আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের নিকট নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র স্ত্রীগণের মর্যাদা

مكانة أزواج النبي صلى الله عليه وسلم عند أهل السنة والجماعة

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের নিকট নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র স্ত্রীগণের মর্যাদা:

ইমাম ইবনে তাইমীয়া (রঃ) বলেনঃ

وَيَتَوَلَّوْنَ أَزْوَاجَ رَسُولِ اللهِ صَلَّىْ اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ أُمَّهَاتِ الْمُؤْمِنِينَ وَيُؤْمِنُونَ بَأَنَّهُنَّ أَزْوَاجُهُ فِي الآخِرَةِ: خُصُوصًا خَدِيجَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا أُمَّ أَكْثَرِ أَوْلاَدِهِ، وَأَوَّلَ مَنْ آمَنَ بِهِ وَعَاَضَدَهُ عَلَى أَمْرِه وَأَوَّلَ مَنْ آمَنَ بِهِ وَعَاَضَدَهُ عَلَى أَمْرِه، وَكَانَ لَهَا مِنْهُ الْمَنْزِلَةُ الْعَالِيَةُ وَالصِّدِّيقَةَ بِنْتَ الصِّدِّيقِ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا، الَّتِي قَالَ فِيهَا النَّبِيُّ صَلَّىْ اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ : "فَضْلُ عَائِشَةَ عَلَى النِّسَاءِ كَفَضْلِ الثَّرِيدِ عَلَى سَائِرِ الطَّعَامِ

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের লোকেরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী উম্মাহাতুল মুমিনদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে। তারা বিশ্বাস করে, আখেরাত দিবসেও তারা তাঁর স্ত্রীরূপেই পরিগণিত হবে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের লোকেরা বিশেষ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী খাদীজা (রাঃ)এর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে। কারণ খাদীজা ছিলেন তাঁর অধিকাংশ সন্তানের জননী, তাঁর প্রতি সর্বপ্রথম ঈমান আনয়নকারীনী এবং দ্বীনের দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে সর্বাত্মক সাহায্যকারীনী। সর্বোপরি খাদীজা (রাঃ)এর ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট সুউচ্চ মর্যাদা।

সিদ্দীকাহ বিনতে সিদ্দীক আয়েশা (রাঃ) সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

«فَضْلَ عَائشَةَ عَلَى النِّسَاءِ كَفَضْلِ الثَّرِيدِ عَلَى سَائرِ الطَّعَامِ»

‘‘আয়েশা (রাঃ)এর মর্যাদা সব নারীর উপর ঠিক সেরকমই, যেমন ছারীদ নামক খাবারের মর্যাদা সকল খাদ্যের উপর’’।[1]


ব্যাখ্যাঃ এই অংশে শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া রাহিমাহুল্লাহ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র স্ত্রীগণের ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের লোকদের আকীদাহ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ তারা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণের প্রতি অন্তর দিয়ে গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে এবং তাদেরকে সম্মান করে। কেননা তারা হলেন শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের দিক থেকে এবং উম্মতের কারো জন্য তাদেরকে বিবাহ করা হারাম হওয়ার দিক থেকে জননী সমতুল্য। তবে বিবাহ ব্যতীত অন্যান্য হুকুম-আহকামের ক্ষেত্রে তাদের হুকুম অপরিচিত মহিলাদের মতই। অর্থাৎ তাদের সাথে নির্জনে একত্রিত হওয়া, তাদের দিকে দৃষ্টিপাত করা, ইত্যাদি সবই হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

﴿النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهَاتُهُمْ﴾

‘‘নবী মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা অধিক ঘনিষ্ঠ তাঁর স্ত্রীগণ তাদের মাতা’’। (সূরা আহযাবঃ ৬) আল্লাহ তাআলা আরো বলেনঃ

﴿وَمَا كَانَ لَكُمْ أَن تُؤْذُوا رَسُولَ اللَّهِ وَلَا أَن تَنكِحُوا أَزْوَاجَهُ مِن بَعْدِهِ أَبَدًا ۚ إِنَّ ذَٰلِكُمْ كَانَ عِندَ اللَّهِ عَظِيمًا﴾

‘‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেয়া মোটেই জায়েয নয় এবং তাঁর পরে তাঁর স্ত্রীদেরকে বিবাহ করাও জায়েয নয়। এটা আল্লাহর দৃষ্টিতে বিরাট গুনাহ্’’। (সূরা আহযাবঃ ৫৩) আল্লাহ তাআলা একই আয়াতে আরো বলেনঃ

﴿وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ ذَلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ﴾

‘‘তোমরা তাঁর পত্নীদের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটা তোমাদের অন্তরের জন্য এবং তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্রতার কারণ’’। সুতরাং সম্মান পাওয়ার দিক থেকে তারা মুমিনদের জননী সমতুল্য; তবে মুমিনগণ আপন মাতার ন্যায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণের জন্য মাহরাম নয়। অর্থাৎ নিজের মাতা, বোন, কন্যা এবং অনুরূপ মহিলার সাথে নির্জনে সাক্ষাৎ করা জায়েয, সেরকম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীদের সাথে নির্জনে মিলত হওয়া জায়েয নয়।

নয়জন স্ত্রী জীবিত রেখে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত্যু বরণ করেছেন। তারা হলেন আয়েশা, হাফসা, যয়নব বিনতে জাহ্শ, উম্মে সালামা, সাফীয়া, মায়মুনা, উম্মে হাবীবা, সাওদা এবং জুআইরিয়া (রাঃ)। তিনি খাদীজাকে নবুওয়াতের পূর্বেই বিবাহ করেছিলেন। তিনি জীবিত থাকতে আর কাউকে বিবাহ করেন নি। যায়নাব বিনতে খুযাইমাকে বিবাহ করার কিছু দিন পরেই যায়নাব মৃত্যু বরণ করেন। এরাই হলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঐ সমস্ত স্ত্রী, যাদের সাথে তিনি ঘরসংসার করেছেন। তাদের সংখ্যা মোট ১১জন। আল্লাহ তাদের উপর সন্তুষ্ট হোন। আমীন।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের লোকেরা আরো বিশ্বাস করে যে, আখেরাত দিবসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণ তাঁর স্ত্রীরূপেই থাকবে। এতে করে তাদের জন্য বিরাট সম্মান ও ফযীলত হাসিল হবে।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী খাদীজার রয়েছে বিশেষ ফযীলত। তাঁর রয়েছে অনেক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট, মর্যাদা এবং ফযীলত। শাইখুল ইসলাম তা থেকে এখানে কয়েকটি উল্লেখ করেছেন। (১) খাদীজা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অধিকাংশ সন্তানের মাতা। সুতরাং ইবরাহীম ব্যতীত তাঁর বাকীসব সন্তানই খাদীজার গর্ভ থেকে। ইবরাহীম (রাঃ) ছিলেন মারিয়া কিবতীর গর্ভ থেকে।

(২) এক মতানুসারে খাদীজাই সর্বপ্রথম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ঈমান আনয়ন করেন। শাইখুল ইসলাম এখানে এই মতটিই উল্লেখ করেছেন। অন্যমতে তিনি মহিলাদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন।

(৩) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে খাদীজাই সর্বপ্রথম সক্রীয়ভাবে সহযোগিতা ও সাহায্য করেছিলেন। তিনি ঠিক সেই সময়ই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাহায্য করেছেন, যখন সাহায্যের খুব প্রয়োজন ছিল।

(৪) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট খাদীজার ছিল উচ্চ মর্যাদা। তিনি খাদীজাকে খুব ভালবাসতেন, তাঁর কথা স্মরণ করতেন এবং তাঁর খুব প্রশংসা করতেন।

আর সিদ্দীকাহ বিনতে সিদ্দীক (রাঃ) সম্পর্কে কথা এই যে, তিনি হলে আয়েশা বিনতে আবু বকর (রাঃ)। অত্যাধিক সত্যবাদীকে সিদ্দীক বলা হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকরকে এই উপাধী দিয়েছেন। আয়েশা (রাঃ)এর রয়েছে অনেক ফযীলত। তার মধ্যে (ক) তিনি ছিলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীদের মধ্যে তাঁর নিকট সর্বাধিক প্রিয়। (খ) তাঁকে ছাড়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আর কোন কুমারী মহিলাকে বিবাহ করেন নি। (গ) আয়েশা (রাঃ)এর সাথে একই চাদরের নীচে থাকা অবস্থায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর অহী নাযিল হতো। (ঘ) মিথ্যুকরা তাঁর উপর যে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিল, আল্লাহ তাআলা নিজেই তাঁকে সেই মিথ্যা অপবাদ থেকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন। (ঙ) তিনি হলেন মহিলাদের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী। (চ) বিজ্ঞ সাহাবীগণ যখন কোন বিষয়ে সমস্যার সম্মুখীন হতেন, তখন তাঁর কাছে সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেন। (ছ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ঘরে এবং তাঁরই বুকের উপর মাথা রেখে মৃত্যু বরণ করেছেন। (জ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাঁর গৃহেই দাফন করা হয়েছে। এ ছাড়াও তাঁর আরো অনেক ফযীলত রয়েছে।[2]আর শাইখুল ইসলাম এখানে তাঁর যেই ফযীলতটি উল্লেখ করেছেন, তা হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, » «فَضْلَ عَائشَةَ عَلَى النِّسَاءِ كَفَضْلِ الثَّرِيدِ عَلَى سَائرِ الطَّعَامِ ‘‘আয়েশা (রাঃ)এর মর্যাদা সব নারীর উপর ঠিক সেরকমই, যেমন ছারীদ নামক খাবারের মর্যাদা অন্যসব খাদ্যের উপর’’। ছারীদ ছিল সে সময়ের সর্বোত্তম খাবার। কেননা তাতে থাকত গোশত ও রুটি। আটার রুটি সর্বোত্তম খাদ্য। আর গোশত হলো সর্বোত্তম সালুন (তরকারী)। গোশত যেহেতু সর্বোৎকৃষ্ট তরকারী এবং আটা যেহেতু সর্বোত্তম খাদ্যদ্রব্য, আর ছারীদ যেহেতু এই উভয় প্রকার বস্ত্ত দ্বারা তৈরী হয়, তাই ছারীদ সর্বোত্তম খাদ্যে পরিণত হয়েছে।

[1] - সেকালে ছারীদ ছিল আরবের সর্বোত্তম খাদ্য, যা রুটি ও মাংস দ্বারা তৈরী হত।

[2] - নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীদের মধ্যে কি আয়েশা (রাঃ) সর্বাধিক উত্তম? না খাদীজা (রাঃ) সর্বাধিক উত্তম? এ বিষয়ে আলেমদের দু’টি কথা রয়েছে। (১) কতিপয় আলেম ফযীলতের ক্ষেত্রে খাদীজাকে আয়েশার উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। আবার অন্যরা খাদীজার উপর আয়েশাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তবে শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া (রঃ) তাদের দুইজনের একজনকে অন্যজনের উপর প্রাধান্য দেয়া থেকে বিরত রয়েছেন।