• ৫৬৪০৩ টি সর্বমোট হাদিস আছেঃ
  • ৫৭৫৬ টি প্রশ্নোত্তর ও ফিকাহঃ

 

 

 

 


জানাযা বিষয়ে অন্যান্য জ্ঞাতব্য সমূহ


জানাযা বিষয়ে অন্যান্য জ্ঞাতব্য সমূহ

(معلومات أخرى فى الجنازة)

(১) কবর ও লাশ বিষয়ে (فى القبر والميت) :

(ক) সাগরবক্ষে মৃত্যুবরণ করলে এবং স্থলভাগ না পাওয়া গেলে গোসল, কাফন ও জানাযা শেষে কবরে শোয়ানোর দো‘আ পড়ে লাশ সাগরে ভাসিয়ে দিবে। [127]

(খ) কবরে যতদিন মুমিনের লাশের কোন অংশ বাকী থাকবে, ততদিন তাকে সম্মান করতে হবে। সেখানে পুনরায় কবর দেওয়া যাবে না। যদি লাশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ও মাটি হয়ে যায়, তাহ’লে সেখানে পুনরায় দাফন করা যাবে ও সাধারণ মাটির ন্যায় সেখানে সবকিছু করা যাবে। কিন্তু তাই বলে কোন সাধারণ অজুহাতে কবরের সম্মান হানিকর কোন কিছু নির্মাণ করা যাবে না।[128]

(গ) কবর খুঁড়তে গিয়ে যদি প্রথম দিকেই মৃত ব্যক্তির হাড় পাওয়া যায়, তাহ’লে কবর খনন বন্ধ করবে। কিন্তু যদি খনন শেষে পাওয়া যায়, তবে হাড়টিকে কবরের একপাশে রেখেই সেখানে নতুন লাশের কবর দিবে। কেননা এক কবরে একাধিক লাশ দাফন করা জায়েয আছে।[129]

(ঘ) যদি বিনা জানাযায় কারু দাফন হয়ে যায় অথবা জানাযা করে দাফন হ’লেও যদি কেউ পরে জানাযা পড়তে চান, তাহ’লে কবরকে সামনে করে জানাযার ছালাত আদায় করা যাবে। [130]

(ঙ) যদি কোন গর্ভবতী মহিলা মারা যান এবং তার পেটে জীবিত বাচ্চা আছে বলে অভিজ্ঞ চিকিৎসক নিশ্চিত হন, তাহ’লে পেট কেটে বাচ্চা বের করে আনা জায়েয আছে।[131]

(চ) শারঈ ওযর বশতঃ যরূরী কারণে কবর পুনঃখনন, লাশ উত্তোলন ও স্থানান্তর করা জায়েয আছে।[132]

(২) মৃতের ক্বাযা ছালাত ও ছিয়াম (قضاء الصلاة والصيام عن الميت) :

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, একজনের ছিয়াম ও ছালাত অন্যজনে করতে পারেনা।[133] কারণ এগুলি দৈহিক ইবাদত, যা নিজেকেই করতে হয়। এগুলি জীবদ্দশায় যেমন অন্যের দ্বারা সম্ভব নয়, মৃতের পরেও তেমনি সম্ভব নয় এবং এগুলির ছওয়াবও অন্যকে দেওয়া যায় না কেবলমাত্র দো‘আ, ছাদাক্বা ও হজ্জ ব্যতীত।[134]

আল্লাহ বলেন, وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلاَّ مَا سَعَى ‘মানুষ সেটাই পায়, যার জন্য সে চেষ্টা করে’ (নাজম ৫৩/৩৯)। অবশ্য মানতের ছিয়াম থাকলে উত্তরাধিকারীগণ তা রাখতে পারেন।[135] অথবা প্রতি ছিয়ামের বদলে একজন মিসকীন খাওয়াবেন কিংবা এক মুদ (৬২৫ গ্রাম) গম (বা চাউল) মিসকীনকে দিবেন,[136] যদি তা মাইয়েতের রেখে যাওয়া সম্পদের এক তৃতীয়াংশে সংকুলান হয়। নইলে তা পূরণ করা ওয়ারিছের জন্য ওয়াজিব নয়।[137] জানাযাকালে মৃতের ক্বাযা ছালাতের কাফফারা স্বরূপ টাকা-পয়সা দান করা সম্পূর্ণরূপে একটি বিদ‘আতী প্রথা মাত্র।

(৩) গর্ভচ্যুত শিশুর জানাযা (الصلاة علي السقط) :

(ক) বাচ্চা যদি ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরে ক্রন্দন করে বা হাঁচি দেয় বা এমন আচরণ করে যাতে তার জীবন ছিল বলে বুঝা যায়, অতঃপর মারা যায়। তবে তার জানাযা পড়তে হবে। ‘এসময় তার মুসলিম বাপ-মায়ের প্রতি ক্ষমা ও অনুগ্রহের জন্য আল্লাহর নিকট দো‘আ করতে হবে’।[138] অর্থাৎ সূরা ফাতিহা, দরূদ ও জানাযার ১ম দো‘আটি পাঠের পর শিশুর জন্য বর্ণিত ৫ম দো‘আটি পাঠ শেষে বলবে, ‘আল্লা-হুম্মাগফির লি আবাওয়াইহে ওয়ারহামহুম’ (হে আল্লাহ! তুমি তার পিতামাতাকে ক্ষমা কর এবং তাদের উপর রহম কর)।

(খ) যদি বাচ্চা চার মাসের আগেই গর্ভচ্যুত হয়, তাহ’লে তাকে গোসল বা জানাযা কিছুই করতে হবে না। বরং কাপড়ে জড়িয়ে দাফন করবে।
(গ) চার মাসের পরের কোন সন্তান যদি মৃত ভূমিষ্ঠ হয়, তবে তারও জানাযা করার প্রয়োজন নেই। কেননা হাদীছে বাচ্চার ‘চীৎকার করার’ কথা এসেছে।[139] গর্ভচ্যুত সন্তানের জানাযা করতে হবে মর্মের ‘আম ছহীহ হাদীছের [140] ভিত্তিতে একদল বিদ্বান গর্ভচ্যুত মৃত সন্তানের জানাযা করার জন্য বলেন। জবাবে শাওকানী বলেন, মায়ের গর্ভে চার মাস অতিক্রম করাটাই শিশুর জীবনের প্রমাণ নয়, বরং ভূমিষ্ট হওয়ার পর কান্নাটাই তার জীবনের প্রমাণ হিসাবে গণ্য হবে। ইমাম মালেক, শাফেঈ, আওযাঈ ও জমহূর বিদ্বানগণ সেকথা বলেন।[141]

(৪) মৃতের প্রতি আদব (احترام الميت) :

(ক) মৃতের প্রতি সাধ্যমত সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। হাদীছে মৃতের হাড্ডি ভাঙ্গাকে জীবিতের হাড্ডি ভাঙ্গার সাথে তুলনা করা হয়েছে।[142] অন্য হাদীছে মৃতের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাটতে নিষেধ করা হয়েছে। [143] অতএব যরূরী রাষ্ট্রীয় নির্দেশ ব্যতীত মৃতদেহ কাটাছেঁড়া বা পোষ্ট মর্টেম করা গুরুতর অন্যায়। আজকাল পোষ্ট মর্টেম-এর বিষয়টি অনেকটা সস্তা হয়ে যাচ্ছে। তারপরেও লাশের প্রতি সেখানে অসম্মান করা হয় বলে শোনা যায়। যা থেকে সংশ্লিষ্ট সকলকে অবশ্যই বিরত থাকা কর্তব্য।

(খ) মৃত মুসলিম ব্যক্তিকে গালি দেওয়া নিষেধ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, لاَ تَسُبُّوا الْأَمْوَاتَ فَإِنَّهُمْ قَدْ أَفْضَوْا إِلَى مَا قَدَّمُوْا‘তোমরা মৃতদের গালি দিয়ো না। কেননা তারা তাদের অগ্রিম পেশকৃত অর্জনের প্রতি ধাবিত হয়েছে’।[144] তবে ঐ ব্যক্তি যদি ফাসিক ও বিদ‘আতী হয়, তবে তা থেকে বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যে সামান্য আলোচনা করা যেতে পারে। নতুবা বিরত থাকতে হবে।[145] কেননা সুন্দর মুসলমানের পরিচয় হ’ল অনর্থক বিষয় সমূহ হ’তে বিরত থাকা।[146] তাছাড়া ‘সন্দেহযুক্ত বিষয়াবলী থেকে নিঃসন্দেহ বিষয়ের দিকে ধাবিত হওয়ার’ জন্য হাদীছে নির্দেশ এসেছে। [147]

(৫) প্রতিবেশীদের কর্তব্য (لزوميات الجيران) :

মৃত্যুর পরে মৃতের প্রতিবেশী ও নিকটাত্মীয়দের কর্তব্য হ’ল, মৃতের পরিবারের লোকদেরকে (কমপক্ষে) একটি দিন ও রাত পেট ভরে খাওয়ানো। জা‘ফর বিন আবু ত্বালিব (রাঃ) শহীদ হ’লে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) তার প্রতিবেশীদেরকে এই নির্দেশ দিয়েছিলেন। এতদ্ব্যতীত বন্ধু-বান্ধব ও সকল হিতাকাংখীর কর্তব্য হ’ল মৃতের উত্তরাধিকারীদের সান্ত্বনা প্রদান করা ও তার বাচ্চাদের মাথায় সহানুভূতির হাত বুলানো।[148] রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদেরকে তিন দিনের বেশী কান্নাকাটি করতে নিষেধ করেন।[149]

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মৃতের বাড়ীতে গিয়ে তাদেরকে বিভিন্নভাবে সান্ত্বনা দিতেন। নিজের সন্তানহারা কন্যা যয়নব (রাঃ)-কে দেওয়া সর্বোত্তম সান্ত্বনা বাক্য হিসাবে বর্ণিত হাদীছটি নিম্নরূপ :

إِنَّ ِللهِ مَا أَخَذَ وَ ِللهِ مَا أَعْطَى وَكُلُّ شَيْئٍِ عِنْدَهُ إِلَى أجَلٍ مُّسَمَّى فَلْتَصْبِرْ وَلْتَحْتَسِبْ

উচ্চারণ : ইন্না লিল্লা-হি মা আখাযা ওয়া লিল্লা-হি মা আ‘ত্বা; ওয়া কুল্লু শাইয়িন ইনদাহূ ইলা আজালিম মুসাম্মা; ফালতাছবির ওয়াল তাহতাসিব

অনুবাদ : ‘নিশ্চয়ই সেটা আল্লাহর জন্য, যেটা তিনি নিয়েছেন এবং সেটাও আল্লাহর জন্য যেটা তিনি দিয়েছেন। প্রত্যেক বস্ত্ত তাঁর নিকটে রয়েছে একটি নির্দিষ্ট সময়কালের জন্য। অতএব তুমি ছবর কর ও ছওয়াবের আকাংখা কর’।[150] ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, কাউকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এটিই সর্বোত্তম হাদীছ।[151]

ফযীলত : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি তার কোন মুমিন ভাইয়ের বিপদে সান্ত্বনা প্রদান করল, আল্লাহ তাকে ক্বিয়ামতের দিন সবুজ রেশমের ঈর্ষণীয় জোড়া পরিধান করাবেন’।[152]

(৬) মৃতের জন্য করণীয় (الأعمال الحسنة للميت) :

১. আল্লাহ বলেন, إِنَّا نَحْنُ نُحْيِ الْمَوْتَى وَنَكْتُبُ مَا قَدَّمُوا وَآثَارَهُمْ وَكُلَّ شَيْءٍ أَحْصَيْنَاهُ فِي إِمَامٍ مُبِينٍ ‘আমরা মৃতকে জীবিত করি এবং লিখে রাখি যা তারা অগ্রে প্রেরণ করে ও যা তারা পশ্চাতে রেখে যায়। আমরা প্রত্যেক বস্ত্ত স্পষ্ট কিতাবে (অর্থাৎ স্ব স্ব আমলনামায়) সংরক্ষিত রাখি’।[153]

২. রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ اِنْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَةٍ إِلاَّ مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ، رواه مسلم-

‘মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সমস্ত আমল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, কেবল তিনটি আমল ব্যতীত : (ক) ছাদাক্বায়ে জারিয়া (খ) এমন ইল্ম যা থেকে কল্যাণ লাভ হয় এবং (গ) নেককার সন্তান, যে তার জন্য দো‘আ করে’।[154]

৩. রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘বান্দা বলে আমার মাল, আমার মাল। অথচ তার মাল তিনটি: (ক) যেটা সে খায় অতঃপর শেষ হয়ে যায় (খ) যেটা সে পরিধান করে অতঃপর তা জীর্ণ হয়ে যায় (গ) যেটা সে ছাদাক্বা দেয় বা দান করে সেটা তার জন্য সঞ্চিত থাকে। বাকী সবকিছু চলে যায় এবং লোকদের জন্য সে ছেড়ে যায়’। [155]

৪. তিনি আরও বলেন, ‘মাইয়েতের সঙ্গে তিনজন যায়। দু’জন ফিরে আসে ও একজন থেকে যায়। তার পরিবার ও মাল ফিরে আসে। কেবল ‘আমল’ তার সাথে থেকে যায়’। [156]

৫. তিনি আরও বলেন, ‘আখেরাতের সুখণ্ডসম্পদের তুলনায় দুনিয়া একটি মরা ছাগলের বাচ্চার চাইতেও তুচ্ছ’।[157]

৬. আল্লাহ বলেন, أَعْدَدْتُ لِعِبَادِى الصَّالِحِينَ مَا لاَ عَيْنَ رَأَتْ، وَلاَ أُذُنَ سَمِعَتْ، وَلاَ خَطَرَ عَلَى قَلْبِ بَشَرٍ ‘আমি আমার সৎকর্মশীল বান্দাদের জন্য এমন সুখ সম্ভার প্রস্ত্তত করে রেখেছি, যা কোন চোখ কখনো দেখেনি, কোন কান কখনো শোনেনি, কোন হৃদয় কখনো কল্পনা করেনি’। [158]

৭. রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘জান্নাতের একটি চাবুক রাখার মত ক্ষুদ্রতম স্থান, সমস্ত পৃথিবী ও তার মধ্যকার সম্পদরাজি অপেক্ষা উত্তম’। [159]

পেজ ন্যাভিগেশন

সর্বমোটঃ  1 টি বিষয় দেখান হচ্ছে।