অঙ্গীকার সংক্রান্ত কাজকর্ম সম্পূর্ণ হয়ে গেছে এবং লোকজনেরা এখন নিজ নিজ গন্তব্য স্থান অভিমুখে রওয়ানা হয়ে যাবেন এমন সময় এক শয়তান ব্যাপারটি জেনে ফেলে। যেহেতু ব্যাপার সে জানতে পারে একেবারে শেষ মুহূর্তে এবং তার হাতে এতটুকু সময় ছিল না যে, সে কুরাইশ মুশরিকদের নিকট এ খবর পাঠিয়ে দেয় এবং তারা আকস্মিকভাবে আক্রমণ চালিয়ে এ সুড়ঙ্গের মধ্যেই এদের সকলকে নিঃশেষ করে ফেলে, সেহেতু সে (শয়তান) তাড়াতাড়ি পাহাড়ে একটি উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে এমন উচ্চ কণ্ঠে (যা কদাচিৎ কেউ শুনে থাকবে) ডাক দিল, ‘হে তাঁবু ওয়ালা! মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে দেখ বেদীনেরা এখন তার সঙ্গে রয়েছে। তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য তারা এখানে একত্রিত হয়েছে।’
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘এ হচ্ছে এ সুড়ঙ্গের শয়তান। হে আল্লাহর দুশমন! আমি তোর জন্য অতিসত্ত্বর বেরিয়ে পড়ছি। এরপর তিনি সকলকে বললেন, ‘তোমরা সকলে নিজ নিজ আস্তানায় চলে যাও।[1]
শয়তানের কণ্ঠ নিঃসৃত শব্দ শ্রবণ করে, আব্বাস বিন উবাদাহ বিন নাযলাহ বললেন, ‘ঐ সত্ত্বার শপথ যিনি ন্যায়ের সঙ্গে আপনাকে প্রেরণ করেছেন, আপনি যদি চান তাহলে আমরা কালই তরবারী নিয়ে মিনাবাসীর উপর আক্রমণ চালাই। তিনি (ﷺ) বললেন, ‘আমাকে এ নির্দেশ দেয়া হয়নি।’ অতএব আপনারা নিজ নিজ আস্তানায় চলে যান।’ কাজেই লোকেরা নিজ নিজ আস্তানায় ফিরে গিয়ে শুয়ে পড়লেন। এভাবেই সকাল হয়ে গেল।[1]
এ সংবাদ কুরাইশদের কর্ণকুহরে পৌঁছিবা মাত্র অসহনীয় দুঃখে বেদনা হেতু তাদের মাঝে কলরব শুরু হয়ে গেল। কেননা, মুসলিমগণের এ ধরণের অঙ্গীকার ও চুক্তির সুদূর প্রসারী বিরূপ প্রতিক্রিয়া যে তাদের জীবন ও সম্পদের উপরে হবে সেটা ভালভাবেই জানা ছিল। সুতরাং, সকাল হওয়া মাত্র তাদের নেতা ও মাস্তানদের ভারী দল ঐ চুক্তির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখানোর উদ্দেশ্যে মদীনাবাসীদের তাঁবু অভিমুখে যাত্রা করল এবং এইভাবে আবেদন জানাল,
হে খাযরাজের লোকেরা! আমরা অবগত হলাম যে, আপনারা আমাদের এ মানুষটিকে আমাদের নিকট হতে নিয়ে যাওয়ার জন্য এসেছেন ও আমাদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য তার সঙ্গে অঙ্গীকারাবদ্ধ হচ্ছেন। অথচ আরব গোত্র সমূহের মধ্যে শুধুমাত্র আপনাদের সাথে যুদ্ধ করা আমাদের অপছন্দ কাজ।[1]
কিন্তু যেহেতু এ বাইআত অত্যন্ত সঙ্গোপনে রাতের অন্ধকারে অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেহেতু খাযরাজ মুশরিকগণ এ সম্পর্কে মোটেই টের পায় নি। সেজন্য তারা বার বার আল্লহর কসম খেয়ে বলল সে রকম কিছু অনুষ্ঠিত হয় নি। আমরা এ বিষয়ে বিন্দু মাত্র অবগত নই। পরিশেষে বিক্ষোভে শামিল এ দল আব্দুল্লাহ বিন উবাই ইবনু সুলুলের নিকট পৌঁছিল। এ বিষয়ে তাঁর নিকট জানতে চাইলে প্রত্যুত্তরে সে বলল ‘নিশ্চয় এটা বাজে কথা। এমনটি কিছুতেই হতে পারে না যে, আমার সম্প্রদায় আমাকে এড়িয়ে আমার অগোচরে এ রকম কোন কাজ করতে পারে। আমি ইয়াসরাবে থাকতাম, তাহলেও আমার পরামর্শ ছাড়া আমার সম্প্রদায় এরূপ করতনা।
অবশিষ্ট রইলেন মুসলিমগণ, তাঁরা আড় চোখে পরস্পর পরস্পরকে দেখলেন এবং চুপচাপ রইলেন। এমন কি হ্যাঁ কিংবা না বলেও কেউ মুখ খুললেন না। শেষ পর্যন্ত কুরাইশ নেতাদের ধারণা হলো মুশরিকদের কথা সত্য এবং এ কারণে তারা নিরাশ হয়ে ফিরে গেল।
মক্কার কুরাইশ নেতাগণ সম্ভবতঃ দৃঢ়তার সঙ্গে এটা ধরেই নিয়েছিল যে, এ সংবাদ মিথ্যা। কিন্তু এর অনুসন্ধানে সর্বদা লেগেই থাকল এবং শেষ পর্যন্ত নিঃসন্দেহে আবগত হল যে, অঙ্গীকার গ্রহণের ঘটনা সত্য। এ ঘটনাটি অবগত হওয়ার পর তারা অঙ্গীকার গ্রহণকারীদের প্রতি মারমুখী হয়ে উঠে। কিন্তু যখন তারা এ সংবাদটি অবগত হল তখন অঙ্গীকারাবদ্ধ হাজীগণ নিজ নিজ গৃহাভিমুখে অনেকটা পথ অগ্রসর হয়ে গিয়েছেন। মক্কাবাসীগণ দ্রুতপদে অগ্রসর হয়েও তাঁদের নাগাল পেলনা। অবশ্য সা’দ বিন উবাদাহ এবং মুনযির বিন ‘আমরকে দেখে ফেলে এবং তাদেরকে তাড়া করতে থাকে। কিন্তু মুনযির অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে তাঁদের নাগালের বাইরে চলে যেতে সক্ষম হন। অবশ্য সা’দ বিন উবাদাহ তাদের হাতে ধরা পড়ে যান। তারা তাঁর হাত দুটো তাঁরই পালানের দড়ি দ্বারা গর্দানের পিছনে বেঁধে দেয়। কষ্ট দিতে দিতে মক্কা পর্যন্ত নিয়ে যায়। কিন্তু সেখানে মুত্ব’ঈম বিন আদী এবং হারিস বিন হারব বিন উমাইয়া এসে তাঁকে ছাড়িয়ে দেন। কারণ, তাদের দুজনের যে বাণিজ্য কাফেলা মদীনার পথ দিয়ে যাতায়াত করত তা সায়াদের আশ্রয়েই চলাচল করত। তাঁকে বন্দী করে নিয়ে যাওয়ায় আনসারগণ খুবই বিব্রতবোধ করতে থাকেন এবং তাঁকে মুক্ত করার ব্যাপারে উপযুক্ত ব্যবস্থাবলম্বনের জন্য সলা পরামর্শ করতে থাকেন। ইতি মধ্যে দেখা গেল যে, বন্দী দশা থেকে মুক্ত হয়ে তিনি সঙ্গী সাথীদের নিকট প্রত্যাবর্তন করেছেন। এরপর সকলেই নিরাপদে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলেন।[1]
এটাই হচ্ছে ‘আক্বাবাহর দ্বিতীয় অঙ্গীকার যাকে ‘আক্বাবাহর বড় শপথ বলে অভিহিত করা হয়। এ অঙ্গীকার এমন এক খোলা জায়গায় সম্পাদিত হয়েছিল যা ভালবাসা ও ওয়াদাপালন, সততা, বিচ্ছিন্ন ঈমানদারদের মধ্যে সাহায্য, সহযোগিতা, পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, আস্থা ও বিশ্বাস, আত্মত্যাগ ও বীরত্বের উদ্দীপনায় ভরপুর ছিল। ফলে ইমানদার ইয়াসরিববাসীদের অন্তর মক্কার দুর্বল ভাইদের প্রতি দয়ামায়ায় ভরপুর ছিল। মক্কার অধিবাসী ভাইদের সাহায্য করার জন্য তাঁদের অন্তরে উৎসাহ উদ্দীপনার কমতি ছিল না। অধিকন্তু, তাঁদের প্রতি অত্যাচার কারীদের বিরুদ্ধে দারুণ দুশ্চিন্তা ও ক্রোধছিল। তাঁদের অন্তর এ ভাইদের ভালবাসায় ভরপুর ছিল যাদের না দেখে আল্লাহর ওয়াস্তে ভাই নির্ধারণ করেছিল।
আর এ উৎসাহ উদ্দীপনা ও অনুধাবন শুধু একটি কল্পিত আকর্ষণের ফলই ছিল না, যা সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে শেষ হয়ে যেতে পারে বরং এর উৎস হচ্ছে আল্লাহর প্রতি ঈমান, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি ঈমান ও কিতাবের প্রতি ঈমান। অর্থাৎ যে ঈমান অন্যায় অত্যাচারের বড় থেকে বড় শক্তির কাছেও মাথানত করে না। যে ঈমানেরই বদৌলতে (কারণে) এমন সব যুগান্তকারী কর্ম ও কীর্তিমালা স্থাপিত হয়েছে এবং মানবজাতির ইতিহাসে এমন সব অধ্যায় রচিত হয়েছে যার তুলনায় অতীত কিংবা বর্তমান কোন কালেই মিলে না। সম্ভবতঃ ভবিষ্যতেও মিলবে না।
‘আক্বাবাহর দ্বিতীয় অঙ্গীকার যখন সুসংবাদ ও সুসংগঠিত রূপ লাভ করল তখন নাস্তিকতা ও মূর্খতার তৃণ শস্য বিহীন মরুভূমিতে ইসলাম মহীরূহের ভিত্তিমূল বহুলাংশে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে উঠল। ইসলামী দাওয়াতের জন্মলগ্ন হতে অদ্যাবধি বিভিন্ন ক্ষেত্রে যতটা সফলতা অর্জন সম্ভব হয়েছিল তার মধ্যে এটাই ছিল সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং উল্লেখযোগ্য সফলতা। এরপরই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মুসলিমগণকে এ নতুন দেশে হিজরত করার (দেশত্যাগ করার) অনুমতি প্রদান করেন।
হিজরতের অর্থ ছিল সকল প্রকার সুখ সুবিধা ও আরাম আয়েশ ত্যাগ করে এবং ধন দৌলত ও সহায় সম্পদ সবকিছু পরিত্যাগ করে কেবলমাত্র প্রাণ রক্ষা করা। আর এটা মনে রাখতে হবে যে, মুশরিকবেষ্টিত মুসলিমগণের জীবন যে কোন মুহূর্তে বিপদগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাই ছিল অধিক। অধিকন্তু পথের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যেকোন স্থানে বিপদ ঘনিয়ে ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। আর ভ্রমণ ছিল এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পানে। জানা ছিল না আগামীতে কোন্ ধরণের বিপদাপদ ও দুঃখ কষ্টের সম্মুখীন তাঁদের হতে হবে।
মুসলিমগণ এ সব জেনে শুনে হিজরত আরম্ভ করে দিলেন। এদিকে মুশরিকরা তাঁদের যাত্রাপথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে শুরু করল। কারণ তারা বুঝতে পারছিল যে, এর মধ্যে বিপদ লুকায়িত রয়েছে। হিজরতের কয়েকটি নমুনা পাঠকগণের খিদমতে পেশ করা হল।
১. সর্ব প্রথম মুহাজির ছিলেন আবূ সালামাহ (রাঃ)। ইবনে ইসহাক্বের মতে তিনি ‘আক্বাবাহর বড় শপথের পূর্বেই হিজরত করেছিলেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েরা। যখন তিনি মক্কা শরীফ থেকে যাত্রা করতে চাইলেন তখন তাঁর শ্বশুর পক্ষ বলল, ‘আপনার নিজ প্রাণের ব্যাপারে আপনি আমাদের উপর জয়ী হলেন। কিন্তু আমাদের কন্যাকে আপনার সঙ্গে শহর থেকে শহরে ঘুরে বেড়াতে দিতে পারি না।’
এ কথা বলার পর তাঁরা তাঁর স্ত্রীকে তাঁর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেলেন। এতে আবূ সালামাহ (রাঃ)-এর আত্মীয়-স্বজন অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন এবং বললেন, ‘তোমরা যখন এ মহিলাকে আমাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছ তখন আমরাও আমাদের সন্তানটিকে কিছুতেই থাকতে দিতে পারি না।’
তারপর সন্তানটিকে নিয়ে উভয় পক্ষ টানাটানির ফলে শিশুটির একটি হাত উপড়ে গেল। এমন এক অবস্থার মধ্যে আবূ সালামাহর আত্মীয়-স্বজনেরা শিশুটিকে নিজেদের অধিকারে নিয়ে যান। এ কারণে আবূ সালামাহকে একাকী মদীনা গমন করতে হয়।
এরপর থেকে উম্মু সালামাহ (রাঃ)-এর অবস্থা এমনটি হল যে, প্রত্যহ সকালে তিনি আবতাহ (যেখানে এ ঘটনা ঘটেছিল) আসতেন এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত কান্নাকাটি করতে থাকতেন। এ অবস্থায় তাঁর অতিবাহিত হয়ে যায় প্রায় একটি বছর। তাঁর এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে কোন এক আত্মীয় গভীর মর্মবেদনা অনুভব করতে থাকেন। তিনি বলেন, কেন একে যেতে দিচ্ছ না। অনর্থক কেন তাকে তার স্বামী ও সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছ?
এ কথাবার্তার পরিপ্রেক্ষিতে তার আত্মীয়রা তাকে বলল, তুমি যদি ইচ্ছা কর তাহলে স্বামীর নিকট যেতে পার। তখন তিনি সন্তানটিকে তার দাদার বাড়ী হতে ফেরত নিয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেলেন। এ সফর হলো দীর্ঘ পাঁচশত কিলোমিটারের। আর তাঁকে পথ চলতে হবে দুর্গম পাহাড় ও ভয়ংকর সব উপত্যকা হয়ে অথচ তার সাথে কোন সঙ্গী-সাথী নেই। আল্লাহ আকবার! সন্তান সহ যখন তিনি তানঈম গিয়ে পৌঁছলেন তখন উসমান বিন আবূ ত্বালহাহর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হল। অবস্থা অবগত হয়ে সহযাত্রীরূপে মদীনা পৌঁছানোর জন্য নিয়ে গেলেন। যখন জনবসতি দৃষ্টি গোচর হল তখন তিনি বললেন, ‘এ গ্রামে তোমার স্বামী আছেন, এ গ্রামে চলে যাও। আল্লাহ বরকতময়, বরকত দিন’’। এরপর তিনি মক্কার অভিমুখে অগ্রসর হলেন।[1]
২. সুহাইব (রাঃ) যখন হিজরতের ইচ্ছা করলেন, তখন কুরাইশ গোত্রের কাফিরগণ বলল, ‘তুমি যখন আমাদের নিকট এসেছিলে তখন নিকৃষ্ট ভিক্ষুক ছিলে। কিন্তু এখানে আসার পর তোমার অনেক ধন সম্পদ হয়েছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। এখন তুমি চাচ্ছ যে, তোমার ধনসম্পদ নিয়ে এখান থেকে চলে যাবে। আল্লাহর কসম! এ কিছুতেই হতে পারে না।’
সুহাইব (রাঃ) বললেন, ‘ঠিক আছে, আমি যদি আমার ধন-সম্পদ ছেড়ে যাই, তবে কি তোমরা আমার পথ ছেড়ে দিব?
তারা বলল, ‘হ্যাঁ’
সুহাইব বললেন, ‘বেশ ঠিক আছে। চলো আমার ধন-সম্পদ যা কিছু আছে তোমাদেরকে দিয়ে দিই।’ (তারপর তিনি আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর মহববতে তার সমস্ত সম্পদ কাফিরদের হাতে তুলে দিলেন)।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন এ খবর জানতে পারলেন তখন আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘সুহাইব লাভবান হয়েছেন, সুহাইব লাভবান হয়েছেন।[2]
৩. উমার বিন খাত্তাব (রাঃ), আইয়াশ বিন আবী রাবী’আহ (রাঃ), হিশাম বিন আস বিন ওয়ায়িল (রাঃ) নিজেদের মধ্যে এটা স্থির করলেন যে, সারিফ-এর তানাযুব স্থানে খুব সকালে একত্রিত হয়ে সেখানে থেকে মদীনা হিজরত করা হবে। উমার (রাঃ) ও আইয়াশ (রাঃ) যথাসময়ে নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হলেন, কিন্তু হিশাম বন্দি হয়ে গেলেন।
এ দিকে উমার (রাঃ) ও আইয়াশ (রাঃ) যখন মদীনায় গিয়ে ‘কুবাতে’ অবতরণ করলেন তখন আবূ জাহল ও তার ভাই হারিস আইয়াশের নিকট উপস্থিত হল। তারা তিন জন ছিল একই মায়ের একই মায়ের সন্তান। তারা দুজন আইয়াশ (রাঃ) কে বলল, ‘তোমার এবং আমাদের মাতা নযর (মানত) মেনেছে যে, যতক্ষণ তোমাকে দেখতে না পাবে ততক্ষণ পর্যন্ত চুল আঁচড়াবে না এবং রোদ ছেড়ে ছায়াতে আশ্রয় নেবে না। এ কথা শ্রবণে আইয়াশ (রাঃ) আপন মায়ের ব্যাপারে অত্যন্ত দয়াদ্র হয়ে পড়লেন। এ অবস্থা দেখে উমার (রাঃ) আইয়াশ (রাঃ)-কে বললেন, ‘দেখ আইয়াশ! আল্লাহর কসম! এরা তোমাকে তোমার ধর্ম থেকে সরিয়ে বিপদে ফেলার জন্য এ কূট কৌশল অবলম্বন করেছে। কাজেই তাদের সম্পর্কে সতর্ক থেকো। আল্লাহর কসম! তোমার মাতাকে যদি উকুনে কষ্ট দেয় তবে সে অবশ্যই ছায়ায় গিয়ে আশ্রয় নেবে। কিন্তু আইয়াশ সে কথায় কর্ণপাত না করে মাতার কসম পূর্ণ করার জন্য ঐ দুজনের সঙ্গে বেরিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন।
উমার (রাঃ) তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘তোমার মাতার ইচ্ছা পূরণের ব্যাপারে তুমি যখন দৃঢ় সংকল্প তখন তোমার যাতায়াতের সুবিধার্থে আমার উটনীটি নিয়ে যাও। এ হচ্ছে খুবই দ্রুতগামী এবং শান্ত স্বভাবের একে যদি তুমি নিয়ে যাও তাহলে হাতের বাইরে ছেড়ে দেবে না। তাছাড়া মক্কার মুশরিকগণের নিকট হতে কোন প্রকার অনিষ্ট কিংবা অসদাচরণের আশঙ্কা থাকলে পালিয়ে আসবে।
আইয়াশ (রাঃ) উটনীর উপর আরোহণ করে তাদের সঙ্গে যাত্রা করলেন। কিছু পথ অতিক্রম করার পর এক জায়গায় আবূ জাহল বলল, ‘ভাই আমার এ উট নিয়ে তো খুব অসুবিধায় পড়তে হল। তুমি কি আমাকে তোমার পশ্চাতে ঐ উটনীর পিঠে বসিয়ে নেবে?’
আইয়াশ বললেন, ‘ঠিক আছে’ তারপর তিনি উটনীকে বসিয়ে দিলেন।
তারা দুজনে আপন আপন উটকে বসিয়ে দিল যাতে আবূ জাহাল তার উটের পিঠ থেকে নেমে গিয়ে আইয়াশ (রাঃ)-এর উটনীর পিঠে গিয়ে উঠতে পারে। কিন্তু তিনজনেই যখন মাটিতে নেমে পড়ল তখন হঠাৎ তারা দুজনে মিলিতভাবে আইয়াশ (রাঃ)-এর উপর আক্রমণ চালাল এবং দড়ি দিয়ে কষে বেঁধে ফেলল। তারপর তাঁকে এ বাঁধা অবস্থাতেই দিবাভাগে মক্কায় নিয়ে এসে মক্কাবাসীকে লক্ষ্য করে বলল, ‘হে মক্কাবাসী! আপনারা আপনাদের অবোধদের সঙ্গে এরূপ করবেন যেমন আমরা আমাদের অবোধের সঙ্গে করেছি।[3]
হিজরতের দৃঢ় ইচ্ছা পোষণকারীদের সম্পর্কে জানতে পেরে মক্কার মুশরিকগণ তাঁদের সঙ্গে কিরূপ আচরণ করত। তার তিনটি নমুনা এখানে পেশ করা হল। কিন্তু তা সত্ত্বেও হিজরতের ধারা অব্যাহত থাকল যার ফলে ‘আক্বাবাহর বড় অঙ্গীকারের পর মাত্র দু’মাসের বেশী সময় অতিক্রান্ত হতে না হতেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ), আবূ বাকর ও আলী রাঃ ব্যতীত কোন মুসলমান মক্কায় অবশিষ্ট ছিলেন না। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)’র নির্দেশে এরা দুজন মক্কাতেই অবস্থান করছিলেন। অবশ্য আরও এমন কিছু সংখ্যক মুসলিম মক্কায় ছিলেন যাদেরকে মুশরিকগণ বল প্রয়োগের মাধ্যমে আটকে রেখেছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজ মাল-সামানা গোছগাছ করে রেখে যাত্রার জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি সহকারে আল্লাহ তা‘আলার আদেশের অপেক্ষা করছিলেন। আবূ বাকর (রাঃ)-এর প্রবাসের সামগ্রী বাঁধা ছিল। অর্থাৎ তিনি হিজরতের জন্য প্রস্তুত ছিলেন।[4]
সহীহুল বুখারীতে ‘আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, নাবী কারীম (ﷺ) মুসলিমগণকে বললেন, ‘আমাকে তোমাদের হিজরতের স্থান দেখানো হয়েছে। এটা হচ্ছে লাওয়ার দু’পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত একটি খেজুর বাগানের এলাকা। এরপর মুসলিমগণ মদীনার দিকে হিজরত করলেন। হাবশের সাধারণ মোহাজেরগণও মদীনায় হিজরত করলেন। আবূ বাকর (রাঃ)-ও মদীনায় হিজরতের জন্য জিনিসপত্র গুছিয়ে ফেললেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে বললেন, ‘একটু থেমে যাও। কেননা আশা করছি আমাকেও অনুমতি দেয়া হবে। আবূ বাকর বললেন, ‘আপনার জন্য আমার মাতা-পিতা কুরবান হোক, আপনার জন্যও কি হিজরতের অনুমতি আশা করতে পারি।’
তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ’।
এরপর আবূ বাকর (রাঃ) থেমে গেলেন যেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে সফর করতে পারেন। তাঁর কাছে দুটো উটনী ছিল। তিনি তাদের চার মাস ধরে ভালভাবে বাবলা গাছের পাতা খাইয়ে হৃষ্টপুষ্ট করে তুললেন যাতে তারা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে পথ চলতে পারে।[5]
[2] ইবনে হিশাম ১ম খন্ড ৪৭৭ পৃঃ।
[3] হিশাম ও আইয়াশ (রাঃ) কাফিরদের বন্দী খানায় পড়ে থাকলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হিজরত করে যাওয়ার পর একদিন বললেন, ‘কে এমন আছে যিনি হিশাম ও আইয়াশকে আমার জন্য ছাড়িয়ে আনবে।’’ অলীদ বিন অলীদ বললেন, ‘আমি তাদেরকে আপনার জন্য ছাড়িয়ে আনার দায়িত্ব নিলাম।’’ তারপর অলীদ গোপনে মক্কা গমন করলেন। একজন স্ত্রীলোকের (যে তাদের দুজনের জন্য খাবার নিয়ে যাচ্ছিল) পিছনে পিছনে গিয়ে তাদের ঠিকানা বের করলেন। এরা দুজনে একটি ছাদ বিহীন গৃহে বন্দী ছিলেন। রাত্রি হলে অলীদ দেওয়াল ডিঙিয়ে তাঁদের নিকট হাজির হলেন এবং বন্দীদশা থেকে মুক্ত করে তাঁদেরকে নিয়ে মদীনায় পালিয়ে এলেন। ইবনে হিশাম ১/৪৭৪-৪৭৬ পৃঃ। উমার (রাঃ) বিশজন সাহাবা’র এক জামায়াতের সঙ্গে হিজরত করেছিলেন সহীহুল বুখারী ১/৬৬৮)।
[4] যা’দুল মা’আদ ২য় খন্ড ৫২ পৃঃ।
[5] সহীহুল বুখারী বাবু হিজবাতিন নাবী (সাঃ) অসহাবিহী ১ম খন্ড ৫৫৩ পৃঃ।
সাহাবীগণ (রাঃ) নিজ নিজ ধনসম্পদ ও স্ত্রী পুত্র কন্যাদেরকে সঙ্গে নিয়ে যখন আউস ও খাযরাজ গোত্রের আবাসিক এলাকায় গিয়ে উপস্থিত হলেন তখন মুশরিকদের মধ্যে একটা হৈচৈ পড়ে গেল। চরম দুঃশ্চিন্তা ও মানসিক যন্ত্রণায় তারা এতই অস্থির হয়ে পড়ল যে, ইতোপূর্বে কোন কারণেই তাদের মধ্যে এত অধিক অস্থিরতা পরিলক্ষিত হয় নি। হিজরতের এ ব্যাপারটি ছিল তাদের মূর্তি পূজা, সামাজিক ঐক্যবোধ এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ স্বরূপ।
মুশরিকরা এটা ভালভাবেই অবগত ছিল যে, মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর মধ্যে পূর্ণ নেতৃত্বদান ও পথ নির্দেশনার সঙ্গে সঙ্গে কিরূপ আকর্ষণীয় শক্তি মওজুদ রয়েছে, সাহাবীদের (রাঃ) মধ্যে কিরূপ দৃঢ়তা এবং আত্মত্যাগের উৎসাহ উদ্দীপনা রয়েছে। তাছাড়া আউস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে কিরূপ শক্তি সামর্থ্য এবং যুদ্ধ করার যোগ্যতা রয়েছে এবং ঐ গোত্রদ্বয়ের জ্ঞানীদের মধ্যে সন্ধি ও পরিচ্ছন্নতার কিরূপ উৎসাহ উদ্দীপনা রয়েছে ও কয়েক বছর ধরে পরিচালিত গৃহযুদ্ধের তিক্ততা আস্বাদনের পর এখন কিভাবে নিজেদের মধ্যকার দুঃখকষ্ট ও শত্রুতা দূরীকরণের জন্য তারা আগ্রহী।
তারা এটাও অনুধাবন করে ছিল যে, ইয়ামান হতে সিরিয়া পর্যন্ত লোহিত সাগরের উপকূল দিয়ে তাদের যে, ব্যবসার জাতীয় সড়ক (রাজপথ) অতিক্রম করছে, এ জাতীয় সড়কে মদীনার সৈনিক অবস্থান কতবেশী গুরুত্বপূর্ণ এমন এক স্পর্শকাতর অবস্থার সম্মুখীন তারা হল। সে সময় সিরিয়ার সঙ্গে মক্কাবাসীদের ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল প্রায় আড়াই লক্ষ দীনার সোনার সমতুল্য। এছাড়া ছিল ত্বায়িফবাসীদের ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপার। আর এ সব ব্যবসা-বাণিজ্য নির্ভর করছিল পথচারী বাণিজ্য কাফেলার নিরাপত্তা বিধানের উপর।
এ বর্ণনা মতে এটা অনুমান করা মোটেই কঠিন ছিল না যে, হিজরতকারী মুসলিমগণের মদীনায় আগমনের ফলে ইসলামী দাওয়াতের ভিত্তি সুপ্রতিষ্ঠিত হলে এবং মদিনাবাসীগণকে মক্কাবাসীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করাতে সক্ষম হলে, তা হবে মক্কাবাসীদের জন্য একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ব্যাপার। মুশরিকেরা উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন ছিল, কাজেই তারা এ চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করার জন্য তৎপর হয়ে উঠেল। এটা তাদের জানা কথা যে, এ বিপদের মূলসূত্র হচ্ছে ইসলামের দাওয়াত। যার পতাকাবাহী হচ্ছেন মুহাম্মাদ (ﷺ)।
উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ‘আক্বাবাহর দ্বিতীয় অঙ্গীকারের আনুমানিক আড়াইমাস পর চতুর্দশ নবুওয়াত বর্ষের ২৬শে সফর মোতাবেক ৬২২ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার[1] দিবসের প্রথম ভাগে[2] মক্কার সংসদ ভবন দারুন নদওয়াতে কুরাইশ মুশরিকগণ ইতিহাসের সব চাইতে ভয়াবহ অধিবেশন অনুষ্ঠিত করে। এতে সকল কুরাইশগোত্রের নেতৃবৃন্দ অংশ গ্রহণ করে।
আলোচ্য বিষয় ছিল এমন এক অকাট্য পরিকল্পনা তৈরি করা যাতে যত শীঘ্র সম্ভব ইসলামী দাওয়াতের পতাকাবাহীকে (নাবী (ﷺ)-কে) হত্যার মাধ্যমে ইসলামের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা সম্ভব হয়।
এ অবস্থায় মারমুখী অধিবেশনে যে সকল গোত্রীয় কুরাইশ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে যথাক্রমেঃ (১) আবূ জাহল বিন হিশাম- বনী মাখযুম গোত্র (২) যুবাইর বিন মুত্ব’ঈম, তু’আইমাহ বিন আদী এবং হারিস বিন ‘আমির- বনী নওফাল বিন আবদে মানাফ থেকে (৩) শাইবাহ বিন রাবী’আহ, উতবাহ বিন রাবী’আহ এবং আবূ সুফইয়ান বিন হারব- বনী আবদে শামস্ বিন আবদে মানাফ থেকে। (৪) নাযর বিন আসওয়াদ ও হাকীম বিন হিযাম- বনী আসাদ বিন আব্দুল উযযা থেকে। (৬) নুবাইহ বিন হাজ্জাজ ও মুনাব্বিহ বিন হাজ্জাজ- বনী সাহম থেকে (৭) উমাইয়া বিন খালফ- বনী জুমাহ থেকে।
নির্ধারিত সময়ে যখন এ সব নেতৃবৃন্দ দারুন নদওয়ায (সংসদভবনে) পৌঁছলেন তখন ইবলীসও সম্ভ্রান্ত পন্ডিতের রূপ ধরে অত্যন্ত অভিজাত মানের পোশাক পরিহিত অবস্থায় রাস্তা ঘিরে দরজার উপর দন্ডায়মান হল। তাকে দেখে লোক সকলে আপোষে বলাবলি করতে লাগল। ‘ইনি কোথাকার শাইখ (পন্ডিত)’’?
ইবলীস বলল, ‘ইনি হচ্ছেন নাজদের শাইখ।’ আপনাদের প্রোগ্রাম শুনে উপস্থিত হয়েছেন, ‘কথাবার্তা শুনতে চান এবং সম্ভব হলে প্রয়োজন মাফিক পরামর্শ দান করতে চান।’
লোকেরা বলল, ‘বেশ ভাল, আপনি ভিতরে আসুন’’।
এ সুযোগে ইবলীস তাদের সঙ্গে ভিতরে গেল।
[2] ইবনে ইসহাক্বের বর্ণনা মতে বলা হয়েছে যে, জিবরাঈল (আঃ) নাবী (সাঃ)-এর নিকট এ সভার সংবাদ এনেছিলেন এবং তাঁকে হিজরতের অনুমতি সংবাদ দিলেন। ‘আয়িশাহ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস থেকে জানা যায় যে, নাবী (সাঃ) ঠিক দুপুরে আবূ বকরের গৃহে এসে বললেন, হিজরতের অনুমতি দেয়া হয়েছে। পূর্ণ বিবরণ পরে আছে।
গণ্যমান্য ব্যক্তিগণের আগমনে সভাকক্ষ পরিপূর্ণ হওয়ার পর বিতর্ক পর্বের সূচনা হল। তারপর প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত আকারে বিতর্ক চলতে থাকল। প্রথমে আবুল আসওয়াদ এ প্রস্তাব পেশ করল যে, ‘আমরা ঐ লোকটিকে আমাদের ভিতর থেকে বের করে দিই এবং এ শহর থেকে বিতাড়িত করি। সে কোথায় যাবে কিংবা কোথায় থাকবে সে ব্যাপারে তাঁর সঙ্গে আমাদের আর কোনই সম্পর্ক থাকবে না। এ কারণে আমাদের আর কোন সমস্যা থাকবে না এবং পূর্বের অবস্থা আবার ফিরে আসবে।
কিন্তু শাইখ নাজদী বলল, ‘আল্লাহর কসম! এটা সঠিক প্রস্তাব হল না। তোমরা কি দেখতে পাওনা যে, ঐ ব্যক্তির কথা কত চমৎকার এবং কথা বলার ধারা কতটা মধুর। তোমরা দেখনা কিভাবে সে মানুষের মন জয় করে চলেছে। আল্লাহর শপথ! তোমরা যদি এটা কর তবে সে কোন আরব গোত্রে গিয়ে আশ্রয় নেবে এবং তাদেরকে নিজ অনুসারী করে নেবে। তারপর তাদের সঙ্গে সখ্যতা করে তোমাদের শহরে আক্রমণ চালিয়ে তোমাদের কোনঠোসা করে ফেলবে এবং যাচ্ছেতাই ব্যবাহার করবে। তোমরা যে সমাধানের কথা বলছ তা বাদ দিয়ে অন্য সমাধানের কথা চিন্তা করো।’
আবুল বুখতারী বলল, ‘তাকে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখ। বন্দী অবস্থায় তাঁকে ঘরে আবদ্ধ রেখে বাহির থেকে দরজা বন্ধ করে দাও এবং এর অবশ্যম্ভাবী পরিণতির জন্য (মৃত্যু) অপেক্ষা করতে থাক। যেমনটি ইতোপূর্বে কবিদের বেলায় (যুহাইর, নাবেগা ও অন্যান্য) হয়েছিল।’
শাইখ নাজদী বলল, ‘না, আল্লাহর কসম! এ প্রস্তাব তেমন সঙ্গত বলে মনে হচ্ছে না। আল্লাহর শপথ! যদি তোমরা তাকে বন্দী করো যেমনটি তোমরা বলছ তাহলে তাঁর খবর বন্ধ দরজা দিয়েই বের হয়ে তাঁর সঙ্গীদের নিকট পৌঁছে যাবে। আর তখন তাদের পক্ষে হয়তো এটা অসম্ভব হবে না যে, তারা তোমাদের উপর আক্রমণ চালিয়ে তাকে মুক্ত করে নিয়ে যাবে। এরপর তারা সম্মিলিতভাবে আক্রমণ চালিয়ে একদম পর্যুদস্ত করে ফেলবে। অতএব, এ প্রস্তাব ও সমর্থন যোগ্য নয়। অন্য কোন সমাধানের কথা চিন্তা করা প্রয়োজন।
এরপর দুটি প্রস্তাবই যখন সংসদ কর্তৃক নাকচ হয়ে গেল তখন পেশ করা হল অন্য একটি প্রস্তাব। এ প্রস্তাবটি পেশ করল মক্কার সব চাইতে কুখ্যাত ব্যক্তি আবূ জাহল। সে বলল, ‘ঐ ব্যক্তি (মুহাম্মাদ সাঃ) সম্পর্কে আমার একটি অভিমত রয়েছে। আমি দেখছি এ যাবৎ তোমরা কেউই সে পর্যন্ত পৌঁছতে পারনি। লোকেরা বলল, ‘আবুল হাকাম! সেটা কী?’
আবূ জাহল বলল, ‘আমাদের প্রস্তাব হল প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন করে সুঠাম দেহী ও শক্তিশালী যুবক নির্বাচন করা হোক এবং প্রত্যেককে একটি করে ধারালো তরবারী দেয়া হোক। তারপর সকলেই তার দিকে অগ্রসর হোক এবং সকলেই এক সঙ্গে তলোয়ার মেরে তাকে হত্যা করুক। তাহলেই আমরা তার হাত থেকে নিস্তার পেয়ে যাব। আর এভাবে হত্যা করার ফল হবে রক্তপাতের দায়িত্বটা সকল গোত্রের উপর সমানভাবে ছড়িয়ে পড়বে। এর একটি বিশেষ সুবিধা হবে বনু আবদে মানাফ সকলের সঙ্গে যুদ্ধ করতে সক্ষম হবে না। ফলে (একটি খুনের বদলে একশত উট প্রদান) দিয়াত গ্রহণে রাজী হয়ে যাবে এবং আমরা তা আদায় করে দেব।[1]
শাইখ নাজদী বলল, ‘এ যুবক যে কথা বলল সেটাই কার্যকর থাকল। যদি কোন প্রস্তাব ও সমর্থনের প্রশ্ন আসে তবে এটাই থাকবে, অন্যগুলোর তেমন কোন গুরুত্বই থাকবে না।’
মক্কার সংসদ এমনভাবে এক কাপুরুষোচিত ঘৃণ্য ও জঘন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্য দিয়ে সে দিনের মতো মুলতবী হয়ে গেল। আর সদস্যগণ এ সিদ্ধান্ত ত্বরিৎ বাস্তবায়ণে সংকল্পবদ্ধ হয়ে আপন গৃহে প্রত্যাবর্তন করল।
তারা তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য এমন জঘন্য পরামর্শ সভা অত্যন্ত গোপনে করে যাতে কার্যসিদ্ধির আগ পর্যন্ত কেউ জানতে না পারে। তারা তাদের এতদিন যাবৎ প্রতিরোধের ধরণে পরিবর্তন নিয়ে আসে যা পূর্বের সব সিদ্ধান্তের চেয়ে নিতান্ত ভয়াবহ ও লোমহর্ষক। এটা ছিল কুরাইশদের চক্রান্ত। অন্যদিকে আল্লাহ তা’আলাও কৌশল অবলম্বন করলেন। তাদেরকে এমনভাবে ব্যর্থ করে দেয়া হলো যে তারা বুঝতেও পারল না। তখন জিবরাঈল (আঃ) মহান ও বরকতময় প্রভুর তরফ থেকে আল্লাহর বাণী নিয়ে তার সম্মুখে উপস্থিত হলেন এবং তাকে কুরাইশ মুশরিকদের ষড়যন্ত্রের কথা জনালেন। তিনি বললেন যে, ‘আপনার প্রভু পরওয়ারদেগার মক্কা থেকে হিজরত করার অনুমতি প্রদান করেছেন জিবরাঈল (আঃ) তাঁকে হিজরতের সময় নির্ধারণ করে দিলেন এবং কুরাইশদের কিভাবে প্রতিহত করতে হবে তা বলে দিলেন। অতঃপর বললেন, আপনি এ যাবৎ যে শয্যায় শয়ন করে এসেছেন আজ রাত্রে সে শয্যায় শয়ন করবেন না।[1]
হিজরত সংক্রান্ত আল্লাহর বাণী প্রাপ্ত হওয়ার পর নাবী কারীম (ﷺ) ঠিক দুপুরে আবূ বাকর (রাঃ)-এর গৃহে তশরীফ আনয়ন করলেন। উদ্দেশ্য ছিল, হিজরতের সময় এবং পন্থা প্রক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, ‘আমরা আব্বাস (আবূ বাকর (রাঃ)-এর) বাড়ীতে ঠিক দুপুরে বসেছিলাম তখন এক ব্যক্তি এসে খবর দিল যে, নাবী কারীম (ﷺ) মাথা ঢেকে আগমন করছেন। এটা দিবা ভাগের এমন সময় ছিল যে সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সাধারণতঃ কোথাও যেতেন না। আবূ বাকর (রাঃ) বললেন ‘আমার মাতা-পিতা আপনার জন্য কোরবান হোক, আপনি এ সময় কোন্ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনার জন্য আগমন করেছেন?’
‘আয়িশাহ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ভিতরে আসার অনুমতি চাইলেন, তাঁকে ভিতরে আসার অনুমতি দেয়া হলে তিনি ভিতরে প্রবেশ করলেন। তারপর আবূ বাকর (রাঃ)-কে বললেন, ‘আপনার কাছে যে সকল লোক রয়েছে তাদের সরিয়ে দিন।’
আবূ বাকর বললেন, ‘যথেষ্ট, আপনার গৃহিনী ছাড়া এখানে আর কেউই নেই। আপনার প্রতি আমার মাতা-পিতা কুরবান হোক, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)।
তিনি বললেন, ‘ভাল, হিজরত করার জন্য আল্লাহ রাববুল আলামীনের তরফ থেকে আমাকে অনুমতি প্রদান করা হয়েছে।
আবূ বাকর বললেন, ‘সাথে... হে আল্লাহর (ﷺ)! আপনার প্রতি আমার পিতামাতা উৎসর্গ হোক।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘হ্যাঁ’’।
তারপর হিজরতের সময় সূচী নির্ধারণ করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আপন গৃহে প্রত্যাবর্তন করলেন এবং রাতের আগমনের জন্য প্রতীক্ষারত রইলেন। তিনি (ﷺ) এ দিন এমনভাবে প্রস্তুতি নিলেন যে, হিজরতের উদ্দেশ্যে তাঁর প্রস্তুতির কথা কেউ জানতে পারল না। নচেৎ জানতে পারলে অন্য যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে কুরাইশরা দ্বিধাবোধ করতো না।
এক দিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন হিজরতের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকলেন, অন্য দিকে মক্কার পাপিষ্ঠরা দারুন নাদওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকল। উদ্দেশ্য সাধনের জন্য নিম্ন তালিকাভুক্ত এগার জন পাপীষ্ঠকে নির্বাচন করা হল। তাদের নাম হচ্ছে যথাক্রমেঃ
(১) আবূ জাহল বিন হিশাম, (২) হাকাম বিন আবীল ‘আস, (৩) উক্ববা বিন আবূ মু’আইত্ব, (৪) নাযর বিন হারিস (৫) উমাইয়া বিন খাআফ, (৬) যাম’আহ বিন আসওয়াদ, (৭) তু’আইইমা বিন আদী, (৮) আবূ লাহাব, (৯) উবাই বিন খালাফ, (১০) নুবাইহ বিন হাজ্জাজ এবং তার ভাই (১১) মুনাব্বিহ বিন হাজ্জাজ।[1]
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্বভাবগত অভ্যাস ছিল তিনি এশার সালাত পর রাত্রের প্রথম প্রহরে ঘুমিয়ে যেতেন এবং অর্ধ রাত্রিতে জেগে মাসজিদুল হারামে চলে যেতেন। তিনি (ﷺ) সেখানে তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করতেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ‘আলী (রাঃ)-কে বললেন, ‘তুমি আমার এ সবুজ হাযরামী[2] চাদর গায়ে দিয়ে আমার বিছানায় ঘুমিয়ে থাক। তারা তোমার ক্ষতি করতে পারবে না।
অতঃপর রাতের এক তৃতীয়াংশ গত হলো, ধরনীতে নিস্তব্ধতা নেমে এল এবং অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে পড়ল- এমন সময় উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গ অতি গোপনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বাড়িতে হাজির হলো। তাঁকে বাধা দেওয়ার জন্য তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ঘরের দরজায় অবস্থান করলো। তাদের ধারণা ছিল, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঘুমিয়ে আছেন, তিনি যখনই বেন হবেন তারা তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের চক্রান্ত বাস্তবায়ন করবে।
তাদের এ ঘৃণ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়ণ ও কার্যকর করার ব্যাপারে তাদের অবস্থা এতই দৃঢ় ছিল যে, কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা কেলাহ ফতেহ করে দেবে। আবূ জাহল চরম অহংকার, উপহাস ও তাচ্ছিল্যের সঙ্গে নাবী (ﷺ)-এর গৃহ ঘেরাওকারী আপন সঙ্গীদের বলল, ‘মুহাম্মাদ (ﷺ) বলছে যে, যদি তোমরা তার ধর্মে প্রবেশ কর, তার অনুসরণ কর তাহলে অনারবদের উপর আরবদের শাসন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। মৃত্যুর পরে আবার যখন তোমাদের উঠানো হবে তখন উরদুনের বাগান সমূহের মতো বাগান দেয়া হবে। আর যদি তোমরা তা না কর তাহলে তার পক্ষ থেকে তোমাদের উপর হত্যাযজ্ঞ চালানো হবে। আর এ অবস্থায় মৃত্যুর পর আবার যখন তোমাদের উঠানো হবে তখন ঠিকানা হবে জাহান্নাম। সেখানে না কি অনন্ত কাল জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে।[3]
যাহোক, জঘন্যতম এ পাপাচার অনুষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত সময় ছিল রাত দুপুরের পরক্ষণ। এ জন্য তারা রাত জেগে সময় কাটাচ্ছিল এবং নির্ধারিত সময়ের জন্য প্রতীক্ষারত ছিল। কিন্তু আল্লাহর ব্যবস্থাই হচ্ছে চূড়ান্ত এবং তাঁর বিজয়ই হচ্ছে প্রকৃত বিজয়। তাঁরই একক এখতিয়ারে রয়েছে আসমান ও জমিনের একচ্ছত্র আধিপত্য। তিনি যা চান তাই করেন। তিনি যাঁকে বাঁচাতে চান কেউই তাঁর কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারে না। আবার তিনি যাকে পাকড়াও করতে চান পৃথিবীর কোন শক্তিই তাকে রক্ষা করতে পারে না। এ প্রসঙ্গে নিম্নের আয়াতে কারীমায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে সম্বোধন করে বলা হয়েছে,
(وَإِذْ يَمْكُرُ بِكَ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا لِيُثْبِتُوْكَ أَوْ يَقْتُلُوْكَ أَوْ يُخْرِجُوْكَ وَيَمْكُرُوْنَ وَيَمْكُرُ اللهُ وَاللهُ خَيْرُ الْمَاكِرِيْنَ) [الأنفال:30].
‘‘স্মরণ কর, সেই সময়ের কথা যখন কাফিরগণ তোমাকে বন্দী করার কিংবা হত্যা করার কিংবা দেশ থেকে বের করে দেয়ার জন্য ষড়যন্ত্র করে। তারা চক্রান্ত করে আর আল্লাহ্ও কৌশল করেন। আল্লাহ্ই সর্বশ্রেষ্ঠ কৌশলী।’ (আল-আনফাল ৮ : ৩০)
[2] হাযমারাউতের (দক্ষিণ ইয়েমেনের) তৈরি চাদরকে হাযরামী চাদর বলা হয়।
[3] প্রাগুক্ত ১ম খন্ড ৪৮৩ পৃঃ।
কুরাইশ মুশরিকগণ তাদের দুরভিসন্ধি বাস্তবায়নের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েও চরমভাবে ব্যর্থ হয়ে গেল। উন্মত্ত জিঘাংসু শত্রু পরিবেষ্টিত রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আলী (রাঃ)-কে বললেন, ‘তুমি আমার এ সবুজ হাযরামী[1] চাদর গায়ে দিয়ে আমার বিছানায় ঘুমিয়ে থাক। তারা তোমার ক্ষতি করতে পারবে না। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এ চাদর গায়ে দিয়েই শুয়ে থাকতেন।[2]
তারপর নাবী কারীম (ﷺ) গৃহের বাহিরে গমন করলেন এবং মুশরিকদের কাতার ফেড়ে এক মুষ্টি কংকরযুক্ত মাটি নিয়ে তাদের মাথার উপর ছড়িয়ে দিলেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাদের দৃষ্টি দরে রাখলেন যার ফলে তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে আর দেখতে পেল না। এ সময় তিনি এ আয়াত কারীমাটি পাঠ করছিলেন,
(وَجَعَلْنَا مِن بَيْنِ أَيْدِيْهِمْ سَدًّا وَمِنْ خَلْفِهِمْ سَدًّا فَأَغْشَيْنَاهُمْ فَهُمْ لاَ يُبْصِرُوْنَ) [يس:9]
‘‘তাদের সামনে আমি একটা (বাধার) প্রাচীর দাঁড় করিয়ে দিয়েছি, আর পেছনে একটা প্রাচীর, উপরন্তু তাদেরকে ঢেকে দিয়েছি; কাজেই তারা দেখতে পায় না।’ (ইয়া সীন ৩৬ : ৯)
এ সময় এমন কোন মুশরিক বাকি ছিল না যার মাথায় তিনি মাটি নিক্ষেপ করেননি। এরপর তিনি আবূ বাকর (রাঃ)-এর গৃহে গমন করলেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে সঙ্গে নিয়ে ইয়ামান অভিমুখে যাত্রা করলেন। তারপর রাতের অন্ধকার থাকতেই তাঁরা মক্কা থেকে কয়েক মাইল দূরত্বে ‘সাওর’ নামক পর্বত গুহায় গিয়ে পৌঁছলেন।[3]
এদিকে অবরোধকারীরা রাত ১২ টার অপেক্ষা করছিল। কিন্তু তার আগেই তাদের নিকট তাদের ব্যর্থতা ও অক্ষমতার সংবাদ পৌঁছে গেল। অবস্থা হল এই যে, তাদের নিকট এক আগন্তুক এসে তাদেরকে সাঃ-এর দরজায় দাঁড়িয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল ‘আপনারা কিসের জন্য অপেক্ষা করছেন? তারা বলল, ‘আমরা মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে খতম করার অপেক্ষায় রয়েছি।
সে বলল, ‘উদ্দেশ্য সাধনে তোমরা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছ। আল্লাহর কসম! কিছুক্ষণ পূর্বে মুহাম্মাদ (ﷺ) তোমাদের সম্মুখ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছেন। যাওয়ার পূর্বে তিনি তোমাদের মাথার উপর এক মুষ্টি মৃত্তিকা ছড়িয়ে দিয়ে গিয়েছেন।’
তারা বলল, ‘আল্লাহর কসম! আমরা তো তাকে দেখিনি। এ বলে তারা মাথা ঝাড়তে ঝাড়তে দাঁড়িয়ে পড়ল। এরপর দারুণ হতাশা ও ক্রোধের সঙ্গে তারা দরজার ফাঁক-ফোকর দিয়ে গৃহের মধ্যে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে থাকল। চাদর জড়ানো অবস্থায় শায়িত আলী (রাঃ) দৃষ্টি গোচর হলে তারা বলতে লাগল, ‘আল্লাহর কসম! এই তো মুহাম্মাদ (ﷺ) শুয়ে আছে।’ তিনি শুয়ে আছেন এ ভ্রান্ত বিশ্বাস নিয়েই তারা সেখানে সকালের জন্য অপেক্ষা করতে থাকল। এ দিকে যখন সকাল হল এবং আলী (রাঃ) বিছানা ছেড়ে উঠলেন তখন তারা বুঝতে পারল যে, সত্যি সত্যিই মুহাম্মাদ (ﷺ)-নেই। তারা অত্যন্ত ক্রদ্ধ এবং বিক্ষুব্ধ কণ্ঠে আলী (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করল, ‘মুহাম্মাদ (ﷺ) কোথায়’’? হযরত আলী (রাঃ) বললেন, ‘‘আমি জানিনা।’’
[2] ইবনে হিশাম ১ম খন্ড ৪৮২-৪৮৩ পৃঃ।
[3] ইবনে হিশাম ১ম খন্ড ৪৮৩ পৃঃ। যা’দুল মা’আদ ২য় খন্ড ৫২ পৃঃ।