ইমেইলে পাঠাতে নিচের ফর্মটি পূরণ করুন
security code
আল-ফিকহুল আকবর আল-ফিকহুল আকবারের বঙ্গানুবাদ ও ব্যাখ্যা ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.)
৪. ৪. ২. ৪. তাবার্রুক

তাবার্রুক অর্থ বরকত অনুসন্ধান করা। আরবের মুশরিকদের শিরকের একটি দিক ছিল তাবার্রুক বা বরকত লাভের জন্য কোনো স্থান বা দ্রব্যের প্রতি ভক্তি প্রকাশ। তারা কাবা ঘরের পাথর বরকতের জন্য কাছে রাখত, তাওয়াফ করত বা সম্মান করত। এ সম্পর্কে ইবনু ইসহাক তার ‘‘সীরাতুন্নবী’’ গ্রন্থে বিভিন্ন সাহাবী ও তাবেয়ীর সূত্রে লিখেছেন: ইসমাঈলের বংশে আরবদের মধ্যে শিরক প্রচলনের কারণ ছিল, এরা কাবাঘরের খুবই ভক্তি করতেন। তারা কাবাঘর ছেড়ে যেতে চাইতেন না। যখন তাদের বাধ্য হয়ে কাবাঘর ছেড়ে বিভিন্ন এলাকায় যেতে হতো, তখন তারা সাথে করে কাবাঘরের তাযীমের জন্য কাবাঘরের কিছু পাথর নিয়ে যেতেন। তারা যেখানেই যেতেন সেখানে এ পাথরগুলো রেখে তার তাওয়াফ করতেন ও সম্মান করতেন। পরবর্তী যুগে ক্রমান্বয়ে এ সকল পাথর ইবাদত করার প্রচলন হয়ে যায়। পরে মানুষেরা খেয়াল খুশি মতো বিভিন্ন পাথর পূজা করতে শুরু করে।[1]

কাবাগৃহের পাথর-গেলাফ ছাড়া আরো অনেক কিছু তারা ‘তাবার্রুকের নামে’ ভক্তি করত এবং শিরকে নিপতিত হতো। এগুলোর মধ্যে ছিল ‘যাত আনওয়াত’ নামক একটি বৃক্ষ। আবু ওয়াকিদ লাইসি (রা) বলেন:


إنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ لَمَّا خَرَجَ إِلَى حُنَيْنٍ (خَرَجَنَا مَع رسول الله ﷺ إِلَى حُنَيْنٍ وَنَحْنُ حَدِيْثُوْ عَهْدٍ بِكُفْرٍ، وكَانُوا أَسْلَمُوا يَوْمَ الْفَتْحِ) مَرَّ بِشَجَرَةٍ لِلْمُشْرِكِينَ يُقَالُ لَهَا ذَاتُ أَنْوَاطٍ يُعَلِّقُونَ عَلَيْهَا أَسْلِحَتَهُمْ (سِدْرَةٌ يَعْكُفُوْنَ حَوْلَهَا ويُعَلِّقُوْنَ بِهَا أَسْلِحَتَهُمْ) فَقَالُوا (قُلْنَا) يَا رَسُولَ اللَّهِ اجْعَلْ لَنَا ذَاتَ أَنْوَاطٍ كَمَا لَهُمْ ذَاتُ أَنْوَاطٍ فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ سُبْحَانَ اللَّهِ هَذَا كَمَا قَالَ قَوْمُ مُوسَى اجْعَلْ لَنَا إِلَهًا كَمَا لَهُمْ آلِهَةٌ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَتَرْكَبُنَّ سُنَّةَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ


‘‘মক্কা বিজয়ের পরে আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর সাথে হুনাইনের যুদ্ধের জন্য যাত্রা করি। তখন আমরা নও মুসলিম। মক্কা বিজয়ের সময়েই কেবল আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি। চলার পথে তিনি মুশরিকদের একটি (বরই) বৃক্ষের নিকট দিয়ে যান, যে গাছটির নাম ছিল ‘যাতু আনওয়াত’। মুশরিকগণ এ গাছের কাছে বরকতের জন্য ভক্তিভরে অবস্থান করত এবং তাদের অস্ত্রাদি বরকতের জন্য ঝুলিয়ে রাখত। আমাদের কিছু মানুষ বললেন: হে আল্লাহর রাসূল, মুশরিকদের যেমন ‘যাতু আনওয়াত’ আছে আমাদেরও অনুরূপ একটি ‘যাতু আনওয়াত’ নির্ধারণ করে দেন। তখন তিনি বললেন, সুবহানাল্লাহ! আল্লাহর কসম, মূসার কওম যেরূপ বলেছিল: মুশরিকদের মূর্তির মতো আমাদেরও মূর্তির দেবতা দাও[2], তোমরাও সেরূপ বললে। যাঁর হাতে আমার জীবন তাঁর কসম, তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তীদের রীতি অনুসরণ করবে।’’[3]

ইহূদী-খৃস্টানদের তাবার্রুক বিষয়ক যে শিরকের কথা হাদীস শরীফে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে তা হলো নবী ও অলীগণের স্মৃতিবিজড়িত স্থান ও কবর-মাজার থেকে বরকত লাভের চেষ্টা। সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ও অন্যান্য গ্রন্থে আবূ উবাইদা, জুনদুব, কাব ইবনু মালিক, ইবনু মাসঊদ, ইবনু আব্বাস প্রমুখ সাহাবী (রাঃ) থেকে বিভিন্ন সহীহ সনদে সংকলিত মুতাওয়াতির পর্যায়ের হাদীসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:


أَلا وَإِنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ كَانُوا يَتَّخِذُونَ قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ وَصَالِحِيهِمْ مَسَاجِدَ أَلا فَلا تَتَّخِذُوا الْقُبُورَ مَسَاجِدَ إِنِّي أَنْهَاكُمْ عَنْ ذَلِكَ. ... لَعَنَ اللَّهُ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسْجِدًا.


‘‘তোমরা মনোযোগ দিয়ে শোন! তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহের মানুষেরা তাদের নবীগণ ও ওলীগণের কবরকে মসজিদ (ইবাদত-বন্দেগির স্থান) বানিয়ে নিত। তোমরা সাবধান! তোমরা কবরকে মসজিদ বানাবে না, আমি তোমাদেরকে নিষেধ করছি এ কাজ থেকে।’’ ... ‘‘আল্লাহ লানত করুন ইহুদী ও খৃস্টানদেরকে, তারা তাদের নবীগণের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছিল।’’[4]

কবরের নিকট মসজিদ বানানোর উদ্দেশ্য কবরবাসীর ইবাদত করা নয়, বরং আল্লাহর ইবাদতে নেককার মানুষের সাহচর্য ও বরকত লাভ মাত্র। কিন্তু এরূপ তাবার্রুকের চিন্তাই শিরকের অন্যতম পথ। এজন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কঠোরভাবে এরূপ করতে নিষেধ করেছেন।

সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ব্যবহৃত দ্রব্য, তাঁর চুল, নখ ইত্যাদিকে বরকতের জন্য গ্রহণ ও সংরক্ষণ করতেন। আর তাঁর স্মৃতি বিজড়িত স্থানে তাঁর অনুকরণ করতেন। অর্থাৎ যেখানে তিনি যে ওয়াক্তের সালাত আদায় করেছেন সেখানে সে ওয়াক্তের সালাত আদায় করতেন, যেখানে ইসতিনজা করেছেন সেখানে ইসতিনজা করতেন, যেখানে যে সময়ে ঘুমিয়েছেন সেখানে সে সময়ে ঘুমাতেন... ইত্যাদি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ছাড়া অন্য কারো ক্ষেত্রে তাঁরা এরূপ করেন নি। অনুরূপভাবে তাবিয়ী ও তাবি-তাবিয়ীগণ কখনো কোনো সাহাবী বা তাবিয়ীর কোনো স্মৃতি বিজড়িত দ্রব্য, বস্ত্ত বা স্থানের বরকত গ্রহণের চেষ্টা করেন নি। তাঁরা তাবার্রুকের নামে অতিভক্তির প্রতিবাদ করতেন।

নাফে’ (রাহ) বলেন: কিছু মানুষ হুদাইবিয়ায় ‘বাইয়াতে রেদওয়ানের গাছ’ নামে কথিত গাছটির নিকট আসত এবং সেখানে সালাত আদায় করত। উমার (রা) এ কথা জানতে পারেন। তখন তিনি তাদেরকে কঠিন শাস্তির ভয় দেখান। পরে তিনি ঐ গাছটিকে কেটে ফেলতে নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশে গাছটি কেটে ফেলা হয়।[5]

উমার (রা) তাঁর খিলাফতকালে এক সফরে কিছু মানুষকে দেখেন যে, তারা সবাই একটি স্থানের দিকে যাচ্ছে। তিনি প্রশ্ন করেন: এরা কোথায় যাচ্ছে? তাঁকে বলা হয়: হে আমীরুল মু’মিনীন, এখানে একটি মসজিদ আছে যেখানে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সালাত আদায় করেছিলেন, এরা সেখানে যেয়ে সালাত আদায় করছে। তখন তিনি বলেন:


إِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِمِثْلِ هَذَا، يَتَّبِعُوْنَ آثَارَ أَنْبِيَائِهِمْ فَيَتَّخِذُونَهَا كَنَائِسَ وَبِيَعاً. مَنْ أَدْرَكَتْهُ الصَّلاَةُ فِيْ هَذِهِ الْمَسَاجِدِ فَلْيُصَلِّ، وَمَنْ لاَ، فَلْيَمْضِ، وَلاَ يَتَعَمَّدُهَا.


‘‘তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতেরা তো এ ধরনের কাজ করেই ধ্বংস হয়েছে। তারা তাদের নবীগণের স্মৃতি বিজড়িত স্থানগুলো খুঁজে বেড়াত এবং সেখানে গীর্জা ও ইবাদতখানা তৈরি করে নিত। যদি কেউ যাত্রা পথে (রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্মৃতি বিজড়িত) এসব মসজিদে সালাতের সময়ে উপস্থিত হয় তবে সে সেখানে সালাত আদায় করবে। আর যদি কেউ যাত্রাপথে অন্য সময়ে সেখানে উপস্থিত হয়, তাহলে সে না থেমে চলে যাবে। বিশেষ করে এসকল মসজিদে সালাত আদায়ের উদ্দেশ্য করবে না।’’[6]

[1] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ ১/৯৪-৯৫।

[2] সূরা (৭) আ’রাফ: ১৩৮ আয়াত।

[3] ইবনু আবী আসিম, আস-সুন্নাহ, পৃ. ৩৭; তিরমিযী, আস-সুনান ৪/৪৭৫। হাদীসটি সহীহ।

[4] বুখারী, আস-সহীহ ১/১৬৮ (আবওয়াবুল মাসাজিদ, বাবুস সালাতি ফিল বীয়াহ); মুসলিম, আস-সহীহ ১/৩৭৫-৩৭৮ (কিতাবুল মাসাজিদ, বাবুন নাহই আন বিনায়িল মাসাজিদ আলাল কুবূর)। বিস্তারিত বর্ণনাগুলির জন্য দেখুন: বুখারী, আস-সহীহ ১/১৬৫, ১৬৮, ৪৪৬, ৪৬৮, ৩/১২৭৩, ৪/১৬১৪, ৪/১৬১৫, ৫/২১৯০; মুসলিম, আস-সহীহ ১/৩৭৫-৩৭৮; মালিক, আল-মুআত্তা ১/১৭২; আহমদ, আল-মুসনাদ ১/১৯৫, ২/২৪৬, ৩৭৬; ইবনু হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী ১/৫২৩-৫২৪, ৫৩১, ৩/২০০, ২০৮, ২৫৫।

[5] ইবনু সা’দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা ২/৭৬, ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ৭/৪৪৮।

[6] ইবনু ওয়াদ্দাহ, আল-বিদাউ, ৪১-৪২, ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ১/৫৬৯, শাতেবী, ইতিসাম ১/৪৪৮-৪৪৯।