• ৫৬৪০৩ টি সর্বমোট হাদিস আছেঃ
  • ৫৭৫৬ টি প্রশ্নোত্তর ও ফিকাহঃ

 

 

 

 


সংজ্ঞা ও সূচনা


আযান ( الأذان)

সংজ্ঞা : ‘আযান’ অর্থ, ঘোষণা ধ্বনি (الإعلام)। পারিভাষিক অর্থ, শরী‘আত নির্ধারিত আরবী বাক্য সমূহের মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ে উচ্চকণ্ঠে ছালাতে আহবান করাকে ‘আযান’ বলা হয়। ১ম হিজরী সনে আযানের প্রচলন হয়।[1]

সূচনা : ওমর ফারূক (রাঃ) সহ একদল ছাহাবী একই রাতে আযানের একই স্বপ্ন দেখেন ও পরদিন সকালে ‘অহি’ দ্বারা প্রত্যাদিষ্ট হ’লে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তা সত্যায়ন করেন এবং বেলাল (রাঃ)-কে সেই মর্মে ‘আযান’ দিতে বলেন।[2]

ছাহাবী আব্দুল্লাহ বিন যায়েদ (রাঃ) সর্বপ্রথম পূর্বরাতে স্বপ্নে দেখা আযানের কালেমা সমূহ সকালে এসে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকটে বর্ণনা করেন। পরে বেলালের কণ্ঠে একই আযান ধ্বনি শুনে হযরত ওমর (রাঃ) বাড়ী থেকে বেরিয়ে চাদর ঘেঁষতে ঘেঁষতে ছুটে এসে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলেন, ‘যিনি আপনাকে ‘সত্য’ সহকারে প্রেরণ করেছেন, তাঁর কসম করে বলছি আমিও অনুরূপ স্বপ্ন দেখেছি’। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ‘ফালিল্লা-হিল হাম্দ’ বলে আল্লাহর প্রশংসা করেন’।[3] একটি বর্ণনা মতে ঐ রাতে ১১ জন ছাহাবী একই আযানের স্বপ্ন দেখেন’। [4] উল্লেখ্য যে, ওমর ফারূক (রাঃ) ২০ দিন পূর্বে উক্ত স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু আব্দুল্লাহ বিন যায়েদ আগেই বলেছে দেখে লজ্জায় তিনি নিজের কথা প্রকাশ করেননি।[5]

আযানের ফযীলত


আযানের ফযীলত ( فضل الأذان) :

(১) আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন,

لاَ يَسْمَعُ مَدَى صَوْتِ الْمُؤَذِّنِ جِنٌّ وَّلاَ إِنْسٌ وَّ لاَ شَيْئٌ إِلاَّ شَهِدَ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ رواه البخاريُّ-

‘মুওয়ায্যিনের আযানের ধ্বনি জিন ও ইনসান সহ যত প্রাণী শুনবে, ক্বিয়ামতের দিন সকলে তার জন্য সাক্ষ্য প্রদান করবে’। [6]

(২) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন যে, ‘ক্বিয়ামতের দিন মুওয়ায্যিনের গর্দান সবচেয়ে উঁচু হবে’।[7]

(৩) মুওয়ায্যিনের আযান ধ্বনির শেষ সীমা পর্যন্ত সজীব ও নির্জীব সকল বস্ত্ত তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে ও সাক্ষ্য প্রদান করে। ঐ আযান শুনে যে ব্যক্তি ছালাতে যোগ দিবে, সে ২৫ ছালাতের সমপরিমাণ নেকী পাবে। মুওয়ায্যিনও উক্ত মুছল্লীর সমপরিমাণ নেকী পাবে এবং তার দুই আযানের মধ্যবর্তী সকল (ছগীরা) গুনাহ মাফ করা হবে’।[8]

(৪) ‘আযান ও এক্বামতের ধ্বনি শুনলে শয়তান ছুটে পালিয়ে যায় ও পরে ফিরে আসে’।[9]

(৫) যে ব্যক্তি বার বছর যাবৎ আযান দিল, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেল। তার প্রতি আযানের জন্য ৬০ নেকী ও এক্বামতের জন্য ৩০ নেকী লেখা হয়’। [10]

(৬) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ইমাম হ’ল (মুছল্লীদের ছালাতের) যামিন ও মুওয়ায্যিন হ’ল (তাদের ছালাতের) আমানতদার। অতঃপর তিনি তাদের জন্য দো‘আ করে বলেন, হে আল্লাহ! তুমি ইমামদের সুপথ প্রদর্শন কর ও মুওয়ায্যিনদের ক্ষমা কর।[11]

আযানের কালেমা সমূহ


আযানের কালেমা সমূহ ( كلمات الأذان) : ১৫ টি:

১. আল্লা-হু আকবার (অর্থ : আল্লাহ সবার চেয়ে বড়) اللهُ أَكْبَرُ....৪ বার

২. আশহাদু আল লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ أَشْهَدُ أَن لاَّ إلَهَ إِلاَّ اللهُ ....২ বার

(আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই)

৩. আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَّسُوْلُ اللهِ...২ বার

(আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল)

৪. হাইয়া ‘আলাছ ছালা-হ (ছালাতের জন্য এসো) حَيَّ عَلَى الصَّلاَةِ...২ বার

৫. হাইয়া ‘আলাল ফালা-হ (কল্যাণের জন্য এসো) حَيَّ عَلَى الْفَلاَحِ...২বার

৬. আল্লা-হু আকবার (আল্লাহ সবার চেয়ে বড়) اللهُ أَكْبَرُ ...২ বার

৭. লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ (আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই) لآ إلَهَ إِلاَّ اللهُ১ বার মোট= ১৫ বার। [12]

ফজরের আযানের সময় হাইয়া ‘আলাল ফালা-হ -এর পরে اَلصَّلاَةُ خَيْرٌ مِّنَ النَّوْمِ আছছালা-তু খায়রুম মিনান নাঊম’ (নিদ্রা হ’তে ছালাত উত্তম) ২ বার বলবে।[13]

এক্বামত


(খ) ‘এক্বামত’ (الإقامة) অর্থ দাঁড় করানো। উপস্থিত মুছল্লীদেরকে ছালাতে দাঁড়িয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারী শুনানোর জন্য ‘এক্বামত’ দিতে হয়। জামা‘আতে হউক বা একাকী হউক সকল অবস্থায় ফরয ছালাতে আযান ও এক্বামত দেওয়া সুন্নাত।[14]

হযরত আব্দুল্লাহ বিন যায়েদ (রাঃ) প্রমুখাৎ আবুদাঊদে বর্ণিত পূর্বোক্ত হাদীছ অনুযায়ী এক্বামতের কালেমা ১১টি। যথা :
১. আল্লা-হু আকবার (২ বার)
২. আশহাদু আল লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ,
৩. আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লা-হ,
৪. হাইয়া ‘আলাছ ছালা-হ,
৫. হাইয়া ‘আলাল ফালা-হ,
৬. ক্বাদ ক্বা-মাতিছ ছালা-হ, (২ বার),
৭. আল্লা-হু আকবার (২ বার),
৮. লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ = সর্বমোট ১১।[15]

উচ্চকণ্ঠের অধিকারী হওয়ায় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বেলাল (রাঃ)-কে ‘আযান’ দিতে বলেন এবং প্রথম স্বপ্ন বর্ণনাকারী আব্দুল্লাহ বিন যায়েদ (রাঃ)-কে ‘এক্বামত’ দিতে বলেন। আনাস (রাঃ) বলেন, বেলালকে দু’বার করে আযান ও একবার করে এক্বামত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল’।[16] এইভাবে ইসলামের ইতিহাসে দু’বার করে আযান ও একবার করে এক্বামত-এর প্রচলন হয়। ৮ম হিজরী সনে মক্কা বিজয়ের পর মদ্বীনায় ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বেলালকে মসজিদে নববীতে স্থায়ীভাবে মুওয়ায্যিন নিযুক্ত করেন। ১১ হিজরী সনে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মৃত্যুর পরে বেলাল (রাঃ) সিরিয়ায় হিজরত করেন এবং নিজ শিষ্য সা‘দ আল-ক্বারাযকে মদ্বীনায় উক্ত দায়িত্বে রেখে যান। হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রাঃ) বলেন,

كَانَ الْأَذَانُ عَلَى عَهْدِ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّتَيْنِ مَرَّتَيْنِ وَالْإِقَامَةُ مَرَّةً غَيْرَ أَنَّهُ كَانَ يَقُوْلُ قَدْ قَامَتِ الصَّلاَةُ قَدْ قَامَتِ الصَّلاَةُ، رواه أبو داؤد والنسائى-

‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর যামানায় আযান দু’বার ও এক্বামত একবার করে দেওয়ার রেওয়াজ ছিল, ‘ক্বাদ ক্বা-মাতিছ ছালা-হ’ দু’বার ব্যতীত। [17]

প্রকাশ থাকে যে, এখানে দু’বার আল্লা-হু আকবার-কে একটি জোড়া হিসাবে ‘একবার’ (মার্রাতান) গণ্য করা হয়েছে। তাছাড়া ‘আল্লাহ’ (الله) শব্দের হামযাহ (ا) ‘ওয়াছ্লী’ হওয়ার কারণে প্রথম ‘আল্লা-হু আকবার’-এর সাথে পরের ‘আল্লা-হু আকবার’ মিলিয়ে পড়া যাবে। একবার ‘ক্বাদ ক্বা-মাতিছ ছালাহ’ এবং প্রথমে ও শেষে একবার করে ‘আল্লা-হু আকবার’ বলার মতামতটি ‘শায’ (شاذ) যা অগ্রহণযোগ্য।[18] কেননা আবুদাঊদে আযান ও এক্বামতের কালেমা সমূহের যথাযথ বিবরণ প্রদত্ত হয়েছে।[19]

ইমাম খাত্ত্বাবী বলেন, মক্কা-মদ্বীনা সহ সমগ্র হিজায, সিরিয়া, ইয়ামন, মিসর, মরক্কো এবং ইসলামী বিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চলে একবার করে এক্বামত দেওয়ার নিয়ম চালু আছে এবং এটাই প্রায় সমস্ত ওলামায়ে ইসলামের মাযহাব।[20] ইমাম বাগাভী বলেন, এটাই অধিকাংশ বিদ্বানের মাযহাব। [21] দু’বার এক্বামত-এর রাবী হযরত আবু মাহযূরাহ (রাঃ) নিজে ও তাঁর পুত্র হযরত বেলাল (রাঃ) -এর অনুসরণে একবার করে ‘এক্বামত’ দিতেন।[22]

তারজী‘ আযান


তারজী‘ আযান (الترجيع في الأذان) :

তারজী‘ (الترجيع) অর্থ ‘পুনরুক্তি’। আযানের মধ্যে দুই শাহাদাত কালেমাকে প্রথমে দু’বার করে মোট চারবার নিম্নস্বরে, পরে দু’বার করে মোট চারবার উচ্চৈঃস্বরে বলাকে তারজী‘ বা পুনরুক্তির আযান বলা হয়। তারজী‘ আযানের কালেমা সংখ্যা হবে মোট ১৫+৪=১৯টি। তারজী‘ আযানের হাদীছটি হযরত আবু মাহযূরাহ (রাঃ) কর্তৃক আবু দাঊদে বর্ণিত হয়েছে।[23] ছহীহ মুসলিমে একই মর্মে একই রাবী হ’তে বর্ণিত অপর একটি রেওয়ায়াতে আযানে প্রথম তাকবীরের সংখ্যা চার-এর স্থলে দুই বলা হয়েছে।[24] তখন কলেমার সংখ্যা দাঁড়াবে তারজীসহ ১৭টি। আবু মাহযূরাহ বর্ণিত সুনানের হাদীছে এক্বামতের কালেমা ‘ক্বাদ ক্বা-মাতিছ ছালা-হ’ সহ মোট ১৭টি বর্ণিত হয়েছে।[25] এটি মূলতঃ তা‘লীমের জন্য ছিল।[26]

এক্ষণে ছহীহ হাদীছ মতে আযানের পদ্ধতি দাঁড়ালো মোট তিনটি ও এক্বামতের পদ্ধতি দু’টি। (১) আব্দুল্লাহ বিন যায়েদ (রাঃ) বর্ণিত বেলালী আযান ও এক্বামত যথাক্রমে ১৫টি ও ১১টি বাক্য সম্বলিত, যা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর যুগে মক্কা-মদ্বীনাসহ সর্বত্র চালু ছিল। (২) আবু মাহযূরাহ (রাঃ) বর্ণিত তারজী‘ আযানের ১৯টি ও ১৭টি এবং এক্বামতের ১৭টি। সবগুলিই জায়েয। তবে দু’বার করে আযান ও একবার করে এক্বামত বিশিষ্ট বেলালী আযান ও এক্বামত-এর পদ্ধতিটি নিঃসন্দেহে অগ্রগণ্য, যা মুসলিম উম্মাহ কর্তৃক সকল যুগে সমাদৃত।

সাহারীর আযান


সাহারীর আযান (الأذان في السحر) :

সাহারীর আযান দেওয়া সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর যামানায় তাহাজ্জুদ ও সাহারীর আযান বেলাল (রাঃ) দিতেন এবং ফজরের আযান অন্ধ ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতূম (রাঃ) দিতেন। তাই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘বেলাল রাত্রি থাকতে আযান দিলে তোমরা (সাহারীর জন্য) খানাপিনা কর, যতক্ষণ না ইবনে উম্মে মাকতূম আযান দেয়। কেননা সে ফজর না হওয়া পর্যন্ত আযান দেয় না’।[27] তিনি আরও বলেন, ‘বেলালের আযান যেন তোমাদেরকে সাহারী খাওয়া থেকে বিরত না করে। কেননা সে রাত্রি থাকতে আযান দেয় এজন্য যে, যেন তোমাদের তাহাজ্জুদ গোযার মুছল্লীগণ (সাহারীর জন্য) ফিরে আসে ও তোমাদের ঘুমন্ত ব্যক্তিগণ (তাহাজ্জুদ বা সাহারীর জন্য) জেগে ওঠে’।[28] এটা কেবল রামাযান মাসের জন্য ছিল না। বরং অন্য সময়ের জন্যও ছিল। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর যামানায় অধিক সংখ্যক ছাহাবী নফল ছিয়াম রাখতেন।[29] আজও রামাযান মাসে সকল মসজিদে এবং অন্য মাসে যদি কোন মসজিদের অধিকসংখ্যক প্রতিবেশী নফল ছিয়ামে যেমন আশূরার দু’টি ছিয়াম, আরাফাহর একটি ছিয়াম, শাওয়ালের ছয়টি ছিয়াম ও তাহাজ্জুদে অভ্যস্ত হন, তাহ’লে ঐ মসজিদে নিয়মিতভাবে উক্ত আযান দেওয়া যেতে পারে। যেমন মক্কা ও মদ্বীনায় দুই হারামে সারা বছর দেওয়া হয়ে থাকে।

সুরূজী প্রমুখ কিছু সংখ্যক হানাফী বিদ্বান রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর যামানার উক্ত আযানকে সাহারীর জন্য লোকজনকে আহবান ও সরবে যিকর বলে দাবী করেছেন। ছহীহ বুখারীর সর্বশেষ ভাষ্যকার হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী বলেন, এই দাবী ‘মারদূদ’ বা প্রত্যাখাত। কেননা লোকেরা ঘুম জাগানোর নামে আজকাল যা করে, তা সম্পূর্ণরূপে ‘বিদ‘আত’ যা ধর্মের নামে নতুন সৃষ্টি। উক্ত আযান-এর অর্থ সকলেই ‘আযান’ বুঝেছেন। যদি ওটা আযান না হয়ে অন্য কিছু হ’ত, তাহ’লে লোকদের ধোঁকায় পড়ার প্রশ্নই উঠতো না। আর রাসূল (ছাঃ)-কেও সাবধান করার দরকার পড়তো না।[30]

আযানের জওয়াব


আযানের জওয়াব ( إجابة المؤذن) :

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, إِذَا سَمِعْتُمُ الْمُؤَذِّنَ فَقُوْلُوْا مِثْلَ مَا يَقُوْلُ ‘যখন তোমরা আযান শুনবে, তখন মুওয়ায্যিন যা বলে তদ্রুপ বল’...। [31] অন্যত্র তিনি এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি মুওয়ায্যিনের পিছে পিছে আযানের বাক্যগুলি অন্তর থেকে পাঠ করে এবং ‘হাইয়া ‘আলাছ ছালা-হ’‘ফালা-হ’ শেষে ‘লা-হাওলা অলা-কুবওয়াতা ইল্লা বিল্লা-হ’ (নেই কোন ক্ষমতা, নেই কোন শক্তি আল্লাহ ব্যতীত) বলে, সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে।[32] অতএব আযান ও এক্বামতে ‘হাইয়া ‘আলাছ ছালা-হ’‘ফালা-হ’ বাদে বাকী বাক্যগুলির জওয়াবে মুওয়ায্যিন যেমন বলবে, তেমনই বলতে হবে। ইক্বামতের জবাব একইভাবে দিবে। কেননা আযান ও ইক্বামত দু’টিকেই হাদীছে ‘আযান’ বলা হয়েছে। [33]

উল্লেখ্য যে, (১) ফজরের আযানে ‘আছ ছালা-তু খায়রুম মিনান নাঊম’-এর জওয়াবে ‘ছাদাক্বতা ওয়া বারারতা’ বলার কোন ভিত্তি নেই।[34] (২) অমনিভাবে এক্বামত-এর সময় ‘ক্বাদ ক্বা-মাতিছ ছালা-হ’-এর জওয়াবে‘আক্বা-মাহাল্লা-হু ওয়া আদা-মাহা’ বলা সম্পর্কে আবুদাঊদে বর্ণিত হাদীছটি ‘যঈফ’।[35] (৩) ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’ -এর জওয়াবে ‘ছাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহে ওয়া সাল্লাম’ বলারও কোন দলীল নেই।

আযানের দো‘আ


আযানের দো‘আ (دعاء الأذان) :

আযানের জওয়াব দান শেষে প্রথমে দরূদ পড়বে।[36] অতঃপর আযানের দো‘আ পড়বে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন ‘যে ব্যক্তি আযান শুনে এই দো‘আ পাঠ করবে, তার জন্য ক্বিয়ামতের দিন আমার শাফা‘আত ওয়াজিব হবে’।[37]

اَللَّهُمَّ رَبَّ هٰذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ، وَالصَّلاَةِ الْقَائِمَةِ، آتِ مُحَمَّدًانِ الْوَسِيْلَةَ وَالْفَضِيْلَةَ، وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَّحْمُوْدًا الَّذِىْ وَعَدْتَهُ -

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা রববা হা-যিহিদ দা‘ওয়াতিত তা-ম্মাহ, ওয়াছ ছলা-তিল ক্বা-য়েমাহ, আ-তে মুহাম্মাদানিল ওয়াসীলাতা ওয়াল ফাযীলাহ, ওয়াব‘আছ্হু মাক্বা-মাম মাহমূদানিল্লাযী ওয়া‘আদ্তাহ’

অনুবাদ: হে আল্লাহ! (তাওহীদের) এই পরিপূর্ণ আহবান ও প্রতিষ্ঠিত ছালাতের তুমি প্রভু। মুহাম্মাদ (ছাঃ) -কে তুমি দান কর ‘অসীলা’ (নামক জান্নাতের সর্বোচ্চ সম্মানিত স্থান) ও মর্যাদা এবং পৌঁছে দাও তাঁকে (শাফা‘আতের) প্রশংসিত স্থান ‘মাক্বামে মাহমূদে’ যার ওয়াদা তুমি তাঁকে করেছ’। [38] মনে রাখা আবশ্যক যে, আযান উচ্চৈঃস্বরে দেওয়া সুন্নাত। কিন্তু উচ্চৈঃস্বরে আযানের দো‘আ পাঠ করা বিদ‘আত। অতএব মাইকে আযানের দো‘আ পাঠের রীতি অবশ্যই বর্জনীয়। আযানের অন্য দো‘আও রয়েছে।[39]

আযানের দো‘আয় বাড়তি বিষয় সমূহ


আযানের দো‘আয় বাড়তি বিষয় সমূহ (الزوائد في دعاء الأذان) :

আযানের দো‘আয় কয়েকটি বিষয় বাড়তিভাবে চালু হয়েছে, যা থেকে বিরত থাকা কর্তব্য। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কঠোরভাবে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার নামে মিথ্যারোপ করল, সে জাহান্নামে তার ঠিকানা করে নিল’।[40] ছাহাবী বারা বিন আযেব (রাঃ) রাতে শয়নকালে রাসূল (ছাঃ)-এর শিখানো একটি দো‘আয় ‘আ-মানতু বে নাবিইয়েকাল্লাযী আরসালতা’-এর স্থলে ‘বে রাসূলেকা’ বলেছিলেন। তাতেই রাসূল (ছাঃ) রেগে ওঠেন ও তার বুকে ধাক্কা দিয়ে ‘বে নাবিইয়েকা’ বলার তাকীদ করেন।[41] অথচ সেখানে অর্থের কোন তারতম্য ছিল না।

প্রকাশ থাকে যে, আযান একটি ইবাদত। এতে কোনরূপ কমবেশী করা জায়েয নয়। তবুও আযানের দো‘আয় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শব্দ ও বাক্য যোগ হয়েছে, যার কিছু নিম্নরূপ :

(১) বায়হাক্বীতে (১ম খন্ড ৪১০ পৃ:) বর্ণিত আযানের দো‘আর শুরুতে ‘আল্লা-হুম্মা ইন্নী আস-আলুকা বে হাকক্বে হা-যিহিদ দাওয়াতে’
(২) একই হাদীছের শেষে বর্ণিত ‘ইন্নাকা লা তুখ্লিফুল মী‘আ-দ
(৩) ইমাম ত্বাহাভীর ‘শারহু মা‘আনিল আছার’-য়ে বর্ণিত ‘আ-তে সাইয়িদানা মুহাম্মাদান’
(৪) ইবনুস সুন্নীর ‘ফী ‘আমালিল ইয়াওমে ওয়াল লায়লাহ’তে ‘ওয়াদ্দারাজাতার রাফী‘আতা’
(৫) রাফেঈ প্রণীত ‘আল-মুহার্রির’-য়ে আযানের দো‘আর শেষে বর্ণিত ‘ইয়া আরহামার রা-হেমীন’।[42] (৬) আযান বা ইক্বামতে ‘আশহাদু আন্না সাইয়েদানা মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’ বলা।[43]
(৭) বর্তমানে রেডিও বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে প্রচারিত আযানের দো‘আয় ‘ওয়ারঝুক্বনা শাফা‘আতাহূ ইয়াওমাল ক্বিয়া-মাহ’ বাক্যটি যোগ করা হচ্ছে। যার কোন শারঈ ভিত্তি জানা যায় না। এছাড়া ওয়াল ফাযীলাতা-র পরে ওয়াদ্দারাজাতার রাফী‘আতা এবং শেষে ইন্নাকা লা তুখলিফুল মী‘আ-দ যোগ করা হয়, যা পরিত্যাজ্য।
(৮) মাইকে আযানের দো‘আ পাঠ করা, অতঃপর শেষে লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লা-হ, ছাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলা।

আযানের অন্যান্য পরিত্যাজ্য বিষয়


আযানের অন্যান্য পরিত্যাজ্য বিষয় :

(১) আযানের আগে ও পরে উচ্চৈঃস্বরে যিকর : জুম‘আর দিনে এবং অন্যান্য ছালাতে বিশেষ করে ফজরের আযানের আগে ও পরে বিভিন্ন মসজিদে মাইকে বলা হয়
(ক) ‘বিসমিল্লা-হ, আছ্ছালাতু ওয়াসসালা-মু ‘আলায়কা ইয়া রাসূলাল্লা-হ ... ইয়া হাবীবাল্লাহ, ... ইয়া রহমাতাল লিল ‘আ-লামীন। এভাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে সালাম দেওয়ার পরে সরাসরি আল্লাহকেই সালাম দিয়ে বলা হয়, আছ্ছালাতু ওয়াসসালামু ‘আলায়কা ইয়া রববাল ‘আ-লামীন’। এটা বিদ‘আত তো বটেই, বরং চরম মূর্খতা। কেননা আল্লাহ নিজেই ‘সালাম’। তাকে কে সালাম দিবে? তাছাড়া হাদীছে আল্লাহকে সালাম দিতে নিষেধ করা হয়েছে। [44]
(খ) আযানের পরে পুনরায় ‘আছছালা-তু রাহেমাকুমুল্লা-হ’ বলে বারবার উঁচু স্বরে আহবান করা (ইরওয়া ১/২৫৫) এতদ্ব্যতীত
(গ) হামদ, না‘ত, তাসবীহ, দরূদ, কুরআন তেলাওয়াত, ওয়ায, গযল ইত্যাদি শোনানো। অথচ কেবলমাত্র ‘আযান’ ব্যতীত এসময় বাকী সবকিছুই বর্জনীয়। এমনকি আযানের পরে পুনরায় ‘আছছালাত, আছছালাত’ বলে ডাকাও হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রাঃ) প্রমুখ ছাহাবীগণ ‘বিদ‘আত’ বলেছেন।[45] তবে ব্যক্তিগতভাবে যদি কেউ কাউকে ছালাতের জন্য ডাকেন বা জাগিয়ে দেন, তাতে তিনি অবশ্যই নেকী পাবেন। [46]

(২) ‘তাকাল্লুফ’ করা : যেমন- আযানের দো‘আটি ‘বাংলাদেশ বেতারের’ কথক এমন ভঙ্গিতে পড়েন, যাতে প্রার্থনার আকুতি থাকেনা। যা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। কারণ নিজস্ব স্বাভাবিক সুরের বাইরে যাবতীয় তাকাল্লুফ বা ভান করা ইসলামে দারুণভাবে অপসন্দনীয়।[47]

(৩) গানের সুরে আযান দেওয়া : গানের সুরে আযান দিলে একদা আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রাঃ) জনৈক মুওয়ায্যিনকে ভীষণভাবে ধমক দিয়ে বলেছিলেন إِنِّيْ لَأُبْغِضُكَ فِي اللهِ ‘আমি তোমার সাথে অবশ্যই বিদ্বেষ করব আল্লাহর জন্য’।[48]

(৪) আঙ্গুলে চুমু দিয়ে চোখ রগড়ানো : আযান ও এক্বামতের সময় ‘মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’ শুনে বিশেষ দো‘আ সহ আঙ্গুলে চুমু দিয়ে চোখ রগড়ানো, আযান শেষে দুই হাত তুলে আযানের দো‘আ পড়া কিংবা উচ্চৈঃস্বরে তা পাঠ করা ও মুখে হাত মোছা ইত্যাদির কোন শারঈ ভিত্তি নেই।[49]

(৫) বিপদে আযান দেওয়া : বালা-মুছীবতের সময় বিশেষভাবে আযান দেওয়ারও কোন দলীল নেই। কেননা আযান কেবল ফরয ছালাতের জন্যই হয়ে থাকে, অন্য কিছুর জন্য নয়।

(৬) এতদ্ব্যতীত শেষরাতে ফজরের আযানের আগে বা পরে মসজিদে মাইকে উচ্চৈঃস্বরে কুরআন তেলাওয়াত করা, ওয়ায করা ও এভাবে মানুষের ঘুম নষ্ট করা ও রোগীদের কষ্ট দেওয়া এবং তাহাজ্জুদে বিঘ্ন সৃষ্টি করা কঠিন গোনাহের কাজ।[50]

পেজ ন্যাভিগেশন

সর্বমোটঃ  11 টি বিষয় দেখান হচ্ছে।
প্রথম পাতাআগের পাতা12