• ৫৬৪০৩ টি সর্বমোট হাদিস আছেঃ
  • ৫৭৫৬ টি প্রশ্নোত্তর ও ফিকাহঃ

 

 

 

 


মাস'আলা / মাসায়েল - প্রশ্নোত্তর

(৬৭) আকীদার মাসআলায় কি অজ্ঞতার অজুহাত গ্রহণযোগ্য?

আকীদার ক্ষেত্রে অজ্ঞতার অজুহাত গ্রহণ করা হবে কি না এ বিষয়টি অন্যান্য ফিক্‌হী মাসআলার ন্যায় মতবিরোধপূর্ণ। ব্যক্তি বিশেষের উপর বিধান প্রয়োগের ক্ষেত্রে কখনো কখনো এই মতভেদ শাব্দিক হতে পারে। অর্থ্যাৎ বিদ্বানগণ একমত যে, কোন একটি কথা বা কাজ করা বা ছেড়ে দেয়াটা কুফরী। কিন্তু যে ব্যক্তি এ কুফরীতে লিপ্ত হল, নির্দিষ্টভাবে তার উপর কি কুফরীর বিধান প্রযোজ্য হবে? কেননা সেখানে কুফরীর শর্তসমূহ বিদ্যামান এবং কাফের না হওয়ার প্রতিবন্ধতা নেই। না কি কাফের হওয়ার দাবী অবর্তমান থাকায় বা কাফের হওয়ার কোন প্রতিবন্ধক থাকায় উক্ত ব্যক্তিকে কাফের বলা প্রযোজ্য হবে না? এ ব্যাপারে আলেমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। যেসমস্ত কারণে মানুষ কাফের হয়ে যায় সেগুলো সম্পর্কে অজ্ঞতা দু’ধরণের হতে পারে।

(১) এমন ব্যক্তি হতে কুফরী প্রকাশ পাওয়া, যে ইসলাম ব্যতীত অন্য ধর্মের অনুসারী অথবা সে কোন দ্বীনই বিশ্বাস করে না এবং সে এটা কোন সময় কল্পনাও করতে পারেনি যে, সে যে বিষয়ের উপর রয়েছে, তা ইসলাম বহির্ভুত। এই ব্যক্তির উপর দুনিয়াতে কাফেরের বিধান প্রয়োগ করা হবে। আখেরাতের বিষয়টি সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে। এ ব্যাপারে গ্রহণযোগ্য মত হল, আল্লাহ পরকালে তাকে যেভাবে পরীক্ষা করবেন। তাদের আমল সম্পর্কে আল্লাহই ভাল জানেন। কিন্তু আমরা এ কথা ভাল করেই জানি যে, বিনা অপরাধে কেউ জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। আল্লাহ বলেন,

)وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدًا(

“আপনার প্রতিপালক কাউকে জুলুম করবেন না।” (সূরা কাহ্‌ফঃ ৪৯) দুনিয়াতে তার উপর কুফরীর বিধান প্রয়োগ হওয়ার কারণ এই যে, সে ইসলামকে দ্বীন হিসাবে গ্রহণ করেনি। তাই তার উপর ইসলামের বিধান প্রয়োগ হবেনা। পক্ষান্তরে আখেরাতে তাকে পরীক্ষা করার ব্যাপারে অনেক হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। ইবনুল কায়্যিম (রঃ) তাঁর রচিত “তরীকুল হিজরাতাইন” নামক বইয়ে মুশরিক শিশুদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে হাদীছগুলো উল্লেখ করেছেন।

(২) এমন লোক থেকে কুফরী প্রকাশ পাওয়া, যার ধর্ম ইসলাম, কিন্তু সে এই কুফরী আকীদা নিয়ে বসবাস করছে অথচ সে জানে না যে, এই আকীদা ইসলাম বিরোধী। কেউ তাকে সতর্কও করে নাই। এরূপ ব্যক্তির ক্ষেত্রে দুনিয়াতে ইসলামের বিধান প্রযোজ্য হবে অর্থাৎ তাকে মুসলমান হিসাবে গণ্য করা হবে। পরকালের বিষয়টি আল্লাহর হাতে। কুরআন, সুন্নাহ এবং আলেমদের বাণী হতে এ মর্মে অনেক দলীল রয়েছে। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ

)وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولًا(                                                                          

“রাসূল না পাঠিয়ে আমি কাউকে শাস্তি দেবনা।” (সূরা ইসরাঃ ১৫) আল্লাহ আরো বলেনঃ

)وَمَا كَانَ رَبُّكَ مُهْلِكَ الْقُرَى حَتَّى يَبْعَثَ فِي أُمِّهَا رَسُولًا يَتْلُوا عَلَيْهِمْ آيَاتِنَا وَمَا كُنَّا مُهْلِكِي الْقُرَى إِلَّا وَأَهْلُهَا ظَالِمُونَ(

“আপনার পালনকর্তা জনপদ সমূহকে ধ্বংস করেন না, যে পর্যন্ত তার কেন্দ্রস্তলে রাসূল প্রেরণ না করেন, যিনি তাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করেন এবং আমি জনপদ সমূহকে তখনই ধ্বংস করি, যখন তার বাসিন্দারা জুলুম করে।” (সূরা কাসাস ৫৯) আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

)رُسُلًا مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ لِأَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ(

“সুসংবাদদাতা ও ভীতি-প্রদর্শনকারী রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি, যাতে রাসূলগণের পরে আল্লাহর প্রতি ওজুহাত বা যুক্তি খাড়া করার মত কোন অবকাশ মানুষের জন্য না থাকে।” (সূরা নিসাঃ ১৬৫) আল্লাহ বলেন

)وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ فَيُضِلُّ اللَّهُ مَنْ يَشَاءُ وَيَهْدِي مَنْ يَشَاءُ(

“আমি সব রাসূলকেই তাদের জাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছি, যাতে তাদেরকে পরিস্কারভাবে বোঝাতে পারেন। অতঃপর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথ প্রদর্শন করেন।” (সূরা ইবরাহীমঃ ৪) আল্লাহ তাআ’লা সূরা তাওবায় এরশাদ করেনঃ

)وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُضِلَّ قَوْمًا بَعْدَ إِذْ هَدَاهُمْ حَتَّى يُبَيِّنَ لَهُمْ مَا يَتَّقُونَ(

“আর আল্লাহ কোন জাতিকে হেদায়েত করার পর পথভ্রষ্ট করেন না যতক্ষণ না তাদের জন্য পরিষ্কারভাবে বলে দেন সে সব বিষয়, যা থেকে তাদের বেঁচে থাকা দরকার।” (সূরা তাওবাঃ ১১৫) আল্লাহ আরো বলেনঃ

)وَهَذَا كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ مُبَارَكٌ فَاتَّبِعُوهُ وَاتَّقُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ أَنْ تَقُولُوا إِنَّمَا أُنزِلَ الْكِتَابُ عَلَى طَائِفَتَيْنِ مِنْ قَبْلِنَا وَإِنْ كُنَّا عَنْ دِرَاسَتِهِمْ لَغَافِلِينَ أَوْ تَقُولُوا لَوْ أَنَّا أُنزِلَ عَلَيْنَا الْكِتَابُ لَكُنَّا أَهْدَى مِنْهُمْ فَقَدْ جَاءَكُمْ بَيِّنَةٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ(

“এটি এমন একটি বরকতময় গ্রন', যা আমি অবতীর্ণ করেছি। অতএব তোমরা এর অনুসরণ কর এবং ভয় কর, যাতে তোমরা করুণাপ্রাপ্ত হও এবং যাতে তোমরা এ কথা বলতে না পার যে, গ্রন' তো কেবল আমাদের পূর্ববর্তী দু’টি সম্প্রদায়ের প্রতিই অবতীর্ণ হয়েছে। আমরা সেগুলোর পাঠ ও পঠন সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। কিংবা এ কথা বলতে না পার যে, যদি আমাদের প্রতি কোন গ্রন' অবতীর্ণ হত, আমরা তাদের চাইতে অধিক সঠিক পথপ্রাপ্ত হতাম। অবশ্যই তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ হতে তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ, হেদায়েত ও রহমত এসে গেছে।” (সূরা আন্‌আমঃ ১৫৫-৫৭) এমনি আরো অসংখ্য আয়াত রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে, মানুষের কাছে দ্বীনের শিক্ষা দান ও তা বর্ণনা করার পূর্বে হুজ্জত কায়েম হবে না।

 ছহীহ মুসলিম শরীফে আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لا يَسْمَعُ بِي أَحَدٌ مِنْ هَذِهِ الْأُمَّةِ يَهُودِيٌّ وَلا نَصْرَانِيٌّ ثُمَّ يَمُوتُ وَلَمْ يُؤْمِنْ بِالَّذِي أُرْسِلْتُ بِهِ إِلا كَانَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ

“ঐ সত্বার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, এই উম্মাতের কোন ইয়াহুদী বা নাসারা আমার কথা শুনে আমার আনিত বিষয় সমূহের প্রতি ঈমান আনয়ন না করে মৃত্য বরণ করলে সে জাহান্নামের অধিবাসী হবে।”

   আলেমগণ বলেন, কোন নও মুসলিম বা অমুসলিম দেশে বসবাসকারী বা মুসলমানদের এলাকা থেকে দূরবর্তী স্থানের অধিবাসী হওয়ার কারণে কেউ যদি কুফরী কাজে লিপ্ত হয়, তাকে কাফের হওয়ার ফতওয়া দেয়া যাবেনা। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন, যারা আমাকে চেনে, তারা অবশ্যই জানে যে, নির্দিষ্টভাবে কাউকে কাফের বা ফাসেক বলা থেকে আমি কঠোরভাবে নিষেধ করে থাকি। তবে যে ব্যক্তি কাফের বা ফাসেক হওয়ার কারণসমূহ সম্পর্কে অবগত আছে, তার কথা ভিন্ন। আমি আবারও বলছি যে, এই উম্মতের কেউ ভুলক্রমে অন্যায় কাজে লিপ্ত হলে আল্লাহ তাআ’লা তাকে ক্ষমা করে দিবেন। চাই আকীদার মাসআলায় ভুল করুক কিংবা অন্য কোন মাসআলায়। সালাফে সালেহীন অনেক মাসআলায় মতভেদ করেছেন। তারপরও কেউ কাউকে কাফের বলেন নি। তাদের থেকে এও বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি এরূপ কথা বলবে, সে কাফের হয়ে যাবে, এটা ঠিক, কিন্তু কোন নির্দিষ্ট কর্মের উপরে হুকুম লাগানো এবং ব্যক্তির উপরে হুকুম লাগানোর মাঝে পার্থক্য রয়েছে। শায়খুল ইসলাম আরো বলেন, কাউকে কাফের বলা অত্যন্ত ভয়ানক বিষয়। করা হয়েছে। কারণ কুফরীতে লিপ্ত ব্যক্তি এমন হতে পারে যে, সে নও মুসলিম অথবা সে আলেম-উলামা থেকে দূরের কোন জনপদে বসবাস করছে। যার কারণে ইসলামের বিধি-বিধান সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করতে পারেনি। কাজেই এরূপ ক্ষেত্রে দ্বীনের কোন বিষয় অস্বীকার করলেই তাকে কাফের বলা যাবে না। যতক্ষণ না তার কাছে হুজ্জত (কুরআন্তসুন্নাহর দলীল সমূহ) পেশ করা হবে। এও হতে পারে যে, সে দলীল-প্রমাণ শুনেনি অথবা শুনেছে কিন্তু বিশুদ্ধ সূত্রে তার কাছে পৌঁছেনি। কখনো এও হতে পারে যে, সে একজন আলেম। তার কাছে দলীল রয়েছে বা দলীলের ব্যাখ্যা রয়েছে। যদিও তা সঠিক নয়।

   শায়খুল ইসলাম মুহাম্মাদ বিন আবদুল ওয়াহ্‌হাব (রঃ) বলেনঃ আমি ঐ ব্যক্তিকে কাফের বলি, যে দ্বীনে মুহাম্মাদী সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর তাকে গালি-গালাজ করল। শুধু তাই নয়; বরং মানুষকে আল্লাহর দ্বীন হতে বিরত রাখে এবং ধার্মিক লোকদের সাথে শত্রুতা পোষণ করে। আমি এই শ্রেণীর লোকদেরকে কাফের বলে থাকি। তিনি আরো বলেন, যারা বলে আমরা ব্যাপকভাবে মানুষকে কাফের বলি এবং দ্বীন পালনে সক্ষম ব্যক্তিকেও আমাদের কাছে হিজরত করে চলে আসতে বলি, তারা অপবাদ প্রদানকারী মিথ্যুক। তারা মানুষকে আল্লাহর দ্বীন গ্রহণ করতে বাঁধা দিয়ে থাকে। আবদুল কাদের জ্বিলানী এবং সায়্যেদ আহ্‌মাদ বাদভীর  কবরের উপরে যে মূর্তি রয়েছে, তার উপাসকদেরকে যদি অজ্ঞতার কারণে এবং তাদেরকে কেউ সতর্ক না করার কারণে কাফের না বলি, তাহলে কিভাবে আমরা এমন নির্দোষ লোকদেরকে আমাদের দিকে হিজরত না করার কারণে কাফের বলব, যারা কখনো আল্লাহর সাথে শরীক করেনি এবং আমাদেরকে কুফর প্রতিপন্ন করেনি ও আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করে নি?

   আল্লাহর কিতাব, রাসূলের সুন্নাত এবং আলেমদের কথা অনুযায়ী দলীল-প্রমাণ পেশ করা ব্যতীত কাউকে কাফের বলা যাবে না। আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহের দাবীও তাই। তিনি অযুহাত পেশ করার সুযোগ দূর না করে কাউকে শাস্তি দিবেন না। বিবেক দ্বারা মানুষের উপরে আল্লাহর হক সাব্যস্ত করা সম্ভব নয়। যদি তাই হত, তাহলে রাসূল প্রেরণের মাধ্যমে হুজ্জত পেশ করা যথেষ্ট হত না।

   সুতরাং একজন মুসলিম ততক্ষণ পর্যন্ত মুসলিম হিসাবেই পরিগণিত হবে, যতক্ষণ না শরীয়তের দলীলের মাধ্যমে তার ইসলাম ভঙ্গ হবে। কাজেই কাফের বলার ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ তা না হলে দু’টি বড় ধরণের ভয়ের কারণ রয়েছে।

(১) আল্লাহর উপর মিথ্যাচারিতার অপবাদ। সাথে সাথে যার উপর হুকুম লাগানো হল তাকেও এমন দোষে দোষী সাব্যস্ত করা হল, যা থেকে সে সম্পূর্ণ মুক্ত। আল্লাহর উপর মিথ্যাচারিতার অপবাদ এভাবে হয় যে, এমন ব্যক্তিকে কাফের বলা হয়েছে, যাকে আল্লাহ কাফের বলেন নি। এটি আল্লাহ যা হালাল করেছেন, তা হারাম করার শামিল। কেননা কাউকে কাফের বলা বা না বলা এটি কেবলমাত্র আল্লাহরই অধিকার। যেমনিভাবে কোন কিছু হারাম করা বা হালাল করার দায়িত্ব আল্লাহর উপরে।

(২) দ্বিতীয় সমস্যাটি হল মুসলিম ব্যক্তি যে অবস্থার উপর প্রতিষ্ঠিত, তার বিপরীত অবস্থানে নিয়ে যাওয়া। কেননা যখন কোন মুসলিমকে লক্ষ্য করে কাফের বলবে, তখন সে যদি কাফের না হয়, তাহলে ফতোয়া দানকারী নিজেই কাফের হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ছহীহ মুসলিমে ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

إِذَا قَالَ الرَّجُلُ لِأَخِيهِ يَا كَافِرُ فَقَدْ بَاءَ بِهِ أَحَدُهُمَا

“যখন কোন ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইকে কাফের বলবে, তখন তাদের দু’জনের একজন কাফেরে পরিণত হবে।” অন্য বর্ণনায় রয়েছে, যাকে কাফের বলা হল, সে যদি কাফের হয়ে থাকে তাহলে কাফের হবে। অন্যথায় ফতোয়া দানকারী নিজেই কাফেরে পরিণত হবে। মুসলিম শরীফে আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে,

وَمَنْ دَعَا رَجُلًا بِالْكُفْرِ أَوْ قَالَ عَدُوَّ اللَّهِ وَلَيْسَ كَذَلِكَ إِلَّا حَارَ عَلَيْهِ

“যে ব্যক্তি কোন মুসলমানকে কাফের বলবে অথবা আল্লাহর শত্রু বলবে, সে অনুরূপ না হয়ে থাকলে যে বলল সে নিজেই কাফের বা আল্লাহর শত্রু হিসাবে পরিণত হয়ে যাবে।”  যে ব্যক্তি কোন মুসলিমকে কাফের বলে, সে নিজের আমল নিয়ে অহংকার করে এবং অপরকে তুচ্ছ জ্ঞান করে থাকে। এ ধরণের ব্যক্তি দু’টি সমস্যার সম্মুখীন। নিজের আমলকে খুব বড় মনে করলে আমল ধ্বংস হয়ে যাবে এবং  তার মধ্যে অহংকার আসার কারণে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ

قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ الْكِبْرِيَاءُ رِدَائِي وَالْعَظَمَةُ إِزَارِي فَمَنْ نَازَعَنِي وَاحِدًا مِنْهُمَا قَذَفْتُهُ فِي النَّارِ

“আল্লাহ বলেন, অহংকার আমার চাদর। বড়ত্ব আমার পোষাক। যে ব্যক্তি আমার এ দু’টির যে কোন একটি পোষাক নিয়ে টানাটানি করবে আমি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব।” সুতরাং কাউকে কাফের বলার পূর্বে দু’টি বিষয় খেয়াল করতে হবেঃ

 (১) আল্লাহর কিতাব এবং রাসূলের সুন্নায় কাজটিকে কুফরী বলা হয়েছে কি না। যাতে করে আল্লাহর উপর মিথ্যাচারিতায় লিপ্ত না হয়।

(২) যার ভিতরে কাফের হওয়ার কারণ ও শর্তসমূহ বিদ্যমান এবং কাফের না হওয়ার যাবতীয় বাঁধামুক্ত। কেবলমাত্র তার উপরই কুফরীর বিধান প্রয়োগ করা। কাফের হওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হল, জেনে-শুনে শরীয়ত বিরোধী এমন কাজে লিপ্ত হওয়া, যা কুফরীকে আবশ্যক করে। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ

)وَمَنْ يُشَاقِقْ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا(

“আর সুপথ প্রকাশিত হওয়ার পর যে রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনগণের বিপরীত পথের অনুগামী হয়, আমি তাকে তাতেই প্রত্যাবর্তন করাবো, যাতে সে প্রত্যাবর্তন করতে চায় এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর ওটা কতই না নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তন স্থল।” (সূরা নিসাঃ ১১৫) উক্ত আয়াতে কারীমায় বলা হয়েছে, জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করার শর্ত হল হেদায়েত সুস্পষ্ট হওয়ার পর রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিরোধিতা করা।

   কাজটি করলে কাফের হয়ে যাবে, এটা জানা কি জরুরী? নাকি কাজটি শরীয়তে নিষেধ এতটুকু জানাই যথেষ্ট? যদিও কাজটির ফলাফল সম্পর্কে অবগত না থাকে।

   উত্তর হল, কাজটি শরীয়তে নিষেধ একথা জেনে তাতে লিপ্ত হলেই হুকুম লাগানোর জন্য যথেষ্ট। কেননা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রামাযান মাসে দিনের বেলায় স্ত্রীর সাথে সহবাস করার কারণে এক লোকের উপর কাফ্‌ফারা ওয়াজিব করেছিলেন। কারণ সে জানতো দিনের বেলায় স্ত্রী সহবাস করা হারাম। কিন্তু কাফ্‌ফারা ওয়াজিব হওয়ার কথা জানতো না। বিবাহিত পুরুষ ব্যভিচারকে হারাম জেনে তাতে লিপ্ত হলে তাকে রজম করতে হবে। যদিও সে বিবাহিত যেনাকারীর শাস্তি যে রজম, তা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে।

   জোর পূর্বক কাউকে কুফরী কাজে বাধ্য করা হলে, তাকে কাফের বলা যাবে না। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ

)مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ مِنْ بَعْدِ إِيمَانِهِ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنٌّ بِالْإِيمَانِ وَلَكِنْ مَنْ شَرَحَ بِالْكُفْرِ صَدْرًا فَعَلَيْهِمْ غَضَبٌ مِنْ اللَّهِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ(

“কেউ ঈমান আনার পরে আল্লাহর সাথে কুফরীতে লিপ্ত হলে এবং কুফরীর জন্য অন্তরকে খুলে দিলে তার উপর আপততি হবে আল্লাহর গযব এবং তার জন্যে রয়েছে মহা শাস্তি। তবে তার জন্যে নয়, যাকে কুফরীর জন্যে বাধ্য করা হয়েছে। কিন্তু তার চিত্ত ঈমানে অবিচল।” (সূরা নাহ্‌লঃ ১০৬)

   অধিক আনন্দ প্রকাশ করতে গিয়ে বা চিন্তিত অবস্থায় অথবা রাগান্বিত হয়ে অথবা ভীত অবস্থায় কুফরী বাক্য উচ্চারণ করলে কাফের হয়ে যাবে না। আল্লাহর বাণী,

)وَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ فِيمَا أَخْطَأْتُمْ بِهِ وَلَكِنْ مَا تَعَمَّدَتْ قُلُوبُكُمْ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا(

“ভুলক্রমে কোন অপরাধ করলে তোমাদের কোন দোষ নেই। কিন্তু তোমাদের অন্তরে সংকল্প থাকলে অপরাধ হবে। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আহ্‌যাবঃ ৫) ছহীহ মুসলিম শরীফে আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

لَلَّهُ أَشَدُّ فَرَحًا بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ حِينَ يَتُوبُ إِلَيْهِ مِنْ أَحَدِكُمْ كَانَ عَلَى رَاحِلَتِهِ بِأَرْضِ فَلَاةٍ فَانْفَلَتَتْ مِنْهُ وَعَلَيْهَا طَعَامُهُ وَشَرَابُهُ فَأَيِسَ مِنْهَا فَأَتَى شَجَرَةً فَاضْطَجَعَ فِي ظِلِّهَا قَدْ أَيِسَ مِنْ رَاحِلَتِهِ فَبَيْنَا هُوَ كَذَلِكَ إِذَا هُوَ بِهَا قَائِمَةً عِنْدَهُ فَأَخَذَ بِخِطَامِهَا ثُمَّ قَالَ مِنْ شِدَّةِ الْفَرَحِ اللَّهُمَّ أَنْتَ عَبْدِي وَأَنَا رَبُّكَ أَخْطَأَ مِنْ شِدَّةِ الْفَرَحِ

“গুনাহ করার পর বান্দা যখন তাওবা করে, তখন আল্লাহ তাআ’লা ঐ ব্যক্তির চেয়ে বেশী খুশী হন, যে একটি বাহনের উপর আরোহন করে মরুভূমির উপর দিয়ে পথ চলতে ছিল। এমন সময় বাহনটি তার খাদ্য-পানীয় সব নিয়ে পলায়ন করল। এতে লোকটি নিরাশ হয়ে একটি গাছের নিচে এসে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ নিদ্রায় থাকার পর হঠাৎ উঠে দেখে বাহনটি তার সমস্ত আসবাব পত্রসহ মাথার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সে বাহনটির লাগাম ধরে আনন্দে বলে উঠল, হে আল্লাহ! আপনি আমার গোলাম, আমি আপনার রব। খুশীতে আত্মহারা হয়েই সে এ ধরণের ভুল করেছে।”

   কাফের বলার পথে আরেকটি বাধা হল কাজটি কুফরী হওয়ার ব্যাপারে কুফরীতে লিপ্ত ব্যক্তির কাছে তা’বীল বা ব্যাখ্যা থাকা। যে কারণে সে মনে করে যে, সে সত্যের উপরই আছে। কাজেই সে তার ধারণা মতে পাপ বা শরীয়ত বিরোধী কাজে লিপ্ত হয়নি। এমতাবস্থায় সে নিম্নোক্ত আয়াতের অন্তর্ভুক্ত হবে যেখানে আল্লাহ বলেনঃ

)وَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ فِيمَا أَخْطَأْتُمْ بِهِ وَلَكِنْ مَا تَعَمَّدَتْ قُلُوبُكُمْ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا(

“ভুলক্রমে কোন অপরাধ করলে তোমাদের কোন দোষ নেই। কিন্তু তোমাদের অন্তরে সংকল্প থাকলে অপরাধ হবে। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আহ্‌যাবঃ ৫) আল্লাহ আরো বলেনঃ

)لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا(

“আল্লাহ কাউকে সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না।” (সূরা বাকারাঃ ২৮৬)

ইমাম ইবনে কুদামা আলমাকদেসী বলেন, কোন প্রকার সন্দেহ বা ব্যাখ্যা ব্যাতীত কেউ যদি নিরাপরাধ মানুষকে হত্যা করা হালাল ভেবে হত্যা করে এবং তাদের সম্পদ আত্মসাৎ করে, তাহলেও সে কাফের হয়ে যাবে। আর যদি তা’বীল করে কাফের ভেবে হত্যা করে এবং সম্পদ হালাল জেনে আত্মসাৎ করে, তবে তাদেরকে কাফের বলা হবে না। এ জন্যে খারেজীদেরকে অধিকাংশ আলেমগণ কাফের বলেন নি। অথচ তারা মুসলমানদের জান্তমাল হালাল মনে করে এবং এ কাজের দ্বারা তারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারবে বলে মনে করে। তাদেরকে কাফের না বলার কারণ এই যে, তারা তা’বীল বা অপব্যাখ্যা করে মুসলমানদেরকে হত্যা করেছিল। তিনি আরো বলেনঃ খারেজীরা অনেক ছাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেয়ীদের রক্ত ও সম্পদ হালাল মনে করত। শুধু তাই নয় এ কাজকে তারা আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের মাধ্যম মনে করত। তা সত্বেও আলেমগণ তাদেরকে কাফের বলেন নি। কারণ তাদের কাছে অপব্যাখ্যা ছিল।

   ইমাম ইবনে তাইমীয়া (রঃ) বলেন, কুরআনের বিরোধীতা করা খারেজীদের উদ্দেশ্য ছিল না; বরং কুরআন বুঝতে গিয়ে ভুল করার কারণে তারা বিদ্‌আতে লিপ্ত হয়ে পাপী মুমিনদেরকে কাফের মনে করেছে। তিনি আরো বলেনঃ খারেজীরা কুরআনের বিরোধীতা করে মুমিনদেরকে কাফের বলেছে। অথচ কুরআনের ভাষায় মুমিনদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। তারা বিনা ইলমে, সুন্নার অনুসরণ না করে এবং প্রকৃত জ্ঞানীদের কাছে না গিয়ে কুরআনের অস্পষ্ট আয়াতগুলোর অপব্যাখ্যা করেছে। তিনি আরো বলেনঃ ইমামগণ ঐক্যবদ্ধভাবে খারেজীদেরকে নিন্দা করেছেন এবং গোমরাহ বলেছেন। তবে তাদেরকে কাফের বলার ক্ষেত্রে দু’টি বর্ণনা পাওয়া যায়। কিন্তু তিনি এও উল্লেখ করেছেন যে, আলী (রাঃ) বা অন্য কোন ছাহাবী তাদেরকে কাফের বলেন নি; বরং তাদেরকে জালেম এবং সীমা লংঘনকারী মুসলমান হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল ও অন্যান্য ইমামগণ থেকেও এ ধরণের কথা বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে তাইমীয়া আরো বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খারেজীদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে বলেছেন। চতুর্থ খলীফা আলী (রাঃ) তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন। ছাহাবী ও পরবর্তী উত্তম যুগের ইমামগণ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন। আলী (রাঃ), সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস বা অন্য কোন সাহাবী খারেজীদেরকে কাফের বলেন নি; বরং তাদেরকে মুসলমান মনে করেছেন। তারা যখন অন্যায়ভাবে মানুষের রক্তপাত শুরু করল এবং মুসলমানদের ধন্তসম্পদের উপর আক্রমণ করল তখন আলী (রাঃ) তাদের এই যুলুম এবং বিদ্রোহ দমন করার জন্য যুদ্ধ করেছেন। তাদেরকে কাফের মনে করে যুদ্ধ করেন নি। তাই তিনি তাদের মহিলাদেরকে দাসী হিসাবে বন্দী করেন নি এবং তাদের সম্পদকে গণীমত হিসাবে গ্রহণ করেন নি। তাদের গোমরাহী কুরআনের দলীল, মুসলমানদের ইজমা দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার আদেশ দিয়েছেন। তথাপিও আলেমগণ তাদেরকে কাফের বলেন নি। তাহলে কিভাবে এমন ফির্কার লোকদেরকে কাফের বলবেন, যাদের চেয়ে বড় আলেমগণ অনেক মাসআলায় ভুল করেছেন। সুতরাং এক দলের পক্ষে অপর দলকে কাফের বলা এবং জান্তমাল হালাল মনে করা জায়েয নেই। যদিও তাদের ভিতরে বিদ্‌আত বর্তমান রয়েছে। মূল কথা তারা যে বিষয়ে মতভেদ করেছে সে সম্পর্কে তারা সকলেই অজ্ঞ। তিনি আরো বলেনঃ কোন মুসলিম যদি তা’বীল করে কারও বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বা কাউকে কাফের বলে, তবে উক্ত মুসলিমকে কাফের বলা যাবে না। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বাণী থেকে যে হুকুম সাব্যস্ত হয়, দাওয়াত না পৌঁছিয়ে বান্দার ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হওয়ার ক্ষেত্রে হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণের তিন ধরণের বক্তব্য রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে কুরআনের বক্তব্যই সঠিক। আল্লাহ বলেনঃ

)وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولًا(                                                                           

“রাসূল না পাঠিয়ে আমি কাউকে শাস্তি দেবনা।” (সূরা ইসরাঃ ১৫)

)رُسُلًا مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ لِأَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ(

“সুসংবাদ দাতা ও ভীতি-প্রদর্শনকারী রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি, যাতে রাসূলগণের পরে আল্লাহর প্রতি ওযুহাত পেশ করার মত কোন অবকাশ মানুষের জন্য না থাকে।” (সূরা নিসাঃ ১৬৫) বুখারী ও মুসলিম শরীফে আছে, আল্লাহর চেয়ে অধিক ওযর-অযুহাত গ্রহণকারী আর কেউ নেই। এই জন্যই আল্লাহ তাআ’লা সুসংবাদ দাতা এবং ভয় প্রদর্শনকারী হিসাবে রাসূল প্রেরণ করেছেন।

   মোট কথা অজ্ঞতার কারণে কেউ কুফরী করলে অথবা কুফরী বাক্য উচ্চারণ করলে কাফের হবে না। এটাই আল্লাহর কিতাব, রাসূলের সুন্নাত এবং আলেমদের পথ।