• ৫৬৫১৩ টি সর্বমোট হাদিস আছেঃ
  • ৫৭৫৬ টি প্রশ্নোত্তর ও ফিকাহঃ

 

 

 

 


ইমাম বুখারী'র সংক্ষিপ্ত জীবনী - দ্বিতীয় পাতা

ইমাম বুখারী (রঃ) মহৎ চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। দান-খয়রাত করা তাঁর স্বভাবে পরিণত হয়ে গিয়েছিল।  উত্তরাধিকারসূত্রে তিনি পিতার বিরাট ধন-সম্পত্তির অধিকারী হয়েছিলেন কিন্তু তিনি তাঁর সবই গরীব দুঃখী ও হাদীস শিক্ষার্থীদের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছেন। তিনি নিজে অতি সামান্য আহার করতেন। কখনোও কখনও দুই তিনটি বাদাম খেয়ে সারাদিন কাটিয়ে দিয়েছেন। বহু বছর তরকারী ছাড়া রুটি খাওয়ার ফলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।

ইমাম বুখারী (রঃ)-এর সততা জনশ্রুতিতে পরিণত হয়েছিল। প্রসঙ্গত এখানে একটি ঘটনার উল্লেখ করা যায়। আবূ হাফস (রঃ) একবার তাঁর কাছে বহু মূল্যবান পণ্যদ্রব্য পাঠান। এক ব্যাবসায়ী তা পাঁচ হাজার দিরহাম মুনাফা দিয়ে খরিদ করতে চাইলে তিনি বললেনঃ তুমি আজ চলে যাও, আমি চিন্তা করে দেখি। পরের দিন সকালে আরেক দল ব্যাবসায়ী এসে দশ হাজার দিরহাম মুনাফা দিতে চাইলে তিনি বললেনঃ গতরাতে আমি একদল ব্যাবসায়ীকে দিবার নিয়্যাত করে ফলেছি; কাজেই আমি আমার নিয়্যাতের খেলাফ করতে চাই না। পরে তিনি তা পূর্বোক্ত ব্যবসায়ীকে পাঁচ হাজার দিরহামের মুনাফায় দিয়ে দিলেন। নিয়্যাত বা মনের সংকল্প রক্ষা করার জন্য পাঁচ হাজার দিরহাম মুনাফা ছেড়ে দিতে তিনি দ্বিধাবোধ করেন নি। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেনঃ আমি জীবনে কোন দিন কারো গীবত শিকায়াত করিনি। তিনি রমযান মাসে পুরো তারাবীতে এক খতম এবং প্রতি তিন রাতে এক খতম কুরআন মজিদ তিলাওয়াত করতেন। একবার নফল সালাত আদায় কালে তাঁকে এক বিচ্ছু ষোল সতেরো বার দংশন করে, কিন্তু তিনি যে সুরা পাঠ করছিলেন তা সমাপ্ত না করে সালাত শেষ করেন নি। এভাবে তাকওয়া-পরহেযগারী, ইবাদত-বন্দেগী দান-খয়রাতের বহু ঘটনা তাঁর জীবনীকারগন বর্ণনা করেছেন, যা অসাধারণ ও বিস্ময়কর।

ইমাম বুখারী (রঃ)-কে জীবনে বহু বিপদ ও কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছে। হিংসুকদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তিনি অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ভোগ করেন। বুখারার গভর্নর তাঁর দুই পুত্রকে প্রাসাদে গিয়ে বিশেষভাবে হাদীস শিক্ষাদানের আদেশ করেন। এতে হাদীসের অবমাননা মনে করে ইমাম বুখারী (রঃ) তা প্রত্যাখ্যান করেন। এ সুযোগে দরবারের কিছু সংখ্যক হিংসুকের চক্রান্তে তাঁকে শেষ বয়সে জন্মভূমি বুখারা ত্যাগ করতে হয়েছিল। এ সময় তিনি সমরকন্দবাসীর আহবানে সেখানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রোওয়ানা হন। পথিমধ্যে খরতাংগ পল্লীতে তাঁর এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে উঠলেন। সেখানে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পহেলা শাওয়াল শনিবার ২৫৬ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন। দাফনের পর তাঁর কবর থেকে সুগন্ধি বিচ্ছুরিত হতে থাকে। লোকে দলে দলে তাঁর কবরের মাটি নিতে থাকে। কোনভাবে তা নিবৃত করতে না পেরে কাটা দিয়ে ঘিরে তাঁর কবর রক্ষা করা হয়। পরে জনৈক ওলিআল্লাহ আকিদা নষ্ট হওয়ার আশংকায় সে সুঘ্রান বন্ধ হওয়ার জন্য দু’আ করেন এবং তারপর তা বন্ধ হয়ে যায়।

বুখারী শরীফ

বুখারী শরীফের পূর্ণ নাম আল জামিউল মুসনাদুস সহীহুল মুখতাসারু মিন উমূরি রাসূলিল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ওয়া সুনানিহী ওয়া আয়্যামিহী। হাদীসের প্রধান প্রধান বিষয়সমূহ সম্বলিত বলে একে ‘জামি’ বা পূর্ণাঙ্গ বলা হয়। কেবল মাত্রও সহীহ হাদীসে সন্নিবেশিত বলে ‘সহীহ’ এবং ‘মারফূ’ ‘মুত্তাসিল’ হাদীস বর্ণিত হওয়ার এর মুসনাদ নামকরণ করা হয়েছে।

সকল মুহাদ্দিসের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত এই যে, সমস্ত হাদীসগ্রন্থের মধ্যে বুখারী শরীফের মর্যাদা সবার ঊর্ধ্বে এবং কুরআন মজীদের পরেই সর্বাপেক্ষা বিশুদ্ধ গ্রন্থ। এক লাখ সহীহ ও দুই লাখ গায়ের সহীহ মোট তিন লাখ হাদীস ইমাম বুখারী (রঃ)-এর মুখস্থ ছিল। এ ছাড়া তাঁর কাছে সংগৃহীত আরও তিন লাখ, মোট ছয় লাখ হাদীস থেকে যাচাই-বাছাই করে তিনি দীর্ঘ ষোল বছরে এ গ্রন্থখানি সংকলন করেন। বুখারী শরীফে সর্বমোট সাত হাজার তিনশত সাতানব্বইটি হাদীস সংকলিত হয়েছে। ‘তাকরার’ বা পুনরাবৃত্তি (যা বিশ্বের প্রয়োজনে করা হয়েছে) বাদ দিলে এই সংখ্যা মাত্র দুই হাজার পাঁচশত তের-তে দাঁড়ায়। মু’আল্লাক ও মুতাবা’আত যোগ করলে এর সংখ্যা পৌছায় নয় হাজার বিরাশিতে। বুখারী শরীফের সর্বপ্রধান বর্ণনাকারী ফারাবরী (রঃ)-এর বর্ণনা অনুসারে বিখ্যাত ভাষ্যকার হাফিয ইবন হাজার (রঃ) কতৃক     গননার সংখ্যা এখানে প্রদত্ত হয়েছে। বিভিন্ন বর্ণনাকারী ও গণনাকারীদের গণনায় এ সংখ্যার তারতম্য পরিলক্ষি ত হয়।

উপরে বর্ণিত সুক্ষ যাচাই-বাছাই ছাড়াও প্রতিটি হাদীস সংকলনের আগে ইমাম বুখারী গোসল করে দু’রাকাত সালাত আদায় করে ইসতিখারা করার পর এক-একটি হাদীস লিপিবদ্ধ করেছেন। এরূপ কঠোর সতর্কতা অবলম্বনের ফলে অন্যান্য হাদীসগ্রন্থের তুলনায় সারা মুসলিম জাহানে বুখারী শরীফ হাদীসগ্রন্থ হিসেবে সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পেরেছে। জমহূর মুহাদ্দিসের বুখারী শরীফের বর্ণিত প্রতিটি হাদীস নিঃসন্দেহে সহীহ ও গ্রহণযোগ্য।

বুখারী শরীফ সংকলনের জন্য ইমাম বুখারী (রঃ)-এর উদ্বুদ্ধ হওয়ার কারণসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য যে, তাঁর বিখ্যাত ওস্তাদ ইসহাক ইবন রাহওয়ায়হ (রঃ) পরোক্ষভাবে তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলেনঃ তোমারদের মধ্যে কেউ কি এমন নেই, যে ‘ গায়ের সহীহ হাদীস’ থেকে ‘সহীহ হাদীস’ বাছাই করে একখানি গ্রন্থ সংকলন করতে পারে?

ইমাম বুখারী (রঃ) একবার স্বপ্নে দেখেন যে, রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর দেহ মুবারকের উপর মাছি এসে বসছে আর তিনি পাখা দিয়ে সেগুলকে তাড়িয়ে দিচ্ছেন। তা’বীর বর্ণনাকারী আলিমগন এর ব্যাখ্যা দিলেন যে, রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর সহীহ হাদীসসমূহ  ‘গায়ের সহীহ’ হাদীস থেকে বাছাইয়ের কাজ স্বপ্ন দ্রষ্টা দ্বারা সম্পাদিত হবে। তখন থেকেই ইমাম বুখারীর মনে এরূপ একটি গ্রন্থ সংকলনের ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠে এবং তিনি দীর্ঘ ষোল বছরের অক্লান্ত সাধনার পর তা সমাপ্ত করতে সক্ষম হয়। এই গ্রন্থ প্রনয়নে তাঁর মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল সহীহ হাদীসের একখানি উচ্চাঙ্গের গ্রন্থ রচনা করা এবং তাঁর সে উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে সফল হয়েছে। এ গ্রন্থের হাদীস সন্নিবেশের পর তিনি চিন্তা করলেন যে, অধ্যায়নের সাথে সাথে যাতে লোক এর ভাবার্থ ও নির্দেশিত বিধানবলী সম্পর্কে অবহিত ও উপকৃত হতে পারে তজ্জন্য হাদীসসমূহ তিনি বিভিন্ন অধ্যায় ও পরিচ্ছেদে বিন্যস্ত করে ‘তরজমাতুল বাব’ বা শিরোনাম কায়েম করেন। যেহেতু দীন-ই-ইসলামের শিক্ষা ব্যাপক ও বিস্তৃত, তাই এর বিধানাবলীর পরিসীমা নির্ধারণ করা দুষ্কর। পক্ষান্তরে ইমাম বুখারী (রঃ) কর্তৃক সংকলিত হাদীসগুলোর সংখ্যা সীমিত। এই সীমিত সংখ্যক হাদীস দ্বারা দীন-ই ইসলামের ব্যাপক ও বিস্তৃতি শিক্ষার দলীল-প্রমাণ উপস্থাপন দুষ্কর। তাই ইমাম বুখারী (রঃ) সংকলিত হাদীসগুলি দ্বারা ব্যাপক বিধানাবলীর দলীল কায়েম করতে গভীর জ্ঞ্যান ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁকে ইশারা বা ইঙ্গিতের আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়েছে। ফলে বুখারী শরীফ অধ্যয়নে তারজমাতুল বাব ও বর্ণিত হাদীসের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান  করা আলিমদের দৃষ্টিতে একটি কঠিন সমস্যা ও প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
বুখারী শরীফ প্রনয়নের পর থেকে আজ এই পর্যন্ত এই কঠিন সমস্যার সমাধান করতে মুহাদ্দিস, ফকীহ ও আলিম সমাজকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। শিরোনামের এই রহস্য ভেদ করতে প্রত্যেকেই স্বীয় জ্ঞ্যান-বিবেকের তুণ থেকে তীর নিক্ষেপে কোন কসুর করেন নি, তবুও মুহাক্কিক আলিমদের ধারণায়, আজও কারো নিক্ষিপ্ত তীর থেকে তীর নিক্ষেপ কোন কসুর করেন নি, তবুও মুহাক্কিক আলিমদের ধারণায়, আজও কারো নিক্ষিপ্ত তীর লক্ষ্যস্থল ভেদে সর্বক্ষেত্রে পুরোপুরি সমর্থ হয় নি। এজন্য বলা হয়ে থাকে ‘ফিকহুল বুখারী ফী তারাজিমিহী’ অর্থাৎ ইমাম বুখারী (রঃ)-এর জ্ঞ্যান-গরিমা ও বুদ্ধি-চাতুর্য তাঁর গ্রন্থের তরজমা বা শিরোনামের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে। পরবর্তীকালে মহিষীগণ এই লুক্কায়িত রত্ন যথাযথ উদ্ধারের সর্বশক্তি ও শ্রম ব্যায় করেও পূর্ণভাবে সফলকাম হতে ব্যর্থ হয়েছেন।

আগের পাতা এখানে...  |  পরের পাতা এখানে