ইমেইলে পাঠাতে নিচের ফর্মটি পূরণ করুন
ইমেইল পাঠাতে লগইন করুন

স্পাম প্রতিরোধে এই ফিচারটি শুধুমাত্র লগইনকৃত ব্যবহারকারীদের জন্য।

লগইন সাইনআপ
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আকীদা আল্লাহ তা‘আলার সীমা ইমাম আবু জা‘ফর আহমাদ আত-ত্বহাবী রহ.
আর আল্লাহ তা‘আলা সীমা ও পরিধি

৩৮। আর আল্লাহ তা‘আলা সীমা, পরিধি[1] থেকে উর্ধ্বে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও সাজ-সরঞ্জাম থেকে মুক্ত। অন্যান্য সৃষ্ট বস্তুর ন্যায় ষষ্ঠ দিক তাঁকে বেষ্টন করে রাখতে পারে না।

৩৯। আর মি‘রাজ সত্য, নবী (মুহাম্মাদ) সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নৈশকালে ভ্রমণ করানো হয়েছিল, তাঁকে জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে উর্ধ্ব আকাশে উত্থিত করা হয়েছিল। সেখান থেকে আল্লাহর ইচ্ছা অনুসারে আরো উর্ধ্বে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে আল্লাহ স্বীয় ইচ্ছা অনুসারে তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করেছেন এবং তাঁকে যা প্রত্যাদেশ করার ছিল তা করেছেন।

﴿مَا كَذَبَ ٱلۡفُؤَادُ مَا رَأَىٰٓ ١١﴾ [النجم: ١١] 

“তিনি যা দেখেছেন তার অন্তর তা মিথ্যা বলেনি।” [সূরা আন-নাজম, আয়াত: ১১] সুতরাং আল্লাহর তাঁর ওপর আখিরাতে এবং দুনিয়ার জগতে সালাত ও সালাম পেশ করুন। 

৪০। আর হাউয (পানির আধার) যা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর উম্মতের পিপাসা নিবারণার্থে প্রদান করে সম্মানিত করেছেন, তা অবশ্যই সত্য।

৪১। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শাফা‘আত, যা তিনি উম্মতের জন্য সংরক্ষিত রেখেছেন যেমনটি বিভিন্ন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, তা সত্য।

৪২। ‘‘মী-ছাক’’ (দৃঢ় অঙ্গীকার), যা আল্লাহ তাআলা আদম এবং তাঁর সন্তানদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছেন তা সত্য।

৪৩। মহান আল্লাহ শুরু থেকে এবং এখন, সব সময়েই ভলো করেই জানেন, কত লোক জান্নাতে যাবে আর কত লোক জাহান্নামে যাবে। এতে ব্যতিক্রম হবে না। তাই এ সংখ্যা কমবেও না, বাড়বেও না।

৪৪। অনুরূপভাবে আল্লাহ তাআলা মানুষের কৃতকর্ম সম্পর্কে পূর্ব হতেই অবহিত এবং যাকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, সে কাজ তার জন্য সহজ সাধ্য করে দেওয়া হয়েছে। শেষ কর্ম দ্বারা মানুষের কৃতকার্যতা বিবেচিত হবে এবং সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর ফায়সালায় ভাগ্যবান বলে সাব্যস্ত হয়েছে। আর হতভাগা সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর ফায়সালায় হতভাগা বলে নির্ধারিত হয়েছে।

৪৫। আর ‘‘তাকদীর’’ সম্পর্কে আসল কথা এই যে, এটা সৃষ্টিকুলের ব্যাপারে আল্লাহর একটি রহস্য; যা নৈকট্যপ্রাপ্ত কোনো ফেরেশ্তা কিংবা প্রেরিত কোনো নবীও অবহিত নন। এ সম্পর্কে তথ্য আবিস্কার করতে যাওয়া অথবা অনুরূপ আলোচনায় প্রবৃত্ত হওয়া আশাহত হওয়ার নিশ্চিত কারণ, বঞ্চনার সিঁড়ি এবং সীমালংঘনের ধাপ। অতএব সাবধান! এ সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা এবং কুমন্ত্রণা থেকে সতর্ক থাকুন। কারণ, আল্লাহ তাআলা ‘তাকদীর’ সম্পর্কিত জ্ঞান তাঁর সৃষ্টিকুল থেকে গোপন রেখেছেন এবং তাদেরকে এর উদ্দেশ্যে অনুসন্ধান করতে নিষেধ করেছেন। যেমন, আল্লাহ তা’আলা বলেন,

﴿لَا يُسۡ‍َٔلُ عَمَّا يَفۡعَلُ وَهُمۡ يُسۡ‍َٔلُونَ ٢٣﴾ [الانبياء: ٢٣] 

‘‘তিনি যা করেন সে বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হবে না, বরং তারা (তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে) জিজ্ঞাসিত হবে’’। [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ২৩]

অতএব, যে ব্যক্তি একথা জিজ্ঞেস করবে ‘‘তিনি কেন এ কাজ করলেন?’’ সে আল্লাহর কিতাবের হুকুম অমান্য করল। আর যে ব্যক্তি কিতাবের হুকুম অমান্য করল, সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হল।

৪৬। (তাকদীর বিষয়ে যা জানা ও যার উপর ঈমান আনার প্রয়োজন), উপরোক্ত আলোচনায় সংক্ষিপ্তভাবে তা বিধৃত হয়েছে। আল্লাহর ওলী তথা বন্ধুদের মধ্যে যার অন্তর জ্যোতিদীপ্ত তার জন্য এতটুকু জানাই প্রয়োজন। আর এটিই হচ্ছে জ্ঞানে সুগভীর প্রজ্ঞা বিভূষিতদের স্তর। (যারা আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত সংবাদকে মনে-প্রাণে গ্রহণ করে নেয় এবং তার কাছে আত্মসমর্পন করে)

কারণ, ইলম বা জ্ঞান দু’প্রকার। (১) যে জ্ঞান সৃষ্ট জীবের নিকট বিদ্যমান[2]। (২) যে জ্ঞান সৃষ্ট জীবের নিকট অবিদ্যমান[3]। বিদ্যমানকে অস্বীকার করাও যেমন কুফুরী, অবিদ্যমান জ্ঞানের দাবী করাও তেমনি কুফুরী। বিদ্যমান জ্ঞানের সাধনা করা, আর অবিদ্যমান জ্ঞানের অন্বেষন করা হতে বিরত থাকাই সুদৃঢ় ঈমানের পরিচয়।


[1] “আর আল্লাহ তা‘আলা সীমা পরিধি থেকে উর্ধ্বে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও সাজ-সরঞ্জাম থেকে মুক্ত। অন্যান্য সৃষ্ট বস্তুর ন্যায় ষষ্ঠ দিক তাঁকে বেষ্টন করে রাখতে পারে না।” এ কথাটিতে অস্পষ্টতা রয়েছে, আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর অপব্যাখ্যাকারী ও বিকৃতিকারীদের কেউ সে অস্পষ্টতার সুযোগ নিতে পারে। অথচ গ্রন্থকারের এ কথার মধ্যে তাদের মতের সপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। কারণ, উক্ত কথা দ্বারা গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য আল্লাহ তা‘আলা ওয়া তা‘আলাকে সৃষ্টির কারও সাদৃশ্যতা থেকে পবিত্র ঘোষণা করা। তবে তিনি একটি অস্পষ্ট বাক্য নিয়ে এসেছেন যা স্পষ্ট করার প্রয়োজন, যাতে করে সন্দেহ সংশয় দূরিভূত হয়। এখানে গ্রন্থকার ‘সীমা’ বলে বুঝিয়েছেন সে সীমা যা মানুষ জানে। কারণ, মহান আল্লাহর সীমা-পরিসীমা তিনি ব্যতীত কেউ জানে না। যেমন, তিনি সূরা ত্বা-হায় বলেন,

﴿يَعۡلَمُ مَا بَيۡنَ أَيۡدِيهِمۡ وَمَا خَلۡفَهُمۡ وَلَا يُحِيطُونَ بِهِۦ عِلۡمٗا ١١٠﴾ [طه: ١١٠] 

“তিনি তাদের সামনে ও পিছনে যা আছে সবই জানেন আর তারা তাঁকে জ্ঞানে আয়ত্ব করতে পারে না”। [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ১১০] সালাফে সালেহীন তথা পূণ্যবান পূর্বসূরীগণের মধ্যে যারা আরশের উপর আরোহণ ইত্যাদি সংক্রান্ত সীমা বর্ণনা করেছেন, সেখানে ‘সীমা’ দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে এমন সীমা-পরিসীমার কথা যা আল্লাহ তা‘আলা জানেন, বান্দার জানা কোনো সীমা নয়।

গ্রন্থকারের অন্য কথা, আল্লাহ তা‘আলা ‘অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও সাজ-সরঞ্জাম থেকে মুক্ত’ এর দ্বারাও তাঁর উদ্দেশ্য হচ্ছে মহান আল্লাহ তা‘আলা ওয়াতা‘আলাকে তাঁর প্রজ্ঞা ও সত্তার সাথে সম্পৃক্ত গুণাবলী যেমন চেহারা, হাত, পা ইত্যাদিতে সৃষ্টির কারও সাথে সামঞ্জস্য বিধান করা থেকে পবিত্র করা। তবে মহান আল্লাহ তা‘আলা চেহারা, হাত, পা ইত্যাদি গুণাগুণে গুণান্বিত, যদিও তাঁর কোনো গুণ সৃষ্টিকুলের কারও গুণের মত নয়। আর আল্লাহ ব্যতীত অপর কেউ তাঁর এ গুণের ধরণ সম্পর্কে অবহিত নয়। বিদ‘আতীরা এ ধরণের শব্দ ব্যবহার করে থাকে যাতে করে এর দ্বারা আল্লাহর গুণাবলী অস্বীকার করতে পারে। আর সে উদ্দেশ্যে তারা এমন সব শব্দ ব্যবহার করে যেগুলো আল্লাহ তা‘আলা নিজে বলেননি এবং নিজের জন্য সাব্যস্ত করেননি; যাতে করে তাদের ষড়যন্ত্র প্রকাশিত হয়ে না পড়ে এবং হকপন্থীরা তাদের উপর দোষ না দিতে পারে। গ্রন্থকার অবশ্য ‘বিদ‘আতীদের’ মত উদ্দেশ্য নেননি। কারণ, তিনি আহলে সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত, যারা আল্লাহর গুণাবলী সাব্যস্তকারী। এ আকীদায় তার কথা-বার্তার একাংশ অপর অংশের ব্যাখ্যা করে, একাংশ অপর অংশের সত্যায়ণ করে এবং সন্দেহযুক্ত অংশকে সন্দেহমুক্ত অংশ ব্যাখ্যা করে।

অনুরূপভাবে গ্রন্থকারের কথা ‘অন্যান্য সৃষ্ট বস্তুর ন্যায় ষষ্ঠ দিক তাঁকে বেষ্টন করে রাখতে পারে না’ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, সৃষ্টিগত ছয়টি দিক। এর দ্বারা মহান আল্লাহর উচ্চে থাকা ও আরশের উপর তাঁর আরোহন করার বিষয়টি অস্বীকার করা উদ্দেশ্য নয়। কারণ এটি সৃষ্ট ছয় দিকের অভ্যন্তরে নয়। কারণ তিনি সৃষ্টিজগতের উপরে এবং সৃষ্টিজগতকে পরিবেষ্টন করে আছেন। মহান আল্লাহর সুউচ্চে থাকার বিষয়টির ওপর ঈমান থাকা তিনি তাঁর বান্দাদের ফিতরাত তথা অন্তরে স্বাভাবিকভাবে গেঁথে দিয়েছেন। তাদের স্বাভাবিক অন্তরের কথা হচ্ছে যে, তিনি উপরের দিকে। এ বিষয়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত তথা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লামের সাহাবী এবং সুন্দরভাবে তাঁদের অনুসারী তাবে‘ঈগণও এর ওপর একমত হয়েছেন। কুরআনে কারীম ও সহীহ মুতাওয়াতির (নিরঙ্কুশ নিঃসন্দেহে বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত) সুন্নাহ স্পষ্ট প্রমাণ দিচ্ছে যে, তিনি উপরে রয়েছেন। হে প্রিয় পাঠক এ বিষয়টি সম্পর্কে ভালোভাবে সাবধান থাকুন এবং জেনে রাখুন যে এটাই সত্য, এটা ব্যতীত অন্য কিছু বাতিল। আর আল্লাহই তাওফীক দেওয়ার মালিক। [ই.বা.]

[2] আর তা হচ্ছে শরী‘আতের মৌলিক ও শাখা-প্রশাখাজনিত জ্ঞান।

[3] গ্রন্থকার এখানে অবিদ্যমান জ্ঞান বলে গায়েবী জ্ঞান বুঝিয়েছেন। যা একমাত্র আল্লাহর সাথেই সংশ্লিষ্ট। কোনো মানুষ যদি সেটার দাবী করবে তবে সে কাফির হয়ে যাবে। কারণ আল্লাহ তা‘আলা ওয়াতা‘আলা বলেন,

﴿وَعِندَهُۥ مَفَاتِحُ ٱلۡغَيۡبِ لَا يَعۡلَمُهَآ إِلَّا هُوَۚ ﴾ [الانعام: ٥٩] 

“আর তার কাছেই রয়েছে গায়েবের জ্ঞান, যা তিনি ব্যতীত কেউ জানে না”। [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ৫৯]

অনুরূপ মহান আল্লাহ বলেন,

﴿قُل لَّا يَعۡلَمُ مَن فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ ٱلۡغَيۡبَ إِلَّا ٱللَّهُۚ ﴾ [النمل: ٦٥] 

“বলুন, আল্লাহ ব্যতীত আসমান ও যমীনে যারা আছে তারা কেউই গায়েব জানে না”। [সূরা আন-নামল: ৬৫]

অনুরূপ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, গায়েবের চাবিকাঠি পাঁচটি। আল্লাহ ছাড়া আর তা কেউ জানে না। তারপর তিনি তিলাওয়াত করলেন,

﴿ إِنَّ ٱللَّهَ عِندَهُۥ عِلۡمُ ٱلسَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ ٱلۡغَيۡثَ ...﴾ [لقمان: ٣٤] 

“নিশ্চয় আল্লাহর কাছেই রয়েছে কিয়ামতের জ্ঞান আর তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন...”। [সূরা লুকমান, আয়াত: ৩৪] অনুরূপভাবে এতদসংক্রান্ত আরও বহু হাদীস রয়েছে, যেগুলো প্রমাণ করে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গায়েব জানতেন না, যদিও তিনি সৃষ্টিকুলের শ্রেষ্ঠ এবং রাসূলদের নেতা। সুতরাং তিনি ব্যতীত অন্যরা তো মোটেই জানার কথা নয়। বস্তুত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও এ জ্ঞানের কিছুই জানতেন না, যতক্ষণ না আল্লাহ তাকে তা হতে কিছু জানাতেন। এ জন্যই আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ওপর অপবাদ দেওয়ার বিষয় নিয়ে লোকেরা যখন বলাবলি করছিল তখন তিনি অহী নাযিল হওয়ার মাধ্যমে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার পবিত্রতার ঘোষণা না আসা পর্যন্ত কিছুই জানতে পারেননি। অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো এক সফরে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার হার হারিয়ে গেলে তিনি বেশ কয়েকজনকে সেটার খোঁজে পাঠিয়েছিলেন, সেটা কোথায় আছে সেটা জানতে পারেননি, অবশেষে যখন উট দাঁড় করানো হলো তখন তারা হারটিকে উটের নিচে দেখতে পেল। আর কুরআন ও সুন্নায় এ বিষয়ে বহু দলীল-প্রমাণাদি রয়েছে। আল-হামদুলিল্লাহ। [ই.বা.]  

আর গায়েবী জ্ঞানের অন্যতম হচ্ছে, তাকদীরের জ্ঞান, যা আল্লাহ তার সৃষ্টির কাছে পর্দাবৃত রেখেছেন। সেটাও কোনো সৃষ্টিই তা জানতে পারে না।