• ৫৬৪০৩ টি সর্বমোট হাদিস আছেঃ
  • ৫৭৫৬ টি প্রশ্নোত্তর ও ফিকাহঃ

 

 

 

 


কবরে আলোকসজ্জা করা


কবরে আলোকসজ্জা করা :

কবরে বাতি দেওয়া নিষেধের হাদীছটি যঈফ।[122] তবে এটি কয়েকটি কারণে নিকৃষ্টতম বিদ‘আত। (১) এটি নবাবিষ্কৃত বিষয়, যা ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল না
(২) এটি অগ্নি উপাসক মজূসীদের অনুকরণ
(৩) এতে স্রেফ মালের অপচয় হয়, যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ
(৪) একে আল্লাহর নৈকট্য হাছিলের মাধ্যম বলে ধারণা করা হয়।[123] যা ভিত্তিহীন ও ইসলাম বিরোধী আক্বীদা। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, كُلُّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ وَكُلُّ ضَلاَلَةٍ فِى النَّارِ ‘প্রত্যেক বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা এবং প্রত্যেক ভ্রষ্টতার পরিণাম জাহান্নাম’। [124] আল্লাহ বলেন,

قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُمْ بِالْأَخْسَرِيْنَ أَعْمَالاً، اَلَّذِيْنَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُوْنَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُوْنَ صُنْعًا-

‘আপনি বলে দিন, আমি কি তোমাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত আমলকারীদের সম্পর্কে খবর দিব? দুনিয়ার জীবনে যাদের সমস্ত আমল বরবাদ হয়েছে। অথচ তারা ভাবে যে, তারা সুন্দর আমল করে যাচ্ছে’ (কাহ্ফ ১৮/১০৩-৪)।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, مَنْ أَحْدَثَ فِيْ أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ، متفق عليه- ‘যে ব্যক্তি আমাদের শরী‘আতে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করল, যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত’।[125] ইমাম মালেক (রহঃ) বলেন, إِنَّ كُلَّ مَا لَمْ يَكُنْ عَلَى عَهْدِ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَصْحَابِهِ دِيْنًا لَمْ يَكُنِ الْيَوْمَ دِيْنًا- ‘নিশ্চয়ই যে সকল বস্ত্ত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও তাঁর ছাহাবীগণের সময়ে দ্বীন হিসাবে গণ্য ছিল না, এ যুগে তা দ্বীন হিসাবে গণ্য হবে না’।[126]

জানাযা বিষয়ে অন্যান্য জ্ঞাতব্য সমূহ


জানাযা বিষয়ে অন্যান্য জ্ঞাতব্য সমূহ

(معلومات أخرى فى الجنازة)

(১) কবর ও লাশ বিষয়ে (فى القبر والميت) :

(ক) সাগরবক্ষে মৃত্যুবরণ করলে এবং স্থলভাগ না পাওয়া গেলে গোসল, কাফন ও জানাযা শেষে কবরে শোয়ানোর দো‘আ পড়ে লাশ সাগরে ভাসিয়ে দিবে। [127]

(খ) কবরে যতদিন মুমিনের লাশের কোন অংশ বাকী থাকবে, ততদিন তাকে সম্মান করতে হবে। সেখানে পুনরায় কবর দেওয়া যাবে না। যদি লাশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ও মাটি হয়ে যায়, তাহ’লে সেখানে পুনরায় দাফন করা যাবে ও সাধারণ মাটির ন্যায় সেখানে সবকিছু করা যাবে। কিন্তু তাই বলে কোন সাধারণ অজুহাতে কবরের সম্মান হানিকর কোন কিছু নির্মাণ করা যাবে না।[128]

(গ) কবর খুঁড়তে গিয়ে যদি প্রথম দিকেই মৃত ব্যক্তির হাড় পাওয়া যায়, তাহ’লে কবর খনন বন্ধ করবে। কিন্তু যদি খনন শেষে পাওয়া যায়, তবে হাড়টিকে কবরের একপাশে রেখেই সেখানে নতুন লাশের কবর দিবে। কেননা এক কবরে একাধিক লাশ দাফন করা জায়েয আছে।[129]

(ঘ) যদি বিনা জানাযায় কারু দাফন হয়ে যায় অথবা জানাযা করে দাফন হ’লেও যদি কেউ পরে জানাযা পড়তে চান, তাহ’লে কবরকে সামনে করে জানাযার ছালাত আদায় করা যাবে। [130]

(ঙ) যদি কোন গর্ভবতী মহিলা মারা যান এবং তার পেটে জীবিত বাচ্চা আছে বলে অভিজ্ঞ চিকিৎসক নিশ্চিত হন, তাহ’লে পেট কেটে বাচ্চা বের করে আনা জায়েয আছে।[131]

(চ) শারঈ ওযর বশতঃ যরূরী কারণে কবর পুনঃখনন, লাশ উত্তোলন ও স্থানান্তর করা জায়েয আছে।[132]

(২) মৃতের ক্বাযা ছালাত ও ছিয়াম (قضاء الصلاة والصيام عن الميت) :

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, একজনের ছিয়াম ও ছালাত অন্যজনে করতে পারেনা।[133] কারণ এগুলি দৈহিক ইবাদত, যা নিজেকেই করতে হয়। এগুলি জীবদ্দশায় যেমন অন্যের দ্বারা সম্ভব নয়, মৃতের পরেও তেমনি সম্ভব নয় এবং এগুলির ছওয়াবও অন্যকে দেওয়া যায় না কেবলমাত্র দো‘আ, ছাদাক্বা ও হজ্জ ব্যতীত।[134]

আল্লাহ বলেন, وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلاَّ مَا سَعَى ‘মানুষ সেটাই পায়, যার জন্য সে চেষ্টা করে’ (নাজম ৫৩/৩৯)। অবশ্য মানতের ছিয়াম থাকলে উত্তরাধিকারীগণ তা রাখতে পারেন।[135] অথবা প্রতি ছিয়ামের বদলে একজন মিসকীন খাওয়াবেন কিংবা এক মুদ (৬২৫ গ্রাম) গম (বা চাউল) মিসকীনকে দিবেন,[136] যদি তা মাইয়েতের রেখে যাওয়া সম্পদের এক তৃতীয়াংশে সংকুলান হয়। নইলে তা পূরণ করা ওয়ারিছের জন্য ওয়াজিব নয়।[137] জানাযাকালে মৃতের ক্বাযা ছালাতের কাফফারা স্বরূপ টাকা-পয়সা দান করা সম্পূর্ণরূপে একটি বিদ‘আতী প্রথা মাত্র।

(৩) গর্ভচ্যুত শিশুর জানাযা (الصلاة علي السقط) :

(ক) বাচ্চা যদি ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরে ক্রন্দন করে বা হাঁচি দেয় বা এমন আচরণ করে যাতে তার জীবন ছিল বলে বুঝা যায়, অতঃপর মারা যায়। তবে তার জানাযা পড়তে হবে। ‘এসময় তার মুসলিম বাপ-মায়ের প্রতি ক্ষমা ও অনুগ্রহের জন্য আল্লাহর নিকট দো‘আ করতে হবে’।[138] অর্থাৎ সূরা ফাতিহা, দরূদ ও জানাযার ১ম দো‘আটি পাঠের পর শিশুর জন্য বর্ণিত ৫ম দো‘আটি পাঠ শেষে বলবে, ‘আল্লা-হুম্মাগফির লি আবাওয়াইহে ওয়ারহামহুম’ (হে আল্লাহ! তুমি তার পিতামাতাকে ক্ষমা কর এবং তাদের উপর রহম কর)।

(খ) যদি বাচ্চা চার মাসের আগেই গর্ভচ্যুত হয়, তাহ’লে তাকে গোসল বা জানাযা কিছুই করতে হবে না। বরং কাপড়ে জড়িয়ে দাফন করবে।
(গ) চার মাসের পরের কোন সন্তান যদি মৃত ভূমিষ্ঠ হয়, তবে তারও জানাযা করার প্রয়োজন নেই। কেননা হাদীছে বাচ্চার ‘চীৎকার করার’ কথা এসেছে।[139] গর্ভচ্যুত সন্তানের জানাযা করতে হবে মর্মের ‘আম ছহীহ হাদীছের [140] ভিত্তিতে একদল বিদ্বান গর্ভচ্যুত মৃত সন্তানের জানাযা করার জন্য বলেন। জবাবে শাওকানী বলেন, মায়ের গর্ভে চার মাস অতিক্রম করাটাই শিশুর জীবনের প্রমাণ নয়, বরং ভূমিষ্ট হওয়ার পর কান্নাটাই তার জীবনের প্রমাণ হিসাবে গণ্য হবে। ইমাম মালেক, শাফেঈ, আওযাঈ ও জমহূর বিদ্বানগণ সেকথা বলেন।[141]

(৪) মৃতের প্রতি আদব (احترام الميت) :

(ক) মৃতের প্রতি সাধ্যমত সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। হাদীছে মৃতের হাড্ডি ভাঙ্গাকে জীবিতের হাড্ডি ভাঙ্গার সাথে তুলনা করা হয়েছে।[142] অন্য হাদীছে মৃতের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাটতে নিষেধ করা হয়েছে। [143] অতএব যরূরী রাষ্ট্রীয় নির্দেশ ব্যতীত মৃতদেহ কাটাছেঁড়া বা পোষ্ট মর্টেম করা গুরুতর অন্যায়। আজকাল পোষ্ট মর্টেম-এর বিষয়টি অনেকটা সস্তা হয়ে যাচ্ছে। তারপরেও লাশের প্রতি সেখানে অসম্মান করা হয় বলে শোনা যায়। যা থেকে সংশ্লিষ্ট সকলকে অবশ্যই বিরত থাকা কর্তব্য।

(খ) মৃত মুসলিম ব্যক্তিকে গালি দেওয়া নিষেধ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, لاَ تَسُبُّوا الْأَمْوَاتَ فَإِنَّهُمْ قَدْ أَفْضَوْا إِلَى مَا قَدَّمُوْا‘তোমরা মৃতদের গালি দিয়ো না। কেননা তারা তাদের অগ্রিম পেশকৃত অর্জনের প্রতি ধাবিত হয়েছে’।[144] তবে ঐ ব্যক্তি যদি ফাসিক ও বিদ‘আতী হয়, তবে তা থেকে বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যে সামান্য আলোচনা করা যেতে পারে। নতুবা বিরত থাকতে হবে।[145] কেননা সুন্দর মুসলমানের পরিচয় হ’ল অনর্থক বিষয় সমূহ হ’তে বিরত থাকা।[146] তাছাড়া ‘সন্দেহযুক্ত বিষয়াবলী থেকে নিঃসন্দেহ বিষয়ের দিকে ধাবিত হওয়ার’ জন্য হাদীছে নির্দেশ এসেছে। [147]

(৫) প্রতিবেশীদের কর্তব্য (لزوميات الجيران) :

মৃত্যুর পরে মৃতের প্রতিবেশী ও নিকটাত্মীয়দের কর্তব্য হ’ল, মৃতের পরিবারের লোকদেরকে (কমপক্ষে) একটি দিন ও রাত পেট ভরে খাওয়ানো। জা‘ফর বিন আবু ত্বালিব (রাঃ) শহীদ হ’লে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) তার প্রতিবেশীদেরকে এই নির্দেশ দিয়েছিলেন। এতদ্ব্যতীত বন্ধু-বান্ধব ও সকল হিতাকাংখীর কর্তব্য হ’ল মৃতের উত্তরাধিকারীদের সান্ত্বনা প্রদান করা ও তার বাচ্চাদের মাথায় সহানুভূতির হাত বুলানো।[148] রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদেরকে তিন দিনের বেশী কান্নাকাটি করতে নিষেধ করেন।[149]

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মৃতের বাড়ীতে গিয়ে তাদেরকে বিভিন্নভাবে সান্ত্বনা দিতেন। নিজের সন্তানহারা কন্যা যয়নব (রাঃ)-কে দেওয়া সর্বোত্তম সান্ত্বনা বাক্য হিসাবে বর্ণিত হাদীছটি নিম্নরূপ :

إِنَّ ِللهِ مَا أَخَذَ وَ ِللهِ مَا أَعْطَى وَكُلُّ شَيْئٍِ عِنْدَهُ إِلَى أجَلٍ مُّسَمَّى فَلْتَصْبِرْ وَلْتَحْتَسِبْ

উচ্চারণ : ইন্না লিল্লা-হি মা আখাযা ওয়া লিল্লা-হি মা আ‘ত্বা; ওয়া কুল্লু শাইয়িন ইনদাহূ ইলা আজালিম মুসাম্মা; ফালতাছবির ওয়াল তাহতাসিব

অনুবাদ : ‘নিশ্চয়ই সেটা আল্লাহর জন্য, যেটা তিনি নিয়েছেন এবং সেটাও আল্লাহর জন্য যেটা তিনি দিয়েছেন। প্রত্যেক বস্ত্ত তাঁর নিকটে রয়েছে একটি নির্দিষ্ট সময়কালের জন্য। অতএব তুমি ছবর কর ও ছওয়াবের আকাংখা কর’।[150] ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, কাউকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এটিই সর্বোত্তম হাদীছ।[151]

ফযীলত : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি তার কোন মুমিন ভাইয়ের বিপদে সান্ত্বনা প্রদান করল, আল্লাহ তাকে ক্বিয়ামতের দিন সবুজ রেশমের ঈর্ষণীয় জোড়া পরিধান করাবেন’।[152]

(৬) মৃতের জন্য করণীয় (الأعمال الحسنة للميت) :

১. আল্লাহ বলেন, إِنَّا نَحْنُ نُحْيِ الْمَوْتَى وَنَكْتُبُ مَا قَدَّمُوا وَآثَارَهُمْ وَكُلَّ شَيْءٍ أَحْصَيْنَاهُ فِي إِمَامٍ مُبِينٍ ‘আমরা মৃতকে জীবিত করি এবং লিখে রাখি যা তারা অগ্রে প্রেরণ করে ও যা তারা পশ্চাতে রেখে যায়। আমরা প্রত্যেক বস্ত্ত স্পষ্ট কিতাবে (অর্থাৎ স্ব স্ব আমলনামায়) সংরক্ষিত রাখি’।[153]

২. রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ اِنْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَةٍ إِلاَّ مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ، رواه مسلم-

‘মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সমস্ত আমল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, কেবল তিনটি আমল ব্যতীত : (ক) ছাদাক্বায়ে জারিয়া (খ) এমন ইল্ম যা থেকে কল্যাণ লাভ হয় এবং (গ) নেককার সন্তান, যে তার জন্য দো‘আ করে’।[154]

৩. রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘বান্দা বলে আমার মাল, আমার মাল। অথচ তার মাল তিনটি: (ক) যেটা সে খায় অতঃপর শেষ হয়ে যায় (খ) যেটা সে পরিধান করে অতঃপর তা জীর্ণ হয়ে যায় (গ) যেটা সে ছাদাক্বা দেয় বা দান করে সেটা তার জন্য সঞ্চিত থাকে। বাকী সবকিছু চলে যায় এবং লোকদের জন্য সে ছেড়ে যায়’। [155]

৪. তিনি আরও বলেন, ‘মাইয়েতের সঙ্গে তিনজন যায়। দু’জন ফিরে আসে ও একজন থেকে যায়। তার পরিবার ও মাল ফিরে আসে। কেবল ‘আমল’ তার সাথে থেকে যায়’। [156]

৫. তিনি আরও বলেন, ‘আখেরাতের সুখণ্ডসম্পদের তুলনায় দুনিয়া একটি মরা ছাগলের বাচ্চার চাইতেও তুচ্ছ’।[157]

৬. আল্লাহ বলেন, أَعْدَدْتُ لِعِبَادِى الصَّالِحِينَ مَا لاَ عَيْنَ رَأَتْ، وَلاَ أُذُنَ سَمِعَتْ، وَلاَ خَطَرَ عَلَى قَلْبِ بَشَرٍ ‘আমি আমার সৎকর্মশীল বান্দাদের জন্য এমন সুখ সম্ভার প্রস্ত্তত করে রেখেছি, যা কোন চোখ কখনো দেখেনি, কোন কান কখনো শোনেনি, কোন হৃদয় কখনো কল্পনা করেনি’। [158]

৭. রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘জান্নাতের একটি চাবুক রাখার মত ক্ষুদ্রতম স্থান, সমস্ত পৃথিবী ও তার মধ্যকার সম্পদরাজি অপেক্ষা উত্তম’। [159]

গায়েবানা জানাযা


(৭) গায়েবানা জানাযা (الصلاة على الغائب) :

গায়েবানা জানাযা জায়েয আছে।[165] তবে সকলের জন্য ঢালাওভাবে এটা জায়েয নয় বলে ইমাম খাত্ত্বাবী, ইবনু আব্দিল বার্র, হাফেয যায়লাঈ, ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ, হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িম, শায়খ আলবানী প্রমুখ বিদ্বানগণ মত প্রকাশ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য সমূহ সংক্ষেপে নিম্নরূপ :

গায়েবানা জানাযার জন্য হাবশার (আবিসিনিয়া) বাদশাহ আছহামা নাজ্জাশীর গায়েবানা জানাযা আদায়ের ঘটনাই হ’ল একমাত্র বিশুদ্ধ দলীল, যিনি ৯ম হিজরী সনে মারা যান। নাজ্জাশী খৃষ্টানদের বাদশাহ ছিলেন। কিন্তু নিজে মুসলমান ছিলেন। সেকারণ তার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছাহাবীদের নিয়ে জামা‘আত সহকারে গায়েবানা জানাযা আদায় করেন এবং বলেন, صَلُّوْا عَلَى أَخٍ لَّكُمْ مَاتَ بِغَيْرِ أَرْضِكُمْ ‘তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জানাযা পড়। যিনি তোমাদের দেশ ব্যতীত অন্য দেশে মৃত্যুবরণ করেছেন’।[166] ইমাম আবুদাঊদ নাজ্জাশী বিষয়ক হাদীছের বর্ণনায় অনুচ্ছেদ রচনা করেছেন এভাবে, باب في الصلاة على المسلم يموت في بلاد الشرك ‘মুশরিক দেশে মৃত্যুবরণকারী মুসলিমের জানাযা’ অনুচ্ছেদ। এতে বুঝা যায় যে, মুশরিক বা অমুসলিম দেশে মুত্যু হওয়ার কারণে যদি কোন মুসলমানের জানাযা হয়নি বলে নিশ্চিত ধারণা হয়, তাহ’লে সেক্ষেত্রে ঐ মুসলমান ভাই বা বোনের জন্য গায়েবানা জানাযা পড়া যাবে।

এ সম্পর্কে দ্বিতীয় দলীল হিসাবে মু‘আবিয়া বিন মু‘আবিয়া লায়ছী আল-মুযানী (রাঃ)-এর গায়েবানা জানাযা পড়ার কথা বলা হয়। মদ্বীনায় তাঁর মৃত্যু হ’লে তাবূকের যুদ্ধে অবস্থানকালে জিব্রীল মারফত এই সংবাদ পেয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর গায়েবানা জানাযা পড়েন।[167] ইবনু আব্দিল বার্র ও ইবনু হাজার প্রমুখ বলেন যে, হাদীছটি ‘ছহীহ’ নয়। দ্বিতীয়ত : এ হাদীছে বলা হয়েছে যে, জিব্রীল (আঃ) স্বীয় পাখার ঝাপটায় সব পর্দা উঠিয়ে দেন ও জানাযা উঁচু করে ধরেন। তাতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জানাযা দেখতে পান ও ছালাত আদায় করেন (حتى نظر إليه وصلي عليه)। ফলে সেটা আর গায়েবানা থাকে না। সেকারণ ইবনু হাজার আসক্বালানী বলেন যে, এই হাদীছ দ্বারা গায়েবানা জানাযার দলীল গ্রহণ বাতিল যোগ্য’।

ইবনু আব্দিল বার্র বলেন, যদি গায়েবানা জানাযা জায়েয হ’ত, তাহ’লে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিশ্চয়ই নিজের ছাহাবীদের গায়েবানা জানাযা আদায় করতেন (যাদের জানাযায় তিনি শরীক হ’তে পারেননি)। অনুরূপ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মুসলমানেরা তাদের প্রিয় চার খলীফার গায়েবানা জানাযা পড়ত। কিন্তু এরূপ কথা কারু থেকে কখনো বর্ণিত হয়নি’। [168]

পরিশেষে বলা যায় যে, গায়েবানা জানাযা নিঃসন্দেহে জায়েয ঐসব ক্ষেত্রে, যাদের জানাযা হয়নি বলে জানা যায়। কিন্তু যাদের জানাযা হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায়, সেক্ষেত্রে গায়েবানা জানাযা না পড়ায় কোন দোষ নেই। বিশেষ করে আজকাল যেখানে গায়েবানা জানাযা নোংরা রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। সেক্ষেত্রে আরও বেশী হুঁশিয়ার হওয়া কর্তব্য।

কবর যিয়ারত


(৮) কবর যিয়ারত (زيارة القبور) :

কবর যিয়ারত করা সুন্নাত। এর দ্বারা মৃত্যু ও আখেরাতের কথা স্মরণ হয়। কবর আযাবের ভীতি সঞ্চারিত হয়। হৃদয় বিগলিত হয়। চক্ষু অশ্রুসিক্ত হয়। অন্যায় থেকে তওবা এবং নেকীর প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়। পরকালীন মুক্তির প্রেরণা সৃষ্টি হয়। উপরোক্ত উদ্দেশ্যেই কেবল কবর যিয়ারতের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। নইলে প্রথমে কবর যিয়ারত নিষিদ্ধ ছিল। নারী-পুরুষ সবার জন্য এই অনুমতি রয়েছে। তবে ঐসব নারীদের জন্য লা‘নত করা হয়েছে, যারা কবর যিয়ারতের সময় সরবে কান্নাকাটি ও বিলাপ ধ্বনি করে।

যিয়ারতের সময় এমন কাজ করা যাবে না, যা করলে আল্লাহ নাখোশ হন। যেমন : লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে বা দুনিয়াবী স্বার্থে যিয়ারত করা, সেখানে ফুল দেওয়া, কবরবাসীর নিকটে কিছু কামনা করা, সেখানে বসা, ছালাত আদায় করা বা সিজদা করা, তার অসীলায় মুক্তি প্রার্থনা করা, সেখানে দান-ছাদাক্বা ও মানত করা, গরু-ছাগল-মোরগ ইত্যাদি ‘হাজত’ দেওয়া বা কুরবানী করা প্রভৃতি।

সকল প্রকারের শিরকী আক্বীদা ও বিদ‘আতী আমল থেকে মুক্ত মন নিয়ে কেবল মৃতের জন্য দো‘আ এবং আখেরাতকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে কবর যিয়ারত করতে হবে। নইলে ঐ যিয়ারত গোনাহের কারণ হবে। উল্লেখ্য যে, শুধুমাত্র কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে কোথাও সফর করা নিষিদ্ধ। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যিয়ারতের উদ্দেশ্যে ও নেকী হাছিলের জন্য কা‘বা গৃহ, বায়তুল মুক্বাদ্দাস ও মসজিদে নববী ব্যতীত অন্যত্র সফর করতে নিষেধ করেছেন।[169] তাই শুধুমাত্র রাসূল (ছাঃ)-এর কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে মদ্বীনায় যাওয়া নাজায়েয। তবে মসজিদে নববীতে ছালাত আদায়ের নেকী হাছিলের উদ্দেশ্যে কেউ মদ্বীনায় গেলে তিনি রাসূল (ছাঃ)-এর কবর যিয়ারত করতে পারেন। অতএব হজ্জের সময় যারা মদ্বীনা হয়ে মক্কায় যান, তাদের নিয়ত হ’তে হবে মসজিদে নববীতে ছালাত আদায়ের অশেষ নেকী হাছিল করা।

বর্তমানে যেভাবে রাজনৈতিক নেতাদের ও পীরদের কবর যেয়ারত করা হচ্ছে এবং মৃত পীরের অসীলায় ইহকালীন মঙ্গল ও পরকালীন মুক্তির আশায় মানুষ যেভাবে বার্ষিক ওরস ও অন্যান্য সময়ে বিভিন্ন মাযারে ছুটছে, তাদের সাবধান হওয়া উচিৎ যে, এর মাধ্যমে তারা দুনিয়া ও আখেরাত দু’টিই হারাচ্ছেন। কেননা আল্লাহ ও রাসূল (ছাঃ)-এর আদেশের বিরোধিতা করলে কেবল আল্লাহর ক্রোধ লাভ হয় ও তাঁর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হ’তে হয়।

যিয়ারতের আদব ( آداب الزيارة ) : এই সময় নিজের মৃত্যু ও আখেরাতকে স্মরণ করবে এবং কবরবাসীদের মাগফেরাতের উদ্দেশ্যে খালেছ মনে নিম্নোক্ত দো‘আ সমূহ পাঠ করবে। দো‘আর সময় একাকী দু’হাত উঠানো যাবে। বাক্বী‘ গারক্বাদ গোরস্থানে দীর্ঘক্ষণ ধরে দো‘আ করার সময় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একাকী তিন বার হাত উঠিয়েছিলেন। [170] এই সময় স্রেফ দো‘আ ব্যতীত ছালাত, তেলাওয়াত, যিকর-আযকার, দান-ছাদাক্বা কিছুই করা জায়েয নয়।

১ম দো‘আ : এটি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আয়েশা (রাঃ)-কে শিক্ষা দিয়েছিলেন।

اَلسَّلاَمُ عَلَى أَهْلِ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ وَالْمُسْلِمِيْنَ، وَيَرْحَمُ اللهُ الْمُسْتَقْدِمِيْنَ مِنَّا وَالْمُسْتَأْخِرِيْنَ، وَإِنَّا إِنْ شَآءَ اللهُ بِكُمْ لَلاَحِقُوْنَ-

উচ্চারণ : আস্সালা-মু ‘আলা আহলিদ দিয়া-রি মিনাল মু’মিনীনা ওয়াল মুসলিমীনা; ওয়া ইয়ারহামুল্লা-হুল মুস্তাক্বদিমীনা মিন্না ওয়াল মুস্তা’খিরীনা; ওয়া ইন্না ইনশা-আল্লা-হু বিকুম লা লা-হেকূনা।

অনুবাদ : মুমিন ও মুসলিম কবরবাসীদের উপরে শান্তি বর্ষিত হৌক। আমাদের অগ্রবর্তী ও পরবর্তীদের উপরে আল্লাহ রহম করুন! আল্লাহ চাহে তো আমরা অবশ্যই আপনাদের সাথে মিলিত হ’তে যাচ্ছি’।[171]

২য় দো‘আ : এটি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) অন্যদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন।-

اَلسَّلاَمُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ وَالْمُسْلِمِيْنَ وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللهُ بِكُمْ لَلاَحِقُوْنَ، نَسْأَلُ اللهَ لَنَا وَلَكُمُ الْعَافِيَةَ-

উচ্চারণ : আস্সালা-মু ‘আলা আহলিদ দিয়া-রি মিনাল মু’মিনীনা ওয়াল মুসলিমীনা; ওয়া ইন্না ইনশা-আল্লা-হু বিকুম লা লা-হেকূনা। নাসআলুল্লা-হা লানা ওয়া লাকুমুল ‘আ-ফিয়াতা’।

অনুবাদ : মুমিন ও মুসলিম কবরবাসীগণ! আপনাদের উপরে শান্তি বর্ষিত হৌক! আল্লাহ চাহে তো আমরা অবশ্যই আপনাদের সাথে মিলিত হ’তে যাচ্ছি। আমাদের ও আপনাদের জন্য আমরা আল্লাহর নিকটে মঙ্গল কামনা করছি’।[172]

৩য় দো‘আ :

السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ دَارَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللهُ بِكُمْ لاَحِقُونَ، اللَّهُمَّ اغْفِرْلَهُمْ-

উচ্চারণ : আসসালামু ‘আলায়কুম দা-রা ক্বাওমিন মু’মিনীনা, ওয়া ইন্না ইনশা-আল্লা-হু বিকুম লা-হেকূনা; আল্লা-হুম্মাগফিরলাহুম।

অনুবাদ : মুমিন কবরবাসীদের উপরে শান্তি বর্ষিত হৌক। আল্লাহ চাহে তো আমরা অবশ্যই আপনাদের সাথে মিলিত হ’তে যাচ্ছি। হে আল্লাহ! তুমি তাদেরকে ক্ষমা করে দাও। [173]

তিরমিযী বর্ণিত ‘আসসালামু ‘আলায়কুম ইয়া আহলাল কুবূরে! ইয়াগফিরুল্লা-হু লানা ওয়া লাকুম’ বলে প্রসিদ্ধ হাদীছটি ‘যঈফ’। [174]

জ্ঞাতব্য :

কাফির-মুশরিক বাপ-মায়ের কবর যিয়ারত করা যাবে। ক্রন্দন করা যাবে। কেননা এর মাধ্যমে মৃত্যুকে স্মরণ করা হয়। কিন্তু সেখানে গিয়ে সালাম করা যাবে না। তাদের জন্য আল্লাহর নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা করা যাবে না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে তাঁর মায়ের কবর যিয়ারতের জন্য অতটুকুই মাত্র অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।[175]

হুকুম ও অন্যান্য


৬. জানাযার ছালাত (صلاة الجنازة)

হুকুম : প্রত্যেক মুসলিম আহলে ক্বিবলার উপর জানাযার ছালাত ‘ফরযে কেফায়াহ’।[1] অর্থাৎ মুসলমানদের কেউ জানাযা পড়লে উক্ত ফরয আদায় হয়ে যাবে। না পড়লে সবাই দায়ী হবে। ছালাত হিসাবে অন্যান্য ছালাতের ন্যায় ওযূ, ক্বিবলা, সতর ঢাকা ইত্যাদি ছালাতে জানাযার শর্তাবলীর অন্তর্ভুক্ত। তবে পার্থক্য এই যে, জানাযার ছালাতে কোন রুকূ-সিজদা বা বৈঠক নেই এবং এ ছালাতের জন্য নির্দিষ্ট কোন ওয়াক্ত নেই। বরং দিনে-রাতে সকল সময় এমনকি নিষিদ্ধ তিন সময়েও পড়া যায়।[2]

ওয়াজিব সমূহ : ছয়টি : (১) দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করা (২) চার তাকবীর দেওয়া (৩) সূরায়ে ফাতিহা পাঠ করা (৪) দরূদ পাঠ করা (৫) মাইয়েতের জন্য খালেছ অন্তরে দো‘আ করা (৬) সালাম ফিরানো।

সুন্নাত সমূহ : পাঁচটি : (১) জামা‘আত সহকারে ছালাত আদায় করা (২) কমপক্ষে তিনটি কাতার হওয়া (৩) ইমাম বা একাকী মুছল্লীর জন্য পুরুষের মাথা ও মেয়েদের কোমর বরাবর দাঁড়ানো (৪) ফাতিহা ব্যতীত অন্য একটি সূরা এবং হাদীছে বর্ণিত দো‘আ সমূহ পাঠ করা (৫) ছালাত শেষে জানাযা উঠানো পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকা। [3] বাকী সবই ‘মুস্তাহাব’। যদি ভুলক্রমে তিন তাকবীর হয়ে যায়, তবে পুনরায় ইমাম চতুর্থ তাকবীর দিবেন। যদি মুক্তাদীর কোন তাকবীর ছুটে যায়, তবে শেষে তাকবীর দিয়ে সালাম ফিরাবে। আর যদি না দেয় তাতেও দোষ নেই।[4]

ফযীলত : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও ছওয়াবের আশায় কোন জানাযায় শরীক হ’ল এবং দাফন শেষে ফিরে এলো, সে ব্যক্তি দুই ‘ক্বীরাত’ সমপরিমাণ নেকী পেল। প্রতি ‘ক্বীরাত’ ওহোদ পাহাড়ের সমতুল্য। আর যে ব্যক্তি কেবলমাত্র জানাযা পড়ে ফিরে এলো, সে এক ‘ক্বীরাত’ পরিমাণ নেকী পেল’। [5]

কাতার দাঁড়ানো : ইমামের পিছনে কাঁধে কাঁধ ও পায়ে পা মিলিয়ে কাতার দিবে।[6] এ সময় জামার হাতাগুলো খুলে দিবে ও টাখনুর উপরে কাপড় রাখবে।[7] জুতা-স্যান্ডেল খোলার প্রয়োজন নেই। যদি তাতে নাপাকী থাকে, তবে তা মাটিতে ঘষে নিলেই যথেষ্ট হবে। [8] এ সময় জুতা-স্যান্ডেল থেকে পা বের করে তার উপরে দাঁড়ানো স্রেফ বোকামি। মাইয়েতকে উত্তর মাথা করে ক্বিবলার দিকে সামনে রাখবে।[9] যদি মাইয়েত পুরুষ হন, তবে ইমাম মাইয়েতের মাথা বরাবর দাঁড়াবেন। আর যদি মহিলা হন, তবে মাইয়েতের কোমর বরাবর দাঁড়াবেন।[10] মাইয়েত একত্রে একাধিক হ’লে এবং পুরুষ ও নারী হ’লে পুরুষের লাশ ইমামের কাছাকাছি সম্মুখে রাখবে। অতঃপর মহিলার লাশ থাকবে। যদি শিশু ও মহিলা হয়, তাহ’লে শিশুর লাশ প্রথমে ও মহিলার লাশ পরে থাকবে।

ইমামের পিছনে তিনটি কাতার দেওয়া মুস্তাহাব।[11] ১ম কাতারে ইমামের কাছাকাছি মাইয়েতের উত্তরাধিকারীগণ ও দ্বীনদার গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ দাঁড়াবেন। চারজন হ’লে ইমামের পিছনে দু’জন দু’জন করে দাঁড়াবেন।[12] ইমাম ব্যতীত একজন পুরুষ ও একজন মহিলা মুক্তাদী হ’লে ইমামের পিছনে পুরুষ ও তার পিছনে মহিলা দাঁড়াবেন। মুক্তাদী একজন হ’লে তিনি ইমামের পিছনে দাঁড়াবেন। কোন লোক না পেলে একাকী জানাযা পড়বেন।[13] তবে শিরক ও বিদ‘আতী আক্বীদা ও আমল মুক্ত দ্বীনদার মুছল্লীর সংখ্যা জানাযায় যত বেশী হবে, মাইয়েতের জন্য তা তত বেশী উপকারী হবে এবং তাদের দো‘আ কবুল করা হবে’।[14]

ইমামত : মাইয়েত কোন ন্যায়নিষ্ঠ ও পরহেযগার ব্যক্তিকে অছিয়ত করে গেলে তিনিই জানাযা পড়াবেন। নইলে ‘আমীর’ বা তাঁর প্রতিনিধি অথবা মাইয়েতের কোন যোগ্য নিকটাত্মীয়, নতুবা স্থানীয় মসজিদের ইমাম বা অন্য কোন মুত্তাক্বী আলেম জানাযায় ইমামতি করবেন। মৃত ব্যক্তি দু’জন ব্যক্তির নামেও অছিয়ত করে যেতে পারেন। [15]

জানাযার ছালাতের বিবরণ


জানাযার ছালাতের বিবরণ (صفة صلاة الجنازة) :

জানাযার ছালাতে চার তাকবীর দিবে। পাঁচ থেকে নয় তাকবীর পর্যন্ত প্রমাণিত আছে। তবে চার তাকবীরের হাদীছ সমূহ অধিকতর ছহীহ ও সংখ্যায় অধিক। মুক্তাদী ইমামের পিছে পিছে তাকবীর বলবে।[16] প্রথমে মনে মনে জানাযার নিয়ত করে সরবে ‘আল্লাহু আকবর’ বলে দু’হাত কাঁধ পর্যন্ত উঠিয়ে বাম হাতের উপর ডান হাত বুকে বাঁধবে। এ সময় ‘ছানা’ পড়বে না।[17] নাভির নীচে হাত বাঁধার হাদীছ সর্বসম্মতভাবে ‘যঈফ’।[18] আনাস, ইবনে ওমর, ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ ছাহাবীগণ সকল তাকবীরেই হাত উঠাতেন।[19] অতঃপর আ‘ঊযুবিল্লাহ-বিসমিল্লাহ সহ সূরায়ে ফাতিহা ও অন্য একটি সূরা পড়বে। [20] তারপর ২য় তাকবীর দিবে ও দরূদে ইবরাহীমী পাঠ করবে, যা আত্তাহিইয়াতু-র পরে পড়া হয়। তারপর ৩য় তাকবীর দিবে ও নিম্নোক্ত দো‘আ সমূহ পড়বে। দো‘আ পাঠ শেষে ৪র্থ তাকবীর দিয়ে প্রথমে ডাইনে ও পরে বামে সালাম ফিরাবে। ডাইনে একবার মাত্র সালাম ফিরানোও জায়েয আছে। [21]

জানাযার ছালাত সরবে ও নীরবে পড়া যায়।[22] ইমাম সরবে পড়লে মুক্তাদীগণ আ‘ঊযুবিল্লাহ-বিসমিল্লাহ সহ কেবল সূরায়ে ফাতিহা চুপে চুপে পড়বে এবং পরে দরূদ ও অন্যান্য দো‘আ সমূহ পড়বে। তবে ইমাম নীরবে পড়লে মুক্তাদীগণ সূরা ফাতিহা ও অন্য একটি সূরা এবং অন্যান্য দো‘আ সমূহ পড়বে।

জানাযার পূর্বে করণীয় : জানাযার পূর্বে মৃতের জন্য প্রথম করণীয় হ’ল তার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করা। এজন্য তার সকল সম্পদ বিক্রি করে হ’লেও তা করতে হবে। যদি তার কিছুই না থাকে, তাহ’লে তার নিকটাত্মীয়, সমাজ, সংগঠন বা সরকার সে দায়িত্ব বহন করবে’।[23]

জানাযা বিষয়ে সতর্কতা :

মহাপাপী কোন মুসলিম যেমন কোন ব্যভিচারী, মদ্যপায়ী, চোর-দস্যু-সন্ত্রাসী, আত্মঘাতি, জারজ সন্তান, কবর ও মূর্তি পূজারী, মুশরিক ও বিদ‘আতী যতক্ষণ না সে প্রকাশ্যে কুফরী ঘোষণা করে, আমানতের খেয়ানতকারী প্রভৃতি লোকদের জানাযা কোন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও পরহেযগার আলেমগণ পড়বেন না। তবে সাধারণ লোকেরা পড়বেন। [24]

ঋণগ্রস্ত, আত্মহত্যাকারী ও বায়তুল মাল বা অন্যের সম্পদ আত্মসাৎকারীর জানাযা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজে পড়েননি, বরং অন্যকে পড়তে বলেন।[25] ‘এটি ছিল তাঁর পক্ষ থেকে অন্যকে আদব শিখানোর জন্য’। [26]

(১) খায়বার কিংবা হোনায়েন-এর যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর জনৈক সাথী বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে। লোকেরা তার উচ্চ প্রশংসা করলে রাসূল (ছাঃ) বললেন, ঐ ব্যক্তি জাহান্নামের অধিবাসী। তখন একজন গোপনে তার পিছু নিল। দেখা গেল যে, ঐ ব্যক্তি যুদ্ধের এক পর্যায়ে আহত হ’ল। অতঃপর যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে নিজের অস্ত্র দিয়ে আত্মহত্যা করল। তখন লোকটি ছুটে এসে বলল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সবাইকে ডেকে বললেন, সত্যিকারের মুমিন ব্যতীত কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। মনে রেখ অনেক লোক জান্নাতী আমল করে। কিন্তু মৃত্যুকালে জাহান্নামী হয়ে যায়। আবার অনেকে জাহান্নামের আমল করে, কিন্তু মৃত্যুকালে জান্নাতী হয়ে যায়। অতঃপর তিনি বলেন إِنَّ اللهَ يُؤَيِّدُ هَذَا الدِّينَ بِالرَّجُلِ الْفَاجِرِ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ এই দ্বীনকে সাহায্য করেন অনেক পাপী লোকের মাধ্যমে’।[27]

আল্লাহ বলেন,وَلاَ تَقْتُلُوْا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيْمًا ‘তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি অতিশয় দয়াবান’ (নিসা ৪/২৯)

(২) খায়বার যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথীদের মধ্যে একজন নিহত হ’লে তিনি বলেন, صَلُّوْا عَلَى صَاحِبِكُمْ ‘তোমরা তোমাদের সাথীর জানাযা পড়’। এতে তাদের মন খারাপ হলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদের বললেন, إِنَّ صَاحِبَكُمْ غَلَّ فِىْ سَبِيْلِ اللهِ ‘তোমাদের সাথীটি আল্লাহর রাস্তায় খেয়ানত করেছে’। পরে অনুসন্ধানে তার থলিতে ইহুদীদের কণ্ঠহারের একটি ছিদ্রযুক্ত ছোট পাথরের লকেট (خَرَزٌ) পাওয়া গেল (যা গণীমতের মাল ছিল)। যার মূল্য দুই দিরহামেরও কম। [28]

(৩) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে হাদিয়া হিসাবে পাঠানো গোলাম মিদ‘আম (مِدْعَم) খায়বার যুদ্ধে নিহত হ’লে লোকেরা তার জান্নাতের সুসংবাদ বলতে থাকলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রাগতঃস্বরে বলেন, কখনোই না। আল্লাহর কসম! গণীমতের মাল থেকে যে চাদরটি সে চুরি করেছে, তা তাকে আগুনে পোড়াবে’। [29]

(৪) অন্য হাদীছে এসেছে, ‘মুমিনের নফ্স তার ঋণের সাথে লটকানো থাকে এবং সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না তার ঋণ পারিশোধ করা হয়’। [30]

(৫) যারা শরীক ফাঁকি দেয় কিংবা শক্তির জোরে বা ছল-চাতুরী করে অন্যের জমি ও সম্পদ আত্মসাৎ করে, তাদের জানাযা কোন পরহেযগার আলেমের পড়া উচিৎ নয়। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, مَنْ أَخَذَ شِبْرًا مِنَ الْأَرْضِ ظُلْمًا فَإِنَّهُ يُطَوَّقُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ سَبْعِ أَرْضِيْنَ ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারু জমি দখল করে, ক্বিয়ামতের দিন সাত তবক যমীন তার গলায় বেড়ীরূপে পরিয়ে দেওয়া হবে’।[31] অন্য বর্ণনায় এসেছে, مَنْ أَخَذَ أَرْضًا بِغَيْرِ حَقِّهَا كُلِّفَ أَنْ يَّحْمِلَ تُرَابَهَا الْمَحْشَرَ ‘...তাকে ক্বিয়ামতের দিন ঐ মাটির বোঝা মাথায় বহন করে চলতে বাধ্য করা হবে’।[32]

উপরোক্ত ব্যক্তিগণ কবীরা গোনাহগার। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে ছালাত তরককারী ব্যক্তিকে হাদীছে ‘কাফির’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। [33] তাহ’লে কিভাবে তার জানাযা পড়া যেতে পারে? আল্লাহ আমাদের হেদায়াত করুন- আমীন!

জানাযার দো‘আ


জানাযার দো‘আ (دعاء الجنازة) :

অনেকগুলি দো‘আর মধ্যে নিম্নের দো‘আটি সুপরিচিত।-

1- اَللَّهُمَّ اغْفِرْ لِحَيِّنَا وَمَيِّتِنَا وَشَاهِدِنَا وَغَائِبِنَا وَصَغِيْرِنَا وَكَبِيْرِنَا وَذَكَرِنَا وَأُنْثَانَا، اَللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الْإِسْلاَمِ وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الْإِيْمَانِ، اَللَّهُمَّ لاَ تَحْرِمْنَا أَجْرَهُ وَلاَ تَفْتِنَّا بَعْدَهُ-

(১) উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মাগ্ফির লিহাইয়েনা ওয়া মাইয়েতেনা ওয়া শা-হেদেনা ওয়া গা-য়েবেনা ওয়া ছাগীরেনা ওয়া কাবীরেনা ওয়া যাকারেনা ওয়া উন্ছা-না, আল্লা-হুম্মা মান আই্য়াইতাহূ মিন্না ফাআহ্য়িহী ‘আলাল ইসলাম, ওয়া মান তাওয়াফ্ফায়তাহূ মিন্না ফাতাওফ্ফাহূ ‘আলাল ঈমান। আল্লা-হুম্মা লা তাহরিমনা আজরাহূ ওয়া লা তাফ্তিন্না বা‘দাহূ।

অনূবাদ : ‘হে আল্লাহ! আমাদের জীবিত ও মৃত এবং (এই জানাযায়) উপস্থিত-অনুপস্থিত আমাদের ছোট ও বড়, পুরুষ ও নারী সকলকে আপনি ক্ষমা করুন। যাকে আপনি বাঁচিয়ে রাখবেন, তাকে ইসলামের উপরে বাঁচিয়ে রাখুন এবং যাকে মারতে চান, তাকে ঈমানের হালতে মৃত্যু দান করুন। হে আল্লাহ! এই মাইয়েতের (জন্য দো‘আ করার) উত্তম প্রতিদান হ’তে আপনি আমাদেরকে বঞ্চিত করবেন না এবং তার পরে আমাদেরকে পরীক্ষায় ফেলবেন না’।[34]

(২) আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দো‘আ যা প্রথমটির সাথে যোগ করে পড়া যায় বিশেষভাবে মাইয়েতের উদ্দেশ্যে। যেমন-

2- اَللَّهُمَّ اغْفِرْلَهُ وَارْحَمْهُ وَعَافِهِ وَاعْفُ عَنْهُ وَأَكْرِمْ نُزُلَهُ وَوَسِّعْ مَدْخَلَهُ، وَاغْسِلْهُ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرَدِ، وَنَقِّهِ مِنَ الْخَطَايَا كَمَا يُنَقَّيْ الثَّوْبُ الْأَبْيَضُ مِنَ الدَّنَسِ، وَأَبْدِلْهُ دَارًا خَيْرًا مِّنْ دَارِهِ وَأَهْلاً خَيْرًا مِّنْ أَهْلِهِ وَزَوْجًا خَيْرًا مِّنْ زَوْجِهِ، وَأَدْخِلْهُ الْجَنَّةَ وَأَعِذْهُ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَ مِنْ عَذَابِ النَّارِ-

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মাগ্ফির লা-হূ ওয়ারহামহু ওয়া ‘আ-ফিহি ওয়া‘ফু ‘আনহু ওয়া আকরিম নুযুলাহূ ওয়া ওয়াস্সি‘ মাদ্খালাহূ; ওয়াগ্সিলহু বিলমা-এ ওয়াছ্ছালজে ওয়াল বারাদে; ওয়া নাক্বক্বিহি মিনাল খাত্বা-য়া কামা ইউনাক্বক্বাছ্ ছাওবুল আবইয়াযু মিনাদ্ দানাসি; ওয়া আবদিলহু দা-রান খায়রান মিন দা-রিহী ওয়া আহলান খায়রাম মিন আহলিহী ওয়া যাওজান খায়রাম মিন যাওজিহী; ওয়া আদখিল্হুল জান্নাতা ওয়া আ‘ইয্হু মিন ‘আযা-বিল ক্বাবরে ওয়া মিন ‘আযা-বিন না-রে

অনুবাদ : হে আল্লাহ! আপনি এই মাইয়েতকে ক্ষমা করুন। তাকে অনুগ্রহ করুন। তাকে নিরাপদে রাখুন এবং তার গোনাহ মাফ করুন। আপনি তাকে সম্মানজনক আতিথেয়তা প্রদান করুন। তার বাসস্থান প্রশস্ত করুন। আপনি তাকে পানি দ্বারা, বরফ দ্বারা ও শিশির দ্বারা ধৌত করুন এবং তাকে পাপ হ’তে এমনভাবে মুক্ত করুন, যেমনভাবে সাদা কাপড় ময়লা হ’তে ছাফ করা হয়। আপনি তাকে দুনিয়ার গৃহের বদলে উত্তম গৃহ দান করুন। তার দুনিয়ার পরিবারের চাইতে উত্তম পরিবার এবং দুনিয়ার জোড়ার চাইতে উত্তম জোড়া দান করুন। তাকে আপনি জান্নাতে দাখিল করুন এবং তাকে কবরের আযাব হ’তে ও জাহান্নামের আযাব হ’তে রক্ষা করুন’।[35]

3- اَللَّهُمَّ إِنَّ فُلاَنَ بْنَ فُلاَنٍ فِيْ ذِمَّتِكَ وَحَبْلِ جِوَارِكَ، فَقِهِ مِنْ فِتْنَةِ الْقَبْرِ وَعَذَابِ النَّارِ، وَأَنْتَ أَهْلُ الْوَفَاءِ وَالْحَقِّ، اَللَّهُمَّ اغْفِرْلَهُ وَارْحَمْهُ، إِنَّكَ أَنْتَ الْغَفُوْرالرَّحِيْمُ-

(৩) উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা ইন্না ফুলা-নাবনা ফুলা-নিন ফী যিম্মাতিকা ওয়া হাবলি জিওয়া-রিকা; ফাক্বিহী মিন ফিৎনাতিল ক্বাবরি ওয়া ‘আযা-বিন্না-রি; ওয়া আন্তা আহলুল ওয়াফা-ই ওয়াল হাক্বক্বি। আল্লা-হুম্মাগফিরলাহূ ওয়ারহামহু, ইন্নাকা আন্তাল গাফূরুর রহীম

অনুবাদ : হে আল্লাহ! অমুকের পুত্র অমুক আপনার যিম্মায় ও আপনার তত্ত্বাবধানে আবদ্ধ। অতএব আপনি তাকে কবরের পরীক্ষা ও জাহান্নামের আযাব হ’তে রক্ষা করুন। আপনি ওয়াদা ও সত্যের মালিক। হে আল্লাহ! আপনি তাকে ক্ষমা করুন ও তাকে অনুগ্রহ করুন। নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল ও দয়াবান।[36]

4- اَللَّهُمَّ عَبْدُكَ وَابْنُ أَمَتِكَ احْتَاجَ إِلَى رَحْمَتِكَ، وَأَنْتَ غَنِيٌّ عَنْ عَذَابِهِ، إِنْ كَانَ مُحْسِنًا فَزِدْ فِي حَسَنَاتِهِ، وَإِنْ كَانَ مُسِيْئًا فَتَجَاوَزْ عَنْهُ-

(৪) উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা ‘আব্দুকা ওয়া ইবনু আমাতিকা, ইহতা-জা ইলা রহমাতিকা ওয়া আনতা গানিইয়ুন ‘আন ‘আযা-বিহী। ইন কা-না মুহসিনান ফাযিদ ফী হাসানা-তিহী; ওয়া ইন কা-না মুসীআন, ফাতাজা-ওয়ায ‘আনহু।

অনুবাদ : হে আল্লাহ! মাইয়েত আপনার বান্দা এবং সে আপনার এক বান্দীর সন্তান। সে আপনার রহমতের ভিখারী। আপনি তাকে শাস্তি দিতে বাধ্য নন। অতএব যদি সে সৎকর্মশীল হয়, তাহ’লে তার নেকী বাড়িয়ে দিন। আর যদি অন্যায়কারী হয়, তাহ’লে তাকে আপনি ক্ষমা করে দিন’।[37]

(৫) মাইয়েত শিশু হ’লে সূরা ফাতিহা, দরূদ ও জানাযার ১ম দো‘আটি পাঠের পর নিম্নোক্ত দো‘আ পড়বে-

5- اَللَّهُمَّ اجْعَلْهُ لَنَا سَلَفًا وَّ فَرَطًا وَّ ذُخْرًا وَّ أَجْرًا ، رواه البخاريُّ تعليقًا-

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মাজ‘আলহু লানা সালাফাওঁ ওয়া ফারাত্বাওঁ ওয়া যুখ্রাওঁ ওয়া আজরান’। ‘লানা’-এর সাথে ‘ওয়া লে আবাওয়াইহে’ (এবং তার পিতা-মাতার জন্য) যোগ করে বলা যেতে পারে।[38]

অনুবাদ : ‘হে আল্লাহ! আপনি এই শিশুকে আমাদের জন্য (এবং তার পিতা-মাতার জন্য) পূর্বগামী, অগ্রগামী এবং আখেরাতের পুঁজি ও পুরস্কার হিসাবে গণ্য করুন’! [39]

জানাযার দো‘আর আদব


জানাযার দো‘আর আদব (آداب دعاء الجنازة) :

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, إِذَا صَلَّيْتُمْ عَلَى الْمَيِّتِ فَأَخْلِصُوْا لَهُ الدُّعَاءَ- ‘যখন তোমরা জানাযার ছালাত আদায় করবে, তখন মাইয়তের জন্য খালেছ অন্তরে দো‘আ করবে’।[40] অতএব মাইয়েত ভাল-মন্দ যাই-ই হৌক না কেন, তার জন্য খোলা মনে দো‘আ করতে হবে। কবুল করা বা না করার মালিক আল্লাহ। ছাহেবে ‘আওন বলেন, অত্র হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মৃতের জন্য নির্দিষ্ট কোন দো‘আ নেই। বরং যেকোন প্রার্থনা করা যেতে পারে। শাওকানীও সেকথা বলেন। তবে তিনি বলেন যে, হাদীছে বর্ণিত দো‘আ সমূহ পাঠ করাই উত্তম। এই সময় সর্বনাম সমূহ পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। কেননা ‘মাইয়েত’ এখানে উদ্দেশ্য। ‘মাইয়েত’ (مَيِّتٌ) আরবী শব্দ, যা স্ত্রী ও পুরুষ উভয় লিঙ্গে ব্যবহৃত হয়।[41]

মৃত্যুকালীন সময়ে করণীয়


মৃত্যুকালীন সময়ে করণীয় (الأعمال عند من حضره الموت)

(ক) তালক্বীন করানো : ‘তালক্বীন’ (التلقين) অর্থ: কথা বুঝানো বা দ্রুত মুখস্থ করে নেওয়া। মৃত্যুর আলামত দেখা গেলে রোগীর শিয়রে বসে তাকে কালেমায়ে ত্বাইয়িবা ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ পড়ানো উচিৎ।[42] যাতে সে দ্রুত মুখস্থ বা স্মরণ করে নেয়। তাওহীদের স্বীকৃতিবাচক এই কালেমাই তাকে জান্নাতে নিয়ে যেতে পারে। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছা্ঃ) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তির সর্বশেষ বাক্য হবে ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ (অর্থ : নেই কোন উপাস্য আল্লাহ ব্যতীত), সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে’।[43] জমহূর বিদ্বানগণ কেবল লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ পড়ার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। কেননা হাদীছে কেবল এতটুকুই এসেছে।[44]

তালক্বীনের অর্থ মৃত্যুমুখী ব্যক্তিকে কেবল কালেমা শুনানো নয়। বরং তাকে কালেমা পড়ানোর চেষ্টা করা। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জনৈক আনছার রোগীকে দেখতে গেলেন ও বললেন, হে মামু! আপনি পড়ুন লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ। তিনি বললেন যে, আমাকে এখতিয়ার দিন, আমি নিজেই পড়ি...। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, হ্যাঁ’।[45] কিন্তু কালেমা পড়ানোর জন্য চাপাচাপি করা উচিৎ নয়। তাতে মুখ দিয়ে বেফাস কথা বের হয়ে যেতে পারে। একবার বলানোর পরে দ্বিতীয়বার চেষ্টা না করা উচিৎ। যাতে এই কালেমাই তার শেষ বাক্য হয়। এই সময় তাকে ক্বিবলামুখী করার জন্য উত্তর দিকে মাথা করে বিছানা ঠিক করে দেওয়া সম্পর্কে কোন ছহীহ হাদীছ নেই। খ্যাতনামা তাবেঈ সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িবকে ক্বিবলামুখী করে বিছানা ঘুরিয়ে দিলে হুঁশ ফেরার পর তিনি পুনরায় পূর্বের ন্যায় শয়ন করেন ও বলেন, মাইয়েত কি মুসলমান নয়? [46] এই সময় মাইয়েতের শিয়রে বসে সূরা ইয়াসীন পাঠ করার হাদীছ ‘যঈফ’।[47]

মৃত্যুর পরে দো‘আ সমূহ এবং করণীয়


মৃত্যুর পরে দো‘আ সমূহ এবং করণীয় :

(১) মৃত্যু হওয়ার পরে উপস্থিত সকলে এবং যারা শুনবেন তারা প্রত্যেকে إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ ‘ইন্না লিল্লা-হে ওয়া ইন্না ইলাইহে রা-জে‘ঊন’ (অর্থ : ‘আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী’) পাঠ করবে এবং আল্লাহ-নির্ধারিত তাক্বদীরের উপরে ছবর করবে ও সন্তুষ্ট থাকবে। অতঃপর

(২) মৃতের চোখ দু’টি বন্ধ করে দিবে। [48] সারা দেহ ও মুখমন্ডল কাপড় দিয়ে ঢেকে দিবে।[49] তবে (হজ্জ বা ওমরাহ কালে) ‘মুহরিম’ ব্যক্তির মুখ ও মাথা খোলা থাকবে। কেননা তিনি ক্বিয়ামতের দিন ‘তালবিয়া’ পাঠ করতে করতে উঠবেন। [50]

(৩) এই সময় মাইয়েতের নিকটতম ব্যক্তি এই দো‘আ পড়বে : اَللَّهُمَّ أَجِرْنِي فِيْ مُصِيْبَتِيْ وَأَخْلِفْ لِيْ خَيْرًا مِّنْهَا ‘আল্লা-হুম্মা আজিরনী ফী মুছীবাতী ওয়া আখলিফ্লী খায়রাম মিনহা’ (অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমাকে বিপদে ধৈর্য ধারণের পারিতোষিক দান কর এবং আমাকে এর উত্তম প্রতিদান দাও’)।[51]

(৪) এসময় মৃতের জন্য নিম্নোক্ত দো‘আটি পড়া যেতে পারে। যা আবু সালামাহ (রাঃ)-এর জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পাঠ করেছিলেন,

اَللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْفَعْ دَرَجَتَهُ فِي الْمَهْدِيِّيْنَ وَاخْلُفْهُ فِيْ عَقِبِهِ فِي الْغَابِرِيْنَ وَاغْفِرْ لَنَا وَلَهُ يَا رَبَّ الْعَالَمِيْنَ، وَافْسَحْ لَهُ فِيْ قَبْرِهِ وَنَوِّرْ لَهُ فِيْهِ-

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মাগফির লাহু ওয়ারফা‘ দারাজাতাহু ফিল মাহদিইয়ীনা ওয়াখলুফহু ফী ‘আক্বিবিহী ফিল গা-বিরীনা, ওয়াগফির লানা ওয়ালাহু ইয়া রববাল ‘আ-লামীন; ওয়াফসাহ লাহু ফী ক্বাবরিহী ওয়া নাওভির লাহু ফীহি।

অনুবাদ : হে আল্লাহ! আপনি তাকে ক্ষমা করুন এবং সুপথপ্রাপ্তদের মধ্যে তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করুন। পিছনে যাদেরকে তিনি ছেড়ে গেলেন, তাদের মধ্যে আপনিই তার প্রতিনিধি হউন। হে বিশ্ব চরাচরের পালনকর্তা! আপনি আমাদেরকে ও তাকে ক্ষমা করুন। আপনি তার জন্য তার কবরকে প্রশস্ত করে দিন এবং সেটিকে তার জন্য আলোকিত করে দিন’। [52]

(৫) এই সময় মৃতের মাগফেরাতের জন্য দো‘আ করা ও তার সদগুণাবলী বর্ণনা করা উচিৎ। কেননা তাতে ফেরেশতাগণ ‘আমীন’ বলেন ও তার জন্য ওগুলি ওয়াজিব হয়ে যায়’। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়’।[53] একটি বর্ণনায় এসেছে যে, ৪, ৩ এমনকি ২ জন নেককার মুমিন ব্যক্তিও যদি মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে উত্তম সাক্ষ্য দেয়, তাতেই তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়।[54] অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘কোন মুসলমান মারা গেলে তার নিকটতম প্রতিবেশীদের চারজন যদি তার সম্পর্কে সাক্ষ্য দেয় যে, তারা তার সম্পর্কে ভাল ব্যতীত কিছুই জানে না, তাহ’লে আল্লাহ বলেন, আমি তোমাদের সাক্ষ্য কবুল করলাম এবং আমি তার ঐসব গোনাহ মাফ করে দিলাম, যেগুলি তোমরা জানো না’। [55] উল্লেখ্য যে, জানাযার সময় মাইয়েত সম্পর্কে উপস্থিত সকলের সমস্বরে ‘ভাল’ বলে সাক্ষ্য দেওয়ার রেওয়াজটি নিন্দনীয় বিদ‘আত।[56]

(৬) দ্রুত কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করবে এবং মৃতের ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা নিবে, যদি তার সমস্ত মাল দিয়েও হয়। কিছু না থাকলে বা কেউ না থাকলে বা ঋণ মাফ না করলে সমাজ বা রাষ্ট্র তার পক্ষ থেকে ঋণ পরিশোধ করবে।[57]

পেজ ন্যাভিগেশন

সর্বমোটঃ  15 টি বিষয় দেখান হচ্ছে।
প্রথম পাতাআগের পাতা12