এলিয়, এলিজা বা ইলিয়াস (Elijah or Elias) খ্রিষ্টপূর্ব নবম শতাব্দীর একজন ইসরাইলীয় নবী ছিলেন। বাইবেলের বর্ণনা অনুসারে একটা ঘুর্ণিঝড়ের মাধ্যমে আগুনের রথে করে তাঁকে আকাশে তুলে নেওয়া হয় (২ রাজাবলি ২/১১)। পুরাতন নিয়মের শেষে ‘মালাখি’-র পুস্তকে বলা হয়েছে যে, প্রভুর ভয়ঙ্কর দিবসের আগমনের পূর্বে নবী ইলিয়াস আবার দুনিয়াতে আসবেন (মালাখি ৪/৫-৬)। এ থেকে ইহুদিদের বিশ্বাস যে, মসীহ বা খ্রিষ্টের আগমনের পূর্বে এলিয়/ ইলিয়াস পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসবেন।[1]
যীশুর খ্রিষ্টত্ব প্রমাণের জন্য এলিয়ের আগমন জরুরি ছিল। আমরা দেখেছি যে, যোহন দ্যা বাপ্টিস্ট (John the Baptist)-কে বিভিন্ন বাংলা বাইবেলে যোহন বাপ্তাইজক, বাপ্তিস্মদাতা ইয়াহিয়া বা তরিকাবন্দীদাতা ইয়াহিয়া বলা হয়েছে। বাইবেলে কোথাও বলা হয়েছে যে, তিনিই ইলিয়াস এবং কোথাও তা অস্বীকার করা হয়েছে।
ইউহোন্না ১/১৯-২১, মো.-১৩: ‘‘আর ইয়াহিয়ার সাক্ষ্য এই- যখন ইহুদীরা কয়েক জন ইমাম ও লেবীয়কে দিয়ে জেরুশালেম থেকে তাঁর কাছে এই কথা জিজ্ঞাসা করে পাঠালো, ‘আপনি কে?’ তখন তিনি স্বীকার করলেন, অস্বীকার করলেন না; তিনি স্বীকার করে বললেন, আমি সেই মসীহ নই। তারা তাঁকে জিজ্ঞাসা করল, তবে আপনি কে? আপনি কি ইলিয়াস (Elijah: এলিয়)? তিনি বললেন, আমি নই।’’
এখানে যোহন স্পষ্টভাবে জানাচ্ছেন যে, তিনি ইলিয়াস নন। অপরদিকে মথি ১১/১৪ শ্লোকে যোহন বিষয়ে যীশু বলেছেন: ‘‘আর তোমরা যদি গ্রহণ করতে সম্মত হও, তবে জানবে, যে ইলিয়াসের আগমন হবে, তিনি এই ব্যক্তি।’’ (মো.-১৩)
এছাড়া মথি ১৭/১০-১৩ বলছে: ‘‘তখন শিষ্যেরা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তবে অধ্যাপকেরা কেন বলেন যে, প্রথমে এলিয়ের আগমন হওয়া আবশ্যক? তিনি উত্তর করিয়া কহিলেন, সত্য বটে, এলিয় আসিবেন, এবং সকলই পুনঃস্থাপন করিবেন; কিন্তু আমি তোমাদিগকে কহিতেছি, এলিয় আসিয়া গিয়াছেন, এবং লোকেরা তাঁহাকে চিনে নাই, বরং তাঁহার প্রতি যাহা ইচ্ছা, তাহাই করিয়াছে; তদ্রূপ মনুষ্যপুত্রকেও তাহাদের হইতে দুঃখভোগ করিতে হইবে। তখন শিষ্যেরা বুঝিলেন যে, তিনি তাঁহাদিগকে যোহন বাপ্তাইজকের (বাপ্তিস্মদাতা ইয়াহিয়ার) বিষয় বলিয়াছেন।’’
এ ভাবে আমরা দেখছি যে, ইয়াহিয়া বা যোহন নিজে নিজের বিষয়ে সাক্ষ্য দিলেন যে, তিনি এলিয় বা ইলিয়াস নন। কিন্তু যীশু সাক্ষ্য দিলেন যে, ইয়াহিয়া বা যোহনই এলিয়। খোলা চোখে দুজনের একজনের কথা মিথ্যা।
‘যীশু কি মিথ্যা বলেছিলেন?’ ‘Did Jesus Christ Lie?’ প্রবন্ধে গ্যারি ডেভানি (Gary DeVaney) এ প্রসঙ্গে লেখেছেন: “Jesus said: John the Baptist is Elijah Catholic / Elias KJV... John the Baptist said he was not Elijah / Elias. Who lied - John the Baptist or Jesus Christ? Do you acknowledge and confirm that according to these 2 Bible C&Vs, either Jesus Christ or John the Baptist lied?”
‘‘যীশু বললেন যোহন বাপ্তাইজক-ই ইলিয়াস/ এলিয়। ... যোহন বাপ্তাইজক বললেন তিনি ইলিয়াস/এলিয় নন। মিথ্যা বললেন কে? যোহন বাপ্তাইজক অথবা যীশু খ্রিষ্ট? আপনি কি স্বীকার ও নিশ্চিত করেন যে, বাইবেলের অধ্যায় ও শ্লোক নির্ধারিত এ দুটো বক্তব্য অনুসারে হয় যীশু খ্রিষ্ট অথবা যোহন বাপ্তাইজক মিথ্যা বলেছেন?’’[2]
[2] http://www.thegodmurders.com/id188.html
মার্কের ৬ষ্ঠ অধ্যায় থেকে জানা যায় যে, রাজা হেরোদ যোহনকে ধার্মিক ও পবিত্র লোক জেনে ভয় করতেন এবং তাঁকে রক্ষা করতেন। আর তাঁর কথা শুনে তিনি অতিশয় উদ্বিগ্ন হতেন এবং তাঁর কথা শুনতে ভাল বাসতেন। শুধুমাত্র তার স্ত্রী ‘‘হেরোদিয়ার নিমিত্ত আপনি লোক পাঠাইয়া যোহনকে ধরিয়া কারাগারে বদ্ধ করিয়াছিলেন’’ এবং পরে হেরোদিয়ার চাপে একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে হত্যা করেন। (মার্ক ৬/১৭-২৬)
পক্ষান্তরে লূকের ৩য় অধ্যায় থেকে জানা যায় যে, হোরোদ রাজা যোহনের প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি শুধু স্ত্রী হোরোদিয়ার জন্যই নয়, উপরন্তু নিজের দুষ্কর্মসমূহের কারণেও যোহনকে কারাগারে বদ্ধ করেন। (লূক ৩/১৯-২০)
মার্ক লেখেছেন, যোহন বাপ্তাইজক ‘পঙ্গপাল ও বনমধু ভোজন করিতেন।’ কিন্তু মথি লেখেছেন, তিনি ভোজন ও পান কিছুই করতেন না। (মার্ক ১/৬; মথি ১১/১৮)
প্রচলিত খ্রিষ্টধর্মের প্রতিষ্ঠাতা ও নতুন নিয়মের অধিকাংশ পুস্তকের রচয়িতা শৌল বা সাধু পল সম্পর্কে আমরা আগেও জেনেছি। তিনি যীশু খ্রিষ্টের সমসাময়িক ছিলেন, কিন্তু কখনো যীশুকে দেখেন নি। যীশুর তিরোধানের পর তাঁর শিষ্যরা যখন ফিলিস্তিন ও পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোয় বসবাসরত ইহুদিদের মধ্যে যীশুর ধর্ম প্রচার করছিলেন তখন হঠাৎ করেই মঞ্চে তাঁর আবির্ভাব। তিনি দাবি করেন যে, তিনি নবদীক্ষিত খ্রিষ্টানদের নির্যাতন করতেন এবং দামেশকের খ্রিষ্টানদের শাস্তি প্রদানের জন্য গমনের পথে তিনি যীশুর দর্শন লাভ করেন এবং পৌল বা পল নাম ধারণ করে ‘অ-ইহুদিদের’ মধ্যে খ্রিষ্টানধর্ম প্রচার শুরু করেন। সাধু পলের যীশুর দর্শন লাভের ঘটনাটা প্রেরিতদের কার্য-বিবরণ-এর ৯, ২২ ও ২৬ অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে। পাঠক ভাল করে পড়লে তিন স্থানের বর্ণনার মধ্যে ১০টা বৈপরীত্য দেখবেন। এখানে মাত্র তিনটা দিক উল্লেখ করছি।
প্রথম দিক: ৯ম অধ্যায়ের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, দামেশক যাওয়ার পথে শৌল যখন আকাশ থেকে আলোক দেখলেন ও যীশুর কথা শুনতে পেলেন, তখন শৌলের সহযাত্রীরা চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং যীশুর কথা শুনতে পাচ্ছিলেন: ‘‘আর তাঁর সহপথিকেরা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো, তারা ঐ বাণী শুনলো বটে, কিন্তু কাউকেও দেখতে পেল না।’’ (প্রেরিত ৯/৭, মো.-১৩)
কিন্তু ২২ অধ্যায় বলছে, তারা কোনো কথা শুনেননি, কিন্তু আলো দেখেন: ‘‘আর যারা আমার সঙ্গে ছিল, তারা সেই আলো দেখতে পেল বটে, কিন্তু যিনি আমার সঙ্গে কথা বলছিলেন তাঁর বাণী শুনতে পেল না।’’ (প্রেরিত ২২/৯, মো.-১৩)
‘তাহারা ঐ বাণী শুনলো’ এবং ‘বাণী শুনতে পেল না’ পরস্পর সাংঘর্ষিক।
দ্বিতীয় দিক: ৯ম অধ্যায়ে যীশু পলকে বলেন: ‘‘কিন্তু উঠ, নগরে প্রবেশ কর, তোমাকে কি করিতে হইবে, তাহা বলা যাইবে।’’ (প্রেরিত ৯/৬) ২২শ অধ্যায়ের বক্তব্য: ‘‘প্রভু আমাকে কহিলেন, উঠিয়া দামেশকে যাও, তোমাকে যাহা করিতে হইবে বলিয়া নিরূপিত আছে, সে সমস্ত সেখানেই তোমাকে বলা যাইবে।’’ (প্রেরিত ২২/১০)
২৬শ অধ্যায়ে বলা হয়েছে: ‘‘কিন্তু উঠ, তোমার পায়ে ভর দিয়া দাঁড়াও, তুমি যে যে বিষয়ে আমাকে দেখিয়াছ এবং যে যে বিষয়ে আমি তোমাকে দর্শন দিব, সেই সকল বিষয়ে যেন তোমাকে সেবক ও সাক্ষী নিযুক্ত করি, সেই অভিপ্রায়ে তোমাকে দর্শন দিলাম। আমি যাহাদের নিকটে তোমাকে প্রেরণ করিতেছি, সেই প্রজালোকদের ও পরজাতীয় লোকদের হইতে তোমাকে উদ্ধার করিব, যেন তুমি তাহাদের চক্ষু খুলিয়া দাও, যেন তাহারা অন্ধকার হইতে জ্যোতির প্রতি, এবং শয়তানের কর্তৃত্ব হইতে ঈশ্বরের প্রতি ফিরিয়া আইসে, যেন আমাতে বিশ্বাস করণ দ্বারা পাপের মোচন ও পবিত্রীকৃত লোকেদের মধ্যে অধিকার প্রাপ্ত হয়।’’ (প্রেরিত ২৬/১৬-১৮)
তাহলে প্রথম দু বক্তব্য অনুসারে পলকে ওয়াদা করা হয়েছিল যে, নগরে পৌঁছানোর পরে তাকে তার করণীয় বিষয় সম্পর্কে জানানো হবে। আর শেষ অধ্যায় থেকে জানা গেল যে, তাকে নগরে পৌঁছানোর পরে কিছু জানানোর ওয়াদা করা হয়নি; উপরন্তু এ স্থানেই তাকে তার করণীয় সম্পর্কে জানানো হয়েছিল।
তৃতীয় দিক: ৯ অধ্যায় অনুসারে শৌল যখন আকাশ থেকে আলোক দেখলেন ও যীশুর কথা শুনতে পেলেন, তখন শৌলের সহযাত্রীরা চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন: ‘‘আর তাঁর সহপথিকেরা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো’’। (প্রেরিত ৯/৭, মো.-১৩)
কিন্তু ২৬ অধ্যায় বলছে, তার সহযাত্রীরা ভূমিতে পড়ে ছিলেন: ‘‘তখন আমরা সকলে ভূমিতে পড়ে গেলে আমি একটি বাণী শুনলাম।’’ (প্রেরিত ২৬/১৪, মো.-১৩)
ধার্মিকের মুক্তিপণ হিসেবে অধার্মিক কষ্ট বা সাজা পাবে? না অধার্মিকের মুক্তিপণ হিসেবে ধার্মিক কষ্ট ভোগ করবেন? বাইবেলে পরস্পর বিরোধী কথা পাওয়া যায়। হিতোপদেশ বা মেসাল পুস্তক থেকে জানা যায় যে, পাপীরা হচ্ছে ধার্মিকদের ফিদিয়া, কাফ্ফারা বা মুক্তির মূল্যস্বরূপ: ‘‘দুষ্ট ধার্মিকদের মুক্তির মূল্যস্বরূপ, বিশ্বাসঘাতক সরলদের পরিবর্তন স্বরূপ (The wicked shall be a ransom for the righteous, and the transgressor for the upright)।’’ কি. মো.-০৬: ‘‘শেষে নির্দোষ লোকদের বদলে দুষ্টেরা আর সৎ লোকদের বদলে বেঈমানেরা কষ্ট পাবে।’’ (হিতোপদেশ/ মেসাল ২১/১৮)
এ থেকে জানা যায় যে, পাপীরাই ধার্মিকদের প্রায়শ্চিত্ত বা কাফ্ফারা। পাপীরা পাপের জন্য যে শাস্তিভোগ করবে তা-ই ধার্মিকদের পাপের কাফফারা বলে গণ্য হবে। কিন্তু ১ যোহন /১-২ ঠিক বিপরীত কথা লেখেছে, যে ধার্মিক যীশুই পাপীদের কাফ্ফারা:
ইংরেজি: “Jesus Christ the righteous..he is the propitiation (RSV expiation) for our sins: and not for ours only, but also for the sins of the whole world.”
আরবি: (يسوع البار وهو كفارة لخطايانا. ليس لخطايانا فقط بل لخطايا كل العالم أيضا)
অর্থাৎ: ‘‘ধার্মিক যীশু খৃস্ট...তিনি আমাদের পাপসমূহের কাফ্ফারা/প্রায়শ্চিত্ত।’’
কেরি: ‘‘তিনি ধার্মিক যীশু খৃস্ট। আর তিনিই আমাদের পাপার্থক প্রায়শ্চিত্ত, কেবল আমাদের নয়, কিনতু সমস্ত জগতেরও পাপার্থক।’’
জুবিলী: ‘‘সেই যীশুখ্রীষ্ট, ধর্মাত্মা যিনি...আমাদের পাপের জন্য প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ...’’
পবিত্র বাইবেল-২০০০ ও কিতাবুল মোকাদ্দস-২০০৬: ‘‘তিনিই ধার্মিক যীশু খ্রীষ্ট/ ঈসা মসীহ, যিনি নির্দোষ। আমাদের পাপ/গুনাহ দূর করবার জন্য খ্রীষ্ট/ মসীহ তাঁর নিজের জীবন কোরবানী করে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করেছেন।’’ কিতাবুল মোকাদ্দস-২০১৩: ‘‘তিনি ধার্মিক ঈসা মসীহ। আর তিনিই আমাদের গুনাহর কাফ্ফারা দিয়েছেন...।’’
সুপ্রিয় পাঠক, বিভিন্ন অনুবাদের উদ্ধৃতি প্রদান করলাম, যেন আপনি মূল অর্থটা অনুধাবন করতে পারেন। অনুবাদ বিভিন্ন রকম হলেও, মূলপাঠের একটাই অর্থ: ধার্মিকই পাপীর কাফফারা বা মুক্তির মূল্য। ধামির্ক, নিরপরাধ বা নির্দোষ যীশুকে শাস্তি বা কোরবানি প্রদানের মাধ্যমে সকল পাপীর সকল পাপের প্রায়শ্চিত হয়েছে।
গীতসংহিতা ১৯/৭ ‘‘সদাপ্রভুর ব্যবস্থা সিদ্ধ, প্রাণের স্বাস্থ্যজনক।’’ এ থেকে জানা যায় যে, ব্যবস্থা, শরীয়ত, তৌরাত (Law/ Commandment) বা পুরাতন নিয়মের সকল বিধান সঠিক ও ফলদায়ক। কিন্তু এর বিপরীতে ইব্রীয়/ইবরানী ৭/১৮ থেকে এবং ৮/৭ থেকে জানা যায় যে, দুর্বল দোষযুক্ত ও নিষ্ফল: ‘‘কারণ এক দিকে আগের নিয়ম দুর্বল ও নিষ্ফল ছিল বলে তার লোপ হচ্ছে’’ (ইবরানী ৭/১৮, মো.-১৩)। পুনশ্চ: ‘‘কারণ ঐ প্রথম নিয়ম যদি নিখুঁত হত, তবে দ্বিতীয় এক নিয়মের প্রয়োজন হত না।’’। (ইবরানী ৮/৭, মো.-১৩)
যীশু বলেন: ‘‘আমার মেষেরা আমার কণ্ঠস্বর শোনে, আর আমি তাদেরকে জানি.. আর আমি তাদেরকে অনন্ত জীবন দিই, তারা কখনোই বিনষ্ট হবে না এবং কেউই আমার হাত থেকে তাদেরকে কেড়ে নেবে না। আমার পিতা, যিনি তাদের আমাকে দিয়েছেন, তিনি সবচেয়ে মহান; এবং কেউই পিতার হাত থেকে কিছুই কেড়ে নিতে পারে না।’’ (ইউহোন্না/ যোহন ১০/২৭-২৯, মো.-১৩)
এ কথা প্রমাণ করে, যীশুর কণ্ঠস্বর একবার যে শুনেছেন বা যীশুর শিষ্যত্ব যে একবার গ্রহণ করেছেন সে কখনোই বিনষ্ট হবে না। কিন্তু এর কিছু দিন পরেই তিনি বলেন: ‘‘তাহাদের মধ্যে কেউ বিনষ্ট হয়নি, কেবল সেই বিনাশ-সন্তান বিনষ্ট হয়েছে, যেন পাক-কিতাবের কালাম পূর্ণ হয়।’’ (ইউহোন্না/ যোহন ১৭/১২, মো.-১৩)
এখানে সমালোচক বাইবেল বিশেষজ্ঞরা বলেন, কিছুদিন আগে ‘কখনোই বিনষ্ট হবে না’ এবং ‘কেউ কেড়ে নিতে পারবে না’ বললেন। কিন্তু তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী ব্যর্থ করে যখন একজন বিনষ্ট হয়ে গেল তখন আবার বললেন, পাক-কিতাবের কালাম পূর্ণ হতে একজন বিনষ্ট হল। কিন্তু পাক কিতাবের কালামটা কি আগে তাঁর জানা ছিল না? অথবা নিজের ভবিষ্যদ্বাণীর ত্রুটি গোপন করতে তিনি এ কথা বললেন? না সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন কথা ইঞ্জিল লেখকরা যাচাই ছাড়া সংকলন করেছেন?
এছাড়া ১ তীমথিয় ৪/১ প্রমাণ করে যে, কোনো কোনো বিশ্বাসী যীশুতে বিশ্বাসের পরেও বিভ্রান্ত হবেন: ‘‘পাক-রূহ স্পষ্টভাবেই বলেছেন, ভবিষ্যতে কতগুলো লোক ভ্রান্তিজনক রূহদের ও বদ-রূহদের শিক্ষামালায় মন দিয়ে ঈমান থেকে সরে পড়বে।’’ (মো.-১৩) এ কথাটা ‘কখনো বিনষ্ট হবে না’ এবং ‘কেউ কেড়ে নিতে পারবে না’ কথার সাথে সাংঘর্ষিক।
বাইবেলে বিভিন্ন স্থানে বলা হয়েছে যে, ঈশ্বর ‘মুখাপেক্ষা’ বা পক্ষপাতিত্ব করেন না। কিন্তু অন্যান্য স্থানে বলা হয়েছে যে, তিনি পক্ষপাতিত্ব করেন।
পক্ষপাতিত্ব না করার বিষয়ে বলা হয়েছে: ‘‘কেননা তোমাদের ঈশ্বর সদাপ্রভুই ঈশ্বরগণের ঈশ্বর ও প্রভুদের প্রভু, তিনিই মহান, বীর্যবান ও ভয়ঙ্কর (terrible) ঈশ্বর, তিনি কাহারও মুখাপেক্ষা (ব্যক্তিবিচার বা পক্ষপাতিত্ব: regardeth not persons) করেন না, ও উৎকোচ গ্রহণ করেন না।’’ কি. মো.-১৩: ‘‘কেননা তোমাদের আল্লাহ মাবুদই দেবতাদের আল্লাহ ও প্রভুদের প্রভু, তিনিই মহান, শক্তিশালী ও ভয়ঙ্কর আল্লাহ; তিনি কারো মুখাপেক্ষা ও ঘুষ গ্রহণ করেন না।’’ (দ্বিতীয় বিবরণ ১০/১৭)
অন্যত্র বলা হয়েছে: ‘‘ঈশ্বর মুখাপেক্ষা (পক্ষপাতিত্ব, ব্যক্তি বিচার: RSV: partiality, KJV: respecter of persons) করেন না’’ (প্রেরিত ১০/৩৪)।
আরো বলা হয়েছে: ‘‘ঈশ্বরের কাছে মুখাপেক্ষা নাই।’’ কি. মে.-১৩: ‘‘ কেননা আল্লাহ কারো প্রতি পক্ষপাতিত্ব করেন না।’’ (রোমীয় ২/১১)
এর বিপরীতে বিভিন্ন স্থানে দেখা যায় যে, ঈশ্বর ভয়ঙ্কর পক্ষপাতিত্ব করেন। কোনোরূপ বিশ্বাস, কর্ম বা কারণ ছাড়াই জন্মের আগে থেকেই কাউকে ভালবাসেন এবং কাউকে ঘৃণা করেন। যাকে ভালবাসেন তার প্রতারণাকে মেনে নিয়ে পুরস্কার দেন এবং যাকে ঘৃণা করেন তাকে কোনো দোষ ছাড়াই শাস্তি দেন। একটা নমুনা ইসহাকের বড় ছেলে এষৌ/ ইস্ (Esau) এবং যাকোব/ ইয়াকুব (Jacob)। কোনো কারণ ছাড়াই ঈশ্বর ছোট ছেলে যাকোবকে ভালবাসেন ও বড় ছেলে এষৌকে ঘৃণা করেন। জন্মের পূর্বেই ঈশ্বর ইসহাককে বলেন: ‘‘জ্যেষ্ঠ কনিষ্ঠের দাস (গোলাম) হইবে।’’ (আদিপুস্তক ২৫/২৩)। অন্যত্র বলা হয়েছে: ‘‘সদাপ্রভু কহেন, এষে (ইস) কি যাকোবের (ইয়াকুবের) ভ্রাতা নয়? তথাপি আমি যাকোবকে প্রেম করিয়াছি; কিন্তু এষৌকে অপ্রেম (ঘৃণা: I hated Esau) করিয়াছি, তাহার পর্বতগণকে ধ্বংসস্থান করিয়াছি, ও তাহার অধিকার প্রান্তরস্থ শৃগালদের বাসস্থান করিয়াছি।’’ (মালাখি ১/২-৩)
এভাবে কোনোরূপ ভাল বা মন্দ কর্ম করার আগেই ঈশ্বর যাকোবকে ভালবাসলেন ও এষৌকে ঘৃণা করলেন: ‘‘যখন সন্তানেরা ভূমিষ্ঠ হয় নাই, এবং ভাল মন্দ কিছুই করে নাই (For the children being not yet born, neither having done any good or evil), তখন- ঈশ্বরের নির্বাচনানুরূপ সঙ্কল্প যেন স্থির থাকে, কর্ম হেতু নয়, কিন্তু আহবানকারীর ইচ্ছা হেতু- তাঁহাকে বলা গিয়াছিল, ‘জ্যেষ্ঠ কনিষ্ঠের দাস হইবে’, যেমন লিখিত আছে, ‘আমি যাকোবকে প্রেম করিয়াছি, কিন্তু এষৌকে অপ্রেম (ঘৃণা: hated) করিয়াছি।’’ (রোমীয় ৯/১১-১৩)
পল বলেছেন যে, এরপ করা ঈশবরের জন্য অন্যায় নয়; কারণ তিনি যাকে ইচ্ছা করুণা করেন (রোমীয় ৯/১৪)। বস্ত্তত, ঈশ্বর যাকে ইচ্ছা তার বিশ্বাস বা কর্মের অতিরিক্ত পুরস্কার দিলে বা করুণা করলে তা পক্ষপাতিত্ব নয়। তবে কাউকে কোনো অন্যায় ছাড়া ঘৃণা করলে তা সন্দেহাতীতভাবেই পক্ষপাতিত্ব। বাইবেলের বর্ণনায় এ পক্ষপাতিত্ব ঘোরতর। এ বইয়ের ষষ্ঠ অধ্যায় থেকে পাঠক জানবেন যে, ভালমন্দ কর্মের বিচারে এষৌ সৎ ও যাকোব প্রতারক। কিন্তু প্রতারককে শাস্তি দেওয়া তো দূরের কথা, ঈশ্বর ঘোষণা দিলেন, কোনো অপরাধ ছাড়াই তিনি এষৌকে ঘৃণা করলেন এবং তাকে ও তার বংশধরদেরকে ভয়ঙ্কর শাস্তি দিলেন। পক্ষান্তরে প্রতারক ও অপরাধী যাকোবকে প্রেম করলেন। এর চেয়ে বড় পক্ষপাতিত্ব আর কী হতে পারে?
এরূপ একটা পক্ষপাতিত্ব কাউকে দয়া করা এবং কাউকে অন্যের অপরাধে শাস্তি দেওয়া: ‘‘তুমি সহস্র (পুরুষ) পর্যন্ত দয়াকারী; আর পিতৃপুরুষদের অপরাধের প্রতিফল তাহাদের পশ্চাদ্বর্তী সন্তানদের ক্রোড়ে দিয়া থাক।’’ (যিরমিয় ৩২/১৮)
এ বিষয়েও বাইবেলে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য বিদ্যমান। ১ তীমথিয় ২/৩-৪ মো.-১৩: ‘‘আমাদের নাজাতদাতা আল্লাহর সম্মুখে তা উত্তম ও গ্রহণযোগ্য; তাঁর ইচ্ছা এই, যেন সমস্ত মানুষ নাজাত পায় ও সত্যের তত্ত্বজ্ঞান পর্যন্ত পৌঁছিতে পারে।’’
এর বিপরীতে ২ থিষলনীকীয় ২/১১-১২: ‘‘আর সেই জন্য ঈশ্বর তাহাদের কাছে ভ্রান্তির কার্যসাধন পাঠান, যাহাতে তাহারা সেই মিথ্যায় বিশ্বাস করিবে; যেন সেই সকলের বিচার হয়, যাহারা সত্যে বিশ্বাস করিত না, কিন্তু অধার্মিকতায় প্রীত হইত।’’
প্রথম বক্তব্য থেকে জানা যায় যে, ঈশ্বর ইচ্ছা করেন যে, সকল মানুষই পরিত্রাণ লাভ করুক এবং সত্যের তত্ত্বজ্ঞানে পৌঁছাক। আর দ্বিতীয় বক্তব্য থেকে জানা যায় যে, ঈশ্বরের ইচ্ছা যে, মানুষ বিভ্রান্ত হোক যেন তিনি অবিশ্বাস ও বিভ্রান্তির কারণে তিনি তাদের শাস্তি দিতে পারেন। আর এজন্য তিনি মানুষদের কাছে ‘ভ্রান্তির কার্যসাধন’ বা ‘ভ্রান্তির শক্তি’ প্রেরণ করেন। উভয় বক্তব্যের মধ্যে বৈপরীত্য সুস্পষ্ট।
নতুন নিয়মের বিভিন্ন স্থানে বলা হয়েছে যে, যীশুই মৃতদের মধ্য থেকে প্রথম পুনরুত্থিত। প্রেরিত ২৬/২৩: ‘‘KJV: That Christ should suffer, and that he should be the first that should rise from the dead. RSV: by being the first to rise from the dead’’: ‘‘খৃস্টকে দুঃখভোগ করতে হবে এবং তিনিই প্রথম মৃতগণের মধ্য হইতে পুনরুত্থিত হবেন/ হয়ে...।’’
কেরির অনুবাদ: ‘‘আর তাহা এই, খ্রিষ্টকে দুঃখভোগ করিতে হইবে, আর তিনিই প্রথম, মৃতগণের পুনরুত্থান দ্বারা’’। জুবিলী বাইবেল: ‘‘খৃস্টকে যন্ত্রণাভোগ করতে হবে, এবং মৃতদের মধ্য থেকে পুনরুত্থিতদের প্রথম হওয়ায় তাঁকে আমাদের জাতির কাছে ও বিজাতীয়দের কাছে আলো প্রচার করতে হবে।’’ কিতাবুল মোকাদ্দস-২০০৬: ‘‘মসীহকে কষ্টভোগ করতে হবে এবং তাঁকেই মৃত্যু থেকে প্রথমে জীবিত হয়ে উঠে...।’’
১ করিন্থীয় ১৫/২০: ‘‘KJV/RSV: But now is Christ risen from the dead, and become the first fruits of them that slept’’: ‘‘কিন্তু এখন খ্রিষ্ট মৃতদের মধ্য থেকে উত্থিত হয়েছেন, এবং যারা ঘুমিয়ে পড়েছিল (মৃত্যুবরণ করেছিল) তাদের মধ্যে তিনিই প্রথম ফসল হয়েছেন। ERV: Easy-to-Read Version: the first one of all those who will be raised: ‘‘মৃতদের মধ্যে থেকে যারা জীবিত হবেন সকলের মধ্যে তিনিই প্রথম।’’ কেরি: ‘‘তিনি নিদ্রাগতদের অগ্রিমাংশ’’। জুবিলী: ‘‘আসলে খ্রিষ্ট মৃতদের মধ্য থেকে পুনরুত্থান করেছেন- নিদ্রাগতদের প্রথম ফসল রূপে’’। কি. মো.-২০০৬: ‘‘তিনিই প্রথম ফল, অর্থাৎ মৃত্যু থেকে যাদের জীবিত করা হবে তাদের মধ্যে তিনিই প্রথমে জীবিত হয়েছেন।’’
কলসীয় ১/১৮: KJV/RSV: who is the beginning, the firstborn from the dead: কেরি: ‘‘তিনি আদি, মৃতগণের মধ্য হইতে প্রথমজাত’’। কিতাবুল মোকাদ্দস-২০০৬: ‘‘তিনিই প্রথম আর তিনিই মৃত্যু থেকে প্রথম জীবিত হয়েছিলেন।’’
এ সকল বক্তব্য নিশ্চিত করে যে, যীশুর পূর্বে কোনো মৃত জীবিত হননি; বরং তিনিই প্রথম মৃত্যু থেকে পুনরুত্থিত।
কিন্তু এর বিপরীতে ইঞ্জিলগুলো থেকে জানা যায় যে, যীশুর পূর্বেই তিনজন মানুষ মৃতদের মধ্য থেকে পুনরুত্থিত হন: (১) অধ্যক্ষ বা নেতার কন্যা, যার কথা শুধু প্রথম তিন ইঞ্জিল (মথি, মার্ক ও লূক) উল্লেখ করেছে (মথি ৯/২৫; মার্ক ৫/৪২; লূক ৮/৫৫), (২) নায়িন নামক নগরের এক বিধবা মাতার একমাত্র সন্তান শুধু লূক তার কথা উল্লেখ করেছেন (লূক ৭/১১-১৬) এবং (৩) লাসার নামক ব্যক্তি, যাকে জীবিত করার ঘটনা শুধুমাত্র যোহন উল্লেখ করেছেন (যোহন ১১/১-৪৪)।
পুরাতন নিয়ম থেকে আরো হাজার হাজার মানুষের কথা জানা যায় যারা মৃতদের মধ্য থেকে পুনরুত্থিত হয়েছিলেন। যিহিষ্কেল/ ইহিস্কেল নবী হাজার হাজার মৃত মানুষকে জীবিত করেন (যিহিষ্কেল ৩৭/১-১৪)। এলিয়/ ইলিয়াস (Elijah) একটি মৃত শিশুকে পুনর্জীবিত করেন (১ রাজাবলি ১৭/১৭-২৪)। ইলীশায়/ আল-ইয়াসা (Elisha) একজন মৃত বালককে পুনর্জীবিত করেন (২ রাজাবলি ৪/৮-৩৭)।
দুটো বিষয়ের মধ্যে বৈপরীত্য সুস্পষ্ট। ইঞ্জিলগুলোর ও পুরাতন নিয়মের বর্ণনাগুলো সত্য বলে গ্রহণ করলে মৃতদের মধ্যে যীশুর প্রথম পুনরুত্থিত হওয়ার কথা মিথ্যা হতে বাধ্য। দুটো পরস্পর বিরোধী কথাকে সত্য বলে গ্রহণ করার উপায় নেই। একটাকে মিথ্যা বা ভুল বলতেই হবে, সরাসরি অথবা ব্যাখ্যার মাধ্যমে।
খ্রিষ্টান প্রচারকরা দাবি করবেন যে, যীশুই প্রথম পুনরুত্থিত- কথাটা মিথ্যা নয়। তবে কথাটার একটা প্রকৃত অর্থ আছে। সে প্রকৃত অর্থটা এ বাক্য থেকে বুঝা যায় না। এ বাক্যের সাথে দু-একটা শব্দ যোগ করলে সে অর্থ বুঝা যায়। যেমন যীশুই মৃতদের মধ্যে থেকে ‘অনন্ত জীবনের জন্য’ প্রথম পুনরুত্থিত। পাক-রূহ বা পবিত্র আত্মা এ শব্দগুলো বলেননি। পবিত্র আত্মার ‘না বলা’ বা ‘বলতে ভুলে যাওয়া’ এ শব্দগুলো যোগ করলেই এর প্রকৃত অর্থ পাওয়া যায়। এরূপ সকল ব্যাখ্যার একটাই অর্থ: বাইবেলে যা লেখা আছে তা মিথ্যা, তবে তার সাথে সংযোজন বা বিয়োজন করে যে ব্যাখ্যা প্রচারকরা পেশ করছেন তা সত্য।