• ৫৬৪০৩ টি সর্বমোট হাদিস আছেঃ
  • ৫৭৫৬ টি প্রশ্নোত্তর ও ফিকাহঃ

 

 

 

 


(৪০২) কখন এবং কিভাবে মুসাফির নামায ও রোযা আদায় করবে?


 মুসাফির নিজ শহর থেকে বের হওয়ার পর থেকে নিয়ে প্রত্যাবর্তন করা পর্যন্ত দু’দু রাকাত নামায আদায় করবে। আয়েশা (রাঃ) বলেন,

أَوَّلَ مَا فُرِضَتِ الصَّلَاةُ رَكْعَتَيْنِ فَأُقِرَّتْ صَلَاةُ السَّفَرِ وَأُتِمَّتْ صَلَاةُ الْحَضَرِ

“সর্বপ্রথম যে নামায ফরয করা হয়েছিল তা হচ্ছে দু’রাকাত। সফরের নামাযকে ঐভাবেই রাখা হয়েছে এবং গৃহে অবস্থানের সময় নামাযকে পূর্ণ (চার রাকাত) করা হয়েছে।” অন্য বর্ণনায় বলা হয়েছে, “গৃহে অবস্থানের সময় নামায বৃদ্ধি করা হয়েছে।” আনাস বিন মালেক (রাঃ) বলেন, আমরা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর সাথে মদ্বীনা থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। তিনি মদ্বীনা ফিরে আসা পর্যন্ত দু’দু রাকাত করে নামায আদায় করলেন।

কিন্তু মুসাফির যদি স্থানীয় ইমামের সাথে নামায আদায় করে তবে পূর্ণ চার রাকাতই পড়বে। চাই নামাযের প্রথম থেকে ইমামের সাথে থাকুক বা পরে এসে অংশ গ্রহণ করুক। কেননা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর সাধারণ বাণী একথার দলীল।

إِذَا سَمِعْتُمُ الْإِقَامَةَ فَامْشُوا إِلَى الصَّلَاةِ وَعَلَيْكُمْ بِالسَّكِينَةِ وَالْوَقَارِ وَلَا تُسْرِعُوا فَمَا أَدْرَكْتُمْ فَصَلُّوا وَمَا فَاتَكُمْ فَأَتِمُّوا

“যখন নামাযের ইকামত প্রদান করা হয় তখন হেঁটে হেঁটে ধীর-স্থির এবং প্রশান্তির সাথে নামাযের দিকে আগমণ করবে। তাড়াহুড়া করবে না। অতঃপর নামাযের যতটুকু অংশ পাবে আদায় করবে। আর যা ছুটে যাবে তা পরে পূর্ণ করে নিবে।”

এ হাদীছটি স্থানীয় ইমামের পিছনে নামায আদায়কারী মুসাফিরদেরও শামিল করে। ইবনু আব্বাস (রাঃ)কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এটা কি কথা মুসাফির একাকী নামায পড়লে দু’রাকাত পড়বে আর স্থানীয় ইমামের পিছনে পড়লে চার রাকাত পড়বে? তিনি বললেন, এটা সুন্নাত।

মুসাফিরের জন্য জামাআতের নামায রহিত নয়। কেননা আল্লাহ্‌ বলেনঃ

]وَإِذَا كُنتَ فِيهِمْ فَأَقَمْتَ لَهُمْ الصَّلَاةَ فَلْتَقُمْ طَائِفَةٌ مِنْهُمْ مَعَكَ وَلْيَأْخُذُوا أَسْلِحَتَهُمْ فَإِذَا سَجَدُوا فَلْيَكُونُوا مِنْ وَرَائِكُمْ وَلْتَأْتِ طَائِفَةٌ أُخْرَى لَمْ يُصَلُّوا فَلْيُصَلُّوا مَعَكَ[

“আর যখন আপনি তাদের সাথে থাকেন আর তাদেরকে জামাআতের সাথে নামায পড়ান, তবে তা এইভাবে হবে যে, তাদের মধ্যে থেকে একদল আপনার সাথে নামাযে দাঁড়াবে এবং নিজেদের অস্ত্র-শস্ত্র সাথে রাখবে। অনন্তর যখন তারা সিজদা করবে (এক রাকাআত পূর্ণ করবে), তখন তারা আপনাদের পিছনে চলে যাবে এবং অন্য দল যারা এখনও নামায পড়েনি তারা আসবে এবং আপনার সাথে নামায পড়ে নিবে।” (সূরা নিসাঃ ১০২)

অতএব মুসাফির যদি নিজ শহর ছেড়ে অন্য শহরে অবস্থান করে, তবে আযান শুনলেই মসজিদে জামাআতের নামাযে উপস্থিত হবে। তবে যদি মসজিদ থেকে বেশী দূরে থাকে বা সফর সঙ্গীদের ক্ষতির আশংকা করে তবে মসজিদে না গেলেও চলবে। কেননা সাধারণ দলীল সমূহ একথাই প্রমাণ করে যে, আযান বা এক্বামত শুনলেই জামাআতে উপস্থিত হওয়া ওয়াজিব।

নফল বা সুন্নাত নামাযের ক্ষেত্রেঃ মুসাফির যোহর, মাগরিব ও এশার সুন্নাত ছাড়া সবধরণের নফল ও সুন্নাত আদায় করবে। রাতের নফল (তাহাজ্জুদ), বিতর, ফজরের সুন্নাত, চাশত, তাহিয়্যাতুল ওযু, তাহিয়্যাতুল মসজিদ, সফর থেকে ফেরত এসে দু’রাকাত নামায আদায় করবে।

দু’নামায একত্রিত করার বিধান হচ্ছেঃ সফর যদি চলমান থাকে তবে উত্তম হচ্ছে দু’নামাযকে একত্রিত করা। যোহর ও আছর এবং মাগরিব ও এশা একত্রিত আদায় করবে। প্রথম নামাযের সময়ই দু’নামায একত্রিত আদায় করবে অথবা দ্বিতীয় নামাযের সময় দু’নামাযকে একত্রিত করবে। যেভাবে তার জন্য সুবিধা হয় সেভাবে করবে।

কিন্তু সফরে গিয়ে কোন জায়গায় যদি অবস্থান করে তবে উত্তম হচ্ছে দু’নামাযকে একত্রিত না করা। একত্রিত করলেও কোন অসুবিধা নেই। কেননা উভয়টিই রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে প্রমাণিত আছে।

ছিয়ামের ক্ষেত্রে মুসাফিরের জন্য উত্তম হচ্ছে ছিয়াম পালন করা। ছিয়াম ভঙ্গ করলেও কোন অসুবিধা নেই। পরে উক্ত দিনগুলোর কাযা আদায় করে নিবে। তবে ছিয়াম ভঙ্গ করা যদি বেশী আরাম দায়ক হয় তাহলে ছিয়াম ভঙ্গ করাই উত্তম। কেননা আল্লাহ্‌ বান্দাকে যে ছুটি দিয়েছেন তা গ্রহণ করা তিনি পসন্দ করেন। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামীনের জন্য।

(৪০৩) সফর অবস্থায় কষ্ট হলে রোযা রাখার বিধান কি?


সফর অবস্থায় যদি এমন কষ্ট হয় যা সহ্য করা সম্ভব, তবে সে সময় রোযা রাখা মাকরূহ। কেননা একদা সফরে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দেখলেন জনৈক ব্যক্তির পাশে লোকজন ভীড় করছে এবং তাকে ছাঁয়া করছে। তিনি বললেন, এর কি হয়েছে? তারা বলল, লোকটি রোযাদার। তখন তিনি বললেন, لَيْسَ مِنَ الْبِرِّ الصَّوْمُ فِي السَّفَرِ “সফর অবস্থায় ছিয়াম পালন করা কোন পূণ্যের কাজ নয়।”

কিন্তু সফরে রোযা রাখা যদি অধিক কষ্টদায়ক হয় তবে ওয়াজিব হচ্ছে রোযা ভঙ্গ করা। কেননা সফর অবস্থায় লোকেরা যখন নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর নিকট অভিযোগ করল যে তাদের কষ্ট হচ্ছে তখন তিনি রোযা ভঙ্গ করলেন। অতঃপর বলা হল, কিছু লোক এখনও রোযা রেখেছে। তিনি বললেন, أُولَئِكَ الْعُصَاةُ أُولَئِكَ الْعُصَاةُ  “ওরা নাফরমান, ওরা নাফরমান।”

কিন্তু রোযা রাখতে যার কোন কষ্ট হবে না, তার জন্য উত্তম হচ্ছে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর অনুসরণ করে রোযা পালন করা। কেননা সফর অবস্থায় তিনি রোযা রাখতেন। আবু দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,

خَرَجْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي شَهْرِ رَمَضَانَ فِي حَرٍّ شَدِيدٍ وَمَا فِينَا صَائِمٌ إِلَّا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَعَبْدُ اللَّهِ ابْنُ رَوَاحَةَ

“একদা রামাযান মাসে কঠিন গরমের সময় আমরা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর সাথে সফরে ছিলাম। তখন আমাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও আবদুল্লাহ্‌ বিন রাওয়াহা ছাড়া আর কেউ রোযা রাখেন নি।”

(৪০৪) আধুনিক যুগের যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত ও আরাম দায়ক হওয়ার কারণে সফর অবস্থায় রোযা রাখা মুসাফিরের জন্য কষ্টকর নয়। এ অবস্থায় রোযা রাখার বিধান কি?


মুসাফির রোযা রাখা ও ভঙ্গ করার ব্যাপারে ইচ্ছাধীন। আল্লাহ্‌ বলেন,

]وَمَنْ كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمْ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمْ الْعُسْرَ[

“আর যে লোক অসুস্থ অথবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে, সে অন্য দিনে গণনা পূরণ করে নিবে।” (সূরা বাক্বারাঃ ১৮৫) ছাহাবায়ে কেরাম নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর সাথে সফরে থাকলে কেউ রোযা রাখতেন কেউ রোযা ভঙ্গ করতেন। কোন রোযা ভঙ্গকারী অপর রোযাদারকে দোষারোপ করতেন না, রোযাদারও রোযা ভঙ্গকারীকে দোষারোপ করতেন না। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)ও সফর অবস্থায় রোযা রেখেছেন। আবু দারদা (রাঃ) বলেন, “একদা রামাযান মাসে কঠিন গরমের সময় আমরা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর সাথে সফরে ছিলাম। তখন আমাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও আবদুল্লাহ্‌ বিন রাওয়াহা ছাড়া আর কেউ রোযা রাখে নি।”

মুসাফিরের জন্য মূলনীতি হচ্ছে, সে রোযা রাখা ও ভঙ্গ করার ব্যাপারে ইচ্ছাধীন। কিন্তু কষ্ট না হলে রোযা রাখাই উত্তম। কেননা এতে তিনটি উপকারীতা রয়েছেঃ

প্রথমতঃ রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর অনুসরণ।

দ্বিতীয়তঃ রোযা রাখতে সহজতা। কেননা সমস্ত মানুষ যখন রোযা রাখে তখন সবার সাথে রোযা রাখা অনেক সহজ।

তৃতীয়তঃ দ্রুত নিজেকে যিম্মামুক্ত করা।

কিন্তু কষ্টকর হলে রোযা রাখবে না। এ অবস্থায় রোযা রাখা পূণ্যেরও কাজ নয়। কেননা এক সফরে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দেখলেন জনৈক ব্যক্তির পাশে লোকজন ভীড় করছে এবং তাকে ছাঁয়া দিচ্ছে। তিনি বললেন, এর কি হয়েছে? তারা বলল, লোকটি রোযাদার। তখন তিনি বললেন, لَيْسَ مِنَ الْبِرِّ الصَّوْمُ فِي السَّفَرِ “সফর অবস্থায় ছিয়াম পালন করা কোন পূণ্যের কাজ নয়।”

এভিত্তিতে আমরা বলব, বর্তমান যুগে সাধারণতঃ সফরে তেমন কোন কষ্ট হয় না। তাই ছিয়াম পালন করাই উত্তম।

(৪০৫) রোযা অবস্থায় মুসাফির যদি মক্কায় পৌঁছে। তবে ওমরা আদায় করতে শক্তি পাওয়ার জন্য রোযা ভঙ্গ করা জায়েয হবে কি?


নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কা বিজয়ের সময় রামাযান মাসের বিশ তারিখে মক্কায় প্রবেশ করেন। সে সময় তিনি রোযা ভঙ্গ অবস্থায় ছিলেন। সেখানে দু’দু রাকআত করে নামায কসর আদায় করেছেন। আর মক্কাবাসীদের বলেছেন, “হে মক্কাবাসীগণ! তোমরা নামায পূর্ণ করে নাও। কেননা আমরা মুসাফির।” ছহীহ্‌ বুখারীতে একথাও প্রমাণিত হয়েছে, তিনি (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাসের অবশিষ্ট দিনগুলো রোযা ভঙ্গ অবস্থাতেই অতিবাহিত করেছেন। কেননা তিনি ছিলেন মুসাফির।

তাই ওমরাকারী মক্কা পৌঁছলেই তার সফর শেষ হয়ে যায় না। যদি রোযা ভঙ্গ অবস্থায় মক্কা পৌঁছে থাকে, তবে দিনের বাকী অংশ পানাহার ত্যাগ করা আবশ্যক নয়। কিন্তু বর্তমান যুগে যেহেতু সফর আরাম দায়ক তাই রোযা রাখাও তেমন কষ্টকর নয়। সেহেতু কেউ যদি রোযা রেখে মক্কায় পৌঁছে অত্যধিক ক্লান্তি অনুভব করে, তখন চিন্তা করে আমি কি রোযা পূর্ণ করে ইফতারের পর ওমরার কাজ শুরু করবো? নাকি রোযা ভঙ্গ করব এবং সর্বপ্রথম ওমরা আদায় করে নিব?

এ অবস্থায় আমরা তাকে বলব, আপনার জন্য উত্তম হচ্ছে, সুস্থাবস্থায় ওমরা পালন করার জন্য রোযা ভঙ্গ করা। কেননা হজ্জ-ওমরা আদায়কারীর জন্য সুন্নাত হচ্ছে, উক্ত উদ্দেশ্যে মক্কা আগমণ করলে, সেখানে পৌঁছার সাথে সাথেই হজ্জ-ওমরার কাজে আত্মনিয়োগ করা। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইহরাম অবস্থায় মক্কা আগমণ করলে দ্রুত মসজিদে হারামে গমণ করতেন। এমনকি আরোহীকে মসজিদের নিকটবর্তী স্থানে বসাতেন।

অতএব ওমরাকারীর জন্য উত্তম হচ্ছে, দিনের বেলায় কর্মশক্তি পাওয়ার উদ্দেশ্যে রোযা ভঙ্গ করে ওমরা পালন করা। রাত পর্যন্ত অপেক্ষা না করা।

ছহীহ্‌ সূত্রে প্রমাণিত হয়েছে, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কা বিজয়ের জন্য যখন সফরে ছিলেন এবং তিনি রোযা অবস্থায় ছিলেন, তখন কতিপয় লোক এসে অভিযোগ করল, রোযা রাখতে তাদের খুব কষ্ট হচ্ছে। আপনি কি করছেন এটা দেখার অপেক্ষায় আছে তারা। তখন সময়টি ছিল আছরের পর। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পানি চাইলেন এবং পান করলেন। লোকেরা সবাই দেখল। অতএব নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সফর অবস্থায় দিনের শেষ প্রহরে রোযা ভঙ্গ করলেন। একাজ যে জায়েয একথা প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে তিনি এরূপ করেছেন।

উল্লেখ্য যে, সফরে কষ্ট স্বীকার করে কিছু লোক যে ছিয়াম পালন করতেই থাকে নিঃসন্দেহে তা সুন্নাহ্‌ বিরোধী কাজ। তার ব্যাপারেই নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ لَيْسَ مِنَ الْبِرِّ الصَّوْمُ فِي السَّفَرِ “সফর অবস্থায় ছিয়াম পালন করা কোন পূণ্যের কাজ নয়।”

(৪০৬) সন্তানকে দুগ্ধদানকারীনী কি রোযা ভঙ্গ করতে পারবে? ভঙ্গ করলে কিভাবে কাযা আদায় করবে? নাকি রোযার বিনিময়ে খাদ্য দান করবে?


দুগ্ধদানকারীনী রোযা রাখার কারণে যদি সন্তানের জীবনের আশংকা করে অর্থাৎ রোযা রাখলে স্তনে দুধ কমে যাবে ফলে শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তবে মায়ের রোযা ভঙ্গ করা জায়েয। কিন্তু পরবর্তীতে তার কাযা আদায় করে নিবে। কেননা এ অবস্থায় সে অসুস্থ ব্যক্তির অনুরূপ। যার সম্পর্কে আল্লাহ্‌ বলেন,

]وَمَنْ كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ[

“আর যে লোক অসুস্থ অথবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে, সে অন্য দিনে গণনা পূরণ করে নিবে।” (সূরা বাক্বারাঃ ১৮৫)

অতএব রোযা রাখার ব্যাপারে যখনই বাধা দূর হবে তখনই কাযা আদায় করবে। চাই তা শীতকালে অপেক্ষাকৃত ছোট দিনে হোক অথবা সম্ভব না হলে পরবর্তী বছর হোক। কিন্তু ফিদ্‌ইয়া স্বরূপ মিসকীন খাওয়ানো জায়েয হবে না। তবে ওযর যদি চলমান থাকে অর্থাৎ সার্বক্ষণিক রোযা রাখায় বাধা দেখা যায় যা বাধা দূর হওয়ার সম্ভবনা না থাকে, তখন প্রতিটি রোযার বদলে একজন করে মিসকীনকে খাওয়াবে।

(৪০৭) ক্ষুধা-পিপাসা ও অতিরিক্ত ক্লান্তির সাথে রোযা পালন করলে রোযার বিশুদ্ধতায় কি কোন প্রভাব পড়বে?


 ক্ষুধা-পিপাসা ও অতিরিক্ত ক্লান্তির সাথে রোযা পালন করলে রোযার বিশুদ্ধতায় এর কোন প্রভাব পড়বে না। বরং এতে অতিরিক্ত ছওয়াব পাওয়া যাবে। কেননা রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আয়েশা (রাঃ)কে বলেছিলেন, “তোমার ক্লান্তি ও কষ্ট অনুযায়ী তুমি ছওয়াব পাবে।” অতএব আল্লাহ্‌র আনুগত্যের ক্ষেত্রে মানুষের ক্লান্তি যত বেশী হবে ততই তার প্রতিদান বেশী হবে। তবে রোযার ক্লান্তি দূর করার জন্য মাথায় ঠান্ডা পানি ঢালা বা ঠান্ডা শীতল স্থানে আরাম গ্রহণ করা যেতে পারে।

(৪০৮) রামাযানের প্রত্যেক দিনের জন্য আলাদা আলাদাভাবে কি নিয়ত করা আবশ্যক? নাকি পূর্ণ মাসের নিয়ত একবার করে নিলেই হবে?


রামাযানের প্রথমে পূর্ণ মাসের জন্য একবার নিয়ত করলেই যথেষ্ট হবে। কেননা রোযাদার যদি প্রতিদিনের জন্য রাতে নিয়ত না করে, তবে তা রামাযানের প্রথমের নিয়তের শামিল হয়ে তার ছিয়াম বিশুদ্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু সফর, অসুস্থতা প্রভৃতি দ্বারা যদি মাসের মধ্যখানে বিচ্ছিন্নতা আসে, তবে নতুন করে আবার নিয়ত আবশ্যক। কেননা মাসের প্রথমে সে যে ছিয়ামের নিয়ত করেছিল তা সফর বা অসুস্থতা প্রভৃতির মাধ্যমে ভঙ্গ করে ফেলেছে।

(৪০৯) রোযা ভঙ্গের জন্য অন্তরে দৃঢ় নিয়ত করলেই কি রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে?


একথা সর্বজন বিদিত যে, ছিয়াম হচ্ছে নিয়ত এবং পরিত্যাগের সমষ্টির নাম। অর্থাৎ রোযা বিনষ্টকারী যাবতীয় বস্ত পরিত্যাগ করে রোযাদার রোযার দ্বারা আল্লাহ্‌র সন্তষ্টি ও নৈকট্য লাভের নিয়ত করবে। কিন্তু সত্যিই যদি এটাকে সে ভঙ্গ করার দৃঢ় সংকল্প করে ফেলে তবে তার ছিয়াম বাতিল হয়ে যাবে। আর এটা রামাযান মাসে হলে দিনের অবশিষ্ট অংশ তাকে পানাহার ছাড়াই কাটাতে হবে। কেননা বিনা ওযরে যে ব্যক্তি রামাযানে ছিয়াম ভঙ্গ করবে তাকে যেমন দিনের বাকী অংশ ছিয়াম অবস্থাতেই কাটাতে হবে, অনুরূপভাবে তার কাযাও আদায় করতে হবে।

কিন্তু যদি দৃঢ় সংকল্প না করে বরং দ্বিধা-দ্বন্দে থাকে, তবে তার ব্যাপারে বিদ্বানদের মতবিরোধ রয়েছে।

কেউ বলেছেন, তার ছিয়াম বাতিল হয়ে যাবে। কেননা দ্বিধা-দ্বন্দ দৃঢ়তার বিপরীত।

কেউ বলেছেন, বাতিল হবে না। কেননা আসল হচ্ছে, নিয়তের দৃঢ়তা অবশিষ্ট থাকা, যে পর্যন্ত তা আরেকটি দৃঢ়তা দ্বারা বিচ্ছিন্ন না করবে। আমার দৃষ্টিতে এমতই বিশুদ্ধ। (আল্লাহ্‌ই অধিক জ্ঞান রাখেন)

(৪১০) রোজাদার ভুলক্রমে পানাহার করলে তার ছিয়ামের বিধান কি? কেউ এটা দেখলে তার করণীয় কি?


রামাযানের রোযা রেখে কেউ যদি ভুলক্রমে খানা-পিনা করে তবে তার ছিয়াম বিশুদ্ধ। তবে স্মরণ হওয়ার সাথে সাথে বিরত হওয়া ওয়াজিব। এমনকি খাদ্য বা পানীয় যদি মুখের মধ্যে থাকে এবং স্মরণ হয়, তবে তা ফেলে দেয়া ওয়াজিব। ছিয়াম বিশুদ্ধ হওয়ার দলীল হচ্ছে, আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 

مَنْ نَسِيَ وَهُوَ صَائِمٌ فَأَكَلَ أَوْ شَرِبَ فَلْيُتِمَّ صَوْمَهُ فَإِنَّمَا أَطْعَمَهُ اللَّهُ وَسَقَاهُ

“যে ব্যক্তি রোযা রেখে ভুলক্রমে পানাহার করে, সে যেন তার ছিয়াম পূর্ণ করে। কেননা আল্লাহ্‌ই তাকে খাইয়েছেন ও পান করিয়েছেন।” তাছাড়া ভুলক্রমে নিষিদ্ধ কাজ করে ফেললে তাকে পাকড়াও করা হবে না। আল্লাহ্‌ বলেন, رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا “হে আমাদের পালনকর্তা আমরা যদি ভুলে যাই বা ভুলক্রমে কোন কিছু করে ফেলি, তবে আমাদের পাকড়াও করবেন না।” (সূরা বাক্বারাঃ ২৮৬) আল্লাহ্‌ বলেন, আমি তাই করলাম।

কেউ যদি দেখতে পায় যে ভুলক্রমে কোন মানুষ খানা-পিনা করছে, তবে তার উপর ওয়াজিব হচ্ছে, তাকে বাঁধা দেয়া এবং ছিয়ামের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া। কেননা ইহা গর্হিত কাজে বাধা দেয়ার অন্তর্গত। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ

“যে ব্যক্তি কোন গর্হিত কাজ হতে দেখবে, সে যেন হাত দ্বারা বাধা প্রদান করে, যদি সম্ভব না হয় তবে যবান দ্বারা বাধা দিবে, যদি তাও সম্ভব না হয় তবে অন্তর দ্বারা তা ঘৃণা করবে।” সন্দেহ নেই রোযা রেখে খানা-পিনা করা একটি গর্হিত কাজ। কিন্তু ভুল ক্রমে হওয়ার কারণে তাকে ক্ষমা করা হবে। কিন্তু যে ব্যক্তি তা দেখবে তার জন্য তাতে বাধা না দেয়ার কোন ওযর থাকতে পারে না।

(৪১১) রোযা রেখে সুরমা ব্যবহার করার বিধান কি?


রোযাদারের জন্য সুরমা ব্যবহার করায় কোন অসুবিধা নেই। অনুরূপভাবে চোখে বা কানে ঔষুধ (ড্রপ) ব্যবহার করতেও কোন অসুবিধা নেই, যদিও এতে গলায় ড্রপের স্বাদ অনুভব করে। এতে রোযা ভঙ্গ হবে না। কেননা ইহা খাদ্য বা পানীয় নয় বা খানা-পিনার বিকল্প হিসেবেও ব্যবহৃত নয়। একথার দলীল হচ্ছে, ছিয়ামের ক্ষেত্রে যে নিষেধাজ্ঞা তা হচ্ছে খানা-পিনা করা। সুতরাং যা খানা-পিনার অন্তর্ভুক্ত নয় তা এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যে গণ্য হবে না। ইমাম ইবনু তাইমিয়া (রহঃ) একথাই বলেছেন। আর এটাই বিশুদ্ধ মত। কিন্তু যদি নাকে ড্রপ ব্যবহার করে এবং তা পেটে পৌঁছে, তবে রোযা ভঙ্গ হবে- যদি রোযা ভঙ্গের উদ্দেশ্য করে থাকে। কেননা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

وَبَالِغْ فِي الِاسْتِنْشَاقِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ صَائِمًا

“ছিয়াম অবস্থায় না থাকলে ওযুর ক্ষেত্রে নাকে অতিরিক্ত পানি নিবে।”

পেজ ন্যাভিগেশন

সর্বমোটঃ  57 টি বিষয় দেখান হচ্ছে।