভে সক্ষম হব না। যদি তারা আমাদের বিশেষ বিশেষ লোকদেরকে হত্যা করে ফেলে তবে এর পরে বেঁচে থাকার সাধ আর কী থাকতে পারে? অতএব, আমাদের কিছু চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে।’
উমায়েরের এ কথা শুনে যুদ্ধের ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্পকারী আবূ জাহেলের সামনে আরেক সমস্যা দেখা দিল। লোকারো তাকে যুদ্ধ করা ছাড়াই মক্কায় ফিরে যেতে বললো। হাকীম ইবনু হিযাম নামক কুরাইশ দলপতির চৈতন্যেদয় হল। তিনি দাঁড়িয়ে এক নীতি দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন এবং সকলকে বুঝাবার চেষ্টা করলেন যে, এ অন্যায় সমরে প্রবৃত্ত হওয়ার কোনই কারণ নেই, তিনশত প্রাণ বলি দিয়ে এ যুদ্ধে বিজয় লাভের সার্থকতাও কিছুই নেই। হাকীম বক্তৃতা দিয়ে ক্ষান্ত হলেন না। তিনি ‘উতবাহ ইবনু রাবীআহ নামক কুরাইশ দলপতির নিকট উপস্থিত হয়ে নিজের মনোভবতার কাছে ব্যক্ত করলেন। ‘উতবাহ হাকীমের কথার যৌক্তিকতা অস্বীকার করতে পারল না। হাকীম তখন আশান্বিত হয়ে বললেন, ‘দেখুন, আপনি ধনে মানে কুরাইশের একজন বরেণ্য ব্যক্তি। সুতরাং আপনি একটু দৃঢ়তা অবলম্বন করে এ অন্যায় যুদ্ধ হতে স্বজাতিকে বিরত রাখুন, তাহলে আরবের ইতিহাসে আপনার নাম চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’ ‘উতবাহ উত্তরে বলল, ‘আমি তো প্রস্তুত আছি। এক ‘আমর বিন হাযরামীর (যে সারিয়্যায়ে নাখলাহতে মারা গিয়েছিল) রক্তপণ, সেটাও আমি নিজে পরিশোধ করে দিতে পারি। কিন্তু হানযালিয়ার পুত্রকে (আবূ জাহল) কোন যুক্তির দ্বারাই বিরত রাখা সম্ভব নয়। যাহোক, তুমি তার কাছে গিয়ে চেষ্টা করে দেখো, তোমার প্রস্তাবে আমার সম্মতি রয়েছে।’
তারপর ‘উতবাহ দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখতে লাগল। বলল, ‘হে কুরাইশগণ! তোমরা মুহাম্মাদ (ﷺ), তাঁর সঙ্গীদের সাথে যুদ্ধ করে কোন বাহাদুরী করবেনা। আল্লাহর শপথ! যদি তোমরা তাঁদেরকে হত্যা করে ফেল তাহলে এমন চেহেরাসমূহ দেখতে পাওয়া যাবে যেগুলোকে দেখা পছন্দনীয় হবে না। কেননা এ যুদ্ধে হয় চাচাতো ভাই নিহত হবে নতুবা খালাতো ভাই কিংবা নিজের গোত্রেরই লোক নিহত হবে। সুতরাং ফিরে চল এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) ও গোটা আরব দুনিয়াকে ছেড়ে দাও। যদি আরবের অন্য লোকেরা মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে হত্যা করে ফেলে তাহলে তো সেটা তোমাদের কাঙ্খিত কাজই হবে। অন্যথা মুহাম্মাদ (ﷺ) তোমাদেরকে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখবেন যে, তোমরা তাঁর প্রতি তোমাদের করণীয় কাজটি করো নি।
এদিকে হাকীম আবূ জাহলের নিকট হাযির হয়ে নিজের ও ‘উতবাহর মতামত ব্যক্ত করলেন। হাকীমের কথা শুনে আবূ জাহলের আপাদমস্তক জ্বলে উঠল। সে ক্রোধান্বিত স্বরে বলতে লাগল, আল্লাহর শপথ, মুহাম্মাদ ও তার সাথীদের দেখার পর ‘মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর যাদু ‘উতবাহর উপর বিশেষ কার্যকরী হয়েছে। কক্ষনো না, আল্লাহর শপথ! আমাদের ও মুহাম্মাদের মধ্যে আল্লাহর ফায়সালা না হওয়া পর্যন্ত আমরা ফিরে যাব না। না, না এতক্ষণে বুঝতে পেরেছি, ‘উতবাহর পুত্র মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর দলভুক্ত (‘উতবাহর পুত্র আবূ হুযাইফা (রাঃ) প্রথম পর্যায়ের মুসলিম ছিলেন এবং হিজরত করে মদীনায় গিয়েছিলেন)। সে যুদ্ধ ক্ষেত্রে উপস্থিত। তার নিহত হওয়ার আশঙ্কায় নরাধম এমন বিচলিত হয়ে পড়েছে। ধিক্ শত ধিক তাকে।’
হাকীম তখন আবূ জাহলকে সেখানে রেখে ‘উতবাহর নিকট গমন করে সমস্ত বৃত্তান্ত প্রকাশ করলেন। ক্রোধ, অভিমান ও অহংকারে ‘উতবাহ একেবারে আতমবিস্মৃত হয়ে পড়লো। সে বলে উঠল, কী, আমি ভীরু? আমি কাপুরুষ? পুত্রের মায়ায় আমি বীরধর্মে জলাঞ্জলি দিচ্ছি। আচ্ছা, তাহলে আরববাসী দেখুক, জগদ্বাসী দেখুক যে, কে বীর পুরুষ, আমি ততক্ষণ ফিরব না যতক্ষণ না মুহাম্মাদের সঙ্গে একটা চূড়ান্ত বোঝাপড়া হয়। এ বলে সে সদল বলে সমরাঙ্গনে এগিয়ে চলল। আর ওদিকে আবূ জাহল ছুটে গিয়ে ‘আমির ইবনু হযরামীকে বলল, ‘দেখছ কি, তোমার ভ্রাতার প্রতিশোধ গ্রহণ আর সম্ভব হবে না। কাপুরুষ ‘উতবাহ সদল বলে যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করে যাচ্ছে। শীঘ্র উঠে আর্তনাদ করতে শুরু কর।’
আবূ জাহলের কথা শেষ হতে না হতেই ‘আমির তার সকল অঙ্গে ধূলো বালি মাখতে মাখতে এবং গায়ের কাপড় ছিঁড়তে ছিঁড়তে নিহত ভ্রাতার নাম নিয়ে আর্তনাদ করে বেড়াতে লাগল। আর যায় কোথায়, মুহূর্তের মধ্যে হাকীমের সমস্ত পরিশ্রম পশু হয়ে গেল। ক্ষণিকের মধ্যেই রণ পিপাসু মুশরিক বাহিনীর বীভৎস চিৎকার দিগ্বিদিক ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত করে তুলল এবং রণাঙ্গন প্রকম্পিত হয়ে উঠল।