ইমেইলে পাঠাতে নিচের ফর্মটি পূরণ করুন
security code
আল ইরশাদ-সহীহ আকীদার দিশারী الأصل الخامس: الإيمان باليوم الآخر - পঞ্চম মূলনীতি: শেষ দিবসের প্রতি ঈমান শাইখ ড. ছলিহ ইবনে ফাওযান আল ফাওযান
৮- النفخ في الصور والصعق - ৮. শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া এবং আসমান-যমীনের সবাই সংজ্ঞাহীন হওয়া

কুরআনুল কারীমে সিঙ্গায় ফুঁ দেয়ার আলোচনা অনেকবার এসেছে। সিঙ্গায় ফুঁ দেয়ার সময় যা কিছু ঘটবে সে সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়েছে। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমীয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, কুরআনে তিনটি ফুঁ দেয়ার কথা উল্লেখ আছে। ভয়-ভীতি ও আতঙ্কের ফুৎকার। সূরা নামালে এ ফুৎকারের কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿وَيَوْمَ يُنْفَخُ فِي الصُّورِ فَفَزِعَ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ إِلاَّ مَنْ شَاءَ اللَّهُ﴾

‘‘আর সেদিন শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে। ফলে আকাশ ও যমীনে যারা আছে সকলেই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে। তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন, সে ব্যতীত’’। (সূরা আন নামল: ৮৭)

 (২) সংজ্ঞাহীন হওয়া ও (৩) দাঁড়ানোর ফুৎকার সম্পর্কে সূরা আয্ যুমারে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,   

﴿وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَصَعِقَ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ نُفِخَ فِيهِ أُخْرَى فَإِذَا هُمْ قِيَامٌ يَنْظُرُونَ﴾

‘‘এবং শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে। ফলে আকাশ ও যমীনে যারা আছে সকলেই বেহুশ হয়ে যাবে। তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন, সে ব্যতীত। অতঃপর আবার শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে। তৎক্ষনাৎ তারা দন্ডায়মান হয়ে দেখতে থাকবে’’। (সূরা যুমার: ৬৮)

এখানে যারা ভীত-আতঙ্কিত হবেনা বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তারা হলেন জান্নাতের হুরগণ। কেননা জান্নাতে কোনো মৃত্যু নেই। অনেকেই তা থেকে রেহাই পাবে। তবে কারা কারা ভয়-ভীতি ও আতঙ্কগ্রস্থ হওয়া থেকে রেহাই পাবে, তাদের প্রত্যেককে দৃঢ়তার সাথে সনাক্ত করা সম্ভব নয়। কেননা আল্লাহ তা‘আলা তার কিতাবে বিষয়টিকে সাধারণ রেখেছেন। সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

«لَا تُفَضِّلُونِي عَلَى مُوسَى فَإِنَّ النَّاسَ يُصْعَقُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، فَأَكُونُ أَوَّلَ مَنْ يُفِيقُ، فَأَجِدُ مُوسَى بَاطِشًا بِسَاقِ الْعَرْشِ، فَلَا أَدْرِي هَلْ أَفَاقَ قَبْلِي، أَوْ كَانَ مِمَّنِ اسْتَثْنَاه اللَّهُ؟»

‘‘তোমরা আমাকে মূসার উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করো না। কেননা কিয়ামতের দিন সমস্ত মানুষ অজ্ঞান হয়ে যাবে। আমিই সর্বপ্রথম জ্ঞান ফিরে পাবো। জ্ঞান ফিরে পেয়ে আমি দেখতে পাবো, মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর আরশের খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি জানিনা, তিনি কি আমার পূর্বে জ্ঞান ফিরে পেয়েছেন? না কি আল্লাহ তা‘আলা তাকে ঐসব সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যারা সংজ্ঞাহীন হবে না?’’[1] এ সংজ্ঞাহীন হওয়ার ব্যাপারে কেউ কেউ বলেছেন, এটি চতুর্থবার ফুঁ দেয়ার কারণে। কেউ কেউ বলেছেন, এটি কুরআনে উল্লেখিত ফুৎকার সমূহেরই অন্তর্ভুক্ত। শাইখুল ইসলামের উক্তি এখানেই শেষ।  ইমাম সাফারায়েনী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, জেনে রাখুন যে, শিঙ্গায় তিনবার ফুঁ দেয়া হবে। (১) ভীত-সন্ত্রস্ত ও আতঙ্কিত হওয়ার ফুৎকার। এর মাধ্যমে সৃষ্টিজগতের শৃঙ্খলা পরিবর্তন হবে এবং সেটা নষ্ট হয়ে যাবে। এ দিকে ইশারা করেই আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَمَا يَنْظُرُ هَؤُلَاءِ إِلَّا صَيْحَةً وَاحِدَةً مَا لَهَا مِنْ فَوَاقٍ﴾

এরা তো কেবল অপেক্ষা করছে এক মহাগর্জনের, যাতে কোনো বিরতি থাকবে না। (সূরা সোয়াদ: ১৫) অর্থাৎ কোনো পুনরাবৃত্তি হবে না। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿وَيَوْمَ يُنْفَخُ فِي الصُّورِ فَفَزِعَ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ اللَّهُ﴾

‘‘এবং শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে। ফলে আসমান ও যমীনে যারা আছে সবাই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে যাবে। তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন, সে ব্যতীত। অতঃপর আবার শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে। তখন তারা দন্ডায়মান হয়ে দেখতে থাকবে’’। (সূরা আয যুমার: ৮৭)

ইমাম যামাখশারী রাহিমাহুল্লাহ তার কাশ্শাফে এ আয়াতে শিঙ্গায় ফুঁ দেয়ার সময় ভয়-ভীতি থেকে যেসব ফেরেশতাদেরকে মুক্ত রাখবেন, তারা হলেন জিবরীল, মীকাঈল, ইসরাফীল ও মালাকুল মাওত। কেউ কেউ অন্য কথাও বলেছেন। শিঙ্গায় ফুঁ দেয়ার সময় যে ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হবে, তার কারণেই তারা ভীত-আতঙ্কিত হয়ে যাবে।

(২) ইমাম সাফারায়েনী রাহিমাহুল্লাহ আরো বলেন, দ্বিতীয় ফুৎকারটি হবে সংজ্ঞাহীন হওয়ার জন্য। এতে সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,   

﴿وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَصَعِقَ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ اللَّهُ﴾

‘‘এবং শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে। ফলে আকাশ ও যমীনে যারা আছে সকলেই সংজ্ঞাহীন হয়ে যাবে। তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন, সে ব্যতীত’’। (সূরা যুমার: ৬৮) সংজ্ঞাহীন হওয়াকে মৃত্যু বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

শিঙ্গাটি হবে নূরের। সমস্ত সৃষ্টির রূহকে সেটার মধ্যে ঢুকানো হবে। মুজাহিদ বলেন, এটি হবে হর্ন বা বিউগলের মতো। ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ এ কথা উল্লেখ করেছেন। ইমাম তিরমিযী রাহিমাহুল্লাহ আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন যে, জনৈক গ্রাম্য লোক নবী করীম সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বললো, শিঙ্গা কী? জবাবে তিনি বললেন, এটি হলো একটি শিঙ্গা, যাতে ফুঁ দেয়া হবে। ইমাম তিরমিযী বলেন, হাদীছটি হাসান।

(৩) তৃতীয় ফুৎকারটি হবে পুনরুত্থান ও হিসাব-নিকাশের। পবিত্র কুরআনের বহু আয়াত এবং অনেক হাদীছ শিঙ্গায় পুনরুত্থানের ফুঁ দেয়ার কথা প্রমাণ করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَإِذَا هُم مِّنَ الْأَجْدَاثِ إِلَىٰ رَبِّهِمْ يَنسِلُونَ﴾

‘‘তারপর শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে এবং সহসা তারা নিজেদের রবের সামনে হাযির হবার জন্য নিজেদের কবর থেকে বের হবে’’। (সূরা ইয়াসীন: ৫১) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿ثُمَّ نُفِخَ فِيهِ أُخْرَى فَإِذَا هُمْ قِيَامٌ يَنْظُرُونَ﴾

‘‘অতঃপর আবার শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে। তখন তারা দন্ডায়মান হয়ে দেখতে থাকবে’’। (সূরা যুমার: ৬৮) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿فَإِذَا نُقِرَ فِي النَّاقُورِ (8) فَذَلِكَ يَوْمَئِذٍ يَوْمٌ عَسِيرٌ (9) عَلَى الْكَافِرِينَ غَيْرُ يَسِيرٍ﴾    

‘‘যেদিন শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে। সেদিন হবে এক সঙ্কটের দিন। যা কাফেরদের জন্য সহজ নয়। (সূরা আল-মুদ্দাছছির: ৮-১০) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿وَاسْتَمِعْ يَوْمَ يُنَادِ الْمُنَادِ مِنْ مَكَانٍ قَرِيبٍ (41) يَوْمَ يَسْمَعُونَ الصَّيْحَةَ بِالْحَقِّ ذَلِكَ يَوْمُ الْخُرُوجِ﴾

‘‘মন দিয়ে শোন! যেদিন এক ঘোষক ঘোষণা করবে নিকটবর্তী স্থান হতে আহবান করবে। সেদিন মানুষ অবশ্যই শ্রবণ করবে এক বিরাট আওয়াজ। সেদিনই বের হওয়ার দিন’’। (সূরা কাফ: ৪০-৪১)

মুফাসসিরগণ বলেন, আহবায়ক হলেন ইসরাফীল আলাইহিস সালাম। তিনি শিঙ্গায় ফুঁ দিবেন এবং আহবান করবেন, হে পুরাতন হাড্ডীসমূহ! হে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন পেশী ও মাংসসমূহ এবং বিক্ষিপ্ত চুলসমূহ! আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে একত্রিত হওয়ার আদেশ দিচ্ছেন। যাতে তিনি বান্দাদের মাঝে বিচার-ফায়ছালা করতে পারেন।

কেউ কেউ বলেছেন, ইসরাফীল ফুঁ দিবেন এবং জিবরীল ডাক দিবেন। নিকটবর্তী স্থান বলতে বাইতুল মুকাদ্দাসের একটি পাথর উদ্দেশ্য। আরেকদল মুফাস্সির বলেছেন, উভয় ফুৎকারের মাঝের ব্যবধান হবে চল্লিশ বছর। কতিপয় আলেম বলেছেন, সমস্ত বর্ণনা একথারই প্রমাণ বহন করে। সহীহ মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে মারফু হিসাবে বর্ণিত হয়েছে যে, উভয় ফুৎকারের মধ্যে চল্লিশের ব্যবধান হবে। সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, হে আবু হুরায়রা! চল্লিশ দিন? আবু হুরায়রা বলেন, আমি তা বলতে অস্বীকার করলাম। সাহাবীগণ আবার জিজ্ঞাসা করলেন, চল্লিশ মাস? তিনি বলেন, আমি তা বলতেও অস্বীকার করলাম। তারা বললেন, চল্লিশ বছর? তিনি বলেন, আমি তাও অস্বীকার করলাম.....।

আবু হুরায়রার উক্তি, আমি অস্বীকার করলাম, এ কথার তিনটি ব্যাখ্যা রয়েছে। (১) প্রথম ব্যাখ্যা হলো, আমি তোমাদের জন্য সেটা বলা থেকে বিরত থাকলাম। (২) কেউ কেউ বলেছেন, আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর কথার অর্থ হলো আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ইহা জিজ্ঞাসা করা থেকে বিরত রয়েছি। (৩) কেউ কেউ বলেছেন, আমি জিজ্ঞাসা করতে ভুলে গিয়েছিলাম। কেউ কেউ বলেছেন, তিনি তা খুলে বলা থেকে বিরত থাকার কারণ হলো, এ বিষয়ে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ অবগত নয়। কেননা এটি মহান আল্লাহর রুবুবীয়াতের বৈশিষ্ট।

আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে ইবনে জারীর, তাবারী, আবু ইয়ালা স্বীয় মুসনাদে, বায়হাকী পুনরুত্থান অধ্যায়ে, আবু মুসা আল-মাদীনি এবং অন্যরা যে দীর্ঘ হাদীছ বর্ণনা করেছেন, তাতে তিনি বলেছেন যে, আমাদের কাছে রসূল সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা যখন আসমান-যমীন সৃষ্টি করে শেষ করলেন তখন শিঙ্গা সৃষ্টি করলেন এবং সেটা ইসরাফীলকে দিলেন। তিনি সেটাকে তার মুখে রেখে আরশের দিকে মাথা উঠিয়ে অপেক্ষা করছেন, কখন তাকে সেটাতে ফুঁ দেয়ার আদেশ দেয়া হবে। আবু হুরায়রা বলেন, আমি বললাম, ইয়া রসূলাল্লাহ! শিঙ্গা কী? তিনি বললেন, সেটা হলো হর্ন বা বিউগল। আবু হুরায়রা বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কী দিয়ে সেটা সৃষ্টি করা হয়েছে? তিনি বললেন, সেটা একটি বিরাট শিঙ্গা। সেটার একটি আংটা আসমান-যমীনের চেয়ে বড়। তাতে তিনি তিনবার ফুঁ দিবেন। প্রথমটি হবে ভীত-সন্ত্রস্ত হওয়ার ফুৎকার, দ্বিতীয়টি হবে সংজ্ঞাহীন হওয়ার ফুৎকার ও তৃতীয়টি হবে সৃষ্টিজগতের প্রভুর সামনে দন্ডায়মান হওয়ার ফুৎকার।

আল্লাহ তা‘আলা ইসরাফীলকে প্রথমবার ফুঁ দেয়ার আদেশ দিবেন। তুমি ভয়-ভীতি ও আতঙ্কগ্রস্থ হওয়ার ফুঁ প্রদান করো। তিনি ফুঁ দিবেন। এতে আসমান-যমীনের সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত ও আতঙ্কিত হবে। তবে আল্লাহ তা‘আলা যাকে এর বাইরে রাখবেন, তার কথা ভিন্ন। আল্লাহ তাকে ফুঁ দেয়ার আদেশ দিবেন। তিনি দীর্ঘ ফুৎকার প্রদান করবেন এবং কোনো প্রকার ক্লান্তিবোধ করবেন না। এ সম্পর্কেই আল্লাহ তা‘আলা বলছেন,

﴿وَمَا يَنْظُرُ هَؤُلَاءِ إِلَّا صَيْحَةً وَاحِدَةً مَا لَهَا مِنْ فَوَاقٍ﴾

‘‘এরা তো কেবল অপেক্ষা করছে এক মহাগর্জনের, যাতে কোনো বিরতি থাকবে না’’। (সূরা সোয়াদ: ১৫)

অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা পাহাড়গুলো চালিত করবেন। এতে মেঘমালা চলার মতো তা চলতে থাকবে। অতঃপর সেটা মরীচিকার মতো হয়ে যাবে। যমীন তার সমস্ত বাসিন্দা সহকারে প্রকম্পিত হবে। সেটা সমুদ্রে ভাসমান মাল বোঝাই করা নৌকার মতো হবে, যাকে আঘাত করছে ঢেউয়ের পর ঢেউ এবং তা ঝুলতে থাকবে ঐ ফানুসের মতো, যা লটকানো আছে আরশের সাথে এবং সেটাতে আশ্রয় নিচ্ছে মুমিনদের রূহসমূহ। আল্লাহ তা‘আলা এ সম্পর্কে বলেন,

﴿يَوْمَ تَرْجُفُ الرَّاجِفَةُ (6) تَتْبَعُهَا الرَّادِفَةُ﴾

‘‘সেদিন প্রকম্পিত করবে মহাপ্রলয়ের প্রথম শিঙ্গাধ্বনি। তার অনুগামী হবে পরবর্তী শিঙ্গাধ্বনি’’। (সূরা আন্-নাযিআত: ৬-৭)

এতে যমীন কাত হয়ে যাবে মানুষের পিঠের উপরে। স্তন্য দানকারীনী মহিলারা কোলের দুপোষ্য শিশুকে ভুলে যাবে, শিশুরা বৃদ্ধে পরিণত হবে এবং ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে শয়তান উড়ে পালানোর চেষ্টা করবে। এমনকি সে দিগমেত্মর দিকে চলে যাবে। কিন্তু ফেরেশতারা তাকে পাকড়াও করবে এবং তার চেহারায় আঘাত করবে। অতঃপর সে আঘাত খেয়ে ফিরে আসবে। মানুষেরা পরস্পরকে ডকাডাকি করতে করতে পালাতে চেষ্টা করবে। আল্লাহ তা‘আলা এ সম্পর্কে বলেন,

﴿يَوْمَ تُوَلُّونَ مُدْبِرِينَ مَا لَكُمْ مِنَ اللَّهِ مِنْ عَاصِمٍ﴾

‘‘সেদিন তোমরা পশ্চাতে ফিরে পলায়ন করতে চাইবে। আল্লাহর শাস্তি থেকে তোমাদের রক্ষাকারী কেউ থাকবে না’’।

এমতাবস্থায় যমীন ফেটে যাবে এবং বিভিন্ন অংশে বিভক্ত হবে। তখন তারা এক ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখতে পাবে। তারা আসমানের দিকে তাকাবে। সেটাকে তারা ফুটন্ত তেলের গাদের মতো দেখতে পাবে। অতঃপর আসমান ফেটে যাবে এবং সেটার নক্ষত্রসমূহ ছিটকে পড়বে। আসমানের সূর্য ও চন্দ্র আলো বিহীন হয়ে যাবে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কবরে দাফন কৃত মৃতরা এ ভয়াবহ অবস্থার কিছুই জানতে পারবে না। বর্ণনাকারী বলেন, আমি বললাম, ইয়া রসূলাল্লাহ!

إِلَّا مَنْ شَاءَ اللَّهُ﴾ ﴿

‘‘তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন, সে ব্যতীত’’ এর মধ্যে আল্লাহ তা‘আলা যাদেরকে আলাদা করেছেন, তারা কারা? তিনি বললেন, তারা হলো শহীদগণ। জীবিত লোকেরা ভীত-আতঙ্কিত হবে। আর শহীদগণ তাদের রবের নিকট জীবিত অবস্থায় রিযিকপ্রাপ্ত হতে থাকবেন। আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে সেদিনের ভয়-ভীতি ও আতঙ্ক থেকে হেফাযত করবেন ও নিরাপত্তা প্রদান করবেন। আর এ ভয়-ভীতি হবে আল্লাহর পক্ষ হতে নিকৃষ্ট লোকদের জন্য শাস্তি স্বরূপ। আল্লাহ তা‘আলা  বলেন,

﴿يَاأَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمٌ يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى النَّاسَ سُكَارَى وَمَا هُمْ بِسُكَارَى وَلَكِنَّ عَذَابَ اللَّهِ شَدِيدٌ﴾

‘‘হে লোক সকল! তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো। নিশ্চয়ই কিয়ামতের প্রকম্পন একটি ভয়ঙ্কর ব্যাপার। সেদিন তোমরা দেখতে পাবে প্রত্যেক স্তন্যদায়ী তার দুধের শিশুকে ভুলে গেছে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী মহিলা তার গর্ভের সন্তান প্রসব করে দিবে আর তুমি মানুষকে মাতাল অবস্থায় দেখতে পাবে। অথচ তারা মাতাল নয়। বস্তুত আল্লাহর আযাব খুবই কঠিন’’। (সূরা হজ্জ: ১-২)

অতঃপর যতক্ষণ আল্লাহ চাইবেন, ততোক্ষণ তারা উক্ত ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে অবস্থান করতে থাকবে।

আমরা আল্লাহ তা‘আলার কাছে সীরাতুল মুস্তাকীম প্রার্থনা করছি এবং আমরা প্রার্থনা করছি, তিনি যেন আমাদেরকে ঐসব লোকের মধ্যে গণ্য করেন, যাদেরকে ভয়াবহ আতঙ্ক কোনো প্রকার চিন্তিত করবে না এবং যাদেরকে ফেরেশতাগণ নিরাপত্তা দিয়ে বলবেন, এটি হলো সেই দিন, যার ওয়াদা তোমাদের সাথে করা হয়েছে।


[1]. সহীহ বুখারী ২৪১১, সহীহ মুসলিম ২৩৭৩।