• ৫৬৪০৩ টি সর্বমোট হাদিস আছেঃ
  • ৫৭৫৬ টি প্রশ্নোত্তর ও ফিকাহঃ

 

 

 

 


(৯২) জনৈক লোক একটি ঘরে বসবাস শুরু করার পর থেকেই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। সেই সাথে আক্রান্ত হয়েছে আরো বড় বড় কয়েকটি মুসিবতে, যার কারণে সে এই ঘরে বসবাস করাকে অমঙ্গলের কারণ হিসাবে মনে করছে। তার জন্য কি ঘর ছেড়ে দেয়া জায়েয আছে?


কোন কোন ঘর, যানবাহন এবং স্ত্রী লোকের ভিতরে আল্লাহ তাআ’লা বিশেষ কোন উদ্দেশ্যে অমঙ্গল নির্ধারণ করে থাকেন। হতে পারে ক্ষতির উদ্দেশ্যে কিংবা কল্যাণ প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে বা অন্য কোন উদ্দেশ্যে। তাই এই ঘর বিক্রি করে অন্য ঘরে চলে যাওয়াতে কোন দোষ নেই। হতে পারে অন্য ঘরে চলে যাওয়াতেই তার জন্য কল্যাণ রয়েছে। নবী (সাঃ) বলেছেনঃ

]إِنَّمَا الشُّؤْمُ فِي ثَلَاثَةٍ فِي الْفَرَسِ وَالْمَرْأَةِ وَالدَّارِ[

“ তিনটি বস্তর মধ্যে অকল্যাণ রয়েছে। ঘোড়া, স্ত্রীলোক এবং গৃহে।”

কোন যানবাহন অকল্যাণকর হতে পারে, কোন কোন স্ত্রীলোকের মাঝে অকল্যাণ থাকতে পারে এবং কোন কোন ঘরেও তা থাকতে পারে। মানুষ যখন এ জাতীয় কিছু দেখতে পেলে যেন মনে করে যে, এট আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত। কোন না কোন উদ্দেশ্যে আল্লাহ এ জাতীয় অকল্যাণ নির্ধারণ করে থাকেন। যাতে করে মানুষ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হয়।

(৯৩) উসীলার হুকুম কি?


প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিস্তারিতভাবে এর উত্তর দিতে চাই। উসীলার অর্থ হচ্ছে কোন উদ্দেশ্যে পৌঁছার জন্যে মাধ্যম গ্রহণ করা। উসীলা দু’প্রকার।

(১) শরীয়ত সম্মত সঠিক উসীলা। তা হল শরীয়ত সম্মত সঠিক পন্থায় লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে পৌঁছার চেষ্টা করা।

(২) শরীয়ত বহির্ভূত উসীলাঃ

প্রথম প্রকারের উসীলা আবার কয়েক প্রকার।

(ক) আল্লাহর গুণবাচক নামগুলোর মাধ্যমে উসীলা গ্রহণ করাঃ এটি দু’ভাবে হতে পারে। সাধারণভাবে আল্লাহর নামগুলো উল্লেখ করে দু’আ করা। (১) যেমন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দুঃশ্চিন্তা থেকে মুক্তির দু’আয় বলেছেনঃ

)اللَّهُمَّ إِنِّي عَبْدُكَ وَابْنُ عَبْدِكَ وَابْنُ أَمَتِكَ نَاصِيَتِي بِيَدِكَ مَاضٍ فِيَّ حُكْمُكَ عَدْلٌ فِيَّ قَضَاؤُكَ أَسْأَلُكَ بِكُلِّ اسْمٍ هُوَ لَكَ سَمَّيْتَ بِهِ نَفْسَكَ أَوْ عَلَّمْتَهُ أَحَدًا مِنْ خَلْقِكَ أَوْ أَنْزَلْتَهُ فِي كِتَابِكَ أَوِ اسْتَأْثَرْتَ بِهِ فِي عِلْمِ الْغَيْبِ عِنْدَكَ أَنْ تَجْعَلَ الْقُرْآنَ رَبِيعَ قَلْبِي(

“হে আল্লাহ আমি আপনার বান্দা এবং আপনার এক বান্দা ও বান্দীর পুত্র। আপনার হাতে আমার কর্তৃত্ব, আমার প্রতি আপনার নির্দেশ প্রতিফলন যোগ্য। আমার প্রতি আপনার ফায়সালা ন্যায়নিষ্ঠ। আপনার সেই সমস্ত নামের প্রত্যেকটির উসীলায় আমি প্রার্থনা জানাচ্ছি, যেগুলো আপনি নিজের জন্য নির্ধারণ করেছেন, অথবা তা আপনার কোন সৃষ্টিকে জানিয়েছেন, অথবা কুরআনে তা নাযিল করেছেন, অথবা আপনার অদৃশ্য জ্ঞানে তা সংরক্ষিত করে রেখেছেন। আপনি আমার জন্য কুরআনকে হৃদয়ের উর্বরতা স্বরূপ করুন--------। এখানে আল্লাহর প্রতিটি নামের উসীলায় আল্লাহর কাছে দু’আ করা হয়েছে।

(২) আল্লাহর নির্দিষ্ট নাম উল্লেখ করে নির্দিষ্ট প্রয়োজন পূর্ণ হওয়ার জন্য তাঁর কাছে দু’আ করা। যেমন আবু বকর (রাঃ) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কাছে নামাযের মধ্যে পঠিতব্য দু’আ শিক্ষা দেয়ার আবেদন জানালে তিনি নিম্নের দু’আটি শিক্ষা দিলেন,

)اللَّهُمَّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي ظُلْمًا كَثِيرًا وَلَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ فَاغْفِرْ لِي مَغْفِرَةً مِنْ عِنْدِكَ وَارْحَمْنِي إِنَّك أَنْتَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ(   

“হে আল্লাহ! আমি আমার আত্মার উপর অবিচার করেছি। আপনি ছাড়া গুনাহ ক্ষমা করার কেউ নেই। তাই আপনি আমাকে ক্ষমা করুন এবং রহম করুন। আপনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়াময়।” এখানে আল্লাহর দু’টি নাম যথাঃ ‘গাফূর’ এবং ‘রাহীম’ এর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও রহমত কামনা করা হয়েছে।

 

 (খ) আল্লাহর গুণাবলীর মাধ্যমে উসীলা গ্রহণ করাঃ এটি দু’ভাবে হতে পারে। (১) এভাবে বলবে যে, হে আল্লাহ! আপনার সুন্দর নামগুলোর মাধ্যমে এবং উন্নত গুণাবলীর মাধ্যমে প্রার্থনা করছি। এরপর প্রত্যেকেই নিজ নিজ প্রয়োজন উল্লেখ করবে।  

(২) নির্দিষ্ট কোন গুণাবলীর উসীলা দিয়ে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য প্রার্থনা করা। যেমন হাদীছে এসেছে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন

)اللَّهُمَّ بِعِلْمِكَ الْغَيْبَ وَقُدْرَتِكَ عَلَى الْخَلْقِ أَحْيِنِي مَا عَلِمْتَ الْحَيَاةَ خَيْرًا لِي وَتَوَفَّنِي إِذَا عَلِمْتَ الْوَفَاةَ خَيْرًا لِى(

“হে আল্লাহ! আপনার ইলম এবং মাখলুকের উপর আপনার ক্ষমতার উসীলা দিয়ে এই দু’আ করছি যে, আমার জীবিত থাকা যদি আমার জন্য কল্যাণকর হয়, তাহলে আমাকে জীবিত রাখুন। আর যদি জানেন যে, আমার মৃত্যু আমার জন্য কল্যাণর, তাহলে আমাকে মৃত্যু দান করুন।” এখানে ইলম ও কুদ্‌রাত- এই দু’টি গুণের মাধ্যমে উসীলা দেয়া হয়েছে। আর এটি প্রার্থনার সাথে খুবই সংগতিপূর্ণ।

 (গ) আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর প্রতি ঈমান আনয়নের মাধ্যমে উসীলা দেয়াঃ এভাবে বলবে যে, হে আল্লাহ! আমি আপনার উপর এবং আপনার রাসূলের উপর ঈমান এনেছি। এই ঈমানের উসীলায় আমাকে ক্ষমা করুন। আল্লাহ তাআ’লা ঈমানের উসীলা দিয়ে দু’আ করার নিয়ম শিক্ষা দিতে গিয়ে বলেনঃ

)إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِأُولِي الْأَلْبَابِ الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ رَبَّنَا إِنَّكَ مَنْ تُدْخِلْ النَّارَ فَقَدْ أَخْزَيْتَهُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ رَبَّنَا إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُنَادِي لِلْإِيمَانِ أَنْ آمِنُوا بِرَبِّكُمْ فَآمَنَّا رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَار(

“নিশ্চয় আসমান ও জমিন সৃষ্টিতে এবং রাত্রি ও দিনের আবর্তনে নিদর্শন রয়েছে বোধসম্পন্ন লোকদের জন্যে। যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং চিন্তা-গবেষণা করে আসমান ও জমিন সৃষ্টির বিষয়ে (তারা বলে) হে আমাদের প্রতিপালক! এসব তুমি অনর্থক সৃষ্টি করোনি। সকল পবিত্রতা তোমারই, আমাদেরকে তুমি দোযখের শাস্তি থেকে বাঁচাও। হে আমাদের পালনকর্তা! নিশ্চয় তুমি যাকে দোযখে নিক্ষেপ করলে তাকে অপমানিত করলে, আর জালেমদের জন্যে তো কোন সাহায্যকারী নেই। হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা নিশ্চিতরূপে শুনেছি একজন আহবানকারীকে ঈমানের প্রতি আহবান করতে যে, তোমাদের পালনকর্তার প্রতি ঈমান আন, তাই আমরা ঈমান এনেছি। হে আমাদের পালনকর্তা! অতঃপর আমাদের সকল গুনাহ ক্ষমা কর এবং আমাদের সকল দোষ-ত্রুটি দূর করে দাও, আর আমাদের মৃত্যু দাও নেক লোকদের সাথে।” (সূরা আল- ইমরানঃ ১৯০-১৯৩) এখানে গুনাহ মাফ, দোষ-ত্রুটি দূর করা এবং নেক লোকদের সাথে যেন মৃত্যু হয় তার জন্য ঈমানের উসীলা দিয়ে দু’আ করা হয়েছে।

 (ঘ) সৎ আমলের উসীলা দিয়ে আল্লাহর কাছে দু’আ করাঃ এখানে তিন ব্যক্তির ঘটনাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তারা রাত্রি যাপনের উদ্দেশ্যে একটি গুহার ভিতরে আশ্রয় নিয়েছিল। উপর থেকে একটি পাথর গড়িয়ে পড়ে গুহার মুখ বন্ধ হয়ে গেলে গুহা থেকে তাদের বের হওয়া অসম্ভব হয়ে গেল। অতঃপর তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ সৎ আমল তুলে ধরে আল্লাহর কাছে দু’আ করেছিল। একজন পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করার উসীলা দিল, দ্বিতীয় ব্যক্তি অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকার উসীলা দিল এবং তৃতীয়জন তার চাকরের বেতন পূর্ণভাবে প্রদান করার উসীলা দিয়ে আল্লাহর কাছে দু’আ করা আরম্ভ করল। তারা প্রত্যেকেই দু’আয় বলেছিল, হে আল্লাহ! আমি যদি এই আমলটুকু আপনার সন'ষ্টির জন্য করে থাকি, তাহলে আপনি আমাদেরকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করুন। এভাবে দু’আ করার পর পাথরটি সরে গেল এবং তারা গুহা থেকে বের হয়ে আসল।

   এই ঘটনাটিতে সৎ আমলকে উসীলা ধরে দু’আ করার কথা প্রমাণিত হয়।

 (ঙ) নিজের অবস্থা আল্লাহর কাছে তুলে ধরে উসীলা দেয়াঃ অর্থাৎ দু’আকারী যে অবস্থায় রয়েছে, তা আল্লাহর কাছে তুলে ধরবে। যেমন মূসা (আঃ) বলেছিলেনঃ

(رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ)

“হে আমার পালনকর্তা! তুমি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ নাযিল করবে, আমি তার মুখাপেক্ষী।” (সূরা কাসাসঃ ২৪) যাকারিয়া (আঃ) নিজের দুর্বলতাকে তুলে ধরে উসীলা দিয়েছেন। আল্লাহ তাঁর কথা উল্লেখ করে বলেনঃ

(قَالَ رَبِّ إِنِّي وَهَنَ الْعَظْمُ مِنِّي وَاشْتَعَلَ الرَّأْسُ شَيْبًا وَلَمْ أَكُنْ بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا)

“তিনি বললেন, হে আমার পালনকর্তা! আমার অসি' বয়স্তভারাবনত হয়েছে, বার্ধক্যে মস্তক সুশুভ্র হয়েছে, হে আমার পালনকর্তা আপনাকে ডেকে আমি কখনো বিফল মনোরথ হইনি।” (মারইয়ামঃ ৪) উসীলার যে সমস্ত প্রকার উপরে বর্ণিত হয়েছে, তার সবই বৈধ।

 (চ) সৎকর্মশীলদের দু’আর উসীলা দেয়াঃ ছাহাবীগণ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কাছে দু’আ চাইতেন। বুখারী ও মুসলিম শরীফে আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে, জুমআর দিনে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খুৎবারত অবস্থায় এক ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ধন্তসম্পদ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, গাছপালা শুকিয়ে যাচ্ছে, পশুপাল পিপাসায় মারা যাচ্ছে। আল্লাহর কাছে বৃষ্টির জন্য দু’আ করুন। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উভয় হাত উঠালেন এবং তিনবার বললেন, হে আল্লাহ! আমাদের জন্য বৃষ্টি বর্ষণ করুন। অতঃপর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিম্বার থেকে নামার আগেই বৃষ্টি বর্ষিত হল এবং তাঁর দাড়ি মুবারক বেয়ে বৃষ্টির পানি ঝরতে থাকল। এবং এক সপ্তাহ পর্যন্ত বৃষ্টি অব্যাহত থাকল। পরবর্তী জুমআয় সেই ব্যক্তি অথবা অন্য এক ব্যক্তি বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! পানিতে সব কিছু ডুবে যাচ্ছে, ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, আল্লাহর কাছে বৃষ্টি বন্ধ হওয়ার জন্য দু’আ করুন। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দু’হাত উঠালেন এবং বললেন, حَوَالَيْنَا وَلاَ عَلَيْنَا) (أَلّلهُمَّ অর্থঃ হে আল্লাহ! আমাদের আশে-পাশের উঁচু ভূমিতে বৃষ্টি বর্ষণ কর, আমাদের উপরে নয়। এই বলে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আকাশের এক পাশের দিকে ইঙ্গিত করার সাথে সাথে আকাশ পরিস্কার হয়ে গেল। মানুষেরা সূর্যের আলোতে বের হয়ে আসল।

আরো অনেক ক্ষেত্রে ছাহাবীগণ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর কাছে বিশেষভাবে দু’আ চেয়েছিলেন। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদা বললেন যে, তাঁর উম্মতের সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে এবং বিনা আযাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তিনি এও বললেন যে, তারা ঐ সমস্ত লোক, যারা ঝাড়-ফুঁক করে না, চিকিৎসার জন্য লোহা গরম করে দাগ দেয় না এবং পাখি উড়িয়ে নিজেদের ভাগ্য পরীক্ষা করে না। বরং তারা তাদের প্রতিপালকের উপর ভরসা করে। এ কথা শুনে উকাশা ইবনে মিহসান (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর নবী! আপনি আল্লাহর কাছে দু’আ করুন, আল্লাহ যেন আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত। এটাও এক প্রকার উসীলা। দু’আ কবুল হওয়ার আশা করা যায় এমন কোন সৎ ব্যক্তির কাছে গিয়ে তার কাছে দু’আ চাওয়া এবং তার দু’আর উসীলা গ্রহণ করা জায়েয আছে। কোন মুসলমান যদি তার মুসলিম ভাইয়ের অনুপসি'তে তার জন্য দু’আ করে, তবে ফেরেশতাগণ আমীন বলতে থাকেন।

 (২) অবৈধ উসীলাঃ

শরীয়ত সম্মত নয়, এমন জিনিষের মাধ্যমে উসীলা গ্রহণ করা অবৈধ। কেননা এ সমস্ত বিষয়ের মাধ্যমে উসীলা দেয়া বিবেক এবং শরীয়ত সম্মত নয়। যেমন মৃত ব্যক্তির কাছে দু’আ চাওয়ার মাধ্যমে উসীলা গ্রহণ করা। এধরণের উসীলা দেয়া জায়েয নেই। কারণ মৃত ব্যক্তির কাছে দু’আ চাওয়া একটি জঘণ্য মুর্খতাপূর্ণ কাজ। কেননা মানুষ যখন মারা যায়, তার আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। কোন মৃত ব্যক্তির পক্ষে কারও জন্য দু’আ করা সম্ভব নয়। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর পক্ষেও মৃত্যু বরণ করার পর কারও জন্য দু’আ করা সম্ভব নয়। তাই ছাহাবীগণ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর মৃত্যুর পর তাঁর কাছে এসে দু’আ চাননি। উমার (রাঃ) এর আমলে যখন অনাবৃষ্টি দেখা দেয়, তখন তিনি বললেনঃ হে আল্লাহ! আপনার নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবিত থাকাকালে তাঁর উসীলা দিয়ে আমরা আপনার কাছে বৃষ্টি প্রার্থনা করতাম। এবং আপনি আমাদেরকে বৃষ্টি প্রদান করতেন। এখন আমরা নবীর চাচার উসীলায় আপনার কাছে বৃষ্টি প্রার্থনা করছি। আমাদেরকে বৃষ্টি প্রদান করুন। তারপর আব্বাস (রাঃ) দাঁড়ালেন এবং দু’আ করলেন। মৃতের কাছে দু’আ চাওয়া যদি বৈধ হতো, তা হলে কোন ক্রমেই তারা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে বাদ দিয়ে আব্বাস (রাঃ) এর কাছে দু’আ চাওয়া বৈধ মনে করতেন না। কারণ আব্বাস (রাঃ) এর দু’আর চেয়ে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর দু’আ কবূল হওয়া অধিক উপযোগী। মোটকথা মৃত ব্যক্তির উসীলা দিয়ে দু’আ করা জায়েয নেই।

অনুরূপভাবে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সম্মানের উসীলা দেয়াও জায়েয নেই। কারণ আল্লাহর কাছে তাঁর সম্মান থাকা দু’আকারীর জন্য কোন উপকারে আসবে না। দু’আকারীর জন্য এমন বিষয়ের উসীলা দেয়া উচিৎ, যা তার কাজে আসবে। সুতরাং এভাবে বলা উচিৎ যে, হে আল্লাহ! আপনার প্রতি এবং আপনার রাসূলের প্রতি আমার ঈমান আনয়নের বিনিময়ে আমাকে ক্ষমা করুন। এ জাতীয় অন্যান্য শরীয়ত সম্মত বিষয়ের উসীলা দেয়া বৈধ।

(৯৪) কাউকে বন্ধু বা শত্রু হিসাবে গ্রহণ করার মূলনীতি কি?


আল্লাহ তাআ’লা যে সমস্ত ব্যক্তি বা বিষয় হতে নিজেকে সম্পর্ক মুক্ত ঘোষণা করেছেন, প্রত্যেক মুসলিমের উচিৎ তা থেকে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করা। আল্লাহ বলেনঃ

)قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَآءُ مِنْكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا(

“তোমাদের  জন্যে ইবরাহীম ও তার সংঙ্গীগণের মধ্যে চমৎকার আদর্শ রয়েছে। তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিল, তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহ ব্যাতীত যার ইবাদত কর, তার সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদেরকে মানি না। তোমরা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করলে তোমাদের আমাদের মধ্যে চিরশত্রুতা থাকবে।” (সূরা মুমতাহানাহঃ ৪) আর এটা হবে মুশরিকদের সাথে। আল্লাহ বলেনঃ

)وَأَذَانٌ مِنْ اللَّهِ وَرَسُولِهِ إِلَى النَّاسِ يَوْمَ الْحَجِّ الْأَكْبَرِ أَنَّ اللَّهَ بَرِيءٌ مِنْ الْمُشْرِكِينَ وَرَسُولُهُ(

অর্থঃ “আর মহান হজ্জের দিনে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে লোকদের প্রতি ঘোষণা দেয়া হচ্ছে যে, আল্লাহ মুশরিকদের থেকে দায়িত্ব মুক্ত এবং তাঁর রাসূলও।” (সূরা তাওবাঃ ৩) সুতরাং প্রতিটি মুমিনের উপর আবশ্যক হল কাফের-মুশরেকদের সাথে সকল প্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করা। এমনিভাবে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের অপছন্দনীয় সকল কাজ থেকে বিরত থাকা প্রতিটি মুসলিমের উপর ওয়াজিব। যদিও তা কুফরীর পর্যায়ে না যায়। যেমন পাপাচারিতায় লিপ্ত হওয়া। আল্লাহ বলেনঃ

)وَلَكِنَّ اللَّهَ حَبَّبَ إِلَيْكُمْ الْإِيمَانَ وَزَيَّنَهُ فِي قُلُوبِكُمْ وَكَرَّهَ إِلَيْكُمْ الْكُفْرَ وَالْفُسُوقَ وَالْعِصْيَانَ أُوْلَئِكَ هُمْ الرَّاشِدُونَ(

“কিন্তু আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ঈমানের প্রতি মহব্বত সৃষ্টি করে দিয়েছেন এবং তা হৃদয়গ্রাহী করে দিয়েছেন। পক্ষান্তরে কুফর, পাপাচার ও নাফরমানীর প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। তারাই সৎপথ অবলম্বনকারী।” (সূরা হুজুরাতঃ ৭)

   যদি কোন মুমিনের কাছে ঈমানের সাথে সাথে পাপাচারিতা থাকে, তাহলে আমরা মুমিন হওয়ার কারণে তাকে ভালবাসব এবং পাপ কাজে লিপ্ত হওয়ার কারণে ঘৃণা করব। এধরণের সম্পর্ক রাখার ব্যাপারে দৃষ্টান্ত হল, যেমন আমরা অরুচীকর ঔষধ গ্রহণ করি, অনিচ্ছা সত্বেও তা পান করি। কারণ তাতে আরোগ্যের আশা করা যায়।

   কোন কোন মানুষ পাপী মুমিনকে কাফের-মুশরেকের চেয়েও ঘৃণা করে। এটি খুবই আশ্চর্য্যের বিষয় এবং বাস্তবতার বিপরীত। কাফের আল্লাহর শত্রু, রাসূলের শত্রু এবং সমস্ত মুমিনের শত্রু। তাদেরকে অন্তর থেকে ঘৃণা করা ওয়াজিব।

)يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُمْ مِنْ الْحَقِّ يُخْرِجُونَ الرَّسُولَ وَإِيَّاكُمْ أَنْ تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ رَبِّكُمْ إِنْ كُنتُمْ خَرَجْتُمْ جِهَادًا فِي سَبِيلِي وَابْتِغَاءَ مَرْضَاتِي تُسِرُّونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَأَنَا أَعْلَمُ بِمَا أَخْفَيْتُمْ وَمَا أَعْلَنتُمْ وَمَنْ يَفْعَلْهُ مِنْكُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَاءَ السَّبِيل(

“হে মুমিনগণ! তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা তো তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও, অথচ তোমাদের কাছে যে সত্য আগমণ করেছে, তারা তা অস্বীকার করছে। তারা রাসূলকে এবং তোমাদেরকে বহিস্কার করে, এই অপরাধে যে, তোমরা তোমাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস রাখ। যদি তোমরা আমার সন'ষ্টি লাভের জন্যে এবং আমার পথে জেহাদ করার জন্যে বের হয়ে থাক, তবে কেন তাদের প্রতি গোপনে বন্ধুত্বের পয়গাম প্রেরণ করছ? তোমরা যা গোপন কর এবং যা প্রকাশ কর, তা আমি খুব জানি। তোমাদের মধ্যে যে এটা করে, সে সরল পথ হতে বিচ্যুত হয়ে যায়।” (সূরা মুমতাহানাহঃ ১) আল্লাহ বলেন,

)يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ (

“হে মুমিনগণ! তোমরা ইয়াহুদী ও নাসাদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করো না। তারা পরস্পরে বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে। আল্লাহ জালেমদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না।” (সূরা মায়িদাহঃ ৫১) আল্লাহ বলেন,

)وَلَنْ تَرْضَى عَنْكَ الْيَهُودُ وَلَا النَّصَارَى حَتَّى تَتَّبِعَ مِلَّتَهُمْ (

“ইহুদী ও খৃষ্টানরা কখনই আপনার উপর সন্তুষ্ট হবে না, যে পর্যন্ত আপনি তাদের ধর্মের অনুসরণ না করবেন।” (সূরা বাকারাঃ ১২০) আল্লাহ আরো বলেন,

)وَدَّ كَثِيرٌ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَوْ يَرُدُّونَكُمْ مِنْ بَعْدِ إِيمَانِكُمْ كُفَّارًا(

“আহ্‌লে কিতাবদের অনেকেই প্রতিহিংসা বশতঃ কামনা করে যে, মুসলমান হওয়ার পর তোমাদেরকে কাফের বানিয়ে দেয়।” (সূরা বাকারাঃ ১০৯)

এমনিভাবে প্রতিটি নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত থাকা আবশ্যক। আমাদের জন্যে হারাম কাজের প্রতি ভালবাসা রাখা বৈধ নয়। আমরা পাপী মুমিনের পাপকাজকে ঘৃণা করি এবং তা থেকে আমরা নিজেদেরকে দূরে রাখি। কিন্তু আমরা তাকে ঈমানের কারণে ভালবাসি।

(৯৫) অমুসলিম দেশে ভ্রমণ করার হুকুম কি? পর্যটনের উদ্দেশ্যে দেশ ভ্রমণের বিধান কি?


তিনটি শর্ত সাপেক্ষে অমুসলিম দেশে ভ্রমণ করা বৈধঃ

১)      ভ্রমণকারীর কাছে প্রয়োজনীয় ইল্‌ম বিদ্যমান থাকা, যার মাধ্যমে সকল সন্দেহ থেকে বিরত থাকা সম্ভব।
২)      তার কাছে এমন দ্বীনদারী বিদ্যমান থাকা, যার মাধ্যমে সে নফসের প্রবৃত্তি দমনে সক্ষম হবে।
৩)      অমুসলিম দেশে ভ্রমণের প্রয়োজনীয়তা বিদ্যমান থাকা।

উপরের শর্তগুলো পাওয়া না গেলে অমুসলিম দেশে সফর করা বৈধ নয়। কেননা এতে ফিতনার ভয় রয়েছে। এতে প্রচুর সম্পদও বিনষ্ট হয়ে থাকে। তবে যদি প্রয়োজন দেখা দেয় যেমন চিকিৎসার জন্য অথবা শিক্ষা অর্জনের জন্য, যা অন্য কোন দেশে পাওয়া যায় না, তা হলে কোন অসুবিধা নেই।

পর্যটনের উদ্দেশ্যে অমুসলিম দেশে ভ্রমণ করার কোন দরকার নেই; বরং এমন ইসলামী দেশে যাওয়া যায় যেখানে ইসলামের বিধিবিধান পালন করা হয়। আমাদের ইসলামী দেশসমূহে আল্লাহর মেহেরবাণীতে যথেষ্ট পর্যটনের স্থান রয়েছে। সেখানে পর্যটনের জন্য যাওয়া এবং সেখানে গিয়ে ছুটি কাটানো সম্ভব।

(৯৬) যে ব্যক্তি কাফেরদের সাথে চাকুরী করে, তার জন্য আপনার উপদেশ কি?


যে মুসলিম ভাই অমুসলিমদের সাথে চাকুরী করে, তার জন্য আমার উপদেশ হল, সে এমন একটি কর্মক্ষেত্র তালাশ করবে, যা আল্লাহ এবং তদীয় রাসূলদের শত্রু হতে মুক্ত। যদি পেয়ে যায়, তাহলে কতইনা সুন্দর। আর যদি না পায়, তাহলে কাফেরদের সাথে একই কর্মক্ষেত্রে চাকুরী করতে কোন অসুবিধা নেই। তারা তাদের কাজ করবে এবং সেও আপন কর্মে লিপ্ত থাকবে। তবে শর্ত থাকে যে, তার অন্তরে যেন কাফেরদের প্রতি কোনরূপ ভালবাসা না থাকে। সালাম এবং তার উত্তর দেয়ার ব্যাপারে সে ইসলামী নীতিমালার অনুসরণ করে চলবে। তাদের জানাযায় শরীক হবে না এবং তাদের অনুষ্ঠানাদিতে অংশ গ্রহণ করবে না। বিশেষ করে তাদের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করবে। সাধ্যানুসারে তাদেরকে ইসলামের দিকে দাওয়াত দেয়ার চেষ্টা করবে।

(৯৭) কাফেরদের কাছে যে সমস্ত প্রযুক্তি রয়েছে, অবৈধতায় পতিত না হয়ে তা দ্বারা কিভাবে আমরা উপকৃত হব?


আল্লাহর শত্রু কাফেররা যে সমস্ত কাজ-কর্ম করে, তা তিন প্রকরঃ-

১) ইবাদত ২) অভ্যাস এবং ৩) কারিগরি ও শিল্পকলা। এবাদতের ক্ষেত্রে কোন ক্রমেই কাফেরদের অনুসরণ করা বৈধ নয়। যে ব্যক্তি এবাদতের ক্ষেত্রে তাদের অনুসরণ করবে, তার জন্য বিরাট ভয়ের কারণ রয়েছে। ইহা তাকে ইসলাম থেকে বেরও করে দিতে পারে। লেবাস্তপোষাক, চাল-চলন ও রীতিনীতি ইত্যাদির কোন ক্ষেত্রেই কাফেরদের অনুসরণ করা বৈধ নয়। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ

)مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ

“যে ব্যক্তি কোন জাতির অনুসরণ করবে, সে উক্ত জাতির অন্তর্ভুক্ত হবে।” তবে যাতে জনগণের উপকার রয়েছে, তা কাফেরদের কাছ থেকে শিক্ষা করাতে কোন দোষ নেই। কারণ তা দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাছাড়া এবাদতের ক্ষেত্রে মূলনীতি হল, তাতে দলীল থাকতে হবে। আর অভ্যাস বা পার্থিব বিষয়ের ব্যাপারে মূলনীতি হল তা সবই হালাল। একমাত্র শরীয়ত সুনির্দিষ্ট ভাবে কিছু হারাম করলে সেটা ভিন্ন কথা।

(৯৮) আরব উপদ্বীপে অমুসলিমদের প্রবেশ করানোর হুকুম কি?


অমসুলিসমদেরকে আরব উপদ্বীপে প্রবেশ করানোতে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বাণীর বিরোধীতা করার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি মৃত্যু শয্যায় শায়িত অবস্থায় বলেনঃ

)أَخْرِجُوا الْمُشْرِكِينَ مِنْ جَزِيرَةِ الْعَرَبِ(

“তোমরা মুশরিকদেরকে আরব উপদ্বীপ থেকে বের করে দাও।” সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

)لَأُخْرِجَنَّ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى مِنْ جَزِيرَةِ الْعَرَبِ حَتَّى لَا أَدَعَ إِلَّا مُسْلِمًا(

“আমি অবশ্যই ইয়াহুদী-নাসারাদেরকে আরব উপদ্বীপ থেকে বের করে দেব। তাতে মুসলিম ব্যতীত অন্য কোন মানুষকে থাকতে দেব না।”

তবে যদি কোন প্রয়োজন দেখা দেয় এবং উক্ত প্রয়োজন পূরণ করার মত  কোন মুসলমান পাওয়া না যায় তবে তাদেরকে আরব উপদ্বীপে প্রবেশ করানোতে কোন দোষ নেই। তবে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি প্রদান করা যাবে না। যেখানে শর্ত সাপেক্ষে জায়েয বলা হয়েছে, সেখানেও যদি আকীদাহ কিংবা চরিত্রগত কোন ফাসাদের সম্ভাবনা থাকে, তাহলে তাদেরকে আরব উপদ্বীপে প্রবেশ করানো হারাম। কেননা জায়েয বস্ততে যদি ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে, তখন তা হারামে পরিণত হয়ে যায়। কাফেরদেরকে এখানে আনা হলে যে সমস্ত ভয়ের সম্ভাবনা রয়েছে, তা হলো তাদেরকে ভালবাসা, তাদের কুফরীতে সন্তুষ্ট থাকা এবং দ্বীনের প্রতি দৃঢ়তা চলে যাওয়া ইত্যাদি। আল্লাহর অনুগ্রহে মুসলিম বিশ্বে যথেষ্ট পেশাদার লোক রয়েছে। আমরা তাদেরকেই যথেষ্ট মনে করতে পারি।

(৯৯) কিছু সংখ্যক মানুষ দাবী করে যে, দ্বীনের অনুসরণই মুসলমানদেরকে উন্নতি থেকে পিছিয়ে রেখেছে। তাদের দলীল হলো পাশ্চাত্য দেশসমূহ সকল প্রকার দ্বীনকে প্রত্যাখ্যান করেই বর্তমানে উন্নতির চরম শিখরে আরোহন করতে সক্ষম হয়েছে। তারা এও বলে যে, পাশ্চাত্য বিশ্বেই বেশী করে বৃষ্টি ও ফসলাদি উৎপন্ন হয়ে থাকে। এ ব্যাপারে আপনার মতামত জানতে চাই।


দুর্বল ঈমানদার, ঈমানহীন এবং ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ লোকেরাই কেবল এ ধরণের কথা বলতে পারে। মুসলিম জাতি ইসলামের প্রথম যুগে দ্বীনকে আঁকড়ে ধরেই সম্মান্তমর্যাদা এবং শক্তি অর্জন করে পৃথিবীর সকল প্রানে- তাদের আধিপত্য বিস্তার করেছিল। মুসলমানদের স্বর্ণ যুগের জ্ঞান্তবিজ্ঞান সংগ্রহ করেই বর্তমান পাশ্চাত্য বিশ্ব এতো উন্নতি করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু মুসলিম জাতি আজ তাদের সঠিক দ্বীনকে ছেড়ে দিয়ে আকীদা ও আমলের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিদ্‌আতে লিপ্ত হওয়ার কারণেই সমস্ত জাতির পিছনে পড়ে আছে। আমরা দৃঢ় বিশ্বাস রাখি যে, মুসলমানেরা যদি আবার তাদের দ্বীনের দিকে ফিরে যায়, তা হলে আমারই সম্মানিত হবো এবং সমস্ত জাতির উপরে আমরা রাজত্ব করতে সক্ষম হবো। আবু সুফিয়ান যখন রোমের বাদশা হিরাক্লিয়াসের সামনে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর দ্বীনের পরিচয় তুলে ধরল, তখন রোমের বাদশা মন্তব্য করে বলল যে, তুমি যা বলছ, তা সত্য হলে অচিরেই তাঁর রাজত্ব আমার পা রাখার স্থান পর্যন্ত চলে আসবে।

   পাশ্চাত্য দেশসমূহে যে সমস্ত উন্নতি সাধিত হয়েছে, আমাদের দ্বীন তা গ্রহণ করতে বাধা দেয় না। আফসোসের কথা হলো মুসলমানেরা দ্বীন্তদুনিয়া উভয়টিকেই হারিয়ে ফেলেছে। পার্থিব উন্নতি সাধন করতে ইসলাম কখনো বিরোধীতা করে না। আল্লাহ বলেনঃ

)وَأَعِدُّوا لَهُمْ مَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رِبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوَّ اللَّهِ وَعَدُوَّكُم(

“আর প্রস্তত কর তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যা কিছু সংগ্রহ করতে পার নিজের শক্তি সামর্থের মধ্য থেকে এবং পালিত ঘোড়ার মধ্য থেকে। তা দ্বারা তোমরা ভয় দেখাবে আল্লাহর শত্রু এবং তোমাদের শত্রুদেরকে।” (সূরা আনফালঃ ৬০) আল্লাহ বলেনঃ

)هُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمْ الْأَرْضَ ذَلُولًا فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُوا مِنْ رِزْقِهِ(

“তিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীকে সুগম করেছেন। অতএব, তোমরা তার দিক-দিগনে- ও রাস্তা সমূহে চলাফেরা কর এবং তাঁর দেয়া রিজিক আহার কর।” (সূরা মুলকঃ ১৫) তিনি আরো বলেনঃ

)هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا(

“তিনি তোমাদের জন্য ভূপৃষ্টের সকল বস্ত সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা বাকারাঃ ২৯) এ অর্থে আরো অনেক আয়াত রয়েছে, যা মানুষকে পৃথিবীর সকল বস্ত উপার্জন করে তা দ্বারা উপকৃত হওয়ার প্রতি উৎসাহ যোগায়। দ্বীন হিসাবে গ্রহণ করার জন্য নয়। বরং তা দ্বারা পার্থিব জীবনে উপকৃত হওয়ার জন্য। অমুসলিম রাষ্ট্রের লোকেরা মৌলিক দিক থেকে কাফের। তারা যে দ্বীনের দাবী করে থাকে, তাও বাতিল ধর্ম। আল্লাহ বলেনঃ

)وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ(

“যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য দ্বীন গ্রহণ করবে, তার কাছ থেকে তা গ্রহণ করা হবে না।” (সূরা আল-ইমরানঃ ৮৫) আহলে কিতাবরা যদিও অন্যান্য কাফের-মুশরেকদের থেকে আলাদা, কিন্তু পরকালে কোন পার্থক্য হবে না। এজন্যই নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শপথ করে বলেছেন, এই উম্মতের কোন ইয়াহুদী-নাসারা যদি তাঁর দাওয়াত শ্রবণ করার পরও ঈমান না এনে মৃত্যু বরণ করে, তবে সে জাহান্নামের অধিবাসী হবে। তারা নিজেদেরকে ইয়াহুদী বলে দাবী করুক বা নাসারা হিসাবে দাবী করুক, সবই সমান।

   অমুসলিমরা বৃষ্টিসহ অন্যান্য যে ধরণের নেয়ামত প্রাপ্ত হয়ে থাকে, তার কারণ হল এটা তাদের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ। তাদের ভাল কাজের বিনিময় দুনিয়াতে প্রদান করা হয়ে থাকে। উমার (রাঃ) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর পিঠে চাটাইয়ের দাগ পড়ে গেছে দেখে বললেন, হে আল্লাহর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! পারস্য এবং রোমের বাদশারা অসংখ্য নেয়ামতের ভিতরে রয়েছে। আর আপনি এই জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছেন। উত্তরে তিনি বললেন, হে উমার এদেরকে পার্থিব জীবনেই সমস্ত নেয়ামত দেয়া হয়েছে। তুমি কি এতে রাজী নও যে, তাদের জন্য হবে দুনিয়া আর আমাদের জন্য হবে আখেরাত।

   তাছাড়া তুমি কি দেখ না যে, তাদের মধ্যে হয়ে থাকে অনাবৃষ্টি, ঝড়, ভূমিকম্পসহ নানা বিপদাপদ? যা প্রায়ই পত্র-পত্রিকায় লেখা হয় এবং রেডিওতে শুনা যায়। উল্লেখিত প্রশ্নের মত যারা প্রশ্ন করে, তারা অন্ধ। আল্লাহ তাদের  অন্তরকেও অন্ধ করে দিয়েছেন। যার ফলে তারা বাস্তব অবস্থা দেখতে পায় না। তাদের জন্য আমার নসীহত এই যে, তারা যেন মৃত্যু আসার পূর্বেই তাওবা করে এবং এটা বিশ্বাস করে যে, ইসলামের দিকে ফিরে আসলেই আমাদের জন্য সম্মান, প্রতিপত্তি ও নেতৃত্ব অর্জিত হবে। উপরোক্ত সন্দেহ পোষণকারীর এটাও বিশ্বাস করা জরুরী যে, পাশ্চাত্য বিশ্বের কাফেররা বাতিলের উপর রয়েছে। আল্লাহর কিতাব এবং রাসূলের সুন্নাত অনুযায়ী তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। পরকালে পূর্ণভাবে শাস্তি প্রদানের নিমিত্তেই তাদেরকে দুনিয়ার নেয়ামত প্রদান করা হয়েছে। যখন তারা দুনিয়া ছেড়ে চলে যাবে, তখন তাদের দুঃখ ও হতাশা বেড়ে যাবে। তাদেরকে নেয়ামত প্রদানের উদ্দেশ্য এটিই।

(১০০) কতক লোক বলে যে, অন্তর ঠিক থাকলে শব্দের উচ্চারণ ঠিক করার বেশী গুরুত্ব নেই। এ ব্যাপারে আপনি কি বলেন?


শব্দের উচ্চারণ বলতে যদি তার উদ্দেশ্য হয় আরবী ভাষা, তাহলে কোন অসুবিধা নেই। তার কারণ এই যে, আকীদা ঠিক থাকলে আরবী ভাষার সঠিক উচ্চারণ জরুরী নয়। অর্থ বোঝা গেলেই চলবে। আর যদি শব্দের উচ্চারণ বলতে এটা উদ্দেশ্য হয় যে, অন্তরের আকীদা যেহেতু ঠিক আছে, কাজেই মুখে যা ইচ্ছা তা উচ্চারণ করাতে কোন অসুবিধা নেই। যদিও তা কুফরী বাক্য হয়ে থাকে। তবে এটি ঠিক নয়। আমরা বলব যে, অন্তরের বিশ্বাসের সাথে সাথে মুখের ভাষাও ঠিক করতে হবে।

(১০১) ‘আল্লাহ আপনাকে চিরস্থায়ী করুন’- একথাটি বলা কি ঠিক?


প্রশ্নে বর্ণিত বাক্যটি বলা ঠিক নয়। বরং এটি দু’আর মধ্যে সীমালংঘন করার শামিল। কারণ আল্লাহ ব্যতীত কোন বস্তই চিরস্থায়ী নয়। আল্লাহ বলেনঃ

)كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ(

“ভূপৃষ্ঠের সবকিছুই ধ্বংসশীল। একমাত্র আপনার মহিমাময় ও মহানুভব পালনকর্তার চেহারা ব্যতীত।” (সূরা আর-রাহমানঃ ২৬-২৭) আল্লাহ আরো বলেনঃ

)وَمَا جَعَلْنَا لِبَشَرٍ مِنْ قَبْلِكَ الْخُلْدَ أَفَإِيْنْ مِتَّ فَهُمْ الْخَالِدُونَ(

“আপনার পূর্বেও কোন মানুষকে অনন্ত জীবন দান করিনি। সুতরাং আপনার মৃত্যু হলে তারা কি চিরঞ্জীব হবে?” (সূরা আম্বীয়াঃ ৩৪)

পেজ ন্যাভিগেশন

সর্বমোটঃ  119 টি বিষয় দেখান হচ্ছে।