নবী (সা.) এর ছলাত সম্পাদনের পদ্ধতি কিতাবটির সংকলন পদ্ধতি মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দিন আলবানী (রহ.) ১ টি

ইমামগণের মধ্যে প্রথমেই হলেন ইমাম আবু হানীফা নুমান বিন ছাবিত (রাহিমাহুল্লাহ)। তাঁর সাথীগণ তাঁর অনেক কথা বিভিন্ন ভাষায় বর্ণনা করেছেন, সব কয়টি কথা একটাই বিষয়ের প্রতি নির্দেশ করে, আর তা হচ্ছেঃ হাদীছকে আকড়ে ধরা ও তার বিপক্ষে ইমামগণের কথা পরিহার করা ওয়াজিব। (কথাগুলো হচ্ছে)

(১) إذا صح الحديث فهو مذهبى অর্থঃ হাদীছ বিশুদ্ধ সাব্যস্ত হলে ওটাই আমার মাযহাব বলে পরিগণিত হবে।[1]

لايحل لأحد أن يأخذ بقولنا ما لم يعلم من أين أخذناه (২)

আমরা কোথা থেকে কথাটি নিলাম এটা না জানা পর্যন্ত কারো জন্য আমাদের কথা গ্ৰহণ করা বৈধ নয়।[2]

অপর বর্ণনায় রয়েছেঃ

حرام على من لم يعرف دليلي أن يفتي بكلامي

অর্থঃ যে আমার কথার প্রমাণ জানে না তার পক্ষে আমার কথার দ্বারা ফতওয়া প্ৰদান করা হারাম। (টীকায় উল্লেখকৃত দ্বিতীয় বর্ণনাটি)

অন্য বর্ণনায় আরো বাড়িয়ে বলেছেনঃ

فإننا بشر، نقول القول اليوم ونرجع عنه غدا

অর্থঃ কেননা আমরা মানুষ, আজ এক কথা বলি, আবার আগামীকাল তা থেকে ফিরে যাই। (টীকায় উল্লেখকৃত তৃতীয় বর্ণনাটি।

অপর বর্ণনায় রয়েছেঃ

ويحك يا يعقوب (هو أبو يوسف) لا تكتب كل ما تسمع منى فإني قد أرى الرأى اليوم واتركه غدا، وأرى الرأى غدا واتركه بعد غد

অর্থঃ এই হতভাগা ইয়াকুব (আবু ইউসুফ) তুমি আমার থেকে যাই শুন তা লিখনা, কেননা আমি আজ এক মত পোষণ করি এবং আগামীকাল তা পরিহার করি, আবার আগামীকাল এক মত পোষণ করি আর পরশুদিন তা পরিত্যাগ করি।[3] (আল। ঈকায গ্রন্থের ৬৫ পৃষ্ঠার টীকা দ্রষ্টব্য)

اذا قلت قولا یخالف کتاب الله تعالی و خبر الرسول صلی الله عليه وسلم فاترکوا قولي (৩)

অর্থঃ যখন আমি এমন কথা বলি যা আল্লাহ তা'আলার কিতাব ও রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর হাদীছ বিরোধী তা হলে তোমরা আমার কথা পরিত্যাগ করবে।[4]


[1] ইবনু আবিদীন এর হাশিয়া ১ম খন্ড ৬৩ পৃষ্ঠা, “রসমিল মুফতী” ১ম খণ্ড ৪র্থ পৃষ্ঠা, ছালিহ আল ফাল্লানীর “ইকাযুল হিমাম” পৃষ্ঠা ৬২, ইবনু আবিদীন ইবনুল হুমামের উস্তায ইবনুশ শাহনা আল কাবীরের “শারহুল হিদায়া” থেকে উদ্ধৃতি করেনঃ

إذا صح الحديث وكان على خلاف المذهب عمل بالحديث ويكون ذلك مذهبه ولا يخرج مقلد عن كونه حنيفا بالعمل به فقد صح ان ابى حنيفة انه قال: إذا صح الحديث فهو مذهبي وقد حكى ذلك الامام ابن عبد البر عن ابى حنيفة وغيره من الأئمة

অর্থঃ যখন হাদীছ বিশুদ্ধ সাব্যস্ত হয়ে যাবে আর তা মাযহাবের বিপক্ষে থাকবে তখন হাদীছের উপরেই আমল করা উচিত হবে এবং এটাই তাঁর (ইমামের) মাযহাব বলে বিবেচিত হবে। উক্ত হাদীছের উপর আমল করাটা তাকে হানাফী মাযহাব থেকে বহিষ্কার করবে না। কেননা বিশুদ্ধ সূত্রে ইমাম আবু হানীফা থেকে এসেছে যে, হাদীছ বিশুদ্ধ সাব্যস্ত হলে এটাই আমার অনুসৃত পথ বলে জানতে হবে। একথা ইমাম ইবনু আব্দিল বার ইমাম আবু হানীফাসহ অন্যান্য ইমামদের থেকেও বর্ণনা করেন।

আমি বলছিঃ এটা হচ্ছে ইমামগণের ইলম ও তাকওয়ার পরিপূর্ণতার বহিঃপ্রকাশ। যাতে তারা একথারই ইঙ্গিত প্ৰদান করছেন যে, তারা সমস্ত হাদীছ আয়ত্ব করতে পারেননি। যে কথা ইমাম শাফিয়ী স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন, পরবর্তীতে যার উল্লেখ রয়েছে। তাই কদাচ তাদের নিকট অনাগত অজানা সুন্নাতের বিপরীত কিছু (বচন-আচরণ) পাওয়া যেতে পারে। এজন্যই তাঁরা আমাদেরকে সুন্নাহ্ আকড়ে ধরার এবং এটাকেই তাদের অবলম্বিত পথ (মাযহাব) হিসাবে গণ্য করার আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা তাদের সবাইকে রহম করুন।

[2] ইবনু আব্দিল বার “আল ইনতিকা ফী ফাযায়েলুস সালাসাতিল আইম্মাতিল ফুকাহা” পৃষ্ঠা ১৪৫, ইবনুল কাইয়্যিম এর “ই’লামুল মুয়াক্কিঈন” (২/৩০৯), ইবনুল আবিদীন “আল বাহরুর রা’ইক” এর টীকায় (৬/২৯৩), “রসমীল মুফতী” পৃষ্ঠা ২৯, ৩২, শা’রানীর “আল মিযান” এ দ্বিতীয় বর্ণনাটি রয়েছে (১/৫৫) আর তৃতীয় বর্ণনা পাওয়া যাবে আব্বাছ আদদূরীর বর্ণনায় ইবনু মাঈন এর “আত-তারীখ” গ্রন্থে (৬/৭৭/১) যুফার থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে। এ ধরনের বর্ণনা ইমাম সাহেবের সাথী যুফার, আবু ইউসুফ এবং আফিয়া ইবনু ইয়াযীদ থেকেও এসেছে “আল-ইকায” পৃষ্ঠা ৫২, ইবনুল কাইয়িম আবু ইউসুফ থেকে একথার বিশুদ্ধতার কথা দৃঢ়তার সাথে বলেছেন। অতিরিক্ত কথাটি যা আবু ইউসুফকে সম্বোধন করে বলেছেন। “আল ইকায” এর ৬৫ পৃষ্ঠার টীকায় ইবনু আব্দিল বার ও ইবনুল কাইয়িম ও অন্যান্যদের থেকে উদ্ধৃত হয়েছে।

আমি বলছিঃ যদি তাদের কথা এমন হয়। এ সব লোকদের ব্যাপারে যারা তাদের কথার দলীল কি সেটা জানে নাই তবে ঐসব লোকদের ব্যাপারে তাদের কি বক্তব্য হতে পারে যারা তাদের (ইমামদের) কথার বিপক্ষে দলীল রয়েছে তা জানার পরেও দলীলের বিপরীত ফাতাওয়া দেয়। অতএব হে পাঠক! বাক্যটি নিয়ে আপনি ভেবে দেখুন, কেননা এ একটি বাক্যই তাকলীদের (অন্ধ অনুসরণের) প্রাচীর ভেঙ্গে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। তাইতো কোন এক মুকল্লিদ আলিমকে দলীল না জেনে ইমাম আবু হানীফার কথায় ফতওয়া দানে আমি বাধা প্ৰদান করলে তিনি এটাকে ইমাম সাহেবের কথা বলে অস্বীকার করেন।

[3] আমি বলছিঃ এর কারণ এই যে, ইমাম সাহেব প্রায়ই কিয়াস করে কথা বলতেন, তাই পরবর্তীতে যখন অপর একটি আরো শক্তিশালী কিয়াস প্রকাশ পেয়ে যেত অথবা নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর হাদীছ তার কাছে পৌছে যেত তখন তিনি এটাই গ্ৰহণ করতেন। আর তার কথা পরিহার করতেন। শা’রানী “আল মিযান” গ্রন্থের ১ম খণ্ড ৬২ পৃষ্ঠায় বলেন যার সংক্ষেপ হচ্ছে এইঃ

আমরা এবং প্রত্যেক ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) সম্পর্কে এই বিশ্বাস রাখি যে, যদি তিনি শরীয়ত (হাদীছ) লিপিবদ্ধ হওয়া পর্যন্ত বেঁচে থাকতেন আর হাফিযগণ তা একত্রিত করার জন্য বিভিন্ন দেশ ও সীমান্তে ভ্ৰমণ করে তা অর্জন করে ফেলতেন এবং তিনি তা হস্তগত করতে পারতেন তাহলে ইমাম সাহেব এগুলোই গ্ৰহণ করতেন। আর যতসব কিয়াস করেছিলেন তা পরিহার করতেন। ফলে তাঁর মাযহাবেও অন্যান্য মাযহাবের ন্যায় কিয়াস কমে আসত। কিন্তু শরীয়তের দলীল যেহেতু তার যুগে তাবেঈন ও তাবে’ তাবেঈনদের কাছে বিভিন্ন শহর, গ্রাম ও সীমান্তে বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে ছিল তাই তার মাযহাবে আবশ্যিকভাবে অন্যান্য ইমামদের চেয়ে বেশী কিয়াসের অনুপ্রবেশ ঘটেছে, তা এই জন্য যে, তিনি তার কিয়াসকৃত মাসআলাগুলোতে স্পষ্ট দলীল পাননি। পক্ষান্তরে অন্যান্য ইমামগণ তার চেয়ে ব্যতিক্রম। কেননা হাদীছ শাস্ত্রের পণ্ডিতগণ তাঁদের যুগে হাদীছ অন্বেষণ ও সংকলনের কাজ আঞ্জাম দিয়ে ফেলেছিলেন, তাতে শরীয়তের এক হাদীছ অপর হাদীছের ব্যাখ্যা প্ৰদান করেছে। এটাই ছিল তার মাযহাবে কিয়াস বেশী ও অন্যান্যদের মাযহাবে তা কম হওয়ার (মূল) কারণ।

আবুল হাসানাত লক্ষীেভী “আন-নাফিউল কাবীর” গ্রন্থের ১৩৫ পৃষ্ঠায় এতদ সংক্রান্ত বিষয়ের এক বৃহৎ অংশ উদ্ধৃত করেন এবং তার উপর সমর্থনমূলক এবং ব্যাখ্যাদানমূলক টীকা সংযুক্ত করেন। উৎসুক মহল তা পড়ে দেখতে পারেন।

আমি বলছিঃ আবু হানীফা (রহঃ) কর্তৃক অনিচ্ছাকৃতভাবে বিশুদ্ধ হাদীছ বিরোধী কথার পক্ষে যখন এহেন উযর বিদ্যমান, যা নিঃসন্দেহে গ্ৰহণযোগ্য। কেননা আল্লাহ কোন ব্যক্তিকে তাঁর সাধ্যাতীত দায়িত্ব চাপান না। অতএব তাকে কিছু সংখ্যক অজ্ঞ লোক যেভাবে কটাক্ষ করে কথা বলে তা মোটেও বৈধ নয়। বরং তার ব্যাপারে আদব রক্ষা করা ওয়াজিব। কেননা তিনি মুসলিম সমাজের ইমামগণের একজন যাদের দ্বারা এই দীনকে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

তাঁর পক্ষ থেকে আমাদের কাছে অমৌলিক মাসআলার ক্ষেত্রে অনেক কিছু পৌছেছে। তিনি ভুল শুদ্ধ যা কিছু বলেছেন সর্বাবস্থায়ই প্রতিদান প্রাপ্ত হবেন। অপরপক্ষে তাঁর ভক্তদেরও উচিত হবে না যে, তারা তার হাদীছ বিরোধী কথাগুলো ধরে থাকবে। কেননা এটা তার মাযহাব নয়। যেমন আপনি এ ব্যাপারে তার কথাগুলো কিছুক্ষণ পূর্বে দেখলেন, তাই বলি (উপরোক্ত লোকদের) একদল হচ্ছে এক প্রান্তে আর অপর দল হচ্ছে অন্য প্রান্তে । অথচ হক বিরাজ করছে উভয় দলের মাঝামাঝিতে। আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ

رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ

অর্থঃ হে আল্লাহ! আমাদেরকে এবং ঈমান আনয়নে আমাদের অগ্রণী ভাইদেরকে ক্ষমা কর। আর ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোন বিদ্বেষ রেখা না। হে আমাদের রব! নিশ্চয় তুমি অতি মমতাময় দয়ালু। (সূরা আল-হাশর ১০ আয়াত)

[4] ফাল্লানীর “আল ইকায” গ্রন্থের ৫০ পৃষ্ঠায় তিনি এটাকে ইমাম মুহাম্মদের কথা বলেও উল্লেখ করেন। অতঃপর বলেনঃ এ কথা এবং এ মর্মের অন্য সব বক্তব্য মুজতাহিদের জন্যে নয় কেননা তিনি ইমামদের কথার প্রয়োজন বোধ করেন না। বরং এটি (ইমামের কথাকে দলীলের সঙ্গে মিলিয়ে মানা) মুকাল্লিদ-এর জন্যই প্রযোজ্য।

আমি বলছিঃ এর উপরেই ভিত্তি করে ইমাম শা'রানী “আল মিযান” গ্রন্থের ১ম খণ্ড ২৬ পৃষ্ঠায় বলেছেনঃ তুমি যদি বল, তবে সেই হাদীছকে কী করব যা আমার ইমামের মারা যাওয়ার পর বিশুদ্ধ সাব্যস্ত হয়েছে এবং তিনি তা গ্রহণ করেননি। উত্তর হবে এই যে, তোমার পক্ষে ওয়াজিব হবে হাদীছের উপর আমল করা। কারণ তোমার ইমাম যদি এটি পেতেন এবং তা তার কাছে বিশুদ্ধ সাব্যস্ত হয়ে যেত। তবে হয়তোবা তিনি এটাই মেনে নেয়ার জন্য তোমাকে নির্দেশ দিতেন। কারণ ইমামগণের প্রত্যেকেই শরীয়তের হাতে বন্দী। যে ব্যক্তি তা মেনে নিল সে দুই হাতে সমস্ত মঙ্গল অর্জন করে ফেলল। আর যে ব্যক্তি বললঃ আমার ইমাম যে হাদীছ গ্ৰহণ করেছেন কেবল সেই হাদীছের উপরেই আমি আমল করব সে ব্যক্তি থেকে অনেক মঙ্গল ছাড়া পড়বে যেমনটি হচ্ছে অনেক মাযহাবের ইমামদের অন্ধ অনুসারীদের বেলায়। তাদের পক্ষে উত্তম ছিল ইমামগণের অছিয়াত অনুযায়ী তাদের পরে যে সব হাদীছ বিশুদ্ধ সাব্যস্ত হয়েছে তার উপর আমল করা। কেননা আমাদের বিশ্বাস যে, তারা যদি বেঁচে থাকতেন এবং তাদের ইন্তিকালের পরে যেসব হাদীছ বিশুদ্ধ সাব্যস্ত হয়েছে তা পেয়ে যেতেন। তবে অবশ্যই তা গ্রহণ করতেন এবং তার উপরে আমল করতেন। আর যতসব কিয়াস ও কথা তাদের পক্ষ থেকে এসেছে তা পরিহার করতেন।