আর-রাহীকুল মাখতূম আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী (রহঃ) ৪৩৪ টি
আর-রাহীকুল মাখতূম আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী (রহঃ) ৪৩৪ টি
গৃহ থেকে গুহা পর্যন্ত (مِنْ الدَّارِ إِلَى الْغَارِ):

রাসূলুল্লাহ ২৭শে সফর চতুর্দশ নবুওয়াত সাল মোতাবেক ১২/১৩ই সেপ্টেম্বর, ৬২২[1] খ্রিষ্টাব্দ মধ্যরাতের সামান্য কিছু সময় পর নিজ গৃহ থেকে বাহির হয়ে জান-মালের ব্যাপারে সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য সঙ্গী আবূ বাকর (রাঃ)-এর গৃহে গমন করেছিলেন এবং সেখান থেকে পিছনের একটি জানালা দিয়ে বাহির হয়ে দুজনই পথ বেয়ে অগ্রসর হতে থাকেন যাতে রাতের অন্ধকার থাকতেই তারা মক্কা নগরীর বাহিরে চলে যেতে সক্ষম হন। কারণ, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জানতেন যে, কুরাইশগণ তাঁকে দেখতে না পেলে সর্বশক্তি দিয়ে তার সন্ধানে লেগে পড়বে এবং সর্বপ্রথম যে রাস্তায় দৃষ্টি দেবে তা হচ্ছে মদীনার কর্মব্যস্ত রাস্তা যা উত্তর দিকে গেছে। এ জন্য তাঁরা সেই পথে যেতে থাকলেন যে পথটি ছিল সেই পথের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। অর্থাৎ ইয়ামান যাওয়ার পথ যা মক্কার দক্ষিণে দিকে অবস্থিত ছিল। এ পথ ধরে পাঁচ মাইল দূরত্ব অতিক্রম করে সুপ্রসিদ্ধ সওর পর্বতের পাদদেশে গিয়ে পৌঁছলেন। এ পর্বতটি ছিল খুব উঁচু, পর্বত শীর্ষে আরোহণের পথ ছিল অাঁকা-বাঁকা ও পাক জড়ানো। আরোহণের ব্যাপারটিও ছিল অত্যন্ত আয়াস-সাধ্য। এ পর্বত গাত্রের এখানে-সেখানে ছিল প্রচুর ধারালো পাথর যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পদযুগলকে ক্ষত-কিক্ষত করে ফেলেছিল। বলা হয়েছে যে, তিনি পদচিহ্ন গোপন করার জন্য আঙ্গুলের উপর ভর দিয়ে চলছিলেন। এ জন্য তাঁর পা জখম হয়েছিল। যাহোক, আবূ বাকর (রাঃ)-এর সহায়তায় তিনি পর্বতের শৃঙ্গদেশে অবস্থিত গুহার পাশে গিয়ে পৌঁছলেন। এ গুহাটিই ইতিহাসে ‘গারে সওর বা সওর গুহা’ নামে পরিচিত।[2]

[1] রাহমাতুল্লিল আলামীন ১ম খন্ড ৯৫ পৃঃ। সফরের এ মাস চতুর্দশ নবুওয়াত বর্ষের ঐ সময় হবে যখন বৎসর আরম্ভ হবে মুহারম মাসে। আর যদি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যে মাসে নবুওয়াত প্রাপ্ত হয়েছিলেন সে মাস থেকে বৎসর গণনা করা হয়ে থাকে তাহলে তা ছিল নবুওয়াত ত্রয়োদশ বর্ষের সফর মাসে। সাধারণ ইতিহাসবিদগণ প্রথম হিসাবটি গ্রহণ করেছেন। আর যাঁরা দ্বিতীয়টি গ্রহণ করেছেন, তাঁরা ঘটনার ক্রমধারায় ভুল করেছেন। আমি মুহাররম থেকে বছরের শুরু ধরেছি।

[2] রহমাতুল্লিল আলামীন ১ম খন্ড ৯৫ পৃঃ। শাইখ আবদুল্লাহ মুখাতসারুস ১৬৭ পৃঃ।

গুহার নিকট উপস্থিত হয়ে আবূ বাকর (রাঃ) বললেন, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে আপনি এখন গুহায় প্রবেশ করবেন না। প্রথমে আমি প্রবেশ করে দেখি এখানে অসুবিধাজনক কোন কিছু আছে কিনা। যদি তেমন কিছু থাকে তাহলে প্রথমে তা আমার সম্মুখীন হবে এবং এর ফলে আপনাকে প্রাথমিক অসুবিধার সম্মুখীন হতে হবে না। এ কথা বলার পর আবূ বাকর (রাঃ) গর্তের ভিতরে প্রবেশ করলেন এবং প্রথমে গর্তটি পরিষ্কার করে নিলেন। গর্তের এক পাশে কিছু ছিদ্র ছিল। নিজের কাপড় টুকরো টুকরো করে তিনি ছিদ্রপথের মুখগুলো বন্ধ করে দিলেন। কিন্তু কাপড়ের টুকরোর ঘাটতির কারণে দুটো ছিদ্র মুখ বন্ধ করা সম্ভব হল না। আবূ বাকর (রাঃ) ছিদ্র দুটোর মুখে নিজ পদদ্বয় স্থাপন করার পর ভিতরে আগমনের জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট আরয করলেন। তিনি ভিতরে প্রবেশ করে আবূ বাকর (রাঃ)-এর উরুতে মাথা রেখে শুয়ে পড়লেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লেন।

এদিকে আবূ বাকর (রাঃ)-এর পায়ে ছিদ্র মধ্যস্থিত স্বর্প কিংবা বিচ্ছু কোন কিছুতে দংশন করল। তিনি বিষে কাতর হয়ে উঠলেন অথচ নড়াচড়া করলেন না এ ভয়ে যে, এর ফলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ঘুম ভেঙ্গে যেতে পারে। এদিকে বিষের তীব্রতায় তাঁর চক্ষু যুগল থেকে অশ্রু ঝরতে থাকল এবং সেই আশ্রু বিন্দু ঝরে পড়ল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মুখমণ্ডলের উপর। এর ফলে তাঁর ঘুম ভেঙ্গে গেলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আবূ বাকর (রাঃ)! তোমার কী হয়েছে?’’

তিনি আরয করলেন, ‘আমার মাতা-পিতা আপনার জন্য কুরবান হউক, গর্তের ছিদ্র পথে কোন কিছু আমার পায়ে কামড় দিয়েছে। এ কথা শ্রবণের পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজের মুখ থেকে কিছুটা লালা নিয়ে সেই ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিলেন। ফলে আবূ বাকর (রাঃ)-এর দংশন জনিত বিষব্যথা দূরীভূত হল।[1] এ পর্বত গুহায় তাঁরা উভয়ে একাদিক্রমে তিন রাত্রি (শুক্র, শনি ও রবিবার রাত্রি) অবস্থান করলেন।[2] আবূ বাকর (রাঃ)-এর পুত্র আব্দুল্লাহও ঐ সময় একই সঙ্গে সেখানে রাত্রি যাপন করতেন। ‘আয়িশাহ (রাঃ)-এর বর্ণনাতে তিনি ছিলেন একজন কর্মঠ, বুদ্ধিমান ও ধীশক্তিসম্পন্ন যুবক। সকলের অগোচরে রাত গভীর হলে তিনি সেখানে যেতেন এবং সাহরী সময়ের পূর্বেই মক্কায় ফিরে এসে মক্কাবাসীগণের সঙ্গে মিলিত হতেন। এতে মনে হতো যেন তিনি মক্কাতেই রাত্রি যাপন করেছেন। গুহায় আত্মগোপনকারীগণের বিরুদ্ধে মুশরিকগণ যে সকল ষড়যন্ত্র করত তা অত্যন্ত সঙ্গোপনে তিনি তাঁদের নিকট পৌঁছিয়ে দিতেন।

এদিকে আবূ বাকর (রাঃ)-এর গোলাম ‘আমির বিন ফুহাইরা পর্বতের ময়দানে ছাগল চরাত এবং যখন রাত্রির এক অংশ অতিবাহিত হয়ে যেত তখন সে ছাগল নিয়ে গারে সওরের নিকটে যেত এবং আত্মগোপনকারী নাবী (ﷺ) এবং তাঁর সাহাবীকে (রাঃ) দুগ্ধ পান করাত। আবার প্রভাত হওয়ার প্রাক্কালে সে ছাগলের পাল নিয়ে দূরে চলে যেত। পরপর তিন রাত্রেই সে এরূপ করল।[3] অধিকন্তু, আব্দুল্লাহ বিন আবূ বকরের গমনাগমন পথে তাঁর পদ চিহ্নগুলো যাতে মিশে যায় তার জন্য ‘আমির বিন ফুহাইরা সেই পথে ছাগল খেদিয়ে নিয়ে যেত।[4]

[1] উমার বিন খাত্তাব থেকে ইমাম রাযীন একথা বর্ণনা করেছেন। এ রেওয়ায়েতে এটা আছে যে, মৃত্যুর প্রান্তকালে এ বিষ তাঁর দেহে প্রতিক্রিয়া করল এবং এটাই ছিল তাঁর মৃত্যুর প্রত্যক্ষ কারণ, মিশকাত ২য় খন্ড ৫৫৬ পৃঃ। বাবু মানাকেবে আবূ বকর দ্রঃ।

[2] ফাতহুল বারী ৭ম খন্ড ৩৩৬ পৃঃ।

[3] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৫৫৩-৫৫৪ পৃঃ।

[4] ইবনে হিশাম ১ম খন্ড ৪৮৬ পৃঃ।

এদিকে কুরাইশদের অবস্থা এই ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে হত্যার উন্মাদনায় উন্মত্ত অবস্থায় রাত্রি অতিবাহিত করার পর প্রভাতে যখন তারা নিশ্চিতভাবে জানতে পারল যে, তিনি তাদের আয়ত্বের বাইরে চলে যেতে সক্ষম হয়েছেন, তখন তারা একদম দিশেহারা হয়ে পড়ল এবং ক্রোধের আতিশয্যে ফেটে পড়তে চাইল। তাদের ক্রোধের প্রথম শিকার হলেন আলী (রাঃ)। তাঁকে টেনে হিঁচড়ে ক্বাবা’হ গৃহ পর্যন্ত নিয়ে গেল এবং প্রায় এক ঘন্টা কাল যাবৎ তাঁর উপর নানাভাবে নির্যাতন চালাল যাতে তার নিকট থেকে তাঁদের দুজনের সম্পর্কে খোঁজ খবর কিছুটা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।[1] কিন্তু তাঁর কাছ থেকে কোন সংবাদ গ্রহণ করা সম্ভব না হওয়ায় আবূ বাকর (রাঃ)-এর গৃহের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল এবং সেখানে গিয়ে দরজায় করাঘাত করল। দরজার করাঘাত শুনে আসমা বিনতে আবূ বাকর (রাঃ) বের হলেন। তারা তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার পিতা কোথায় আছেন?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহই ভাল জানেন, আমি জানি না আববা কোথায় আছেন?’ এতে কমবখত খবীস আবূ জাহল তাঁর গন্ডদেশে এমন জোরে চপেটাঘাত করল যে, সে ব্যথার চোটে চিৎকার করে উঠল এবং তার কানের বালী খুলে পড়ে গেল।[2]

এরপর কুরাইশগণ একটি তড়িঘড়ি সভা করে সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল যে, তাঁদের ধরার জন্য অনতিবিলম্বে সম্ভাব্য সর্বপ্রকার ব্যবস্থা অবলম্বন করা হোক। ফলে মক্কা থেকে বেরিয়ে যে দিকে যত পথ গেছে সকল পথেই অত্যন্ত কড়া সশস্ত্র পাহারা বসিয়ে দেয়া হল। অধিকন্তু, সর্বত্র এ ঘোষণাও প্রচার করে দেয়া হল যে, যদি কেউ মুহাম্মাদ (ﷺ) এবং আবূ বাকর (ﷺ)-কে অথবা দুজনের যে কোন একজনকে জীবন্ত কিংবা মৃত অবস্থায় হাজির করতে পারবে তাকে একশত উষ্ট্রের সমন্বয়ে একটি অত্যন্ত মূল্যবান পুরষ্কার প্রদান করা হবে।[3]

এই প্রচারনার ফলে বিভিন্ন বাহনারোহী, পদাতিক ও পদচিহ্নবিশারদগণ অত্যন্ত জোরে শোরে অনুসন্ধান কাজ শুরু করে দিল। প্রান্তর, পর্বতমালা, শস্যভূমি, বিরান অঞ্চল সর্বত্রই তারা অনুসন্ধান কাজ চালিয়ে যেতে থাকল, কিন্তু ফল হল না কিছুই।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও আবূ বাকর (রাঃ) যে পর্বত গুহায় আত্মগোপন করে ছিলেন অনুসন্ধানকারীগণ সে গুহার প্রবেশ পথের পার্শ্বদেশে পৌঁছে গেল, কিন্তু আল্লাহ আপন কাজে জয়ী হলেন। সহীহুল বুখারী শরীফে আনাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে যে, ‘আবূ বাকর (রাঃ) বলেছেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে গুহায় থাকা অবস্থায় মাথা তুলে মানুষের পা দেখতে পেলাম।’ আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর নাবী (ﷺ) তাদের মধ্যে কেউ যদি শুধু নিজ দৃষ্টি নীচের দিকে নামায় তাহলেই আমাদেরকে দেখে ফেলবে।’

তিনি বললেন,‏[‏اُسْكُتْ يَا أَبَا بَكْرٍ، اِثْنَانِ، اللهُ ثَالِثُهُمَا‏]‏ ‘আবূ বাকর (রাঃ) চুপচাপ থাক। আমরা দুজন, আর তৃতীয় জন আছেন আল্লাহ তা‘আলা।’ অন্য একটি বর্ণনায় ভাষা এরূপ আছে, ‏[‏مَا ظَنُّكَ يَا أَبَا بَكْرٍ بِاِثْنَيْنِ اَللهُ ثَالِثُهُمَا] ‘হে আবূ বাকর (রাঃ) এরূপদুজন লোক সম্পর্কে তোমার কী ধারণা যাদের তৃতীয়জন হলেন আল্লাহ।[4]

প্রকৃত কথা হচ্ছে এটা ছিল একটি মো'জেযা (অলৌকিক ঘটনা) যা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নাবী (ﷺ)-কে প্রদান করেছিলেন। কাজেই অনুসন্ধানকারীগণ সে সময় ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হল যেখানে তিনি (ﷺ) ও তাদের মধ্যে ব্যবধান ছিল কয়েক ফুটেরও কম।

[1] রহমাতুল্লিল আলামীন ১ম খন্ড ৯৬ পৃঃ।

[2] ইবনে হিশাম ১ম খন্ড ৪৮৭ পৃঃ।

[3] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৫৫৪ পৃঃ।

[4] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৫১৬, ৫৫৮ পৃঃ। এক্ষেত্রে অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে যে, আবূ বকর (রাঃ)-এর অস্থিরতার কারণ নিজ প্রাণের ভয় নয় বরং এর একমাত্র কারণ ছিল যা এ রিওয়ায়েতে বর্ণনা করা হয়েছে যে, যখন আবূ বকর (রাঃ) পদরেখা বিশারদগণকে দেখেছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সম্পর্কে তাঁর চিন্তা হল। তিনি বললেন, ‘আমি যদি মারা যাই তবে কেবলমাত্র আমি একজন লোকই মরব। কিন্তু যদি আপনাকে হত্যা করা হয়, তাহলে পুলো উম্মতটাই ধ্বংস হয়ে যাবে। এ সময় রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছিলেন ‘চিন্তা করবেন না। অবশ্যই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। দ্রঃ শেখ আব্দুল্লাহ কৃত মুখতাসারুস সীরাহ ১৬৮ পৃঃ।
মদীনার পথে (فِي الطَّرِيْقِ إِلَى الْمَدِيْنَةِ):

তিনদিন যাবৎ নিস্ফল দৌড়ঝাঁপ এবং খোঁজাখুঁজির পর যখন কুরাইশদের আকস্মিক প্রজ্জ্বলিত ক্রোধাগ্নি কিছুটা প্রশমিত হওয়ায় অনুসন্ধান কাজের মাত্রা মন্দীভূত হয়ে এল এবং তাদের উৎসাহ উদ্দীপনা কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ল তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং আবূ বাকর (রাঃ) মদীনার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করার জন্য সংকল্পবদ্ধ হলেন। আব্দুল্লাহ বিন আরীকাত লাইসী যিনি সাহারা জনমানবশুন্য পথ সম্পর্কে অভিজ্ঞ ছিলেন, মদীনায় পৌঁছিয়ে দেয়ার জন্য পূর্বে তাঁর সঙ্গে চুক্তি ও মজুরী নির্ধারিত হয়েছিল এবং তার নিকট দুটি বাহনও রাখা হয়েছিল। ঐ ব্যক্তি তখনো কুরাইশ মূর্তিপূজকদের দলভুক্ত থাকলেও পথ প্রদর্শক হিসেবে তাঁর উপর নির্ভর করার ব্যাপারে সন্দেহের কোন অবকাশ ছিল না। তাঁর সঙ্গে এ মর্মে কথাবার্তা ছিল যে, তিন রাত্রি অতিবাহিত হওয়ার পর চতুর্থ রাত্রিতে বাহন দুটি নিয়ে তাকে গারে সওর পৌঁছতে হবে। সেই কথা মোতাবেক সোমবারের দিবাগত রাত্রিতে বাহন দুটি নিয়ে উপস্থিত হয়ে (সেটি ছিল ১ম হিজরী সনের রবিউল আওয়াল মাসের চাঁদনী রাত মোতাবেক ১৬ই সেপ্টেম্বর ৬২২ খ্রিষ্টাব্দ) বললেন ইয়া রাসূলুল্লাহ (ﷺ)! আমার বাহন দুটির মধ্যে একটি আপনি গ্রহণ করুন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, মূল্যের বিনিময়ে।

এদিকে আসমা বিনতে আবূ বাকর (রাঃ) সফরের সামগ্রী নিয়ে এলেন কিন্তু তাতে ঝুলানোর জন্য বন্ধনের রশি লাগাতে ভুলে গিয়েছিলেন। যখন যাত্রার সময় হয়ে এল এবং আসমা (রাঃ) সামগ্রী ঝুলাতে গিয়ে দেখলেন তাতে বন্ধন রশি নেই, তখন তিনি তাঁর কোমরবন্ধ খুললেন এবং তা দু ভাগে ভাগ করে ছিঁড়ে ফেললেন। তারপর এক অংশের সাহায্যে সামগ্রী ঝুলিয়ে দিলেন এবং দ্বিতীয় অংশের সাহায্যে কোমর বাঁধলেন। এ কারণেই তার উপাধি হয়েছিল যাতুন নিত্বাক্বাইন।[1]

এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও আবূ বাকর (রাঃ) উটের পিঠে আরোহণ করলেন। ‘আমর বিন ফুহায়রাও সঙ্গে ছিলেন। পথ প্রদর্শক আব্দুল্লাহ বিন আরীকাত মদীনা যাত্রার সাধারণ পথে না গিয়ে লোহিত সাগরের উপকূলের পথ ধরলেন। সর্বপ্রথম সওর গুহা হতে যাত্রা আরম্ভ করে তিনি (পথ প্রদর্শক) ইয়ামেনের পথে যাত্রা করলেন এবং দক্ষিণ দিকে অনেক দূর পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। তার পরে পশ্চিমদিকে ঘুরে সমুদ্রোপকূলের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেলেন। তারপরে এমন এক পথে নিয়ে গেলেন যে পথের সন্ধান সাধারণ লোকেরা জানত না। এরপর উত্তর দিকে মোড় নিলেন যে পথ লোহিত সাগরের খুব কাছাকাছি ছিল। এপথে খুব অল্প মানুষ চলাচল করত।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ পথে যে সকল স্থান দিয়ে অতিক্রম করেছিলেন ইবনে ইসহাক্ব তার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন পথপ্রদর্শক যখন তাদের দুজনকে নিয়ে বের হলেন তখন মক্কার নিম্নভূমি অঞ্চল দিয়ে নিয়ে গেলেন এরপর উপকূল দিয়ে চলতে চলতে ‘উসফানের নিম্ন দিয়ে পথ কাটলেন। এরপর আমাজের নিম্নদিয়ে এগিয়ে চললেন এবং কুদাইদ পার হয়ে রাস্তা কাটলেন। তারপর সান্নায়াতুল মাররাহ দিয়ে তারপরে লিক্বফ দিয়ে তার পরে লিক্বফের বিস্তৃতি ভূমি অতিক্রম করেন। তারপর হাজ্জাজের বিস্তৃীর্ণ ভূমিতে পৌঁছলেন এবং সেখান থেকে মিযাযের মোড় দিয়ে অতিক্রম করেন। তারপর যুল গুযওয়াইনের মোড়ের শস্য শ্যামল ভূমিতে যান। তারপরে যূ কাশর মাঠে প্রবেশ করে জুদাজাদের দিকে যান এবং সেখান থেকে আজরাদে পৌঁছেন। এরপর মাদজালাহ তি’হিনের বিস্তৃীর্ণ অঞ্চলের পাশ দিয়ে যু সালাম অতিক্রম করেন। সেখান থেকে আবাবীদ তাপরে ফাজহ অভিমুখে যাত্রা করেন। তারপরে ‘আরজে অবতরণ করলেন। তারপরে রকূবার ডান পার্শ্ব দিয়ে সান্নায়াতুল ‘আয়িরে গেলেন এবং রি’ম উপত্যকায় অবতরণ করেন। এরপরই কুবায় গিয়ে পৌঁছলেন।[2]

[1] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৫৫৩-৫৫৫ পৃঃ। ইবনে হিশাম ১ম খন্ড ৪৮৬ পৃঃ।

[2] ইবনে হিশাম ১ম খন্ড ৪৯১-৪৯২ পৃঃ।
পথে ঘটিত কতিপয় বিচ্ছিন্ন ঘটনা (وَهَاكَ بَعْضُ مَا وَقَعَ فِي الطَّرِيْقِ):

১. সহীহুল বুখারী শরীফে আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘আমরা (গারে সওর থেকে বেরিয়ে) একটানা সারা রাত এবং পরের দিন দুপুর পর্যন্ত চলতে থাকলাম। রোদের প্রখরতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ক্রমান্বয়ে পথচারীর সংখ্যা কমতে থাকল এবং ঠিক দুপুরে পথ জনশূন্য হয়ে গেল। আমরা তখন দীর্ঘ বড় পাথর দেখতে পেলাম যার ছায়ায় তখনো রোদ আসেনি। আমরা সেখানে নেমে পড়লাম। আমি নিজ হাতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর শয়নের জন্য একটি জায়গা সমতল করে দিলাম এবং সেখানে একখানা চাদর পেতে দিয়ে বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আপনি এখানে শয়ন করুন আর আমি আপনার আশ-পাশের সব কিছু দেখাশুনা করছি। তিনি শয়ন করলেন এবং আমি সামনে ও পেছনের খোঁজ খবর নেওয়া এবং দেখাশোনার জন্য বেরিয়ে পড়লাম। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম একজন রাখাল তার ছাগলের পাল নিয়ে পাথরের দিকে চলে আসছে। সেই পাথর থেকে সেও ঐ জিনিসই চাচ্ছে যা আমরা চেয়েছিলাম। আমি তাকে বললাম, ‘হে যুবক তুমি কার লোক?’

সে মক্কা অথবা মদীনার কোন লোকের কথা বলল। আমি তাকে বললাম, ‘তোমার ছাগীর ওলানে কি কিছু দুধ আছে?’ সে বলল, ‘হ্যাঁ’’। আমি পুনরায় বললাম, ‘সেটি কি দোহন করতে পারি?’ সে বলল, ‘হ্যাঁ’’। তারপর সে একটি ছাগী ধরে নিয়ে এল। আমি বললাম, ‘মাটি, খড়কুটো এবং লোম থেকে ওলানটা পরিষ্কার করে নাও। পরিষ্কার করে নেয়ার পর একটি পেয়ালায় অল্প কিছুটা দুধ দোহন করল। তারপর দুধটুকু আমি একটি চামড়ার পাত্রে ঢেলে নিলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পানি এবং ওযুর জন্য ঐ পাত্রটি আমি সঙ্গে নিয়েছিলাম।

আমি দুগ্ধ পাত্র হাতে রাসূলুল্লাহর নিকট এসে দেখি তখনো তিনি ঘুমন্ত অবস্থায় রয়েছেন। কাজেই, তাকে ঘুম থেকে জগানোর সাহস হল না। তারপর যখন তিনি জাগ্রত হলেন তখন আমি দুধের মধ্যে কিছুটা পানি ঢেলে দিলাম যাতে দুধের তলদেশ ঠান্ডা হয়ে যায় এবং বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এ দুগ্ধটুকু পান করুন’’, তিনি পান করলেন। তাকে পান করানোর সুযোগ প্রদানের জন্য আনন্দ উদ্বেল চিত্তে আল্লাহর সমীপে শুকরিয়া আদায় করলাম।

দুগ্ধ পানের পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘এখনো কি যাত্রার সময় হয়নি?’

আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল কেন হবে না, যাত্রার উপযুক্ত সময় হয়েছে,’ তারপর আমরা পুনরায় যাত্রা শুরু করলাম।[1]

২. এই প্রবাস যাত্রাকালে আবূ বাকর (রাঃ) সাধারণতঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর রাদীফ থাকতেন। অর্থাৎ তিনি বাহনে নাবী (ﷺ)-এর পিছনে বসতেন। তিনি পিছনে বসতেন এ কারণে যে, তার মধ্যে বার্ধক্যের চিহ্ন প্রকাশ পেয়েছিল এবং মানুষের দৃষ্টি প্রথমেই তার উপরেই পড়তো। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মধ্যে তখনো যৌবনের চিহ্ন পরিষ্ফুট ছিল এজন্য তার প্রতি মানুষের দৃষ্টি অপেক্ষাকৃত কম যেতো। এর ফল ছিল কোন লোকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে সে আবূ বাকর (রাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করত আপনার সম্মুখের লোকটি কে? আবূ বাকর (রাঃ)-এর এক অত্যন্ত সূক্ষ্ণ উত্তর প্রদান করতেন। বলতেন, ‘এই লোকটি আমাকে পথ বলে দিচ্ছেন। এতে লোকেরা সহজভাবে পথের কথাই বুঝতেন। কিন্তু এ কথার মাধ্যমে তিনি কল্যাণের পথকেই বোঝাতে চেয়েছেন।[2]

৩. এই প্রবাস যাত্রাকালে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) খুযা’আহ গোত্রের উম্মু মা’বাদের তাঁবুদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করেন। ইনি একজন নামকরা স্বাস্থ্যবান মহিলা ছিলেন। হাতে হাঁটু ধারণ করে তাঁবুর অঙ্গনে বসে থাকতেন এবং গমনাগমনকারীদেরকে পানাহার করাতেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন আপনার নিকট কিছু আছে? তিনি বললেন, ‘আমার নিকট যদি কিছু থাকত তাহলে আল্লাহর ওয়াস্তে আপনাদের মেহমানদারীতে কোন প্রকার ত্রুটি হতো না। ঘরে তেমন কিছুই নেই, বকরীগুলোও রয়েছে দূরদূরান্তে। সময়টা ছিল দূর্ভিক্ষ কবলিত।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দেখলেন তাঁবুর এক কোনে একটি বকরী রয়েছে।

তিনি বললেন, ‘হে উম্মু মা’বাদ, এটা কেমন বকরী? মহিলা বললেন, ওর দুর্বলতার কারণে ওকে দলের বাহিরে রাখা হয়েছে। নাবী (ﷺ) বললেন ওর ওলানে কি কিছু দুধ আছে? তিনি বললেন, ‘দুধ দানের মতো তার কোন শক্তিই নেই।’ নাবী (ﷺ) বললেন, ‘অনুমতি দিলে আমি তাকে দোহন করি’’।

মহিলা বললেন, ‘হ্যাঁ’’, আমার মাতা-পিতা আপনার জন্য কুরবান হোক। যদি আপনি ওলানে দুধ দেখতে পান তবে অবশ্যই দোহন করবেন।’

এ কথাবার্তার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বকরীটির ওলানের উপর হাত ফিরালেন, আল্লাহর নাম নিলেন এবং দু’আ করলেন। তারপর বকরীটা তার পেছনের পা দুটি বিস্তার করল এবং তার ওলান দুধে ভরপুর হয়ে উঠল।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উম্মু মা’বাদের বেশ বড় আকারের একটি পাত্র নিলেন এবং এত পরিমাণ দুধ দোহন করলেন যে, দুধের ফেনা পাত্রের উপরে উঠে গেল। দুধ দোহনের পর উম্মু মা’বাদকে পান করালেন। তিনি দুগ্ধপানে পূর্ণরূপে পরিতৃপ্ত হলেন। তারপর সঙ্গী সাথীদের পান করালেন। পূর্ণ পরিতৃপ্তির সঙ্গে সকলকে পান করানোর পর তিনি নিজে পান করলেন। দ্বিতীয় বারেও তিনি এত পরিমাণ দুধ দোহন করলেন যে, পাত্র ভরে গেল। এ দুগ্ধ উম্মু মা’বাদের নিকট রেখে দিয়ে তিনি সঙ্গীদের সহ মদীনার পথে অগ্রসর হলেন।

অল্পক্ষণ পরেই তাঁর স্বামী আবূ মা’বাদ আপন দুর্বল বকরী যা দুর্বলতা হেতু ধীরে ধীরে পায়ে হাঁটছিল হাঁকাতে হাঁকাতে এসে পৌঁছল। পাত্রভর্তি দুধ দেখে তিনি বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়লেন। তাঁর সহধর্মিনীকে জিজ্ঞেস করলেন, এ দুধ তুমি কোথায় পেলে? সে ক্ষেত্রে দুগ্ধবতী বকরীগুলো দূর চারণ ভূমিতে ছিল এবং বাড়িতে কোন দুগ্ধবতী বকরীই ছিলনা, সেক্ষেত্রে পাত্রে এত দুধ এল কোথায় থেকে?

স্ত্রী উম্মু মা’বাদ তাঁর স্বামীকে সেই বরকতময় মেহমানের কথা জানালেন যিনি পথ চলার সময় তাঁর গৃহে আগমন করেন এবং যেভাবে যা ঘটেছিল তা সবিস্তারে বর্ণনা করলেন। এ সব কথা শ্রবণের পর স্বামী আবূ মা’বাদ বললেন, ‘একে তো ঠিক সেই লোক বলে মনে হচ্ছে যাঁকে কুরাইশগণ খুঁজে বেড়াচ্ছেন।’ আবূ মা’বাদ পুনরায় তাঁর স্ত্রীকে বললেন, ‘আচ্ছা তাঁর আকৃতি প্রকৃতি বর্ণনা কর দেখি।’

স্বামীর এ কথা শ্রবণের পর উম্মু মা’বাদ অত্যন্ত জীবন্ত ও আকর্ষণীয়ভাবে তাঁর গুণাবলী ও যোগ্যতার এমন একটি নকশা অংকণ করলেন তাতে মনে হল শ্রবণকারীগণ যেন তাঁকে চোখের সম্মুখেই দেখছে (কিতাবের শেষ ভাগে সেই গুণগুলোর কথা উল্লে­খিত হবে)। মেহমানের এ সকল গুণের কথা অবগত হয়ে আবূ মা’বাদ বললেন, ‘আল্লাহর শপথ! ইনি তো কুরাইশদের সেই সাথী লোকেরা যাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন প্রকার কথা বলছেন। আমার ইচ্ছা তাঁর বন্ধুত্ব গ্রহণ করি এবং যদি কোন পথ পাই তাহলে অবশ্যই তা করব। এদিকে মক্কায় একটি ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়ছে যা মানুষ শুনতে পাচ্ছে কিন্তু বক্তাকে দেখতে পাচ্ছে না। কথাগুলো ছিল এরূপ :

جزى الله رب العرش خير جزائـه ** رفيقين حَلاَّ خيمــتى أم مَعْبَـدِ

هـمـا نزلا بالبِــرِّ وارتحلا بـه ** وأفلح من أمسى رفيق محمــد

فيا لقُصَىّ مــا زَوَى الله عنكـم ** به من فعال لا يُحَاذى وسُــؤْدُد

لِيَهْنِ بني كعـب مكــان فَتاتِهـم ** ومقعدُهـا للمؤمنـين بَمْرصَـد

سَلُوْا أختكم عن شاتهـا وإنائهـا ** فإنكم إن تسألوا الشاة تَشْـهَـد

অর্থঃ আরশের প্রভূ আল্লাহ ঐ দু’বন্ধুকে উত্তম পুরষ্কার দেন যারা উম্মু মা’বাদের তাঁবুতে অবতরণ করেছিলেন। তারা দুজনে কল্যাণের সঙ্গে অবতরণ করেছেন এবং কল্যাণের সঙ্গে গমন করেছেন। যিনি মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর বন্ধু হয়েছেন, তিনি সফলকাম হয়েছেন। হায় কুসাই! আল্লাহ তোমাদের থেকে কত নজিরবিহীন কার্যকলাপ ও নেতৃত্ব গুটিয়ে নিয়ে তাদেরকে দিয়েছেন, অর্থাৎ বনু কা‘বদেরকে, ওদের মহিলাবর্গের অবস্থান স্থল এবং মুমিনদের সেনাচৌকী বরকতময় হোক। তোমরা নিজ ভগ্নিদেরকে তাদের পাত্র এবং বকরী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো। তুমি যদি স্বয়ং বকরীদেরকেও জিজ্ঞেস কর তবে তারাও সাক্ষ্য দেবে।

আসমা (রাঃ) বলছেন, ‘আমরা জানতাম না যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কোন্ দিকে গমন করেছেন। ইতোমধ্যে একজন মক্কার নিম্নভূমি থেকে এ কবিতা পাঠ করতে করতে এল। মানুষ তার পিছনে পিছনে চলছিল, তার কথা শুনছিল, কিন্তু তাকে কেউই দেখতে পাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত সে মক্কার উচ্চভূমি থেকে বের হয়ে গেল।’

তিনি বলেন, ‘আমরা যখন তাঁর কথা শুনলাম তখন বুঝতে পারলাম রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কোন দিকে গমন করেছেন। অর্থাৎ তিনি গমন করেছেন মদীনার দিকে।[3]

৪. সুরাক্বাহ বিন মালিক পথের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পিছু ধাওয়া করে। এ ঘটনা সুরাক্বাহ নিজেই বর্ণনা করেছে। সে বলেছে, ‘আমি নিজ সম্প্রদায় বনী মুদলিজের এক সভায় বসেছিলাম। ইতোমধ্যে একজন লোক আমার পাশে এসে দাঁড়াল। সে বলল, ‘হে সুরাক্বাহ! আমি কিছুক্ষণ পূর্বে উপকূলে কতিপয় লোককে দেখলাম। আমার ধারণা এরা হবেন মুহাম্মাদ (ﷺ) এবং তাঁর সঙ্গীগণ।’

সুরাক্বাহ বলেন, ‘আমি বুঝে গেলাম যে, এরা তাঁরাই।’ কিন্তু ঐ লোকটির ধারণা পালটিয়ে দেয়ার জন্য তাকে বললাম, ‘এরা তারা নয়। বরং তুমি অমুক অমুককে দেখেছ যারা আমার চোখের সম্মুখ দিয়ে অতিক্রম করল।’

‘এরপর সভাস্থানে সামান্য সময় অপেক্ষা করে অন্দর মহলে চলে গেলাম এবং নিজ দাসীকে নির্দেশ দিলাম আস্তাবল থেকে আমার ঘোড়াটি বের করে নিয়ে গিয়ে ঢিবির পিছনে আমার জন্য অপেক্ষা করতে। এদিকে আমি নিজ তীর গ্রহণ করলাম এবং বাড়ির পিছন দরজা দিয়ে বের হলাম। এ সময় আমার হাতের লাঠিটির এক মাথা মাটির সঙ্গে ঘর্ষণ খাচ্ছিল এবং অন্য মাথা নীচু করে রাখা ছিল। এ অবস্থায় আমি নিজ ঘোড়ার নিকট গিয়ে তার উপর আরোহণ করলাম। তারপর লোকটির কথিত দিক লক্ষ্য করে ঘোড়া ছুটিয়ে চললাম।’

‘‘আমি দেখলাম সে আমাকে নিয়ে স্বাভাবিকভাবে ছুটছে। এক পর্যায়ে আমি তাদের নিকটবর্তী হয়ে গেলাম, কিন্তু আকস্মিকভাবে আমাকে সমেত ঘোড়ার পা পিছলিয়ে যাওয়ায় আমি ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গেলাম। আমি উঠে দাঁড়িয়ে তুনের দিকে হাত বাড়ালাম এবং পাশার তীর বের করে জানতে চাইলাম যে, তাঁকে বিপদে ফেলতে পারব কিনা। কিন্তু যে তীরটি বেরিয়ে আসল সেটা আমার অপছন্দনীয়। কিন্তু আমি তীরের সাংকেতিক অভিব্যক্তি এড়িয়ে অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করলাম। সে আমাকে নিয়ে ছুটতে লাগল এবং এক পর্যায়ে নাবী (ﷺ)-এর কণ্ঠ নিঃসৃত কুরআনের পাঠ আমার কর্ণকূহরে প্রবিষ্ট হল। তিনি কোন সময়ের জন্যও পিছনে ফিরে তাকান নি। কিন্তু আবূ বাকর (রাঃ) বার বার পিছনে ফিরে তাকাচ্ছিলেন।

আর সামান্য পথ অতিক্রম হলে তাঁদের পথ রোধ করতে পারি এমন এক অবস্থায় আকস্মিকভাবে আমার ঘোড়ার পা হাঁটু পর্যন্ত মাটিতে ঢুকে গেল। এতে আমি তার পিঠ থেকে ছিটকে পড়ে গেলাম। আমি অবস্থাটা সামলিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াবার জন্য ঘোড়াটিকে ধমকা-ধমকি শুরু করলাম। আমার ধমক খেয়ে সে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করল কিন্তু সহজে তা পারল না। অবশেষে অনেক কষ্ট করে সে পা টেনে বের করল। কিন্তু সে যখন বহু কষ্টের পর উঠে দাঁড়াল তখন তার পদচিহ্ন থেকে আসমানের দিকে ধোঁয়ার মতো ধূলি প্রবাহের সৃষ্টি হয়েছিল।

আমি আবার পাশার তীর থেকে আমার ভাগ্যান্বেষণের ইঙ্গিত সম্পর্কে জানতে চাইলাম। কিন্তু আবার ঐ তীরটিই বাহির হল, যা আমার অপছন্দনীয় ছিল। এরপর আমি তাঁদের নিরাপত্তা চেয়ে আহবান জানালে তাঁরা থেমে গেলেন। আমি ঘোড়া খেদিয়ে তাঁদের নিকট পৌঁছলাম। যখন আমি তাঁদেরকে থামিয়ে ছিলাম তখনই আমার মনে এ কথাটা গেঁথে গিয়েছিল যে, মুহাম্মাদ (ﷺ)-ই শেষ পর্যন্ত জয়ী হবেন। এজন্য আমি তাকে বললাম যে, ‘আপনার সম্প্রদায় আপনার প্রাণের বিনিময়ে পুরষ্কার ঘোষণা করেছে’ এবং ঐ কথার সূত্রেই আমি তাঁকে মানুষের মনোভাব সম্পর্কে সতর্ক করে দিলাম। অধিকন্তু, কিছু খাদ্য-সামগ্রী এবং আসবাবপত্রেরও ব্যবস্থা করে দিতে চাইলাম। কিন্তু আমার কাছ থেকে কোন কিছুই গ্রহণ করলেন না এবং আমাকে কোন প্রশ্নও জিজ্ঞেস করলেন না। শুধু এ টুকুই বললেন যে, ‘আমাদের ব্যাপারে গোপনীয়তা রক্ষা করবেন।’ আমি আরয করলাম ‘আমাকে নিরাপত্তা পরওয়ানা লিখে দিন।’ তিনি ‘আমির বিন ফুহাইরাকে তা লিখে দেয়ার নির্দেশ প্রদান করায়। তিনি এক টুকরো চামড়ার উপর তা লিখে আমার হাতে দিলেন। তারপর নাবী (ﷺ)-এর দল সম্মুখে পানে অগ্রসর হলেন।[4]

এ ঘটনা সম্পর্কে খোদ আবূ বাকর (রাঃ)-এর এক রেওয়ায়েতে এর বর্ণনা রয়েছে যে, ‘আমাদের যাত্রা করার পর আমাদের স্বগোত্রীয় লোকজন অনুসন্ধান কাজে তৎপর হয়ে ওঠে, কিন্তু সুরাক্বাহ বিন মালিক বিন জু’শুম ছাড়া যারা নিজ ঘোড়ায় উঠেছিল তার কেউই আমাদের নাগাল পায়নি। আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমাদের পিছনে আগমনকারীরা আমাদেরকে পেয়ে যাবে।’

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন,

‏(‏لاَ تَحْزَنْ إِنَّ اللهَ مَعَنَا‏)‏ ‏[‏التوبة‏:‏40‏]

‘‘চিন্তার কোন কারণ নেই, আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সঙ্গেই আছেন।(আত্-তাওবাহ ৯ : ৪০)[5]

যাহোক, সুরাক্বাহ প্রত্যাবর্তন করে দেখে যে, লোকজন সব হন্যে হয়ে অনুসন্ধান কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সে তাদের বলল, ‘এ দিকের খোঁজ খবর আমি নিয়েছি। এদিকে তোমাদের যা কাজ ছিল তা যথারীতি করা হয়েছে। এভাবে সে লোকদের ফিরিয়ে নিয়ে গেল। দিনের প্রথম ভাগে যে ছিল আক্রমণকারী শত্রু, দিনের শেষ ভাগে সেই হল জীবন রক্ষাকারী বন্ধু।[6]

৫. পথে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ছোট্ট কাফেলার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় বুরাইদাহ বিন হুসাইব আসলামীর। সে ছিল নিজ সম্প্রদায়ের নেতা এবং শক্তিমান পুরুষ। তার সাথে প্রায় আশি জন লোক ছিল। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তার সঙ্গী সাথীগণও ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এশার সালাত আদায় করেন এবং এসব লোকেরাও তাঁর পেছনে সালাত আদায় করেন। বুরাইদাহ তার স্বীয় গোত্রের সঙ্গেই বসবাস করেন এবং উহুদ যুদ্ধের পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন।

আব্দুল্লাহ বিন বুরাইদাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ফাল বিশ্বাস করতেন কিন্তু ত্বিয়ারাহ (এর প্রকার ভাগ্য নির্ণয়) বিশ্বাস করতেন না। বুরাইদাহ (রাঃ) সত্তর জন লোকের এক কাফেলাসহ মদীনায় আগমন করেন। অতঃপর তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করলে তাদের জিজ্ঞাসা করেন, তোমরা কোন কওমের লোক। তারা বললো আমরা আসলাম গোত্রের। এরপর আবূ বাকরকে বললেন, আমি নিরাপদ হলাম। অতঃপর তিনি (ﷺ) কোন গোত্রের? তারা বললো বনু সাহম গোত্রের। তিনি বললেন তোমার অংশ বের হয়ে গেছে।

৬. রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আবূ আওস তামীম বিন হাযার আসলামী অথবা আবূ তামীম আওস বিন হাযার আসলামীর নিকট দিয়ে আরয-এর হারশা ও জুহফাহর মধ্যবর্তী কাহদাওয়াত অতিক্রম করছিলেন। তাঁর পিঠের ব্যথার কারণে ধীরে পথ চলছিলেন। সে সময় তিনি (ﷺ) এবং আবূ বাকর (রাঃ) একই উটের সওয়ারী ছিলেন। আওস লোকজন তাঁকে সওয়ার জন্য একটা উট প্রদান করলেন এবং তাদের সাথে মাস’উদ নামক এক ক্রীতদাসকে সঙ্গে দিয়ে দিলেন। ক্রীতদাসকে বলে দিলেন যে, তাঁদের সাথে সাথে পথ চলবে। কক্ষনোই তাঁদের থেকে পৃথক হবে না। ফলে সে তাঁদের সাথে চলতে থাকলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁরা মদীনায় পৌছে গেলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মাসউদকে তার মনিবের নিকটে ফিরত পাঠালেন। আর তাকে এ নির্দেশ দিলেন যে, সে যেন আওস গোত্রের লোকেদের বলে যে, তারা যেন তাদের এ উটের গর্দানে গাধার ন্যায় দুটো আংটা পরিয়ে দেয় এবং উভয়ের মাঝে দুরত্ব রাখে। এটাই তাদের চিহ্ন। মুশরিকরা উহুদ প্রান্তরে উপস্থিত হলে আওস তার ক্রীতদাস মাসউদ বিন হুনাইদাহকে ‘আরয হতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দরবারে গিয়ে মুশরিকদের বিষয়ে খবর দেয়ার জন্য প্রেরণ করলেন। এ ঘটনাকে ইবনু মা’কূল ত্বাবারী থেকে বর্ণনা করেছেন।

তিনি রাসূলুলাহ (ﷺ)-এর মদীনায় আগমনের পর ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তিনি আরযে বসবাস করতেন।

৭. পথ চলার পরবর্তী পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে যুবাইর বিন আওয়ামের সাক্ষাৎ হয়। মুসলিমগণের একটি বাণিজ্য কাফেলার সঙ্গে তিনি সিরিয়া থেকে প্রত্যাবর্তন করছিলেন। যুবাইর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও আবূ বাকর (রাঃ) কে সাদা কাপড় প্রদান করেন।[7]

[1] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৫১০ পৃঃ।

[2] সহীহুল বুখারী আনাসহেত ১ম খন্ড ৫৫৬ পৃঃ।

[3] যা’দুল মা’আদ ২য় খন্ড ৫৩-৫৪ পৃঃ। বনু খোযয়ার আবাদী অবস্থানের প্রতিদৃষ্টি রেখে এ কথাই অধিক গ্রহণযোগ্য যে, এ গটনাটি গার থেকে যাত্রা পরে ২য় দিনে সংঘটিত হয়েছিল।

[4] সহীহুল বুখারী শরীফ ১ম খন্ড ৫৫৪ পৃঃ। বনী মুদলেজদের বাড়ি রাবেগের নিকটবর্তী ছিল। সুরাক্বাহ সেই সময় নাবী (সাঃ)-এর অনুসন্ধানে রত হয়েছিলেন যখন তিনি কুদাইদ থেকে উপরে যাচ্ছিলেন। যাদুল মা’আদ ২য় খন্ড ৫৩ পৃঃ। এটা অধিক গ্রহণযোগ্য এ কারণে যে, গুহা থেকে যাত্রার তৃতীয় দিবসে পিছু ধাওয়ার এ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল।

[5] সহীহুল বুখারী শরীফ, ১ম খন্ড ৫১৬ পৃঃ।

[6] যা’দুল মা’আদ ২য় খন্ড ৫৩ পৃঃ।

[7] সহীহুল বুখারী উরওয়াপুত্র যুবাইর থেকে ১ম খন্ড ৫৫৪ পৃঃ।

৮ই রবিউল আওয়াল, ১৪ই নাবাবী সনে, অর্থাৎ ১ম হিজরী সন মোতাবেক ২৩ সেপ্টেম্বর ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কুবাতে আগমন করেন।[1]

‘উরওয়া বিন যুবাইরের বর্ণনায় রয়েছে যে, মদীনাবাসী মুসলিমগণ মক্কা থেকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর রওয়ানা হওয়ার সংবাদ শুনেছিলেন এজন্য তাঁরা প্রত্যেক দিন সকালে বের হয়ে হাররার দিকে গমন করতেন এবং তার পথ চেয়ে থাকতেন। দুপুরে রোদ যখন অত্যন্ত প্রখর হয়ে উঠত তখন তাঁরা গৃহে ফিরতেন। এক দিবসে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর মুসলিমগণ যখন গৃহে ফিরে এলেন তখন একজন ইহুদী তাঁর নিজের কোন কাজে একটা টিবির উপর উঠলে সে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং তার সঙ্গীদের দেখতে পায়। সাদা কাপড়ে আবৃত অবস্থায় তাঁরা যখন আসছিলেন তখন তাঁদের পোষাক হতে যেন চাঁদের কিরণ বিচ্ছুরিত হচ্ছিল। এ অবস্থা দেখে সে আত্মহারা হয়ে উচ্চ কণ্ঠে বলল, ‘ওগো আরবের লোকেরা! তোমাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়েছে, তোমাদের বহু আকাঙ্ক্ষিত অতিথি ঐ যে এসে গেছেন।’ এ কথা শোনামাত্রই মুসলিমগণ অস্ত্রাগারে দৌড় দিলেন[2] এবং অস্ত্র শয্যায় সজ্জিত হয়ে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে স্বাগত জানানোর জন্য সমবেত হলেন।

ইবনুল কাইয়্যেম বলেছেন : এর মধ্যেই বণী ‘আমর বিন আউফ গোত্রের (কুবার বাসিন্দা) লোকজনদের শোরগোল উঁচু হয়ে উঠল এবং তাকবীর ধ্বনি শোনা গেল। মুসলিমগণ নাবী কারীম (ﷺ)-এর আগমনে তাঁকে খুশআমদেদ জানানোর উদ্দেশ্যে হর্ষোৎফুল্ল­ কণ্ঠে তাকবীর ধ্বনি দিতে দিতে সমবেত হতে থাকল। তিনি তাঁদের মাঝে এসে উপস্থিত হলে সকলে সম্মিলিতভাবে তাঁকে মুবারকবাদ জ্ঞাপন করলেন এবং চতুর্দিক থেকে পরিবেষ্টন করে দাঁড়ালেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) শান্তির আবরণে আচ্ছাদিত ছিলেন এবং আল্লাহর বাণী অবতীর্ণ হচ্ছিল,

‏(‏فَإِنَّ اللهَ هُوَ مَوْلَاهُ وَجِبْرِيْلُ وَصَالِحُ الْمُؤْمِنِيْنَ وَالْمَلَائِكَةُ بَعْدَ ذٰلِكَ ظَهِيْرٌ‏)‏ ‏[‏التحريم‏:‏4‏]

‘‘তবে (জেনে রেখ) আল্লাহ তার মালিক-মনিব-রক্ষক। আর এ ছাড়াও জিবরীল, নেক্কার মু’মিনগণ আর ফেরেশতাগণও তার সাহায্যকারী।’ (আত্-তাহরীম ৬৬ : ৪)

‘উরওয়া বিন যুবাইর (রাঃ)-এর বর্ণনা রয়েছে যে, লোকজনের সঙ্গে মিলিত হবার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের সঙ্গে নিয়ে ডানদিকে ফিরলেন এবং ’’আমর বিন আওফ গোত্রে গমন করলেন। সে সময়টা ছিল রবিউল আওয়াল মাসের সোমবার। অতঃপর আবূ বকর (রাঃ) লোকেদের সাথে কথাবার্তা বলার জন্য দাঁড়ালেন আর রাসূল (ﷺ) চুপ করে বসে থাকলেন। সে সকল আনসার রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এখন পর্যন্ত দেখেন নি তারা একের পর এক আসতে থাকলেন তাঁকে স্বাগতম জানাতে।

অন্য বর্ণনায় রয়েছে, আবূ বকর (রাঃ) আগমন করলেন। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ এর উপর সূর্যের তাপ লাগতে লাগল তখন আবূ বাকর (রাঃ) স্বীয় চাদর দিয়ে তাঁকে ছায়া দিলেন। ফলে লোকেরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে চিনে ফেললেন।

পুরো মদীনা যেন স্বাগতম জানানোর জন্য কুচকাওয়াজ করছিল। সে দিন এমনই একটা দিন ছিল মদীনার ইতিহাসে এমন দিন আর আসেনি।

রাসূলুল্লাহ কুলসুম বিন হাদাম এবং বলা যায় যে, সা’দ বিন খায়সামার বাড়ীতে অবস্থান করেছিলেন। এর মধ্যে প্রথম মতটি অধিক শক্তিশালী।

এদিকে আলী (রাঃ) মক্কায় তিন দিন অবস্থানের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট লোকদের গচ্ছিত আমানত আদায় করার পর পদদলে মদীনা অভিমুখে যাত্রা করলেন। তারপর মদীনায় পৌঁছে তিনি কুবায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং কুলসুম বিন হাদামের বাড়িতেই অবস্থান করলেন।[3]

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কুবাতে চারদিন[4] (সোমবার, মঙ্গলবার, বুধ ও বৃহস্পতিবার) অথবা দশ দিন থেকে বেশী অথবা পৌঁছা ও যাত্রার দিন ছাড়া চবিবশ দিন অবস্থান করেন। আর এ সময়ের মধ্যেই মসজিদে কুবার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন এবং তাতে সালাতও আদায় করেন। তাঁর নবুওয়াত প্রাপ্তির পর এটা হচ্ছে সর্ব প্রথম মসজিদ যার বুনিয়াদ তাকওয়া (আল্লাহ ভীতির) উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পঞ্চম দিনে (অথবা দ্বাদশ দিনে অথবা চবিবশতম দিনে) শুক্রবারে তিনি আল্লাহর নির্দেশে আরোহণ করলেন। আবূ বাকর (রাঃ) তাঁর রাদীফ (পিছনে আরোহণকারী) ছিলেন। তিনি বনু নাজ্জারদেরকে (যাঁরা তাঁর মামাগোষ্ঠির ছিলেন) সংবাদ প্রেরণ করেছিলেন। ফলে তাঁরা তরবারী ধারণ করে উপস্থিত হলেন। তিনি তাঁদেরসহ মদীনার দিকে যাত্রা করলেন। তারপর বনু সালিম বিন আউফের আবাসস্থানে পৌঁছিলে জুমার সালাতের সময় হয়ে যায়। তিনি এ স্থানে বাতনে অদীতে জুমা পড়লেন। সেখানে এখনো মসজিদ রয়েছে। সেখানে মোট একশত লোক ছিলেন।[5]

[1] রহামাতুল্লিল আলামীন ১ম খন্ড ১০২ পৃঃ। এ সময় নাবী (সাঃ)-এর বয়স একেবারে কাঁটায় কাঁটায় ৫০ বছর হয়েছিল। আর যাঁরা তাঁর নবুওয়াত কাল ৯ই রবিউল আওয়াল ৪১ ফীল বর্ষ মানছেন তাঁদের কথা মোতাবেক নবুওয়াতের ঠিক ১৩ বছর পূর্ণ হয়েছিল। অবশ্য যাঁরা তাঁর নবুওয়াতের সময় কাল রমাযান ১৪ ফীল বর্ষ মানেন তাঁদের কথা মোতাবেক ১২ বছর ৫মাস কিংবা ২২ দিন হয়েছিল।

[2] সহীহুল বুখারী শরীফ ১ম খন্ড ৫৫৫ পৃঃ।

[3] যা’দুল মা’আদ ২য় খন্ড ৫৪ পৃঃ ইবনে হিশাম ১ম খন্ড ৪৯৩ পৃঃ। রহমতুল্লিল আলামীন ১ম খন্ড ১০২ পৃঃ।

[4] এটা ইবনে ইসহাক্বের রেওয়াতে। ইবনে হিশাম ১ম খন্ড ৪৯৪ পৃঃ। আল্লামা মানসুরপুরী এটাই গ্রহণ করেছেন। রাহমাতুল্লিল আলামীন ১ম খন্ড ১০২ পৃঃ দ্রঃ। কিন্তু সহীহুল বুখারীর একটি বর্ণনা রয়েছেন যে, নাবী কারীম (সাঃ) কুবাতে ২৪ দিন অবস্থান করেছিলেন। কিন্তু অন্য একটি বর্ণনায় আছে দশরাত হতে কয়েকদিন হতে বেশী ১/৫৫৫ অন্য এক (তৃতীয়) বর্ণনায় চৌদ্দ রাত ১/৫৬০ পৃঃ। ইবনুল কাইয়্যেম শেষ বর্ণনাটিকে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তিন নিজে ব্যাখ্যা করেছেন যে, নাবী (সাঃ) কুবাতে সোমবার পৌঁছেন এবং সেখান থেকে শুক্রবার যাত্রা করেন্ (যা’দুল মা’আদ) ২/৫৪ ও ৫৫ পৃঃ।) আর এটা জানা যায় যে, সোমবার আর জুমা (শুক্রবার) পৃথক পৃথক দু’সপ্তাহের ধরা হলে পৌঁছা ও যাত্রার দিন দুটি বাদ দিলে সর্ব মোট হচ্ছে ১০ দিন আর পদার্পণ ও যাত্রার দিন সহ হচ্ছে ১২ দিন। সর্বমোট চৌদ্দ দিন কিভাবে হবে?

[5] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৪৫৫-৫৬০ পৃঃ। যা’দুল মা’আদ ২য় খন্ড ৫৫ পৃঃ। ইবনে হিশাম ১ম খন্ড ৪৯৪ পৃঃ। রমহাতুল্লিল আলামীন ১ম খন্ড ১০২ পৃঃ।
মদীনায় প্রবেশ (الدُّخُوْلُ فِي الْمَدِيْنَةِ):

জুমআর সালাত শেষে নাবী (ﷺ) মদীনায় প্রবেশ করলেন। ঐ দিন থেকেই এ শহরের নাম ইয়াসরিরের পরিবর্তে মদীনাতুররাসূল বা রাসূলের শহর হয়ে যায় সংক্ষেপে একে মদীনা বলা হয়ে থাকে। এটা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক ঐতিহাসিক দিবস। মদীনার অলিতে গলিতে সর্বত্র সেদিন তাকদীস ও তাহমীদের (পবিত্রতা ও প্রশংসার) গুঞ্জণ ধবনি শ্রুত হচ্ছিল। আনসারদের ছেলেমেয়েরা আনন্দ উদ্বেল কণ্ঠে নিন্মের কবিতার চরণগুলো সুর ও ঝংকার সহকারে গেয়ে বেড়াচ্ছিল।

طـلـع الـبــدر علـينا

**

مـن ثـنيــات الـوداع

وجـب الشـكـر علـين

**

مـــا دعــا لـلـه داع

أيـهـا المبـعـوث فـينا

**

جـئـت بـالأمـر المطاع

‘‘দক্ষিণ পাশের পাহাড় হতে পূর্ণিমার চন্দ্র আমাদের উপর উদিত হয়েছে।’

‘‘কি উত্তম ধর্ম ও শিক্ষা! আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের প্রতি ওয়াজেব।’

তোমার নির্দেশ অনুসরণ করা ফরয। তোমার প্রেরণকারী হচ্ছেন কিবরিয়া (মহাপ্রভূ)[1]

আনসারগণ যদিও ধনী ছিলেন না, তবুও সকলের আশা ছিল যে, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তার বাসাতেই অবস্থান করুন। ফলে তার উটনী আনসারদের যে বাড়ি কিংবা মহল্লার পাশ দিয়ে অতিক্রম করত সেখানকার লোকজন উটনীর লাগাম ধরে নিতেন এবং অনুরোধ করতেন যে, আসবাবপত্র, অস্ত্রশস্ত্র ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা প্রস্তুত রয়েছে, আগমন করুন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলতেন ‘উটনীর পথ ছেড়ে দাও। সে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিদের্শিত রয়েছে। ফলে উটনী একটানা চলতে থাকল এবং ঐ স্থানে এসে বসে পড়ল যেখানে মসজিদে নাবাবী রয়েছে।

কিন্তু তিনি নীচে অবতরণ করলেন না। তারপর উটনী পুনরায় উঠে দাঁড়াল এবং কিছু দূরে গিয়ে ঘুরে ফিরে দেখার পর পূর্বের জাগাতেই এসে বসে পড়ল। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নীচে অবতরণ করলেন। এটা ছিল তাঁর নানীর, অর্থাৎ বনু নাজ্জার গোত্রের মহল্লা। আর উটনীর জন্য ছিল এটা আল্লাহর তরফ থেকে নির্দেশনা। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) চেয়েছিলেন তাঁর নানার গোত্রে অবস্থান করে তাঁদের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে, সেই জন্যই এ ব্যবস্থা।

এখন বনু নাজ্জার গোত্রের লোকজনেরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে নিজ নিজ গৃহে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর নিকট আবেদন নিবেদন শুরু করে দিলেন। কিন্তু আবূ আইউব আনসারী (রাঃ) উষ্ট্রের পালান উঠিয়ে নিলেন এবং বাড়িতে নিয়ে গেলেন। এতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলতে লাগলেন মানুষ তার পালানের সাথে রয়েছে। এদিকে আস’আদ বিন যুরারাহ (রাঃ) এসে উটনীর লাগাম ধরে নিলেন, ফলে উটনী তার নিকটেই রয়ে গেল।[2]

সহীহুল বুখারী শরীফে আদাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘কোন্ লোকের বাড়ি আমার থেকে নিকটে’’?

আইউব আনসারী (রাঃ) বলেন, ‘আমার বাড়ি, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এটা আমার বাড়ি আর এটা আমার দরজা।’

তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে বললেন, ‘যাও এবং আমার বিশ্রামের জায়গা ঠিক কর। তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং আবূ বাকর (রাঃ) দুজনকেই সেখানে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানালেন।[3]

কিছুদিন পর নাবী পত্নী উম্মুল মু’মিনীন সওদা (রাঃ) এবং নাবী তনয়া ফাত্বিমাহ (রাঃ) ও উম্মুল কুলসুম (রাঃ) এবং উসামা বিন যায়দ (রাঃ) ও উম্মু আয়মান (রাঃ) মদীনায় গিয়ে পৌঁছলেন। এদের সকলকে আব্দুল্লাহ বিন আবূ বাকর (রাঃ)- আবূ বকরের আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে যাদের মধ্যে ‘আয়িশাহও ছিলেন- নিয়ে এসেছিলেন। অবশ্য নাবী তনয়া যায়নাব (রাঃ), আবুল আসের নিকট থেকে গিয়েছিলেন। তিনি তাকে আসতে দেননি। তিনি বদরের যুদ্ধের পরে এসেছিলেন।[4]

‘আয়িশাহ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মদীনায় পৌঁছার পর আবূ বাকর (রাঃ) ও বিলাল (রাঃ) জ্বরে আক্রান্ত হন। আমি তাদের খেদমতে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম আববাজান! আপনি কেমন আছেন? তারপরে বিলালকে লক্ষ্য করে বললাম আপনি কেমন আছেন? তিনি অর্থাৎ ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেছেন যখন আবূ বাকর (রাঃ)-এর জ্বর আসত তখন তিনি এ কবিতা পাঠ করতেন,

كل امرئ مُصَبَّحٌ في أهله ** والموت أدنى من شِرَاك نَعْلِه

অর্থঃ প্রতিটি মানুষকে তার আত্মীয়ের মাঝে সুপ্রভাত বলা হয়ে থাকে অথচ মৃত্যু তার জুতার ফিতার চাইতেও নিকটবর্তী।

বিলালের অবস্থা যখন একটু সুস্থ থাকত তখন তিনি নিজের দুঃখপূর্ণ স্বর উঁচু করে বলতেনঃ

ألا ليت شِعْرِى هل أبيتَنَّ ليلة ** بوَادٍ وحولى إذْخِرٌ وجَلِيْـلُ
وهل أردْن يومـًا ميـاه مِجَنَّة ** وهل يَبْدُوَنْ لى شامة وطَفِيْلُ

‘হায় যদি আমি জানতাম যে, আমার কোন একরাত্রি যাপন হবে এক প্রান্তরে (মক্কায়) এবং আমার পাশে ইযখির ও জালীল (ঘাস) থাকবে এবং কোন দিন কি মাজিন্না ঝর্ণাতে অবতরণ করতে পারব এবং আমি সামা ও তুফাইল পাহাড় দেখতে পাব?’

‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেছেন যে, আমি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে তাদের এ প্রলাপের সংবাদ দিলাম। তখন তিনি বললেন,

‏[اللهم حبب إلينا المدينة كحبنا مكة أو أشد، وصححها، وبارك في صاعها ومدها، وانقل حماها فاجعلها بالجُحْفَة‏]‏‏.‏

‘‘হে আল্লাহ, আমাদের নিকট মদীনাকে এমন প্রিয় করে দাও যেমন মক্কা প্রিয় ছিল বরং তার চেয়ে অনেক বেশী। মদীনার মাঠ, ঘাট ও আবহাওয়া স্বাস্থ্যের উপযোগী করে দাও এবং উহার ‘সা‘’ ও ‘মুদ্দে’ (শস্য মাপার পাত্র বিশেষ) বরকত দাও, তার অসুখ প্রত্যাবর্তন করে জুহফাহ’য় পৌঁছিয়ে দাও।[5] আল্লাহ তাঁর দু‘আ শুনলেন ও অবস্থার পরিবর্তন ঘটল।

এখান পর্যন্ত পবিত্র জীবনের এক প্রকার ও ইসলামী দাওয়াতের এক যুগ অর্থাৎ মক্কী জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটল। আমরা এখন তাঁর মাদানী জীবন সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করবো। আল্লাহ তা’আলা তাওফীক দাতা।

[1] কবিতার এ অনুবাদটি আল্লামা মানসুরপুরী করেছেন। আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম লিখেছেন যে, এ কবিতাটি তাবুকের যুদ্ধ হতে নাবী (সাঃ)-এর ফেরত আসার সময় পাঠ করা হয়েছিল এবং যাঁরা বলেছেন এটা নাবী (সাঃ)-এর মদীনায় প্রবেশের সময় পাঠ করা হয়েছিল তাঁদের ভুল হয়েছে। (যা’দুল মা’আদ ৩/১০২ পৃঃ।) কিন্তু আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম ভুল হওয়ার কোন সুস্পষ্ট প্রমাণ প্রদান করেননি। এর বিপরীতে আল্লামা মানসুরপুরী এ কবিতাটি নাবী (সাঃ)-এর মদীনায় প্রবেশের সময় পাঠ করা হয়েছিল বলে অধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এ ব্যাপারে তাঁর নিকট দলীলও রয়েছে। রহমাতুল্লিল আলামীন ১/১০৬ পৃঃ।

[2] যা’দুল মা’আদ ২য়/৫৫ পৃঃ। রাহমাতুল্লিল আলামীন ১ম খন্ড ১০৬ পৃঃ।

[3] সহীহুল বুখারী শরীফ ১ম খন্ড ৫৫৬ পৃঃ।

[4] যা’দুল মা’আদ ২য় খন্ড ৫৫ পৃঃ।

[5] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৫৮৮-৫৮৯ পৃঃ।
মদীনার জীবনে দাওয়াত ও জিহাদের স্তরসমূহ (مراحل الدعوة والجهاد فى العهد المدني):

মদীনার জীবনকে তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত করা যেতে পারে।

১. প্রথম পর্যায়ঃ ইসলামী সমাজ নির্মাণের ও ইসলামের দাওয়াত প্রতিষ্ঠালাভের যুগ। এ পর্যায়ে ফিতনা ও অশান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে। শহরের মধ্য হতে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং বাহির থেকে শত্রুরা আক্রমণ চালিয়েছে যাতে মদীনায় ইসলামের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে যায়। এ পর্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে ৬ হিজরী সনে যুল ক্বা’দাহ মাসে হুদায়বিয়াহর সন্ধিতে।

২. দ্বিতীয় পর্যায়ঃ এ পর্যায়ে মূর্তি পূজারী নেতাদের সঙ্গে সন্ধি স্থাপিত হয়, এটার সমাপ্তি ৮ম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের দ্বারা ঘটে। এ পর্যায়কে বিশ্বের রাজন্যবর্গের নিকট ইসলামের দাওয়াত প্রেরণের পর্যায়ও বলা যেতে পারে।

৩. তৃতীয় পর্যায়ঃ এ পর্যায়ের বিস্তৃতি ঘটেছিল একাদশ হিজরীর রবিউল আওয়াল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পবিত্র জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। এ সময়ে বিভিন্ন দেশ ও গোত্রের মানুষ দলেদলে ইসলাম গ্রহণ করে। এ পর্যায় বিভিন্ন জাতি ও গোত্রসমূহের মুখপাত্রগণের মদীনায় আগমনের পর্যায়।

মদীনার অধিবাসীগণ এবং হিজরতের সময় তাদের অবস্থা (سكان المدينة واحوالهم عند الهجرة):

অশান্তি এবং উপহাসের লক্ষ্য বস্তু হওয়া থেকে নিস্কৃতিলাভই শুধু হিজরতের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল না। বরং এ উদ্দেশ্যও নিহিত ছিল যে, এক শান্তিপূর্ণ এলাকায় ইসলামী আন্দোলনের জন্য স্বস্তি ও শান্তির বাতাবরণ সৃষ্টি করা। এ কারণে সকল সমর্থ মুসলিমগণের জন্য এটা ফরজ করে দেয়া হয়েছিল যে, এই নতুন দেশ ও নতুন রাষ্ট্রের নির্মাণ কাজে তারা সাধ্যমত অংশ গ্রহণ করবেন এবং একে রক্ষণাবেক্ষণ ও মর্যাদার উচ্চশিখরে সমাসীন করার ব্যাপারে আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন। আর এ কথা তো সন্দেহাতীতভাবে সকলেই অবগত আছেন যে, এ মহতি জীবনধারার রূপকার এবং এ মহান জাতির ইমাম নেতা ও পথ প্রদর্শক ছিলেন স্বয়ং বিশ্বের সেরা মানব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)।

মদীনাতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে এমন তিনটি গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কে গড়ে তুলতে হয়েছিল যাদের একগোষ্ঠি থেকে অন্যগোষ্ঠির অবস্থা ছিল ভিন্ন এবং পরস্পর পরস্পরের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন সব বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিল যার ভিন্নতার প্রাধান্যই ছিল বেশী। গোষ্ঠী তিনটির পরিচিতি হচ্ছে যথাক্রমে নিম্নরূপঃ

১. আল্লাহর মনোনীত রাসূল (ﷺ)-এর নিকট হতে উত্তম প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ও আল্লাহর পথে ধন প্রাণ উৎসর্গ করতে সদাপ্রস্তুত সাহাবী (রাঃ)-এর জামাত বা গোষ্ঠী।

২. মদীনার আদি ও মূল বাসিন্দাদের মুশরিক (পৌত্তলিক) গোষ্ঠী যারা তখনো ঈমান আনে নি।

৩. ইহুদীগণ

(ক) সাহাবীগণ (রাঃ) সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে যে সব সমস্যার সম্মুখীন হতে হতো তা হচ্ছে- তাদের জন্য মদীনার অবস্থা অবশ্যই মক্কার অবস্থার বিপরীত ছিল। যদিও তাঁদের দ্বীন সম্পর্কিত ধ্যান ধারণা দ্বীনী কাজ কর্মের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অভিন্ন ছিল, কিন্তু মক্কা জীবনে তারা বসবাস করতেন বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত অবস্থায়। আর তাঁরা ছিলেন নিরুপায়, পর্যু্যদস্ত, অপমানিত ও দুর্বলতর। তারা আত্মিক ও নৈতিকবলে চরম বলীয়ান হলেও লৌকিক শক্তি সামর্থ্য কিংবা ব্যক্তি স্বাধীনতা বলতে তেমন কিছুই ছিল না। সকল প্রকার শক্তি ও সম্পদ পুঞ্জীভূত ছিল ধর্মের চির দুশমনদের হাতে। এমনকি মানবিক জীবন যাপনের জন্য সে সকল আসবাবপত্র এবং উপকরণাদির ন্যূনতম প্রয়োজন সে সব কিছুই ছিল না মুসলিমগণের হাতে যাকে সম্বল করে তারা নতুনভাবে ইসলামী সমাজ গঠন করতে সক্ষম হবেন। কাজেই আমরা দেখতে পাই মক্কী সূরাহগুলোতে কেবলমাত্র ইসলামের প্রারম্ভিক বিষয়গুলোরই বর্ণনা রয়েছে এবং ঐ সকল বিষয়ের উপর নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে যা ব্যক্তিগতভাবে করা সম্ভব। অধিকন্তু এ পর্যায়ে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই পূত পবিত্র জীবন যাপনের মাধ্যমে আত্মিক উন্নতি ও উত্তম চরিত্র গঠনের উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে এবং অনৈতিক ও অসামাজিক ক্রিয়াকর্ম থেকে পরহেজ করে চলার জোর তাকীদ প্রদান করা হয়েছে। পক্ষান্তরে মদীনা জীবনের প্রথম থেকেই নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের বাগডোর ছিল মুসলিমগণেরই হাতে। মুসলিম ছাড়া মদীনা কিংবা তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় যে সকল সম্প্রদায় ছিল, ইসলাম সূর্যের নিকট তাদের নেতৃত্ব ছিল নিষ্প্রভ। কাজেই তখন এমন এক সময় ও সুযোগ এসেছিল যাতে মুসলিমগণ তাহযীব, তামাদ্দুন ও স্থাপত্য জীবনধারা, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্রিয়াকর্ম, রাষ্ট্র পরিচালনা, যুদ্ধ-সন্ধি ইত্যাদি সকল ব্যাপারেই ইসলামের বিধি বিধান ও অনুশীলন অনুযায়ী পরিচালিত হবে। এর ফলে হালাল, হারাম, ইবাদত, আখলাক ইত্যাদি জীবনের সব ব্যাপারে পুরাপুরি মীমাংসা করা সম্ভব হয়।

সময় ও সুযোগ এসেছিল মুসলিমগণের জন্য এমন এক জীবন-ধারা প্রবর্তনের যা ছিল জাহেলিয়াত যুগের জীবন-ধারা থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। এমনকি পৃথিবীর কোথাও এমন কোন জীবন ধারা ছিল না যার সঙ্গে এর কোন তুলনা করা যেতে পারে। বিগত দশ বছর যাবৎ মুসলিমগণ অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টের জীবন-যাপনের মধ্য দিয়ে এমন এক জীবন ধারা গড়ে তুলেছিলেন কোন কালে কোথাও যার তুলনা মিলবে না।

এ প্রসঙ্গে যে ব্যাপারটি বিশেষভাবে উল্লেখ্য তা হচ্ছে এ জাতীয় কোন জীবন ধারার রূপ এক দিনের, এক মাসের কিংবা এক বছরের কাজ হতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন একটি দীর্ঘ সময়ের যাতে করে ধীরে ধীরে পর্যায়ক্রমে এর বিধি-বিধান ও নির্দেশাবলী প্রয়োগ করা এবং নীতি-নির্ধারণী কাজের অভ্যাস ও চর্চা এবং তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে পূর্ণতা দান করা সম্ভব হতে পারে। ইসলাম যে পর্যন্ত বিধি-বিধান প্রদান সংগ্রহ সংরক্ষণের পর্যায়ে ছিল তার জিম্মাদার ছিলেন স্বয়ং আল্লাহ। পক্ষান্তরে, এ সবের বাস্তবায়ন মুসলিমগণের চর্চা ও অভ্যন্তকরণ এবং পথ প্রদর্শনের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)। ফলে ইরশাদ হয়েছে ,

‏(‏هُوَ الَّذِيْ بَعَثَ فِيْ الْأُمِّيِّيْنَ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُوْ عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيْهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ‏)‏ ‏[‏الجمعة‏:‏ 2]‏‏.‏

‘তিনিই নিরক্ষরদের মাঝে পাঠিয়েছেন তাঁর রসূলকে তাদেরই মধ্য হতে, যে তাদের কাছে আল্লাহর আয়াত পাঠ করে, তাদেরকে পবিত্র করে, আর তাদেরকে কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেয় অথচ ইতোপূর্বে তারা ছিল স্পষ্ট গুমরাহীতে নিমজ্জিত।’ (আল-জুমু‘আহ ৬২ : ২)

এদিকে সাহাবায়ে কেরামের (রাঃ) এই অবস্থা ছিল যে, তাঁরা সর্বক্ষণ নাবী কারীম (ﷺ)-এর প্রতি সজাগ দৃষ্টি রেখে চলতেন। যে কোন আহকাম নির্ধারিত হওয়া মাত্র তা কায় মনোবাক্যে গ্রহণ করে নিতেন এবং তা পালন করে আনন্দ লাভ করতেন। ইরশাদ হয়েছে,

‏(‏وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيْمَانًا‏)‏ ‏[‏الأنفال‏:‏ 2]‏‏.‏

‘‘আর তাদের কাছে যখন তাঁর আয়াত পঠিত হয়, তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে...।’ (আল-আনফাল ৮ : ২)

এ সকল বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা করা আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়, কাজেই এ বিষয়ের প্রয়োজনীয় অংশটুকু আলোচনা করব।

যাহোক, এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল মুসলিমগণের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল, এবং দাওয়াতে ইসলামীয়ার ও রিসালাতে মুহাম্মাদীয়ার এটাই ছিল বড় রকমের উদ্দেশ্য, কিন্তু সত্যিকার অর্থে এটা কোন ক্ষণস্থায়ী বিষয় ছিল না। বরং স্বয়ং সম্পূর্ণ ও স্থায়ী ব্যাপার ছিল। অবশ্য এ ছাড়া এমন কিছু অন্যান্য বিষয়ও ছিল যা সমাধানের ব্যাপারে তাৎক্ষণিক মনোযোগের প্রয়োজন ছিল। যার সংক্ষিপ্ত অবস্থা নিম্নরূপ :

মুসলিমগণের মধ্যে দু’শ্রেণীর লোক ছিলেন, প্রথম শ্রেণীভুক্ত হচ্ছেন যাঁরা নিজস্ব জমিজমা, ঘরবাড়ি এবং ধনসম্পত্তির মধ্যে বববাস করতেন। এ সম্পর্কে তাদের অন্য কোন অতিরিক্ত চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন ছিল না, যা একজন লোককে তাঁর আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে শান্তিতে থেকে করতে হয়। এরা হচ্ছেন আনসার গোত্রীয় লোক। এদের মধ্যে বংশানুক্রমে একে অন্যের সঙ্গে প্রবল শত্রুতা ও মত বিরোধ চলে আসছিল। তাঁদের পাশাপাশি অন্য যে দলটি ছিলেন তাঁরা হচ্ছেন মোহাজের গোত্র। ঐ সকল সুবিধা হতে সম্পূর্ণরূপে এরা বঞ্চিত ছিলেন। লুণ্ঠিত হয়েও মার খেয়ে নিঃস্ব এবং রিক্ত অবস্থায় ভাগ্যের প্রতি ভরসা করে কোনরূপে মদীনায় পৌঁছে ছিলেন।

মদীনায় বসবাসের জন্য মুহাজিরদের জন্য কোন বাসস্থান বা আহার ও পোষাকের জন্য কোন কর্ম সংস্থান ছিল না। অথবা কোন প্রকার ধন ও সম্পদ ছিল না, যার দ্বারা তাঁরা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন। অথচ এ আশ্রয় প্রার্থী মোহাজিরদের সংখ্যা কম ছিল না। তদুপরি দিনের পর দিন তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েই চলেছিল। কারণ, সুস্পষ্ট ঘোষণা করা হয়েছিল যে, যারা আল্লাহ ও রাসূল (ﷺ)-এর প্রতি ঈমান আনয়ন করেছেন তারা যেন হিজরত করে মদীনায় চলে আসেন। অথচ এটা জানা কথা যে, মদীনাতে সম্পদ বলতে উল্লেখযোগ্য কোন কিছুই ছিল না। এমনকি ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ-সুবিধাও ছিল অত্যন্ত সীমিত। এর ফলে মদীনার অর্থনৈতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়ে পড়ল। ইসলাম বিরোধী চক্র এ বিপর্যয়ের সুযোগ নিয়ে অর্থনৈতিক বয়কট আরম্ভ করে দেয়। কাজেই আমদানী সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায় এবং অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গীন হয়ে পড়ে। কিন্তু মুসলিমগণের বিরুদ্ধে অন্তরে কোন বিদ্বেষ বিরোধিতা কিংবা শত্রুতার মনোভাব ছিল না।

(খ) দ্বিতীয় সম্প্রদায়ঃ মদীনার মূল পৌত্তলিক (মুশরিক) অধিবাসী এ সম্প্রদায়ভুক্ত। মুসলিমগণের উপর এদের কোন নেতৃত্ব বা কর্তৃত্ব ছিল না। কিছু সংখ্যক মুশরিক সন্দেহ ও দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে পড়েছিল এবং পৈতৃক ধর্ম পরিত্যাগের ব্যাপারে সন্দিহান ও অনিচ্ছুক ছিল, কিন্তু মুসলিমগণের বিরুদ্ধে তাদের অন্তরে কোন বিদ্বেষ বিরোধিতা কিংবা শত্রুতার মনোভাব ছিল না। এ শ্রেণীর মানুষ স্বল্প কালের মধ্যেই ইসলাম গ্রহণ করে এবং নিষ্ঠাবান মুসলিমগণের দলভুক্ত হয়ে যায়।

পক্ষান্তরে এমন কিছু সংখ্যক মুশরিক ছিল যারা অন্তরে অন্তরে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও মুসলিমগণের প্রতি বিদ্বেষ, হিংসা ও শত্রুতা পোষণ করত, কিন্তু তাঁদের সঙ্গে মোকাবেলা করার ক্ষমতা তাদের ছিল না। অন্তরে তাদের যেভাবেই থাক না কেন, প্রকাশ্যে তার মৈত্রী ও বন্ধুত্বের ভাব প্রকাশে বাধ্য হতো। এদের মধ্যে প্রথম সারিতে ছিল আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সলুল। আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ছিল সেই ব্যক্তি যাকে বুআসের যুদ্ধের পর আউস ও খাযরাজ গোত্র থেকে নেতা নির্বাচনের সিদ্ধান্তে একমত হয়ে ছিল। অথচ এর পূর্বে এ দু’গোত্র মিলিতভাবে কোন লোককে নেতা নির্বাচনের ব্যাপারে এক মত হতে পারে নি। নেতা নির্বাচনের পর তার জন্য মনিমুক্তা খচিত মুকুট তৈরি করা হচ্ছিল। এ মুকুট পরিয়ে দেয়ার পর তাকে মদীনার রাজা হিসেবে অভিষেক অনুষ্ঠানের কথা ছিল। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে মদীনায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আগমনের ফলে পট পরিবর্তিত হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হয়ে উঠেন মদীনা সমাজের মধ্যমণি। এর ফলে আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কারণেই মদীনার রাজ সিংহাসন থেকে তাকে বঞ্চিত হতে হয়েছে। ফলে অত্যন্ত পাকাপাকিভাবে সে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)’র বিরুদ্ধাচরণে লিপ্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বিরুদ্ধে নানাভাবে নানা চক্রান্তে করেও সে তেমন কোন সুবিধা করতে পারল না। বদরের যুদ্ধের পর যখন সে দেখল যে, অবস্থা মোটেই তার অনুকূল নয় এবং শিরকের উপর অটল থাকার কারণে তাকে পার্থিব ফায়দা থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে, তখন সে বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিয়ে বসল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে কাফেরই ছিল।

এ কারণে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও মুসলিমগণের বিরুদ্ধে শত্রুতার সামান্যতম সুযোগ পেলেও তার সদ্ব্যবহার করতে সে পিছপা হতো না। তার সঙ্গে সাধারণতঃ ঐ সকল নেতার সম্পর্ক ছিল যারা তার রাজত্বে বড় বড় পদ পাওয়ার আশায় আশান্বিত ছিল। কিন্তু মুসলিমগণের প্রাধান্যের ফলে এদেরকে তাদের আকাঙ্খিত পদ ও প্রতিপত্তি থেকে বঞ্চিত হতে হল। এ জন্য তাদের আক্ষেপও কম ছিল না। এ হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার মানসে তারা কোন কোন সময় সরল প্রাণ মুসলিম যুবকদেরকে অস্ত্র হিসেবে চাইত।

(গ) তৃতীয় সম্প্রদায়ঃ মদীনার ইহুদীগণ হচ্ছে এ শ্রেণীভুক্ত। এরা এ্যাসিরীয় ও রোমীয়গণের অন্যায় অত্যাচার জর্জরিত হয়ে হিজাযে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এরা ছিল প্রকৃতপক্ষে ইবরানী (হিব্রু) ভাষাভাষী। কিন্তু হিজাযে বসবাসের পর তাদের চাল-চলন, ভাষা এবং তাহযীব-তামুদ্দুন ইত্যাদি সম্পূর্ণরূপে আরবী রঙে রঞ্জিত হয়ে গিয়েছিল। এমনকি তাদের গোত্রীয় এবং ব্যক্তিমন্ডলও আরবী সংস্কৃতির প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। শুধু তাই নয়, ইহুদী এবং আরবদের মধ্যে বিবাহ শাদির সম্পর্কও স্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের বংশধারা এবং বংশপরিচয় ঠিকই ছিল। আরবদের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে মিশে যায় নি। বরং নিজেদেরকে ইহুদী বা ইসরাঈলী জাতীয়তাবাদের অনুসারী বলে গর্ববোধ করত এবং আরবদের অত্যন্ত নিকৃষ্ট শ্রেণীর বলে মনে করত। কোন কোন ক্ষেত্রে তাদেরকে অশিক্ষিত, বর্বর, হিংস্র, নীচ, অচ্ছুৎ ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষিত করতেও ছাড়ত না। তাদের ধারণা ছিল যে, অরবদের সম্পদ তাদের জন্য বৈধ বা হালাল। আরবদের সম্পদ এভাবে যথেচ্ছ ব্যবহার করার ফলে ইরশাদ হয়েছে,

‏(‏وَمِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ مَنْ إِن تَأْمَنْهُ بِقِنطَارٍ يُؤَدِّهِ إِلَيْكَ وَمِنْهُم مَّنْ إِن تَأْمَنْهُ بِدِيْنَارٍ لاَّ يُؤَدِّهِ إِلَيْكَ إِلاَّ مَا دُمْتَ عَلَيْهِ قَآئِمًا ذٰلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوْا لَيْسَ عَلَيْنَا فِي الأُمِّيِّيْنَ سَبِيْلٌ‏)‏ ‏[‏آل عمران‏:‏ 75‏]‏‏.‏

‘আহলে কিতাবের মধ্যে কেউ কেউ এমন আছে যে, যদি তাদের নিকট স্বর্ণের স্তুপ গচ্ছিত রাখ, তবে তোমাকে তা ফেরত দেবে, পক্ষান্তরে তাদের কেউ কেউ এমন যে, একটি দিনারও যদি তাদের নিকট গচ্ছিত রাখ, তার পেছনে লেগে না থাকলে সে তোমাকে তা ফেরত দেবে না, এটা এজন্য যে, তারা বলে, ‘নিরক্ষরদের প্রতি আমাদের কোন দায়-দায়িত্ব নেই’।’ (আল-‘ইমরান ৩ : ৭৫)

ধর্ম প্রচারের ব্যাপারে ইহুদীদের মধ্যে কোন প্রকার সংগ্রামী চেতনা কিংবা উৎসাহ উদ্দীপনা চোখে পড়ত না। ধর্মের মূল প্রতিপাদ্য তাদের মধ্যে যা লক্ষ্য করা যেত তা হল ভালো মন্দ লক্ষণ নির্ধারণ করা, যাদু ও টোনার ঝাঁড়ফুঁক এবং আরও নানা প্রকার তুকতাক করা। এসকল কাজের জন্যই তারা নিজেদেরকে জ্ঞানী গুণী এবং আধ্যাত্মিক ইমাম ও নেতা মনে করত।

অর্থোপার্জনের নানা পন্থা প্রক্রিয়া ও কৌশলাদির ব্যাপারে ইহুদীরা ছিল অত্যন্ত সিদ্ধহস্ত। বিখ্যাত শস্যাদি, খেজুর, মদ এবং বস্ত্র ব্যবসায়ে তারা ছিল সে জমানায় শীর্ষ স্থানীয় । তারা খাদ্যশস্য, বস্ত্র, মদ ইত্যাদি আমদানী করত এবং খেজুর রপ্তানী করত। এছাড়া অন্যান্য বিভিন্ন কাজেও তারা নিয়োজিত থাকত। ব্যবসা-বাণিজ্য করতে গিয়ে তারা আরবদের নিকট থেকে অত্যন্ত উচ্চ হারে মুনাফা আদায় করত। শুধু তাই নয়, তারা চড়া সুদে সুদী কারবারও করত। এ সকল সুদখোর ইহুদীরা আরবের বড় বড় ব্যবসায়ী নেতাদের সুদী ঋণ প্রদান করত। এ সকল ঘাতক ব্যবসায়ী ও নেতাগণ ঋণদাতা ইহুদীগণের প্রশংসা কীর্তনের জন্য এবং প্রশংসাসূচক কাব্য রচনার জন্য কবিদের অর্থ যোগান দিত। ঋণদানের সময় ইহুদীগণ ঋণ পরিশোধের পরবর্তী কালে চড়া সুদের ফলে সুদ আসলে ঋণলব্ধ অংকের অর্থ যখন অতিমাত্রায় ফুলে ফেঁপে উঠত তখন ঋণ গ্রহীতাদের পক্ষে সেই ঋণ পরিশোধ করা সম্ভবপর হয়ে উঠত না। ফলে তাদের দায়বদ্ধ সম্পত্তি ইহুদীদের অধিকারে চলে যেত।

এরা কুচক্র, ষড়যন্ত্র, যুদ্ধ ও শত্রুতার অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করতে সিদ্ধহস্ত ছিল। তারা এত সূক্ষ্ণ ও কূটকৌশলের সঙ্গে প্রতিবেশী গোত্রসমূহের মধ্যে শত্রুতার বীজ বপন করত যে, তারা এ ব্যাপারে কোন অাঁচই পেতনা। তাদের কুচক্রিপণার ফলশ্রুতিতে গোত্রে গোত্রে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলতে থাকত। ঘটনাচক্রে যুদ্ধের তীব্রতা কিছুটা মন্দীভূত হলে তারা পুনরায় কুট-কৌশল প্রয়োগ করে তার তীব্রতা বাড়িয়ে দিত। এক্ষেত্রে সব চাইতে মজার ব্যাপার ছিল গোত্রে গোত্রে যখন ধবংসযজ্ঞ চলত তখন আরবদের এ ধ্বংসলীলা যাতে বন্ধ হয়ে না যায়, তদুদ্দেশ্যে যুদ্ধমান পক্ষদ্বয়কে বিশাল বিশাল অংকের ঋণ স্বল্প সুদে প্রদান করত এবং বিনিময়ে তাদের সহায়-সম্পত্তি দায়বদ্ধ করে রাখত। এভাবে ক্বায়দা-কৌশল করে দোধারী অস্ত্রের মতো তারা দ্বিমুখী মুনাফা লুটত। অধিকন্তু এক দিকে তারা ইহুদী ঐক্য সংরক্ষিত করার ব্যাপারে যেমন সর্বক্ষণ স্বচেষ্ট থাকত অন্যদিকে তেমনি সুদের বাজার গরম রাখার জন্য সর্বক্ষণ সক্রিয় থাকত।

ইয়াসরিবের ইহুদী গোত্রগুলোর তিনটি গোত্র ছিল সমাধিক প্রসিদ্ধ। এ গোত্রদ্বয় হচ্ছেঃ

১. বনু ক্বাইনুক্বা : এরা ছিল খাযরাজদের মিত্র এবং এদের আবাসস্থল মদীনার মধ্যেই ছিল।

২. বনু নাযীর : এরা ছিল খাযরাযের মিত্র এবং এদের আবাসস্থল মদীনার উপকণ্ঠে।

৩. বনু কুরাইযাহ : এ গোত্র দুটি ছিল আউসদের মিত্র। এদের বাসস্থান ছিল মদীনার উপকণ্ঠে।

প্রায় এক যুগ যাবৎ এ গোত্রদ্বয় আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের মধ্যে যুদ্ধাগ্নি প্রজ্জ্বলিত করে রেখেছিল এবং বুআসের যুদ্ধে আপন আপন মিত্র গোত্রের পক্ষে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিল।

ইসলাম ও মুসলিমগণের সঙ্গে ইহুদীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে সংক্ষেপে এ টুকুই বলা যায় যে, তারা কখনই মুসলিমগণকে সুনজরে দেখত না। তারা সর্বদাই মুসলিমগণের ব্যাপারে প্রতিহিংসাপরায়ণ ও শত্রুভাবাপন্ন থাকত। কারণ, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে তাদের গোত্রীয় কিংবা বংশজাত কোন সম্পর্কই ছিল না। প্রসঙ্গক্রমে এটা বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, তাদের বংশীয় টান তাদের আত্মা ও মন মেজাজের অংশ হিসেবে স্থান লাভ করত এবং এতে তারা প্রচুর আনন্দও পেত।

ইসলাম সম্পর্কে তাদের বিরূপ ভাবাপন্ন হওয়ার অন্য একটি কারণ ছিল এর দাওয়াত ছিল একটি অত্যন্ত উকৃষ্ট মানের দাওয়াত যা ভাঙ্গা অন্তরকে জোড়া দিয়ে চলছিল, হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতার অগ্নিকে নির্বাপিত করছিল, সকল লেনদের ক্ষেত্রে বিশ্বস্ততা ও পবিত্রতার পথ অবলম্বন এবং হালাল উপার্জন ও হালাল ভক্ষণের জন্য মানুষকে অনুপ্রাণিত ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছিল। এর ফলে ইয়াসরিবের গোত্রসমূহের মধ্যকার শিথিল সম্পর্ক ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী ও মজবুত হয়ে উঠতে থাকল যা হহুদীদের মনে দারুণ প্রতিক্রিয়া ও আতঙ্কের সৃষ্টি করল। এ ব্যাপারে তাদের আশঙ্কা ছিল ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে তাদের রমরমাপূর্ণ সূদী কারবার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যাবে। তাছাড়া, সূদী কারবার সূত্রে কূট-কৌশলের মাধ্যমে মদীনাবাসীগণের যে সকল সম্পদ তারা কুক্ষিগত করে রেখেছিল সে সব কিছুই তাদেরকে ফেরৎ দিতে বাধ্য হতে হবে।

যখন ইহুদীগণ বুঝতে পারল যে, ইসলামী দাওয়াত ইয়াসরিবের মাটিতে নিজের জন্য স্থান করে নিয়ে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তখন থেকেই তারা এটাকে তাদের জন্য একটি প্রকৃত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে নিল। একারণেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ইয়াসরিবে আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ইসলাম ও মুসলিমগণের সঙ্গে তারা শত্রুতা আরম্ভ করে দিল। অবশ্য একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাদের এ শত্রুতা গোপনে গোপনেই চলেছিল। তার পর প্রকাশ্যে শত্রুতা করার সৎসাহস তারা অর্জন করে। ইবনে ইসহাক্ব বর্ণিত একটি ঘটনা সূত্রে এ ব্যাপার সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা লাভ করা যায় :

তাঁর বর্ণনায় রয়েছে যে, ‘আমি উম্মুল মু’মিনীন সাফিয়্যাহ বিনতে হুয়াই বিন আখতাব (রাঃ) থেকে এ বর্ণনা প্রাপ্ত হয়েছি যে, তিনি বলেন, ‘আমি আমার আববা ও চাচাজান আবূ ইয়াসেরের নিকট তাদের সন্তানদের মধ্যে সব চাইতে অধিক প্রিয় ছিলাম। তাঁদের অন্যান্য সন্তানদের সঙ্গে থেকে আমি যখনই তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতাম তাঁরা সকলের চাইতে আমাকেই অধিক ভালবাসতেন এবং সকলের আগে আমাকেই কোলে তুলে নিতেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন মদীনায় আগমন করলেন তখন আমার পিতা হুয়াই ইবনে আখতাব ও আমার চাচা আবূ ইয়াসার অতি প্রত্যুষে তাঁর দরবারে উপস্থিত হলেন। ক্লান্ত ও অবসন্ন অবস্থায় সূর্যাস্তের সময় টাল খেতে খেতে তারা ফিরছিলেন, আমি উঁকি মেরে তাদের দেখার পর পূর্বের নিয়ম মাফিক দৌড় দিয়ে তাঁদের নিকট গেলাম, কিন্তু আল্লাহর শপথ তাঁরা এত বেশী চিন্তিত ছিলেন যে, আমার প্রতি তারা ফিরেও তাকালেন না। আমি আমার চাচাকে বলতে শুনলাম, তিনি আববাকে বলছিলেন, ‘ইনিই কি তিনি’’? আববা বললেন, ‘হ্যাঁ, আল্লাহর শপথ!’ চাচা পুনরায় বললেন, ‘আপনি তাকে ঠিক ঠিক চিনতে পারছেন তো’’?

পিতা বললেন, ‘হ্যাঁ’’।

তারপর চাচা বললেন, ‘তার ব্যাপারে আপনি এখন মনে মনে কী ধারণা পোষণ করছেন?

পিতা বললেন, ‘শত্রুতা, আল্লাহর শপথ! যতদিন জীবিত থাকব’’।[1]

এর সাক্ষ্য সহীহুল বুখারী শরীফের একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, যাতে আব্দুল্লাহ বিন সালামের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তিনি ইহুদী সম্প্রদায়ের একজন উঁচুদূরের আলেম ছিলেন। তিনি যখন অবগত হলেন যে, নাবী (ﷺ) বণী নাজ্জার গোত্রে আগমন করেছেন তখন তিনি খুব তাড়াতাড়ি তাঁর দরবারে গিয়ে উপস্থিত হলেন এবং তাকে কয়েকটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন, যার উত্তর একমাত্র নাবীগণ ছাড়া অন্য কেউই দিতে পারেন না। তিনি যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট থেকে প্রশ্ন সমূহের উত্তর পেয়ে গেলেন, তখন তিনি সেখানেই মুসলিম হয়ে গেলেন এবং তাঁকে বললেন যে, ইহুদীরা হচ্ছে মিথ্যা অপবাদকারী এক ঘৃণিত সম্প্রদায়। আমার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি জানার পর যদি তাদেরকে আমার সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তবে তাঁরা আমার সম্পর্কে মিথ্যা অপবাদ দিতে থাকবে।

এ কথা শোনার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইহুদীদেরকে ডেকে পাঠালেন। তারা এ আহবানে তাঁর দরবারে এসে উপস্থিত হল, এদিকে আব্দুল্লাহ বিন সালাম গৃহকোণে আত্মগোপন করে রইলেন। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আব্দুল্লাহ বিন সালাম কেমন লোক তা জানতে চাইলেন। প্রত্যুত্তরে তারা বলল, ‘তিনি হচ্ছেন আমাদের মধ্যে সব চাইতে বড় আলেম এবং সব চাইতে বড় আলেমের পুত্র, তিনি হচ্ছেন আমাদের মধ্যে সব চাইতে ভাল মানুষ এবং সব চাইতে ভাল মানুষের পুত্র।’

অন্য এক বর্ণনা সূত্রে জানা যায় যে, তারা বলল, ‘তিনি আমাদের সর্দার এবং সর্দারের ছেলে। আরও এক বর্ণনাতে রয়েছে যে, তারা বলল, ‘তিনি হচ্ছেন আমাদের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট ব্যক্তি এবং সর্বোৎকৃষ্ট ব্যক্তির সন্তান।’

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘আচ্ছা বলত আব্দুল্লাহ যদি মুসলিম হয়ে যায় তবে?’

ইহুদীগণ দু’ কিংবা তিনবার বলল, ‘আল্লাহ যেন তাঁকে এ থেকে রক্ষা করেন।’ এ কথা শ্রবণান্তে আব্দুল্লাহ বিন সালাম ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন,

أَشْهَدُ أَن لاَّ إِلٰهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَه” لاَ شَرِيْكَ لَه”، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ

অর্থঃ ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোন উপাস্য নেই এবং আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল।’

এ কথা শোনা মাত্রই ইহুদীগণ বলে বসল, (এ হচ্ছে আমাদের মধ্যে সব চাইতে খারাপ লোক এবং সব চাইতে খারাপ লোকের সন্তান)। এর পর তারা তার কুৎসা বর্ণনা করতে শুরু করে দিল। একটি বর্ণনায় আছে, আব্দুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ) এ সময় বললেন, ‘হে ইহুদীদের দল! আল্লাহকে ভয় কর। সেই আল্লাহর শপথ! যিনি ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই। তোমরা আরও জান যে, তিনি (মুহাম্মাদ (ﷺ)) আল্লাহর রাসূল এবং তিনি সত্যসহ আগমন করেছেন।’

কিন্তু ইহুদীরা বলল, ‘তুমি মিথ্যা বলছ’’।[2]

এটা ছিল ইহুদী সম্প্রদায় সম্পর্কিত রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রথম অভিজ্ঞতা। আর তা মদীনায় প্রবেশের প্রথম দিনেই অর্জন হয়েছিল।

এ পর্যন্ত যে সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হল, তা ছিল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মদীনায় প্রবেশ কালীন অবস্থা ও ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। মদীনার বাইরে মুসলিমগণের সব চাইতে শক্তিশালী শত্রু ছিল কুরাইশ মুশরিকগণ। মুসলিমগণকে দশ বছর যাবৎ তাদের প্রবল চাপ, ভীতি প্রদর্শন, অত্যাচার, উৎপীড়ন এবং জুলুম নির্যাতনের মধ্যে বসবাস করতে হয়। পক্ষান্তরে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর উপর দৃঢ় বিশ্বাস, ঈমান-আমান সংক্রান্ত সুষ্ঠু প্রশিক্ষণ, ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং সহিষ্ণুতা ইত্যাদির মাধ্যমে মুসলিমগণের আত্মিক উৎকর্ষতা চরমে পৌঁছেছিল। যার ফলে অনেক অসুবিধার মধ্যে থেকে তাঁদের মনোবল উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েই চলেছিল।

মুসলিমগণ যখন মদীনায় হিজরত করলেন, কুরাইশ মুশরিকগণ তখন তাঁদের বাড়িঘর এবং ধন-সম্পত্তি নিজেদের অধিকারভুক্ত করে নিয়েছিল। শুধু সে সব নিয়েই তারা ক্ষান্ত হল না, মুসলিমগণের সঙ্গে তাঁদের আত্মীয়-স্বজনদের যোগাযোগ রক্ষা করে চলার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে চলল, অধিকন্তু, তারা যাকে পেল তাকেই বন্দী করে রাখল এবং তাদের উপর অমানুষিক জুলুম-নির্যাতন চালাতে থাকল। কিন্তু এত করেও তারা ক্ষান্ত হল না, আরও চরম ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে হত্যা এবং তাঁর দাওয়াতকে সমূলে ধ্বংস করার জন্য চেষ্টা চালাতে থাকল। তা সত্ত্বেও মুসলিমগণ যখন কোনভাবে জীবন রক্ষা করে পাঁচশ’ কিলোমিটার দূরত্বে মদীনায় গিয়ে উপস্থিত হলেন তখন কুরাইশগণ সুযোগের সদব্যবহার করে এক রাজনৈতিক কূটকৌশলের প্রয়োগ শুরু করল। যেহেতু তারা ছিল বায়তুল্লাহ শরীফের প্রতিবেশী, সে কারণে আরব বাসীদের মধ্যে তাদের ধর্মীয় নেতৃত্ব, পার্থিব ঐশ্বর্য ও পদসমূহ তাদের অধিনস্থ ছিল। এ কারণে তারা আরব উপদ্বীপের মুশরিক অধিবাসীদেরকে মদীনার বিরুদ্ধে উস্কানি প্রদান করে সম্পূর্ণভাবে বয়কট করে ফেলল। যার ফলে মদীনায় জিনিসপত্র আমদানী ক্রমেই হ্রাস পেতে থাকল। অথচ মুহাজিরদের সংখ্যা দিনে দিনে বৃদ্ধি পেতেই থাকল। প্রকৃতপক্ষে মক্কার বিরুদ্ধবাদীদের সঙ্গে মদীনার মুসলিমগণের নতুন অবস্থার প্রেক্ষাপটে যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি হয়ে গেল। যারা সমস্যার অভ্যন্তরে প্রবেশ না করে এ যুদ্ধের দোষ এবং দায়-দায়িত্ব মুসলিমগণের ঘাড়ে চাপিয়ে দিল তাদের সম্পর্কে বুঝতে হবে যে, হয় তারা বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে একথা বলছে, নতুবা এ ব্যাপারে তাদের কোন ধারণাই নেই।

মুসলিমগণের জন্য এ পর্যায়ে নায্য প্রাপ্য এটাই ছিল যে, যেভাবে তাদের সম্পদ হরণ করা হয়েছে তেমনিভাবে তাঁরাও দুস্কৃতিকারীদের সম্পদ হরণ করবেন, যেভাবে তাঁদের প্রতি অত্যাচার উৎপীড়ন চালানো হয়েছে সেভাবে তাঁরাও অত্যাচারীদের উপর অত্যাচারের প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন, যেভাবে মুসলিমগণের জীবনধারণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে, তেমনিভাবে তাঁরাও তাদের জীবন ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবেন। মোট কথা, দুষ্কৃতিকারীদের সঙ্গে ‘যেমন কর্ম তেমনি ফল’ নীতি অবলম্বন করে চলবেন যাতে মুসলিমগণের প্রতি তাদের প্রতিহিংসাপরায়ণতা এবং ইসলামের মূলোৎপাটনের ধারণা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।

বর্ণিত ঘটনা প্রবাহ ও সমস্যাসমূহ যেগুলো রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নাবী, রাসূল, হাদী ও নেতা হিসেবে মদীনা আগমনের পর প্রত্যক্ষ করেন, তিনি সে সকল সমস্যার সমাধান করেছিলেন নাবী এবং নেতা সুলভ ভূমিকার মাধ্যমে। যে সম্প্রদায় দয়া পাবার যোগ্য তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন এবং যারা কঠোরতা পাবার যোগ্য তাদের প্রতি কঠোরতা প্রদর্শনের মাধ্যমে তিনি এ সকল সমস্যার সমাধান করেছিলেন। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, কঠোরতার চাইতে দয়াই তাঁর অধিক কাম্য এবং প্রিয় ছিল। যার ফলে স্বল্প কালের মধ্যেই ইসলামের চাবিকাঠি মুসলিমগণের নিয়ন্ত্রণে এসে যায়। পরবর্তী পৃষ্ঠাসমূহে এ সবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করা হবে।

[1] ইবনে হিশাম ১ম খন্ড ৫১৮-৫১৯ পৃঃ।

[2] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৪৫৯, ৫৫৬ ও ৫৬১ পৃঃ।
নতুন সমাজ ব্যবস্থার রূপায়ণ (بِنَاءُ مُجْتَمِعٍ جَدِيْدٍ ):

ইতোপূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মদীনায় আগমন করে প্রথম হিজরী রবিউল আওয়াল মাসের ১২ই তারীখে জুমআর দিন মোতাবেক ২৭শে সেপ্টেম্বর ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে বনী নাজ্জার গোত্রের আবূ আইউব আনসারীর বাড়ির সম্মুখে অবরতণ করেছিলেন এবং বলেছিলেন ‘ইন-শা-আল্লাহ এটাই হবে আমার অবস্থান।’ তারপর তিনি আবূ আইউব আনসারীর বাড়িতে স্থানান্তর হয়ে যান।

দেখানো হচ্ছেঃ ১১১ থেকে ১২০ পর্যন্ত, সর্বমোট ৪৩৪ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে পাতা নাম্বারঃ « আগের পাতা 1 2 3 4 · · · 9 10 11 12 13 · · · 41 42 43 44 পরের পাতা »