সুদের ক্ষতি-অপকার-কুপ্রভাব ইসলামে সুদের অবস্থান ড. সাঈদ ইব্‌ন আলী ইব্‌ন ওয়াহফ আল-ক্বাহত্বানী ১ টি

রিবা বা সুদ থেকে সতর্ক করে কুরআন ও সুন্নায় অনেক বক্তব্য এসেছে। আর কুরআন-সুন্নাহ যেহেতু শরিয়তের এমন প্রধান দুই উৎস যে, এ দুটোকে যে অবলম্বন করবে; এতদুভয়ের অনুসরণ ও আনুগত্য করবে, সে হবে কামিয়াব; চির সফল। যে মুখ ফিরিয়ে নিবে তার জন্য রয়েছে এক সংকুচিত জীবন তদুপরি কিয়ামতে তাকে উঠানো হবে অন্ধ হিসেবে।

  • আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- ‘যারা সুদ খায়, তারা তার ন্যায় (কবর থেকে) উঠবে, যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল বানিয়ে দেয়। এটা এ জন্য যে, তারা বলে, বেচা-কেনা সুদের মতই। অথচ আল্লাহ বেচা-কেনা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন। অতএব, যার কাছে তার রবের পক্ষ থেকে উপদেশ আসার পর সে বিরত হল, যা গত হয়েছে তা তার জন্যই ইচ্ছাধীন। আর তার ব্যাপারটি আল্লাহর হাওলায়। আর যারা ফিরে গেল, তারা আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে।[1]
  • আল্লাহ সুদকে মিটিয়ে দেন এবং সদাকাকে বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহ কোন অতি কুফরকারী পাপীকে ভালবাসেন না।[2]
  • হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে, তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা মুমিন হও। কিন্তু যদি তোমরা তা না কর তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা নাও, আর যদি তোমরা তাওবা কর, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই থাকবে। তোমরা যুলম করবে না এবং তোমাদের যুলম করা হবে না।’[3]

    ইবনে আববাস রা. বলেন, এটি শেষ আয়াত যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম-এর প্রতি অবতীর্ণ হয়েছিল।[4]
  • আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইরশাদ করেন- ‘হে মুমিনগণ, তোমরা সুদ খাবে না বহুগুণ বৃদ্ধি করে। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফল হও।’[5]
  • আল্লাহ তাআলা সুদ হারাম করেন আর ইহুদিরা কৌশলের আশ্রয় নিয়ে সুদ বৈধ করার চেষ্টা করে, সেদিকে ইঙ্গিত করে মহান বর বলেন- ‘আর তাদের সুদ গ্রহণের কারণে, অথচ তা থেকে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল।’[6]
  • ‘আর তোমরা যে সুদ দিয়ে থাক, মানুষের সম্পদে বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য তা মূলতঃ আল্লাহর কাছে বৃদ্ধি পায় না। আর তোমরা যে যাকাত দিয়ে থাক আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে (তাই বৃদ্ধি পায়) এবং তারাই বহুগুণ সম্পদ প্রাপ্ত।’[7]
  • জাবির রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুদদাতা, গ্রহীতা এবং এর লেখক ও সাক্ষীদ্বয়কে অভিশাপ দিয়েছেন।’[8]
  • সামুরা বিন জুনদুব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- ‘রাতে আমি দেখলাম, দু’জন লোক এসে আমার কাছে এলো। তারা আমাকে এক পবিত্র ভূমির দিকে নিয়ে গেল। আমরা চলছিলাম, সহসা এক রক্ত নদীর পাড়ে গিয়ে উপস্থিত হলাম যার মাঝে দন্ডায়মান এক ব্যক্তি। নদীর মাঝখানে এক ব্যক্তিকে দেখা গেল। সামনে তার পাথর। মাঝের লোকটি নদী পেরুনোর জন্য যেই সামনে অগ্রসর হয়, পাথর হাতে দাঁড়ানো ব্যক্তি অমনি তার মুখে পাথর মেরে তাকে পূর্বের জায়গায় ফিরিয়ে দেয়। এভাবে যখনই সে নদী পেরিয়ে আসতে চায়, লোকটি তখনই তার মুখে পাথর মেরে পেছনে ঠেলে দেয়। আমি বললাম, ব্যাপার কী ? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম বললেন, আমি যাকে নদীর মধ্যখানে দেখেছি সে সুদখোর।’[9]
  • আবু হোরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- ‘ধ্বংসকারী সাতটি জিনিস থেকে বেঁচে থাক। সাহাবিরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, সেগুলো কী কী? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, শিরক করা, যাদু করা, অনুমোদিত কারণ ছাড়া কাউকে হত্যা করা, সুদ খাওয়া, এতিমের মাল ভক্ষণ করা, জিহাদের ময়দান থেকে পলায়ন করা এবং সতী সরলা মুমিনা নারীকে ব্যাভিচারের অপবাদ দেয়া।’[10]
  • ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- ‘সুদের অর্থ দিয়ে যা-ই বৃদ্ধি করুক না কেন অল্পই কিন্তু তার শেষ পরিণাম।’[11]
  • সালমান বিন আমর তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- কে বিদায় হজে আমি বলতে শুনেছি, তিনি বলেন- ‘মনে রেখ জাহিলি যুগের সকল সুদ ভিত্তিহীন। তোমাদের জন্য শুধুই মূলধন। তোমরা জুলুম করবেও না এবং সইবেও না।’[12]

এ হাদিসে জাহিলি যুগের প্রচলিত রীতিগুলোকে ইসলাম প্রত্যাখ্যান করেছে। যদি অমুসলিম ব্যক্তি তার ইসলাম পূর্ব সময়ে লাভ হিসেবে সুদের পাওনাদার হয়। অতপর সে অর্থ গ্রহণের আগেই ইসলামে প্রবেশ করে। তবে শুধু তার মালের মূল অংশ গ্রহণ করবে; লাভটুকু ছেড়ে দিবে। আর ইসলামের আগে এ ধরনের যে কারবারগুলো হয়েছে ইসলাম সে ব্যাপারে ক্ষমা ঘোষণা করেছে। সুতরাং তাদেরকে অতীত কারবার সম্পর্কে কোনো জবাবদিহি করতে হবে না। ইসলাম অতীত ক্ষমা করে দিয়েছে। কারণ, ইসলাম পূর্বকৃত সকল গুনাহ মাফ করে দেয়।[13]

  • আবু হোরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- ‘এমন এক সময় উপস্থিত হবে যখন লোকেরা পরোয়া করবে না সম্পদ হালাল নাকি হারাম উপায়ে অর্জিত।’[14] নবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন সংবাদ দিয়েছেন মানুষকে সম্পদের ফিতনা থেকে বাঁচানোর জন্য। তিনি এমন সংবাদ দিয়েছেন যা তাঁর যুগে ছিল না। এ ধরনের ভবিষ্যৎবাণী তাঁর নবুওয়াতের সত্যতার প্রমাণও বটে।[15]
  • আবি জুহায়ফা রা. তদীয় পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, ‘নবী সাললাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রক্ত ও কুকুরের মূল্য নিতে এবং দাসীর উপার্জন গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। অভিশাপ দিয়েছেন উল্কি অঙ্কনকারী, উল্কি গ্রহণকারী এবং সুদ গ্রহীতা ও সুদদাতাকে। আরও অভিশাপ দিয়েছেন তিনি চিত্রাঙ্কনকারীকে।’[16]
  • আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- ‘সুদের তিয়াত্তরটি স্তর রয়েছে। সর্বনিম্নটি হলো নিজের মায়ের সঙ্গে জেনা করার সমতুল্য। আর অপর ভাইয়ের সম্মান নষ্ট করা সবচে’ নিকৃষ্ট সুদ।[17]
  • ফেরেশতা কর্তৃক গোসল করার সৌভাগ্যধন্য হানযালা তনয় আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- ‘জেনে বুঝে এক দিরহাম পরিমাণ সুদ খাওয়া ছত্রিশবার জেনা করার চেয়েও বড় অপরাধ।[18]
  • ইবনে আববাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- ‘যখন কোনো জনপদে সুদ ও ব্যভিচার ছড়িয়ে পড়ে তখন তারা নিজেদের ওপর আল্লাহর আজাব বৈধ করে নেয়।[19]
[1]. বাকারা : ২৭৫

[2]. বাকারা : ২৭৬

[3]. বাকারা : ২৭৮-২৭৯

[4]. ফাতহুল বারি : ৪/৩১৪

[5]. আলে উমরান : ১৩০

[6]. নিসা : ১৬১

[7]. রুম : ৩৯

[8]. মুসলিম : ৭৫৯৭

[9]. বুখারি : ২০৮৫, ফাতহুল বারি : ৪/৩১৩

[10]. বুখারি : ২০১৫, মুসলিম : ৮৯

[11]. ইবনে মাজা : ২২৭৯। আলবানি সহি জামে সগিরে ৫/১২০ বলেছেন, এটি সহি হাদিস।

[12]. আবু দাউদ : ৩৩৩৪

[13]. আওনুল মাবুদ বি শরহি সুনানে আবি দাউদ : ৯/১৮৩

[14]. বুখারি : ২০৮৩

[15]. ফাতহুল বারি : ৪/২৯৭

[16]. বুখারি : ২২২৮

[17]. মুস্তাদরাকে হাকেম : ২/৩৭

[18]. মুসনাদে আহমদ : ৫/২২৫

[19]. মুস্তাদরাকে হাকেম : ২/৩৭