আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আকীদা লাওহে মাহফুযে ঈমান ইমাম আবু জা‘ফর আহমাদ আত-ত্বহাবী রহ. ১ টি
লাওহে মাহফুয, তাকদীর ও অন্যান্য বিষয়ে আমাদের ঈমান

৪৭। আর আমরা লাওহে মাহফুযে ঈমান রাখি, আরও ঈমান রাখি কলমের উপর। আর যা আল্লাহ লাওহে মাহফুযে লিখে রেখেছেন তার সবকিছুতে। যা সংঘটিত হবে বলে আল্লাহ এ লাওহে মাহফুযে লিখে রেখেছেন তা যদি সকল সৃষ্ট জীব একত্রিত হয়েও রোধ করতে চায় তারা সেটা করতে সক্ষম হবে না। পক্ষান্তরে, তাতে যে বিষয় সংঘটিত হবার কথা তিনি লিখেননি, সমস্ত সৃষ্ট জীব একত্রিত হয়েও তা ঘটাতে পারবে না। কিয়ামত দিবস পর্যন্ত যা ঘটবে তা লিপিবদ্ধ হয়ে কলমের কালি শুকিয়ে গেছে। যা বান্দার নসীবে লেখা হয়নি, তা সে কখনই পাবে না আর যা বান্দার নসীবে লেখা আছে, তা কখনই বাদ পড়বে না।  

৪৮। বান্দার একথা জেনে রাখা উচিত যে, তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত যাবতীয় ঘটনাবলী সম্পর্কে আল্লাহ পূর্ব হতে অবহিত রয়েছেন। অতএব, তিনি সেটাকে অকাট্য ও অবিচল তাকদীর হিসাবে নির্ধারিত করেছেন। আসমান ও যমীনের কোনো মাখলুক এটাকে বানচালকারী অথবা এর বিরোধিতাকারী নেই, অনুরূপ একে কেউ অপসারণ অথবা পরিবর্তন করতে পারবে না, একে সংকোচন কিংবা পরিবর্ধনও করতে পারবে না।

আর এটাই হচ্ছে ঈমানের দৃঢ়তা, মারেফাতের মূলবস্তু এবং আল্লাহ তা‘আলার ওয়াহদানিয়াত ও রবুবিয়্যাত সম্পর্কে স্বীকৃতি দান। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর গ্রন্থে ঘোষণা করেছেন,

﴿وَخَلَقَ كُلَّ شَيۡءٖ فَقَدَّرَهُۥ تَقۡدِيرٗا ٢﴾ [الفرقان: ٢] 

‘‘তিনি সকল বস্তু সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে যথাযথ অনুপাত অনুসারে পরিমিতি প্রদান করেছেন।’’ [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৩]

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অন্যত্র বলেছেন,

﴿وَكَانَ أَمۡرُ ٱللَّهِ قَدَرٗا مَّقۡدُورًا ٣٨ ﴾ [الاحزاب: ٣٨] 

‘‘আল্লাহর বিধান সুনির্ধারিত।’’ [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৩৮]

অতএব, ঐ ব্যক্তির জন্য ধ্বংস অনিবার্য যে ব্যক্তি তাক্বদীর সম্পর্কে আল্লাহর বিরুদ্ধে মন্তব্য করেছে এবং রোগগ্রস্ত অন্তর নিয়ে এ ব্যাপারে আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই সে স্বীয় ধারণা অনুসারে গায়েবের একটি গুপ্ত রহস্য সম্পর্কে অনুসন্ধান করেছে এবং এ সম্পর্কে সে যা মন্তব্য করেছে তার ফলে সে মিথ্যাবাদী ও পাপাচারীতে পরিণত হয়েছে।

৪৯। আর ‘আরশ এবং কুরসী সত্য।

৫০। আর আল্লাহ তা‘আলা ‘আরশ ও অন্যান্য বস্তু থেকে অমুখাপেক্ষী।

৫১। তিনি সমস্ত বস্তুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন এবং তিনি সব কিছুরই উর্ধ্বে। সৃষ্টিজগত তাঁকে পূর্ণভাবে আয়ত্ব করতে অক্ষম।

৫২। আমরা আরও বলি যে, আল্লাহ রাববুল আলামীন ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে খলীল বা অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেছেন এবং মূসা আলাইহিস সালাম এর সঙ্গে কথোপকথন করেছেন। (আমরা একথা বলি) এর প্রতি পূর্ণ ঈমান রেখে, এর সত্যতা স্বীকার করে এবং তাকে পরিপূর্ণভাবে মেনে নিয়ে।

৫৩। আর আমরা আল্লাহর ফিরিশতাগণ, নবীগণ ও রাসূলগণের ওপর প্রেরিত কিতাবসমূহের ওপর ঈমান রাখি এবং আমরা আরও সাক্ষ্য প্রদান করি যে, তারা প্রকাশ্য সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।

৫৪। আমাদের ক্বিবলাকে (বায়তুল্লাহকে) যারা ক্বিবলা বলে স্বীকার করে আমরা তাদেরকে মুসলিম ও মু’মিন বলে আখ্যায়িত করি যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নিয়ে আসা শরী‘আতকে স্বীকার করে এবং তিনি যা কিছু বলেছেন তাকে সত্য বলে গ্রহণ করে।

৫৫। আমরা আল্লাহর সত্ত্বা (জাত) সম্পর্কে অন্যায় গবেষণায় প্রবৃত্ত হই না এবং তাঁর দীন সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত হই না।

৫৬। কুরআন সম্পর্কে আমরা কোনো তর্কে লিপ্ত হই না এবং সাক্ষ্য প্রদান করি যে, কুরআন বিশ্ব চরাচরের রবের কালাম (কথা)। এটা নিয়ে জিবরীল আমীন অবতীর্ণ হয়েছেন। অতঃপর তিনি তা সকল রাসূলদের নেতা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লামকে শিক্ষা দেন। এ কুরআন আল্লাহ তা‘আলার কালাম (বাণী), কোনো সৃষ্টির কথা এর সমতুল্য নয়। আর আমরা একে সৃষ্ট বলি না এবং (এ ব্যাপারে) আমরা মুসলিম মিল্লাতের বিরুদ্ধাচরণ করি না।

৫৭। কোনো গুনাহর কারণে কোনো আহলে ক্বিবলাকে (মুসলিমকে) কাফির বলে অভিহিত করি না; যতক্ষণ না সে উক্ত গুনাহকে হালাল (জায়েয) মনে করে[1]।

৫৮। আর আমরা বলি না যে, ঈমান আনার পর কোনো গুনাহ করাতে ক্ষতি নেই।

৫৯। আমরা আশা করি যে, সৎকর্মশীল মু’মিনগণকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন এবং স্বীয় অনুগ্রহে তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আমরা তাদের সম্পর্কে নিঃশঙ্ক হয়ে যাবো না, আর তাদেরকে জান্নাতী বলে ঘোষণাও দান করবো না[2]। আর আমরা তাদের গুনাহসমূহের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করব এবং আমরা তাদের জন্য আশংকা বোধ করব, কিন্তু আমরা তাদেরকে নিরাশ করব না।


[1] গ্রন্থকারের কথা, ‘কোনো গুনাহর কারণে কোনো আহলে ক্বিবলাকে (মুসলিমকে) কাফির বলে অভিহিত করি না; যতক্ষণ না সে উক্ত গুনাহকে হালাল (জায়েয) মনে করে’ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত আল্লাহ ও শেষ দিবসের ওপর ঈমান আনয়নকারী কোনো একত্ববাদী মুমিন মুসলিমকে কোনো গুনাহ যেমন ব্যভিচার, মদপান, সুদ খাওয়া ও পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া ইত্যাদি অপরাধ করার কারণে কাফির বলে না, যতক্ষণ না সে এগুলোকে বৈধ মনে করে করবে; কিন্তু যদি এগুলোকে বৈধ হিসেবে সম্পাদন করে তবে সে কাফির হয়ে যাবে। কারণ, এর মাধ্যমে সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর মিথ্যরোপ করেছে, তাঁর দীন থেকে বের হয়ে গেছে। তবে যদি সে বৈধ হিসেবে গ্রহণ না করে এ গুনাহগুলো করে বসে তবে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের নিকট এ অপরাধগুলোর কারণে তাকে কাফির বলা যাবে না, বরং তাকে দুর্বল ঈমানের অধিকারী বলা হবে। যে ধরণের অপরাধ সে করেছে সে ধরণের অপরাধের জন্য শরী‘আতে যে বিধান দেওয়া হয়েছে যেমন ফাসেক (পাপাচারী) বলা, কিংবা তার উপর যে হদ তথা নির্ধারিত শাস্তি রয়েছে তা প্রযোজ্য করা হবে। আর এটিই হচ্ছে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের মত।
এ ব্যাপারে খাওয়ারিজ ও মু‘তাযিলা এবং যারা তাদের বাতিল মতামতের অনুসরণ করে চলে তারা ভিন্ন মত পোষণ করে থাকে। তন্মধ্যে খাওয়ারিজরা তাদেরকে গুনাহের কারণে কাফির বলে থাকে (অর্থাৎ দুনিয়াতে তাদের ওপর দীন ত্যাগের শাস্তি আর আখেরাতে তারা স্থায়ীভাবে জাহান্নামী বলে থাকে)। অন্যদিকে মু‘তাযিলারা তাদেরকে দু’ অবস্থানের মধ্যবর্তী অবস্থানে রাখে। অর্থাৎ দুনিয়াতে তাদেরকে ঈমান ও কুফরীর মাঝে রয়েছে বলে থাকে, কিন্তু আখেরাতে খাওয়ারিজদের মতই তাদেরকে স্থায়ীভাবে জাহান্নামী বলে বিশ্বাস করে। এ উভয় দলের মতই কুরআন, সুন্নাহ ও এ উম্মতের সত্যনিষ্ঠ পূর্বসূরীদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে বাতিল বলে স্বীকৃত। এ দু‘দলের বিষয় কোনো কোনো মানুষের মনে তার জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে সন্দেহ-সংশয় তৈরী করতে পারে, কিন্তু আল্লাহর জন্য সকল প্রশংসা খাওয়ারিজ ও মু‘তাযিলাদের আকীদা-বিশ্বাস ভ্রান্ত হওয়ার বিষয়টি হকপন্থীদের নিকট যেমনটি আমরা বর্ণনা করেছি দিবালোকের মতোই স্পষ্ট। আল্লাহর কাছেই সার্বিক তাওফীক কামনা করি। [ই.বা.]

[2] এর দ্বারা গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে, যাদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতের সাক্ষ্য দিয়েছেন। যেমন, জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন ও অন্যান্য সুসংবাদপ্রাপ্তগণ, তাদের ব্যতীত অন্যদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করা থেকে বিরত থাকা। যেমনটি গ্রন্থকারের শেষের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়েছে। তবে এটা জানা আবশ্যক যে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আকীদা হচ্ছে, সাধারণভাবে তাকওয়ার অধিকারী ঈমানদার ব্যক্তিগণ জান্নাতে যাবে, আর কাফির, মুশরিক, মুনাফিক ব্যক্তিরা জাহান্নামে যাবে। যেমনটি কুরআনে কারীমের বিভিন্ন আয়াত এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বহু মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে। তন্মধ্যে রয়েছে মহান আল্লাহর বাণী,

﴿إِنَّ ٱلۡمُتَّقِينَ فِي جَنَّٰتٖ وَنَعِيمٖ ١٧﴾ [الطور: ١٧] 

“নিশ্চয় মুত্তাকীরা থাকবে জান্নাতে ও নি‘আমতে”। [সূরা আত-তূর, আয়াত: ১৭]

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

﴿وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ وَٱلۡمُؤۡمِنَٰتِ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ خَٰلِدِينَ فِيهَا وَمَسَٰكِنَ طَيِّبَةٗ فِي جَنَّٰتِ عَدۡنٖۚ وَرِضۡوَٰنٞ مِّنَ ٱللَّهِ أَكۡبَرُۚ ذَٰلِكَ هُوَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ ٧٢ ﴾ [التوبة: ٧٢] 

“আল্লাহ মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জান্নাতের, যার নিচে নদীসমূহ প্রবাহিত, সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আরও (ওয়াদা দিচ্ছেন) স্থায়ী জান্নাতসমূহে উত্তম বাসস্থানের। আর আল্লাহর সন্তুষ্টিই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং এটাই মহাসাফল্য”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৭২] অনুরূপ অর্থে আরও বহু আয়াত রয়েছে যা এ কথর ওপর প্রমাণবহ।

আর কাফিরদের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَٱلَّذِينَ كَفَرُواْ لَهُمۡ نَارُ جَهَنَّمَ لَا يُقۡضَىٰ عَلَيۡهِمۡ فَيَمُوتُواْ وَلَا يُخَفَّفُ عَنۡهُم مِّنۡ عَذَابِهَاۚ كَذَٰلِكَ نَجۡزِي كُلَّ كَفُورٖ ٣٦﴾ [فاطر: ٣٦] 

“আর যারা কুফুরী করেছে তাদের জন্য আছে জাহান্নামের আগুন। তাদের উপর ফয়সালা দেয়া হবে না যে, তারা মরবে এবং তাদের থেকে জাহান্নামের শাস্তিও লাঘব করা হবে না। এভাবেই আমরা প্রত্যেক অকৃতজ্ঞকে শাস্তি দিয়ে থাকি”। [সূরা ফাতির, আয়াত: ৩৬] অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,

﴿إِنَّ ٱلۡمُنَٰفِقِينَ فِي ٱلدَّرۡكِ ٱلۡأَسۡفَلِ مِنَ ٱلنَّارِ وَلَن تَجِدَ لَهُمۡ نَصِيرًا ١٤٥﴾ [النساء: ١٤٥] 

“মুনাফিকরা তো জাহান্নামের নিম্নতম স্তরে থাকবে এবং তাদের জন্য আপনি কখনো কোনো সহায় পাবেন না।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৪৫] তাছাড়া অনুরূপ আরও বহু আয়াত রয়েছে যা এ অর্থের ওপর প্রমাণবহ। আর আল্লাহই হচ্ছেন তাওফীকদাতা। [ই.বা.]