বড় শির্ক ও ছোট শির্ক বড় শির্কের প্রকারভেদ মোস্তাফিজুর রহমান বিন আব্দুল আজিজ আল-মাদানী
১৭. কবর পূজার শির্ক

কবর পূজার শির্ক বলতে কবরে শায়িত কোন ওলী বা বুযুর্গের জন্য যে কোন ধরনের ইবাদাত সম্পাদন বা ব্যয় করাকে বুঝানো হয়।

বর্তমান যুগের মাযারকে শির্কের কুঞ্জ বা আড্ডা বলা যেতে পারে। এমন কোন শির্ক নেই যা কোন না কোন মাযারকে কেন্দ্র করে অনুশীলিত হচ্ছে না। আহবান, ফরিয়াদ, আশ্রয়, আশা, রুকু, সিজদাহ্, বিনম্রভাবে কবরের সামনে দাঁড়ানো, তাওয়াফ, তাওবা, জবাই, মানত, আনুগত্য, ভয়, ভালোবাসা, তাওয়াক্কুল, সুপারিশ ও হিদায়াত কামনা করার মত বড় বড় শির্ক যে কোন কবরের পার্শ্বে নির্বিঘ্নে চর্চা করা হচ্ছে।

এ সবের মূলে সর্বদা একটি কারণই কাজ করে চলছে। আর তা হলো: ওলী-বুযুর্গদের ব্যাপারে অমূলক বাড়াবাড়ি। এ জাতীয় বাড়াবাড়ির কারণে যেমনিভাবে ধ্বংস হয়েছে নূহ (আ.) এর উম্মতরা তেমনিভাবে ধ্বংস হয়েছে ইহুদী ও খ্রিষ্টানরা।

এ কারণেই আল্লাহ্ তা’আলা ওদেরকে ধর্মীয় ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে পরিষ্কারভাবে নিষেধ করে দিয়েছেন।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

«قُلْ يَآ أَهْلَ الْكِتَابِ لاَ تَغْلُوْا فِيْ دِيْنِكُمْ غَيْرَ الْـحَقِّ وَلاَ تَتَّبِعُوْا أَهْوَاءَ قَوْمٍ قَدْ ضَلُّوْا مِنْ قَبْلُ وَأَضَلُّوْا كَثِيْرًا وَضَلُّوْا عَنْ سَوَآءِ السَّبِيْلِ»

‘‘আপনি বলে দিন: হে ইহুদী ও খ্রিষ্টানরা! তোমরা ধর্মীয় ব্যাপারে অমূলক সীমালংঘন করো না এবং ওসব লোকদের ভিত্তিহীন কল্পনার অনুসারী হয়ো না যারা অতীতে নিজেরাও পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং আরো বহু লোককে পথভ্রষ্ট করেছে। বস্ত্ততঃ তারা সরল পথ থেকে বহু দূরে সরে গিয়েছে’’। (মায়িদাহ্ : ৭৭)

আব্দুল্লাহ্ বিন্ আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি আল্লাহ্ তা’আলার বাণী:

«وَقَالُوْا لاَ تَذَرُنَّ آلِهَتَكُمْ وَلاَ تَذَرُنَّ وَدًّا وَّلاَ سُوَاعًا، وَلاَ يَغُوْثَ وَيَعُوْقَ وَنَسْرًا»

‘‘তারা বলেছে: তোমরা কখনো পরিত্যাগ করো না তোমাদের দেব-দেবীকে ; পরিত্যাগ করো না ওয়াদ্দ্, সুওয়া’, ইয়াগুস্, ইয়াঊক্ ও নাসর্কে’’। (নূহ্ : ২৩)

উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন:

صَارَتِ الْأَوْثَانُ الَّتِيْ كَانَتْ فِيْ قَوْمِ نُوْحٍ فِيْ الْعَرَبِ بَعْدُ، أَمَّا وَدٌّ: كَانَتْ لِكَلْبٍ بِدَوْمَةِ الْـجَنْدَلِ، وَأَمَّا سُوَاعٌ: كَانَتْ لِـهُذَيْلٍ، وَأَمَّا يَغُوْثُ: فَكَانَتْ لِـمُرَادٍ، ثُمَّ لِبَنِيْ غُطَيْفٍ بِالْـجَوْفِ عِنْدَ سَبَإٍ، وَأَمَّا يَعُوْقُ: فَكَانَتْ لِـهَمْدَانَ، وَأَمَّا نَسْرٌ: فَكَانَتْ لِـحِمْيَرَ لِآلِ ذِيْ الْكَلاَعِ أَسْمَاءُ رِجَالٍ صَالِحِيْنَ مِنْ قَوْمِ نُوْحٍ، فَلَمَّا هَلَكُوْا أَوْحَى الشَّيْطَانُ إِلَى قَوْمِهِمْ: أَنِ انْصِبُوْا إِلَى مَجَالِسِهِمْ الَّتِيْ كَانُوْا يَجْلِسُوْنَ أَنْصَابًا وَسَمُّوْهَا بِأَسْمَائِهِمْ، فَفَعَلُوْا، فَلَمْ تُعْبَدْ، حَتَّى إِذَا هَلَكَ أُوْلآئِكَ وَتَنَسَّخَ الْعِلْمُ عُبِدَتْ

‘‘যে মূর্তিগুলোর প্রচলন নূহ্ (আ.) এর সম্প্রদায়ে ছিলো তা এখন আরবদের নিকট। দাউমাতুল্ জান্দাল্ এলাকায় কাল্ব সম্প্রদায় ওয়াদ্দকে পূজা করতো। হুযাইল্ সম্প্রদায় সুওয়া’কে। মুরাদ্ সম্প্রদায় ইয়াগুস্কে। সাবাদের নিকটবর্তী এলাকা জাউফের ‘‘বানী গোত্বাইফ্’’ গোত্ররাও ইয়াগুসেরই পূজা করতো। হাম্দান সম্প্রদায় ইয়াউক্কে। জুল্ কালা’ এর বংশধর হিম্য়ার সম্প্রদায় নাস্রকে। এ সবগুলো ছিল নূহ্ (আ.) এর সম্প্রদায়ের ওলী-বুযুর্গদের নাম। যখন তারা মৃত্যুবরণ করলো তখন শয়তান তাদের সম্প্রদায়কে এ মর্মে বুদ্ধি দিলো যে, তোমরা ওদের বৈঠকখানায় ওদের প্রতিমূর্তি বানিয়ে সম্মানের সাথে বসিয়ে দাও। অতঃপর তারা তাই করলো। কিন্তু তখনো ওদের পূজা শুরু হয়নি। তবে এ প্রজন্ম যখন নিঃশেষ হয়ে গেলো এবং ধর্মীয় জ্ঞানের বিলুপ্তি ঘটলো তখনই এ প্রতিমূর্তিগুলোর পূজা শুরু হলো’’। (বুখারী, হাদীস ৪৯২০)

শুধু বুযুর্গদের ব্যাপারেই বাড়াবাড়ি নয় বরং রাসূল (সা.) নিজ ব্যাপারেও কোন বাড়াবাড়ি করতে উম্মতদেরকে সুদৃঢ় কন্ঠে নিষেধ করেছেন।

রাসূল (সা.) এর প্রতি সত্যিকার সম্মান:

’উমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি নবী (সা.) কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেন:

لاَ تُطْرُوْنِيْ كَمَا أَطْرَتِ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ ، فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ، فَقُوْلُوْا: عَبْدُ اللهِ وَرَسُوْلُهُ

‘‘তোমরা আমার প্রশংসা করতে গিয়ে কখনো বাড়াবাড়ি করো না যেমনিভাবে বাড়াবাড়ি করেছে খ্রিষ্টানরা ’ঈসা বিন্ মার্য়াম্ (আ.) এর ব্যাপারে। আমি কেবল আল্লাহ্ তা’আলার বান্দাহ্। সুতরাং তোমরা আমার সম্পর্কে বলবে: তিনি আল্লাহ্ তা’আলার বান্দাহ্ এবং তদীয় রাসূল’’। (বুখারী, হাদীস ৩৪৪৫, ৬৮৩০)

রাসূল (সা.) কে অমূলক বেশি সম্মান দিতে যাওয়ার কারণেই বহু শির্কের উদ্ভাবন হয়। এ অমূলক সম্মান হেতুই যে কোন সমস্যায় তাঁকে আহবান করা হয়, তাঁর নিকট ফরিয়াদ করা হয়, তাঁর জন্য মানত মানা হয়, তাঁর কবরের চতুষ্পার্শ্বে তাওয়াফ করা হয় এবং তিনি গায়েব জানেন ও তাঁর হাতে সর্বময় ক্ষমতা রয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়।

সত্যিকারার্থে এটি সম্মান নয় বরং তা কুফরী বৈ কি? মূলতঃ রাসূল (সা.) কে তিন ভাবে সম্মান করা যায়। তা নিম্নরূপ:

ক. অন্তর দিয়ে সম্মান করা। আর তা হচ্ছে মুহাম্মাদ (সা.) কে আল্লাহ্ তা’আলার বান্দাহ্ ও তদীয় রাসূল হিসেবে বিশ্বাস করার আওতাধীন এবং তা কেবল রাসূল (সা.) এর ভালোবাসাকে নিজ সত্তা, মাতা, পিতা, সন্তান ও সকল মানুষের ভালোবাসার উপর প্রাধান্য দেয়ার মাধ্যমেই সংঘটিত হয়ে থাকে।

তবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে, বাহ্যিক এমন দু’টি কর্ম রয়েছে যা কারোর অন্তরে সত্যিকারার্থে রাসূল (সা.) এর জন্য এ জাতীয় ভালোবাসা বিদ্যমান রয়েছে কি না তা প্রমাণ করে। কর্ম দু’টি নিম্নরূপ:

১. খাঁটি তাওহীদে বিশ্বাসী হওয়া। কারণ, রাসূল (সা.) সার্বিকভাবে শির্কের সকল পথ, মত ও মাধ্যম বন্ধ করে দিয়েছেন। সুতরাং রাসূল (সা.) এর সম্মান কখনো শির্কের মাধ্যমে হতে পারে না।

২. সর্ব ক্ষেত্রে তাঁরই অনুসরণ করা। অতএব সর্ব বিষয়ে তাঁর কথাই গ্রহণযোগ্য হবে। অন্য কারোর কথা নয়। যেমনিভাবে সকল ইবাদাত একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার জন্যই হতে হয় তেমনিভাবে সকল প্রকারের অনুসরণ একমাত্র তাঁরই রাসূলের জন্য হতে হবে।

খ. মুখ দিয়ে সম্মান করা। আর তা কোন রকম বাড়াবাড়ি ছাড়া রাসূল (সা.) এর যথোপযুক্ত প্রশংসা করার মাধ্যমেই সংঘটিত হয়ে থাকে।

গ. অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে সম্মান করা। আর তা রাসূল (সা.) এর সমূহ আনুগত্য বাস্তব কর্মে পরিণত করার মাধ্যমেই সংঘটিত হয়ে থাকে।

মোটকথা, রাসূল (সা.) এর কার্যত সম্মান তাঁর বিশুদ্ধ বাণীর প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস স্থাপন করা, তাঁর আদেশ-নিষেধ মান্য করা, তাঁরই জন্যে কাউকে ভালোবাসা বা কারোর সাথে শত্রুতা পোষণ করা, যে কোন ব্যাপারে তাঁরই ফায়সালাকে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেয়ার মাধ্যমেই সুসংঘটিত হয়ে থাকে।

অমূলক বাড়াবাড়ি শরীয়তের দৃষ্টিতে মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। চাই তা ইবাদাতের ক্ষেত্রেই হোক বা আক্বীদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে।

’আব্দুল্লাহ্ বিন্ ’আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

يَا أَيُّهَا النَّاسُ! إِيَّاكُمْ وَالْغُلُوَّ فِيْ الدِّيْنِ، فَإِنَّهُ أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ الْغُلُوُّ فِيْ الدِّيْنِ

‘‘হে মানুষ সকল! তোমরা ধর্মীয় ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না। কারণ, তোমাদের পূর্বেকার সকল উম্মাত শুধু এ কারণেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে’’। (ইবনু মাজাহ্, হাদীস ৩০৮৫ ইবনু হিববান্, হাদীস ১০১১)

’আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাস্’ঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

هَلَكَ الْـمُتَنَطِّعُوْنَ، هَلَكَ الْـمُتَنَطِّعُوْنَ، هَلَكَ الْـمُتَنَطِّعُوْنَ

‘‘সীমা লঙ্ঘনকারীরা ধ্বংস হোক! রাসূল (সা.) এ বাক্যটি তিন বার উচ্চারণ করেন’’। (মুসলিম, হাদীস ২৬৭০ আবু দাউদ, হাদীস ৪৬০৮)

ওলী-বুযুর্গদের ব্যাপারে বেশি বাড়াবাড়ি করার কারণেই প্রথমে তাদের কবরের উপর ঘর বা মসজিদ তৈরি করা হয়। অতঃপর সে কবরের জন্য সিজদা করা হয়, মানত করা হয় এমনকি উহাকে নামায ও দো’আ কবুল হওয়ার বিশেষ স্থান হিসেবে গণ্য করা হয়, তাতে শায়িত ব্যক্তির নামে কসম খাওয়া হয়, তার নিকট ফরিয়াদ করা হয়, তাকে আল্লাহ্ তা’আলার চাইতেও বেশি ভয় করা হয়, তার নিকট যে কোন সমস্যার সমাধান চাওয়া হয়, তার নিকট অতি বিনয়ের সঙ্গে এমনভাবে কান্নাকাটি করা হয় যা আল্লাহ্ তা’আলার ঘর মসজিদেও করা হয় না এমনকি পরিশেষে তা খাদিম নামের কিছু সংখ্যক মানুষের আড্ডা হয়ে যায়। ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) কবরের উপর মসজিদ নির্মাণকারীকে আল্লাহ্ তা’আলার সর্ব নিকৃষ্ট সৃষ্টি হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

’আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আন্হা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: উম্মে হাবীবাহ্ ও উম্মে সালামাহ্ (রা.) ইথিওপিয়ায় একটি গির্জা দেখেছিলো যাতে অনেকগুলো ছবি টাঙ্গানো রয়েছে। তারা তা রাসূল (সা.) কে জানালে তিনি বলেন:

إِنَّ أُوْلآئِكَ إِذَا كَانَ فِيْهِمُ الرَّجُلُ الصَّالِحُ فَمَاتَ، بَنَوْا عَلَى قَبْرِهِ مَسْجِدًا، وَصَوَّرُوْا فِيْهِ تِلْكَ الصُّوَرَ، فَأُوْلآئِكَ شِرَارُ الْـخَلْقِ عِنْدَ اللهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ

‘‘নিশ্চয়ই ওরা তাদের মধ্যে কোন ওলী-বুযুর্গ ইন্তিকাল করলে তারা ওর কবরের উপর মসজিদ বানিয়ে নেয় এবং এ জাতীয় ছবিসমূহ টাঙ্গিয়ে রাখে। ওরা কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা’আলার নিকট সর্ব নিকৃষ্ট সৃষ্টি হিসেবে সাব্যস্ত হবে’’। (বুখারী, হাদীস ৪২৭, ৪৩৪, ১৩৪১, ৩৮৭৩ মুসলিম, হাদীস ৫২৮ ইবনু খুযাইমাহ্, হাদীস ৭৯০)

আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাস্ঊদ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

إِنَّ مِنْ شِرَارِ النَّاسِ مَنْ تُدْرِكُهُمُ السَّاعَةُ وَهُمْ أَحْيَاءُ، وَالَّذِيْنَ يَتَّخِذُوْنَ الْقُبُوْرَ مَسَاجِدَ

‘‘সর্ব নিকৃষ্ট মানুষ ওরা যারা জীবিত থাকতেই কিয়ামত এসে গেলো এবং ওরা যারা কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করলো’’।

(ইবনু খুযাইমাহ্, হাদীস ৭৮৯ ইবনু হিববান/ইহ্সান, হাদীস ৬৮০৮ ত্বাবারানী/কাবীর, হাদীস ১০৪১৩ বায্যার/কাশ্ফুল আস্তার, হাদীস ৩৪২০)

নবী (সা.) কবরের উপর মসজিদ নির্মাণকারী ইহুদী ও খ্রিষ্টানদেরকে লা’নত (অভিশাপ) দিয়েছেন।

’আয়েশা ও ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত তাঁরা বলেন:

لَـمَّا نُزِلَ بِرَسُوْلِ اللهِ صلى الله عليه وسلم، طَفِقَ يَطْرَحُ خَمِيْصَةً عَلَى وَجْهِهِ، فَإِذَا اغْتَمَّ كَشَفَهَا عَنْ وَجْهِهِ، فَقَالَ وَهُوَ كَذَلِكَ: لَعْنَةُ اللهِ عَلَى الْيَهُوْدِ وَالنَّصَارَى، اِتَّخَذُوْا قُبُوْرَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ، يُحَذِّرُ مَا صَنَعُوْا

‘‘যখন রাসূল (সা.) মৃত্যু শয্যায় তখন তিনি চাদর দিয়ে নিজ মুখমন্ডল ঢেকে ফেললেন। অতঃপর যখন তাঁর শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচিছলো তখন তিনি চেহারা খুলে বললেন: ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের উপর আল্লাহ্ তা’আলার লা’নত ; তারা নবীদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিলো। এ কথা বলে নবী (সা.) নিজ উম্মতকে সে কাজ না করতে সতর্ক করে দিলেন’’। (বুখারী, হাদীস ৪৩৫, ৪৩৬, ৩৪৫৩, ৩৪৫৪, ৪৪৪৩, ৪৪৪৪ মুসলিম, হাদীস ৫৩১)

নবী (সা.) কবরের উপর মসজিদ বানানোর ব্যাপারে শুধু লা’নত ও নিন্দা করেই ক্ষান্ত হননি বরং তিনি তা করতে সুস্পষ্টভাবে নিষেধও করেছেন।

জুন্দাব্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি নবী (সা.) কে এ কথা বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেন:

أَلاَ وَإِنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ كَانُوْا يَتَّخِذُوْنَ قُبُوْرَ أَنْبِيَائِهِمْ وَصَالِحِيْهِمْ مَسَاجِدَ، أَلاَ فَلاَ تَتَّخِذُوْا الْقُبُوْرَ مَسَاجِدَ، إِنِّيْ أَنْهَاكُمْ عَنْ ذَلِكَ

‘‘তোমাদের পূর্বেকার লোকেরা নিজ নবী ও ওলী-বুযুর্গদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিতো। সাবধান! তোমরা কবরকে মসজিদ বানিওনা। আমি তোমাদেরকে এ ব্যাপারে কঠোরভাবে নিষেধ করছি’’। (মুসলিম, হাদীস ৫৩২)

শুধু কবরের উপর মসজিদ বানানোই নয় বরং রাসূল (সা.) কবরের উপর বসতে বা উহার দিকে ফিরে নামায পড়তেও নিষেধ করেছেন।

আবু মার্সাদ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

لاَ تَجْلِسُوْا عَلَى الْقُبُوْرِ وَلاَ تُصَلُّوْا إِلَيْهَا

‘‘তোমরা কবরের উপর বসো না এবং উহার দিকে ফিরে নামাযও পড়ো না’’। (মুসলিম, হাদীস ৯৭২ আবু দাউদ, হাদীস ৩২২৯ ইবনু খুযাইমাহ্, হাদীস ৭৯৩)

আনাস্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:

نَهَى النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم عَنِ الصَّلاَةِ بَيْنَ الْقُبُوْرِ

‘‘নবী (সা.) কবরস্থানে নামায পড়তে নিষেধ করেছেন’’।

(ইবনু হিববান, হাদীস ৩৪৫ আবু ইয়া’লা, হাদীস ২৮৮৮ বাযযার/কাশফুল আস্তার, হাদীস ৪৪১, ৪৪২)

রাসূল (সা.) শুধু কবরের উপর ঘর বানাতে নিষেধ করেই ক্ষান্ত হননি বরং তিনি কবরকে পাকা করতে এবং কবরের সাথে যে কোন বস্ত্ত সংযোজন করতেও কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।

জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:

نَهَى رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم أَنْ يُّجَصَّصَ الْقَبْرُ، وَأَنْ يُّقْعَدَ عَلَيْهِ، وَأَنْ يُّبْنَى عَلَيْهِ أَوْ يُزَادَ عَلَيْهِ

‘‘রাসূল (সা.) কবর পাকা করতে, উহার উপর বসতে, ঘর বানাতে এমনকি উহার সাথে কোন জিনিস সংযোজন করতেও নিষেধ করেছেন’’।

(মুসলিম, হাদীস ৯৭০ আবু দাউদ, হাদীস ৩২২৫, ৩২২৬ আব্দুর রায্যাক, হাদীস ৬৪৮৮ ইবনু হিববান/ইহসান, হাদীস ৩১৫৩, ৩১৫৫)

কবরের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা যাতে মানুষের অন্তরে গেঁথে না যায় এবং রাসূলে আক্রাম (সা.) এর কবর এলাকা যাতে মেলা বা ঈদগাহে রূপান্তরিত না হয় সে জন্য রাসূল (সা.) তাঁর কবরের নিকট গিয়ে তাঁকে সালাম করার আদেশ দেননি। বরং তিনি এর বিপরীতে তাঁর কবরের নিকট গিয়ে তাঁকে সালাম করার প্রতি নিজ উম্মতদেরকে অনুৎসাহিত করেছেন। সুতরাং যে কোন মুসলমান যে কোন স্থান হতে তাঁর নিকট সালাত ও সালাম পাঠাতে পারে। অতএব তাঁর কবরের নিকট গিয়ে তাঁকে সালাম দেয়ার মধ্যে কোন বিশেষত্ব নেই।

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

لاَ تَجْعَلُوْا بُيُوْتَكُمْ قُبُوْرًا، وَلاَ تَجْعَلُوْا قَبْرِيْ عِيْدًا، وَصَلُّوْا عَلَيَّ ؛ فَإِنَّ صَلاَتَكُمْ تَبْلُغُنِيْ حَيْثُ كُنْتُمْ

‘‘তোমরা নিজেদের ঘর গুলোকে কবর বানিও না। বরং তোমরা তাতে নফল নামায, কোর’আন তিলাওয়াত ও দো’আ ইত্যাদি করিও এবং আমার কবরকে মেলা বানিও না। তাতে বার বার নির্দিষ্ট সময়ে আসার অভ্যাস করো না। বরং তোমরা সর্বদা আমার উপর সালাত ও সালাম পাঠিও। কারণ, তোমাদের সালাত ও সালাম আমার নিকট অবশ্যই পৌঁছুবে। তোমরা যেখানেই থাকো না কেন’’। (আবু দাউদ, হাদীস ২০৪২ আহমাদ : ২/৩৬৭)

আউস্ বিন্ আউস্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

إِنَّ مِنْ أَفْضَلِ أَيَّامِكُمْ يَوْمَ الْـجُمُعَةِ ؛ فِيْهِ خُلِقَ آدَمُ، وَفِيْهِ قُبِضَ، وَفِيْهِ النَّفْخَةُ، وَفِيْهِ الصَّعْقَةُ، فَأَكْثِرُوْا عَلَيَّ مِنَ الصَّلاَةِ فِيْهِ ؛ فَإِنَّ صَلاَتَكُمْ مَعْرُوْضَةٌ عَلَيَّ، قَالُوْا: يَا رَسُوْلَ اللهِ! وَكَيْفَ تُعْرَضُ صَلاَتُنَا عَلَيْكَ وَقَدْ أَرِمْتَ؟! قَالَ: إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ حَرَّمَ عَلَى الْأَرْضِ أَجْسَادَ الْأَنْبِيَاءِ

‘‘সর্বোৎকৃষ্ট দিন জুমার দিন। এ দিন আদম (আ.) কে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং এ দিনই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এ দিন শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে এবং এ দিনই সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। অতএব তোমরা এ দিন আমার নিকট বেশি বেশি সালাত ও সালাম পাঠিও। কারণ, নিশ্চয়ই তোমাদের সালাত ও সালাম আমার নিকট পৌঁছিয়ে দেয়া হবে। সাহাবারা বললেন: কিভাবে আপনার নিকট আমাদের সালাত ও সালাম পৌঁছিয়ে দেয়া হবে? অথচ আপনি তখন মাটি হয়ে নিঃশেষ হয়ে যাবেন। রাসূল (সা.) বললেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা’আলা মাটির উপর নবীদের শরীর হারাম করে দিয়েছেন’’। (আবু দাউদ, হাদীস ১০৪৭, ১৫৩১ ইবনু হিববান/ইহসান, হাদীস ৯০৭ ইবনু খুযাইমাহ্, হাদীস ১৭৩৩)

এ যদি হয় রাসূল (সা.) এর কবরের অবস্থা। যেখানে যিয়ারাতের উদ্দেশ্যে বার বার যাওয়ার অভ্যাস করা যাবে না। যাতে করে তা মেলাক্ষেত্রে রূপান্তরিত না হয়ে যায়। তাহলে নিয়মিতভাবে প্রতি বছর ওলী-বুযুর্গদের কবরের উপর উরস ও দো’আভোজ উদ্যাপন কিভাবে জায়িয হতে পারে? যা সরাসরি মেলা হওয়ার মধ্যে কোন সন্দেহ নেই এবং যাতে ঈদের চাইতেও অনেক বেশি খুশি প্রকাশ করা হয়। অতএব কোন্ যুক্তিতে উরস মাহফিল অভিমুখে মানতের গরু ছাগল নিয়ে মাযারভক্তদের শোভাযাত্রা বড় শির্ক না হয়ে তা জায়িয বরং সাওয়াবের কাজ হতে পারে? অথচ রাসূল (সা.) তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও সাওয়াবের নিয়্যাতে ভ্রমণ করা হারাম করে দিয়েছেন।

আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

لاَ تُشَدُّ الرِّحَالُ إِلاَّ إِلَى ثَلاَثَةِ مَسَاجِدَ: مَسْجِدِ الْـحَرَامِ، وَمَسْجِدِ الْأَقْصَى، وَمَسْجِدِيْ

‘‘তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্য কোথাও সাওয়াবের নিয়্যাতে সফর করা যাবে না। সে মসজিদগুলো হলোঃ হারাম (মক্কা) শরীফ, মসজিদে আক্সা এবং মসজিদে নববী’’। (বুখারী, হাদীস ১১৯৭, ১৯৯৫ মুসলিম, হাদীস ৮২৭ তিরমিযী, হাদীস ৩২৬)

বাস্রা বিন্ আবী বাস্রা গিফারী (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি আবু হুরাইরাহ্ (রা.) কে তূর পাহাড় থেকে আসতে দেখে বললেন:

لَوْ أَدْرَكْتُكَ قَبْلَ أَنْ تَخْرُجَ إِلَيْهِ لَـمَا خَرَجْتَ، سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَقُوْلُ: لاَ تُعْمَلُ الْـمَطِيُّ إِلاَّ إِلَى ثَلاَثَةِ مَسَاجِدَ: الْـمَسْجِدِ الْـحَرَامِ، وَمَسْجِدِيْ هَذَا، وَالْـمَسْجِدِ الْأَقْصَى

‘‘আমি আপনাকে তূর পাহাড়ের দিকে যাওয়ার পূর্বে দেখতে পেলে অবশ্যই সে দিকে যেতে দিতাম না। কারণ, আমি রাসূল (সা.) কে বলতে শুনেছি: সাওয়াবের নিয়্যাতে তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও সফর করা যাবে না। সে মসজিদগুলো হলো: মসজিদে হারাম, মসজিদে নববী ও মসজিদে আকসা’’। (মালিক : ১/১০৮-১০৯ আহমাদ : ৬/৭ ’হুমাইদী, হাদীস ৯৪৪)

মোটকথা, ওলী-বুযুর্গদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা সমূহ ধ্বংসের মূল। সুতরাং যে কোন ধরণের বাড়াবাড়ি ওদের ব্যাপারে শরীয়তের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য।

নবী-ওলীদের নিদর্শনসমূহ অনুসন্ধান করে তা নিয়ে ব্যস্ত হওয়াও তাদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ির শামিল। সুতরাং তাও শরীয়তের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য।

নাফি’ (রাহিমাহুল্লাহ্) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:

كَانَ النَّاسُ يَأْتُوْنَ الشَّجَرَةَ الَّتِيْ يُقَالُ لَهَا شَجَرَةُ الرِّضْوَانَ فَيُصَلُّوْنَ عِنْدَهَا، قَالَ: فَبَلَغَ ذَلِكَ عُمَرَ بْنَ الْـخَطَّابِ فَأَوْعَدَهُمْ فِيْهَا وَأَمَرَ بِهَا فَقُطِعَتْ

‘‘রাসূল (সা.) এর মৃত্যুর পর রিদ্ওয়ান বৃক্ষের (যে গাছের নীচে রাসূল (সা.) সাহাবাদেরকে ষষ্ঠ হিজরী সনে মক্কার কাফিরদের সঙ্গে যুদ্ধের বায়’আত করেন) নীচে এসে অনেকেই নামায পড়া শুরু করলো। তা শুনে ’উমর (রা.) কঠোর ভাষায় উহার নিন্দা করলেন এবং উক্ত গাছটি কেটে ফেললেন’’। (ইবনু আবী শাইবাহ্, হাদীস ৭৫৪৫ আল্-মুন্তাযিম ৩/২৭২)

মা’রুর বিন্ সুওয়াইদ্ (রাহিমাহুল্লাহ্) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: একদা আমি ’উমর (রা.) এর সাথে মক্কার পথে ফজরের নামায আদায় করলাম। অতঃপর তিনি দেখলেন অনেকেই এদিক ওদিক ছুটোছুটি করছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: এরা কোথায় যাচ্ছে। উত্তরে বলা হলো: রাসূল (সা.) যেখানে নামায পড়েছেন ওখানে নামায পড়ার জন্যে। তখন তিনি বললেন:

إِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِمِثْلِ هَذَا، كَانُوْا يَتَتَبَّعُوْنَ آثَارَ أَنْبِيَائِهِمْ وَيَتَّخِذُوْنَهَا كَنَائِسَ وَبِيَعًا، فَمَنْ أَدْرَكَتْهُ الصَّلاَةُ فِيْ هَذِهِ الْمَسَاجِدِ فَلْيُصَلِّ، وَمَنْ لاَ فَلْيَمْضِ وَلاَ يَتَعَمَّدْهَا

‘‘তোমাদের পূর্বেকার লোকেরা এ কারণেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো। তারা নিজ নবীদের নিদর্শনসমূহ খুঁজে বেড়াতো এবং উহার উপর গির্জা বা ইবাদাতখানা বানিয়ে নিতো। অতএব এ মসজিদগুলোতে থাকাবস্থায় নামাযের সময় হলে তোমরা তাতে নামায পড়ে নিবে। নতুবা তা অতিক্রম করে যাবে। বিশেষ সাওয়াবের নিয়্যাতে তাতে নামায পড়তে আসবে না’’। (ইবনু আবী শাইবাহ্ : ২/৩৭৬)

আবুল ’আলিয়াহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:

لَـمَّا فَتَحْنَا تُسْتَرَ وَجْدْنَا فِيْ بَيْتِ مَالِ الْـهُرْمُزَانِ سَرِيْرًا عَلَيْهِ رَجُلٌ مَيِّتٌ عِنْدَ رَأْسِهِ مُصْحَفٌ، فَأَخَذْنَا الْـمُصْحَفَ فَحَمَلْنَاهُ إِلَى عُمَرَ، فَدَعَا لَهُ كَعْبًا فَنَسَخَهُ بِالْعَرَبِيَّةِ، فَأَنَا أَوَّلُ رَجُلٍ قَرَأَهُ مِنَ الْعَرَبِ، قَرَأْتُهُ مِثْلَ مَا أَقْرَأُ الْقُرْآنَ، قَالَ الرَّاوِيْ لِأَبِيْ الْعَالِيَةِ: فَمَا كَانَ فِيْهِ؟ قَالَ: سِيْرَتُكُمْ وَأُمُوْرُكُمْ وَلُحُوْنُ كَلاَمِكُمْ وَمَا هُوَ كَائِنٌ بَعْدُ، قَالَ الرَّاوِيْ: فَمَا صَنَعْتُمْ بِالرَّجُلِ؟ قَالَ: حَفَرْنَا لَهُ بِالنَّهَارِ ثَلاَثَةَ عَشَرَ قَبْرًا مُتَفَرِّقَةً، فَلَمَّا كَانَ بِاللَّيْلِ دَفَنَّاهُ وَسَوَّيْنَا الْقُبُوْرَ كُلَّهَا لِنُعَمِّيَهُ عَلَى النَّاسِ لاَ يَنْبُشُوْنَهُ، قَالَ: وَمَا يَرْجُوْنَ مِنْهُ؟ قَالَ: كَانَتِ السَّمَاءُ إِذَا حُبِسَتْ عَنْهُمْ بَرَزُوْا بِسَرِيْرِهِ فَيُمْطَرُوْنَ، قَالَ: مَنْ كُنْتُمْ تَظُنُّوْنَ الرَّجُلَ؟ قَالَ: رَجُلٌ يُقَالُ لَهُ دَانِيَالُ، قَالَ: مُنْذُ كَمْ وَجَدْتُمُوْهُ قَدْ مَاتَ؟ قَالَ: مُنْذُ ثَلاَثِ مِئَةِ سَنَةٍ، قَالَ: مَا كَانَ تَغَيَّرَ مِنْهُ شَيْءٌ؟ قَالَ: لاَ، إِلاَّ شُعَيْرَاتٌ مِنْ قَفَاهُ، إِنَّ لُحُوْمَ الْأَنْبِيَاءِ لاَ تُبْلِيْهَا الْأَرْضُ

‘‘যখন আমরা তুস্তার্ জয় করলাম তখন আমরা হুর্মুযের খাজাঞ্চিখানায় একটি খাট পেলাম। তাতে একটি মৃত মানুষ শায়িত এবং তার মাথার পার্শ্বে একখানা কেতাব রাখা আছে। আমরা কেতাবখানা ’উমর (রা.) এর নিকট নিয়ে আসলে তিনি কা’ব (রা.) কে ডেকে তা আরবী করে নেন। আরবদের মধ্যে আমিই সর্বপ্রথম তা পড়লাম। যেভাবে আমরা কোর’আন মাজীদ পড়ি সেভাবেই পড়লাম। বর্ণনাকারী বলেন: আমি আবুল্ ’আলিয়াকে জিজ্ঞাসা করলাম: তাতে কি লেখা ছিলো? তিনি বললেন: তোমাদের জীবন যাপন, কর্মকান্ড, কথার ধ্বনি ও ভবিষ্যতে যা ঘটবে সে সম্পর্কেই আলোচনা ছিলো। বর্ণনাকারী বললো: সে মৃত লোকটাকে আপনারা কি করলেন? তিনি বললেন: আমরা দিনের বেলায় বিক্ষিপ্তভাবে তার জন্য তেরোটি কবর খনন করলাম। রাত্র হলে আমরা তাকে কোন একটিতে দাফন করে কবরগুলো সমান করে দেই। যাতে কেউ বুঝতে না পারে তাকে কোথায় দাফন করা হলো। যাতে তারা পুনরায় তাকে কবর থেকে উঠিয়ে না ফেলতে পারে। বর্ণনাকারী বললো: তারা সে ব্যক্তি থেকে কি আশা করতো? তিনি বললেন: (তাদের ধারণা) যখন তাদের এলাকায় কখনো অনাবৃষ্টি দেখা দিতো তখন তারা তাকে খাট সহ বাইরে নিয়ে আসতো এবং তখনই বৃষ্টি হতো। বর্ণনাকারী বললো: আপনাদের ধারণা মতে সে কে হতে পারে? তিনি বললেন: লোক মুখে শুনা যায়, তিনি ছিলেন দানিয়াল নবী। বর্ণনাকারী বললো: কতদিন থেকে আপনারা তাকে মৃত অবস্থায় দেখতে পেলেন? তিনি বললেন: তিন শত বছর থেকে। বর্ণনাকারী বললো: তাঁর শরীরের কোন অংশের পরিবর্তন হয়নি কি? তিনি বললেন: না। তবে শুধু ঘাড়ের কয়েকটি চুলের সামান্যটুকু পরিবর্তন দেখা গেলো। কারণ, মাটি নবীদের শরীর খেতে পারে না। (আল্ বিদায়া ওয়ান্ নিহায়াহ্ : ২/৪০ আম্ওয়াল্/আবু ’উবাইদ্ : ৮৭৭ ফুতূহুল্ বুল্দান্ : ৩৭১)

কোন কবরকে পূজা করা হলে শরীয়তের পরিভাষায় তা মূর্তিপূজা হিসেবে গণ্য করা হয়। এ কারণেই রাসূল (সা.) তাঁর কবরকে ভবিষ্যতে কেউ যেন মূর্তি বানিয়ে না নেয় সে জন্য আল্লাহ্ তা’আলার নিকট করুণ কন্ঠে ফরিয়াদ করেন।

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী কারীম (সা.) আল্লাহ্ তা’আলার নিকট এ দো’আ প্রার্থনা করেন:

اللَّهُمَّ لاَ تَجْعَلْ قَبْرِيْ وَثَنًا يُعْبَدُ، لَعَنَ اللهُ قَوْمًا اِتَّخَذُوْا قُبُوْرَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ

‘‘হে আল্লাহ্! আপনি আমার কবরকে মূর্তি বানাবেন না। ভবিষ্যতে যার পূজা করা হবে। আল্লাহ্ তা’আলার লা’নত এমন সম্প্রদায়ের উপর যারা নবীদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিলো’’। (আহমাদ : ২/২৪৬ আবু নু’আঈম্ : ৭/৩১৭)

বর্তমান যুগের কবর পূজারী ও মাযারের খাদিমদের সাথে ইব্রাহীম ও মূসা (আলাইহিমাস্ সালাম) এর যুগের মূর্তি পূজারীদের কতইনা সুন্দর মিল রয়েছে।

ইব্রাহীম (আ.) তাঁর যুগের মূর্তি পূজারীদেরকে বললেন:

«مَا هَذِهِ التَّمَاثِيْلُ الَّتِيْ أَنْتُمْ لَهَا عَاكِفُوْنَ»

‘‘এ মূর্তিগুলো কি যে ; তোমরা তাদের নিকট পূজার জন্য নিয়মিত অবস্থান করছো’’। (আম্বিয়া : ৫২)

মূসা (আ.) এর যুগের মূর্তি পূজারীদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

«وَجَاوَزْنَا بِبَنِيْ إِسْرَآئِيْلَ الْبَحْرَ فَأَتَوْا عَلَى قَوْمٍ يَعْكُفُوْنَ عَلَى أَصْنَامٍ لَّـهُمْ»

‘‘আমি বনী ইস্রাঈলকে সমুদ্র পার করে দিলে তাদের সঙ্গে মূর্তির নিকট নিয়মিত অবস্থানকারী এক দল পূজারীর সাথে সাক্ষাৎ হয়’’। (আ’রাফ : ১৩৮)

কবর পূজারীদের অনেকেরই ধারণা এই যে, যারা একবার আল্লাহ্ তা’আলা ও তদীয় রাসূল (সা.) এর উপর ঈমান এনেছে তাদের মধ্যে কখনো কোন শির্ক পাওয়া যেতে পারে না। মুশরিক শুধু রাসূল (সা.) এর যুগেই ছিল। যারা তাঁর ইসলাম প্রচারে সর্বদা বাধা প্রদান করতো। অন্যদিকে যে ব্যক্তি একবার আল্লাহ্ তা’আলা ও তদীয় রাসূল (সা.) এর উপর ঈমান এনেছে সে কি করে মুশরিক হতে পারে? তা কখনোই সম্ভব নয়।

তাদের এ ধারণা সম্পূর্ণরূপেই ভুল প্রমাণিত। কারণ, রাসূল (সা.) হাদীসের মধ্যে এর সম্পূর্ণ বিপরীত মত পোষণ করেছেন। শুধু এতটুকুতেই তিনি ক্ষান্ত হননি বরং তিনি এ উম্মতের মধ্যে মূর্তি পূজাও যে চালু হবে তা সত্যিকারভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন।

সাউবান (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

لاَ تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتَّى تَلْحَقَ قَبَائِلُ مِنْ أُمَّتِيْ بِالْـمُشْرِكِيْنَ وَحَتَّى تَعْبُدَ قَبَائِلُ مِنْ أُمَّتِيْ الْأَوْثَانَ

‘‘কিয়ামত কায়েম হবেনা যতক্ষণনা আমার উম্মতের কয়েকটি গোত্র মুশরিকদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা এবং মূর্তি পূজা শুরু করবে’’।

(আবু দাউদ, হাদীস ৪২৫২ ইবনু মাজাহ্, হাদীস ৪০২৩ বাগাওয়ী, হাদীস ৪০১৫)

শুধু এতটুকুতেই ক্ষান্ত নয় বরং রাসূল (সা.) এর উম্মতরা ছোট-বড় প্রতিটি কাজে ইহুদী, খ্রিষ্টান ও অগ্নিপূজকদের হুবহু অনুসারী হবে।

আবু সাঈদ খুদ্রী (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী (সা.) ইরশাদ করেন:

لَتَتَّبِعُنَّ سَنَنَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ شِبْرًا بِشِبْرٍ، وَذِرَاعًا بِذِرَاعٍ، حَتَّى لَوْ سَلَكُوْا جُحْرَ ضَبٍّ لَسَلَكْتُمُوْهُ، قُلْنَا: يَا رَسُوْلَ اللهِ! الْيَهُوْدَ وَالنَّصَارَى؟ قَالَ: فَمَنْ؟!

‘‘তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের অনুসারী হবে। হাত হাত বিঘত বিঘত তথা হুবহু অবিকলভাবে। এমনকি তারা যদি কোন গুইসাপ গর্তে ঢুকে পড়ে তাহলে তোমরাও তাতে ঢুকে পড়বে। আমরা (সাহাবাগণ) বললাম: হে আল্লাহ্’র রাসূল! তারা কি ইহুদী ও খ্রিষ্টান? তিনি বললেন: তারা নয় তো আর কারা?’’

(বুখারী, হাদীস ৩৪৫৬, ৭৩২০ মুসলিম, হাদীস ২৬৬৯ ত্বায়ালিসী, হাদীস ২১৭৮)

এরই পাশাপাশি কোর’আন ও হাদীসে অপরিপক্ক কিছু আলিম সমাজ, রাজা-বাদশাহ, আমীর-উমারা বিপুল সংখ্যক জনসাধারণকে পথভ্রষ্ট করার কাজে ব্যস্ত রয়েছে। তারা এতটুকুও আল্লাহ্ তা’আলাকে ভয় পাচ্ছে না। এদেরই সম্পর্কে রাসূল (সা.) বহু পূর্বে সত্য ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন।

সাউবান (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

وَإِنَّمَا أَخَافُ عَلَى أُمَّتِيْ الْأَئِمَّةَ الْـمُضِلِّيْنَ

‘‘নিশ্চয়ই আমি আমার উম্মতের ব্যাপারে পথভ্রষ্টকারী ইমাম বা নেতাদের ভয় পাচ্ছি। যারা প্রতিনিয়ত জনসাধারণকে গোমরাহ্ করবে’’।

(আবু দাউদ, হাদীস ৪২৫২ ইবনু মাজাহ্, হাদীস ৪০২৩ বাগাওয়ী, হাদীস ৪০১৫)

এতদ্সত্ত্বেও একটি দল কিয়ামত পর্যন্ত সর্বদা ও সর্ববস্থায় সত্যের উপর অটল ও অবিচল থাকবে। কারোর অসহযোগিতা বা অসহনশীলতা তাদের কোনরূপ ক্ষতি করতে পারবেনা।

সাউবান, মু’আবিয়া ও মুগীরা বিন্ শো’বা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তাঁরা বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِّنْ أُمَّتِيْ ظَاهِرِيْنَ عَلَى الْـحَقِّ مَنْصُوْرِيْنَ، لاَ يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَـهُمْ وَلاَ مَنْ خَالَفَهُمْ حَتَّى يَأْتِيَهُمْ أَمْرُ اللهِ وَهُمْ عَلَى ذَلِكَ

‘‘সর্বদা আমার একদল উম্মত সত্যবিজয়ী এবং সাহায্যপ্রাপ্ত হবে। কারোর অসহযোগিতা বা বিরোধিতা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। কিয়ামত আসা পর্যন্ত তারা এ অবস্থায়ই থাকবে’’।

(বুখারী, হাদীস ৩৬৪০, ৩৬৪১ মুসলিম, হাদীস ১৯২০, ১৯২১, ১০৩৭ আবু দাউদ, হাদীস ৪২৫২ ইবনু মাজাহ্, হাদীস ৪০২৩ বাগাওয়ী, হাদীস ৪০১৫)