• ৫৬৬৩৯ টি সর্বমোট হাদিস আছেঃ
  • ৫৭৫৬ টি প্রশ্নোত্তর ও ফিকাহঃ

 

 

 

 


মাস'আলা / মাসায়েল - প্রশ্নোত্তর

জানাযার ছালাতের বিবরণ

জানাযার ছালাতের বিবরণ (صفة صلاة الجنازة) :

জানাযার ছালাতে চার তাকবীর দিবে। পাঁচ থেকে নয় তাকবীর পর্যন্ত প্রমাণিত আছে। তবে চার তাকবীরের হাদীছ সমূহ অধিকতর ছহীহ ও সংখ্যায় অধিক। মুক্তাদী ইমামের পিছে পিছে তাকবীর বলবে।[16] প্রথমে মনে মনে জানাযার নিয়ত করে সরবে ‘আল্লাহু আকবর’ বলে দু’হাত কাঁধ পর্যন্ত উঠিয়ে বাম হাতের উপর ডান হাত বুকে বাঁধবে। এ সময় ‘ছানা’ পড়বে না।[17] নাভির নীচে হাত বাঁধার হাদীছ সর্বসম্মতভাবে ‘যঈফ’।[18] আনাস, ইবনে ওমর, ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ ছাহাবীগণ সকল তাকবীরেই হাত উঠাতেন।[19] অতঃপর আ‘ঊযুবিল্লাহ-বিসমিল্লাহ সহ সূরায়ে ফাতিহা ও অন্য একটি সূরা পড়বে। [20] তারপর ২য় তাকবীর দিবে ও দরূদে ইবরাহীমী পাঠ করবে, যা আত্তাহিইয়াতু-র পরে পড়া হয়। তারপর ৩য় তাকবীর দিবে ও নিম্নোক্ত দো‘আ সমূহ পড়বে। দো‘আ পাঠ শেষে ৪র্থ তাকবীর দিয়ে প্রথমে ডাইনে ও পরে বামে সালাম ফিরাবে। ডাইনে একবার মাত্র সালাম ফিরানোও জায়েয আছে। [21]

জানাযার ছালাত সরবে ও নীরবে পড়া যায়।[22] ইমাম সরবে পড়লে মুক্তাদীগণ আ‘ঊযুবিল্লাহ-বিসমিল্লাহ সহ কেবল সূরায়ে ফাতিহা চুপে চুপে পড়বে এবং পরে দরূদ ও অন্যান্য দো‘আ সমূহ পড়বে। তবে ইমাম নীরবে পড়লে মুক্তাদীগণ সূরা ফাতিহা ও অন্য একটি সূরা এবং অন্যান্য দো‘আ সমূহ পড়বে।

জানাযার পূর্বে করণীয় : জানাযার পূর্বে মৃতের জন্য প্রথম করণীয় হ’ল তার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করা। এজন্য তার সকল সম্পদ বিক্রি করে হ’লেও তা করতে হবে। যদি তার কিছুই না থাকে, তাহ’লে তার নিকটাত্মীয়, সমাজ, সংগঠন বা সরকার সে দায়িত্ব বহন করবে’।[23]

জানাযা বিষয়ে সতর্কতা :

মহাপাপী কোন মুসলিম যেমন কোন ব্যভিচারী, মদ্যপায়ী, চোর-দস্যু-সন্ত্রাসী, আত্মঘাতি, জারজ সন্তান, কবর ও মূর্তি পূজারী, মুশরিক ও বিদ‘আতী যতক্ষণ না সে প্রকাশ্যে কুফরী ঘোষণা করে, আমানতের খেয়ানতকারী প্রভৃতি লোকদের জানাযা কোন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও পরহেযগার আলেমগণ পড়বেন না। তবে সাধারণ লোকেরা পড়বেন। [24]

ঋণগ্রস্ত, আত্মহত্যাকারী ও বায়তুল মাল বা অন্যের সম্পদ আত্মসাৎকারীর জানাযা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজে পড়েননি, বরং অন্যকে পড়তে বলেন।[25] ‘এটি ছিল তাঁর পক্ষ থেকে অন্যকে আদব শিখানোর জন্য’। [26]

(১) খায়বার কিংবা হোনায়েন-এর যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর জনৈক সাথী বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে। লোকেরা তার উচ্চ প্রশংসা করলে রাসূল (ছাঃ) বললেন, ঐ ব্যক্তি জাহান্নামের অধিবাসী। তখন একজন গোপনে তার পিছু নিল। দেখা গেল যে, ঐ ব্যক্তি যুদ্ধের এক পর্যায়ে আহত হ’ল। অতঃপর যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে নিজের অস্ত্র দিয়ে আত্মহত্যা করল। তখন লোকটি ছুটে এসে বলল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সবাইকে ডেকে বললেন, সত্যিকারের মুমিন ব্যতীত কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। মনে রেখ অনেক লোক জান্নাতী আমল করে। কিন্তু মৃত্যুকালে জাহান্নামী হয়ে যায়। আবার অনেকে জাহান্নামের আমল করে, কিন্তু মৃত্যুকালে জান্নাতী হয়ে যায়। অতঃপর তিনি বলেন إِنَّ اللهَ يُؤَيِّدُ هَذَا الدِّينَ بِالرَّجُلِ الْفَاجِرِ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ এই দ্বীনকে সাহায্য করেন অনেক পাপী লোকের মাধ্যমে’।[27]

আল্লাহ বলেন,وَلاَ تَقْتُلُوْا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيْمًا ‘তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি অতিশয় দয়াবান’ (নিসা ৪/২৯)

(২) খায়বার যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথীদের মধ্যে একজন নিহত হ’লে তিনি বলেন, صَلُّوْا عَلَى صَاحِبِكُمْ ‘তোমরা তোমাদের সাথীর জানাযা পড়’। এতে তাদের মন খারাপ হলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদের বললেন, إِنَّ صَاحِبَكُمْ غَلَّ فِىْ سَبِيْلِ اللهِ ‘তোমাদের সাথীটি আল্লাহর রাস্তায় খেয়ানত করেছে’। পরে অনুসন্ধানে তার থলিতে ইহুদীদের কণ্ঠহারের একটি ছিদ্রযুক্ত ছোট পাথরের লকেট (خَرَزٌ) পাওয়া গেল (যা গণীমতের মাল ছিল)। যার মূল্য দুই দিরহামেরও কম। [28]

(৩) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে হাদিয়া হিসাবে পাঠানো গোলাম মিদ‘আম (مِدْعَم) খায়বার যুদ্ধে নিহত হ’লে লোকেরা তার জান্নাতের সুসংবাদ বলতে থাকলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রাগতঃস্বরে বলেন, কখনোই না। আল্লাহর কসম! গণীমতের মাল থেকে যে চাদরটি সে চুরি করেছে, তা তাকে আগুনে পোড়াবে’। [29]

(৪) অন্য হাদীছে এসেছে, ‘মুমিনের নফ্স তার ঋণের সাথে লটকানো থাকে এবং সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না তার ঋণ পারিশোধ করা হয়’। [30]

(৫) যারা শরীক ফাঁকি দেয় কিংবা শক্তির জোরে বা ছল-চাতুরী করে অন্যের জমি ও সম্পদ আত্মসাৎ করে, তাদের জানাযা কোন পরহেযগার আলেমের পড়া উচিৎ নয়। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, مَنْ أَخَذَ شِبْرًا مِنَ الْأَرْضِ ظُلْمًا فَإِنَّهُ يُطَوَّقُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ سَبْعِ أَرْضِيْنَ ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারু জমি দখল করে, ক্বিয়ামতের দিন সাত তবক যমীন তার গলায় বেড়ীরূপে পরিয়ে দেওয়া হবে’।[31] অন্য বর্ণনায় এসেছে, مَنْ أَخَذَ أَرْضًا بِغَيْرِ حَقِّهَا كُلِّفَ أَنْ يَّحْمِلَ تُرَابَهَا الْمَحْشَرَ ‘...তাকে ক্বিয়ামতের দিন ঐ মাটির বোঝা মাথায় বহন করে চলতে বাধ্য করা হবে’।[32]

উপরোক্ত ব্যক্তিগণ কবীরা গোনাহগার। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে ছালাত তরককারী ব্যক্তিকে হাদীছে ‘কাফির’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। [33] তাহ’লে কিভাবে তার জানাযা পড়া যেতে পারে? আল্লাহ আমাদের হেদায়াত করুন- আমীন!