• ৫৬৪০৩ টি সর্বমোট হাদিস আছেঃ
  • ৫৭৫৬ টি প্রশ্নোত্তর ও ফিকাহঃ

 

 

 

 


(৬২) সৃষ্টির পূর্বে মানুষের ভাগ্যে যা লেখা হয়েছে, তা কি দু’আর মাধ্যমে পরিবর্তন করা সম্ভব?


সন্দেহ নাই যে, ভাগ্যের লিখন পরিবর্তনে দু’আর প্রভাব রয়েছে। তবে জেনে রাখা দরকার, পরিবর্তনটাও পূর্বে লেখা আছে যে, দু’আর মাধ্যমে অমুকের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। এই ধারণা যেন না হয় যে, আপনি ভাগ্যের কোন অলিখিত বস্ত পরিবর্তনের জন্যে দু’আ করছেন। সুতরাং দু’আ করবেন এটাও লেখা আছে। আর দু’আর মাধ্যমে যা অর্জিত হবে, তাও লিখিত আছে। এই জন্যই আমরা দেখতে পাই যে, রোগীকে ঝাড়-ফুঁক করা হলে রোগী সুস্থ হয়ে উঠে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদল সৈনিক কোন একদিকে প্রেরণ করলেন। তাঁরা কোন এক গোত্রের নিকটে মেহমান হিসাবে উপস্থিত হলে গোত্রের লোকেরা মেহমানদারী করতে অস্বীকার করল। রাতের বেলা সেই গোত্রের নেতাকে বিষাক্ত সাঁপে দংশন করল। তাকে ঝাড়ার জন্য কবিরাজ অনুসন্ধান করা হল। কিন্তু কোন কবিরাজ পাওয়া গেলনা। অবশেষে লোকেরা ছাহাবীদের নিকট এসে কবিরাজ অন্বেষণ করল। একজন সাহাবী বললেন, আমি ঝাড়-ফুঁক করতে রাজি আছি, তবে আমাকে বিনিময় দিতে হবে। তারা একশটি ছাগল দিতে রাজি হলে উক্ত সাহাবী রোগীকে সূরা ফাতিহা পড়ে ঝাড়-ফুঁক করলেন। ফলে রোগী এমনভাবে সুস্থ হয়ে উঠল মনে হয় যেন রশির বাঁধন হতে মুক্ত করা হল।

   উক্ত হাদীছ থেকে দেখা যাচ্ছে যে, রোগ মুক্তর জন্য ঝাড়-ফুঁক যথেষ্ট কার্যকর। দু’আর প্রভাব রয়েছে। তবে তাতে ভাগ্যের পরিবর্তন হয়না; বরং ভাগ্যে এটাও লেখা রয়েছে যে দু’আ করবে তার ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। সব কিছুই সংঘটিত হয় ভাগ্যের লিখন অনুযায়ী।

(৬৩) রিজিক এবং বিবাহ কি লাওহে মাহফুজে লিখিত আছে?


আল্লাহ তাআ’লা যেদিন কলম সৃষ্টি করেছেন, সেদিন থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যত মাখলুকাত সৃষ্টি হবে, সবই লাওহে মাহফূজে লিপিবদ্ধ আছে। আল্লাহ তাআ’লা কলম সৃষ্টি করে বললেন, লিখ। কলম বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমি কি লিখব? আল্লাহ তাআ’লা বললেন, কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু হবে সব লিখে ফেল। সে সময় কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু পৃথিবীর বুকে সংঘটিত হবে, কলম সব কিছুই লিখে ফেলল। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, ভ্রুন  মাতৃগর্ভে চার মাস অতিবাহিত হওয়ার পর আল্লাহ তাআ’লা একজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন। ফেরেশতা তার মধ্যে রূহ ফুঁকে দেন এবং লিখে দেন তার রিজিক, বয়স এবং তার কাজ অর্থাৎ সৌভাগ্যবান হবে না দুর্ভাগা হবে। রিজিক লিখা আছে এবং কিভাবে অর্জন করবে, তাও লিখা আছে। রিজিক অন্বেষণের সাথ সাথে রিজিক অন্বেষণের উপকরণও লিপিবদ্ধ আছে। আল্লাহ বলেনঃ

)هُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمْ الْأَرْضَ ذَلُولًا فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُوا مِنْ رِزْقِهِ وَإِلَيْهِ النُّشُورُ(

“তিনি তোমাদের জন্যে পৃথিবীকে সুগম করেছেন, অতএব তোমরা তাতে বিচরণ কর এবং তার দেয়া রিজিক আহার কর। তাঁরই কাছে পুনরুজ্জীবন হবে।” (সূরা মুলকঃ ১৫) রিজিক পাওয়ার এবং তা বৃদ্ধি হওয়ার অন্যতম মাধ্যম হল, পিতা-মাতার সাথে সৎ ব্যবহার করা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

)مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ أَوْ يُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ(

“যে ব্যক্তি চায় যে, তার রিজিক বাড়িয়ে দেয়া হোক এবং বয়স বাড়িয়ে দেয়া হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।” রিজিক বৃদ্ধির আরো মাধ্যম হল তাকওয়া বা আল্লাহর ভয়। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ

)وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ(

“আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্যে নিস্কৃতির পথ বের করে দিবেন এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিজিক দান করবেন।” (সূরা তালাকঃ ২-৩) এমন বলা যাবে না যে, রিজিক যেহেতু নির্ধারিত আছে, সুতরাং আমি এর উপকরণ অনুসন্ধান করব না। এটা বোকামীর পরিচয়। বুদ্ধিমানের পরিচয় হল রিজিক এর জন্য এবং দ্বীন্তদুনিয়ার কল্যাণ অর্জনের জন্য প্রচেষ্টা চালানো। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

)الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ(

“বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের হিসাব নিল এবং পরকালের জন্য আমল করল। অক্ষম ও নির্বোধ সেই ব্যক্তি, যে নিজের কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করল এবং আল্লাহর উপর ভরসা করে বসে থাকল।” রিজিক যেভাবে লিপিবদ্ধ আছে, বিবাহ করাও নির্ধারিত রয়েছে। এই পৃথিবীতে কে কার স্বামী বা স্ত্রী হবে, তাও নির্দিষ্ট রয়েছে। আসমানজমিনের কোন কিছুই আল্লাহর কাছে গোপন নয়।

(৬৪) মুসিবত নাযিল হলে যে ব্যক্তি অসন্তুষ্ট হয়, তার হুকুম কি?


বালা-মুসিবত নাযিল হওয়ার সময় মানুষ চার স্তরে বিভক্ত হয়ে যায়। যথাঃ-

প্রথম স্তরঃ অসন'ষ প্রকাশ করা। এটি আবার কয়েক প্রকার।

১ম প্রকারঃ আল্লাহ যে বিষয় নির্ধারণ করেছেন, তার কারণে অন্তর দিয়ে আল্লাহর উপর অসন্তুষ্ট হয়ে যাওয়া। এটা হারাম। কারণ এধরণের অসন'ষ্টি কখনো কুফরীর দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ

)وَمِنْ النَّاسِ مَنْ يَعْبُدُ اللَّهَ عَلَى حَرْفٍ فَإِنْ أَصَابَهُ خَيْرٌ اطْمَأَنَّ بِهِ وَإِنْ أَصَابَتْهُ فِتْنَةٌ انقَلَبَ عَلَى وَجْهِهِ خَسِرَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةَ(

“মানুষের মধ্যে কেউ কেউ দ্বিধা-সংকোচ নিয়ে আল্লাহর এবাদত করে। যদি সে কল্যাণ প্রাপ্ত হয়, তবে এবাদতের উপর কায়েম থাকে এবং যদি কোন পরীক্ষায় পড়ে, তবে পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। সে ইহকালে ও পরকালে ক্ষতিগ্রস্ত।” (সূরা হজ্জঃ ১১)

২য় প্রকারঃ কখনো অসন'ষ্টি কথার মাধ্যমে হয়ে থাকে। যেমন হতাশা প্রকাশ করা এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়ার দু’আ করা। এটাও হারাম।

তৃতীয় প্রকারঃ কখনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে হয়ে থাকে। যেমন গাল চাপড়ানো, জামা-কাপড় ছেড়া, মাথার চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলা ইত্যাদি সবই হারাম এবং ধৈর্য্য ধারণের পরিপন্থী।

দ্বিতীয় স্তরঃ বিপদের সময় ধৈর্য্য ধারণ করা। যেমন কোন আরবী কবি বলেছেন ‘বিপদের সময় ধৈর্য ধারণ করা খুবই কঠিন। কিন্তু এর শেষ পরিণাম খুবই সুমধুর।’ কেননা এই সবর করাটা তার নিকট খুবই কঠিন তবুও সে সবর করে। বিপদগ্রস্ত হওয়াটা যেমন অপছন্দ করে তেমনি তাতে অসন'ষ্টি প্রকাশ করাটাও তার নিকট অপছন্দনীয়। কিন্তু তার ঈমান তাকে অসন'ষ্টি প্রকাশ থেকে বিরত রাখে। মোটকথা সে বিপদে আপতিত হওয়া এবং না হওয়াকে এক মনে করে না। এক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করা ওয়াজিব। কারণ আল্লাহ তায়ালা বিপদাপদে ধৈর্য ধারণ করার আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেনঃ

)وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ(

“তোমরা ধৈর্য্যধারণ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।” (সূরা আনফালঃ ৪৬)

তৃতীয় স্তরঃ বিপদ আসার পর সন্তুষ্ট থাকা এবং মুসিবত আসা ও না আসা উভয়কেই সমান মনে করা। তাই বিপদ আসলেও তার কাছে বিপদ সহ্য করা বেশী কঠিন মনে হয় না। গ্রহণযোগ্যমতে এধরণের ছবর মুস্তাহাব। ওয়াজিব নয়। এটা এবং পূর্ববর্তী স্তরের মাঝে পার্থক্য অতি সুস্পষ্ট। বিপদ হওয়া এবং না হওয়া সমান মনে হওয়া সন্তুষ্ট থাকার ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। এ প্রকারের এবং পূর্বের প্রকারের মাঝে পার্থক্য এই যে, পূর্বের প্রকারে বিপদে আপতিত ব্যক্তি বিপদকে কঠিন মনে এবং ধৈর্য্য ধারণ করে।

চতুর্থ স্তরঃ শুকরিয়া আদায় করা। এটা সর্বোচ্চ স্তর। তা এই যে, বিপদের সময় আল্লাহর প্রশংসা করা। কারণ সে ভাল করেই জানে যে, এ সমস্ত বিপদাপদ গুনাহ মোচন এবং ছাওয়াব বৃদ্ধির কারণ হতে পারে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

مَا مِنْ مُصِيبَةٍ تُصِيبُ الْمُسْلِمَ إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا عَنْهُ حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا

অর্থঃ কোন মুসলিম বিপদাপদে পতিত হলে বিনিময়ে আল্লাহ তাআ’লা তার গুনাহ মোচন করেন। এমন কি শরীরে একটি কাঁটা বিধলেও তার বিনিময়ে গুনাহ মাফ করা হয়।

(৬৫) সম্মানিত শায়খ! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী, ( لا عدوى ولاطيرة ولا هامة ولا صفر ) “একজনের রোগ অন্যজনের শরীরে সংক্রমিত হয়না। পাখী উড়িয়ে বা পাখীর ডাক শুনে কল্যাণ-অকল্যাণ নির্ধারণের নিয়ম ইসলামে নেই। সফর মাসকেও অশুভ মনে করাও ঠিক নয়। এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা জানতে চাই। হাদীছে বর্ণিত জিনিষগুলোর প্রভাবকে অস্বীকার করা হয়েছে। এগুলো কোন ধরণের অস্বীকার? নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর বাণী, “কুষ্ঠ রোগী থেকে পলায়ন কর যেভাবে তুমি বাঘ থেকে ভয়ে পলায়ন কর”। এই হাদীছ ও প্রথমোক্ত হাদীছের মধ্যে কিভাবে সমন্বয় করব?


একজনের রোগ অন্যজনের শরীরে সংক্রমিত হওয়াকে আদ্‌ওয়া বলা হয়। শারীরিক রোগে যেমন এটা হয়, তেমনি চারিত্রিক রোগের ক্ষেত্রেও এমন হয়ে থাকে। এ জন্যই নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, অসৎ বন্ধু কামারের ন্যায়। সে হয়ত তোমার জামা পুড়িয়ে ফেলবে। তা না হলে কমপক্ষে তুমি তার কাছ থেকে দুর্গন্ধ পাবে।

   কোন জিনিষ দেখে, কোন কথা শুনে বা জানার মাধ্যমে কুলক্ষণ মনে করাকে ‘ত্বিয়ারা’ বলা হয়।

  ‘হামাহ’ এর ব্যাখ্যা দু’ধরণ হতে পারে। ক) এমন রোগ, যা একজনকে আক্রমণ করে অন্যজনের নিকট সংক্রমিত হয়। খ) ‘হামাহ’ বলা হয়, আরবদের ধারণামতে এমন এক শ্রেণীর পাখিকে, যে গভীর রাতে নিহত ব্যক্তির বাড়িতে উপস্থিত হয়ে তার পরিবারের লোকদেরকে ডাকাডাকি করে এবং প্রতিশোধ নেয়ার উৎসাহ দেয়। কেউ কেউ ধারণা করে যে, এটি নিহত ব্যক্তির রূহ পাখির আকৃতি ধরে উপস্থিত হয়েছে। এই পাখিটিকে আমাদের পরিভাষায় হুতুম পেঁচা বলা হয়। তৎকালিন আরবরা এ পাখির ডাককে কুলক্ষণ মনে করত। কারো ঘরের পাশে এসে এ পাখি ডাকলে তারা বিশ্বাস করত যে, সে মৃত্যু বরণ করবে।

   ‘ছফর’ এর বিভিন্ন ব্যাখ্যা করা হয়েছে। (১) আরবী ছফর মাস। আরবরা এ মাসকে অকল্যাণের মাস মনে করত। (২) এটি উটের এক ধরণের রোগের নাম, যা এক উটের শরীর থেকে অন্য উটের শরীরে সংক্রমিত হয়। (৩) ছফর মাসকে আরবরা কখনো হারাম মাসের সাথে গণনা করত। আবার কখনো হালাল মাস হিসাবে গণ্য করত। এটি আরবদের গোমরাহী মূলক একটি আচরণ। 

   তবে উল্লেখিত ব্যাখ্যাগুলির মধ্যে গ্রহণযোগ্য কথা হল, জাহেলী সমাজের লোকেরা ছফর মাসকে অমঙ্গলের মাস মনে করত। মূলতঃ কল্যাণ-অকল্যাণ নির্ধারণে সময় বা মাসের কোন প্রভাব নেই। ছফর মাস অন্যান্য মাসের মতই। তাতে কল্যাণ-অকল্যাণ আল্লাহর নির্ধারণ অনুযায়ীই হয়ে থাকে।

   উপরে বর্ণিত ভ্রান্ত বিশ্বাস খন্ডন করতে গিয়ে কোন কোন মানুষ যখন ছফর মাসে কোন কাজ সমাধা করে, তখন সেই তারিখ লিখে রাখে এবং বলে কল্যাণের মাস ছফর মাসের অমুক তারিখে কাজটি সমাধা হল। এটি এক বিদ্‌আত দ্বারা অন্য বিদ্‌আতের এবং এক অজ্ঞতা দ্বারা অন্য অজ্ঞতার চিকিৎসা করার শামিল। এটি কল্যাণের মাসও নয় এবং অকল্যাণের মাসও নয়। এই জন্যই কোন কোন বিদ্বান পেঁচার ডাক শুনে (خيرا ان شاء الله) “আল্লাহ চাহেতো ভাল হবে” এ কথা বলার প্রতিবাদ করেছেন। ভাল বা খারাপ কোন কিছুই বলা যাবে না। সে অন্যান্য পাখির মতই ডাকে।

   উপরের চারটি বিষয়ের প্রভাবকে হাদীছে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করা হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় আল্লাহর উপর ভরসা করা সকল মু’মিনের উপর আবশ্যক। এতে ঈমান মজবুত হবে। এ সমস্ত কুসংস্কারের সামনে মুমিন ব্যক্তি কখনো দুর্বল হবে না।

   কোন মুসলিম ব্যক্তি যখন এ সমস্ত বিষয়ের প্রভাবকে বিশ্বাস করবে, তখন নিম্নলিখিত দু’অবস্থার এক অবস্থা হতে পারেঃ

 (১) সে হয়ত বিশ্বাস করে সামনের দিকে অগ্রসর হবে অথবা থেমে যাবে। এ অবস্থায় তার কর্মসমূহ এমন বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত করল, যার কোন প্রভাব নেই।

(২) কোন কিছু পরওয়া না করে কাজের প্রতি অগ্রসর হবে, কিন্তু মনের ভিতরে দুর্বলতা ও দুশ্চিন্তা থেকেই যাবে। কিন্তু এটি প্রথমটির চেয়ে হালকা। কারণ সে এ সমস্ত বিষয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করে থাকে।

   কিছু কিছু মানুষ শুভ-অশুভ নির্ধারণ করার জন্য কুরআন মাজীদ খুলে থাকে। খুলে জাহান্নামের আলোচনা দেখতে পেলে লক্ষণ ভাল নয় বলে মনে করে। আর জান্নাতের আলোচনা দেখতে পেলে খুশী হয়। এটি জাহেলী যামানার লোকদের কাজের মতই। যারা জুয়ার তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ধারণ করত।

   নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উক্ত জিনিষগুলোর অস্তিত্বকে অস্বীকার করেন নি। কারণ এগুলোর অস্তিত্ব রয়েছে। তবে এগুলোর প্রভাবকে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মেনে নেন নি। আল্লাহই সকল বস্তর উপর প্রভাব বিস্তারকারী। সুতরাং যদি জানা যায় যে, কোন বস্ত সংঘটিত হওয়াতে সঠিক কারণ রয়েছে, তাহলে তাকে কারণ হিসাবে বিশ্বাস করা বৈধ। কিন্তু নিছক ধারণা করে কোন ঘটনায় অন্য বস্তর প্রভাব রয়েছে বলে বিশ্বাস করা ঠিক নয়। কোন বস্ত নিজে নিজেই অন্য ঘটনার কারণ হতে পারে না। সংক্রামক রোগের অস্তিত্ব রয়েছে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “অসুস্থ উটের মালিক যেন সুস্থ উটের মালিকের উটের কাছে অসুস্থ উটগুলো নিয়ে না যায়।” সুস্থ উটগুলো অসুস্থ হয়ে যাওয়ার ভয়ে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ রকম বলেছেন। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরো বলেনঃ

فِرَّ مِنَ الْمَجْذُومِ كَمَا تَفِرُّ مِنَ الْأَسَدِ

সিংহের ভয়ে তুমি যেমন পলায়ন কর, জুযাম (কুষ্ঠ) রোগী দেখেও তুমি সেভাবে পলায়ন কর। আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুষ্ঠ রোগী থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। এখানে রোগের চলমান শক্তির কথা স্বীকার করা হয়েছে। তবে রোগ নিজস্ব ক্ষমতা বলে অন্যজনের কাছে চলে যায় তা অনিবার্য নয়। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সতর্কতা অবলম্বনের আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেনঃ

)وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ(

“তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিওনা। (সূরা বাক্বারাঃ ১৯৫) এটা বলা যাবে না যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রোগের সংক্রমন হওয়াকে অস্বীকার করেছেন। কেননা বাস্তব অবস্থা ও অন্যান্য হাদীছের মাধ্যমে এ রকম ধারণাকে খন্ডন করা হয়েছে।

   যদি বলা হয় যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন বললেন, রোগ সংক্রামিত হয়না, তখন একজন লোক বলল, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! মরুভূমিতে সম্পূর্ণ সুস্থ উট বিচরণ করে। উটগুলোর কাছে যখন একটি খুজ্‌লিযুক্ত উট আসে, তখন সব উটই খুজ্‌লিযুক্ত হয়ে যায়। তিনি বললেন, প্রথম উটটিকে কে খুজ্‌লিযুক্ত করল?

   উত্তর হল, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উক্তি “প্রথমটিকে কে খুজ্‌লিযুক্ত করল?” এর মাধ্যমেই জবাব দিয়েছেন। আল্লাহর ইচ্ছাতেই রোগের জীবানু অসুস্থ ব্যক্তির নিকট থেকে সুস্থ ব্যক্তির নিকট গমণ করে থাকে। তাই আমরা বলব যে, প্রথম উটের উপরে সংক্রামক ব্যতীত আল্লাহর ইচ্ছাতেই রোগ নাযিল হয়েছে। কোন ঘটনার পিছনে কখনো প্রকাশ্য কারণ থাকে। আবার কখনো প্রকাশ্য কোন করণ থাকে না। প্রথম উট খুজ্‌লিযুক্ত হওয়ার পিছনে আল্লাহর নির্ধারণ ব্যতীত অন্য কোন কারণ পাওয়া যাচ্ছে না। দ্বিতীয় উট খুজ্‌লিযুক্ত হওয়ার কারণ যদিও জানা যাচ্ছে, তথাপি আল্লাহ চাইলে খুজ্‌লিযুক্ত হত না। তাই কখনো খুজলিতে আক্রান্ত হয় এবং পরবর্তীতে ভালও হয়ে যায়। আবার কখনো মারাও যায়। এমনিভাবে প্লেগ, কলেরা এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রেও একই কথা। একই ঘরের কয়েকজন আক্রান্ত হয়। কেউ মারা যায় আবার কেউ রেহাই পেয়ে যায়। মানুষের উচিৎ আল্লাহর উপর ভরসা করা। বর্ণিত আছে যে, ‘একজন কুষ্ঠ রোগী লোক নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর কাছে আসল। তিনি তার হাত ধরে বললেন, আমার সাথে খাও।’ আল্লাহর উপর তাঁর অগাধ বিশ্বাস ও ভরসা থকার কারণেই তিনি তাকে খানায় শরীক করেছিলেন।

   উপরের বিরোধপূর্ণ হাদীছগুলোর মাঝে সামঞ্জস্য বিধানে যা বলা হল, তাই সর্বোৎকৃষ্ট। কেউ কেউ প্রশ্নের শেষোক্ত হাদীছকে মানসুখ বা রহিত বলেছেন। রহিত হওয়ার দাবী ঠিক নয়। কেননা রহিত হওয়ার অন্যতম শর্ত হল বিরোধপূর্ণ হাদীছের মধ্যে সমঝোতা করা সম্ভব না হওয়া। উভয় হাদীছের মধ্যে মিল দেয়া সম্ভব হলে উভয় হাদীছের উপর আমল করতে হবে। আর রহিত হওয়ার দাবী করলে এক পক্ষের হাদীছের উপর আমল বাতিল হয়ে যায়। এক পক্ষের হাদীছগুলো বাতিল করার চেয়ে উভয় পক্ষের হাদীছগুলোর উপর আমল করাই উত্তম।

(৬৬) মানুষের উপর কি বদ নজর লাগে? লাগলে তার চিকিৎসা কি? এ থেকে বেঁচে থাকা কি আল্লাহর উপর ভরসার পরিপন্থী?


বদ নজরের প্রভাব সত্য। আল্লাহ বলেনঃ

)وَإِنْ يَكَادُ الَّذِينَ كَفَرُوا لَيُزْلِقُونَكَ بِأَبْصَارِهِمْ(

“কাফেরেরা তাদের দৃষ্টির মাধ্যমে আপনাকে আছাড় দিয়ে ফেলে দিতে চায়।” (সূরা আল-কলমঃ ৫১) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ

الْعَيْنُ حَقٌّ وَلَوْ كَانَ شَيْءٌ سَابَقَ الْقَدَرَ سَبَقَتْهُ الْعَيْنُ وَإِذَا اسْتُغْسِلْتُمْ فَاغْسِلُوا

“বদ নজরের প্রভাব সত্য। কোন জিনিষ যদি তাকদীরকে অতিক্রম করতে পারত, তাহলে বদ নজর তাকে অতিক্রম করত। তোমাদেরকে গোসল করতে বলা হলে তোমরা গোসল করবে এবং গোসলে ব্যবহৃত পানি দিয়ে রোগীর চিকিৎসা করবে।” নাসাঈ এবং ইবনে মাজাহ্‌ শরীফে বর্ণিত আছে যে, একদা আমের ইবনে রাবীয়া সাহল ইবনে হুনাইফের কাছ দিয়ে অতিক্রম করলেন। সাহল ইবনে হুনাইফ (রাঃ) তখন গোসল করতে ছিলেন। আমের ইবনে রাবীয়া সাহলকে দেখে বলল, আমি আজকের মত লুকায়িত সুন্দর চামড়া আর কখনো দেখিনি। এ কথা বলার কিছুক্ষণ পর সাহ্‌ল অসুস্থ হয়ে পড়ে গেল। তাকে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কাছে নিয়ে এসে বলা হল, সাহ্‌ল বদ নজরে আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি বললেন, তোমরা কাকে সন্দেহ করছ? তারা বলল, আমের ইবনে রাবীয়াকে। তখন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, কেন তোমাদের কেউ তার ভাইকে হত্যা করতে চায়। কেউ যদি কারো মধ্যে ভাল কিছু দেখে, তাহলে সে যেন তার জন্য ভাই এর কল্যাণ কামনা করে এবং দু’আ করে। অতঃপর তিনি পানি আনতে বললেন এবং আমেরকে অযু করতে বললেন। অযুতে মুখমন্ডল, কনুই সহ উভয় হাত এবং হাটু পর্যন্ত এমনকি লুঙ্গীর নীচ পর্যন্ত ধৌত করে সাহলের শরীরে ঢালতে বললেন। কোন বর্ণনায় পাওয়া যায় পানির পাত্র যেন পেছন থেকে ঢালে। এটি বাস্তব ঘটনা, যা  অস্বীকার করার কোন উপায় নেই।

   বদ নজরে আক্রান্ত হলে তার চিকিৎসা হলঃ

(১) হাদীছে বর্ণিত দু’আগুলো পাঠ করে আক্রান্ত রোগীর উপর ঝাড়-ফুঁক করতে হবে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ

لَا رُقْيَةَ إِلَّا مِنْ عَيْنٍ أَوْ حُمَةٍ

“বদ নজর এবং বিচ্ছুর বিষ নামানোর ঝাঁড়-ফুঁক ব্যতীত কোন ঝাড়-ফুঁক নেই।”  জিবরীল (আঃ) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে এই দু’আর মাধ্যমে ঝাড়তেন,

بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ اللَّهُ يَشْفِيكَ بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ

“আমি আপনাকে আল্লাহর নামে ঝাড়-ফুঁক করছি প্রতিটি এমন জিনিষ হতে, যা আপনাকে কষ্ট দেয় এবং প্রত্যেক জীবের অমঙ্গল হতে ও হিংসুকের বদ নজর হতে আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য দান করুন। আমি আপনাকে আল্লাহর নামে ঝাড়-ফুঁক করছি।” 

(২) যার বদ নজর লাগছে বলে সন্দেহ করা হয়, তাকে গোসল করিয়ে গোসলের পানি রোগীর শরীরে ঢালতে হবে। যেমনভাবে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমের বিন রাবীয়াকে গোসল করতে বলেছিলেন। সন্দেহ যুক্ত ব্যক্তির পেশাব-পায়খানা বা অন্য কোন কিছু দিয়ে চিকিৎসা করার কোন দলীল নেই। অনুরূপভাবে  তার উচ্ছিষ্ট বা অযুর পানি ইত্যাদি ব্যবহার করাও ভিত্তিহীন। হাদীছে যা পাওয়া যায় তা হল তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং লুঙ্গির নিচের অংশ ধৌত করা এবং সম্ভবতঃ মাথার টুপি, পাগড়ী বা পরিধেয় কাপড়ের নিচের অংশ ধৌত করা এবং তা ব্যবহার  করাও বৈধতার অন্তর্ভুক্ত হবে।

   বদ নজর লাগার আগেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়াতে কোন দোষ নেই। এটা আল্লাহর উপর ভরসা করার পরিপন্থীও নয়। কারণ আল্লাহর উপর পরিপূর্ণভাবে ভরসার স্বরূপ হল বান্দা বৈধ উপকরণ অবলম্বন করে বদনজর ইত্যাদি থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করবে এবং সেই সাথে আল্লাহর উপর ভরসা করবে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাসান্তহুসাইন (রাঃ)কে এই বাক্যগুলো দিয়ে ঝাড়-ফুঁক করতেনঃ

أُعِيْذُكُماَ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ

“আমি আল্লাহর কাছে তাঁর পরিপূর্ণ বাক্যের মাধ্যমে প্রতিটি শয়তান এবং বিষধর বস্ত ও কষ্ট দায়ক নযর হতে তোমাদের জন্য আশ্রয় চাচ্ছি।” নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পুত্র ইসহাক এবং ইসমাঈল (আঃ)কে এই দু’আর মাধ্যমে ঝাড়-ফুক করতেন।

(৬৭) আকীদার মাসআলায় কি অজ্ঞতার অজুহাত গ্রহণযোগ্য?


আকীদার ক্ষেত্রে অজ্ঞতার অজুহাত গ্রহণ করা হবে কি না এ বিষয়টি অন্যান্য ফিক্‌হী মাসআলার ন্যায় মতবিরোধপূর্ণ। ব্যক্তি বিশেষের উপর বিধান প্রয়োগের ক্ষেত্রে কখনো কখনো এই মতভেদ শাব্দিক হতে পারে। অর্থ্যাৎ বিদ্বানগণ একমত যে, কোন একটি কথা বা কাজ করা বা ছেড়ে দেয়াটা কুফরী। কিন্তু যে ব্যক্তি এ কুফরীতে লিপ্ত হল, নির্দিষ্টভাবে তার উপর কি কুফরীর বিধান প্রযোজ্য হবে? কেননা সেখানে কুফরীর শর্তসমূহ বিদ্যামান এবং কাফের না হওয়ার প্রতিবন্ধতা নেই। না কি কাফের হওয়ার দাবী অবর্তমান থাকায় বা কাফের হওয়ার কোন প্রতিবন্ধক থাকায় উক্ত ব্যক্তিকে কাফের বলা প্রযোজ্য হবে না? এ ব্যাপারে আলেমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। যেসমস্ত কারণে মানুষ কাফের হয়ে যায় সেগুলো সম্পর্কে অজ্ঞতা দু’ধরণের হতে পারে।

(১) এমন ব্যক্তি হতে কুফরী প্রকাশ পাওয়া, যে ইসলাম ব্যতীত অন্য ধর্মের অনুসারী অথবা সে কোন দ্বীনই বিশ্বাস করে না এবং সে এটা কোন সময় কল্পনাও করতে পারেনি যে, সে যে বিষয়ের উপর রয়েছে, তা ইসলাম বহির্ভুত। এই ব্যক্তির উপর দুনিয়াতে কাফেরের বিধান প্রয়োগ করা হবে। আখেরাতের বিষয়টি সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে। এ ব্যাপারে গ্রহণযোগ্য মত হল, আল্লাহ পরকালে তাকে যেভাবে পরীক্ষা করবেন। তাদের আমল সম্পর্কে আল্লাহই ভাল জানেন। কিন্তু আমরা এ কথা ভাল করেই জানি যে, বিনা অপরাধে কেউ জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। আল্লাহ বলেন,

)وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدًا(

“আপনার প্রতিপালক কাউকে জুলুম করবেন না।” (সূরা কাহ্‌ফঃ ৪৯) দুনিয়াতে তার উপর কুফরীর বিধান প্রয়োগ হওয়ার কারণ এই যে, সে ইসলামকে দ্বীন হিসাবে গ্রহণ করেনি। তাই তার উপর ইসলামের বিধান প্রয়োগ হবেনা। পক্ষান্তরে আখেরাতে তাকে পরীক্ষা করার ব্যাপারে অনেক হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। ইবনুল কায়্যিম (রঃ) তাঁর রচিত “তরীকুল হিজরাতাইন” নামক বইয়ে মুশরিক শিশুদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে হাদীছগুলো উল্লেখ করেছেন।

(২) এমন লোক থেকে কুফরী প্রকাশ পাওয়া, যার ধর্ম ইসলাম, কিন্তু সে এই কুফরী আকীদা নিয়ে বসবাস করছে অথচ সে জানে না যে, এই আকীদা ইসলাম বিরোধী। কেউ তাকে সতর্কও করে নাই। এরূপ ব্যক্তির ক্ষেত্রে দুনিয়াতে ইসলামের বিধান প্রযোজ্য হবে অর্থাৎ তাকে মুসলমান হিসাবে গণ্য করা হবে। পরকালের বিষয়টি আল্লাহর হাতে। কুরআন, সুন্নাহ এবং আলেমদের বাণী হতে এ মর্মে অনেক দলীল রয়েছে। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ

)وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولًا(                                                                          

“রাসূল না পাঠিয়ে আমি কাউকে শাস্তি দেবনা।” (সূরা ইসরাঃ ১৫) আল্লাহ আরো বলেনঃ

)وَمَا كَانَ رَبُّكَ مُهْلِكَ الْقُرَى حَتَّى يَبْعَثَ فِي أُمِّهَا رَسُولًا يَتْلُوا عَلَيْهِمْ آيَاتِنَا وَمَا كُنَّا مُهْلِكِي الْقُرَى إِلَّا وَأَهْلُهَا ظَالِمُونَ(

“আপনার পালনকর্তা জনপদ সমূহকে ধ্বংস করেন না, যে পর্যন্ত তার কেন্দ্রস্তলে রাসূল প্রেরণ না করেন, যিনি তাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করেন এবং আমি জনপদ সমূহকে তখনই ধ্বংস করি, যখন তার বাসিন্দারা জুলুম করে।” (সূরা কাসাস ৫৯) আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

)رُسُلًا مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ لِأَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ(

“সুসংবাদদাতা ও ভীতি-প্রদর্শনকারী রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি, যাতে রাসূলগণের পরে আল্লাহর প্রতি ওজুহাত বা যুক্তি খাড়া করার মত কোন অবকাশ মানুষের জন্য না থাকে।” (সূরা নিসাঃ ১৬৫) আল্লাহ বলেন

)وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ فَيُضِلُّ اللَّهُ مَنْ يَشَاءُ وَيَهْدِي مَنْ يَشَاءُ(

“আমি সব রাসূলকেই তাদের জাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছি, যাতে তাদেরকে পরিস্কারভাবে বোঝাতে পারেন। অতঃপর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথ প্রদর্শন করেন।” (সূরা ইবরাহীমঃ ৪) আল্লাহ তাআ’লা সূরা তাওবায় এরশাদ করেনঃ

)وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُضِلَّ قَوْمًا بَعْدَ إِذْ هَدَاهُمْ حَتَّى يُبَيِّنَ لَهُمْ مَا يَتَّقُونَ(

“আর আল্লাহ কোন জাতিকে হেদায়েত করার পর পথভ্রষ্ট করেন না যতক্ষণ না তাদের জন্য পরিষ্কারভাবে বলে দেন সে সব বিষয়, যা থেকে তাদের বেঁচে থাকা দরকার।” (সূরা তাওবাঃ ১১৫) আল্লাহ আরো বলেনঃ

)وَهَذَا كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ مُبَارَكٌ فَاتَّبِعُوهُ وَاتَّقُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ أَنْ تَقُولُوا إِنَّمَا أُنزِلَ الْكِتَابُ عَلَى طَائِفَتَيْنِ مِنْ قَبْلِنَا وَإِنْ كُنَّا عَنْ دِرَاسَتِهِمْ لَغَافِلِينَ أَوْ تَقُولُوا لَوْ أَنَّا أُنزِلَ عَلَيْنَا الْكِتَابُ لَكُنَّا أَهْدَى مِنْهُمْ فَقَدْ جَاءَكُمْ بَيِّنَةٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ(

“এটি এমন একটি বরকতময় গ্রন', যা আমি অবতীর্ণ করেছি। অতএব তোমরা এর অনুসরণ কর এবং ভয় কর, যাতে তোমরা করুণাপ্রাপ্ত হও এবং যাতে তোমরা এ কথা বলতে না পার যে, গ্রন' তো কেবল আমাদের পূর্ববর্তী দু’টি সম্প্রদায়ের প্রতিই অবতীর্ণ হয়েছে। আমরা সেগুলোর পাঠ ও পঠন সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। কিংবা এ কথা বলতে না পার যে, যদি আমাদের প্রতি কোন গ্রন' অবতীর্ণ হত, আমরা তাদের চাইতে অধিক সঠিক পথপ্রাপ্ত হতাম। অবশ্যই তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ হতে তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ, হেদায়েত ও রহমত এসে গেছে।” (সূরা আন্‌আমঃ ১৫৫-৫৭) এমনি আরো অসংখ্য আয়াত রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে, মানুষের কাছে দ্বীনের শিক্ষা দান ও তা বর্ণনা করার পূর্বে হুজ্জত কায়েম হবে না।

 ছহীহ মুসলিম শরীফে আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لا يَسْمَعُ بِي أَحَدٌ مِنْ هَذِهِ الْأُمَّةِ يَهُودِيٌّ وَلا نَصْرَانِيٌّ ثُمَّ يَمُوتُ وَلَمْ يُؤْمِنْ بِالَّذِي أُرْسِلْتُ بِهِ إِلا كَانَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ

“ঐ সত্বার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, এই উম্মাতের কোন ইয়াহুদী বা নাসারা আমার কথা শুনে আমার আনিত বিষয় সমূহের প্রতি ঈমান আনয়ন না করে মৃত্য বরণ করলে সে জাহান্নামের অধিবাসী হবে।”

   আলেমগণ বলেন, কোন নও মুসলিম বা অমুসলিম দেশে বসবাসকারী বা মুসলমানদের এলাকা থেকে দূরবর্তী স্থানের অধিবাসী হওয়ার কারণে কেউ যদি কুফরী কাজে লিপ্ত হয়, তাকে কাফের হওয়ার ফতওয়া দেয়া যাবেনা। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন, যারা আমাকে চেনে, তারা অবশ্যই জানে যে, নির্দিষ্টভাবে কাউকে কাফের বা ফাসেক বলা থেকে আমি কঠোরভাবে নিষেধ করে থাকি। তবে যে ব্যক্তি কাফের বা ফাসেক হওয়ার কারণসমূহ সম্পর্কে অবগত আছে, তার কথা ভিন্ন। আমি আবারও বলছি যে, এই উম্মতের কেউ ভুলক্রমে অন্যায় কাজে লিপ্ত হলে আল্লাহ তাআ’লা তাকে ক্ষমা করে দিবেন। চাই আকীদার মাসআলায় ভুল করুক কিংবা অন্য কোন মাসআলায়। সালাফে সালেহীন অনেক মাসআলায় মতভেদ করেছেন। তারপরও কেউ কাউকে কাফের বলেন নি। তাদের থেকে এও বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি এরূপ কথা বলবে, সে কাফের হয়ে যাবে, এটা ঠিক, কিন্তু কোন নির্দিষ্ট কর্মের উপরে হুকুম লাগানো এবং ব্যক্তির উপরে হুকুম লাগানোর মাঝে পার্থক্য রয়েছে। শায়খুল ইসলাম আরো বলেন, কাউকে কাফের বলা অত্যন্ত ভয়ানক বিষয়। করা হয়েছে। কারণ কুফরীতে লিপ্ত ব্যক্তি এমন হতে পারে যে, সে নও মুসলিম অথবা সে আলেম-উলামা থেকে দূরের কোন জনপদে বসবাস করছে। যার কারণে ইসলামের বিধি-বিধান সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করতে পারেনি। কাজেই এরূপ ক্ষেত্রে দ্বীনের কোন বিষয় অস্বীকার করলেই তাকে কাফের বলা যাবে না। যতক্ষণ না তার কাছে হুজ্জত (কুরআন্তসুন্নাহর দলীল সমূহ) পেশ করা হবে। এও হতে পারে যে, সে দলীল-প্রমাণ শুনেনি অথবা শুনেছে কিন্তু বিশুদ্ধ সূত্রে তার কাছে পৌঁছেনি। কখনো এও হতে পারে যে, সে একজন আলেম। তার কাছে দলীল রয়েছে বা দলীলের ব্যাখ্যা রয়েছে। যদিও তা সঠিক নয়।

   শায়খুল ইসলাম মুহাম্মাদ বিন আবদুল ওয়াহ্‌হাব (রঃ) বলেনঃ আমি ঐ ব্যক্তিকে কাফের বলি, যে দ্বীনে মুহাম্মাদী সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর তাকে গালি-গালাজ করল। শুধু তাই নয়; বরং মানুষকে আল্লাহর দ্বীন হতে বিরত রাখে এবং ধার্মিক লোকদের সাথে শত্রুতা পোষণ করে। আমি এই শ্রেণীর লোকদেরকে কাফের বলে থাকি। তিনি আরো বলেন, যারা বলে আমরা ব্যাপকভাবে মানুষকে কাফের বলি এবং দ্বীন পালনে সক্ষম ব্যক্তিকেও আমাদের কাছে হিজরত করে চলে আসতে বলি, তারা অপবাদ প্রদানকারী মিথ্যুক। তারা মানুষকে আল্লাহর দ্বীন গ্রহণ করতে বাঁধা দিয়ে থাকে। আবদুল কাদের জ্বিলানী এবং সায়্যেদ আহ্‌মাদ বাদভীর  কবরের উপরে যে মূর্তি রয়েছে, তার উপাসকদেরকে যদি অজ্ঞতার কারণে এবং তাদেরকে কেউ সতর্ক না করার কারণে কাফের না বলি, তাহলে কিভাবে আমরা এমন নির্দোষ লোকদেরকে আমাদের দিকে হিজরত না করার কারণে কাফের বলব, যারা কখনো আল্লাহর সাথে শরীক করেনি এবং আমাদেরকে কুফর প্রতিপন্ন করেনি ও আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করে নি?

   আল্লাহর কিতাব, রাসূলের সুন্নাত এবং আলেমদের কথা অনুযায়ী দলীল-প্রমাণ পেশ করা ব্যতীত কাউকে কাফের বলা যাবে না। আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহের দাবীও তাই। তিনি অযুহাত পেশ করার সুযোগ দূর না করে কাউকে শাস্তি দিবেন না। বিবেক দ্বারা মানুষের উপরে আল্লাহর হক সাব্যস্ত করা সম্ভব নয়। যদি তাই হত, তাহলে রাসূল প্রেরণের মাধ্যমে হুজ্জত পেশ করা যথেষ্ট হত না।

   সুতরাং একজন মুসলিম ততক্ষণ পর্যন্ত মুসলিম হিসাবেই পরিগণিত হবে, যতক্ষণ না শরীয়তের দলীলের মাধ্যমে তার ইসলাম ভঙ্গ হবে। কাজেই কাফের বলার ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ তা না হলে দু’টি বড় ধরণের ভয়ের কারণ রয়েছে।

(১) আল্লাহর উপর মিথ্যাচারিতার অপবাদ। সাথে সাথে যার উপর হুকুম লাগানো হল তাকেও এমন দোষে দোষী সাব্যস্ত করা হল, যা থেকে সে সম্পূর্ণ মুক্ত। আল্লাহর উপর মিথ্যাচারিতার অপবাদ এভাবে হয় যে, এমন ব্যক্তিকে কাফের বলা হয়েছে, যাকে আল্লাহ কাফের বলেন নি। এটি আল্লাহ যা হালাল করেছেন, তা হারাম করার শামিল। কেননা কাউকে কাফের বলা বা না বলা এটি কেবলমাত্র আল্লাহরই অধিকার। যেমনিভাবে কোন কিছু হারাম করা বা হালাল করার দায়িত্ব আল্লাহর উপরে।

(২) দ্বিতীয় সমস্যাটি হল মুসলিম ব্যক্তি যে অবস্থার উপর প্রতিষ্ঠিত, তার বিপরীত অবস্থানে নিয়ে যাওয়া। কেননা যখন কোন মুসলিমকে লক্ষ্য করে কাফের বলবে, তখন সে যদি কাফের না হয়, তাহলে ফতোয়া দানকারী নিজেই কাফের হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ছহীহ মুসলিমে ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

إِذَا قَالَ الرَّجُلُ لِأَخِيهِ يَا كَافِرُ فَقَدْ بَاءَ بِهِ أَحَدُهُمَا

“যখন কোন ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইকে কাফের বলবে, তখন তাদের দু’জনের একজন কাফেরে পরিণত হবে।” অন্য বর্ণনায় রয়েছে, যাকে কাফের বলা হল, সে যদি কাফের হয়ে থাকে তাহলে কাফের হবে। অন্যথায় ফতোয়া দানকারী নিজেই কাফেরে পরিণত হবে। মুসলিম শরীফে আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে,

وَمَنْ دَعَا رَجُلًا بِالْكُفْرِ أَوْ قَالَ عَدُوَّ اللَّهِ وَلَيْسَ كَذَلِكَ إِلَّا حَارَ عَلَيْهِ

“যে ব্যক্তি কোন মুসলমানকে কাফের বলবে অথবা আল্লাহর শত্রু বলবে, সে অনুরূপ না হয়ে থাকলে যে বলল সে নিজেই কাফের বা আল্লাহর শত্রু হিসাবে পরিণত হয়ে যাবে।”  যে ব্যক্তি কোন মুসলিমকে কাফের বলে, সে নিজের আমল নিয়ে অহংকার করে এবং অপরকে তুচ্ছ জ্ঞান করে থাকে। এ ধরণের ব্যক্তি দু’টি সমস্যার সম্মুখীন। নিজের আমলকে খুব বড় মনে করলে আমল ধ্বংস হয়ে যাবে এবং  তার মধ্যে অহংকার আসার কারণে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ

قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ الْكِبْرِيَاءُ رِدَائِي وَالْعَظَمَةُ إِزَارِي فَمَنْ نَازَعَنِي وَاحِدًا مِنْهُمَا قَذَفْتُهُ فِي النَّارِ

“আল্লাহ বলেন, অহংকার আমার চাদর। বড়ত্ব আমার পোষাক। যে ব্যক্তি আমার এ দু’টির যে কোন একটি পোষাক নিয়ে টানাটানি করবে আমি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব।” সুতরাং কাউকে কাফের বলার পূর্বে দু’টি বিষয় খেয়াল করতে হবেঃ

 (১) আল্লাহর কিতাব এবং রাসূলের সুন্নায় কাজটিকে কুফরী বলা হয়েছে কি না। যাতে করে আল্লাহর উপর মিথ্যাচারিতায় লিপ্ত না হয়।

(২) যার ভিতরে কাফের হওয়ার কারণ ও শর্তসমূহ বিদ্যমান এবং কাফের না হওয়ার যাবতীয় বাঁধামুক্ত। কেবলমাত্র তার উপরই কুফরীর বিধান প্রয়োগ করা। কাফের হওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হল, জেনে-শুনে শরীয়ত বিরোধী এমন কাজে লিপ্ত হওয়া, যা কুফরীকে আবশ্যক করে। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ

)وَمَنْ يُشَاقِقْ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا(

“আর সুপথ প্রকাশিত হওয়ার পর যে রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনগণের বিপরীত পথের অনুগামী হয়, আমি তাকে তাতেই প্রত্যাবর্তন করাবো, যাতে সে প্রত্যাবর্তন করতে চায় এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর ওটা কতই না নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তন স্থল।” (সূরা নিসাঃ ১১৫) উক্ত আয়াতে কারীমায় বলা হয়েছে, জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করার শর্ত হল হেদায়েত সুস্পষ্ট হওয়ার পর রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিরোধিতা করা।

   কাজটি করলে কাফের হয়ে যাবে, এটা জানা কি জরুরী? নাকি কাজটি শরীয়তে নিষেধ এতটুকু জানাই যথেষ্ট? যদিও কাজটির ফলাফল সম্পর্কে অবগত না থাকে।

   উত্তর হল, কাজটি শরীয়তে নিষেধ একথা জেনে তাতে লিপ্ত হলেই হুকুম লাগানোর জন্য যথেষ্ট। কেননা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রামাযান মাসে দিনের বেলায় স্ত্রীর সাথে সহবাস করার কারণে এক লোকের উপর কাফ্‌ফারা ওয়াজিব করেছিলেন। কারণ সে জানতো দিনের বেলায় স্ত্রী সহবাস করা হারাম। কিন্তু কাফ্‌ফারা ওয়াজিব হওয়ার কথা জানতো না। বিবাহিত পুরুষ ব্যভিচারকে হারাম জেনে তাতে লিপ্ত হলে তাকে রজম করতে হবে। যদিও সে বিবাহিত যেনাকারীর শাস্তি যে রজম, তা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে।

   জোর পূর্বক কাউকে কুফরী কাজে বাধ্য করা হলে, তাকে কাফের বলা যাবে না। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ

)مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ مِنْ بَعْدِ إِيمَانِهِ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنٌّ بِالْإِيمَانِ وَلَكِنْ مَنْ شَرَحَ بِالْكُفْرِ صَدْرًا فَعَلَيْهِمْ غَضَبٌ مِنْ اللَّهِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ(

“কেউ ঈমান আনার পরে আল্লাহর সাথে কুফরীতে লিপ্ত হলে এবং কুফরীর জন্য অন্তরকে খুলে দিলে তার উপর আপততি হবে আল্লাহর গযব এবং তার জন্যে রয়েছে মহা শাস্তি। তবে তার জন্যে নয়, যাকে কুফরীর জন্যে বাধ্য করা হয়েছে। কিন্তু তার চিত্ত ঈমানে অবিচল।” (সূরা নাহ্‌লঃ ১০৬)

   অধিক আনন্দ প্রকাশ করতে গিয়ে বা চিন্তিত অবস্থায় অথবা রাগান্বিত হয়ে অথবা ভীত অবস্থায় কুফরী বাক্য উচ্চারণ করলে কাফের হয়ে যাবে না। আল্লাহর বাণী,

)وَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ فِيمَا أَخْطَأْتُمْ بِهِ وَلَكِنْ مَا تَعَمَّدَتْ قُلُوبُكُمْ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا(

“ভুলক্রমে কোন অপরাধ করলে তোমাদের কোন দোষ নেই। কিন্তু তোমাদের অন্তরে সংকল্প থাকলে অপরাধ হবে। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আহ্‌যাবঃ ৫) ছহীহ মুসলিম শরীফে আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

لَلَّهُ أَشَدُّ فَرَحًا بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ حِينَ يَتُوبُ إِلَيْهِ مِنْ أَحَدِكُمْ كَانَ عَلَى رَاحِلَتِهِ بِأَرْضِ فَلَاةٍ فَانْفَلَتَتْ مِنْهُ وَعَلَيْهَا طَعَامُهُ وَشَرَابُهُ فَأَيِسَ مِنْهَا فَأَتَى شَجَرَةً فَاضْطَجَعَ فِي ظِلِّهَا قَدْ أَيِسَ مِنْ رَاحِلَتِهِ فَبَيْنَا هُوَ كَذَلِكَ إِذَا هُوَ بِهَا قَائِمَةً عِنْدَهُ فَأَخَذَ بِخِطَامِهَا ثُمَّ قَالَ مِنْ شِدَّةِ الْفَرَحِ اللَّهُمَّ أَنْتَ عَبْدِي وَأَنَا رَبُّكَ أَخْطَأَ مِنْ شِدَّةِ الْفَرَحِ

“গুনাহ করার পর বান্দা যখন তাওবা করে, তখন আল্লাহ তাআ’লা ঐ ব্যক্তির চেয়ে বেশী খুশী হন, যে একটি বাহনের উপর আরোহন করে মরুভূমির উপর দিয়ে পথ চলতে ছিল। এমন সময় বাহনটি তার খাদ্য-পানীয় সব নিয়ে পলায়ন করল। এতে লোকটি নিরাশ হয়ে একটি গাছের নিচে এসে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ নিদ্রায় থাকার পর হঠাৎ উঠে দেখে বাহনটি তার সমস্ত আসবাব পত্রসহ মাথার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সে বাহনটির লাগাম ধরে আনন্দে বলে উঠল, হে আল্লাহ! আপনি আমার গোলাম, আমি আপনার রব। খুশীতে আত্মহারা হয়েই সে এ ধরণের ভুল করেছে।”

   কাফের বলার পথে আরেকটি বাধা হল কাজটি কুফরী হওয়ার ব্যাপারে কুফরীতে লিপ্ত ব্যক্তির কাছে তা’বীল বা ব্যাখ্যা থাকা। যে কারণে সে মনে করে যে, সে সত্যের উপরই আছে। কাজেই সে তার ধারণা মতে পাপ বা শরীয়ত বিরোধী কাজে লিপ্ত হয়নি। এমতাবস্থায় সে নিম্নোক্ত আয়াতের অন্তর্ভুক্ত হবে যেখানে আল্লাহ বলেনঃ

)وَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ فِيمَا أَخْطَأْتُمْ بِهِ وَلَكِنْ مَا تَعَمَّدَتْ قُلُوبُكُمْ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا(

“ভুলক্রমে কোন অপরাধ করলে তোমাদের কোন দোষ নেই। কিন্তু তোমাদের অন্তরে সংকল্প থাকলে অপরাধ হবে। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আহ্‌যাবঃ ৫) আল্লাহ আরো বলেনঃ

)لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا(

“আল্লাহ কাউকে সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না।” (সূরা বাকারাঃ ২৮৬)

ইমাম ইবনে কুদামা আলমাকদেসী বলেন, কোন প্রকার সন্দেহ বা ব্যাখ্যা ব্যাতীত কেউ যদি নিরাপরাধ মানুষকে হত্যা করা হালাল ভেবে হত্যা করে এবং তাদের সম্পদ আত্মসাৎ করে, তাহলেও সে কাফের হয়ে যাবে। আর যদি তা’বীল করে কাফের ভেবে হত্যা করে এবং সম্পদ হালাল জেনে আত্মসাৎ করে, তবে তাদেরকে কাফের বলা হবে না। এ জন্যে খারেজীদেরকে অধিকাংশ আলেমগণ কাফের বলেন নি। অথচ তারা মুসলমানদের জান্তমাল হালাল মনে করে এবং এ কাজের দ্বারা তারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারবে বলে মনে করে। তাদেরকে কাফের না বলার কারণ এই যে, তারা তা’বীল বা অপব্যাখ্যা করে মুসলমানদেরকে হত্যা করেছিল। তিনি আরো বলেনঃ খারেজীরা অনেক ছাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেয়ীদের রক্ত ও সম্পদ হালাল মনে করত। শুধু তাই নয় এ কাজকে তারা আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের মাধ্যম মনে করত। তা সত্বেও আলেমগণ তাদেরকে কাফের বলেন নি। কারণ তাদের কাছে অপব্যাখ্যা ছিল।

   ইমাম ইবনে তাইমীয়া (রঃ) বলেন, কুরআনের বিরোধীতা করা খারেজীদের উদ্দেশ্য ছিল না; বরং কুরআন বুঝতে গিয়ে ভুল করার কারণে তারা বিদ্‌আতে লিপ্ত হয়ে পাপী মুমিনদেরকে কাফের মনে করেছে। তিনি আরো বলেনঃ খারেজীরা কুরআনের বিরোধীতা করে মুমিনদেরকে কাফের বলেছে। অথচ কুরআনের ভাষায় মুমিনদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। তারা বিনা ইলমে, সুন্নার অনুসরণ না করে এবং প্রকৃত জ্ঞানীদের কাছে না গিয়ে কুরআনের অস্পষ্ট আয়াতগুলোর অপব্যাখ্যা করেছে। তিনি আরো বলেনঃ ইমামগণ ঐক্যবদ্ধভাবে খারেজীদেরকে নিন্দা করেছেন এবং গোমরাহ বলেছেন। তবে তাদেরকে কাফের বলার ক্ষেত্রে দু’টি বর্ণনা পাওয়া যায়। কিন্তু তিনি এও উল্লেখ করেছেন যে, আলী (রাঃ) বা অন্য কোন ছাহাবী তাদেরকে কাফের বলেন নি; বরং তাদেরকে জালেম এবং সীমা লংঘনকারী মুসলমান হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল ও অন্যান্য ইমামগণ থেকেও এ ধরণের কথা বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে তাইমীয়া আরো বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খারেজীদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে বলেছেন। চতুর্থ খলীফা আলী (রাঃ) তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন। ছাহাবী ও পরবর্তী উত্তম যুগের ইমামগণ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন। আলী (রাঃ), সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস বা অন্য কোন সাহাবী খারেজীদেরকে কাফের বলেন নি; বরং তাদেরকে মুসলমান মনে করেছেন। তারা যখন অন্যায়ভাবে মানুষের রক্তপাত শুরু করল এবং মুসলমানদের ধন্তসম্পদের উপর আক্রমণ করল তখন আলী (রাঃ) তাদের এই যুলুম এবং বিদ্রোহ দমন করার জন্য যুদ্ধ করেছেন। তাদেরকে কাফের মনে করে যুদ্ধ করেন নি। তাই তিনি তাদের মহিলাদেরকে দাসী হিসাবে বন্দী করেন নি এবং তাদের সম্পদকে গণীমত হিসাবে গ্রহণ করেন নি। তাদের গোমরাহী কুরআনের দলীল, মুসলমানদের ইজমা দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার আদেশ দিয়েছেন। তথাপিও আলেমগণ তাদেরকে কাফের বলেন নি। তাহলে কিভাবে এমন ফির্কার লোকদেরকে কাফের বলবেন, যাদের চেয়ে বড় আলেমগণ অনেক মাসআলায় ভুল করেছেন। সুতরাং এক দলের পক্ষে অপর দলকে কাফের বলা এবং জান্তমাল হালাল মনে করা জায়েয নেই। যদিও তাদের ভিতরে বিদ্‌আত বর্তমান রয়েছে। মূল কথা তারা যে বিষয়ে মতভেদ করেছে সে সম্পর্কে তারা সকলেই অজ্ঞ। তিনি আরো বলেনঃ কোন মুসলিম যদি তা’বীল করে কারও বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বা কাউকে কাফের বলে, তবে উক্ত মুসলিমকে কাফের বলা যাবে না। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বাণী থেকে যে হুকুম সাব্যস্ত হয়, দাওয়াত না পৌঁছিয়ে বান্দার ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হওয়ার ক্ষেত্রে হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণের তিন ধরণের বক্তব্য রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে কুরআনের বক্তব্যই সঠিক। আল্লাহ বলেনঃ

)وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولًا(                                                                           

“রাসূল না পাঠিয়ে আমি কাউকে শাস্তি দেবনা।” (সূরা ইসরাঃ ১৫)

)رُسُلًا مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ لِأَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ(

“সুসংবাদ দাতা ও ভীতি-প্রদর্শনকারী রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি, যাতে রাসূলগণের পরে আল্লাহর প্রতি ওযুহাত পেশ করার মত কোন অবকাশ মানুষের জন্য না থাকে।” (সূরা নিসাঃ ১৬৫) বুখারী ও মুসলিম শরীফে আছে, আল্লাহর চেয়ে অধিক ওযর-অযুহাত গ্রহণকারী আর কেউ নেই। এই জন্যই আল্লাহ তাআ’লা সুসংবাদ দাতা এবং ভয় প্রদর্শনকারী হিসাবে রাসূল প্রেরণ করেছেন।

   মোট কথা অজ্ঞতার কারণে কেউ কুফরী করলে অথবা কুফরী বাক্য উচ্চারণ করলে কাফের হবে না। এটাই আল্লাহর কিতাব, রাসূলের সুন্নাত এবং আলেমদের পথ।

(৬৮) যারা আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে মানব রচিত আইন দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা করে তাদের হুকুম কি?


আমি আল্লাহর উপর ভরসা করে বলছি যে, আল্লাহ কর্তৃক নাযিলকৃত বিধান দিয়ে রাষ্ট্র চালানো বা বিচার-ফয়সালা করা তাওহীদে রুবূবীয়্যাতের অন্তর্ভুক্ত। কেননা তাতে আল্লাহর রুবূবীয়্যাত, পরিপূর্ণ রাজত্ব এবং পরিচালনা ক্ষমতার দাবী অনুযায়ী তাঁর হুকুম কার্যকর করার নামান্তর। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ

)اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهًا وَاحِدًا لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ(

 “তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেদের আলেম ও ধর্ম-যাজকদেরকে প্রভু বানিয়ে নিয়েছে এবং মারইয়ামের পুত্র মাসীহকেও অথচ তাদের প্রতি শুধু এই আদেশ দেয়া হয়েছে যে, তারা শুধুমাত্র এক মা’বূদের এবাদত করবে, যিনি ব্যতীত মা’বূদ হওয়ার যোগ্য কেউ নয়। তিনি তাদের অংশী স্থাপন করা হতে পবিত্র।” (সূরা তাওবাঃ ৩১) এখানে আল্লাহ তাআ’লা ইয়াহুদী-নাসারাদের ধর্ম-যাজকদেরকে রব হিসাবে নাম করণ করেছেন। কারণ তারাও আল্লাহর বিধানের মত বিধান রচনা করত। তাদের রচিত বিধানের অনুসারীদেরকে গোলাম বা বান্দা হিসাবে নাম দেয়া হয়েছে। কারণ তারা আল্লাহর বিধানের বিরোধীতা করে ঐ সব পাদ্রি ও আলেমদের কাছে নতি স্বীকার করত এবং তাদের অনুসরণ করত। আদী বিন হাতেম (রাঃ) রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে বললেন, তারা তো তাদের এবাদত করে না। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তারা হালালকে হারাম করে এবং হারামকে হালাল করে। আর সাধারণ লোকেরা তাদের অনুসরণ করে থাকে। এটার নামই এবাদত।

   আপনি জেনে নিন, যে ব্যক্তি আল্লাহর আইন দিয়ে বিচার করে না; বরং অন্যের বিধান দ্বারা বিচার-ফায়সালা করতে চায়, তাদের ব্যাপারে কুরআনের আয়াতগুলো দু’ভাগে বিভক্ত। প্রথম প্রকারের আয়াতে তাদেরকে ঈমানহীন (মুনাফেক) দ্বিতীয় প্রকারের আয়াতে কাফের, জালেম ও ফাসেক বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন,

)أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِنْ قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَى مَا أَنزَلَ اللَّهُ وَإِلَى الرَّسُولِ رَأَيْتَ الْمُنَافِقِينَ يَصُدُّونَ عَنْكَ صُدُودًا فَكَيْفَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ ثُمَّ جَاءُوكَ يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا إِحْسَانًا وَتَوْفِيقًا  أُوْلَئِكَ الَّذِينَ يَعْلَمُ اللَّهُ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ وَعِظْهُمْ وَقُلْ لَهُمْ فِي أَنفُسِهِمْ قَوْلًا بَلِيغًا وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ جَاءُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمْ الرَّسُولُ لَوَجَدُوا اللَّهَ تَوَّابًا رَحِيمًا فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا(

“আপনি কি তাদেরকে দেখেন নি, যারা দাবী করে যে, আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে তারা সে সমস্ত বিষয়ের উপর ঈমান এনেছে। তারা বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো সমাধানের জন্য শয়তানের কাছে নিয়ে যেতে চায়, অথচ তাদেরকে আদেশ দেয়া হয়েছে, যাতে তারা ওকে মান্য না করে। পক্ষান্তরে শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়। আর যখন আপনি তাদেরকে বলবেনঃ তোমরা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান এবং তাঁর রাসূলের দিকে এসো তখন আপনি মুনাফেকদিগকে দেখবেন, ওরা আপনার কাছ থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় যদি তাদের কৃতকর্মের দরুন বিপদ আরোপিত হয়, তখন কেমন হবে? অতঃপর তারা আল্লাহর নামে কসম খেয়ে ফিরে আসবে যে, কল্যাণ ও সমঝোতা ছাড়া আমাদের অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিল না। এরা হল সে সমস্ত লোক, যাদের মনের গোপন বিষয় সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা অবগত। অতএব, আপনি ওদেরকে উপেক্ষা করুন এবং ওদেরকে সদুপদেশ দিয়ে এমন কোন কথা বলুন, যা তাদের জন্য কল্যাণকর। বস্তুতঃ আমি একমাত্র এই উদ্দেশ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি, যাতে আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী তাদের (রাসূলগণের) আদেশ-নিষেধ মান্য করা হয়। আর সেসব লোক যখন নিজেদের অনিষ্ট সাধন করেছিল, তখন যদি আপনার কাছে আসত অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করত এবং রাসূলও যদি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেন, অবশ্যই তারা আল্লাহকে ক্ষমাকারী, মেহেরবান রূপে পেত। অতএব, তোমার পালনকর্তার কসম, সে লোক ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে আপনাকে ন্যায়বিচারক বলে মনে না করে। অতঃপর আপনার মীগোশতার ব্যাপারে নিজের মনে কোন রকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং তা সন্তুষ্ট চিত্তে কবূল করে নিবে।” (সূরা নিসাঃ ৬০-৬৫)

   এখানে আল্লাহ তাআ’লা ঈমানের দাবীদার মুনাফেকদের কয়েকটি বৈশিষ্ট তুলে ধরেছেনঃ

(১) মুনাফেকদের প্রথম বৈশিষ্ট হলো তারা তাগুতের নিকট বিচার-ফায়সালার জন্য গমণ করে থাকে। প্রত্যেক ঐ বিষয় বা ব্যক্তির নামই তাগুত, যে আল্লাহর বিধানের বিরোধীতা করে। সমস্ত বিচার-ফায়সালা এবং হুকুমের মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআ’লা। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

)أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ تَبَارَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ  (

 “জেনে রাখ তাঁরই কাজ সৃষ্টি করা এবং আদেশ করা। আল্লাহ বরকতময় যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক।” (সূরা আ’রাফঃ ৫৪)

(২) তাদেরকে আল্লাহর নাযিলকৃত বিষয় এবং রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর দিকে আহবান করা হলে তারা অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

(৩) তারা কোন বিপদে পড়লে অথবা তাদের কৃতকর্ম মানুষের কাছে প্রকাশিত হয়ে গেলে শপথ করে বলে থাকে যে, সৎ উদ্দেশ্য এবং পরিস্থিতি শান্ত রাখা ব্যতীত আমাদের অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিল না। বর্তমানে যারা ইসলামের বিধান বাদ দিয়ে মানব রচিত বিধান দিয়ে রাষ্ট্র চালায়, তাদের কথাও একই রকম। তারা বলে, আমাদের উদ্দেশ্য হল যুগোপযোগী শাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের উপকার সাধন করা।

   আল্লাহ তাআ’লা উপরোক্ত চরিত্রের অধিকারী মুনাফেকদেরকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, আল্লাহ তাআ’লা তাদের অন্তরের খবর জানেন এবং তাদেরকে নসীহত করার জন্য এবং কঠোর ভাষায় কথা বলার জন্য নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে আদেশ দিয়েছেন। রাসূল পাঠানোর উদ্দেশ্য হল, যাতে শুধুমাত্র তাঁদেরই অনুসরণ করা হয়। অন্য মানুষের অনুসরণ নয়। তাদের চিন্তাধারা ও মতবাদ যতই শক্তিশালী হোক না কেন। অতঃপর আল্লাহ তাআ’লা নিজের রুবূবীয়্যাতের শপথ করে তাঁর রাসূলকে বলছেন যে, তিনটি বিষয়ের সমন্বয় ব্যতীত কারও ঈমান সংশোধন হবে না।

১)      সকল প্রকার বিরোধপূর্ণ বিষয়ে রাসূলের দিকে ফিরে আসা।

২)      রাসূলের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়ার জন্য অন্তরকে প্রশস্ত করা।

৩)      পরিপূর্ণভাবে রাসূলের ফায়সালাকে মেনে নেয়া এবং কোন প্রকার শীথিলতা ব্যতীত তা বাস্তবে রূপদান করা।

দ্বিতীয় প্রকারের আয়াত সমূহে আল্লাহ বলেন,

)وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَئِكَ هُمْ الْكَافِرُونَ(

“যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে না, তারা কাফের।” (সূরা মায়েদাঃ ৪৪)

)وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَئِكَ هُمْ الظَّالِمُونَ(

“যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে না, তারা জালেম।” (সূরা মায়েদাঃ ৪৫)

)وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَئِكَ هُمْ الفَاسِقُوْنَ(

“যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে না, তারা ফাসেক।” (সূরা মায়েদাঃ ৪৭) যারা আল্লাহর আইন দিয়ে বিচার করে না তাদেরকে আল্লাহ উপরের তিনিটি আয়াতে পরপর কাফের, জালেম এবং ফাসেক বলেছেন। তিনটি গুণই কি এক ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে? অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর আইন দিয়ে বিচার করল না, সে কাফের, ফাসেক এবং জালেমও বটে। কেননা আল্লাহ কাফেরদেরকে জালেম এবং ফাসেক হিসাবেও বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ বলেন,

)وَالْكَافِرُونَ هُمْ الظَّالِمُونَ(

“বস্তুতঃ কাফেরেরাই প্রকৃত জালেম।” (সূরা বাকারাঃ ২৫৪) আল্লাহ বলেন,

)إِنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَمَاتُوا وَهُمْ فَاسِقُون(

“তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে কুফরী করেছে এবং ফাসেক অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়েছে।” (সূরা তাওবাঃ ৮৪) প্রত্যেক কাফেরই কি জালেম এবং ফাসেক? নাকি আল্লাহর আইন দিয়ে ফায়সালা না করার কারণে বিভিন্ন প্রকার মানুষের উপর অবস্থাভেদে এ সমস্ত বিধান প্রযোজ্য হবে। দ্বিতীয় মতটি আমার নিকট গ্রহণযোগ্য। অর্থাৎ আল্লাহর আইন দিয়ে বিচার না করলে মানুষ কখনো কাফের হয়, কখনো জালেম হয় আবার অবস্থাভেদে কখনো ফাসেক হয়।

   সুতরাং আমরা বলব যে, যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানকে অবজ্ঞা ও তুচ্ছ মনে করে এবং অন্য বিধানকে অধিক উপযোগী ও উপকারী মনে করে তার মাধ্যমে মানুষের বিচার-ফায়সালা করে, তারা ইসলাম থেকে বের হয়ে কাফের হয়ে যাবে। এদের অন্তর্ভুক্ত ঐ সমস্ত লোক, যারা মানুষের জন্য পথ হিসাবে ইসলাম বিরোধী বিধান রচনা করে। তারা তাদের রচিত বিধানকে মানুষের জন্য অধিক উত্তম ও উপযোগী মনে করেই তৈরী করে থাকে। এ কথা স্বাভাবিকভাবেই জ্ঞাত হওয়া যায় যে, মানুষ এক পথ ছেড়ে দিয়ে যখন অন্য পথে চলে, তখন এটা মনে করেই চলে যে, প্রথম পথের চেয়ে দ্বিতীয় পথটি উত্তম।

   আর যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে অন্যের বিধানের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করে এবং বিচার-ফায়সালা করে কিন্তু সে আল্লাহর বিধানকে অবজ্ঞা করে না এবং অন্য বিধানকে অধিক উপকারী এবং উপযোগীও মনে করে না বরং সে অন্যের উপর প্রভাব বিস্তার কিংবা প্রতিশোধ গ্রহণ করার জন্য এরূপ করে থাকে, তাহলে কাফের হবে না বরং জালেম হিসাবে গণ্য হবে।

   আর যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে অন্য বিধানের মাধ্যমে রাষ্টীয় বিচার-ফায়সালা করে কিন্তু সে আল্লাহর বিধানকে অবজ্ঞা করে না এবং অন্য বিধানকে অধিক উপকারী এবং উপযোগীও মনে করে না, বরং বিচার প্রার্থীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে কিংবা ঘুষ গ্রহণের জন্য কিংবা অন্য কোন পার্থিব স্বার্থ হাসিলের জন্য এরূপ করে থাকে, তা হলে কাফের হবে না; বরং ফাসেক হিসাবে গণ্য হবে।

   শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন, যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেদের আলেমদেরকে রব্ব (প্রভু) হিসাবে গ্রহণ করে, তারা দু’প্রকার।

(১) তারা জানে যে, তাদের গুরুরা আল্লাহর দ্বীন পরিবর্তন করে ফেলেছে। তারপরও তারা তাদের অনুসরণ করে এবং তাদের হালাল করা বস্তকে হালাল ও হারামকে হারাম হিসাবে বিশ্বাস করে। এক্ষেত্রে তাদের নেতাদের অন্ধ অনুসরণ করে থাকে। তারা ভাল করেই জানে যে, তাদের নেতারা রাসূলদের আনীত দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলেছে। এটা নিঃসন্দেহে কুফরী। এটাকে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল শির্ক হিসাবে ব্যক্ত করেছেন।

(২) তারা কেবলমাত্র হারামকে হালাল এবং হালালকে হারাম করার ক্ষেত্রে তাদের অনুসরণ করে। তারা আল্লাহর নাফরমানীতে তাদের নেতাদের অনুসরণ করেছে। যেমনভাবে মুসলমানেরা হারাম জেনেও পাপকাজে লিপ্ত হয়ে থাকে। তাদের হুকুম অন্যান্য পাপীদের মতই।

(৬৯) গাইরুল্লাহর নৈকট্য হাসিলের জন্য পশু কুরবানী করার হুকুম কি? গাইরুল্লাহর নামে যবাই করা পশুর গোশত ভক্ষণ করা জায়েয আছে কি?


গাইরুল্লাহর নামে পশু যবাই করা বড় শির্কের অন্তর্ভুক্ত। কেননা যবাই করা একটি এবাদত। আল্লাহ তাআ’লা এ মর্মে আদেশ দিয়ে বলেনঃ

)فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ(

“আপনার প্রভুর জন্য নামায পড়ুন এবং কুরবানী করুন।” (সূরা কাউছারঃ ২)

)قُلْ إِنَّ صَلاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَاي وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ لا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ(

“আপনি বলুন! আমার নামায, আমার সমস্ত এবাদত, আমার জীবন এবং আমার মরণ সব কিছু সারা জাহানের রব আল্লাহর জন্যে। তাঁর কোন শরীক নেই, আমি এর জন্যে আদিষ্ট হয়েছি, আর আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে আমিই হলাম প্রথম।” (সূরা আনআ’মঃ ১৬২-১৬৩) সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্যে পশু যবাই করবে, চাই সে কোন ফেরেশতার উদ্দেশ্যে করুক বা নবী-রাসূলের উদ্দেশ্যে বা কোন অলী বা আলেমের উদ্দেশ্যে করুক, সবই শির্কে পরিণত হবে এবং এতে লিপ্ত ব্যক্তি মুশরিকে পরিণত হবে। সুতরাং মুসলিম ব্যক্তির উচিৎ এ ধরণের শির্কে লিপ্ত না হওয়া। আল্লাহ বলেনঃ

)إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ (

“নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন করবে, আল্লাহ তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার বাসস্থান হবে জাহান্নাম, আর এরূপ অত্যাচারীদের জন্যে কোন সাহায্যকারী হবে না।” (সূরা মায়িদাঃ ৭২)

   গাইরুল্লাহর জন্যে যবাইকৃত পশুর গোশত খাওয়া হারাম। যেমন আল্লাহ বলেনঃ

)حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ وَالْمُنْخَنِقَةُ وَالْمَوْقُوذَةُ وَالْمُتَرَدِّيَةُ وَالنَّطِيحَةُ وَمَا أَكَلَ السَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيْتُمْ وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ(

“তোমাদের জন্যে মৃত, রক্ত, শুকরের গোশত, আল্লাহ ছাড়া অপরের নামে উৎসর্গকৃত পশু, গলাটিপে মারা পশু, প্রহারে মৃত পশু, উপর থেকে পতিত হয়ে মারা যাওয়া পশু, অন্য পশুর শিংয়ের আঘাতে মৃত পশু এবং হিংস্র জন্তুর ভক্ষণ করা পশুর গোশত খাওয়া হারাম করা হয়েছে। তবে যা তোমরা যবাই দ্বারা পবিত্র করেছ, তা হালাল। আর যে সমস্ত পশুকে পূজার বেদীর উপর বলি দেয়া হয়েছে, তাও তোমাদের জন্য হারাম।” (সূরা মায়িদাঃ ৩)

(৭০) আল্লাহ বা তাঁর রাসূল অথবা দ্বীন নিয়ে হাসি ঠাট্টা করার হুকুম কি?


এই কাজটি অর্থাৎ আল্লাহ বা তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অথবা কুরআন অথবা দ্বীন নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করা কুফরী। যদিও তা মানুষকে হাসানোর নিয়তে হয়ে থাকে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর যুগে এ রকম বিদ্রুপের ঘটনা ঘটেছিল। একদা মুনাফেকরা তাঁকে এবং সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বলল, আমরা এ সমস্ত লোকদের চেয়ে অধিক পেট পূজারী, অধিক মিথ্যুক এবং যুদ্ধ ক্ষেত্রে এদের চেয়ে অধিক ভীতু আর কাউকে দেখিনি। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেনঃ

)وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ(

“আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন, উত্তরে তারা অবশ্যই বলবে যে, আমরা কেবল হাসি-তামাসা করছিলাম।” (সূরা তাওবাঃ ৬৫) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর কাছে যখন অভিযোগ আসল, তখন তারা বলল, পথের ক্লান্তি দূর করার জন্য যে সমস্ত কথা-বার্তা বলা হয়, আমরা শুধু তেমন কিছু কথাই বলছিলাম। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদেরকে আল্লাহর বাণী শুনিয়ে দিলেন।

) قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ(

“বলুন! তোমরা কি আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহ এবং তাঁর রাসূলকে নিয়ে হাসি-তামাসা করছিলে? তোমরা এখন ওযর পেশ করো না। তোমরা তো ঈমান প্রকাশের পর কুফরী করেছো।” (সূরা তাওবাঃ ৬৫-৬৬) কাজেই আল্লাহ তাআ’লা, রিসালাত, অহী এবং দ্বীনের বিভিন্ন বিষয় অত্যন্ত পবিত্র। এগুলোর কোন একটি নিয়ে ঠাট্টা করা বৈধ নয়। যে এরূপ করবে, সে কাফের হয়ে যাবে। কারণ তার কাজটি আল্লাহ, তাঁর রাসূল, কিতাব এবং শরীয়তকে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রমাণ বহন করে। যারা এ ধরণের কাজ করবে, তাদের উচিৎ আল্লাহর দরবারে তাওবা করে এবং ক্ষমা চেয়ে নিজেকে সংশোধন করা। তাদের উচিৎ আল্লাহর প্রতি ভয় ও সম্মান দিয়ে অন্তরকে পরিপূর্ণ করা।

(৭১) কবরবাসীর কাছে দু’আ করার বিধান কি?


দু’আ করা দু’প্রকারঃ

(১) এবাদতের মাধ্যমে দু’আ। যেমনঃ নামায, রোজা এবং অন্যান্য এবাদত। মানুষ যখন নামায আদায় করে কিংবা রোযা রাখে, তখন সে প্রভুর কাছে উক্ত এবাদতের মাধ্যমে ক্ষমা প্রার্থনা করে, আল্লাহর আযাব থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চায়। আল্লাহর বাণী,

)وَقَالَ رَبُّكُمْ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِين(

“তোমাদের প্রতিপালক বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবো। যারা অহংকার করতঃ আমার এবাদত হতে বিমুখ হবে, তারা অবশ্যই লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (সূরা মুমিনঃ ৬০) আল্লাহ তাআ’লা দু’আকে এবাদত হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি এবাদতের কোন প্রকার আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্যে পেশ করবে, সে ইসলাম থেকে বের হয়ে কাফেরে পরিণত হবে। সুতরাং কেউ যদি কোন বস্তকে আল্লাহর মত সম্মানিত ভেবে তার সামনে রুকূ করে অথবা সেজদা করে, সে ইসলাম থেকে বের হয়ে কাফেরে পরিণত হবে। এ কারণেই নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শির্কের দরজা বন্ধ করার জন্য পারস্পরিক সাক্ষাতের সময় কারো সামনে মাথা নত করতে নিষেধ করেছেন। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে জিজ্ঞাসা করা হল, কোন ব্যক্তি কি মুসলিম ভাইয়ের সাক্ষাতে মাথা নত করবে? উত্তরে তিনি তা করতে নিষেধ করেছেন। সালাম দেয়ার সময় অজ্ঞ লোকেরা যদি আপনার সামনে মাথা নত করে, তবে আপনার উপর আবশ্যক হল, তাদের কাছে বিষয়টি বর্ণনা করে দেয়া এবং তাকে নিষেধ করে দেয়া।

(২) কোন প্রয়োজনে কারো নিকট কিছু চাওয়া বা প্রার্থনা করা। এটি সকল ক্ষেত্রে শির্ক নয়।

প্রথমতঃ যার কাছে দু’আ করা হবে, সে যদি জীবিত হয়ে থাকে এবং প্রার্থিত বস্ত প্রদান করতে সক্ষম হয়ে থাকে, তাহলে শির্ক হবে না। যেমন আপনি কাউকে বললেন, আমাকে পানি পান করান, আমাকে দশটি টাকা দিন, ইত্যাদি। এ ধরণের কথা শির্ক নয়। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, তোমাদেরকে যখন কেউ আহবান করে, তবে তোমরা তার আহবানে সাড়া দাও। আল্লাহ বলেন,

)وَإِذَا حَضَرَ الْقِسْمَةَ أُوْلُوا الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينُ فَارْزُقُوهُمْ مِنْهُ(

“সম্পদ বন্টনের সময় আত্মীয়, ইয়াতীম এবং মিসকীন উপস্থিত হলে, তাদেরকে তা থেকে রিযিক হিসেবে কিছু দান কর।” (সূরা নিসাঃ ৮) সুতরাং ফকীর যদি হাত বাড়ায় এবং বলে আমাকে কিছু দান করুন, তাহলে তা জায়েয হবে। যেহেতু আল্লাহ বলেছেনঃ “তোমরা তাদেরকে রিজিক রিযিক হিসেবে কিছু দাও।” 

দ্বিতীয়তঃ যার কাছে দু’আ করা হল, সে যদি মৃত হয়, তাহলে শির্ক হবে এবং এতে লিপ্ত ব্যক্তি মুশরিকে পরিণত হবে।

   বড়ই আফসোসের বিষয় যে, কিছু কিছু মুসলিম অধ্যষিত দেশে এমন অনেক মুসলমান রয়েছে, যারা বিশ্বাস করে যে, কবরে দাফনকৃত মাটির সাথে মিশে যাওয়া মৃত লোকটি উপকার বা অপকারের ক্ষমতা রাখে অথবা সন্তানহীনকে সন্তান দিতে সক্ষম। এটি বড় শির্কের অন্তর্ভুক্ত, যা মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। এ ধরণের শির্ককে সমর্থন করা মদ্য পান, ব্যভিচার এবং অন্যান্য পাপ কাজ সমর্থন করার চেয়েও জঘণ্য। আল্লাহর কাছে দু’আ করি তিনি যেন মুসলমানদের অবস্থা সংশোধন করে দেন।

পেজ ন্যাভিগেশন

সর্বমোটঃ  119 টি বিষয় দেখান হচ্ছে।