আর-রাহীকুল মাখতূম মক্কা বিজয়ের যুদ্ধ (غَزْوَةُ فَتْحِ مَكَّةَ) আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী (রহঃ)
যুদ্ধের কারণ (سَبَبُ الْغَزْوَةِ):

ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম মক্কা বিজয় সম্পর্কে লিখতে গিয়ে লিখেছেন যে, ‘এ ছিল সে মহাবিজয় যার মাধ্যমে আল্লাহ স্বীয় দ্বীনকে, স্বীয় রাসূল (ﷺ)-কে, স্বীয় সৈন্যসম্পদকে এবং স্বীয় আমানত রক্ষাকারী দলকে ইজ্জত দান করেছেন এবং স্বীয় শহর ও স্বীয় ঘরকে, বিশ্ববাসীর জন্য হেদায়াতের কেন্দ্রের মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। কাফির ও মুশরিকদের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করেছেন। এ বিজয়ে আসমানবাসীগণের অন্তরেও খুশীর ঢল নেমেছিল এবং তাদের মান-ইজ্জতের রশ্মিগুলো আকাশের চূড়ার কাঁধের উপর বিস্তৃতি লাভ করেছিল, যার ফলে মানুষ দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে লাগল এবং পৃথিবীর মুখমণ্ডল আলোর ঝলকে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠল।[1]

হুদায়বিয়াহর সন্ধি সংক্রান্ত আলোচনায় এটা উল্লেখিত হয়েছে যে, এ সন্ধি চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল, কেউ যদি মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে চায় তাহলে হতে পারে। পক্ষান্তরে কেউ যদি কুরাইশদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে চায় তাহলে তাকেও সে সুযোগ এবং স্বীকৃতি দিতে হবে। অধিকন্তু, এ রকম আশ্রিত কোন ব্যক্তি কিংবা গোত্র যদি আক্রান্ত হয়, তাহলে এ আক্রমণকে আশ্রয়দাতা পক্ষের উপর আক্রমণ বলে গণ্য করা হবে।

উল্লেখিত শর্তের আওতায় বনু খুযা’আহ গোত্র রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আশ্রিত হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে এবং বনু বাকর কুরায়শদের আশ্রিত হিসেবে। এভাবে আপাতঃদৃষ্টিতে উভয় গোত্র পারস্পরিক হিংসা বিদ্বেষ ও দ্বন্দ্ব সংঘাত থেকে নিস্কৃতি ও নিরাপত্তা লাভ করল। কিন্তু যেহেতু উল্লেখিত গোত্রদ্বয়ের মধ্যে জাহেলিয়াত যুগ হতে পারস্পরিক শত্রুতা বিবাদ চলে আসছিল সেহেতু চুক্তিবদ্ধ দুটি পক্ষের আশ্রিত হয়েও প্রতিহিংসার প্রশ্নটি তাদের মন থেকে অপসৃত হল না। সেজন্য যখন ইসলাম প্রভাব বিস্তার আরম্ভ করল ও হুদাইবিয়ার চুক্তি লিপিবদ্ধ হল তখন কুরাইশদের পক্ষ অবলম্বন করার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান পূর্বাপেক্ষা শক্তিশালী মনে করে বনু বাকর গোত্র বনু খুযাআ’হর উপর তাদের পুরাতন শত্রুতার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য মোক্ষম সুযোগ মনে করল। এ ধারণার প্রেক্ষিতে নাওফাল বিন মুয়াবিয়া দাইলী ৮ম হিজরীর শা‘বান মাসে বনু বকরের একটি বাহিনী নিয়ে রাতের আঁধারে বনু খুযা’আহকে আক্রমণ করে বসল। ঐ সময় বনু খুযা’আহ গোত্র ওয়াতীর নামক এক ঝর্ণার ধারে শিবির স্থাপন করে বসবাস করছিল এ আক্রমণে খুযা’আহ গোত্রের অনেক লোক নিহত হয়।

এ যুদ্ধে কুরাইশগণ অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে বনু বাকরকে সাহায্য করে। এমন কি রাতের অন্ধকারে কুরাইশ যোদ্ধাগণও এ যুদ্ধে বনু বকরের পক্ষে অংশ গ্রহণ করে। এ যুদ্ধে বনু খুযা’আহর বহুলোক নিহত হয় এবং তাদেরকে সেখান থেকে বিতাড়িত করে হারাম পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।

হারামে পৌঁছে বনু বাকর বলল, ‘হে নাওফাল! এখন তো আমরা হারামে প্রবেশ করেছি। তোমাদের উপাস্য! তোমাদের উপাস্য! এর উত্তরে নাওফাল একটি অত্যন্ত গুরুতর কথা বলল। সে বলল, ‘হে বনু বাকর! আজ কোন উপাস্য নেই, প্রতিশোধ গ্রহণ করে নাও। আমার জীবনের কসম! তোমরা হারামে চুক্তি করেছ, তা সত্ত্বেও কি হারামে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারবে না?’

এদিকে বনু খুযা’আহ গোত্র মক্কায় পৌঁছে বুদাইল বিন ওয়ারাক্বা খুযা’য়ী এবং নিজেদের মুক্ত করা দাস রাফি’র গৃহে আশ্রয় গ্রহণ করে। অতঃপর ‘আমর বিন সালিম খুযা’য়ী সেখান থেকে বাহির হয়ে তৎক্ষণাৎ মদীনা অভিমুখে যাত্রা করেন। মদীনা পৌঁছে তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খিদমতে উপস্থিত হলেন।

সে সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মসজিদে নাবাবীতে সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-এর মাঝে অবস্থান করছিলেন। ‘আমর বিন সালিম বললেন,

يا رب إني ناشدٌ محمدًا

 

حلف أبينا وأبيه إلا تلدا

كُنتَ لنا أبًا وكنا ولدًا

 

ثَمت أسلمنا ولم ننزع يدا

فانصر هداك الله نصرًا (عتدا)

-

وادع عباد الله يأتوا مددا

فيهم رسول الله قد تجرّدا

-

أبيض مثل الشمس ينمو صعدا

إن سيم خسفًا وجهه تربدا

-

في فيلق في البحر تجري مزبدًا

إن قريشًا لموافوك الموعدا

-

ونقضوا ميثاقك المؤكدا

وجعلوا لي في كداء رصدا

-

وزعموا أن لست تدعو إحدا

وهم أذلّ وأقلّ عددا

-

هم (وجدونا) بالحطيم هُجّدا

وقتلونا رُكّعًا وسُجّدًا

অর্থ : ‘হে প্রতিপালক! আমি মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর নিকটে তাঁর প্রতিজ্ঞা এবং তাঁর পিতার পুরাতন প্রতিজ্ঞার দোহাই উদ্ধৃত করছি।[2] আপনারা শিশু ছিলেন এবং আমরা ছিলাম জন্মদাতা।[3] অতঃপর আমরা অনুগত হয়েছি এবং কখনও হাত টেনে নেই নি। আল্লাহ আপনাদেরকে হিদায়াত করুন আপনি শক্তভাবে সাহায্য করুন এবং আল্লাহর বান্দাদের আহবান করুন। তাঁরা সাহায্যের জন্য আসবেন যেখানে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) থাকেন। অস্ত্রসজ্জিত এবং পূর্ণিমার চাঁদের মতো এবং গমের রঙের মতো সুন্দর। তাদের উপর যদি অত্যাচার করা হয় এবং তাদের অবমাননা করা হয় তবে মুখমণ্ডল বিবর্ণ করে উঠবে। আপনি এক যুদ্ধপ্রিয় সৈন্যদলের মধ্যে আগমন করবেন যা হবে ফেনায় পরিপূর্ণ সমুদ্রের ন্যায় তরঙ্গযুক্ত। কুরাইশগণ অবশ্যই আপনার প্রতিজ্ঞার বিরোধিতা করেছে এবং আপনার পরিপক্ক অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে। তারা আমার জন্য কোদা নামক স্থানে গোপনে অবস্থান গ্রহণ করেছে এবং মনে করেছে যে সাহায্যের জন্য আমি কাউকেও আহবান করব না। অথচ তারা বড়ই নিকৃষ্ট এবং সংখ্যায় অল্প। তারা রাত্রি বেলায় ওয়াতিরে আক্রমণ চালিয়েছে এবং আমাদেরকে রুকু ও সিজদাহহ অবস্থায় হত্যা করেছে। অর্থাৎ আমরা ছিলাম মুসলিম এবং আমাদেরকে তাঁরা হত্যা করেছে।’

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘হে ‘আমর বিন সালিম, তোমাকে সাহায্য করা হয়েছে। এর পর আকাশে মেঘমালার একটি অংশ দেখতে পাওয়া যায়। নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, ‘এ মেঘমালা বনু কা’বের সাহায্যের শুভ সংবাদে চমকাচ্ছে।

এর পর বুদাইল বিন ওয়ারাক্বা’ খুযা’য়ীর তত্ত্বাবধানে বনু খুযা’আহর একটি দল মদীনায় আগমন করেন এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে অবহিত করলেন কারা নিহত হয়েছেন এবং কিভাবে কুরাইশগণ বনু বাকরকে সাহায্য করেছে। এরপর এ লোক মক্কায় ফিরে গেলেন।

[1] যাদুল মা‘আদ ২য় খন্ড ১৬০ পৃঃ।

[2] এ দ্বারা সে প্রতি্জ্ঞার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যা বনু খোযায়া এবং বনু হাশেমের মধ্যে আব্দুল মুত্তালিবের সময় হতে চলে আসছিল।

[3] এ দ্বারা সে কথার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যা আবদে মানাফের মা অর্থাৎ কুসাইয়ের স্ত্রী হুবা খোযায়ার অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ জন্য পুরো পরিবারটাকে বনু খোযায়ার সন্তান বলা হয়েছে।