ইমেইলে পাঠাতে নিচের ফর্মটি পূরণ করুন
security code
পবিত্র বাইবেল পরিচিতি ও পর্যালোচনা দশম অধ্যায় - পবিত্র বাইবেল ও মুহাম্মাদ (ﷺ) ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.)
(২৪) যোহন/ ইউহোন্না ১৬/৭-১৫

নতুন নিয়মের ৪র্থ পুস্তক ইউহোন্না বা যোহন লিখিত সুসমাচার। এ পুস্তকটাতে যীশুর পরে একজন সহায় আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী বিদ্যমান। এ জাতীয় একটা বক্তব্য নিম্নরূপ:

‘‘তবুও আমি তোমাদেরকে সত্যি বলছি, আমার যাওয়া তোমাদের পক্ষে ভাল, কারণ আমি না গেলে সেই সহায় তোমাদের কাছে আসবেন না; কিন্তু আমি যদি যাই, তবে তোমাদের কাছে তাঁকে পাঠিয়ে দেব। আর তিনি এসে গুনাহ্র সম্বন্ধে, ধার্মিকতার সম্বন্ধে ও বিচারের সম্বন্ধে, জগৎকে দোষী করবেন। গুনাহ্র সম্বন্ধে, কেননা তারা আমার উপর ঈমান আনে না; ধার্মিকতার সম্বন্ধে, কেননা আমি পিতার কাছে যাচ্ছি ও তোমরা আর আমাকে দেখতে পাবে না; বিচারের সম্বন্ধে, কেননা এই দুনিয়ার অধিপতিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তোমাদেরকে বলবার আমার আরও অনেক কথা আছে, কিন্তু তোমরা এখন সে সব সহ্য করতে পার না। যখন তিনি, সত্যের রূহ্ আসবেন তখন পথ দেখিয়ে তোমাদেরকে পূর্ণ সত্যে নিয়ে যাবেন; কারণ তিনি নিজের থেকে কিছু বলবেন না, কিন্তু যা যা শোনেন, তাই বলবেন এবং আগামী ঘটনাও তোমাদেরকে জানাবেন। তিনি আমাকে মহামান্বিত করবেন; কেননা যা আমার, তা-ই তিনি তোমাদেরকে জানাবেন। পিতার যা যা আছে, সকলই আমার; এজন্য বললাম, যা আমার, তিনি তা-ই তোমাদেরকে জানাবেন।’’ (মো.-১৩) পুনশ্চ: ইউহোন্না ১৪/১৫-১৭, ২৬-২৯, ১৫/২৬-২৭।

আমরা দেখেছি যে, প্রচলিত ইঞ্জিলগুলো গ্রীক ভাষায় রচিত। গ্রীক ইঞ্জিলে এখানে ‘পারাক্লীত’ (Paraclete) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, বাংলায় যা ‘সহায়’ অনুবাদ করা হয়েছে। আমরা আরো দেখেছি যে, যীশু তাঁর সাহাবীদের ভাষা ছিল হিব্রু-আরামাইক। এ কথাগুলোও যীশু তাঁর ভাষায় বলেছিলেন। প্রশ্ন হলো, তিনি এ সকল বক্তব্যে ‘সহায়’ বোঝাতে যীশু হিব্রু বা আরামাইক ভাষায় কী বলেছিলেন? জানার কোনো উপায় নেই। আমরা শুধু হিব্রু শব্দটার গ্রীক অনুবাদ জানতে পারছি।

এখানে দু’টো গ্রীক শব্দ বিবেচ্য। পারাক্লীটোস (Paracletos) এবং পেরিক্লীটোস (Periclytos)। প্রথম শব্দের অর্থ সান্তনাদানকারী, সাহায্যকারী বা উকিল। আর দ্বিতীয় শব্দটার অর্থ প্রশংসিত বা প্রশংসাকারী, যা ‘মুহাম্মাদ’ ও ‘আহমদ’ শব্দের সমার্থক। গ্রীক ভাষায় দু’টা শব্দের বানান ও লিখন পদ্ধতি প্রায় একই। ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে একটার স্থানে আরেকটা শব্দ লেখা খুবই স্বাভাবিক।

যীশু তাঁর মাতৃভাষায় কোন্ শব্দ ব্যবহার করেছিলেন তা আমরা জানতে পারছি না। গ্রীক অনুবাদের মূল শব্দটা যদি পেরিক্লীটোস (Periclytos) হয়ে থাকে বোঝা যায় যে, তিনি হিব্রুতে আহমদ বা মুহাম্মাদ বা এ অর্থে কোনো শব্দ বলেছিলেন; কারণ আরবী ও হিব্রু ভাষার মূল একই। আর পারাক্লীটোস (Paracletos) হলেও সমস্যা নেই। তিনি হয়ত নাম না বলে তাঁর বিশেষণ বলেছিলেন। মূল শব্দ যাই হোক না কেন, উপরের বক্তব্যটা সুস্পষ্টভাবেই পরবর্তী একজন নবীর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী। মুসলিমরা দাবি করেন যে, এটা মুহাম্মাদ (ﷺ) বিষয়ক ভবিষ্যদ্বাণী। তিনিই সত্যের আত্মা বা আল-আমীন ছিলেন এবং তিনিই ঈসা মাসীহের পরে এসে তার বিষয়ে ইহূদি ও ত্রিত্ববাদী খ্রিষ্টানদের মিথ্যাচার দূর করে তাকে মহিমান্বিত করেছেন। ঈসা মাসীহ যা বলে যেতে পারেননি সে সকল কথা তিনি বলে ইসলামী শরীয়তের পূর্ণতা প্রদান করেছেন। তিনি নিজের থেকে কিছুই বলেননি; ওহীর মাধ্যমে যা পেয়েছেন তাই বলেছেন।

খ্রিষ্টীয় বিশ্বাসে এখানে যীশু পবিত্র আত্মার আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। যীশুর তিরোধানের পর পঞ্চাশত্তমীর দিন তাঁর শিষ্যরা একত্রিত হন এবং তখন পবিত্র আত্মা তাঁদের উপর অবতীর্ণ হন (প্রেরিত: ২ অধ্যায়)। খ্রিষ্টানরা বিশ্বাস করেন যে, যীশু পবিত্র আত্মার এ আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। বিশেষত ইঞ্জিলের মধ্যেই কোথাও কোথাও পারাক্লীতের ব্যাখ্যায় ‘পবিত্র আত্মা’ বলা হয়েছে।

মুসলিম লেখকরা বিভিন্নভাবে এ দাবি খণ্ডনের চেষ্টা করেন। তারা বলেন, পরাক্লীতের ব্যাখ্যায় পবিত্র আত্মা কথাটা বাহ্যত ইঞ্জিল লেখকদের সংযোজিত ব্যাখ্যা। এছাড়া পবিত্র আত্মা বলতে বাইবেলে পবিত্র মানুষদেরকেও বোঝানো হয়েছে। যীশুর ভবিষ্যদ্বাণীতে সুস্পষ্ট যে, তিনি সতন্ত্র সত্বাময় একজন মানুষের আগমনের কথা বলছেন।

পারাক্লীত বিষয়ে যীশু বলেছেন, ‘‘আর এখন, ঘটবার আগে, আমি তোমাদেরকে বললাম, যেন ঘটলে পর তোমরা বিশ্বাস কর’’ (ইউহোন্না ১৪/২৯, মো.-১৩)। এ থেকে জানা যায় যে, ফারাক্লীত বলতে পৃথক একজন মানুষের কথা বলা হয়েছে পবিত্র আত্মাকে বোঝানো হয়নি। কারণ, পবিত্র আত্মার অবতরণের সময় শিষ্যরা তা অবিশ্বাস করবেন বলে ধারণা করার কোনো উপায় নেই। কারো উপর পাক রূহ বা পবিত্র আত্মা অবতরণ করবেন অথচ তা তিনি অবিশ্বাস করবেন এ কথা কি কল্পনা করা যায়? পক্ষান্তরে ফারাক্লীত বলতে যদি একজন নবীকে বোঝানো হয় তবে এ কথাটা সার্থক ও যথাযথ বলে গণ্য হয়। উপরন্তু নতুন নবীকে অবিশ্বাস করার প্রবণতার দিকে লক্ষ্য করলে এ কথাটা অত্যন্ত মূল্যবান বলে গণ্য হয়।

এছাড়া যীশু বলেছেন: ‘‘আমি না গেলে সেই সহায় তোমাদের কাছে আসবেন না; কিন্তু আমি যদি যাই, তবে তোমাদের কাছে তাঁকে পাঠিয়ে দেব।’’ এতে প্রমাণিত হয় যে, ফারাক্লীত বলতে কখনোই পবিত্র-আত্মাকে বোঝানো হয়নি। কারণ পবিত্র আত্মার আগমনের জন্য যীশুর তিরোধান কখনোই পূর্বশর্ত ছিল না। আমরা দেখেছি যে, যীশু বিদ্যমান থাকা অবস্থাতেই পবিত্র আত্মা তাদের কাছে এসেছেন (মথি ৩:১৩)। ফারাক্লীত বলতে এমন এক ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে যার সাথে প্রেরিতরা যীশুর স্বর্গারোহণের পূর্বে পরিচিত হননি বা যীশুর স্বর্গারোহণের পূর্বে তিনি কোনোভাবে পৃথিবীতে আসেননি। তাঁর আগমনের পূর্বশর্ত ছিল যীশুর প্রস্থান।

এছাড়া যীশু বলেছেন, ‘‘কারণ তিনি নিজের থেকে কিছু বলবেন না, কিন্তু যা যা শোনেন, তা-ই বলবেন।’’ এ থেকেও জানা যায় যে, ফারাক্লীত এমন ব্যক্তি হবেন, যার কথাকে নিজের বানোয়াট কথা মনে করে তাকে মিথ্যাবাদী বা ভন্ড বলে প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ থাকবে। এজন্য যীশুকে তাঁর সত্যবাদিতা সম্পর্কে নিশ্চয়তা প্রদান করতে হলো। পবিত্র আত্মার ক্ষেত্রে এরূপ সম্ভাবনা কল্পনা করা যায় না।  এছাড়া খ্রিষ্টীয় বিশ্বাস অনুসারে ‘পবিত্র-আত্মা’ই ঈশ্বর এবং ঈশ্বরের তিন ব্যক্তির এক ব্যক্তি, এরা তিনজন মিলে এক ঈশ্বর। তাহলে কি কল্পনা করা যায় যে, পবিত্র আত্মা পিতা ঈশ্বরের অনুমতি বা সম্মতির বাইরে নিজে বানিয়ে কিছু বলতে পারেন বা বলার সম্ভাবনা তার ক্ষেত্রে থাকে? তিনিই যেহেতু ঈশ্বর তাহলে তিনি কার কাছ থেকে শুনে শুনে এসে বলবেন? তিনি কী ঈশ্বরের কথার বাইরে নিজের থেকে বানোয়াট কথা বলতে পারেন? তিনি যেহেতু ঈশ্বর সেহেতু তার নিজের কথাও কি ঈশ্বরের কথা নয়? তাহলে যীশুর এ কথার অর্থ বা প্রয়োজনীয়তা কী?

এতে প্রতীয়মান যে, যীশু মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর কথাই এখানে বলেছেন। তাঁর ক্ষেত্রে তাঁর কথাকে মনগড়া বলে প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ ছিল। আর তিনি ঈশ্বর ছিলেন না বা ঈশ্বরের অংশ ছিলেন না কাজেই তাকে কিছু বলতে হলে ঈশ্বরের নিকট থেকে শ্রবণ করার দরকার ছিল। আর তিনি ওহীর মাধ্যমে ‘যাহা যাহা শুনিতেন তাহাই বলিতেন’। এ জন্যই আল্লাহ বলেছেন: ‘‘তিনি মনগড়া কথা বলেন না। (সে যা বলে) তা তো ওহী, যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়।’’ (সূরা নাজম: ৩-৪ আয়াত)

এখানে আরো লক্ষণীয় যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) বিষয়ক পূর্ববর্তী এক ভবিষ্যদ্বাণীর আলোচনায় আমরা দেখেছি যে, সেখানে বলা হয়েছে: ‘‘তার মুখে আমার কালাম দেব; আর আমি তাঁকে যা যা হুকুম করব তা তিনি ওদেরকে বলবেন।’’ আর এখানে বলা হয়েছে, ‘‘কারণ তিনি নিজের থেকে কিছু বলবেন না, কিন্তু যা যা শোনেন, তা-ই বলবেন।’’ উভয় কথার অর্থ একই। এতে প্রমাণিত হয় যে, মাবুদ মূসা (আ)-এর কাছে যে নবীর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাঁরই আগমন বার্তা শুনিয়েছেন ঈসা (আ)।