• ৫৬৪০৩ টি সর্বমোট হাদিস আছেঃ
  • ৫৭৫৬ টি প্রশ্নোত্তর ও ফিকাহঃ

 

 

 

 


(৫৩০) ১২ তারিখে সূর্যাস্তের পূর্বে মিনা ত্যাগ করার পর কাজ থাকার কারণে কেউ যদি সূর্যাস্তের পর আবার মিনায় ফিরে আসে। এখন কি মিনায় রাত থাকা তার উপর আবশ্যক হয়ে যাবে?


না, মিনায় রাত থাকা তার উপর আবশ্যক হবে না। সে তাড়াহুড়াকারী হিসেবে গণ্য হবে। কেননা সে হজ্জের যাবতীয় কার্যাদী সম্পন্ন করে ফেলেছে। কাজের জন্য মিনায় ফিরে আসা তাড়াহুড়ার পরিপন্থী নয়। কেননা তার মিনায় ফিরে আসার নিয়ত নির্দিষ্ট কাজের জন্য হজ্জের জন্য নয়।

(৫৩১) সঊদী আরবের বাইরে অবস্থান করে এমন জনৈক হাজী হজ্জের কাজ সম্পাদন করেছে। জিলহজ্জের ১৩ তারিখে আছর তথা বিকাল চারটার সময় তার সফরের সময় নির্দিষ্ট। কিন্তু ১২ তারিখ কঙ্কর মারার পর সে মিনা থেকে বের হয়নি। ১৩ তারিখের রাত সেখানেই অবস্থান করেছে। এখন ১৩ তারিখ সকালে কঙ্কর মেরে মিনা থেকে বের হওয়া তার জন্য জায়েয হবে কি? উল্লেখ্য যে, যোহরের পর কঙ্কর মেরে বের হলে নির্ঘাত তার সফর বাতিল হয়ে যাবে, ফলে সে বিরাট অসুবিধায় পড়বে। এর উত্তর যদি না জায়েয হয়, তবে যোহরের পূর্বে কঙ্কর মারার ব্যাপারে কি কোন মত পাওয়া যায় না?


কোন অবস্থাতেই যোহরের পূর্বে কঙ্কর মারা জায়েয নয়। জরূরী অবস্থা হিসেবে কঙ্কর নিক্ষেপ করা রহিত হবে না। তবে তার সমাধান হচ্ছে এ অবস্থায় কঙ্কর না মেরেই সে চলে যাবে এবং তার ফিদিয়া প্রদান করবে। আর তা হচ্ছে মক্কা বা মিনায় একটি কুরবানী করবে অথবা কাউকে এর দায়িত্ব প্রদান করবে। এবং উক্ত কুরবানী সেখানকার ফকীরদের মাঝে বিতরণ করে দিবে। এরপর বিদায়ী তওয়াফ করে মক্কা ত্যাগ করবে।

হ্যাঁ, যোহরের পূর্বে কঙ্কর মারার বৈধতার ব্যাপারে মত পাওয়া যায়, কিন্তু তা বিশুদ্ধ নয়। সঠিক কথা হচ্ছে, ঈদের পর আইয়্যামে তাশরীকের দিনগুলোতে কোন অবস্থাতেই যোহরের সময়ের পূর্বে কঙ্কর মারা জায়েয নয়। কেননা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “তোমরা আমার নিকট থেকে ইবাদতের (হজ্জ-ওমরার) নিয়ম শিখে নাও।” আর তিনি এই দিনগুলোতে যোহরের পূর্বে কঙ্কর মারেন নি।

কেউ যদি বলে যে, যোহরের পর নবীজির কঙ্কর নিক্ষেপ তার সাধারণ একটি কর্ম। আর সাধারণ কর্ম দ্বারা ওয়াজিব সাব্যস্ত হয় না।

জবাবে আমরা বলব, একথা সত্য যে এটি তাঁর সাধারণ কর্ম। তিনি যোহরের পর কঙ্কর নিক্ষেপ করেছেন। এরকম বাচনিক নির্দেশ প্রদান করেন নি যে, ‘কঙ্কর নিক্ষেপ যোহরের পরেই হতে হবে’। তাছাড়া এ সময়ের পূর্বে নিক্ষেপের ব্যাপারে কোন নিষেধও করেন নি। আর তাঁর কর্ম ওয়াজিবের অর্থ বহণ করে না। নির্দেশ সূচক শব্দ ছাড়া কোন কাজ বাস্তবায়ন করা ওয়াজিব হয় না বা নিষেধ সূচক শব্দ ছাড়া পরিত্যাগ করা ওয়াজিব প্রমাণিত হয় না। কিন্তু আমি বলব, নবীজির উক্ত কর্ম যে ওয়াজিব তার পক্ষে কারণ আছে। আর তা হচ্ছে, কঙ্কর মারার ব্যাপারে যোহরের সময় পর্যন্ত নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর অপেক্ষা করাটাই প্রমাণ করে যে এটা ওয়াজিব। কেননা যোহরের পূর্বে কঙ্কর মারা যদি জায়েয হত, তবে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেটাই করতেন। কারণ উম্মতের জন্য এটাই সহজ। আর নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে যখন দু’টি বিষয়ের মাঝে স্বাধীনতা দেয়া হত, তখন তিনি উভয়টির মধ্যে থেকে সহজটি গ্রহণ করতেন্ত যদি তাতে কোন পাপ না থাকত। সুতরাং এখানে যখন তিনি সহজ অবস্থাটি গ্রহণ করেন নি অর্থাৎ যোহরের সময় হওয়ার পূর্বে কঙ্কর নিক্ষেপ করেন নি, তখন বুঝা যায় এতে পাপ আছে। অতএব যোহরের সময় হওয়ার পরই কঙ্কর মারা ওয়াজিব।

এ কাজটি ওয়াজিব হওয়ার দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলার সাথে সাথে যোহরের নামায আদায় করার পূর্বেই কঙ্কর মেরেছেন। যেন তিনি অধির আগ্রহে সূর্য ঢলার অপেক্ষা করছিলেন। যাতে করে দ্রুত কঙ্কর মারতে পারেন। আর একারণেই যোহর নামায দেরী করে আদায় করেছেন। অথচ প্রথম সময়ে অর্থাৎ সময় হওয়ার সাথে সাথেই নামায আদায় করা উত্তম। এথেকেই বুঝা যায় যোহরের সময় হওয়ার পূর্বে কঙ্কর মারা জায়েয হবে না।

(৫৩২) জনৈক ব্যক্তি ১২ তারিখে কঙ্কর না মেরেই মিনা ছেড়েছে এ ধারণায় যে, এটাই অনুমদিত তাড়াহুড়া। এবং বিদায়ী তওয়াফও করেনি। তার হজ্জের কি হবে?


তার হজ্জ বিশুদ্ধ। কেননা সে হজ্জের কোন রুকন পরিত্যাগ করেনি। কিন্তু সে তিনটি ওয়াজিব পরিত্যাগ করেছে- যদি ১২ তারিখের রাত মিনায় না কাটিয়ে থাকে।

প্রথম ওয়াজিবঃ ১২ তারিখের রাত মিনায় কাটানো।

দ্বিতীয় ওয়াজিবঃ ১২ তারিখে কঙ্কর নিক্ষেপ করা।

তৃতীয় ওয়াজিবঃ বিদায়ী তওয়াফ।

তার উপর আবশ্যক হচ্ছে প্রতিটি ছেড়ে দেয়া ওয়াজিবের বিনিময়ে একটি করে দম দেয়া। অর্থাৎ মোট তিনটি কুরবানী করে তা মক্কার ফকীরদের মাঝে বিতরণ করে দেয়া। কেননা বিদ্বানদের মতে কেউ যদি হজ্জের কোন ওয়াজিব পরিত্যাগ করে, তবে তার বিনিময়ে কুরবানী করে তা মক্কার ফকীরদের মাঝে বিতরণ করতে হবে।

এ উপলক্ষে আমি হাজী সাহেবানদের সতর্ক করতে চাই, প্রশ্নকারী যে রকম ভুল করেছে অধিকাংশ হাজী এরকমই বুঝে থাকে এবং অনুরূপ ভুল করে থাকে। আল্লাহ্‌র বাণীঃ “যে ব্যক্তি দু’দিন থেকে তাড়াহুড়া করে চলে যেতে চায়, তার কোন গুনাহ্‌ নেই।” তারা মনে করে এখানে দু’দিন বলতে ঈদের দিন ও ১১তম দিনকে বুঝানো হয়েছে। তাই তারা ১১ তারিখে কঙ্কর মেরেই মিনা ত্যাগ করে। কিন্তু বিষয়টি এরূপ নয়। এটা একটা মারাত্মক ভুল। কেননা আল্লাহ বলেন,

] وَاذْكُرُوا اللَّهَ فِي أَيَّامٍ مَعْدُودَاتٍ فَمَنْ تَعَجَّلَ فِي يَوْمَيْنِ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ وَمَنْ تَأَخَّرَ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ [

“তোমরা নির্দিষ্ট কতিপয় দিনে আল্লাহর যিকির কর। অতঃপর যে ব্যক্তি দু’দিন থাকার পর তাড়াহুড়া করে চলে যেতে চায়, তার কোন গুনাহ্‌ নেই।” (সূরা বাক্বারাঃ ২০৩) এ আয়াতে নির্দিষ্ট সংখ্যক দিন বলতে আইয়্যামে তাশরীকের দিন সমূহ (তথা জিলহজ্জের ১১, ১২ ও ১৩)কে বুঝানো হয়েছে। আর আইয়ামে তাশরীকের প্রথম দিন হচ্ছে ১১ তারিখ। অতএব উক্ত আয়াতের উদ্দেশ্য হচ্ছে, যে ব্যক্তি আইয়ামে তাশরীকের মধ্যে থেকে প্রথম দু’দিনে তাড়াহুড়া করে চলে আসবে তার কোন গুনাহ্‌ নেই। আর উক্ত দু’দিনের দ্বিতীয় দিন হচ্ছে ১২তম দিন।

সুতরাং প্রত্যেকের উচিৎ এ মাসআলাটি ভালভাবে অনুধাবন করা এবং ভুল সংশোধন করে নেয়া।

(৫৩৩) মিনায় স্থান না পাওয়ার কারণে কোন লোক যদি সেখানে শুধুমাত্র রাতের বেলায় আগমণ করে মধ্য রাত্রি পর্যন্ত অবস্থান করে। তারপর মক্কা চলে যায় এবং রাত ও দিনের অবশিষ্ট অংশ তথায় অবস্থান করে তবে কি হবে?


তার এই কাজ যথেষ্ট হবে। কিন্তু এর বিপরীত করাই উত্তম। উচিৎ হচ্ছে, হাজী সাহেব রাত ও দিনের পূরা সময় মিনাতেই অতিবাহিত করবে। ভালভাবে অনুসন্ধান করার পরও যদি কোন মতেই মিনার অভ্যন্তরে স্থান করতে না পারে, তবে সর্বশেষ (খীমা বা) তাঁবুর সংলগ্ন স্থানে তাঁবু করে সেখানে অবস্থান করবে যদিও তা মিনার বাইরে পড়ে। বর্তমান যুগের কোন কোন বিদ্বান মত প্রকাশ করেছেন যে, কোন মানুষ যদি মিনায় অবস্থান করার স্থান না পায়, তবে মিনায় রাত কাটানো রহিত হয়ে যাবে। তখন তার জন্য জায়েয হয়ে যাবে মক্কা বা অন্য কোন স্থানে রাত কাটানো। তাদের কিয়াস হচ্ছে, কোন মানুষের ওযুর কোন অঙ্গ যদি কাটা থাকে তখন সেটা ধৌত করা রহিত হয়ে যায়। কিন্তু তাদের এই মত যুক্তি সংগত নয়। কেননা ওযুর অঙ্গের বিষয়টি ঐ ব্যক্তির পবিত্রতার সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু মিনায় রাত কাটানোর বিষয়টির উদ্দেশ্য হচ্ছে, সমস্ত লোকের একস্থানে সমবেত থাকা। সকলে ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে প্রকাশ ঘটানো। সুতরাং ওয়াজিব হচ্ছে, মিনার শেষ তাঁবুর পাশে তাঁবু বানিয়ে থাকা, যাতে করে সে হাজীদের সাথেই রাত কাটাতে পারে। এর উদাহরণ হচ্ছে, নামাযের জামাতে যদি মসজিদ পূর্ণ হয়ে যায়, আর লোকেরা মসজিদের আশে-পাশে বাইরে নামাযে দাঁড়ায়, তবে আবশ্যক হচ্ছে কাতার মিলিত হওয়া। যাতে করে তারা একই জামাতভুক্ত একথা প্রমাণ হয়। রাত কাটানোর বিষয়টি এর সাথে সামঞ্জস্যশীল, শরীরের কর্তিত অঙ্গের সাথে এর তুলনা করা উচিৎ নয়।

(৫৩৪) জনৈক ব্যক্তি সকালে বিদায়ী তওয়াফ করে ঘুমিয়ে পড়ে এবং আছরের পর সফর করার ইচ্ছা করে। তাকে কি কিছু করতে হবে?


হজ্জ ও ওমরা উভয় ক্ষেত্রে তাকে পুনরায় বিদায়ী তওয়াফ করতে হবে। কেননা নবী (সাঃ) বলেনঃ

لا يَنْفِرَنَّ أَحَدٌ حَتَّى يَكُونَ آخِرُ عَهْدِهِ بِالْبَيْتِ

“সর্বশেষ কাজ বায়তুল্লাহ্‌র তওয়াফ না করে কেউ যেন বের না হয়।” একথাটি নবীজি বিদায় হজ্জে বলেছেন। সুতরাং বিদায়ী তওয়াফের বিধান সেই সময় থেকে শুরু হয়েছে। একথা বলা ঠিক হবে না যে, নবী তো বিদায় হজ্জের পূর্বে ওমরা করেছেন কিন্তু বিদায়ী তওয়াফ তো করেননি। কেননা বিদায়ী তওয়াফের আবশ্যকতার নির্দেশ তো বিদায় হজ্জে পাওয়া গেছে। আর তিনি এরশাদ করেছেন:

وَاصْنَعْ فِي عُمْرَتِكَ كَمَا تَصْنَعُ فِي حَجَّتِكَ

“হজ্জের মধ্যে যেভাবে কাজ করে থাক ওমারাতেও সেভাবে করো।” এ নির্দেশটি ব্যাপক অর্থবোধক। কিন্তু তার মধ্যে ব্যতিক্রম হচ্ছে আরাফা, মুযদালিফা ও মিনাতে অবস্থান ও কঙ্কর নিক্ষেপ। কেননা সর্বসম্মতিক্রমে একাজগুলো হজ্জের সাথে সম্পর্কিত। এগুলো ছাড়া বাকী কাজ উক্ত হাদীছের আওতাধীন থাকবে। কেননা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওমরাকে ছোট হজ্জ রূপে আখ্যা দিয়েছেন। যেমনটি আমর বিন হাযম কর্তৃক প্রসিদ্ধ দীর্ঘ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে। হাদীছটি মুরসাল। কিন্তু উলামাগণ সাধারণভাবে হাদীছটি গ্রহণ করেছেন।

তাছাড়া আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন, “তোমরা আল্লাহর জন্য হজ্জ ও ওমরা পূর্ণ কর।” বিদায়ী তওয়াফ যদি হজ্জের পূর্ণতার অংশ হয়, তবে উহা ওমরারও পূর্ণতার অংশ হবে।

ওমরাকারী মসজিদে হারামের তাহিয়্যাত হিসেবে তওয়াফের মাধ্যমে ভিতরে প্রবেশ করেছে। সুতরাং কোন তাহিয়্যাত ছাড়া চলে যাওয়াও উচিৎ হবে না। তাই সে বিদায়ী তওয়াফ করবে।

অতএব এই ভিত্তিতে হজ্জের ন্যায় ওমরাতেও বিদায়ী তওয়াফ করা ওয়াজিব। তিরমিযীতে একটি হাদীছ পাওয়া যায়ঃ বলা হয়েছে, “কোন লোক যদি হজ্জ বা ওমরা করে, সে আল্লাহর ঘরের বিদায়ী তওয়াফ না করে যেন বের না হয়।” কিন্তু এই হাদীছটি যঈফ। কেননা এর সনদে হাজ্জাজ বিন আরত্বাত নামক একজন বর্ণনাকারী রয়েছে। সে দুর্বল। এ হাদীছটি দুর্বল না হলে এই মাসআলার সুস্পষ্ট দলীল হিসেবে বিবেচিত হত এবং সকল মতভেদ বিদূরীত হত। কিন্তু দুর্বল হওয়ার কারণে তা দ্বারা দলীল গ্রহণ করার কোন ভিত্তি নেই। তবে আমরা পূর্বে যে সমস্ত মূলনীতি, দলীল ও যুক্তি উপস্থাপন করেছি তার ভিত্তিতে প্রমাণিত হয় যে, ওমরায় বিদায়ী তওয়াফ ওয়াজিব।

তাছাড়া এই তওয়াফ সতর্কতা ও যিম্মা মুক্তি স্বরূপও হয়ে যায়। কেননা ওমরাতে আপনি বিদায়ী তওয়াফ করলে তো কেউ আপনাকে বলবে না যে আপনি ভুল করছেন। কিন্তু তা না করলে তো যারা তা ওয়াজিব মনে করে তারা বলবে, আপনি ভুল করলেন। এই কারণে তওয়াফ করাটাই সঠিক হবে। আর তওয়াফ না করলে আশংকা রয়ে যাবে এবং বিদ্বানদের কারো মতে তা ভুল হবে। (আল্লাহই অধিক জ্ঞানী)

(৫৩৫) ওমরাকারীর জন্য বিদায়ী তওয়াফ করার বিধান কি?


ওমরাকারী মক্কা আগমণ করার সময় যদি নিয়ত করে যে, তওয়াফ, সাঈ ও মাথা মুন্ডন তথা ওমরার কার্যাদী সম্পন্ন করার সাথে সাথে ফেরত চলে যাবে, তবে তাকে বিদায়ী তওয়াফ করতে হবেনা। কেননা তওয়াফে কুদূমই তার জন্য ওমরার তওয়াফ ও বিদায়ী তওয়াফ হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু ওমরা সম্পন্ন করার পর যদি মক্কায় অবস্থান করে তবে প্রাধান্যযোগ্য মত হচ্ছে, বিদায়ী তওয়াফ করা ওয়াজিব। একথার দীলল নিম্নরূপঃ

প্রথমতঃ নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর ব্যাপক নির্দেশঃ

]لا يَنْفِرَنَّ أَحَدٌ حَتَّى يَكُونَ آخِرُ عَهْدِهِ بِالْبَيْتِ[

 “সর্বশেষ কাজ বায়তুল্লাহ্‌র তওয়াফ না করে কেউ যেন বের না হয়।” এখানে أَحَدٌ বা ‘কেউ’ শব্দটি অস্পষ্ট। যে কেউ বরে হলেই তার জন্য উক্ত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। অর্থাৎ- তওয়াফ না করে বের হবে না। সে হজ্জকারী হোক বা ওমরাকারী।

দ্বিতীয়তঃ ওমরা হজ্জের মতই। কেননা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওমরাকে হজ্জ রূপে আখ্যা দিয়েছেন। আমর বিন হাযম কর্তৃক প্রসিদ্ধ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “ওমরা হচ্ছে ছোট হজ্জ।” হাদীছটি মুরসাল। কিন্তু উলামাগণ সাধারণভাবে হাদীছটি গ্রহণ করেছেন।

তৃতীয়তঃ নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ক্বিয়ামত পর্যন্ত ওমরা হজ্জের মধ্যে শামিল হয়ে গেছে। অর্থাৎ- হজ্জ করলে ওমরাও আদায় হয়ে গেল।

চতুর্থতঃ নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইয়ালা বিন উমাইয়াকে বলেন,

] وَاصْنَعْ فِي عُمْرَتِكَ كَمَا تَصْنَعُ فِي حَجَّتِكَ[

“হজ্জের মধ্যে যেভাবে কাজ করে থাক ওমারাতেও সেভাবে করো।” যদি তুমি হজ্জে বিদায়ী তওয়াফ করে থাক, তবে ওমরাতেও তা কর। তবে বিদ্বানদের ঐকমত্যে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো উক্ত নির্দেশের বাইরে থাকবেঃ আরাফা, মুযদালিফা ও মিনাতে অবস্থান ও কঙ্কর নিক্ষেপ। এগুলো ওমরাতে শরীয়ত সম্মত নয়। তাছাড়া সতর্কতার জন্য এবং যিম্মা মুক্ত হওয়ার জন্য বিদায়ী তওয়াফ করে নেয়াই উচিৎ।

(৫৩৬) জনৈক ব্যক্তি মীক্বাত থেকে হজ্জের ইহরাম বেঁধেছে। কিন্তু মক্কা পৌঁছে সে প্রশাসন (ডিউটি পুলিশ) কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হয়। কেননা সে হজ্জের অনুমতি পত্র নেয়নি। এখন তার করণীয় কি?


এ অবস্থায় মক্কা প্রবেশ করতে না পারলে সে ‘মুহছার’ বা বাধাগ্রস্ত বলে বিবেচিত হবে। তখন বাধাপ্রাপ্ত স্থানে কুরবানী যবেহ করে সে ইহরাম খুলে ফেলবে। যদি ইহা তার প্রথম ফরয হজ্জ হয়ে থাকে তবে পরবর্তী বছর তা আদায় করবে। আর ফরয না হয়ে থাকলে বিশুদ্ধ মতানুযায়ী পরবর্তী বছর তা আদায় করার কোন বাধ্যবাধকতা নেই। কেননা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হুদায়বিয়ার বছরে বাধাপ্রাপ্ত হলে পরবর্তী বছর তা কাযা আদায় করার নির্দেশ প্রদান করেননি। অতএব আল্লাহর কিতাবে ও রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর সুন্নাতে বাধাপ্রাপ্ত হজ্জ বা ওমরা কাযা আদায় করার বাধ্যবাধকতা নেই। আল্লাহ্‌ বলেন,

] فَإِنْ أُحْصِرْتُمْ فَمَا اسْتَيْسَرَ مِنْ الْهَدْيِ  [

“যদি বাধাগ্রস্ত হও, তবে সহজসাধ্য কুরবানী করবে।” (সূরা বাক্বারাঃ ১৯৬) এখানে কুরবানী করা ছাড়া অন্য কিছু উল্লেখ করা হয়নি। আর পরবর্তী বছর নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর উমরা আদায়কে কাযা উমরা এজন্যই বলা হয়েছে যে, তিনি কুরায়শদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন যে পরবর্তী বছর ওমরা আদায় করবেন। এই কারণে নয় যে, ছুটে যাওয়া কাজের পূর্ণতার জন্য কাযা আদায় করেছিলেন। (আল্লাহ্‌ই অধিক জ্ঞান রাখেন)

(৫৩৭) হজ্জের ইচ্ছা করার পর যদি তাকে নিষেধ করে দেয়া হয়, তবে তার করণীয় কি?


যদি সে ইহরাম না করে থাকে তবে কোন অসুবিধা নেই। কোন কিছু তার উপর আবশ্যক হবে না। কেননা কোন লোক ইহরামে প্রবেশ করার পূর্ব পর্যন্ত ইচ্ছা করলে সম্মুখে অগ্রসর হতে পারে, ইচ্ছা করলে নিজ ঠিকানায় ফেরত আসতে পারে। কিন্তু হজ্জ ফরয হলে, যতদ্রুত সম্ভব আদায় করে নেয়া ভাল।

আর ইহরামে প্রবেশ করার পর বাধাগ্রস্ত হলে যদি ইহরাম বাধার সময় শর্ত করে থাকে এই বলে, “আল্লাহুম্মা ইন্‌ হাবাসানী হাবেস্‌, ফা মাহেল্লী হায়ছু হাবাস্‌তানী”, তবে বাধাপ্রাপ্ত স্থানে ইহরাম খুলে ফেলবে। কোন কিছু তার উপর আবশ্যক হবে না। কিন্তু যদি শর্ত করার জন্য এরূপ দু’আ পাঠ না করে থাকে, তবে উক্ত বাধা অচিরেই বিদূরিত হওয়ার আশা থাকলে অপেক্ষা করবে এবং হজ্জ পূর্ণ করবে। আরাফাতে অবস্থানের পূর্বে যদি বাধা মুক্ত হয়, তবে আরাফাতে অবস্থান করে হজ্জ পূর্ণ করবে। কিন্তু আরাফাতে অবস্থানের পর বাধা মুক্ত হলে, হজ্জ ছুটে গেল। তখন ওমরা আদায় করে ইহরাম খুলে ফেলবে। ফরয হজ্জ হয়ে থাকলে পরবর্তী বছর তা কাযা আদায় করবে। কিন্তু অচিরেই বাধা মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলে এবং শর্ত না করে থাকলে ইহরাম খুলে ফেলবে এবং কুরবানী করে দিবে। কেননা আল্লাহ্‌ বলেন,

] وَأَتِمُّوا الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ لِلَّهِ فَإِنْ أُحْصِرْتُمْ فَمَا اسْتَيْسَرَ مِنْ الْهَدْيِ [

“তোমরা আল্লাহর জন্য হজ্জ-ওমরা পূর্ণ করবে। যদি বাধাগ্রস্ত হও, তবে সহজসাধ্য কুরবানী করবে।” (সূরা বাক্বারাঃ ১৯৬)

(৫৩৮) হজ্জ করতে এসে পাপের কাজে লিপ্ত হলে কি হজ্জের ছওয়াব কমে যাবে?


সাধারণভাবে সবধরণের পাপকাজ হজ্জের ছওয়াব হরাস করে দেয়। কেননা আল্লাহ্‌ বলেন,

]فَمَنْ فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِي الْحَجِّ[

“যে ব্যক্তি ঐ মাসগুলোর মধ্যে হজ্জের সংকল্প করবে, সে স্ত্রী সহবাস, গর্হিত কাজ ও ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হতে পারবে না।” (সূরা বাক্বারাঃ ১৯৭)

বরং বিদ্বানদের মধ্যে কেউ বলেছেন, হজ্জ অবস্থায় পাপ কাজ করলে হজ্জ বাতিল হয়ে যাবে। কিন্তু অধিকাংশ বিদ্বানদের নিকট প্রসিদ্ধ মূলনীতি হচ্ছে: “হারাম কাজটি যদি ইবাদতের সাথে সংশ্লিষ্ট না হয়, তবে তার কারণে ইবাদত বাতিল হবে না।” সাধারণ পাপ সমূহ হজ্জের কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। কেননা তা হজ্জের সময় যেমন হারাম অন্য সময়ও হারাম। এটাই বিশুদ্ধ মত। এ সমস্ত পাপকাজ হজ্জকে বাতিল করে দিবে না। কিন্তু তার ছওয়াব বিনষ্ট করে দিবে।

(৫৩৯) মিথ্যা পাসপোর্ট বানিয়ে হজ্জ করলে হজ্জ হবে কি?


তার হজ্জ হয়ে যাবে। হজ্জ বিশুদ্ধ হবে। কেননা পাসপোর্ট নকল করা হজ্জের কর্ম সমূহের অন্তর্ভুক্ত নয়। এটা হজ্জের বাইরের কাজ। কিন্তু একাজের কারণে সে গুনাহগার হবে। তাকে তওবা করা উচিৎ। কেননা স্বার্থ সিদ্ধির জন্য মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বা প্রশাসনকে ধোঁকা দেয়া একটি মারাত্মক অপরাধ ও বড় গুনাহর কাজ।

জেনে রাখা উচিৎ, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করবে আল্লাহ তার ব্যবস্থা করে দিবেন, তাকে ধারণাতীত রিযিক দান করবেন, তার সকল কাজ সহজ করে দিবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করবে, সত্য কথা বলবে এবং সৎ পথ অবলম্বন করবে, আল্লাহ্‌ তার কর্ম সংশোধন করে দিবেন এবং তার গুনাহ্‌ ক্ষমা করে দিবেন।

পেজ ন্যাভিগেশন

সর্বমোটঃ  90 টি বিষয় দেখান হচ্ছে।
1...456789পরের পাতাশেষের পাতা