• ৫৬৪০৩ টি সর্বমোট হাদিস আছেঃ
  • ৫৭৫৬ টি প্রশ্নোত্তর ও ফিকাহঃ

 

 

 

 


(১৩১) প্রস্রাব-পায়খানার সময় কিবলা সামনে বা পিছনে রাখার বিধান কি?


এ মাসআলায় বিদ্বানদের থেকে কয়েকটি মত পাওয়া যায়ঃ

একদল বিদ্বান বলেন, বন্ধ ঘর ছাড়া অন্য কোথাও কিবলা সামনে বা পিছনে রেখে প্রস্রাব-পায়খানা করা হারাম। তারা আবু আইয়্যুব আনসারী (রাঃ)এর হাদীছকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ

]إِذَا أَتَيْتُمُ الْغَائِطَ فَلَا تَسْتَقْبِلُوا الْقِبْلَةَ وَلَا تَسْتَدْبِرُوهَا بِبَوْلٍ وَلَا غَائِطٍ وَلَكِنْ شَرِّقُوا أَوْ غَرِّبُوا قَالَ أَبُو أَيُّوبَ فَقَدِمْنَا الشَّامَ فَوَجَدْنَا مَرَاحِيضَ قَدْ بُنِيَتْ قِبَلَ الْقِبْلَةِ فَنَنْحَرِفُ عَنْهَا وَنَسْتَغْفِرُ اللَّهَ[

“তোমরা পেশাব-পায়খানায় গেলে পায়খানার সময় বা প্রস্রাব করার সময় কিবলাকে সামনে রাখবে না এবং পিছনেও রাখবে না। বরং পূর্ব ও পশ্চিম দিক ফিরে বসবে।” আবু আইয়্যুব বলেন, আমরা শাম দেশে গিয়ে দেখি সেখানকার টয়লেট কা’বার দিকে তৈরী করা আছে। আমরা তা ব্যবহার করার সময় বাঁকা হয়ে বসতাম অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতাম।

এ বিষয়টি ছিল খোলা মাঠে। কিন্তু বন্ধ ঘরের মধ্যে যদি হয়, তবে কিবলা সামনে বা পিছনে রাখাতে কোন দোষ নেই।

ইবনু ওমার (রাঃ) বর্ণিত হাদীছে বলা হয়েছে, তিনি বলেনঃ

ارْتَقَيْتُ فَوْقَ بَيْتِ حَفْصَةَ فَرَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقْضِي حَاجَتَهُ مُسْتَدْبِرَ الْقِبْلَةِ مُسْتَقْبِلَ الشَّأْمِ

“আমি একদা হাফসার বাড়ীর ছাদে উঠলাম। দেখলাম নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শামের দিকে মুখ করে কা’বার দিকে পিছন ফিরে তাঁর প্রয়োজন পূরণ করছেন।”

বিদ্বানদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন, ঘেরা স্থানে হোক বা খোলা স্থানে হোক কোন সময়ই কিবলা সম্মুখে বা পশ্চাতে রাখা যাবে না। তাদের দলীল হচ্ছে পূর্বেল্লিখিত আবু আইয়্যুব আনসারীর হাদীছ। আর ইবনু ওমরের হাদীছ সম্পর্কে তাদের জবাব হচ্ছেঃ

প্রথমতঃ ইবনু ওমারের হাদীছটি হচ্ছে নিষেধাজ্ঞার পূর্বের।

দ্বিতীয়তঃ নিষেধাজ্ঞাই প্রাধান্য পাবে। কেননা নিষেধাজ্ঞা আসল থেকে স্থানান্তরিত হয়েছে। আর আসল হচ্ছে জায়েয। তাই জায়েয থেকে স্থানান্তর হয়ে নাজায়েযের বিধানই গ্রহণযোগ্য।

তৃতীয়তঃ আবু আইয়্যুব বর্ণিত হাদীছ নবী (সাঃ)এর উক্তি। আর ইবনু ওমারের হাদীছ তাঁর কর্ম। রাসূল (সাঃ)এর মৌখিক নির্দেশের হাদীছ কর্মের হাদীছের সাথে সংঘর্ষশীল হতে পারে না। কেননা কর্মে বিশেষত্ব ও ভুলের সম্ভাবনা থাকে বা অন্য কোন ওযরেরও সম্ভাবনা থাকতে পারে।

এ মাসআলায় আমার মতে, প্রাধান্যযোগ্য কথা হচ্ছে,

খোলা ময়দানে ক্বিবলা সামনে বা পিছনে রেখে শৌচকার্য করা হারাম। চার দেয়ালে ঘেরা স্থানে কিবলাকে পিছনে রাখা জায়েয হবে সামনে রাখা জায়েয নয়। কেননা কিবলার সম্মুখবর্তী হওয়ার হাদীছ সংরক্ষিত। এখানে বিশেষত্বের কোন সম্ভাবনা নেই। কিন্তু পশ্চাতে রাখার নিষেধাজ্ঞাকে নবীজীর কর্ম দ্বারা বিশিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। তাছাড়া সম্মুখে রাখার চাইতে পশ্চাতে রাখার বিষয়টি সহজ, এই কারণে (আল্লাহ ভাল জানেন) ঘেরার মধ্যে থাকলে বিষয়টিকে হালকা করা হয়েছে। তবে সর্বক্ষেত্রে উত্তম হচ্ছে কিবলাকে সম্মুখে বা পশ্চাতে না রাখা।

(১৩২) বায়ু নির্গত হলে কি ইস্তেনজা করা আবশ্যক?


পশ্চাদদেশ থেকে বায়ু নির্গত হলে ওযু বিনষ্ট হবে। কেননা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ

لَا يَنْصَرِفْ حَتَّى يَسْمَعَ صَوْتًا أَوْ يَجِدَ رِيحًا

“নামায থেকে বের হবে না যে পর্যন্ত বায়ু বের হওয়ার আওয়াজ না শুনবে বা দুর্গন্ধ না পাবে।” কিন্তু এতে ইস্তেঞ্জা করা ওয়াজিব নয়। অর্থাৎ- লজ্জাস্থান ধৌত করা আবশ্যক নয়। কেননা এমন কিছু তো বের হয়নি যা ধৌত করার দরকার হবে।

তাই বায়ু নির্গত হলে ওযু নষ্ট হবে। এতে ওযু করে পবিত্র হওয়াই যথেষ্ট। অর্থাৎ-কুলি, নাক ঝাড়াসহ মুখমন্ডল ধৌত করবে, কনুইসহ দু’হাত ধৌত করবে, কানসহ মাথা মাসেহ করবে এবং টাখনু পর্যন্ত দু’পা ধৌত করবে।

এখানে একটি মাসআলার ব্যাপারে আমি মানুষকে সতর্ক করতে চাইঃ কিছু লোক নামাযের সময় হওয়ার পূর্বে পেশাব-পায়খানা করলে ইস্তেঞ্জা করে। তারপর নামাযের সময় উপস্থিত হলে ওযু করার পূর্বে ধারণা করে যে, পুনরায় তাদেরকে ইস্তেঞ্জা করতে হবে- পুনরায় লজ্জাস্থান ধৌত করতে হবে। কিন্তু এটা সঠিক নয়। কেননা কোন কিছু বের হওয়ার পর উক্ত স্থান ধৌত করে নিলেই তো তা পবিত্র হয়ে গেল। আর পবিত্র হয়ে গেলে পুনরায় তা ধৌত করার কোন অর্থ নেই। কেননা ইস্তেঞ্জা ও শর্ত মোতাবেক কুলুখের উদ্দেশ্য হচ্ছে পেশাব-পায়খানা বের হওয়ার স্থানকে পবিত্র করা। একবার পবিত্র হয়ে গেলে নতুন করে কোন কিছু বের না হলে আর তা নাপাক হবে না।

(১৩৩) কখন মেসওয়াক ব্যবহার করার গুরুত্ব বেশী? খুতবা চলাবস্থায় নামাযের অপেক্ষাকারীর মেসওয়াক করার বিধান কি?


উত্তরঃ নিম্ন লিখিত সময় মেসওয়াক করা গুরুত্বপূর্ণঃ নিদ্রা থেকে জাগ্রত হলে, গৃহে প্রবেশ করে, ওযুতে কুলি করার সময়, নামাযে দন্ডায়মান হওয়ার সময়।

নামাযের অপেক্ষাকারীর মেসওয়াক করাতে কোন অসুবিধা নেই। কিন্তু খুতবা চলাবস্থায় মেসওয়াক করবে না। কেননা এটা তাকে খুতবা শোনা থেকে ব্যস্ত করবে। কিন্তু তন্দ্রা কাটানোর প্রয়োজনে মেসওয়াক ব্যবহার করতে কোন দোষ নেই।

(১৩৪) ওযুর প্রারম্ভে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা কি ওয়াজিব?


ওযুর প্রারম্ভে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা ওয়াজিব নয়; বরং উহা সুন্নাত। কেননা এক্ষেত্রে বর্ণিত হাদীছ ছহীহ বলার ক্ষেত্রে অনেকের আপত্তি রয়েছে। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রহঃ) বলেন, ‘এক্ষেত্রে কোন হাদীছ প্রমাণিত হয়নি।’ বলার অপেক্ষা রাখে না এবং কারো অজানা নয় যে, ইমাম আহমাদ হাদীছ শাস্ত্রের ইমাম এবং হাফেয। তিনি যদি কোন ক্ষেত্রে বলেন, এ বিষয়ে কোন হাদীছ প্রমাণিত হয়নি, তবে সে ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রশ্ন থেকে যায়। অতএব যে বিষয়টি রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত নয় তা মানুষের উপর আবশ্যক করা উচিৎ নয়। এ জন্যে আমি মনে করি ওযুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা সুন্নাত। কিন্তু কারো নিকট যদি এ ক্ষেত্রে হাদীছ ছহীহ বলে প্রমাণিত হয়, তবে ‘বিসমিল্লাহ’ ওয়াজিব বলা তার জন্য আবশ্যক। কেননা হাদীছে বলা হয়েছে: لاَ وَضُوْءَ অর্থাৎ- ওযু বিশুদ্ধ হবে না। ওযু পূর্ণ হবে না এরূপ অর্থ করা ঠিক নয়।

(১৩৫) পুরুষ ও নারীর খাতনা করার বিধান কি?


খাতনার বিষয়টি মতভেদপূর্ণ। নিকটবর্তী মত হচ্ছে, পুরুষের খাতনা করা ওয়াজিব আর নারীর জন্য সুন্নাত। এই পার্থক্যের কারণ হচ্ছে, পুরুষের খাতনার মাঝে একটি ইবাদত বিশুদ্ধ হওয়ার শর্ত বিদ্যমান। আর তা হচ্ছে নামাযের পবিত্রতা। যদি খাতনা না করা হয়, তবে পেশাব বের হলে তার কিছু অংশ লিঙ্গের ঢাকনা চামড়ার ভিতরে জমা হয়ে থাকে, যা জ্বলনের কারণ হয় বা সেখানে ক্ষত (infection) হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এবং সর্বনিম্ন অসুবিধা হচ্ছে, যখনই সে নড়াচড়া করবে, তখনই পেশাবের বিন্দু বের হবে এবং তার শরীর ও কাপড় নাপাক করে দিবে।

আর নারীর খাতনা করার সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য ও উপকারিতা হচ্ছে, তার যৌন উত্তেজনা হরাস করা। আর এটা হচ্ছে তার একটি পূর্ণতা। এখানে খারাপ অতিরিক্ত কোন বিষয়কে বিদূরীত করা হচ্ছে না। যেমন পুরুষের বেলায় হয়ে থাকে।

বিদ্বানগণ খাতনার ক্ষেত্রে শর্ত করেছেন, খাতনা করলে যদি অসুস্থতা বা প্রাণনাশের আশংকা থাকে, তবে সে অবস্থায় খাতনা করা ওয়াজিব নয়। কেননা ওয়াজিব বিষয় সমূহ অপারগতা, ধ্বংসের আশংকা ও ক্ষতির কারণে রহিত হয়ে যায়।

পুরুষের খাতনা ওয়াজিব হওয়ার দলীলঃ

প্রথমতঃ এ মর্মে কয়েকটি হাদীছ বর্ণিত হয়েছে যে, ইসলাম গ্রহণ করলে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খাতনা করার আদেশ করেছেন। আর নবীজীর নির্দেশ মানেই তা পালন করা ওয়াজিব।

দ্বিতয়তঃ খাতনা হচ্ছে মুসলিম ও খৃষ্টান বা হিন্দুদের মাঝে পার্থক্যের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট। এমনকি মুসলমানগণ যুদ্ধ ক্ষেত্রে খাতনার মাধ্যমে নিজেদের নিহত ব্যক্তিদের খুঁজতেন। আর যা বৈশিষ্ট হিসেবে গণ্য তা হচ্ছে ওয়াজিব। কেননা মুসলমান ও কাফেরের মাঝে পার্থক্য থাকা ওয়াজিব। এই কারণেই নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাফেরদের সাথে সাদৃশাবলম্বন নিষিদ্ধ করেছেন। তিনি বলেনঃ

] مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ [

“যে ব্যক্তি কোন জাতির সদৃশ অবলম্বন করবে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে।”

তৃতীয়তঃ খাতনা হচ্ছে শরীর থেকে একটি জিনিস কর্তন করা। বিনা কারণে শরীরের কোন অংশ কর্তন করা হারাম। আর ওয়াজিব কারণ ছাড়া হারামকে হালাল করা বৈধ নয়। অতএব খাতনা করা ওয়াজিব।

চতুর্থতঃ খাতনা করলে অভিভাবকের পক্ষ থেকে ইয়াতীমের উপর ও তার সম্পদের উপর হস্তক্ষেপ করা হয়। কেননা এতে খাতনাকারীকে পারিশ্রমিক দেয়া আবশ্যক। বিষয়টি ওয়াজিব না হলে তার শরীরে ও সম্পদে হস্তক্ষেপ করা জায়েয হত না।

হাদীছের বাণী ও উল্লেখিত যুক্তি দ্বারা আমরা প্রমাণ করলাম যে, পুরুষের খাতনা করা  ওয়াজিব।

কিন্তু নারীর খাতনা ওয়াজিব বলার ক্ষেত্রে প্রশ্ন রয়েছে। যেমনটি ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। অতএব সঠিক মত হচ্ছে, পুরুষের খাতনা করা ওয়াজিব, নারীর নয়। একটি যঈফ হাদীছ রয়েছে। বলা হয়েছে,

]الْخِتَانُ سُنَّةٌ لِلرِّجَالِ مَكْرُمَةٌ لِلنِّسَاءِ[

“খাতনা পুরুষের জন্য সুন্নাত ও নারীর জন্য সম্মান।” হাদীছটি বিশুদ্ধ হলে সকল মতভেদের সমাধান হয়ে যেত।

(১৩৬) কৃত্রিম দাঁত থাকলে কুলি করার সময় কি উহা খুলে রাখা ওয়াজিব?


কারো মুখে যদি দাঁত বাধানো থাকে, তবে ওযুর সময় উহা খুলে রাখা আবশ্যক নয়। উহা হাতের আংটি বা ঘড়ি ব্যবহার করার মত। ওযুর সময় আংটি খোলা আবশ্যক নয়। বরং উত্তম হচ্ছে উহা নাড়িয়ে দেয়া, কিন্তু এই নাড়ানোও ওয়াজিব নয়। কেননা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আংটি পরিধান করতেন কিন্তু এমন কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না যে, তিনি ওযুর সময় উহা খুলে রাখতেন। অথচ মুখের মধ্যে বাঁধানো দাঁতের তুলনায় আংটিই পানি পৌঁছানোর ব্যাপারে বাধার কারণ হতে পারে। তাছাড়া কোন কোন মানুষের দাঁত অনেক কষ্টে বাধাই করতে হয়- যা যখন তখন খোলা ও লাগানো সম্ভব হয় না।

(১৩৭) কান মাসেহ করার জন্য কি নতুন করে পানি নিতে হবে?


কান মাসেহ করার জন্য হাতে নতুন পানি নেয়া আবশ্যক নয়। বিশুদ্ধ মতানুযায়ী মুস্তাহাবও নয়। কেননা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে ওযুর পদ্ধতি বর্ণনাকারী ছাহাবীদের মধ্যে কেউ এমন কথা উল্লেখ করেন নি যে, তিনি কান মাসেহ করার জন্য নতুন করে পানি নিতেন। অতএব মাথা মাসেহ করার পর হাতের অবশিষ্ট ভিজা দিয়েই কান মাসেহ করতে হবে।

(১৩৮) ওযুতে ধারাবাহিকতার অর্থ কি? ওযুতে মুওয়ালাত বা অবিচ্ছিন্নতা রক্ষা করার অর্থ কি? এদু’টি কথার বিধান কি?


ওযুর মধ্যে ধারাবাহিকতার অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ্‌ যে ধারাবাহিকতার সাথে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কথা উল্লেখ করেছেন সেভাবে ওযু করা। আল্লাহ প্রথমে মুখমন্ডল ধোয়ার কথা উল্লেখ করেছেন, তারপর দু’হাত, তারপর মাথা মাসেহ করা এবং শেষে পা ধৌত করা। কোন মানুষ যদি উল্টাপাল্টা করে যেমন প্রথমে হাত তারপর পা তারপর মুখমন্ডল ধৌত করে তারপর মাথা মাসেহ করে, তবে তার ওযু হবে না। এই কারণে মুখমন্ডল ধৌত করার পূর্বে দু’হাত কব্জি পর্যন্ত ধৌত করা ওয়াজিব নয় সুন্নাত। অতএব আল্লাহ যে সিরিয়ালে ওযুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কথা উল্লেখ করেছেন, তাকেই ধারাবাহিকতা বলে যা বজায় রাখা ওযুর অন্যতম ওয়াজিব। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হজ্জে গিয়ে সাঈ করতে গিয়ে প্রথমে ছাফা পর্বতে আরোহণ করে পাঠ করেন,

]إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ[

“নিশ্চয় ছাফা ও মারওয়া পর্বতদ্বয় আল্লাহর নিদর্শন সমূহের অন্তর্গত।” (সূরা বাক্বারা- ১৫৮) এবং তিনি বলেন, أَبْدَأُ بِمَا بَدَأَ اللَّهُ بِهِ  ‘আল্লাহ যেভাবে শুরু করেছেন সেভাবে শুরু করছি।” এখানে তিনি বর্ণনা করে দিলেন, কেন তিনি মাওয়াতে যাওয়ার পূর্বে প্রথমে ছাফা পর্বতে আরোহন করলেন। আর তা হচ্ছে, আল্লাহ যার কথা প্রথমে উল্লেখ করেছেন সেখান থেকেই প্রথমে শুরু করা।

আর মুওয়ালাত বা অবিচ্ছিন্নত রক্ষা করার অর্থ হচ্ছে ওযুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধোয়ার ক্ষেত্রে বিরতি গ্রহণের মাধ্যমে একটিকে অন্যটি থেকে পৃথক না করা। এর উদাহরণ হচ্ছে, মুখমন্ডল ধৌত করার পর পরই হাত না ধুয়ে দেরী করা। এ অবস্থায় তার মুওয়ালাত নষ্ট হয়ে গেল, তাই তাকে নতুন করে ওযু আরম্ভ করতে হবে। কেননা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দেখলেন জনৈক ব্যক্তি ওযু করেছে কিন্তু পায়ে তার নখ বরাবর একটি স্থান রয়েছে। তিনি তাকে বললেন, ارْجِعْ فَأَحْسِنْ وُضُوءَكَ “তুমি ফিরে গিয়ে সুন্দরভাবে ওযু করে আস।” আবু দাঊদের বর্ণনায় বলা হয়েছে, তিনি তাকে পুনরায় নতুন করে ওযু করার নির্দেশ দিলেন। এ থেকে বুঝা যায়, ওযুতে অবিচ্ছিন্নতা রক্ষা করা ওয়াজিব। কেননা ওযু একটি ইবাদত। আর একটি ইবাদতের বিভিন্ন অংশের মাঝে বিচ্ছিন্ন করলে অবিচ্ছিন্নতার উপর ভিত্তি করা চলে না।

অতএব বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে, ধারাবাহিকতা ও অবিচ্ছিন্নতা রক্ষা করা ওযুর দু’টি ফরয।

(১৩৯) ওযুর সময় কেউ যদি কোন একটি অঙ্গ ধৌত করতে ভুলে যায়, তবে তার বিধান কি?


ওযু করার সময় কেউ যদি একটি অঙ্গ ভুলে যায়, তবে যদি অচিরেই তা মনে পড়ে, তাহলে তা ধৌত করবে এবং তার পরবর্তী অঙ্গ ধৌত করবে। যেমন কেউ ওযু করল, কিন্তু বাম হাত ধৌত করতে ভুলে গেল এবং শুধু ডান হাত ধৌত করে মাথা ও কান মাসেহ্‌ করে ফেলল। দু’পা ধৌত করার পর খেয়াল হল তার বাম হাত ধৌত করা হয়নি। তাকে আমরা বলব, আপনি বাম হাত ধৌত করুন, মাথা ও কান মাসেহ্‌ করুন এবং দু’পা ধৌত করুন। এই অঙ্গগুলো পুনরায় ধৌত করা এজন্যই ওয়াজিব যে, ওযুতে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা আবশ্যক। কেননা ওযুর অঙ্গগুলো যেরূপ ধারাবাহিক ভাবে আল্লাহ্‌ উল্লেখ করেছেন, সেভাবেই ধারবাহিকতা বজায় রেখে তা করতে হবে। আল্লাহ্‌ বলেনঃ

]فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُوا بِرُءُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ[

“তোমরা মুখমন্ডল ধৌত কর, দু’হাত কনুই পর্যন্ত ধৌত কর, মাথা মাসেহ্‌ কর এবং দু’পা টাখনু পর্যন্ত ধৌত কর।” (সূরা মায়েদা- ৬)

কিন্তু যদি দীর্ঘ সময় পর স্মরণ হয়, তবে পুনরায় ওযু করবে। যেমন কেউ ওযু করার সময় বাম হাত ধৌত করতে ভুলে গেল এবং এভাবেই ওযু শেষ করে ফেলল। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর স্মরণ হল সে তো বাম হাত ধৌত করেনি। তখন তার উপর আবশ্যক হচ্ছে পুনরায় প্রথম থেকে ওযু করা। কেননা ওযুর অঙ্গ সমূহ ধৌত করার ক্ষেত্রে পরম্পরা রক্ষা করা আবশ্যক। বরং ওযু বিশুদ্ধ হওয়ার অন্যতম শর্ত।

জেনে রাখা উচিৎ, যদি সে সন্দেহে থাকে অর্থাৎ- ওযু শেষ হওয়ার পর সন্দেহ হল, সে ডান হাত বা বাম হাত ধৌত করেছে কি না? কুলি করেছে কি না? নাক ঝেড়েছে কি না? তখন এ সন্দেহের প্রতি গুরুত্বারোপ করবে না। বরং সামনে অগ্রসর হবে এবং নামায আদায় করবে। কেননা ইবাদত শেষ হওয়ার পর কোন সন্দেহ দেখা দিলে সে দিকে ভ্রুক্ষেপ করবে না, তার কোন মূল্য নেই। এ ধরণের সন্দেহের প্রতি গুরুত্বারোপ করলে মানুষের সামনে শয়তানের ওয়াস্‌ওয়াসার দরজা উম্মুক্ত করা হয়। তখন প্রত্যেক মানুষ নিজ নিজ ইবাদতে সন্দেহ করা শুরু করবে। অতএব আল্লাহর রহমতের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে, ইবাদত সম্পন্ন করার পর কোন সন্দেহ দেখা দিলে মানুষ সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করবে না, তার প্রতি গুরুত্বারোপ করবে না। অবশ্য সন্দেহ যদি দৃঢ়তায় পরিণত হয়, তবে তার ব্যবস্থা নেয়া ওয়াজিব।

(১৪০) ওযু চলছে এমন সময় পানি বন্ধ হয়ে গেল। পানি যখন ফিরে এল তখন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ শুকিয়ে গেছে। এখন ওযু কি নতুন করে করতে হবে নাকি বাকী অঙ্গ সমূহ ধৌত করলেই চলবে?


উত্তরঃ মাসআলাটির ভিত্তি হচ্ছে, ওযুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধোয়ার ক্ষেত্রে পরম্পরা রক্ষা করা, ওযু বিশুদ্ধ হওয়ার শর্ত কি না? এতে বিদ্বানদের মধ্যে দু’টি মত পাওয়া যায়।

একটি মত হচ্ছেঃ মুওয়ালাত বা ওযুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সমূহ অবিচ্ছিন্নতা ধৌত করা অর্থাৎ- একটি না শুকাতে অপর অঙ্গ ধৌত করা ওযু বিশুদ্ধ হওয়ার অন্যতম শর্ত। একটি অঙ্গ ধৌত করার পর অপর অঙ্গ ধোয়ার পূর্বে যদি বিচ্ছিন্নতা হয়ে যায়, তবে ওযু বিশুদ্ধ হবে না। এটাই সঠিক মত। কেননা ওযু পূর্ণাঙ্গ একটি ইবাদত। এর একটি অংশের সাথে অপর অংশের সম্পর্ক থাকা জরূরী। অঙ্গ সমূহ পরস্পর ধৌত করার অর্থ কি? এর অর্থ হচ্ছে, এক অঙ্গ ধোয়ার পর সাধারণভাবে এতটা সময় বিরতি গ্রহণ না করা যাতে পরের অঙ্গ ধোয়ার পূর্বে তা শুকিয়ে যায়। কিন্তু এই বিরতি গ্রহণ যদি পবিত্রতা অর্জনের সাথে সম্পর্কিত হয় তবে কোন অসুবিধা নেই। যেমন ওযু শুরু করেছে এমন সময় লক্ষ্য করে কোন এক অঙ্গে পেইন্ট বা এ জাতীয় কোন বস্ত লেগে আছে, তখন তা অপসারণ করতে গিয়ে যদি দীর্ঘ সময়ের দরকার পড়ে এবং আগের অঙ্গ শুস্ক হয়ে যায়, তাতে কোন অসুবিধা নেই, ওযু চালিয়ে যাবে, নতুন করে আবার শুরু করতে হবে না। কেননা এই দীর্ঘতা তো পবিত্রতার কাজের সাথেই সম্পর্কিত। তাছাড়া এখানে তো ওযুর কাজে বিরতি গ্রহণ করা হয়নি।

কিন্তু পানির জন্য যদি বিরতি হয়, যেমনটি প্রশ্নে উল্লেখ করা হয়েছে, তবে বিদ্বানদের মধ্যে কেউ বলেন, এ অবস্থায় পরস্পর ধৌত করার শর্ত ক্ষুন্ন হল। অতএব তাকে পুনরায় নতুন করে ওযু শুরু করতে হবে। আবার কেউ বলেন, নতুন করে ওযু শুরু করার দরকার নেই। কেননা এখানে তো তার কোন এখতিয়ার নেই। সে তো ওযু পূর্ণ করারই অপেক্ষা করছে। তাই পানি আসলে ওযুর বাকী কাজ পূর্ণ করবে- যদিও ধৌতকৃত অঙ্গ শুকিয়ে যায়।

যে সমস্ত বিদ্বান পরস্পর ধৌত করা ওয়াজিব বলেন, তাদের কথা হচ্ছেঃ অঙ্গ শুস্ক হওয়া না হওয়ার সাথে পরস্পর ধৌত করার সম্পর্ক নেই। এর সম্পর্ক হচ্ছে সামাজিক পরিচিতির সাথে। সামাজিকভাবে যদি বলা হয় এখানে ওযুর মাঝে বিচ্ছিন্ন হল বা বিরতি নেয়া হল, তবে তাতে পরস্পরতা নষ্ট হবে। যেমন পানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর যারা পানির অপেক্ষা করে তারা তো পানি নিয়ে আসার কাজে ব্যস্ত, সাধারণভাবে মানুষ এটাকে ওযুর প্রথম অংশ ও দ্বিতীয় অংশের মাঝে বিচ্ছিন্নতা বলে না। অতএব তারা পানি পাওয়ার পর ওযুর বাকী কাজ পূর্ণ করবে। আর এটাই উত্তম কথা। তবে যদি উক্ত বিরতি খুব বেশী দীর্ঘ হয়ে যায়, তবে নতুন করে শুরু করে নেয়াটাই ভাল। কেননা কাজটা খুবই সহজ।

পেজ ন্যাভিগেশন

সর্বমোটঃ  64 টি বিষয় দেখান হচ্ছে।