গুনাহ মাফের উপায় গুনাহ মাফের আমলগুলোর স্তরবিন্যাস শাহাদাৎ হুসাইন খান ফয়সাল (রহ.)
[৫] এমন ‘আমল যা ব্যক্তির গুনাহগুলো সাধারণভাবে মাফ করিয়ে দেয় - ১০

৮৪. সূরা আল মুল্‌ক তিলাওয়াত করা :

কুরআনের যে কয়টি সূরার কিছু নির্দিষ্ট ফযীলত রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম সূরা হলো সূরা আল মুল্ক। এই সূরাটি গুনাহ মাফের অন্যতম উপায় হতে পারে। আবূ হুরায়রাহ্ থেকে বর্ণিত। নাবী (সা.) বলেছেন :

إِنَّ سُورَةً مِنْ الْقُرْآنِ ثَلَاثُونَ آيَةً شَفَعَتْ لِرَجُلٍ حَتّٰى غُفِرَ لَه وَهِيَ سُورَةُ تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ

‘‘ত্রিশ আয়াত বিশিষ্ট কুরআনের একটি সূরা পাঠের কারণে যদি তা কোন ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করে তাহলে তাকে মাফ করে দেয়া হয়। সেই সূরাটি হল ‘তাবা-রাকাল্লাযী বিইয়াদিহিল মুল্ক’ (সূরা আল মুল্ক)।’’[1]


৮৫. ক্রয়-বিক্রয় ও পাওনা আদায়ে উদার হওয়া :

মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ক্রয়-বিক্রয় ও পাওয়া আদায় করা অন্যতম কাজ। এসব ক্ষেত্রে অনেকেই কঠোরতা আরোপ করেন এবং কঠোর আচরণ করেন। সুযোগ থাকার পরও উদারতা দেখান না। অথচ এসব ক্ষেত্রে উদার হওয়া গুনাহ মাফের অন্যতম উপায়। জাবির থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

غَفَرَ اللهُ لِرَجُلٍ كَانَ قَبْلَكُمْ كَانَ سَهْلًا إِذَا بَاعَ سَهْلًا إِذَا اشْتَرٰى سَهْلًا إِذَا اقْتَضٰى

‘‘তোমাদের পূর্ববর্তী যুগের এক ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলা মাফ করে দিয়েছেন। সে বিক্রির ক্ষেত্রে ছিল উদার-সহজ, ক্রয়ের ক্ষেত্রে ছিল উদার, তাগাদার ক্ষেত্রেও ছিল উদার।’’[2]


৮৬. শহীদ হওয়া :

আল্লাহর রাস্তায় যারা মৃত্যুবরণ করেন তারাই মূলত শহীদ। ইসলামে শহীদের মর্যাদা অনেক উপরে। শহীদ হতে পারলে জীবনের গুনাহ মাফ পাওয়া যায়। আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর ইবনুল ‘আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন,

يُغْفَرُ لِلشَّهِيدِ كُلُّ ذَنْبٍ إِلَّا الدَّيْنَ

‘‘ঋণ ছাড়া শহীদের সকল গুনাহই মাফ করে দেয়া হবে।’’[3]

‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর ইবনুল ‘আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নাবী (সা.) বলেন,

الْقَتْلُ فِى سَبِيلِ اللهِ يُكَفِّرُ كُلَّ شَىْءٍ إِلَّا الدَّيْنَ

‘‘আল্লাহর রাস্তায় নিহত হওয়া ঋণ ছাড়া সকল গুনাহকে মাফ করিয়ে দেয়।’’[4]

আবূ ক্বতাদাহ্ রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি (একদা) তাদের মধ্যে দাঁড়ালেন এবং তাদের কাছে বর্ণনা করলেন যে,

أَنَّ الْجِهَادَ فِى سَبِيلِ اللهِ وَالإِيمَانَ بِاللهِ أَفْضَلُ الْأَعْمَالِ. فَقَامَ رَجُلٌ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ أَرَأَيْتَ إِنْ قُتِلْتُ فِى سَبِيلِ اللهِ تُكَفَّرُ عَنِّىْ خَطَايَاىَ فَقَالَ لَه رَسُولُ اللهِ ﷺ نَعَمْ إِنْ قُتِلْتَ فِى سَبِيلِ اللهِ وَأَنْتَ صَابِرٌ مُحْتَسِبٌ مُقْبِلٌ غَيْرُ مُدْبِرٍ. ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ كَيْفَ قُلْتَ. قَالَ أَرَأَيْتَ إِنْ قُتِلْتُ فِى سَبِيلِ اللهِ أَتُكَفَّرُ عَنِّىْ خَطَايَاىَ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ نَعَمْ وَأَنْتَ صَابِرٌ مُحْتَسِبٌ مُقْبِلٌ غَيْرُ مُدْبِرٍ إِلَّا الدَّيْنَ فَإِنَّ جِبْرِيلَ عَلَيْهِ السَّلَامُ قَالَ لِىْ ذٰلِكَ

‘‘আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান হচ্ছে সর্বোত্তম ‘আমল। তখন এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললো, আপনি কি মনে করেন যে, আমি যদি আল্লাহর রাস্তায় নিহত হই তা হলে আমার পাপসমূহ মোচন হয়ে যাবে? তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে বললেন : হ্যাঁ, যদি তুমি ধৈর্য্যশীল, সাওয়াবের আশায় সম্মুখবর্তী/অগ্রবর্তী হয়ে পৃষ্ঠপ্রদর্শন না করে (শক্রর মুখোমুখি অবস্থায় নিহত হও)। তারপর রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তুমি কী বললে! তখন সে ব্যক্তি (আবার) বললো, আপনি কি মনে করেন, আমি যদি আল্লাহর রাস্তায় নিহত হই তা হলে আমার সকল গুনাহসমূহের কাফফারাহ্ হয়ে যাবে? তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, হ্যাঁ তুমি যদি ধৈর্যধারণকারী, সাওয়াবের আশায় সম্মুখবর্তী/অগ্রবর্তী হয়ে পৃষ্ঠপ্রদর্শন না করে শক্রর মুখোমুখি অবস্থায় নিহত হও, তাহলে সকল গুনাহ মাফ হবে। কিন্তু ঋণের কথা আলাদা। কেননা, জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে একথা বলেছেন।’’[5]

আল মিক্বদাম ইবনু মা‘দীকারিব আল কিন্দী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন :

إِنَّ لِلشَّهِيدِ عِنْدَ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ سِتَّ خِصَالٍ أَنْ يُغْفَرَ لَه فِي أَوَّلِ دَفْعَةٍ مِنْ دَمِه

‘‘আল্লাহ তা‘আলার নিকট একজন শহীদের জন্য ছয়টি মর্যাদা রয়েছে : (তার মধ্যে প্রথমটি হলো) (শত্রুর আঘাতে) তার শরীর থেকে প্রথমবার রক্ত বের হওয়ার সাথে সাথে তাকে মাফ করে দেয়া হয়...।’’[6]

ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন :

فيه تنبيه على جميع حقوق الآدميين وأن الجهاد والشهادة وغيرهما من أعمال البر لا يكفر حقوق الآدميين وانما يكفر حقوق الله تعالى

‘‘এই হাদীসের মধ্যে সকল মানুষের হক সমূহ ও পাওনাগুলো লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি রয়েছে। আর জিহাদ, শাহাদাত বরণ বা যে কোন সৎ ‘আমলের মাধ্যমে মানুষের হক সমূহ ও পাওনাগুলো লঙ্ঘনের গুনাহ মোচন হয় না; এর মাধ্যমে শুধু আল্লাহর অধিকার লঙ্ঘনের গুনাহ মাফ করা হয়।’’[7]


৮৭. জানাযায় একশ মুসলিমের উপস্থিতি ও মৃতের জন্য দু‘আ করা :

কোন মুসলিম ব্যক্তি মারা গেলে তার গোসল-কাফন দিয়ে দাফনের আগে জানাযা পড়তে হয়। জানাযা সলাত যারা পড়ে তাদের এক কীরাত (এক উহুদ পাহাড় সমপরিমাণ) সাওয়াব হয়। কিন্তু যার জানাযাহ্ আদায় করা হচ্ছে তার লাভ কী? হ্যাঁ, কারও জানাযায় যদি একশজন মুসলিম উপস্থিত হয় তাহলে ঐ ব্যক্তিকে মাফ করে দেয়া হয়। আবূ হুরায়রাহ্ থেকে বর্ণিত। নাবী (সা.) বলেন,

مَنْ صَلّٰى عَلَيْهِ مِائَةٌ مِنْ الْمُسْلِمِينَ غُفِرَ لَه

‘‘একশত মুসলিম কারো জানাযার সলাত আদায় করলে তাকে ক্ষমা করা হয়।’’[8]

৮৮. নিজ বাড়ি থেকে মাসজিদে নাবাবীর উদ্দেশে হেঁটে যাওয়া :

বাড়ি থেকে সলাত আদায়ের উদ্দেশে মাসজিদে হেঁটে গেলে অনেক সাওয়াব হয় মর্মে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। বিশেষ করে মাসজিদে নবভীর ক্ষেত্রে এই সাওয়াবের বিশেষ ঘোষণা রয়েছে। আবূ হুরায়রাহ্ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী (সা.) বলেছেন :

مَنْ حِيْنَ يَخْرُجُ أَحَدُكُمْ مِنْ مَنْزِلِه إِلٰى مَسْجِدِىْ فَرِجْلٌ تُكْتَبُ لَه حَسَنَة وَرِجْلٌ تَحُطُّ عَنْهُ سَيِّئَةٌ حَتّٰى يَرْجِعْ

‘‘কেউ তার বাড়ি থেকে আমার মাসজিদে (মাসজিদে নাবাবী) আসার জন্য বের হয় তখন তার একটি কদমে একটি সাওয়াব লেখা হয় আরেকটি কদমে তার থেকে একটি গুনাহ মুছে ফেলা হয়, (এভাবে প্রতি কদমে চলতে থাকে) যতক্ষণ না সে (বাড়িতে) ফিরে আসে।’’[9]


৮৯. শারীরিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে কিছু দান করা :

শারীরিকভাবে আঘাত পেলে নিজের অতিরিক্ত সম্পদ থেকে কিছু দান করলে আল্লাহ এর বিনিময়ে তার দানের সমপরিমাণ গুনাহ মাফ করে দেন। শা‘বী (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, ‘উবাদাহ্ ইবনুস্ সামিত বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি,

مَامِنْ رَجُلٍ يُجْرَحُ فِي جَسَدِه جِرَاحَةً فَيَتَصَدَّقُ بِهَا إِلَّا كَفَّرَ اللهُ عَنْهُ مِثْلَ مَا تَصَدَّقَ بِه

‘‘কোন ব্যক্তি যখন শারীরিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং এর জন্য কিছু দান করে তাহলে তার দান পরিমাণ গুনাহ তার থেকে মুছে দেয়া হয়।’’[10]


৯০. চুল সাদা হওয়া :

বার্ধক্যজনিত কারণে কারও চুল বা দাড়ি যদি পেকে যায় (সাদা হয়) তাহলে প্রতিটি সাদা চুলের বিনিময়ে গুনাহ মাফ হয়। আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন :

لَا تنتفوا الشَّيْبَ فَإِنَّه” نُوْرٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَمَنْ شَابَّ شَيْبَةَ فِى الْإِسْلَامِ كُتِبَ لَه بِهَا حَسَنَةٌ وَحُطَّ عَنْهُ بِهَا خَطِيْئَةٌ وَرُفَعَ لَه بِهَا دَرَجَةٌ

‘‘তোমরা সাদা চুল উপড়ে ফেলো না কেননা সেগুলো ক্বিয়ামাতের দিন আলো হবে। আর যে মুসলিম ব্যক্তির চুল (বার্ধক্যজনিত কারণে) সাদা হয় তার প্রতিটি সাদা চুলের বিপরীতে ১টি করে সাওয়াব তার ‘আমলনামায় লেখা হয় এবং ১টি করে গুনাহ মাফ করা হয় এবং ১টি করে মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়।’’[11]

উপরে বর্ণিত গুনাহ মাফের উপায়গুলো একজন গুনাহগারের গুনাহ থেকে মুক্তির জন্য যথেষ্ট। তবে এর বাইরেও গুনাহ মাফের উপায় থাকতে পারে। রহমানুর রহীম আল্লাহ দয়া করে আমাদের গুনাহগুলো মাফ করার উপায় আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন। তাই আমরা শয়তানের কুমন্ত্রণায় কখনো গুনাহ করে ফেললেও হতাশ না হয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে মাফ পাওয়ার আশায় আশাবাদী হতে পারছি।

[1]. জামি‘ আত্ তিরমিযী : ৩৫৪০, হাদীসটি হাসান।

[2]. জামি‘ আত্ তিরমিযী : ১৩২০, হাদীসটি সহীহ।

[3]. সহীহ মুসলিম : ৪৯৯১।

[4]. সহীহ মুসলিম : ৪৯৯২।

[5]. সহীহ মুসলিম : ৪৯৮৮।

[6]. মুসনাদ আহমাদ : ১৭১৮২, হাদীসটির সনদ সহীহ।

[7]. শারহু সহীহ মুসলিম, খ. ১৩, পৃ. ২৯।

[8]. সুনান ইবনু মাজাহ : ১৪৮৮, হাদীসটি সহীহ; সহীহ ইবনু মাজাহ : ১২০৯।

[9]. সহীহ ইবনু হিব্বান : ১৬২২, হাদীসটির সদন সহীহ।

[10]. মুসনাদ আহমাদ : ২২৭০১, সনদ গ্রহণযোগ্য।

[11]. সহীহ ইবনু হিব্বান : ২৯৮৫, সনদ হাসান।