বিদআত দর্পণ আবদুল হামীদ ফাইযী ৪৭ টি
বিদআত দর্পণ আবদুল হামীদ ফাইযী ৪৭ টি

ইসলাম চিরন্তন ও কালজয়ী দ্বীন। এই পূর্ণাঙ্গ দ্বীনের আসল রূপ অবিকৃত ও অক্ষত রাখতে হলে তার প্রতি ভেজালের সকল অনুপ্রবেশ দ্বার বন্ধ করতে হবে। যেহেতু দ্বীন পরিপূর্ণ এক গ্লাস দুগ্ধের ন্যায়, যাতে এক বিন্দুও অন্য কিছু রাখার, সংযোজন ও পরিবর্ধন করার কোন অবকাশ নেই। ওঁর-এঁর’ কথা ও অভিমতের পানি বা গোমূত্রকে তাতে স্থান দিতে গেলে অবশ্যই বিশুদ্ধ ও নির্ভেজাল কিছু দুধ গ্লাস হতে উপচে পড়ে যাবে এবং ধীরে ধীরে ঐ দুগ্ধ পানের অযোগ্য হয়ে পড়বে। তাই দ্বীনে যাতে ভেজাল প্রবেশ না করে তার জন্য আল্লাহর রসূল #উম্মতকে অতি গুরুত্বের সহিত তাকীদ করে গেছেন। তাঁর সাহাবা, তাবেয়ীন এবং সলফগণও ঐ ভেজাল মিশ্রণ থেকে মুসলিমদেরকে উচিত সতর্ক করে গেছেন। তাঁদের পর সেই ফরযই উলামাগণের উপর বর্তায়। ভেজালের প্রত্যেক ছিদ্র পথ বন্ধ করা, অনুপ্রবিষ্ট ভেজাল চিহ্নিত করে তা উৎখাত করা এবং ঐ নির্ভেজাল দুগ্ধকে কালো বাজারে ক্রয়-বিক্রয় করা হতে চোরা ব্যবসায়ীদেরকে প্রতিহত করা তাঁদের এবং সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের মহান কর্তব্য।

এই কর্তব্য ভার অনুভব করে, সমাজের মানুষকে সাবধান করার লক্ষ্যে অধমের সাধ্যমত এই কিঞ্চিৎ প্রয়াস। এর দ্বারা সমাজে কিছু পরিমাণও জাগরণ এলে এবং সঠিক পথ স্পষ্ট হলে শ্রম সার্থক হবে। এতে যা কিছু প্রমাণ করতে চেয়েছি তা সঠিক হলে মহান আল্লাহর তরফ হতে এবং ভুল হলে আমার ও শয়তানের তরফ হতে। প্রমাণসহ ত্রুটি চিহ্নিত করে জ্ঞানীরা আমার সঠিক দিগদর্শন করলে কৃতজ্ঞ হব।

এই পুস্তিকাটি প্রস্তুত করতে বহু মূল্যবান গ্রন্থের সাহায্য নিতে হয়েছে। তন্মধ্যে আল-ইতিসাম (শাত্বেবী), সহীহুল জামিউস সাগীর (মুহাদ্দেস আলবানী রঃ), আল-ইবদা’ ফী মাযা-রিল ইবতিদা’ (আলী মাহফু), আল-বিদআতু যাওয়াবিতুহা অআষারুহাস সাইয়্যে ফিল উম্মাহ (ডাঃ আলী মুহাম্মাদ নাসের আল-ফাকীহী) এবং এবং তানবীহু উলিল আবসার ইলা কামালিদ্দীন অমা ফিল বিদআতি মিনাল আখত্বার (ডঃ সালেহ সা’দ আল-সুহাইমী) বিষেশভাবে উল্লেখযোগ্য। মহান আল্লাহ তাদের সকলকে এবং আমাদেরকে নেক প্রতিদান দিন। আমীন।

সারা বিশ্বে কুরআন ও সুন্নাহর নির্ভেজাল প্রচারে সউদিয়ার যুবসমাজের নিঃস্বার্থ আগ্রহ ও প্রচেষ্টার সীমা নেই। এর পশ্চাতে তাঁরা কেবল মহান আল্লাহর নিকট বৃহৎ প্রতিদানই চান।

এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নগণ্যের পুস্তিকাটিকে মাজমাআর দাওআত অফিস কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করে সমাজকে উপহার দিতে আনন্দবোধ করেছেন। তাই তাঁদের জন্য আমাদের আন্তরিক নেক দুআ। মহান আল্লাহ তাঁদেরকে উত্তম প্রতিদান দিন ও অধিক ভাল কাজে আরো আরো তওফীক দিন এবং মুসলিম সমাজকে বিদআত ও শির্কের সর্বনাশ থেকে বাঁচিয়ে কিতাব ও সুন্নাহর অনাবিল আবে হায়াত’-এ পরিপুত করুন। আমীন।

বিনীত আব্দুল হামীদ মাদানী

আল-মাজমাআহ ২২/৯/ ১৪১৫ হিঃ

بسم الله الرحمن الرحيم

الحمد لله الذي بنعمته تتم الصالحات، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين، وبعد

জানা আবশ্যক যে, দ্বীনে অনুপ্রবিষ্ট অভিনব কর্ম (বিদআত)সমূহ সম্পর্কে অবহিত হওয়া এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেহেতু ঐ বিদআত থেকে মুক্ত না হয়ে মুসলিমের জন্য মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ সম্ভব হয় না। এই মুক্তিলাভও ততক্ষণ সম্ভবপর নয় যতক্ষণ পর্যন্ত প্রত্যেকটি বিদআত সম্বন্ধে পরিচিতি লাভ না হয়েছে, যদি তার নিয়মাবলী ও মৌলিক সুত্র না জানা থাকে তাহলে। নচেৎ অজান্তে বিদআতে আপতিত হওয়াই স্বাভাবিক। অতত্রব বিদআত সম্পর্কে জ্ঞান রাখা ওয়াজের। কারণ যে জিনিষ ছাড়া কোন ওয়াজেব কোন ওয়াজেব পালন হয় না সে। জিনিষও ওয়াজেব, যেমন ওসুলের উলামাগণ বলেন।

তদনুরূপই শির্ক ও তার বিভিন্ন প্রকারাদিকে জানা। কারণ যে শির্ক না চিনবে সে তাতে নিপতিত হবে। যেমন বহু সংখ্যক মুসলিমদের বর্তমান অবস্থা। দেখা যায় তারা শির্ক দ্বারা মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করতে চায়। যেমন আউলিয়া ও সালেহীনদের নামে ন্যর মানা, শফথ করা, তাঁদের তওয়াফ করা, তার উপর মসজিদ নির্মাণ করা এবং সেখানে সিজদা করা প্রভৃতি কর্ম যার শির্ক হওয়ার কথা আহলে ইলমের নিকট অবিদিত নয়। এই জন্যই ইবাদত করায় কেবল সুন্নাহ জানার উপর সংক্ষেপ করা যথেষ্ট নয় বরং সাথে তার পরিপন্থী বিদআতকে চেনাও জরুরী। যেমন ঈমানের জন্য কেবল তওহীদ জানাই যথেষ্ট নয় বরং তার সাথে তার পরিপন্থী শিককে চেনাও একান্ত দরকার। এই তথ্যের প্রতিই কুরআন মাজীদে ইঙ্গিত করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ

অর্থাৎ, অবশ্যই আমি প্রত্যেক জাতীর মধ্যে রসূল প্রেরণ করেছি (এই নির্দেশ দিয়ে) যে, তোমরা আমারই এবাদত কর এবং তাগুত (পূজ্যমান গায়রুল্লাহ) থেকে দুরে থাক। (সূরা নাহল ৩৬ আয়াত)

তিনি আরো বলেনঃ

وَالَّذِينَ اجْتَنَبُوا الطَّاغُوتَ أَن يَعْبُدُوهَا وَأَنَابُوا إِلَى اللَّهِ لَهُمُ الْبُشْرَىٰ

অর্থাৎ, যারা তাগুতের ইবাদত করা হতে দূরে থাকে এবং আল্লাহর অনুরাগী হয় তাদের জন্য আছে সুসংবাদ। (সুরা যুমার ১৭ আয়াত)

তিনি আরো বলেন,

فَمَن يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِن بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَىٰ لَا انفِصَامَ لَهَا

অর্থাৎ, সুতরাং যে তাগুতকে অস্বীকার করবে ও আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে, নিশ্চয় সে এমন শক্ত হাতল ধারণ করবে যা কখনো ভাঙ্গার নয়।” (সূরা বাকারাহ ২৫৬)

আর এ তথ্যই আল্লাহর রসূল (সা.) স্পষ্ট করে তুলে ধরে বলেন, “যে ব্যক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ব্যতীত কেউ সত্য উপাস্য নেই) বলল (স্বীকার করল) এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য পুজিত বাতিল মাবুদসমূহকে অস্বীকার করল, তার মাল ও জান হারাম হয়ে গেল। (অর্থাৎ, সে মুসলিম বলে গণ্য হয়ে গেল)। আর তার (বাকী) হিসাব আল্লাহর উপর।” (মুসলিম)।

সুতরাং তিনি কেবল আল্লাহর তওহীদ স্বীকার করাকেই যথেষ্ট মনে করেননি বরং তার সহিত আল্লাহ ছাড়া অন্য সব পূজ্যমান ব্যক্তি-বস্তুকে অস্বীকার ও বর্জন করাকে একই সুত্রে শামিল করেছেন। অতএব এ তথ্য ও এই নির্দেশ) স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করে যে, ঈমান আনার সাথে সাথে কুফরীকে চেনা জরুরী, নতুবা অজান্তে কখন মুমিন। কুফরীতে আপতিত হয়ে যাবে সে তার কোন টেরই পাবে না।

অনুরূপভাবে সুন্নাহ ও বিদআতের ক্ষেত্রেও একই নির্দেশ; উভয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। কারণ, ইসলাম দুই বৃহৎ বুনিয়াদের উপর প্রতিষ্ঠিত; প্রথমতঃ আমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করব না এবং দ্বিতীয়তঃ আল্লাহ যা বিধিবদ্ধ করেছেন সে শরীয়ত ছাড়া আর ভিন্ন কোন নিয়ম-পদ্ধতিতে বা নির্দেশে তাঁর ইবাদত করব না। অতএব যে ব্যক্তি এই দুই বুনিয়াদের মধ্যে কোন একটিকে উপেক্ষা করে সে অপরটিকেও বর্জন করে এবং সে আল্লাহ তাআলার ইবাদত করে না। যেহেতু প্রথম ভিত্তি ত্যাগ করলে মুশরিক এবং দ্বিতীয়টি ত্যাগ করলে বিদআতী হয়ে যাবে।

অতএব পুর্বোক্ত আলোচনার মাধ্যমে এ কথাই প্রমাণিত হল যে, বিদআত চেনা অবশ্যই জরুরী। যাতে মুমিনের ইবাদত তা থেকে মুক্ত ও নির্মল হয়ে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হয়।

পক্ষান্তরে বিদআত সেই অনিষ্টকর বস্তুসমূহের অন্যতম যাকে চেনা ওয়াজেব, তা ত্যাগ করার জন্য নয়, বরং তা থেকে বাঁচার জন্য। যেমন আরবী কবি বলেনঃ

‘মন্দ জেনেছি বাঁচার লাগি নহে মন্দের তরে,

ভালো কি মন্দ চিনে না যে সে মন্দেতে গিয়ে পড়ে।

অবশ্য এর মর্মার্থ হাদীস শরীফ হতে গৃহীত। সাহাবী হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান, বলেন, “লোকেরা রসুল (সা.)-কে ইষ্টকর ও মঙ্গল বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করত আর আমি কবলিত হবার আশংকায় তাঁকে অনিষ্টকর ও অমঙ্গল বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতাম।” (বুখারী ও মুসলিম)।

আর এজন্যই যে সমস্ত বিদআত দ্বীনে অনুপ্রবেশ করেছে তার উপর মুসলিম জাতিকে সতর্ক ও অবহিত করা নিতান্ত জরুরী এবং বিষয়টি এত গুরুত্বহীন নয় যে, কেবল তাদেরকে তাওহীদ ও সুন্নাহ সম্পর্কিত জ্ঞান ও নির্দেশ প্রদান করাই যথেষ্ট এবং শির্ক ও বিদআত প্রসঙ্গে কোন কথা উত্থাপনের প্রয়োজন নেই; বরং এ বিষয়ে চুপ থাকাই ভালো! যেমন, অনেকে এ ধরনের ধ্যান-ধারণা রেখে থাকে। অথচ এটা এক সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির ফল।

যা শির্কের পরিপন্থী তওহীদ এবং বিদআতের পরিপন্থী সুন্নাহর প্রকৃত জ্ঞান স্বল্পতার কারণে সৃষ্টি হয়ে থাকে। আর একই সময়ে এই দৃষ্টিভঙ্গি ঐ ধরনের মানুষদের অজ্ঞতার ইঙ্গিত বহন করে। কারণ, তারা জানে। না যে বিদআতে যে কেউ আপতিত হতে পারে, এমনকি আলেম মানুষও। কেননা, বিদআত করা বা তাতে আপতিত হওয়ার বহু কারণ আছে। যার মধ্যে যয়ীফ ও মওযু (জাল) হাদীসের উপর ভিত্তি করে আমল করাও অন্যতম।

যেহেতু কখনো কিছু উলামার নিকটেও তার কিছু অপ্রকাশ থেকে যেতে পারে। যাকে তাঁরা সহীহ হাদীস মনে করে তার উপর আমল করে থাকেন এবং আল্লাহর সান্নিধ্য ও সন্তুষ্টি লাভের আশা করেন। অতঃপর তাঁদের ছাত্ররা ঐ বিষয়ে তাঁদের অনুকরণ করে এবং ধীরে ধীরে জনসাধারণও তাঁদের দেখে নিঃসন্দেহে আমল করতে লাগে। ফলে কিছু দিনের মধ্যেই তা পালনীয় সুন্নাহর আকার ধারণ করে। (আল-আজৰিবাতুন নাফেজাহ ফিল জুমআহ, আলবানী ৬১-৬৩ পৃঃ)।

তাই তো পরে কোন আলেম সে বিষয়ে অবহিত হয়ে তা রদ করতে গেলে বা তার পরিবর্তে সহীহ সুন্নাহর প্রতি পথ-নির্দেশ করতে গেলে ওদের অনেকে বলে থাকে, নতুন হাদীস! ওঁরা কি জানেন না বা জানতেন না? ইত্যাদি।

মহান আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় কর এবং তোমরা আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) না হয়ে মরো না। (সূরা আলে ইমরান ১০২ আয়াত)

“হে মানব! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন ও তা থেকে তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যিনি তাদের দুজন থেকে বহু নর-নারী বিস্তার করেছেন এবং আল্লাহকে ভয় কর যার নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচঞ্চা কর এবং অজ্ঞাতি-বন্ধন ছিন্ন করাকে ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর তীক্ষ দৃষ্টি রাখেন। (সুরা নিসা ১ আয়াত)।

হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল; তাহলে তিনি তোমাদের কর্মসমূহকে ত্রুটিমুক্ত করবেন এবং তোমাদের পাপ মার্জনা করবেন। যারা আল্লাহ ও তদীয় রসুলের আনুগত্য করে তারা অবশ্যই মহা সাফল্য অর্জন করবে।” (সুরা আহযাব ৭০-৭১ আয়াত)। আল্লাহ জাল্লা শানুহু তাঁর বান্দাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে আদেশ করেছেন এবং অনৈক্য ও আপোস-বিরোধিতা করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন,

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ۚ وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُم بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنتُمْ عَلَىٰ شَفَا حُفْرَةٍ مِّنَ النَّارِ فَأَنقَذَكُم مِّنْهَا ۗ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ

অর্থাৎ, তোমরা সকলে আল্লাহর রশি (দ্বীন ও কুরআন)কে শক্ত করে ধর এবং পরস্পর বিছিন্ন হয়ো না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ কর, তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতির সঞ্চার করেন। ফলে তোমরা তাঁর অনুগ্রহে পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে গেলে। তোমরা অগ্নিকুন্ডের (জাহান্নামের) প্রান্তে ছিলে, অতঃপর তিনি তা থেকে তোমাদেরকে উদ্ধার করেছেন। এরূপে আল্লাহ তোমাদের জন্য নিদর্শন স্পষ্টভাবে বিবৃত করেন, যাতে তোমরা সৎপথ পেতে পার। (সূরা আলে ইমরান ১০৩ আয়াত)

এই ঐক্য রক্ষার জন্য, আল্লাহর রজুকে সুদৃঢ়ভাবে ধারণ করার জন্য এবং বিছিন্নতা থেকে রেহাই পাবার জন্য তিনি বান্দাদেরকে রসুলের উপর নাযেলকৃত অনুশাসনের অনুসরণ করতে আদেশ করেছেন। তিনি বলেন,

كِتَابٌ أُنزِلَ إِلَيْكَ فَلَا يَكُن فِي صَدْرِكَ حَرَجٌ مِّنْهُ لِتُنذِرَ بِهِ وَذِكْرَىٰ لِلْمُؤْمِنِينَ * اتَّبِعُوا مَا أُنزِلَ إِلَيْكُم مِّن رَّبِّكُمْ وَلَا تَتَّبِعُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاءَ ۗ قَلِيلًا مَّا تَذَكَّرُونَ

অর্থাৎ, এই কিতাব তোমার প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে। অতএব তোমার মনে যেন এর সম্পর্কে কোন দ্বিধা না থাকে। যাতে এর দ্বারা তুমি (মানুষকে) সতর্ক কর এবং এটা মুমিনদের জন্য উপদেশ। তোমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে তোমাদের প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তোমরা তার অনুসরণ কর এবং তাঁকে ছেড়ে অন্যান্য অভিভাবকদের অনুসরণ করো না। তোমরা খুব অল্পই উপদেশ গ্রহণ করে থাক। (সুরা আরাফ ২-৩ আয়াত)

যেমন, তিনি বাপ-দাদা (অনুরূপ বুযুর্গ, আউলিয়া ও বিদআতীদের) সে সব বিষয়ে অনুসরণ করতে নিষেধ করেন যে বিষয় কিতাব ও সুন্নাহর অনুশাসনের বিপরীত। তিনি বলেন,

وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنزَلَ اللَّهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا ۗ أَوَلَوْ كَانَ آبَاؤُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ شَيْئًا وَلَا يَهْتَدُونَ

অর্থাৎ, আর যখন তাদেরকে বলা হয় যে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার তোমরা অনুসরণ কর; তখন তারা বলে, (না-না) বরং আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদের যাতে (যে মতামত ও ধর্মাদর্শে) পেয়েছি তারই অনুসরণ করব।” যদিও তাদের পিতৃপুরুষগণ কিছুই বুঝত না এবং তারা সৎপথেও ছিল না। (সুরা বাক্বারাহ ১৭০ আয়াত)

তিনি আরো বলেন,

وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنزَلَ اللَّهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا وَجَدْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا ۚ أَوَلَوْ كَانَ الشَّيْطَانُ يَدْعُوهُمْ إِلَىٰ عَذَابِ السَّعِيرِ

অর্থাৎ, আর যখন বলা হয় যে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তোমরা সে বস্তুর অনুসরণ কর; তখন তারা বলে আমাদের বাপ-দাদাদেরকে যাতে পেয়েছি আমরা

তো তাই মেনে চলব; যদিও শয়তান তাদেরকে দোযখ যন্ত্রণার দিকে আহবান করে (তথাপি কি তারা বাপ-দাদারই অনুসরণ করবে)? (সুরা লুকমান ২১ আয়াত)

সুতরাং কিতাব ও সুন্নাহর মতামত ছাড়া অন্য কোন মতবাদের দিকে আহবানকারী প্রবৃত্তি, দোযখের দিকে আহবানকারী মানুষ শয়তানের অনুসরণ করতে মুসলিমকে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন কিতাব ও সুন্নাহরই অনুসরণ করতে, কেবল ঐ দুটিকেই জীবন-সংবিধানরূপে গ্রহণ ও ধারণ করতে সে আদিষ্ট হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, মানুষের পরিত্রাণ ও সফলতা কেবল ঐ দুয়ের অনুসরণেই আছে। আল্লাহর রসূল ঐ বলেন, “তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস ছেড়ে যাচ্ছি, তা যদি তোমরা শক্তভাবে ধারণ কর, তবে কোন দিন পথভ্রষ্ট হবে না; আল্লাহর কিতাব ও আমার সুন্নাহ।” (মুআত্তা মালেক ইত্যাদি)। এই বাণীতে নবী করীম (সা.) কিতাব ও সুন্নাহর অনুসারীর জন্য সুপথ প্রাপ্তি এবং দুনিয়া ও আখেরাতের সর্বনাশী পথভ্রষ্টতা হতে রক্ষার যামানত নিয়েছেন। যেমন অন্য দিকে আল্লাহর দ্বীনে বিদআত রচনা করতে কঠোরভাবে নিষেধ ও সতর্ক করেছেন এবং সারা উম্মতকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, আল্লাহর দ্বীনে যে কোন বিদআত পথভ্রষ্টতার কারণ।

সাহাবী ইরবায বিন সারিয়াহ (রাঃ) বলেন, (একদা) আল্লাহর রসুল ঐ আমাদেরকে এমন উচ্চাঙ্গের উপদেশ দান করলেন যাতে আমাদের চিত্ত কম্পিত এবং চক্ষু অশ্রু বহমান হল। আমরা বল্লাম, হে আল্লাহর রসুল! এটা যেন বিদায়ী উপদেশ, অতএব আমাদেরকে কিছু অসিয়ত (অতিরিক্ত নির্দেশ দান করুন। তিনি বললেন, “তোমাদেরকে আল্লাহ-ভীতি এবং (পাপ ছাড়া অন্য বিষয়ে) আমীর (বা নেতা) এর আনুগত্য স্বীকার করার অসিয়ত করছি। যদিও বা তোমাদের আমীর এক জন ক্রীতদাস হয়। আর অবশ্যই তোমাদের মধ্যে যারা আমার বিদায়ের পর জীবিত থাকবে তারা অনেক রকমের মতভেদ দেখতে পাবে। অতএব তোমরা আমার এবং আমার সুপথপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ অবলম্বন করো, তা দন্ত দ্বারা দৃঢ়তার সহিত ধারণ করো। (তাতে যা পাও মান্য কর এবং অন্য কোনও মতের দিকে আকৃষ্ট হয়ো না।) এবং (দ্বীনে) নবরচিত কর্মসমূহ হতে সাবধান! কারণ, নিশ্চয়ই প্রত্যেক বিদআহ (নতুন আমল) ভ্রষ্টতা।” (আবু দাউদ ৪৪৪৩, তিরমিযী ২৮১৫, ইবনে নাজাহ ৪২ নং)

উল্লেখিত হাদীস শরীফটি উম্মাহর মাঝে ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠা করতে, ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী মতভেদ ও অনৈক্য নির্মূল করতে উদ্বুদ্ধ করে। সুন্নাহর অনুসরণ করে, জামাআত (সাহাবা)র অনুগমন করে, দাওয়াত পদ্ধতি, কর্ম, কথা ও বিশ্বাসে প্রত্যেক নব রচিত কর্মসমূহ বা বিদআত হতে সুদুরে থাকতে আদেশ করে; যা বিভ্রাট ও বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টিকারী বিতর্ক ও কলহের প্রতি উম্মাহকে টেনে নিয়ে যায়। আল্লাহ তাআলার প্রত্যাদেশ ও শরীয়ত উম্মাহর কাছে পৌছে না দেওয়া ও যথাযথভাবে তা বিবৃত না করার পূর্বে তাঁর প্রিয় রসুল প্লঃ ইহকাল ত্যাগ করেন নি। তিনি উম্মাহকে সে সকল কিছু কর্তব্যাকর্তব্য বর্ণনা করে গেছেন যাতে তাদের পার্থিব ও দ্বীনী কল্যাণ ও ইষ্ট নিহিত ছিল। তিনি উম্মাহকে এমন সমুজ্জ্বল পথে রেখে গেছেন যার রজনীও দিবসের ন্যায় দীপ্তিমান; যে পথ হতে একমাত্র ধ্বংসগামী ব্যতীত অন্য কেউ বক্রতা অবলম্বন করে না।

আর আল্লাহ জাল্লা শানুহ তাঁর প্রিয় নবীর জন্য দ্বীনকে পরিপূর্ণ ও তাঁর সম্পদকে সম্পূর্ণ করেছেন। আর সমগ্র মানব ও দানব জাতির জন্য ইসলামকেই একমাত্র ধর্ম বলে মনোনীত ও নির্বাচিত করেছেন। তিনি বলেন,

الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا

অর্থাৎ, আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ (নেয়ামত) সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের ধর্মরূপে মনোনীত করলাম। (সূরা মায়েদাহ ৩ আয়াত) তিনি অন্যত্র বলেন,

وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ

অর্থাৎ, কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্ম চাইলে তা কখনো তার নিকট হতে গ্রহণ করা হবে না এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের দলভুক্ত হবে। (সূরা আলে ইমরান ৮৫ আয়াত)।

সুতরাং এখান হতে প্রতীয়মান হয় যে, দ্বীন অসম্পূর্ণ নয়, বরং সম্পূর্ণ। আর রসূল ঐ তা স্পষ্টভাবে প্রচারও করে গেছেন। যেমন হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, “যে ব্যক্তি ধারণা করে যে, মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর অবতীর্ণ প্রত্যাদেশের কিছুও গুপ্ত করেছেন, তবে সে নিশ্চয় আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে। যেহেতু আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ ۖ وَإِن لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ

অর্থাৎ, হে আল্লাহর রসূল! তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা প্রচার কর। যদি তা না কর তবে তুমি তাঁর বার্তা প্রচার করলে না। (সূরা মায়েদাহ ৬৭ আয়াত)।

অনুরূপভাবে বিদায়ী হজ্জের ভাষণে রসুল (সা.) বিভিন্ন অনুদেশ, বৈধাবৈধ এবং পরস্পরের মান-ইজ্জত হারাম হওয়ার প্রসঙ্গ বিবৃত করার পর বলেছিলেন, “শোন! আমি কি (আল্লাহর প্রত্যাদেশ তোমাদের নিকট যথাযথভাবে) পৌছে দিলাম?” সাহাবাবৃন্দ বলেছিলেন, 'হ্যাঁ, অবশ্যই। তখন তিনি আকাশের প্রতি হস্তোত্তলন করে বলেছিলেন, “হে আল্লাহ! সাক্ষী থাকুন। আল্লাহ! সাক্ষী থাকুন।”

অতএব এর পরেও যদি কোন ব্যক্তি দ্বীনে নতুন কিছু আবিষ্কার করে; যার নির্দেশ না কিতাবে আছে সুন্নাহতে এবং না খুলাফায়ে রাশেদীন বা কোনও সাহাবার আদর্শে, তা আকীদা হোক বা আমল, কথা হোক বা ইসলামের প্রতি দাওয়াতী পদ্ধতি তবে ঐ ব্যক্তি যেন বলে যে, দ্বীন অসম্পূর্ণ, পুর্ণাঙ্গ নয়। আর সে এই অসম্পূর্ণতাকে নতুন কিছু (বিদআত) রচনার মাধ্যমে পূর্ণতা দান করার দুঃসাহসিকতা করে থাকে। অথচ মহান আল্লাহ বলেন, “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম।” অথবা ঐ ব্যক্তি যেন এই বলে বা ধারণা করে যে, দ্বীন তো পূর্ণাঙ্গ। কিন্তু এমন কিছু বিষয় আছে যা নবী ঐ প্রচার করে যাননি! অথচ হযরত আয়েশার হাদীস তা ভীষণভাবে খন্ডন করে।

অনুরূপভাবে বিদায়ী হজ্জের ভাষণে তাঁর তবলীগ ও প্রচার প্রসঙ্গে গুরুত্ব আরোপ করে এ বিষয়ে আল্লাহকে সাক্ষী রাখেন এবং সকলের উদ্দেশ্যে বলেন, “তোমাদের উপস্থিত ব্যক্তি অনুপস্থিত ব্যক্তিকে পেীছে দেবে। সম্ভবতঃ যার নিকট (ইলম) পৌছে দেওয়া হবে সে শ্রোতা অপেক্ষা অধিক স্মৃতিমান হতে পারে।” অতএব বিদআতীর রসনা অথবা অবস্থা যেন বলে যে, শরীয়ত পূর্ণাঙ্গ নয়। এমন কিছু বিষয় আছে যা তাতে সংযোজন ও পরিবর্ধন করা ওয়াজেব অথবা মুস্তাহাব। যেহেতু তার বিশ্বাস যদি এই থাকত যে, শরীয়ত সর্বতোভাবে পূর্ণতাপ্রাপ্ত, তাহলে নিশ্চয় তাতে আধুনিক কিছু উদ্ভাবন করে তাকে শরীয়ত’ নাম দেবার অপচেষ্টা ও দুঃসাহসিকতা আদৌ করত না। আর এরূপ আকীদা ও বিশ্বাসের মানুষ অবশ্যই পথভ্রষ্ট, সত্য ও সঠিক পথ হতে বহু দুরে।।

ইবনে মাজেশুন বলেন, আমি ইমাম মালেক (রঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, যে ব্যক্তি ইসলামে কোন বিদআত রচনা করে এবং তা পুণ্যের কাজ মনে করে, সে ব্যক্তি ধারণা করে যে, মুহাম্মাদ প্রঃ রিসালতের খিয়ানত (আল্লাহর প্রত্যাদেশ প্রচারে বিশ্বাসঘাতকতা) করেছেন। যেহেতু আল্লাহ তাআলা বলেন, “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম।” অতএব সেদিন যা দ্বীন ছিল না আজও (নতুনভাবে) তা দ্বীন নয়। (আল ইতিসাম ১/৪৯)

ইমাম শাত্ববী তাঁর মূল্যবান গ্রন্থ আল-ই'তিসামে বলেনঃ

১। বিদআতী শরীয়তের বিরোধী ও দ্বীনের পরিপন্থী। কারণ, আল্লাহ আযযা অজাল্ল বান্দাদের জন্য তাঁর ইবাদতের নির্দিষ্ট পথ ও পদ্ধতি নির্ধারিত করেছেন এবং তারই উপরে সৃষ্টিকে তাঁরই আদেশ ও নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তিরস্কার ও পুরস্কারের অঙ্গীকারের সহিত সীমাবদ্ধ করেছেন। আর এও জানিয়েছেন যে, কেবলমাত্র তাতেই মঙ্গল নিহিত আছে এবং এর সীমালঙ্ঘনে অমঙ্গল ও বিপদ আছে। যেহেতু আল্লাহ (কিসে ভাল অথবা মন্দ আছে তা) জানেন এবং আমরা কিছুও জানি না। আর বিদিত যে, তিনি তাঁর রসূল (সা.)-কে জগদ্বাসীর জন্য করুণা স্বরূপ প্রেরণ করেছেন।

কিন্তু বিদআতী এসব কিছুকে অমান্য ও অস্বীকার করে। সে মনে করে যে, (আল্লাহর নির্ধারিত ও সীমিত পথ ব্যতীত) আরো অন্যান্য পথও আছে (যাতে তাঁর সামিপ্য ও সন্তুষ্টি লাভ হয়) তিনি যা নির্দিষ্ট করেছেন তাতেই সীমাবদ্ধ নয় এবং যা নির্ধারিত করেছেন সেটাই চূড়ান্ত ও শেষ পথ নয়! যেন সে বলে আল্লাহ জানেন আমরাও জানি। বরং আল্লাহর শরীয়তে সংযোজন ও পরিবর্ধন করে সে ভাবে যে, আল্লাহ যা জানতেন না তা সে জেনে ফেলেছে! (নাউযু বিল্লাহ মিন যালিক।) বিদআতীর এমন কর্ম ও ধারণা যদি স্বেচ্ছাকৃত হয়, তবে নিশ্চয় তা কুফর এবং যদি তা অনিচ্ছাকৃত হয়, তবে তা ভ্রষ্টতা।

২। বিদআতী তার এই কাজে নিজেকে আল্লাহ তাআলার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে। কারণ আল্লাহ পাক শরীয়ত প্রণয়ন করেছেন এবং মানুষকে তাঁর সেই বিধান অনুযায়ী বাধ্য-বাধকতার সহিত চলতে আদেশ করেছেন। আর তিনিই এ কাজে একক ও অদ্বিতীয়। কারণ বান্দারা যাতে মতভেদ করে থাকে সে বিষয়ে মীমাংসা তিনিই দান করে থাকেন।

তাই শরীয়ত কোন জ্ঞানলব্ধ বস্তু নয় মানুষের বিবেক-বুদ্ধি দ্বারা রচিত বিধান নয়; যা যে কেউ ইচ্ছা করলে নিজের তরফ হতে রচনা বা সংযোজন করতে পারে। যদি ব্যাপারটা তাই হত, তাহলে আর জগদ্বাসীর জন্য কোন নবী বা রসুল প্রেরণ করার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু বিদআতী বিদআত রচনা করে যেন সে নিজেকে শরীয়ত রচয়িতার প্রতিদ্বন্দ্বী ও সমকক্ষ মনে করে। তাই সে তার মত শরীয়তবিধান উদ্ভাবন করতে সাহস পায় এবং এর দ্বারা মতান্তর ও বিচ্ছিন্নতার দ্বার উদ্ঘাটন করতে প্রয়াসী হয়।

৩। আবার বিদআতী তার এই কাজে নিজের কামনা ও প্রবৃত্তির অনুসরণ করে থাকে। অথচ আল্লাহ পাক বলেন,

وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ

অর্থাৎ, আল্লাহর পথ-নির্দেশ ব্যতিরেকে যে ব্যক্তি নিজের খেয়াল খুশীর অনুসরণ করে তার অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত আর কে? (সুরা কাসাস ৫০ আয়াত) অতএব যে ব্যক্তি তার আত্মার প্রবৃত্তিকে আল্লাহর পথ-নির্দেশের অনুসারী করে না তার চেয়ে বেশী পথভ্রষ্ট আর কেউ নেই।

আল্লাহর দ্বীনে নব বিধান রচনাকারী বিদআতী যে নিজেকে তাঁর সমকক্ষ মনে। করে, কুরআন কারীমে তার নিন্দা করা হয়েছে। কারণ, বিদআতের পথ বক্রপথ। আর যে বক্র পথে চলতে চায় আল্লাহ তার হৃদয়কে বক্র করে দেন। যেহেতু প্রতিশোধ কৃতকর্মের সদৃশ হয়ে থাকে। যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেন,

فَلَمَّا زَاغُوا أَزَاغَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ ۚ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ

অর্থাৎ, অতঃপর ওরা যখন বক্রপথ অবলম্বন করল, তখন আল্লাহও তাদের হৃদয়কে বক্র করে দিলেন। আল্লাহ সত্যত্যাগী (ফাসেক) সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করেন না। (সুরা সাফ্‌ফ ৫ আয়াত)।

তাদের এ শাস্তি এই জন্যই যে, তারা কুরআনের রূপক আয়াতের অনুসরণ করে, সুস্পষ্ট দ্ব্যর্থহীন আয়াত বর্জন করে এবং রূপক আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য অনুসন্ধান করে; বরং আয়াতের অর্থ বিকৃত করে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

هُوَ الَّذِي أَنزَلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ مِنْهُ آيَاتٌ مُّحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ وَأُخَرُ مُتَشَابِهَاتٌ ۖ فَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ زَيْغٌ فَيَتَّبِعُونَ مَا تَشَابَهَ مِنْهُ ابْتِغَاءَ الْفِتْنَةِ وَابْتِغَاءَ تَأْوِيلِهِ

অর্থাৎ, তিনিই তোমার প্রতি এই কিতাব অবতীর্ণ করেছেন যার কিছু আয়াত সুস্পষ্ট দ্ব্যর্থহীন, এগুলি কিতাবের মূল অংশ। আর অন্যগুলি রূপক, যাদের মনে বক্রতা আছে তারা ফিতনা (বিশৃঙ্খলা) সৃষ্টি ও ভুল ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে যা রূপক তার অনুসরণ করে। (সুরা আলে ইমরান ৭ আয়াত)

আয়েশা (রাঃ) কর্তৃক হাদীসে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রসুল (সা.) এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বললেন, “যাদেরকে রূপক আয়াতের অনুসরণ করতে দেখবে আল্লাহ তাদেরকেই উদ্দেশ্য করেছেন। অতএব তোমরা ঐ ধরনের মানুষ হতে সাবধান থাকো।”

অন্য এক বর্ণনায় বলেন, “যাদেরকে রূপক আয়াত নিয়ে তর্ক-বিবাদ (অনুরূপভাবে রহস্য ও ভেদ বের করার অপচেষ্টা করতে দেখবে তাদেরকেই আল্লাহ লক্ষ্য করে বলেছেন। অতএব তাদের থেকে সাবধান থেকো।” মহান আল্লাহ বলেন,

إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَّسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ

অর্থাৎ, অবশ্যই যারা ধর্ম সম্বন্ধে নানা মতের সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে কোন কিছুতেই তুমি তাদের মধ্যে নও। (সূরা আনআম ১৫৯ আয়াত) (এবং তারা তোমাদের দলভুক্ত নয়।)।

ইবনে কাসীর বলেন, বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে; যেমন বিভিন্ন সম্প্রদায় দল, প্রবৃত্তি ও ভ্রষ্টতার অনুগামীরা হয়েছে। আল্লাহ জাল্লা শানুহ তাঁর রসূলকে সে সব দল হতে সম্পর্কহীন ঘোষণা করেছেন। (তফসীর ইবনে কাসীর)। আল্লাহ রাব্বল আলামীন অন্যত্র বলেন,

وَأَنَّ هَٰذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَن سَبِيلِهِ ۚ ذَٰلِكُمْ وَصَّاكُم بِهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

অর্থাৎ, নিশ্চয় এটিই আমার সরল পথ, সুতরাং এরই অনুসরণ কর ও বিভিন্ন পথের অনুসরণ করো না। করলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ হতে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। এভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দান করেছেন, যেন তোমরা সাবধান। হও। (সুরা আনআম ১৫৩ আয়াত)।

আল্লাহ যে সরল পথের প্রতি আহবান করেছেন তা হল আহমাদ (সা.)-এর চরিত্রাদর্শ, যা কুরআন ও সুন্নাহর পথ এবং পূর্ণাঙ্গ ইসলামের বিধান। আর অন্যান্য বিভিন্ন বাঁকা পথ, বিরুদ্ধবাদী, অন্যথাচারী ও ভ্রষ্টচারীদের পথ; যারা সরল পথ হতে সরে গেছে, যারা নিজেদের খেয়াল-খুশী ও কুপ্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে আল্লাহর দ্বীনে নতুনত্ব সৃষ্টি করেছে।

উপরোক্ত আয়াত শরীফে বিভিন্ন (বাকা) পথ’ বলতে বিদআতীদের বিভিন্ন পথ উদ্দিষ্ট হয়েছে। যেমন আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ এ বলেন, একদা রসূল ঐ স্বহস্তে একটি (সরল) রেখা টানলেন, অতঃপর বললেন, “এটা আল্লাহর সরল পথ।” তারপর ঐ রেখাটির ডানে ও বামে আরো অনেক রেখা টেনে বললেন, “এই হচ্ছে বিভিন্ন পথ; যার প্রত্যেকটির উপর রয়েছে শয়তান, যে ঐ পথের দিকে আহবান করে (দাওয়াত দিতে) থাকে।” অতঃপর তিনি উপরোক্ত আয়াতটি পাঠ করলেন। বাক বিন আ’লা বলেন, 'আমার মনে হয় তাঁর উদ্দেশ্য মনুষ্যশয়তানের আহবান; আর তা হচ্ছে বিদআত।”

মুজাহিদ বলেন, বিভিন্ন পথসমূহের অনুসরণ করো না। অর্থাৎ, বিদআত ও সন্দিহান কর্মের অনুসরণ করো না।”

বিদআতীদের নিন্দাবাদ যেমন আল-কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে তেমনিই বহু সংখ্যক হাদীসে নববীতে তাদের অতি নিন্দা বিবৃত হয়েছে এবং তাদের ভ্রষ্টতা, পাপ ও তাদের আমল অগ্রহণযোগ্যতার কথাও বর্ণিত হয়েছে। যেমন মুস্তাফা (সা.) বলেন, “যে ব্যক্তি আমাদের এ বিধানে আধুনিক কিছু রচনা করবে; যা এর অন্তর্ভুক্ত নয় তা প্রত্যাখ্যাত। (পরিত্যাজ্য ও বাতিল।) (বুখারী ৪/৩৫৫) | অন্য বর্ণনায় বলেন, “যে ব্যক্তি এমন কোন আমল করে যার উপর আমাদের কোন নির্দেশ নেই, তা নাকচকৃত ও খন্ডিত।” (মুসলিম)।

যে ব্যক্তি হেদায়াত (সৎপথের) দিকে আহবান করবে তার পুণ্য হবে ওর অনুসারীদের পুণ্যরাশির মত। তাদের কারোরই পুণ্য কিছু পরিমাণও কম করা হবে না। আর যে ব্যক্তি ভ্রষ্টতার দিকে মানুষকে আহবান করবে (বা দাওয়াত দেবে) তার পাপ হবে ওঁর অনুসারীদের পাপরাজির মত। তাদের কারোই পাপ কিছু পরিমাণও কম করা হবে না।” (মুসলিম) “কোন জাতি যখন তাদের দ্বীনে কোন বিদআত রচনা করে, তখন আল্লাহ তাদের সুন্নাহ থেকে সমপরিমাণ অংশ তুলে নেন। অতঃপর তা আর তাদের প্রতি কিয়ামত পর্যন্ত ফিরিয়ে দেন না।” (দারেমী)। হও কওসরের পানি পান করার জন্য পিপাসার্ত লোক (কিয়ামতের) দিন। আল্লাহর নবী ঐ-এর নিকট উপস্থিত হবে। কিন্তু তাদেরকে নিরুদ্দেশ উট বিতাড়িত করার ন্যায় বিতাড়িত করা হবে। তিনি বলবেন, 'ওরা আমার দলের। (বা ওরা তো আমার উম্মত)। বলা হবে। তিনি বলবেন, আপনি জানেন না, আপনার বিগত হওয়ার পর ওরা কি নবরচনা করেছিল। তখন নবী (সা.) তাদেরকে বলবেন ? “দূর হও, দুর হও।” (মুসলিম)।

তিনি আরো বলেন, “আমার পুর্বে আল্লাহর প্রেরিত প্রত্যেক নবীর জন্যই তাঁর। উম্মতের মধ্য হতে বহু শিষ্য ও সহচর ছিল; যারা তাঁর আদর্শ গ্রহণ করত এবং তাঁর সর্বকাজে অনুসরণ করত। অতঃপর তাদের পর তারা আদিষ্ট নয়। অতএব যে ব্যক্তি তাদের বিরুদ্ধে হস্ত দ্বারা জিহাদ করে সে মুমিন। যে ব্যক্তি তাদের বিরুদ্ধে রসনা দ্বারা জিহাদ করে সে মুমিন এবং যে ব্যক্তি তাদের বিরুদ্ধে অন্তর দ্বারা জিহাদ করে সে মুমিন। আর এর পশ্চাতে এক সরিষা দানা পরিমাণও ঈমান থাকে না।” (মুসলিম)

“নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক বিদআতী হতে তওবা অন্তরিত করেছেন।”(1) (সিলসিলাহ সহীহাহ ১৬২০নং) “যে ব্যক্তি (দ্বীনে) অভিনব কিছু রচনা করে অথবা কোন নতুনত্ব উদ্ভব রচয়িতাকে স্থান দেয় তার উপর আল্লাহ, ফিরিশ্তাগণ এবং সমস্ত মানুষের অভিশাপ। আল্লাহ তার নিকট হতে নফল ইবাদত (অথবা তওবা) এবং কোন। ফরয ইবাদত (অথবা ক্ষতিপুরণ করবেন না।)”

আমর বিন সালামাহ বলেন, ফজরের নামাযের পূর্বে আমরা আব্দুল্লাহ বিন। মাসউদ (রাঃ)-এর বাড়ির দরজায় বসে থাকতাম। যখন তিনি নামাযের জন্য বের হতেন, তখন আমরা তাঁর সাথে মসজিদে যেতাম। (একদা ঐরূপ বসেছিলাম) ইতিমধ্যে আবু মূসা আশআরী আমাদের নিকট এসে বললেন, 'এখনো কি আবু আব্দুর রহমান (ইবনে মাসউদ) বের হন নি?” আমরা বল্লাম, না। অতঃপর তাঁর অপেক্ষায় তিনিও আমাদের সহিত বসে গেলেন। তারপর তিনি যখন বাড়ি হতে

বের হয়ে এলেন, তখন আমরা সকলে তাঁর প্রতি উঠে দন্ডায়মান হলাম। আবু মূসা আশআরী তার উদ্দেশ্যে বললেন, হে আবু আব্দুর রহমান! আমি মসজিদে এক্ষনি এমন কাজ দেখলাম, যা অদ্ভুত বা অভূতপূর্ব। তবে আলহামদুলিল্লাহ, আমি তা ভালই মনে করি। তিনি বললেন, 'কি সেটা? ' (আবু মুসা) বললেন, যদি বাঁচেন। তো দেখতে পাবেন; আমি মসজিদে এক সম্প্রদায়কে এক-এক গোল বৈঠকে বসে। নামাযের প্রতীক্ষা করতে দেখলাম। তাদের হাতে রয়েছে কাঁকর। প্রত্যেক মজলিসে কোন এক ব্যক্তি অন্যান্য সকলের উদ্দেশ্যে বলছে, একশত বার ‘আল্লাহু আকবার” পড়। তা শুনে সকলেই শতবার তকবীর পাঠ করছে।

লোকটি আবার বলছে, একশত বার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পড়। তা শুনে সকলেই শতবার তাহলীল পাঠ করছে। আবার বলছে, একশত বার সুবহানাল্লাহ’ পড়। তা শুনে সকলেই শতবার তসবীহ পাঠ করছে। তিনি (ইবনে মাসউদ) বললেন, 'আপনি ওদেরকে কি বললেন?’ আবু মূসা বললেন, 'আপনার রায়ের অপেক্ষায় আমি ওদেরকে কিছু বলিনি।” তিনি বললেন, আপনি ওদেরকে নিজেদের পাপ গণনা করতে কেন আদেশ করলেন না এবং ওদের পুণ্য বিনষ্ট হবার উপর যামানত কেন নিলেন না?” আমর বলেন, অতঃপর আমরা তাঁর সহিত চলতে লাগলাম। তিনি ঐ সমস্ত গোল বৈঠকের কোন এক বৈঠকের সম্মুখে পৌছে দন্ডায়মান হয়ে বললেন, 'আমি তোমাদেরকে একি করতে দেখছি?” ওরা বলল, 'হে আবু আব্দুর রহমান! কাঁকর, এর দ্বারা তকবীর, তহলীল ও তসবীহ গণনা করছি।

তিনি বললেন, 'তোমরা তোমাদের পাপরাশি গণনা কর, আমি তোমাদের জন্য যামিন হচ্ছি যে, তোমাদের কোন পুণ্য বিনষ্ট হবে না। ধিক তোমাদের প্রতি হে উম্মতে মুহাম্মাদ! কি সত্বর তোমাদের ধ্বংসের পথ এল! তোমাদের নবীর সাহাবাবৃন্দ এখনও যথেষ্ট রয়েছেন। এই তাঁর বস্ত্র এখনো বিনষ্ট হয়নি। তাঁর পাত্রসমূহ এখনো ভগ্ন হয়নি। তাঁর শপথ যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! তোমরা এমন মিল্লাতে আছ যা মুহাম্মাদ (সা.)-এর মিল্লাত অপেক্ষা শ্রেষ্টতর অথবা তোমরা ভ্রষ্টতার দ্বার উদঘাটনকারী?! ওরা বলল, ‘আল্লাহর কসম, হে আবু আব্দুর রহমান! আমরা ভালরই ইচ্ছা করেছি। তিনি বললেন, কিন্তু কত ভালোর অভিলাষী ভালোর নাগালই পায় না। অবশ্যই আল্লাহর রসূল ঐ আমাদেরকে হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, “এক সম্প্রদায় কুরআন পাঠ করবে, কিন্তু তাদের ঐ পাঠ (তেলাঅত) তাদের কণ্ঠ অতিক্রম করবে না।” আর আল্লাহর কসম! জানি না, সম্ভবতঃ তাদের অধিকাংশই তোমাদের মধ্য হতে।”

অতঃপর তিনি সেখান হতে প্রস্থান করলেন। আর বিন সালামাহ বলেন, ‘নহরওয়ানের দিন ঐ বৈঠকসমুহের অধিকাংশ লোককেই খাওয়ারেজদের সহিত দেখে ছিলাম। যারা আমাদের (হযরত আলী ও অন্যান্য সাহাবাদের) বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়ছিল।’ (সিলসিলাহ ২০০৫নং)

অধিকাংশ বিদআতীর রচনায় কিছুটা অথবা সম্পূর্ণ সদুদ্দেশ্য থাকে। কোন। সৎকাজ করছে মনে করেই নতুন কোন ধর্মীয় কর্ম বিরচিত করে। কুরআনের (বিশেষ করে সিফাতের) আয়াতসমূহের অপব্যাখ্যা ও ভুল তাৎপর্য করে। অনেক ক্ষেত্রে স্পষ্ট অর্থ ত্যাগ করে নিজের জ্ঞান ও প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে বিভিন্ন কুটার্থ উদ্ভাবন করে। হক ও বাতিলের মাঝে খামখা সমন্বয় ও সম্প্রীতি সাধন করার উদ্দেশ্যে আল্লাহ ও তদীয় রসুলের নির্দেশিত পথ ব্যতিরেকে ভিন্ন পথে কল্যাণ অন্বেষণ করে। এই ধরনের কিছু কপট মানুষের উদ্দেশ্যে আল্লাহ পাক বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا (59)

أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَن يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا (60) وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَىٰ مَا أَنزَلَ اللَّهُ وَإِلَى الرَّسُولِ رَأَيْتَ الْمُنَافِقِينَ يَصُدُّونَ عَنكَ صُدُودًا (61) فَكَيْفَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ ثُمَّ جَاءُوكَ يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا إِحْسَانًا وَتَوْفِيقًا (62) أُولَٰئِكَ الَّذِينَ يَعْلَمُ اللَّهُ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ وَعِظْهُمْ وَقُل لَّهُمْ فِي أَنفُسِهِمْ قَوْلًا بَلِيغًا (63)

অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস কর তবে আল্লাহর অনুগত হও, রসুল ও তোমাদের শাসক (আমীর ও উলামা)দের অনুগত হও। আর যদি কোন বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটে, তাহলে সে বিষয়ে। আল্লাহ ও রসুলের (কিতাব ও সুন্নাহর) ফায়সালা নাও। এটিই ভালো এবং ব্যাখ্যায়। (পরিণামে) প্রকৃষ্টতর। (হে মুহাম্মাদ!) তুমি কি তাদের দেখনি, যারা ধারণা করে যে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং তোমার পুর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে তারা বিশ্বাস করে? অথচ তারা তাগুতের (আল্লাহ ব্যতীত ভিন্ন আরাধ্য ও মান্য বস্তু যেমন, মুর্তি, কবর, মাযার,ঝটা আউলিয়া, মনগড়া কানুন, শয়তান, মন ও প্রবৃত্তি প্রভৃতি) কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায় - যদিও তা প্রত্যাখ্যান করার জন্য তাদেরকে আদেশ দেওয়া হয়েছে। আর শয়তান তাদেরকে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট করতে চায়। তাদেরকে যখন বলা হয় যে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার দিকে এবং রসূলের দিকে (কিতাব ও সুন্নাহর দিকে) এস, তখন তুমি কপটদের তোমার নিকট থেকে একেবারে মুখ ফিরিয়ে নিতে দেখবে। সুতরাং তাদের কৃতকর্মের জন্য যখন তাদের। উপর কোন বিপদ এসে পড়ে তখন তাদের কি অবস্থা হয়? অতঃপর তোমার নিকট আল্লাহর শপথ করে বলবে যে, আমরা কল্যাণ ও সম্প্রীতি সাধন ব্যতীত অন্য কিছুই চাইনি। এরাই তো তারা যাদের অন্তরে কি আছে আল্লাহ তা জানেন। সুতরাং তুমি তাদেরকে উপেক্ষা কর, তাদেরকে সদুপদেশ দাও এবং তাদেরকে গোপনে গভীর কথা বল। (সুরা নিসা ৫৯-৬৩ আয়াত)

আয়াতের মনগড়া অর্থ ও ব্যাখ্যাকারী এক সম্প্রদায় সম্বন্ধে সতর্ক করে রসুল (সা.) বলেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এই কুরআনের ব্যাখ্যার উপর লড়বে, যেমন আমি ওর অবতরণের উপর লড়ছি।” (মুসনাদে আহমাদ, নাসাঈ, ইবনে হিব্বান)

(1) পাপকে পাপ মনে করে তওবা করার তওফীক লাভ হয়। কিন্তু বিদআতকে দ্বীন মনে করেই পালন করে বিদআতী। সুতরাং তা থেকে তওবা করার কোন প্রশ্নই ওঠে না তার মনে। পক্ষান্তরে বিদআতী যদি হক জেনে বিদআত ছেড়ে বিশুদ্ধ চিত্তে তওবা করে তাহলে অবশ্যই তওবার দরজা খোলা আছে। আল্লাহ রসূল (সা.) বলেন, “আল্লাহ প্রত্যেক বিদআতীর তওবা ততক্ষণ পর্যন্ত স্থগিত রাখেন (গ্রহণ করেন না) যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার বিদআত বজর্ন না করেছে।” (তাবারানী, সহীহ তারগীব ৫১ নং)

বিদআতের আভিধানিক অর্থ, বিনা নমুনা বা উদাহরণে কিছু রচনা বা উদ্ভাবন করা বা আবিষ্কার করা। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, “(আল্লাহ) আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর আবিষ্কর্তা।” অর্থাৎ বিনা নমুনায় সৃষ্টিকর্তা। (সূরা বাকারাহ ১১৭ আয়াত) বলা হয় বিদআত করেছে; অর্থাৎ, এমন পথ বা প্রথা রচনা করেছে, পুর্বে যার কোন উদাহরণ ছিল না। যেমন, যে ঘটনা বা কান্ড পুর্বে কখনো ঘটেনি তাকে বলা হয় অভূতপূর্ব ঘটনা।

এই সকল অর্থের প্রতি খেয়াল করে বিদআতকে বিদআত বলা হয়েছে সুতরাং এমন ধর্মীয় বিশ্বাস, কথা বা কাজ যার কোন দলীল শরীয়তে নেই। এই বিদআতীর পূর্বে আল্লাহর রসূল অথবা তার কোন সাহাবী বলেননি বা করেননি, যার কোন ইঙ্গিত দ্বীনে বা কুরআনে অথবা সহীহ সুন্নাহতে নেই, নতুনভাবে তাই বিশ্বাস করা, বলা বা করাকে - যা আসল শরীয়তের সমতুল্য মনে করা হয় এবং অতিরঞ্জন করে তা পালনীয় ধর্মীয় রীতি স্বরূপ করার উদ্দেশ্যে হয় - তাকে বিদআত বলে।

অন্য কথায়, প্রত্যেক সেই আমল (ইবাদত মনে করে বা আল্লাহর সন্তুষ্টি আছে মনে বা শরীয়ত ভেবে বা করতে হয় অথবা নেই ভেবে, নেকী বা গোনাহ হয় মনে করে) করা বা ত্যাগ করা, যার নির্দেশ বা ইঙ্গিত দ্বীনে নেই তাকে বিদআত বলে। (হুজাজ প্লাবিয়্যাহ) অতএব যে আমলের মূল দ্বীন বা শরীয়তে আছে এবং কিছুকাল পরে যদি তার নতুনভাবে সংস্কার সাধন করা হয়, তাহলে তাকে আভিধানিক অর্থে বিদআত বলা গেলেও শরয়ী অর্থে তা বিদআত’ নয়। যেমন কিছু সলফের উক্তি “নি’মাতিল বিদআহ” (উত্তম আবিষ্কার বা বিদআহ) শরয়ী অর্থে বিদআত নয়। হযরত উমার (রাঃ) যখন সমস্ত লোকদেরকে রমযানের তারাবীহ পড়ার জন্য একই ইমামের পিছনে জমায়েত হয়ে নামায পড়তে দেখলেন, তখন তিনি বললেন, ‘নি’মাতিল বিদআতু হা-যিহ। (অর্থাৎ, উত্তম আবিষ্কার এটা!) এটা আভিধানিক অর্থে বিদআহ।

কারণ, রমযানে জামাআত করে তারাবীহর নামায পড়ার মূল ভিত্তি। শরীয়তে ছিল। রসুল প্লঃ নিজে সাহাবাবৃন্দকে নিয়ে জামাআত করে দুই-তিন রাত্রি তারাবীহর নামায পড়েছিলেন। তারপর ঐ নামায উম্মতের উপর ফরয হয়ে যাবে এবং তা আদায় করতে তারা অক্ষম হবে -এই আশঙ্কায় আর কোন দিন জামাআত করে পড়েননি। সুতরাং তা শরয়ী অর্থে বিদআত নয়। পক্ষান্তরে হযরত উমরের বা অন্যান্য খলীফা ও সাহাবার কর্মও সুন্নাহ।। সতর্কতার বিষয় এই যে, হযরত উমার (রাঃ) বা খুলাফায়ে রাশেদীন-দের কোন কাজের দোহাই দিয়ে বিদআত করা বা নবী -এর পরে তাঁদের কোন কর্মকে তাঁদের পরবর্তী যুগে কোন নতুন ধর্মীয় কাজ বা প্রথা রচনা করার উপর দলীল মনে করা যাবে না।

তাই এ কথা কারো মনে করা উচিত নয় যে, হযরত উসমান (রাঃ), সমস্ত কুরআনী আয়াতকে জমা করে মুসহাফ বা গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করেছেন যা এক নতুন কাজ ছিল, তাই আমাদেরও ঐ ধরনের কোন অন্য কাজ করা চলবে, অথবা তাঁদের ঐ ধরনের কর্মগুলি বিদআত ছিল। কারণ, আল্লাহর রসুল (সা.)-এর উক্তিতে প্রমাণিত যে, তাঁদের যে কোনও কাজ সুন্নাহ, বিদআত নয়; যদি তা তাঁর নির্দেশের পরিপন্থী না হয় তবে। অতএব তাঁদের নির্দেশিত বা কৃতকর্মের আমরা অনুসরণ করতে পারি; কিন্তু তাতে কোন অতিরিক্ত অথবা তাঁদের রচনার অনুকরণে কোন অন্য নতুন কর্ম রচনা করতে পারি না। আবার কোন দেশাচার, লৌকিক বা কোন বৈষয়িক কাজ (ধর্ম না ভেবে করাকে) আভিধানিক অর্থে বিদআত বলা গেলেও

শরীয়তের পারিভাষিক অর্থে তা বিদআত’ নয় এবং রসুল (সা.)-এর উদ্দেশ্য ঐ ধরনের কর্মের উপর সতর্ক করাও নয়। অবশ্য ঐ সমস্ত প্রথা বা কর্ম শরীয়ত পরিপন্থী হলে সে কথা ভিন্ন।

তদনুরূপ কোন বৈষয়িক বা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারও শরয়ী অর্থে বিদআত নয়। তা সাধারণ কর্মে অথবা দ্বীন ও ইবাদতের অসীলাহ ও মাধ্যমস্বরূপ ব্যবহার করাও বিদআতের পর্যায়ে পড়ে না। যেমন আযান, নামায বা খুতবার জন্যে লাউড-স্পীকার, বিদ্যুৎ বাতি, শিক্ষার অভিনব ব্যবস্থা ইত্যাদিকে বিদআত বলতে পারি না।

পক্ষান্তরে যদি কোন কাজ ইবাদত বা নৈকট্যদানকারী না ভেবে করা হয়, তবে তার তিন অবস্থা হতে পারে;

(১) সে কাজের কোন স্পষ্ট নির্দেশ শরীয়তে থাকলেও তা ব্যাপক অর্থ ও মৌলিক নীতির অন্তর্ভুক্ত হবে। অস্পষ্ট বা পরোক্ষ ইঙ্গিত থাকলে তা বিদআত বলে গণ্য হবে না। বরং তা ঐ মূল অর্থ অনুযায়ী ঐ নির্দেশ ওয়াজেব হলে ঐ কর্ম ওয়াজেব; নচেৎ মুস্তাহাব অথবা হারাম হবে।

(২) সে কাজের প্রতি অস্পষ্টও কোন ইঙ্গিত শরীয়তে পাওয়া যাবে না এবং তা মৌলিক নীতি বা ব্যাপক দলীলের আওতাভুক্ত নয়। বরং সে বিষয়ে শরীয়ত নীরব। তাহলে তা মুবাহ। অর্থাৎ, তাতে পাপ-পুণ্য কিছুই নেই।

(৩) সে কাজ ব্যাপক কোন দলীলের বা মৌলিক নীতির অন্তর্ভুক্ত নয় এবং এ বিষয়ে শরীয়ত নীরব। কিন্তু তা ইবাদত বা আমলের কেবল অসীলাহ ও মাধ্যম মাত্র। তাহলে তা যে কাজের অসীলা তার হিসাবে অসীলারও গুরুত্ব হবে। যেমন তবলীগ বা ইসলাম প্রচারের জন্য রেডিও, টিভি, টেপরেকর্ডার, আযান, জলসা বা দর্সের জন্য মাইক ইত্যাদি আমলের সহায়ক যন্ত্রাদি ব্যবহার করা বিদআতের পর্যায়ে পড়ে না। (ফারাইদুল ফাওয়াইদ, ইবনে উষাইমীন ১৪৪-১৪৫ পৃঃ)

বৈশিষ্ট্যের দৃষ্টিকোণ থেকে বিদআতকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়; বিদআহ হাক্বীক্বিয়্যাহ (প্রকৃত বিদআত) এবং বিদআহ ইযাফিয়্যাহ (অতিরিক্ত বিদআত)।

প্রকৃত বিদআত তখন বলা হয়, যখন ধর্ম-কল্প কাজের ভিত্তি কিতাব, সুন্নাহ অথবা ইজমাতে পাওয়া যায় না। বরং ভিত্তিহীনভাবেই সে কাজকে দ্বীন বলে মেনে নেওয়া হয়। যেমন, কোন সন্দিহানে পড়ে বিনা কোন শরয়ী ওযর অথবা সৎ উদ্দেশ্যে কোন হালাল বস্তুকে হারাম অথবা হারাম বস্তুকে হালাল করা। যেমন, বৈরাগ্য অবলম্বন করা, মাছ-মাংসাদি উত্তম খাদ্য ভক্ষণ না করা, উত্তম পরিচ্ছদ পরিহার করা, প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও বিবাহ না করা ইত্যাদি। আত্মাকে কষ্ট দিয়ে (যেমন দেহে কাঁটা, জিভে শিক ফুড়ে আল্লাহর নৈকট্য আশা করা, জ্যান্ত কবর নিয়ে। মাটির উপর হাত বের করে তসবীহ পড়া, মর্সিয়া-মাতমে বুক চিরা, পিঠে চাবুক মারা প্রভৃতির মাধ্যমে) ইবাদত করা বা নেকী লাভের আশা করা।

আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) বলেন, আমরা নবী (সা.)-এর সহিত জিহাদে (সফরে) থাকতাম এবং আমাদের সঙ্গে আমাদের পত্নীরা থাকত না। (দীর্ঘ সফরের ফলে যৌনজ্বালা অনুভূত হলে) আমরা তাঁকে বললাম, আমরা খাসি করব না কি?” তিনি আমাদেরকে তাতে নিষেধ করলেন এবং বস্ত্রের বিনিময়ে (সফরে) কোন নারীকে বিবাহ করতে অনুমতি দিলেন। অতঃপর এই আয়াত পাঠ করলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُحَرِّمُوا طَيِّبَاتِ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ

অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্য যে সব উৎকৃষ্ট বস্তু বৈধ করেছেন, সে সকলকে তোমরা অবৈধ করো না। সীমালংঘনকারীদেরকে আল্লাহ মোটেই ভালবাসেন না। (সুরা মায়েদাহ ৮৭ আয়াত, বুখারী ৮/২৭৬)।

আবু কাইস বিন হাযেম বলেন, আবু বাকর (রাঃ) আহমাসের যয়নাব নামক এক মহিলার নিকট প্রবেশ করলেন। তিনি তাকে দেখলেন, সে কথা বলে না। জিজ্ঞাসা করলেন, 'ব্যাপার কি ওর, কথা বলে না কেন?’ সকলে বলল, ‘নীরব থেকে হজ্জ করতে চায়। তিনি মহিলাটিকে বললেন, ‘কথা বল, কারণ, এটা বৈধ নয়। এমন করা জাহেলিয়াতের কাজ। মহিলাটি তখন কথা বলতে শুরু করল। বলল, ‘আপনি কে? তিনি বললেন, ‘মুহাজেরীনদের একটি লোক।' (বুখারী ৭/১৪৭)

তদনুরূপ এমন মনগড়া ইবাদত রচনা করা যার বিধান আল্লাহ তাআলা দেননি। যেমন বিনা পবিত্রতায় নামায পড়া, কাওয়ালী, গান-বাজনা প্রভৃতির মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি চাওয়া ইত্যাদি। অনুরূপভাবে শরীয়তে সুন্নাহকে দলীল মানতে অস্বীকার করা, শুদ্ধ বর্ণনার উপর জ্ঞান ও বিবেককে প্রাধান্য দেওয়া এবং জ্ঞানের নিক্তিতে শরীয়তকে ওজন করা ইত্যাদি।

তদনুরূপ হকীকত, তরীকত বা মারেফত ইত্যাদি নতুন পথ রচনা করা বা মান্য করা। নির্দিষ্ট ধর্মীয় মর্যাদা (বা কামালে) পৌছে গেলে -আমল ওয়াজেব হওয়ার শর্তাবলী বর্তমান থাকা সত্ত্বেও - আর কোন আমল ঐ কামেলের উপর ওয়াজেব। নেই ভাবা। অথবা মারেফতীর সেই মঞ্জিলে পৌছে গেলে বান্দার নিকট হারামহালাল সব একাকার হয়ে যায়; তখন আর তাকে শরীয়তের বাধা মেনে চলতে হয় না, ব্যভিচার, শুয়োর, কুকুর, মাদক দ্রব্য ইত্যাদি হারাম বস্তু তার জন্য হালাল হয়ে যায় -এই ধারণা করা অথবা কোন মরমিয়া তত্ত্বানুসন্ধান করা ইত্যাদি।

অতিরিক্ত বিদআত তখন হয়, যখন আসল আমল তো বিধেয় থাকে; কিন্তু ঐ বিধেয় কর্মের সাথে আরো কিছু অতিরিক্ত কর্ম মনগড়াভাবে যুক্ত করে দেওয়া হয়। যার ফলে পুরো কর্মটাই অবিধেয় বিদআত বলে বিবেচিত হয়। লোক মাঝে অধিকাংশ এই বিদআতেরই প্রচলন বেশী। যেমন; নামায, রোযা, যিকর, দুআ, দরূদ, কষ্টের সময় পূর্ণ অযু প্রভৃতি বিধেয় ইবাদত; যে সবের বিধান শরীয়তে রয়েছে। কিন্তু কেউ যদি বলে, আমি এক রাকআতে একশ বার কুল পড়ে অথবা প্রতি রাকআতে তিন বার করে সিজদা করে নামায পড়ব, রৌদ্রে কষ্ট ভোগ করে ছায়া থাকা সত্ত্বেও তা গ্রহণ না করে রোযা করব, বছরের তিন শ’ পঁয়ষট্টি দিনই রোযা রাখব। একত্রিত হয়ে সমস্বরে জামাআতী যিকর করব, যেখানে বিধেয় নয়। সেখানে একত্রে হাত তুলে জামাআতী দুআ করব, জামাআতবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে সমস্বরে দরূদ পড়ব ইত্যাদি তবে সে বিদআতী। অযুর সময় অতিরিক্ত বিদআত যেমন, কোন ব্যক্তির নিকট গরম পানি মজুদ আছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও কঠিন শীতের সময় অতি শীতল পানি দ্বারা অযু করা উত্তম মনে করে এবং ঐ পানি দ্বারা অযু করে আত্মাকে কষ্ট দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির আশা করে।

সুতরাং নামায, রোযা, যিকর প্রভৃতি শরীয়ত-সম্মত (ফরয) ইবাদত যা পালন করতে বান্দা আদিষ্ট হয়েছে, যা আদায় করতে তাকে অনুপ্রাণিত করা হয়েছে এবং তার বিনিময়ে মহাপুণ্যলাভের প্রতিশ্রুতিও দান করা হয়েছে। কিন্তু তার সহিত পালনের অতিরিক্ত মনগড়া পদ্ধতি ও প্রণালী সম্পর্কে কোন নির্দেশ তাকে দেওয়া হয়নি। তাই যেমনভাবে তাকে তা পালন করতে বলা হয়েছিল, ঠিক তেমনিভাবে তা তার করা উচিত ছিল। তা না করে স্বকপোলকল্পিত পদ্ধতিতে শরীয়তের উপর সংশোধন ও সংযোজন সাধন করার অপচেষ্টা ও দুঃসাহসিকতা করে। অথচ আল্লাহ বলেন, “আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম।”

পূর্বেই আলোচিত হয়েছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) একদল মানুষকে একত্রে সমস্বরে যিকর করতে দেখে বললেন, 'অবশ্যই তোমরা সীমালংঘন করে (যিকর করার) এক অভিনব পন্থা (বিদআত) রচনা করেছ অথবা মুহাম্মাদ (সা.)-এর সহচরবৃন্দ অপেক্ষা তোমরা নিজেদেরকে ইমে অধিক বড় মনে করছ। নিশ্চয় তোমরা এ ভ্রষ্টতার পাপের জন্য ধৃত হবে।

অনুরূপভাবে নবী-দিবসের বিদআত; অবশ্যই নবী (সা.)-এর প্রতি ভক্তি, প্রেম ও ভালবাসা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ওয়াজেব। “কোন মানুষই ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার আপন প্রাণ, সন্তান, পিতা এবং সকল মানুষ (বরং সকল সৃষ্টি) অপেক্ষা তাঁকে অধিক ভালবেসেছে।” (বুখারী)। কিন্তু সংসারে প্রত্যেক ভালোবাসা বা প্রেমের এক এক রকম ভিন্ন-ভিন্ন ভাব ও ধরন আছে। বিশ্বপ্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা.)-কে ভালবাসার ধরন হল, তাঁর আনুগত্য করা, তাঁর কথার অনুসরণ করা, তাঁর আদর্শে আদর্শবান হওয়া, তাঁর প্রত্যেক নির্দেশ পালন করা, প্রত্যেক নিষিদ্ধ কর্ম হতে বিরত থাকা, তিনি বিদআত (বা দ্বীনে অভিনব পথ রচনা) করতে নিষেধ করেছেন তা মান্য করা।

যদি এসব কেউ করতে পারে তবে সত্যই সে নবীর যথার্থ প্রেমিক বা ভক্ত। নচেৎ যে কেবল মুখে প্রেমের দাবী করে, লোক সমাজে প্রচার করে এবং প্রিয়তমের মন ও আদেশের প্রতিকূলে চলে সে এক কপট ভন্ড প্রেমিক ব্যতীত কিছু নয়। হ্যাঁ, নবী দিবস এক অভিনব রচিত নবীপ্রেম-বিকাশ পদ্ধতি। যার কোন নির্দেশ অথবা ইঙ্গিত তিনি দেননি। তাঁর একান্ত ভক্ত সাহাবাবৃন্দও ঐ দিবস পালন করে তাঁর প্রগাঢ় ভক্তি ও প্রেমের প্রমাণ ও পরিচয় দিয়ে যাননি। অথচ তাঁরা এই ধর্মধ্বজীদের চেয়ে কত শতগুণ অধিক তাঁর কথার অনুসরণ করতেন, তাঁকে তা’যীম ও ভক্তি করতেন। তাঁদের পরে কোন আহলে সুন্নাহর ইমামও এ পদ্ধতি প্রসঙ্গে কোন ঈঙ্গিত দেননি। এই প্রেম প্রণালী বা ভক্তি প্রকাশের ফ্যাশন’ রাফেযাহ, ফাতেমী বা উবাইদী ফিকাহর লোকেরা আবিষ্কার করে মুসলিম সমাজে প্রচলিত করেছে। যে ফাতেমীদের প্রকৃত বংশধারা সুলামিয়ার একজন ইয়াহুদী হতে শুরু হয়।

এই নবী দিবস প্রসঙ্গে শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রঃ) বলেন, খ্রীষ্টানদের অনুকরণে অথবা নবী প্লঃ-এর মহব্বতে (অতিরঞ্জন করে) কিছু লোক তাঁর জন্ম দিনটিকে নবী দিবস’রূপে ঈদের মত পালন করে থাকে। অথচ তাঁর জন্মদিন। প্রসঙ্গে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতান্তর রয়েছে। (অনেকে বলেছেন ১২ রবিউল আওয়াল। কিন্তু সর্বসম্মত অভিমতে তাঁর মৃত্যু দিন ঐ তারীখেই। তাই ঐ দিনে জন্মের খুশী মানালে তাঁর মৃত্যুর দিনে খুশী করা হয়। আবার মৃত্যুর শোক পালন করলে জন্মের শুভ আনন্দের পরিপন্থী হয়।) পরন্তু ঐ দিনটিকে অথবা নবীদিবস নামক কোন ঈদ সফলদের কেউই পালন করে যাননি। (তারা তো কেবল দুটি ঈদই জানতেন।)

অথচ যদি ঐ ঈদ পালনে কোন মঙ্গল থাকত, তাহলে আমাদের চেয়ে তাঁরাই তার অধিক হকদার হতেন। (আমাদের পূর্বে তাঁরাই বেশীরূপে তা পালন। করে যেতেন। কারণ আমাদের চেয়ে তাঁদের হৃদয়ে নবী (সা.)-এর মহব্বত ও তা'যীম বহুগুণ অধিক ছিল এবং আমাদের অপেক্ষা তাঁরাই অধিক কল্যাণকর ও পুণ্যময় কর্মের খোঁজ ও আশা রাখতেন। পক্ষান্তরে প্রকৃত মহব্বত ও প্রেমের পরিচয় তাঁর আনুগত্য ও অনুসরণে, তাঁর আদেশ পালনে, তাঁর সুন্নাহ ও আদর্শ দ্বারা জীবন ও চরিত্র গঠনে, তাঁর আনীত শরীয়ত প্রচারে এবং এর উপরে নিজ হস্ত, রসনা ও অন্তর দ্বারা জিহাদে প্রকাশ পায়। মহব্বত প্রকাশের এই পদ্ধতিই প্রাথমিক অগ্রানুসারী মুহাজেরীন ও আনসারদের। এবং যাঁরা শুদ্ধচিত্তে তাঁদের অনুগমন করেছেন তাঁদের।” (ইতিফউস সিরাহিল মুস্তাকীম)

বিদআতকে ভিন্ন আরো তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়ঃ (১) ই’তিক্বাদিয়্যাহ (বিশ্বাসগত) (২) ক্বাওলিয়্যাহ (কথাগত) এবং (৩) আমালিয়্যাহ (কর্মগত)।

১। বিশ্বাসগত বিদআত তখন হয়, যখন কোন কিছুর উপর কারো বিশ্বাস রসূল ও সাহাবার বিশ্বাসের পরিপন্থী হয়। যেমন খাওয়ারেজদের বিশ্বাস; তারা মনে করে যে, কোন মুসলিম কাবীরাহ গুনাহ (চুরি, চুগলী, হত্যা ইত্যাদি) করলে কাফের হয়ে

চিরস্থায়ী জাহান্নামবাসী হবে। তাই তারা অনেক সাহাবাদেরকেও কাফের মনে করে থাকে। অথচ আহলে সুন্নাহর মতে সে ব্যক্তি কাফের হয় না। পাপের পরিমাণ মত দোযখে শাস্তি ভোগ করে ঈমানের কারণে একদিন জান্নাতবাসী হবে। অথবা আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাকে মাফ করে জান্নাতে দেবেন। যেমন অনেকের বিশ্বাস; আল্লাহ সব জায়গায় বিদ্যমান। অথচ আল্লাহ আছেন সপ্তাকাশের উপর আরশে। তাঁর ইলম আছে সর্বত্রে।

তদনুরূপ এই বিশ্বাস যে, মানুষের কর্ম মানুষেরই সৃষ্টি, আল্লাহর সৃষ্টি নয়, অথবা কর্মে মানুষের কোন এখতিয়ার নেই প্রভৃতি।

২। কথাগত বিদআত তখন হয়, যখন এমন কথা বলা ও প্রচার করা হয় যা কিতাব ও সুন্নাহর বিপরীত। যেমন বিভিন্ন ফির্কা; রাফেযাহ, খাওয়ারেজ, জাহমিয়াহ, মু’তাযেলাহ, আশআরিয়্যাহ প্রভূতিদের কথা। যারা কিতাব ও সুন্নাহর মৌলনীতি বর্জন করে সাহাবায়ে কেরামগণের সমঝ ও তরীকা প্রত্যাখ্যান করে উভয়ের অপব্যাখ্যা ও ভুল অর্থ মনগড়াভাবে করে থাকে এবং আহলে সুন্নাহ তথা দুনিয়ায় কিয়ামত পর্যন্ত হক ও ন্যায়ের সপক্ষে জিহাদে তায়েফাহ মানসুরাহ (সাহায্য প্রাপ্ত গোষ্ঠী) এবং আখেরাতে ‘ফিকাহ নাজিয়াহ’ (মুক্তিপ্রাপ্ত সম্প্রদায়)-এর বিরোধিতা করে থাকে। যারা সাহাবাদেরকে গালি দেয়, কেউ কাবীরাহ গোনাহ করলে তাকে কাফের ও চির-জাহান্নামী বলে, আল্লাহ মহিমান্বিত গুণাবলীর তাবীল ও অপব্যাখ্যা অথবা অস্বীকার করে ইত্যাদি।

৩। কর্মগত বিদআত তখন হয়, যখন এমন কোন কাজ দ্বীন ভেবে বা করতে হয় ভেবে করা হয়, যা শরীয়তে বর্ণিত কাজ ও তার পদ্ধতির প্রতিকুল হয়। যেমন। শবেবরাত, শবে মিরাজ, মুহারাম, চালশে প্রভৃতি পালন করা।

বিদআতের প্রতিক্রিয়ার দিকে লক্ষ্য করে তাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়

(ক) বিদআত মুকাফফিরাহ

(খ) গায়র মুকাফফিরাহ।

(ক) মুকাফফিরাহ বিদআত তখন বলা হয়, যখন ঐ বিদআত করার ফলে বিদআতী কাফের বলে গণ্য হয়। যেমন, সৰ্ববাদিসম্মত কোন দ্বীনী অনুশাসনকে অস্বীকার করা, কোন ফরয কর্মকে অস্বীকার করা, অথবা যা ফরয নয় তাকে ফরয। করে নেওয়া, সৰ্ব্বসম্মত কোন হালাল বস্তুকে হারাম অথবা তার বিপরীত করা। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল অথবা কিতাব প্রসঙ্গে এমন বিশ্বাস রাখা, যা হতে আল্লাহ, তাঁর রসুল এবং কিতাব পবিত্র।

যেমন; আল্লাহর পুত্র আছে ভাবা, রসুলকে আল্লাহ মনে করা (আহমাদকে আহাদ মনে করা) কুরআনকে মখলুক (সৃষ্ট) মনে করা ইত্যাদি। তদনুরূপ কবর বা আস্তানা পূজা করা এবং জান্নাত, জাহান্নাম, তকদীর, ফিরিশ্মা জিন প্রভৃতি অস্বীকার ও অবিশ্বাস করা ইত্যাদি।

(খ) গায়র মুকাফফিরাহ বিদআত তখন বলা হয়, যখন বিদআত করে বিদআতী। তার কারণে কাফের হয়ে যায় না, তবে পাপী নিশ্চয় হয়। যেমন, নির্দিষ্ট সময় হতে নামায দেরী করে পড়া, ঈদের নামাযের পুর্বে খুতবাহ পড়া, বিভিন্ন পর্ব ও ঈদের উদ্ভাবন করা ইত্যাদি।

প্রকাশ যে, বিদআতে হাসানাহ (যে বিদআত কোন উপকার ও মঙ্গলের খাতিরে রচনা করা হয়) বলে কোন বিদআত নেই; যা করলে পাপ না হয়ে পুণ্যলাভ হয়, অথবা তা মুবাহ। বরং দ্বীনে প্রত্যেক নবীন বিরচনই বিদআত এবং প্রত্যেক বিদআতই সাইয়েআহ ও ভ্রষ্টতা। বলা বাহুল্য, বিদআতকে বিদআতে হাসানাহ ও বিদআতে সাইয়েআহ এই দুই ভাগে ভাগ করাও এক বিদআত। রসুল (সা.) জুমআর খুতবায় বলতেন, “নিশ্চয়ই সর্বশ্রেষ্ঠ কথা আল্লাহর বাণী এবং সর্বোত্তম হেদায়াত (পথনির্দেশ) মুহাম্মাদ (সা.)-এর হেদায়াত। সর্বনিকৃষ্ট বিষয় যাবতীয় অভিনব রচিত বিষয়। প্রত্যেক অভিনব রচিত বিষয়ই বিদআত এবং প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা।” অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, “আর প্রত্যেক ভ্রষ্টতাই জাহান্নামে।”

সতর্কতার বিষয় যে, হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি ইসলামে কোন উত্তম সুন্নাহ (প্রথা বা রীতি রচনা বা) চালু করে, তার জন্য রয়েছে ঐ সুন্নাহর সওয়াব এবং তার সওয়াবও যে ঐ সুন্নাহর উপর আমল করে------।”

এর অর্থ এ নয় যে, যদি কেউ শরীয়তে কোন উত্তম কর্ম বা প্রথা নতুনভাবে প্রচলন। করে তবে সে ঐ সওয়াবের অধিকারী হবে। বরং এর অর্থ এই যে, যে ব্যক্তি কোন বিধিসম্মত উত্তম কাজ প্রারম্ভ করে এবং তার দেখাদেখি অন্যান্য লোক সেই কাজ করে, অথবা কোন সুন্নাহর সংস্কার করে; অর্থাৎ, যা আসলে সুন্নাহ ও দ্বীনী রীতি, কিন্তু তার উপর কেউ আমল না করার ফলে তা মৃতপ্রায় থাকে এবং কেউ এসে তা পুনর্জীবিত করে, অথবা এমন পদ্ধতি ও পথ আবিষ্কার করে যা আসলে ধর্ম বা সুন্নাহ

হলেও তা ধর্মের অসীলা বা মাধ্যম; যেমন, মাদ্রাসা নির্মাণ, বই-পুস্তক ছাপা ইত্যাদি, তাহলে তার জন্য ঐ সওয়াবও রয়েছে।

সুতরাং এ ধরনের কর্ম বা সুন্নাহ মানুষ নিজের তরফ থেকে বিরচন করে না; বরং তার সংস্কার বা বৈধ উন্নয়ন সাধন করে যা উত্তম কাজ। আর তা বিদআত নয়।

বিদআতী বা মুবতাদে’ (যে বিদআত বা দ্বীনে কোন মান্য ও পালনীয় রীতি রচনা করে তা মানে ও পালন করে, তার প্রতি মানুষকে আহবান ও আকর্ষণ করে এবং তার উপর সম্প্রীতি ও বৈরিতা গড়ে সে) ফাসেকও হতে পারে আবার কাফেরও। যেমন এ কথা বিদআতের প্রকারভেদে ইঙ্গিত করা হয়েছে। কিন্তু তার পুর্বে এখানে। একটি সতর্কতার বিষয় এই যে, নির্দিষ্টভাবে কোন মুসলিমকে চট করে চোখ বন্ধ করে ফাসেক, বিদআতী, কাফের ইত্যাদি বলে আখ্যায়ন করা উচিত নয়। কারণ, এ বিষয়ে শরীয়তে কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা ও সতর্কতা বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন, প্রিয়। নবী প্লঃ বলেন, “যে (মুসলিম) ব্যক্তি নিজের (মুসলিম) ভাইকে বলে, 'এ কাফের। অথচ সে প্রকৃতপক্ষে কাফের নয়, তবে সে কথা তার নিজের উপর বর্তায়।” (অর্থাৎ, সে নিজেকে কাফের করে।) (মুসলিম)

এর জন্য শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রঃ) বলেন, কোন মুসলিমকে কাফের বলার অধিকার কারো নেই, যদিও সে ভুল-ভ্রান্তি করে থাকে। যতক্ষণ পর্যন্ত

তার উপর হুজ্জত কায়েম (দলীলাদি দ্বারা কুফরী প্রমাণ) করা হয়েছে এবং স্পষ্ট সুপথ ও মত তার জন্য ব্যক্ত করা হয়েছে। যার ইসলাম নিশ্চয়তার সহিত প্রমাণিত হয়েছে তার ইসলাম’ কেবল কারো সন্দেহ নিরসনের পরই অপসৃত হতে পারে। (ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ ১২/৪৬৬) কিন্তু যে ব্যক্তি সরল পথ এবং সত্য দ্বীন হতে বহির্ভূত হবে, সে শরীয়ত পরিপন্থী বহু কর্মে লিপ্ত হবে, তার অবস্থা হবে ভিন্ন। যেরূপ অবৈধ কর্মে সে লিপ্ত হবে ঠিক অনুরূপ মন্তব্য তার উপর করা হবে, স্পষ্ট কুফরী অথবা মুনাফিকী। এ বিষয়ে তিনি আরো বলেন, যে ব্যক্তি হেদায়াত ও দ্বীনে হক থেকে অপসৃত হয়, যে আবেদ, আলেম, ফকীহ, যাহেদ, দার্শনিক অথবা চিকিৎসক সেই সত্য হতে বাহির হয়ে যায়, যে সত্যের সহিত রসূল (সা.) প্রেরিত হয়েছেন, আল্লাহ তাঁর রসূল প্রমুখাৎ যে সব বিষয়ের সংবাদ প্রদান করেছেন তার সবটাকে যে বিশ্বাস ও স্বীকার করে না, আল্লাহ। ও তদীয় রসূল যা হারাম করেছেন তা হারাম বলে মানে না, যেমন, যে বিশ্বাস রাখে। যে, তার পীর তাকে রুজী দান করে, সাহায্য করে, বিপদে রক্ষা করে, অথবা সে তার । পীর বা গুরুর ইবাদত (সিজদা, ধ্যান, ন্যর ইত্যাদি) করে অথবা তাকে আল্লাহর

নবী (সা.)-এর উপর সম্যক প্রাধান্য দান করে অথবা সামান্য কোন বিষয়ে তার উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করে অথবা মনে করে যে, সে এবং তার পীর রসূলের আনুগত্যের মুখাপেক্ষী নয় (তাদের জন্য শরীয়তের অনুসরণ জরুরী নয়), তবে ঐ ধরনের সকল লোকই কাফের -যদি তাদের ঐ বিশ্বাস ও কর্ম প্রকাশ করে তাহলে। নচেৎ গোপন করলে তারা মুনাফেক।।

অতঃপর শাইখুল ইসলাম ঐ শ্রেণীর মানুষের আধিক্য হওয়ার কারণ দর্শিয়ে। বলেন, ইলম ও ঈমানের প্রতি আহবানকারী আলেমের সংখ্যা নগণ্য হওয়ার ফলে ওদের সংখ্যা অধিক বেড়ে গেছে। এ ছাড়া অন্য প্রকার বিদআতী যাদের উপর কোন মন্তব্য করার পুর্বে খুব বিচার-বিবেচনা ও দৃঢ় নিশ্চয়তার প্রয়োজন আছে। কারণ কুফর আকীদায় (বিশ্বাসে) হয় এবং আমলেও। আর উভয়ের জন্য শরীয়তে ভিন্ন ভিন্ন অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছে। আবার যে কথা’ কিতাব-সুন্নাহ ও ইজমা’ (সর্বসম্মতি)তে কুফর তার জন্য সাধারণভাবে বলা যায় যে, যে ব্যক্তি ঐ কথা বলবে সে কাফের হয়ে যাবে; যেমন। শরয়ী দলীলে তার সাক্ষ্য বহন করে। (কিন্তু নির্দিষ্টভাবে কোন ব্যক্তি বিশেষকে তা বলা যাবে না।)

ঈমান আল্লাহ ও তদীয় রসুলের নিকট হতে প্রাপ্ত ও লব্ধ বস্তু। অতএব তা কার আছে এবং কার নেই, সে মন্তব্য কেউ কারো খোয়ল-খুশী বা ধারণা। ও অনুমান দিয়ে করতে পারে না। তাই নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তি প্রসঙ্গে বলা যাবে না যে, অমুক ব্যক্তি ঐ কথা বলে তাই সে কাফের। কারণ কাউকে কাফের সাবস্ত করার জন্য কয়েকটি শর্ত পূরণ হতে হবে; যেমন, ঐ ব্যক্তি ঐ কথা বলা অবৈধ বা কুফরী তা জানবে, তা সজ্ঞানে বলবে, ঐ ‘কথা’ অবৈধ হওয়ার বিষয়ে তার নিকট দলীল পেশকৃত হবে। সে তা মনের ভুলে বলবে না, ঐ কথা অবৈধ হওয়ার ব্যাপারে তার মনে কোন সংশয় থাকবে না ইত্যাদি। (ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ ৩/৩৫৪)

উপযুক্ত শর্তাবলী যদি ঐ ব্যক্তির মাঝে পাওয়া যায়, তবেই তাকে কাফের বলা যাবে, তার পূর্বে নয়। সুতরাং যদি কেউ বলে যে, সুদ বা মদ হালাল, তবে সে কাফের হবে। কিন্তু কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে তা বলা যাবে না। কারণ, এমনও হতে পারে যে, ঐ ব্যক্তি কারো নিকট হতে কোন দিন শুনেনি যে, তা হারাম। অথবা শুনেছে; কিন্তু মস্তিষ্কবিকৃতির ফলে সে বলছে। অথবা সে মনে করে, তা হারাম হওয়ার ব্যাপারে কোন শক্ত দলীল নেই। অথবা সে সব কিছু জানত, কিন্তু অসাবধানতায় বা মনের ভুলে তা হালাল বলে ফেলেছে অথবা ঐ বিষয়ে তার কোন সন্দেহ ও সংশয় আছে তাই হালাল মনে করেছে; যেমন অনেকে ব্যাংকের সুদকে হালাল মনে করে। কারণ ঐ সুদ কুরআনে নিষিদ্ধ জাহেলিয়াতের সুদ বটে কিনা, সে বিষয়ে তার সন্দেহ আছে, অথবা ভাবে যে, কেবল সেই সুদ হারাম যাতে গরীব শোষণ করা হয়; কিন্তু যে।

সুদ সরকারের নিকট হতে নেওয়া হয় যাতে কোন শোষণ হয় না (?) তা অবৈধ নয়। অথবা সন্দেহ করে যে, এটা বড় ব্যবসায় অংশগ্রহণ করে তার লভ্যাংশ উপভোগ করা অথবা দারূল কুফরে সুদ হালাল ইত্যাদি। এগুলির একটি পাওয়া গেলে ঐ ব্যক্তিকে কাফের বলা যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তার এসব অযথা ও অযৌক্তিক সন্দেহ নিরসন হয়েছে এবং তা হারাম হওয়ার ব্যাপারে অকাট্য দলীল তার সামনে। পেশ করা হয়েছে। অতএব যদি কেউ অজান্তে সুদ খায়, তবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন, হারাম জানা সত্ত্বেও যদি অবহেলা করে খায় তবে সে মহাপাপী (ফাসেক), কোন সন্দেহের কারণে যদি তা হালাল মনে করে, তবে সেও মহাপাপী এবং যে ব্যক্তি নিঃসন্দেহে হারাম জেনেও হালাল ভেবে খায়, তবে সে সব কিছু জানার পর যেহেতু আল্লাহর হারামকৃত বস্তুকে অস্বীকার করে হালাল মনে করে, তাই সে কাফের হয়ে যায়।

তদনুরূপ কবর পূজা (কবরকে সিজদা করা, তওয়াফ করা, সেখানে মানত মানা, ন্যর মানা, নযর-নিয়ায পেশ করা ইত্যাদি) শির্ক ও কুফর। কিন্তু অমুক মিয়া কবর পুজে, তাই সে কাফের -তা চট করে বলতে পারি না। কারণ, হয় তো সে জানে না যে, কোন কবরের (মৃত মানুষের) নিকট সুখ-সমৃদ্ধি, সন্তান বা রুজী চাইলে, বা সিজদা করলে শির্ক বা কুফর হয় অথবা তা জানে, কিন্তু ঐ বিষয়ে তার কাছে কোন। সন্দেহ আছে। যদি এসব কিছু তার নিকট হতে দূর করে দেওয়া হয় এবং তা সত্ত্বেও সে হক ও ন্যায়ের প্রতি প্রত্যাবর্তন না করে, তবে তাকে কাফের বা মুশরিক বলা। হবে, তার পূর্বে নয়।

মোট কথা, যে বিদআতী সবকিছু জেনে-শুনে, নিঃসন্দেহে কোন এমন কাজ করে। (যেমন, কোন সৰ্ববাদিতসম্মত ওয়াজেব বা হারাম অস্বীকার করা, বা কোন সর্বসম্মত হারামকে হালাল বা তার বিপরীত মনে করা অথবা আল্লাহ, তাঁর রসুল ও কুরআন বিষয়ে এমন ধারণা রাখা, যা শরীয়ত খন্ডন করে ইত্যাদি) যাতে কাফের হতে হয়, তবে সে কাফের।

আর যদি এমন কাজ করে যাতে কেউ কাফের হয়ে যায় না; বরং পাপী হয় (যেমনঃ সমস্বরে যিকর করা, কিয়াম করা, নামাযের পর জামাআতী দুআ করা প্রভৃতি) তাহলে সে শরয়ী আইনে অবাধ্য হওয়ার ফলে কেবল পাপীই হবে; কাফের হবে না। এদের জন্য হেদায়াত প্রাপ্তির দুআ করা হবে।

মানুষ মাত্রেই ভুল করে থাকে। যাঁর সুন্দর আচরণ মন মুগ্ধ করে, যাঁর চলার পথ ও প্রণালী আহলে সুন্নাহর, যিনি শরয়ী যথার্থ জ্ঞানের অধিকারী, যাঁর ইমের সাথে ন্যায়পরায়ণতা ও সত্যনিষ্ঠতা প্রসিদ্ধ, যিনি অজ্ঞতা, খেয়াল-খুশী ও প্রবৃত্তির অনুসরণ হতে বহু দুরে, যাঁর কথা ও মতের দলীল কুরআন ও সুন্নাহ তাঁর কোন কোন বিষয়ে দু-একটি ইজতেহাদী ভুল ধর্তব্য নয়। সে ত্রুটি তাঁকে তাঁর মর্যাদা হতে চত করে না এবং তাঁর কোন মানহানিও ঘটায় না। তিনি যদি জীবিত থাকেন তবে তাঁর সেই ত্রুটির উপর শিষ্টতা, ভদ্রতা ও শ্রদ্ধার সহিত তাঁকে অবহিত ও সতর্ক করা উচিত। আপোসের সহৃদ বৈঠকে, শ্রদ্ধাপূর্ণ লেখন বা দুরালাপের মাধ্যমে সৎ ও মঙ্গলে পারস্পরিক সহায়তা করা ওয়াজেব।

যেহেতু দ্বীন তার অনুসারীদের পারস্পরিক হিতোপদেশ ও হিতৈষিতার মাধ্যমে পূর্ণ হয়। তাই প্রত্যেক অভিজ্ঞ আলেমের উচিত, তাঁর মান ও মর্যাদা খেয়াল রেখে, দলীলের সহিত, কোন প্রকার রুঢ়তা বা আত্মগর্ব প্রকাশ না করে, প্রজ্ঞা, যুক্তি ও সদুপদেশের সাথে ভুল ধরিয়ে দেবার চেষ্টা করা। যেমন তাঁরও উচিত, সেই ভুল স্বীকার করে সঠিক ও সত্য গ্রহণ করতে কোন লজ্জা, দ্বিধা ও সংকোচ না করা। এইরূপে ঐক্য, সৌহার্দ, সম্প্রীতি ও আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্ব বজায় থাকবে এবং সকল মুসলিম ভাই ভাই হয়ে উঠবে - ইনশাআল্লাহ।

কিন্তু ত্রুটি করে যদি আলেম ইহলোক ত্যাগ করে থাকেন, তবে তাঁর জন্য ক্ষমা প্রার্থনার দুআ করতে হবে। কারণ, আম্বিয়াগণ ব্যতীত অন্য কেউই নিষ্পাপ, নিষ্কলুষ ও ত্রুটিমুক্ত নয়। তবে তাঁর সেই ভুল সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সতর্ক ও সাবধান অবশ্যই করতে হবে; যাতে কেউ তাঁর সেই ভুলের অনুসরণ না করে বসে। তবে ঐ। ভুল ও ত্রুটি বর্ণনায় যেন ঐ বিগত আলেমের প্রতি কোন অসমীচীন মন্তব্য অথবা তুচ্ছ ধারণা ও মানহানির ইচ্ছা না থাকে।

প্রত্যেক আলেমের উচিত, আহলে সুন্নার আকীদাহ ও বিশ্বাসকে চিরঞ্জীব রাখা, অপরের ইজতিহাদী (খেয়াল-খুশী বা প্রবৃত্তির বশবর্তী নয়, বিদ্বেষ বা ঈর্ষাজনিত নয় এমন) কথা, রায় বা মন্তব্যকে সমীহ ও শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখা এবং ঐ ধরনের বক্তাকে চোখ বুজে কাফের, বিদআতী ইত্যাদি না বলা। বরং মার্জিত আপোস সমঝােতায়। আল্লাহর দ্বীনকে এক হয়ে ধারণ করা সকলের মহান কর্তব্য।

মহান আল্লাহ বলেন,

وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِي آيَاتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّىٰ يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ ۚ وَإِمَّا يُنسِيَنَّكَ الشَّيْطَانُ فَلَا تَقْعُدْ بَعْدَ الذِّكْرَىٰ مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ

অর্থাৎ, (হে নবী) তুমি যখন দেখ যে, তারা আমার নিদর্শন সম্বন্ধে নিরর্থক আলোচনায় মগ্ন হয়, তখন তুমি দুরে সরে পড়বে, যে পর্যন্ত না তারা অন্য প্রসঙ্গে আলোচনায় প্রবৃত্তি হয় এবং শয়তান যদি তোমাকে ভ্রমে ফেলে, তাহলে স্মরণ হওয়ার পরে অত্যাচারী সম্প্রদায়ের সাথে বসবে না। (সুরা আনআম ৬৮ আয়াত)

তিনি অন্যত্র বলেন,

وَقَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَابِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَيُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّىٰ يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ ۚ إِنَّكُمْ إِذًا مِّثْلُهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ جَامِعُ الْمُنَافِقِينَ وَالْكَافِرِينَ فِي جَهَنَّمَ جَمِيعًا

অর্থাৎ, আর তিনি কিতাবে তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন যে যখন তোমরা শুনবে আল্লাহর কোন আয়াত প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে এবং তা নিয়ে বিদ্রুপ করা হচ্ছে, তখন যে পর্যন্ত তারা অন্য প্রসঙ্গে লিপ্ত না হয় তোমরা তাদের সহিত বসো না, নচেৎ তোমরাও তাদের মত হয়ে যাবে। কপট ও অবিশ্বাসীদের সকলকেই আল্লাহ জাহান্নামে একত্রিত করবেন। (সুরা নিসা ১৪০ আয়াত)

প্রবৃত্তির অনুসারী এবং বিদআতীদের সহিত উঠা-বসা করতে তাবেঈনদের বহু উলামা সাবধান ও নিষেধ করেছেন এবং তা এই আশঙ্কায় যে, হয়তো বা ঐ বিদআতী তার সঙ্গীর উপরেও বিদআতের প্রভাব বিস্তার করে ফেলবে। যেহেতু আল্লাহর রসুল ঐ সৎ ও সাধু সাথী নির্বাচন করতে এবং অসৎ ও মন্দ সঙ্গী হতে দূরে থাকতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি ঐ দুই সঙ্গীর উপমা বর্ণনা করে বলেন, “সৎ সঙ্গী সুগন্ধি ব্যবসায়ীর ন্যায়; যার নিকট হতে সুগন্ধ ক্রয় করা যায় অথবা সে পার্শ্বে উপবেশনকারীকে সুগন্ধ (আতর) উপহার দিয়ে থাকে অথবা তার নিকট হতে (এমনিই) সুন্দর সুবাস পাওয়া যায়। আর অসৎ সাথী হাপরে ফুৎকারকারী (কামারের) মত। যার পার্শ্বে বসলে অঙ্গারের ছিটায় কাপড় পুড়ে যায় অথবা তার নিকট হতে বিকট দুর্গন্ধ (এবং দমবন্ধকারী ধুয়া) নাকে লাগে।” (বুখারী, মুসলিম)

অনুরূপভাবে বিদআতীর সাহচর্য গ্রহণ করলে হয়তো বা সে তার বিদআতকে সুন্দররূপে সুশোভিত করে দ্বীন বলে হৃদয়ে গেঁথে ফেলবে অথবা তার শরীয়ত পরিপন্থী কথা শুনে বা কাজ দেখে চিত্ত দগ্ধ ও ব্যধিগ্রস্ত হবে।।

যার জন্য ইমাম হাসান বসরী (রঃ) বলেন, কোন খেয়াল-খুশীর অনুসারী ব্যক্তি (বিদআতীর) নিকট বসো না, কারণ, সে এমন কিছু তোমার অন্তরে ভরে দেবে যার অনুসরণ করে তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে অথবা তুমি তার প্রতিবাদ ও বিরোধিতা করবে যাতে তোমার হৃদয় ব্যাধিগ্রস্ত হবে। আবু কিলাবাহ বলেন, প্রবৃত্তির অনুসরণকারী (বিদআতী)দের সাথে বসো না এবং তাদের সঙ্গে কোন বিষয়ে ঝগড়া বা বিতর্ক করো না, কারণ আমার আশঙ্কা হয় যে, তারা তোমাদেরকে তাদের ভ্রষ্টতায় ডুবিয়ে ফেলবে এবং যা তোমরা জানতে তাতে বিভ্রম ও সংশয় সৃষ্টি করবে।

তিনি আরো বলেন, খেয়াল-খুশীর অনুগতরা ভ্রান্ত ও ভ্রষ্ট এবং দোযখই তাদের প্রত্যাবর্তনস্থল বলে মনে করি। কোন ব্যক্তি বিদআত রচনা করলেই সে তরবারি হালাল করে নেয়।

আইয়ুব সাখতিয়ানী বলেন, বিদআতী যত বেশী ইজতিহাদ করবে, তত বেশী আল্লাহ থেকে দুর হতে থাকবে। এবং তিনি বিদআতীদেরকে খাওয়ারেজ বলতেন। (ইতিসাম ১/৮৩)

ইয়াহয়্যা বিন কাষীর বলেন, যদি বিদআতীকে কোন রাস্তায় দেখ, তাহলে তুমি। ভিন্ন রাস্তা ধরে চলো, (এবং তার সহিত সাক্ষাৎও করো না।)

এতে বুঝা যায় যে, অন্যায়ের সহিত কোন আপোস নেই। পাপকে ঘৃণা কর। পাপীকে নয় বলে তাদের সহিত কোন বন্ধুত্ব নেই। যে যা করছে করুক, নামে মুসলিম হলেই হবে বলে তার কুফর ও বিদআতের প্রতি ভক্ষেপ না করে অনবধানতায় ঐক্য সৃষ্টি করার কথা যুক্তিযুক্ত নয়। তবে পূর্বোক্ত উক্তিগুলির এ অর্থ নয় যে, তাদের নিকট বসে তাদেরকে সত্যের দিকে আহবান করা হবে না বা সঠিক পথনির্দেশ করে তাদের ভুল সংশোধন করা হবে না অথবা তাদের বিভ্রান্তি ও সন্দেহ নিরসন করার উদ্দেশ্যে কোন ঠান্ডা বিতর্ক করা হবে না। বরং তাদের সহিত প্রজ্ঞা, যুক্তি, দলীল ও সদুপদেশের সাথে আলোচনা করতে হবে এবং তাদেরকে সত্য পথের সন্ধান দিয়ে ভ্রান্ত পথ হতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। কারণ তা ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজে বাধা দান করার অন্তর্ভুক্ত; যা দাওয়াতি কাজের বিভিন্ন মৌলনীতি ও ভিত্তির অন্যতম। যার আদেশ আল্লাহ তাঁর কিতাবে ঘোষণা করেছেন; তিনি বলেন,

وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ ۚ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ

অর্থাৎ, তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা (লোককে) কল্যাণের দিকে আহবান করবে এবং সৎকাজের নির্দেশ দিবে ও মন্দ কার্যে বাধা দান করবে। আর এরাই হবে সফলকাম। (সুরা আলে-ইমরান ১০৪ আয়াত)

সাধারণভাবে সমগ্র মুসলিম জাতির উদ্দেশ্যে প্রিয় নবী ঐ বলেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ কোন অসৎ কাজ দেখলে তা স্বহস্ত দ্বারা অপসারিত করবে, যদি তাতে সক্ষম না হয়, তবে রসনা দ্বারা, তাতেও যদি সক্ষম না হয়, তবে তার অন্তর দ্বারা (ঘৃণা করবে) এবং এটা সবচেয়ে দুর্বলতম ঈমান (এর পরিচায়ক)।” (মুসলিম ৪৯নং, আহমাদ, আসহাবে সুনান)।

সুতরাং বিদআতীদের বিদআতে প্রতিবাদ করা, তাদের সহিত প্রতর্কে তাদেরকে পাস্ত করা এবং তাদেরকে সৎপথের নির্দেশনা দেওয়া যাদের ক্ষমতায় আছে তারা অবশ্যই তাদের মজলিসে বসে সে উদ্দেশ্য সাধন করবে। কিন্তু যাদের সে ক্ষমতা নেই, দিতে গিয়ে হারিয়ে যাওয়ার যাদের ভয় আছে এবং তাদের বিভ্রান্তিমূলক ও সুশোভিত কথায় প্রভাবান্বিত হওয়ার যাদের আশঙ্কা আছে, তারা যেন তাদের বৈঠকে না বসে।

সলফে সালেহীনগণ বিদআত ও বিদআতীদের প্রতি অতি কঠোর ছিলেন। বিদআতকে প্রতিহত এবং বিদআতীর প্রতিবাদ করতে তাঁরা কখনো দ্বিধা করতেন না। আব্দুল্লাহ ও বলেন, এক সম্প্রদায় আসবে যারা এই সুন্নাহসমূহকে প্রত্যাখ্যান। করবে, অতএব যদি তোমরা তাদেরকে উপেক্ষা কর (কোন বাধা না দাও), তবে। তারা মহাসঙ্কট উপস্থিত করবে।”

উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) বলেন, 'রায়-ওয়ালাদের থেকে দুরে থেকো। কারণ তারা সুন্নাহর দুশমন। হাদীস মুখস্থ করতে অপারগ হয়ে নিজেদের রায় (জ্ঞান) দ্বারা কথা বলে (দ্বীনী বিধান দেয়)। ফলে তারা নিজেরা ভ্রষ্ট হয় এবং অপরকেও ভ্রষ্ট করে।

ইয়াহয়্যা বিন ইয়া’মুর আব্দুল্লাহ বিন উমার (রাঃ)-কে বললেন, 'আমাদের দিকে কিছু লোক বের হয়েছে, যারা কুরআন (বেশী বেশী) পাঠ করে এবং ইলম অনুসন্ধান করে বেড়ায়। অতঃপর তাদের আরো অন্যান্য অবস্থা বর্ণনা করে বললেন, তারা ধারণা করে যে, তকদীর বলে কিছু নেই এবং সমস্ত বিষয় সদ্য উদ্ভূত, (অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার পূর্বে কিছুরই তকদীর (ভাগ্য) নির্ধারিত করেননি এবং কিছু ঘটার পুর্বে তিনি তার অবস্থা সম্পর্কে অবহিত নন।) একথা শুনে ইবনে উমর (রাঃ), তাঁকে বললেন, 'ওদের সহিত তোমার সাক্ষাৎ হলে ওদেরকে খবর দাও যে, ওদের সহিত আমার কোন সম্পর্ক নেই এবং আমার সহিত ওদের কোন সম্পর্ক নেই।

আব্দুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) যার হলফ করেন, তাঁর শপথ! যদি ওদের কারো উহুদ (পর্বত) সমপরিমাণ সোনা থাকে এবং তা দান করে তবে আল্লাহ ততক্ষণ পর্যন্ত তা কবুল করবেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তকদীরের উপর ঈমান এনেছে। ' (মুসলিম)।

কাতাদাহ বলেন, কেউ যখন কোন বিদআত রচনা করে, তখন (আহলে সুন্নাহর) উচিত, তা সকলের সম্মুখে উল্লেখ করা যাতে সকলে তা হতে বাঁচতে পারে।

সলফে সালেহীনগণ এইভাবে বিদআতের খন্ডন, প্রতিবাদ ও প্রতিকার করেছেন। তাঁরা কেবল ভ্রষ্ট বিদআতীদের মত ও পথের খন্ডন করে এবং তাদের বাতিল ও বিভ্রান্তি বর্ণনা করেই তাদের মুকাবিলা করেননি; বরং সকল মানুষকে তাদের মজলিসে বসতে সতর্ক করেছেন, তাদের সহিত কথা বলতে সাবধান করেছেন। তাদের প্রতি স্মিত মুখ হতে, তাদেরকে সালাম করতে এবং তাদের সালামের উত্তর দিতেও বাধা দিয়েছেন। বরং অনেকে তাদের সহিত একত্রে এক পরিবেশে বাস করতেও অপছন্দ ও হুশিয়ার করেছেন।

যেমন আবুল জাওযা বলেন, কোন প্রবৃত্তি-পূজারী (বিদআতী) আমার প্রতিবেশী হওয়া অপেক্ষা শুকর ও বানর দল প্রতিবেশী হওয়া আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়। কতক সলফ এমন গ্রাম বা শহর বসবাস করা পরিত্যাগ করেছেন যেখানে বিদআত প্রসার ও দৃঢ়তা লাভ করেছে এবং প্রতিবেশী এমন গ্রাম বা শহরে বাস করেছেন যা পূর্বাপেক্ষা অধিক সুন্নাহর অনুসারী। যেমন, হুরাইম বিন আব্দুল্লাহ, হানযালাহ এবং আদী বিন হাতেম প্রভৃতি সলফগণ (বিদআতের শহর) কুফা ত্যাগ করে কুকীসিয়ায় গিয়ে বসবাস করেছেন এবং বলেছেন, 'আমরা এমন শহরে বসবাস করব না, যে শহরে উসমান (রাঃ)-কে গালি দেওয়া হয়।”

হাসান বলেন, 'ইচ্ছার পূজারীদের নিকট বসো না, তাদের সহিত কোন তর্ক করো না এবং তাদের নিকট হতে কিছু শ্রবণও করো না।

মামার বলেন, ইবনে ত্বাউস বসে ছিলেন। ইতিমধ্যে মু'তাযিলার একটি লোক তাঁর নিকট এসে অনেক কিছু বলতে লাগল। তা দেখে ইবনে ত্বউস আঙ্গুল দ্বারা। দুই কান বন্ধ করে নিলেন এবং তাঁর ছেলেকেও বললেন, “বেটা! কানে শক্ত করে। আঙ্গুল রেখে নাও। ওর কোন কথাই শুনো না।”

ফুযাইল বিন ইয়া বলেন, 'কারো নিকটে কোন ব্যক্তি (ইম তলবের ব্যাপারে) পরামর্শ নিতে এলে সে যদি কোন বিদআতী (আলেমের) ঠিকানা বলে দেয় তবে নিশ্চয় সে ইসলামকে ধােকা দেয়। বিদআতীদের নিকট যাতায়াত করা হতে সাবধান হও। কারণ, তারা হক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। সত্যপক্ষে যে ব্যক্তি কোন বিদআতীকে তার পথপ্রদর্শক, মুরশিদ ওস্তাদ মেনে। নেয়, তার সর্বনাশ অবশ্যম্ভাবী। কারণ,

কাক যদি কারো পথের হয় রাহবার

চলাইবে সেই পথে যে পথে ভাগাড়।

তিনি আরো বলেন, যে ব্যক্তি কোন বিদআতীর তা'যীম ও সম্মান করল, সে যেন ইসলামকে ধ্বংস করার উপর সাহায্য করল, যে ব্যক্তি কোন বিদআতীর সাক্ষাতে হাসল, সে যেন মুহাম্মাদ (সা.)-এর অবতীর্ণ শরীয়তকে গুরুত্বহীন মনে করল, যে ব্যক্তি তার স্নেহ-পুত্তলী (কন্যার বন্ধন) বিবাহ কোন বিদআতীর সাথে (বা ঘরে) দিল, সে যেন তার আত্মীয়তার (পিতা-কন্যার) বন্ধন ছেদন করল এবং যে ব্যক্তি কোন বিদআতীর জানাযায় অংশ গ্রহণ করল, সে আল্লাহর গযবে থাকে; যতক্ষণ না সে ফিরে আসে। (শারহুসসুন্নাহ)।

ইব্রাহিম বিন মাইসারাহ বলেন, 'যে ব্যক্তি কোন বিদআতীকে তা'যীম বা শ্রদ্ধা করে সে অবশ্যই ইসলাম ধ্বংসে সহায়তা করে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَوْمَ تَبْيَضُّ وُجُوهٌ وَتَسْوَدُّ وُجُوهٌ

অর্থাৎ, সেদিন কতকগুলো মুখমন্ডল সাদা (উত্তঞ্জল) হবে এবং কতকগুলো মুখমন্ডল হবে কালো। (সুরা আলে ইমরান ১০৬ আয়াত)

ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, সেদিন যাদের মুখমন্ডল উজ্জল হবে তাঁরা আহলে সুন্নাহ অল-জামাআহ (হাদীস ও সাহাবার অনুসারীদল) এবং উলামা। আর যাদের মুখমন্ডল কালো হবে তারা হল, বিদআতী ও ভ্রষ্টের দল। (তফসীর ইবনে কাষীর)

সুফইয়ান সাওরী (রঃ) বলেন, 'ইবলীসের নিকট পাপের চেয়ে বিদআতই অধিকতর পছন্দনীয়। কারণ, পাপ হতে তওবার আশা থাকে, কিন্তু বিদআত হতে তওবার কোন সম্ভাবনা থাকে না। (অর্থাৎ, তওবার তওফীকই লাভ হয় না। কারণ, বিদআতী তার বিদআতকে দ্বীন মনে করে থাকে।) ইবনে আবী আসেম প্রভৃতি বর্ণনা করেন যে, নবী ঐ বলেছেন, “শয়তান বলে। আমি মানুষকে বিভিন্ন পাপ দ্বারা সর্বনাশগ্রস্ত করেছি, কিন্তু ওরা আমাকে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ ও ইস্তিগফার দ্বারা ধ্বংস করেছে। অতঃপর যখন আমি তা লক্ষ্য করলাম, তখন ওদের মধ্যে কুপ্রবৃত্তি প্রক্ষিপ্ত করলাম। সুতরাং ওরা পাপ করবে; কিন্তু আর ইস্তিগফার করবে না। কারণ, তারা ধারণা করবে যে, তারা ভালো কাজই করছে।”

ইমাম ইবনুল কাইয়েম (রঃ) বলেন, সাধারণ পাপীর ক্ষতি তার নিজের উপরই বর্তায়, কিন্তু বিদআতীদের ক্ষতি ও অনিষ্ট শ্রেণী (বহু মানুষের) উপর ব্যাপক হয়। বিদআতীর ফিৎনা হয় মূল দ্বীনে অথচ সাধারণ পাপীর ফিৎনা তার প্রবৃত্তিতে হয়।। বিদআতী সহজ ও সরল পথের উপর বসে মানুষকে সে পথে চলা হতে বিরত করে, কিন্তু পাপী সেরূপ করে না। বিদআতী আল্লাহর গুণগ্রাম ও তার পরিপূর্ণতায় আঘাত হানে, অথচ পাপী তা করে না। বিদআতী রসুল প্লঃ কর্তৃক আনীত শরীয়তের পরিপন্থী হয়, কিন্তু পাপী তা হয় না। বিদআতী মানুষকে আখেরাতের সঠিক পথ হতে বিচ্যুত করে, কিন্তু পাপী নিজেই স্বীয় পাপের কারণে মৃদুগামী হয়। (আলজাওয়াবুল কাফী

সুতরাং বিদআতীরা কেবল গোনাহর জন্য গোনাহগারই হয় না বরং তারও অধিক কিছু হয় (যেমন পূর্বে আলোচিত হয়েছে। কারণ, গোনাহগার যখন গোনাহ করে, তখন তাতে অপরের জন্য শরীয়ত-বিধায়ীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে কোন আদর্শ বা চিরপালনীয় রীতির রূপ দান করে না; যেমন বিদআতী করে থাকে। অতএব তার দুষ্কৃতি সাধারণ দুষ্কৃতির চেয়ে বহু গুণে বড়। আল্লাহ পাক বলেন,

أَمْ لَهُمْ شُرَكَاءُ شَرَعُوا لَهُم مِّنَ الدِّينِ مَا لَمْ يَأْذَن بِهِ اللَّهُ ۚ وَلَوْلَا كَلِمَةُ الْفَصْلِ لَقُضِيَ بَيْنَهُمْ ۗ وَإِنَّ الظَّالِمِينَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ

অর্থাৎ, ওদের কি এমন কতকগুলি অংশীদার আছে যারা ওদের জন্য বিধান। দিয়েছে এমন ধর্মের, যার অনুমতি আল্লাহ লংঘনকারীদের জন্য মর্মন্তুদ শান্তি রয়েছে। (সুরা শূরা ২১ আয়াত)

আবু তালেব বলেন, “আমি আব্দুল্লাহকে সেই ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম, যে। (কুরআন সম্বন্ধে) কিছু মন্তব্য করতে বিরত থাকে এবং বলে বলছি না যে, কুরআন মখলুক (সৃষ্টি) নয়। এমন ব্যক্তির সাথে যদি রাস্তায় আমার সাক্ষাৎ হয় এবং সে আমাকে সালাম দেয়, তবে আমি তার উত্তর দেব কি? তিনি বললেন, 'তার সালামের উত্তর দিও না এবং তার সহিত কথাও বলো না। তুমি তাকে সালাম দিলে (বা সালামের উত্তর দিলে) লোক তাকে চিনবে কি করে? আর সেই বা জানবে কি করে যে, তুমি তাকে মন্দ জানছ? অতএব যদি তুমি তাকে সালাম না দাও তাহলে অপমান স্পষ্ট হয়, জানা যায়, তুমি তাকে মন্দ জেনেছ এবং লোকেও তাকে (বিদআতী বলে) চিনতে পারে।” বিশেষ করে যে বিদআতে কুফর হয় সেই বিদআতের বিদআতীদের সহিত সলফ ও তার উলামাদের এই পদক্ষেপ ও ভূমিকা ছিল এবং বর্তমানেও তাই হওয়া দরকার।

যেহেতু বিদআত রচনা করে বিদআতীরা প্রকৃত ইসলাম হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সেই বিদআত ত্যাগ না করা পর্যন্ত তাদের সহিত কোন প্রকার আপোস সম্ভব নয়। ইজতিহাদী আহকাম বা গৌণ বিষয়ে মতান্তরকে দুরে ফেলে আকীদাহ ও মৌলিক বিষয়ে একমত হয়ে একতা সম্ভব। (অবশ্য ইসলামের সকল নীতিই মৌলিক, তাতে গৌণ কিছু নেই।) হানাফী-শাফেয়ী, মালেকী-হাম্বলী প্রভৃতি ইজতিহাদী পৃথক পৃথক মযহাবের মাঝে ঐক্য সম্ভব; যদি সকলে সহীহ সুন্নাহর অনুসারী হয়। নির্দিষ্ট কোন মহাবের (সহীহ সুন্নাহর বিপরীত) তাকলীদ করা ওয়াজেব জ্ঞান যদি ত্যাগ করা হয় এবং কেবল আনুগত্য ও অনুসরণ তাঁর করা হয়, যাঁর সমস্ত সাহাবা, তাবেঈন এবং সকল ইমামগণ করেছেন।

আর সামান্য ইজতিহাদী বিষয়ের মতপার্থক্যকে এক ওজর ও অজুহাত বলে মানা যায়। যাতে সকলের নিকট হতে পরস্পর সহিষ্ণতার সহিত সম্প্রীতি ও আপোস সৃষ্টি করতে সাহায্য পাওয়া যায়; আর সেটাই ওয়াজেব।। কিন্তু যার মতান্তর মৌলিক বিষয়ে কেন্দ্রীভূত তার সহিত ন্যায়ের আপোস সম্ভব নয়। যেহেতু এ মতভেদ সামান্য নয়। এ পার্থক্য হক ও বাতিলের, ঈমান ও কুফরের, আর ঈমান ও কুফরের মাঝে আপোস আদৌ সম্ভব নয়। যারা হযরত

আবু বাকর, উমার, উষমান, আয়েশা প্রভৃতি সাহাবা (রাঃ)-কে গালি দেয় ও কাফের বলে, যারা বলে, এ কুরআন সে কুরআন নয়, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যের সামনে। সিজদাবনত হয়, যারা কবরের নিকট নিজেদের প্রয়োজন ভিক্ষা করে, যারা কাবীরাহ। গোনাহগারকে কাফের মনে করে, যারা তকদীরকে অবিশ্বাস করে, যারা আল্লাহর বিভিন্ন সিফাতকে অস্বীকার করে, যারা মারেফতীর দাবী করে মরমিয়া সেজে শরীয়ত ত্যাগ করে, যারা গায়বী খবর জানার দাবী করে, যারা বাউলিয়া হয়ে খানকার মধ্যে ইসলামকে সীমাবদ্ধ করে ইত্যাদি। এমন মযহাবধারীরা নিজেদের মযহাবে থেকে সালাফীদের সহিত (বাহ্যিক) আপোস করতে চাইলে অথবা কেউ সালিস করতে চাইলে তা সুদূর পরাহত এবং এক স্বপ্ন।

আন্তরিক ও বাহ্যিক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত করতে হলে তাদেরকে নিজেদের সুন্নাহ পরিপন্থী ঐ সালিস বা আপোসে রাজি হলে তাকে সালাফিয়াত বা সুন্নিয়াত ত্যাগ করতে হবে। কারণ, সলফ ও আহলে সুন্নাহর আকীদাহ, নোংরাকে নোংরা ও মন্দকে মন্দ জানা এবং তার কর্তার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা আর খাঁটি তওহীদবাদী হক-পন্থীদের সাথেই অন্তরঙ্গ সম্প্রীতি গড়া এবং তা ওয়াজেব। সুতরাং কোন সালাফী ঐ সালিস বা আপোসে সম্মত হলে এবং ঐ জাতীয় দলে শামিল হলে ওতে বাতিল থাকা সত্ত্বেও ওর প্রতি অন্তরঙ্গ সম্প্রীতি রাখবে এবং তা ছাড়া বিরোধী অন্যান্য সবকিছুর প্রতি (সুন্নাহ হলেও) বিদ্বেষ পোষণ করবে এবং ভাববে এটাই সঠিক ও বাকী বেঠিক। অনেক ক্ষেত্রে অন্যায়কে অন্যায় জানা সত্ত্বেও কোন স্বার্থে তার প্রতিবাদ করতে নীরব হবে। ফলে ঈমান ও কুফর তার নিকট একাকার হয়ে সালাফিয়াত বা সুন্নিয়াত চুরমার হয়ে যাবে। যেহেতু অন্যায়ের সাথে আপোস করে সালাফিয়াত থাকে না। কারণ, হক এক ও অদ্বিতীয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,

فَمَاذَا بَعْدَ الْحَقِّ إِلَّا الضَّلَالُ

অর্থাৎ, হক ও সত্য ত্যাগ করার পর বিভ্রান্তি ছাড়া আর কি? (সুরা ইউনুস ৩২ আয়াত) আর সে হকের পথ সরল। বাকি ডানে বামে সবই বাঁকা পথ। যাতে ভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতা ছাড়া কিছু নেই। যেমন সরল রেখার আয়াত ও হাদীসে পুর্বে আলোচনা করা হয়েছে।

অতএব বলাই বাহুল্য যে, একজন সালাফী বা আহলে সুন্নাহ কোন বিদআতীর দলে একাকার হতে পারে না। (অবশ্য কূটনীতির ক্ষেত্রে ভিন্ন কথা) আহলে সুন্নাহ ও সালাফী একতার ডাক দেয়, ইসলামী রাষ্ট্র রচনা করতে চায় এবং ঐক্য ও মিলনকে ওয়াজেবও মনে করে। তবে ন্যায় ও তাওহীদের উপর কিতাব ও সুন্নাহর উপর এবং জামাআত ও সাহাবাগণের সমঝের উপর। কিতাব ও সুন্নাহর ডাকে জামাআত ও সাহাবাগণের সমঝের আওয়াজ ভিন্ন অন্য কোন ঐক্যের প্রতি সালাফীরা আহবান করে না এবং মিথ্যা আহবানে সাড়া দেয় না। যেহেতু একতা কেবল কিতাব ও সুন্নাহর (শুদ্ধ ও সঠিক জ্ঞানের) প্লাটফর্মে সম্ভব। শির্ক ও বিদআতের ‘জগাখিচুড়ি’ ময়দানে সম্ভব নয়। কেউ যদি সলফ বা আহলে সুন্নাহর রীতি-নীতি অবলম্বন করে এবং শির্ক ও বিদআত বর্জন করে একতা প্রতিষ্ঠার জন্য বাতিলকে স্বীকৃতি দিয়ে। কোন সালাফী আপন (কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ তথা সাহাবার) নীতি ও বিশ্বাসের একটি হরফও ছাড়তে বিন্দুমাত্র রাজী নয়।

পক্ষান্তরে ঐ ধরনের আপোস ও ঐক্যের মানুষদেরকে ঐক্যবদ্ধ দেখলেও তাদের। আপোষের আন্তরিক ও মানসিক মিল থাকে না। ফলে ঐ মরিচীকাকে দুর হতে পানি মনে হলেও নিকটে বা বাস্তবে তা নয়। যে অট্টালিকা কাঁচা-পাকা-ভুয়া প্রভৃতি ইষ্টক দ্বারা নির্মিত, তা যে তিষ্ঠিতে পারে না অথবা অদুরেই সদ্যপাতী হয়, তা সকল স্থপতির জ্ঞান অবশ্যই আছে।

দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ১০ পর্যন্ত, সর্বমোট ৪৭ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে পাতা নাম্বারঃ 1 2 3 4 5 পরের পাতা »